‘দ্বীন’ অর্থ কী? ড. ইউসুফ আল কারযাভী অনুবাদ : মু. সাজ্জাদ হোসাইন খাঁন

উসতায ইউসুফ আল কারযাভী রচিত অনবদ্য এক গ্রন্থ ‘الدين والسياسة’। বাংলায় আমরা ‘ইসলাম ও রাজনীতি’ বলতে পারি। ঊঁৎড়ঢ়বধহ ঈড়ঁহপরষ ভড়ৎ ঋধঃধি ধহফ জবংবধৎপয-এর আহ্বানে গ্রন্থটি রচনা করেন উসতায। সংস্থাটি ২০০৬ সালে তাদের ষোড়শ অধিবেশনে ‘الفقه السياسي للأقليات المسلمة في أوروبا’ শিরোনামে একটি সেমিনারের আয়োজন করে। উক্ত সেমিনারে এই গবেষণাকর্মটি উপস্থাপন করা হয়। এতে উসতায কারযাভী ইসলাম ও রাজনীতির সংজ্ঞা, উভয়ের মধ্যকার সম্পর্ক, ইসলামী ঐতিহ্যে রাজনীতির অবস্থান, ইসলামী জীবনব্যবস্থায় রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা, ইসলামী রাজনীতির বিরুদ্ধে সেক্যুলারদের অসার দাবি, সেক্যুলারিজমের বাতুলতা ও মুসলিম সংখ্যালঘু রাষ্ট্রে ইসলামী রাজনীতি নিয়ে ধারাবাহিকভাবে বিস্তর আলোচনা করেছেন। এই বিষয়গুলো সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখা প্রতিটি মুসলমানের জন্য, বিশেষত ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের জন্য অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ। ইসলাম ও রাজনীতি সম্পর্কিত বোঝাপড়ার আগে ‘দ্বীন’ এর সঠিক বুঝ অর্জন করা দরকার। তাই উসতায কারযাভী দ্বীন শব্দের অর্থ বর্ণনার মাধ্যমে এ বিষয়ক আলোচনার সূচনা করেছেন। -অনুবাদক।

‘দ্বীন’ আভিধানিক অর্থ
আমরা যদি ‘الدين’ শব্দের আভিধানিক অর্থ সম্পর্কে অনুসন্ধান করি, তাহলে দেখতে পাব যে শব্দটির ভিন্নধর্মী একাধিক অর্থ রয়েছে। ভিন্নধর্মী একাধিক অর্থ থাকার কারণে, কেবল আভিধানিক অর্থ থেকে ‘الدين’ শব্দের প্রকৃত মর্ম সম্পর্কে আমরা বেশি একটা অবগত হতে পারি না। এ কারণেই আল্লামা ড. মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ দাররায কোনো বিষয়ে চূড়ান্ত বোধ অর্জনে আভিধানিক জ্ঞানকে অসম্পূর্ণ আখ্যায়িত করেছেন, কারণ তা আমাদেরকে সামগ্রিকভাবে কোনো বিষয়ের যথার্থ ও চূড়ান্ত বোধ ও তাৎপর্য সম্পর্কে অবহিত করতে পারে না।
তবে শাইখ দাররায তাঁর গবেষণায় পেয়েছেন যে, ‘الدين’ শব্দের এই বিবিধ অর্থ সামগ্রিকভাবে তিনটি পরস্পর সম্পর্কযুক্ত মৌলিক অর্থের প্রতি অভিমুখী হয়। আবার এই তিনটি মৌলিক অর্থের মাঝেও যে সামান্য তফাৎ পরিলক্ষিত হয়, তার ভিত্তি হচ্ছে যে শব্দের অর্থ করা হচ্ছে তা মূলত একটা শব্দ নয়, বরং তিনটি শব্দ। আরও সাবলীল করে বলতে হলে, ‘الدين’ শব্দ তিনটি ক্রিয়ামূলকে ধারণ করে। ফলে, এই তিন ক্রিয়ামূলের অর্থের মাঝে সামান্য তফাৎ পরিলক্ষিত হয়। নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
‘الدين’ শব্দটি মাঝে মাঝে ‘دانه يدينه’ থেকে উদগত হয়। তখন এটা হয় স্বনির্ভর فعل متعدي বা সকর্মক ক্রিয়া। মাঝে মাঝে ‘دان له’ থেকে উদগত হয়, তখন এটা ‘ل’ দ্বারা فعل متعدي বা সকর্মক ক্রিয়া হয় এবং মাঝে মাঝে ‘دان به’ থেকে উদগত হয়, তখন এটা ‘ب’ দ্বারা فعل متعدي বা সকর্মক ক্রিয়া হয়। এই উৎপত্তিস্থল ভিন্ন হওয়ার কারণেই ‘الدين’ শব্দের অর্থের মাঝে ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়।
১. ফলে যখন আমরা বলব ‘دانه دينا’, তখন এর অর্থ হবে, সে তার মালিক হলো, সে তাকে আদেশ করল, সে তাকে পরিচালনা করল, সে তার বন্দোবস্ত করল, সে তাকে বশীভূত করল, সে তার হিসাব নিলো, সে তার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিলো, সে তাকে প্রতিদান দিল এবং সে তাকে পুরস্কৃত করল ইত্যাদি। অতএব দেখা যাচ্ছে উপর্যুক্ত ব্যবহারে ‘الدين’ শব্দটি ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের অর্থ প্রদান করে। আর এই মালিক হওয়া, আদেশ করা, পরিচালনা করা, বন্দোবস্ত করা, বশীভূত করা, হিসাব নেয়া, সিদ্ধান্ত নেয়া, প্রতিদান দেয়া ও পুরস্কৃত করা ইত্যাদি সবকিছুই রাজা, বাদশাহ বা ক্ষমতাধর সত্তার কর্মকা-।
‘الدين’ শব্দের এ অর্থই প্রদান করে মহাগ্রন্থ কুরআনুল কারিমের এই আয়াত,
مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ
“বিচার দিনের মালিক।” (সূরা ফাতিহা : ৪)
অর্থাৎ হিসাব-নিকাশ আদায় ও প্রতিদান প্রদানের দিবস।
রাসূল সা. বলেন,
الْكَيِّسُ مَنْ دَانَ نَفْسَهُ
“বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে নিজের নফসকে বশে রাখে।” ১
অর্থাৎ সে স্বীয় নফসকে তার নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্বের ভিতর রাখে।
‘الدين’ শব্দের এই অর্থের ভিত্তিতেই কাজি বা বিচারককে আরবিতে ‘الديان’ বলা হয়।
২. আবার যখন আমরা বলব ‘دان له’, তখন এর অর্থ হবে সে তার আনুগত্য করেছে, সে তার অধীন হয়েছে ইত্যাদি। অতএব এর আলোকে ‘الدين’ শব্দের অর্থ হচ্ছে আনুগত্য, বশ্যতা, অধীনতা ও দাসত্ব ইত্যাদি।
ফলে ‘الدین لله’ বা ‘দ্বীন আল্লাহর জন্য’ এই শব্দগুচ্ছ দুইটি অর্থ প্রদান করে। আর এই দুইটি অর্থই সঠিক। অর্থ দুইটি হচ্ছে, ১. কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা আল্লাহর জন্য। ২. আনুগত্য ও দাসত্ব আল্লাহর জন্য।
উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে আমাদের কাছে এ কথা স্পষ্ট যে, ‘الدين’ শব্দের দ্বিতীয় অর্থটি প্রথম অর্থের অনুগামী ও তার সাথে সম্পর্কিত। তাই বলা হয়,
دانه فدان له
অর্থাৎ সে তাকে আনুগত্যের ব্যাপারে চাপ প্রয়োগ করল, ফলে সে তার আনুগত্য করল এবং তার সামনে বিনীত হলো।
৩. আবার যখন আমরা বলব ‘دان بالشيء’, তখন এর অর্থ হবে, সে কোনো কিছুকে তার দ্বীন বা চলার পথ হিসেবে গ্রহণ করেছে, কোন কিছুকে সে তার আকিদা বা বিশ্বাস হিসেবে পছন্দ করে নিয়েছে এবং কোন কিছুকে সে তার অভ্যাস বা আখলাক হিসেবে বেছে নিয়েছে ইত্যাদি। এর আলোকে ‘الدين’ শব্দের অর্থ হয় এমন চিন্তাগত ও কর্মগত এমন এক মাজহাব বা চলার পথ, মানুষ যাকে তাদের জীবন চলার পথে অনুসরণ করে। একজন মানুষের কর্মগত মাজহাব হচ্ছে তার স্বভাব, আচার, আচরণ, অভ্যাস, রীতি নীতি ও জীবন চরিত ইত্যাদি। যেমন বলা হয়,
هذا ديني وديدني
অর্থাৎ এটাই আমার দ্বীন, এটাই আমার স্বভাব চরিত।
আবার একজন মানুষের চিন্তাগত মাজহাব হচ্ছে তার আকিদা-বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গি, যা সে লালন করে। যেমন আরবরা বলে,
دینت الرجل
অর্থাৎ আমি তাকে তার দ্বীনের ব্যাপারে ছেড়ে দিয়েছি। তথা আকিদা বা বিশ্বাস হিসেবে যা কিছুকে সে বেছে নিয়েছে, তার ব্যাপারে আমি কোনো আপত্তি বা বিরোধিতা করিনি।
অতএব দেখা যাচ্ছে, ‘الدين’ শব্দের এই তৃতীয় অর্থটিও পূর্ববর্তী দুই অর্থের অনুগামী। কারণ কোনো ব্যক্তি যে আকিদা-বিশ্বাস বা স্বভাব-চরিত্রগুলো লালন করে, তার উপর এসবের সীমাহীন প্রভাব বিরাজ থাকে। ফলে এই আকিদা-বিশ্বাস বা স্বভাব-চরিত্রগুলো ব্যক্তিকে তাদের অনুগত, অনুসারী ও দাসানুদাস করে তোলে।
মোট কথা এই ত্রিবিধ আভিধানিক অর্থ থেকে এ কথা প্রমাণিত হচ্ছে যে, ‘الدين’ শব্দ দ্বারা আরবরা মূলত এমন এক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে বুঝাতো যার প্রথমপক্ষ দ্বিতীয়পক্ষকে সম্মান ও ভক্তি করতো, সমীহ করতো এবং তার সামনে বিনীত হতো। তাই আমরা যদি ‘الدين’ শব্দকে প্রথমপক্ষের বিশেষণ হিসেবে ব্যবহার করি, তখন এর অর্থ হবে আনুগত্য ও অধীনতা। আর যদি দ্বিতীয় পক্ষের বিশেষণ হিসেবে ব্যবহার করি, তখন এর অর্থ হবে মালিকানা, ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব ইত্যাদি। আর যদি আমরা দুই পক্ষের মধ্যে যুগসূত্র স্থাপনকারী সম্পর্ককে বিবেচনায় আনি, তখন এর অর্থ হবে দ্বিপাক্ষিক এই সম্পর্কের প্রকাশভঙ্গি কিংবা এই সম্পর্ক পরিচালিত হওয়ার সুবিন্যস্ত রূপরেখা।
অতএব আমরা বলতে পারি যে, সম্পূর্ণ আলোচনা মূলত একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে। আর তা হচ্ছে আনুগত্যের আবশ্যকতা। প্রথম ব্যবহার তথা دانه دينا এর অর্থ হচ্ছে অপরের উপর আনুগত্য আবশ্যক করে দেওয়া, দ্বিতীয় ব্যবহার তথা دان له এর অর্থ হচ্ছে নিজের উপর আনুগত্যকে আবশ্যক করে নেওয়া এবং তৃতীয় ও সর্বশেষ ব্যবহার তথা دان بالشيء এর অর্থ হচ্ছে সেই মূলনীতি ও রূপরেখা, যার আনুগত্য করা হয়।
উপর্যুক্ত আলোচনা আরেকটি কথা পরিষ্কার হয়ে ওঠে। তা হচ্ছে ‘الدين’ শব্দটি ও তার সমুদয় ব্যবহার সবকিছুই আরবি ভাষার উৎসজাত। আর ওরিয়েন্টালিস্টরা যা দাবি করে তথা ‘الدين’ শব্দ ও এর সমুদয় ব্যবহার কিংবা অধিকাংশ ব্যবহার হিব্রু অথবা ফার্সি থেকে আগত, তা একটি মিথ্যা ও অসার দাবি। তাদের এই অযৌক্তিক দাবির পিছনে লুকিয়ে রয়েছে ঘৃণ্য জাতিবিদ্বেষ। তারা আরবদেরকে সম্মান ও গৌরবের সকল উৎস থেকে বঞ্চিত করতে চায়, এমনকি ভাষাগত সম্মান ও গৌরব থেকেও; অথচ এ ভাষাই হচ্ছে তাদের সম্মান ও গৌরবের সর্বশ্রেষ্ঠ উৎস।২
আমাদের মূল আলোচনায় ফিরে যাওয়া যাক। ‘الدين’ শব্দের এই ত্রিবিধ ব্যবহার থেকে আমাদেরকে সাহায্য করবে শেষ দুইটি ব্যবহার, বিশেষত তৃতীয় ব্যবহারটি। কারণ ধর্মসমূহের ইতিহাসে ‘الدين’ শব্দটি মাত্র দুইটি অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে, অন্য আর কোনো অর্থে ব্যবহৃত হয়নি। যথা-
১. সেই মানসিক অবস্থা (ল্কঃধঃ ংঁনলবপঃরভ), যাকে আমরা ধার্মিকতা (ৎবষরমরড়ংরঃল্ক) হিসেবে অভিহিত করে থাকি।
২. বহিস্থ সেই হাকিকত (ভধরঃ ড়নলবপঃরভ) যার দিকে প্রতিটি বাহ্যিক আচার-আচরণ, রীতিনীতি ও কর্মকা-ের ক্ষেত্রে প্রত্যাবর্তন করা যায়। অর্থাৎ সেই মূলনীতিসমূহ যাকে কোনো জাতি তাদের চিন্তা ও কর্মের মানহায (ফড়পঃৎরহব ৎবষরমরবঁংব) হিসেবে গ্রহণ করে থাকে।
সর্বশেষ এই অর্থটিই বহুল ব্যবহৃত ও প্রচলিত।৩
‘দ্বীন’ পারিভাষিক অর্থ
الدين শব্দের আভিধানিক অর্থ আমাদেরকে এর সেই পূর্ণাঙ্গ বোধ ও অর্থ প্রদান করে না, যেই অর্থে শব্দটিকে মানুষ চিনে এবং তাদের ভাষায় ব্যবহার করে থাকে। মুসলিম স্কলারগণ الدين এর বেশ কিছু সংজ্ঞা প্রদান করেছেন, যদিও সংজ্ঞাগুলো প্রায় কাছাকাছি।
ইবনুল কামাল বলেন, “দ্বীন হচ্ছে এমন এক ইলাহি বিষয়, যা আকলবানদেরকে ঐ বিষয়াগুলো কবুল করতে আহ্বান জানায়, যেগুলো রাসূল সা. নিয়ে এসেছেন।”
কেউ কেউ বলেন, “দ্বীন হচ্ছে এমন এক ইলাহি বিষয়, যা আকলবানদেরকে তাদের সৎ ইচ্ছাশক্তির ভিত্তিতে সত্তাগত দিক থেকে উত্তম বিষয়াবলির প্রতি চালিত করে।”৪
আবুল বাকা তার কুল্লিয়ায় বলেন, “দ্বীন হচ্ছে এমন এক ইলাহি বিষয়, যা আকলবানদেরকে তাদের সৎ ইচ্ছার আলোকে সত্তাগত দিক থেকে উত্তম অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক বিষয়াবলির প্রতি চালিত করে। যেমন আকিদা-বিশ্বাস, জ্ঞান ও নামায ইত্যাদি।
মাঝে মাঝে الدين শব্দের ব্যবহারে এর একটি দিককে (এর অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক বিষয়াবলির মাঝে অভ্যন্তরীণ বিষয়াবলিকে) উপেক্ষা করে এটাকে কেবল দ্বীনের মৌলিক বিষয়য়াবলি বুঝাতে প্রয়োগ করা হয়। তখন এটি মিল্লাত অর্থে ব্যবহৃত হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
دِينًا قِيَمًا مِلَّةَ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا ۚ
“এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বীন, ইবরাহিমের মিল্লাত (আদর্শ), তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ।” (সূরা আনয়াম : ১৬১)
আবার মাঝে মাঝে এর অন্য দিকটিকে উপেক্ষা করে এটাকে দ্বীনের শাখাগত বিষয়াবলি বুঝাতে প্রয়োগ করা হয়। এ অর্থেই আল্লাহ তায়ালার কথা,
وَيُقِيمُوا الصَّلَاةَ وَيُؤْتُوا الزَّكَاةَ ۚ وَذَٰلِكَ دِينُ الْقَيِّمَةِ
অর্থাৎ আর (তাদেরকে আদেশ করা হয়েছে) নামায কায়েম করতে ও যাকাত আদায় করতে। আর এটাই সঠিক দ্বীন।”
(সূরা বাইয়িনাহ : ৫)৫
ইসলামপন্থীরা দ্বীনের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ যে সংজ্ঞাটি নকল করে, তা মূলত বর্ণনা করেছেন كشاف اصطلاحات العلوم والفنون প্রণেতা। সংজ্ঞাটি হচ্ছে, “দ্বীন হচ্ছে এমন এক ইলাহি বিষয়, যা সুস্থ আকলের অধিকারী ব্যক্তিদেরকে তাদের ইচ্ছার আলোকে দুনিয়াবি কল্যাণ ও পরকালীন সফলতার দিকে চালিত করে।”৬
শাইখ ড. দাররায উপর্যুক্ত সংজ্ঞাগুলোকে এভাবে সারসংক্ষেপ করেছেন,
الدين وضع إلهي يرشد إلی الحق في الإعتقادات، وإلی الخير في السلوك والمعاملات.
“দ্বীন হচ্ছে এমন এক ইলাহি বিষয়, যা আকিদার ক্ষেত্রে হক এবং আচার-আচরণ ও মুয়ামালাতের ক্ষেত্রে কল্যাণের দিকে চালিত করে।”৭
আমার কাছে মনে হয়েছে, শাইখ দাররাযের সংক্ষেপিত এই সংজ্ঞার ত্রুটি হচ্ছে তা ইবাদত ও মুয়ামালাত উভয়কে একত্রে ধারণ করে না। তবে আমরা যদি সংজ্ঞায় বর্ণিত আচার-আচরণ (السلوك) শব্দকে ব্যাপক অর্থে ধরি, তাহলে তা আল্লাহর সাথে আচার-আচরণ ও বান্দার সাথে আচার-আচরণ উভয়কেই ধারণ করে।
শাইখ দাররায পাশ্চাত্যের কিছু স্কলার কর্তৃক বর্ণিত ধর্মের সংজ্ঞাও উল্লেখ করেছেন, যা মুসলিম স্কলারদের বর্ণিত দ্বীনের সংজ্ঞার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিংবা সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলেও কাছাকাছি অর্থবোধক। আমরা এখানে কয়েকটি সংজ্ঞা উদ্ধৃতি করছি।
ঈরপবৎড় বলেন, “ধর্ম হচ্ছে সেই সম্পর্ক বা বন্ধন, যার মাধ্যমে মানুষ স্রষ্টার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে।
তিনি আরও বলেন, “ধর্ম হচ্ছে আমাদের সেই দায়িত্বানুভূতি যা ঐশী নির্দেশনার উপর নির্ভরশীল।”
ঋৎরবফৎরপয ঝপযষবরবৎসধপযবৎ তার ঙহ জবষরমরড়হ: ঝঢ়ববপযবং ঃড় রঃং ঈঁষঃঁৎবফ উবংঢ়রংবৎং গ্রন্থে বলেন, “ধর্মের মূল ভিত্তি হচ্ছে আমাদের নিরঙ্কুশ অভাববোধ ও অধীনকার মানসিকতা।”
ফাদার শাতিল বলেন, “ধর্ম হচ্ছে সৃষ্টিজীবের কতিপয় দায়িত্বের সমাহার। যথা স্রষ্টার প্রতি দায়িত্ব, সমাজের প্রতি দায়িত্ব এবং তার নিজের প্রতি দায়িত্ব।”
জড়নবৎঃ ই. ঝঢ়বহপবৎ বলেন, “ধর্মের মূল উপাদান হচ্ছে এমন এক শক্তির প্রতি বিশ্বাস, সময় বা কাল কোনো দিক থেকেই যার সীমা, পরিসীমা ও সমাপ্তি নেই।”৮

তথ্যসূত্র
১. মুসনাদু আহমাদ : ১৭১২৩। ইমাম আহমাদ হাদিসটি শাদ্দাদ ইবনু আউস থেকে বর্ণনা করেছেন। মুহাক্কিকরা বলেন, এর সনদ দূর্বল। কারণ এর সনদে আবু বকর ইবনু আবি মারইয়াম নামক একজন দূর্বল রাবি আছেন। তবে সনদের বাকি রাবিরা নির্ভরযোগ্য। ইমাম তিরমিজি, কিতাবু সিফাতিল কিয়ামাহ ওয়ার রাকায়িক ওয়াল ওরায়ি : ২৪৫৯। ইমাম তিরমিজি বলেছেন, হাদিসটি হাসান। ইবনু মাযাহ, কিতাবুয যুহদ : ৪২৬০। মুসতাদরাকুল হাকিম, কিতাবুত তাওবা : (৪/২৮০)। হাকিম বলেন, হাদিসটির সনদ সহিহ; কিন্তু ইমাম বুখারি ও মুসলিম এটা বর্ণনা করেননি। ইমাম যাহাবি তাঁর সাথে একমত পোষণ করেছেন।
২. দেখুন দায়িরাতু মাআরিফিল ইসলামিল মুতারজামা, নবম খ-, পৃষ্ঠা ৩৬৮-৩৬৯।
৩. আদ দ্বীন, শাইখ মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ দাররায, পৃষ্ঠা ২৯-৩২।
৪. দেখুন আয যুবাইদি ফি তাজিল উরুস, নবম খ-, পৃষ্ঠা ২০৮, বিষয় : দ্বীন, দারু সাদির মুদ্রণ, বৈরুত।
৫. দেখুন আল কুল্লিয়াতু লি আবিল বাকা, পৃষ্ঠা ৪৩৩, মুয়াসসাতুর রিসালা মুদ্রণ, বৈরুত।
৬. কাশশাফু ইসতিলাহাতিল উলুমি ওয়াল ফুনুনি লিত থানভি, পৃষ্ঠা ৪০৩।
৭. আদ দ্বীন, শাইখ মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ দাররায, পৃষ্ঠা ৩৩, দারুল কলম মুদ্রণ, কুয়েত।
৮. আদ দ্বীন, শাইখ মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ দাররায, পৃষ্ঠা ৩৪ ও এর পরবর্তী।

SHARE

Leave a Reply