দ্বীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে শহীদের রক্ত বৃথা যাবে না -মো: সাইফুল্লাহ

শহীদ সাইফুল্লাহ মোহাম্মদ মাসুম এবং হাফেজ গোলাম কিবরিয়া শিপনের কথা যখনই মনে পড়ে তখনই ভাবি, তাদের মতো আন্তরিকতাপূর্ণ, সাহসিকতা এবং একনিষ্ঠ ভালোবাসা আমাদের মাঝে অনেক অভাব। তাদের উভয়ের চেহারা কল্পনা করলে মনে হয় না যে, তারা আমাদের মাঝে নেই।
২০০৬ সালে ২৮ অক্টোবরের লগি-বৈঠার তান্ডবের কয়েকদিন পূর্বে ঈদের সময় আমরা সকল সাথী সদস্য সিদ্ধান্ত নিলাম একই রংয়ের পাঞ্জাবি পরে সবাই একসাথে এলাকায় ঘুরব। প্রায় ৪০ জন জনশক্তি সবুজ কালারের পাঞ্জাবি পরে সাবেক ও বর্তমান ভাইদের বাসায় একসাথে গিয়েছিলাম। আমাদের দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন শহীদ হাফেজ গোলাম কিবরিয়া শিপন ও সাইফুল্লাহ মাসুম। আমরা কি আর জানতাম এটা হবে সবুজবাগের মাটি ও জনসাধারণের প্রাণপ্রিয় মানুষ ২ শহীদের শেষ ঈদ উদযাপন। শহীদ শিপন ছিলেন সকলের চোখের মণি, কারণ তিনি সহজের মানুষকে ম্যানেজ করতে পারতেন। তিনি ব্যাপক কৌতুক বলতে পারতেন। আর মানুষকে নিজের করে নেয়ার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল। তাই এলাকার ছাত্র, শ্রমিক, নামাজি, বেনামাজি সবাই তাকে খুব ভালোবাসতো। আর শহীদ মাসুম ভাই ছিলেন সেরা খেলোয়াড়। সবধরনের খেলায় তিনি সেরা ছিলেন। তা ক্রিকেট বা ফুটবল কিংবা ব্যাডমিন্টন। অবশ্য সবাই এক সাথে অনেক বাসায় না ঢুকে শুধু সালাম বিনিময় করে এলাকায় নির্বাচনী স্টাইলে ঈদ শোডাউন দিলাম। সাবেক দায়িত্বশীল আবুল কালাম আজাদ, কামরুল হাসান রিপন ভাইয়ের নেতৃত্বে পরদিনও বের হলাম। আগের দিন অতিরিক্ত খাবারের কারণে অনেকেরই পেটে সমস্যা। শহীদ মাসুম ভাই অনেকটা চাপা স্বভাবের ছিলেন। কোন বিষয়ে কখনই সমস্যা দেখাতেন না। ছোট সমস্যা থাকা সত্ত্বেও একসাথে  ঘোরার আনন্দ সেই দিন মিস করেননি। জিজ্ঞেস করতে পারিনি প্রথম দিনের মত আজ কেন উচ্ছলতার ঘাটতি।
সংগঠনের পক্ষ থেকে নির্দেশ ছিল জনশক্তিকে ঈদের ছুটি কম পালনের জন্য। আমরা সম্ভবত ২৬ অক্টোবর ২০০৬ সালের সকাল ১০টায় ওয়ার্ড দায়িত্বশীলদের নিয়ে ঈদ পুনর্মিলনীর আয়োজন করি এবং ২৮ অক্টোবর জোট সরকারের পাঁচ বছর পূর্তি সমাবেশে অংশগ্রহণের বিষয়ে আলোচনা হয়। যদিও ঈদপুনর্মিলনীর কথা ছিল বিকালে কিন্তু মহানগরী দায়িত্বশীলদের নির্দেশে সকাল ১০টায় করা হয়। সকল ওয়ার্ড উপস্থিতি থাকলেও মহানগরী কর্তৃক পুরস্কারপ্রাপ্ত শ্রেষ্ঠ ওয়ার্ড ২৭ দক্ষিণের কেউই এলো না। ওয়ার্ড সভাপতি নূর হোসেন কুতুব এবং সেক্রেটারি শহীদ মাসুম ভাইয়ের বাসায় ফোন দিয়ে পেলাম না, বায়তুলমাল সম্পাদক শহীদ শিপন ভাইয়ের বাসায় ফোন দিয়ে তাকে পেলাম, বললাম সবাই উপস্থিত আর আপনারাই অনুপস্থিত ব্যাপার কী? শহীদ শিপন জানালেন ভাই, আমরা জানি প্রোগ্রাম বিকেলে। কিন্তু এখন কী করবো? আমি বললাম এখনই জানান। ওনারা কোথায় ক্রিকেট খেলতে গিয়েছেন আপনি দ্রুত নিয়ে আসেন। দীর্ঘ সময় পর কাউকে না পেয়ে নিজেই উপস্থিত হলেন।
২৭ অক্টোবর থেকেই পরিবেশ পাল্টাতে লাগল। রাত বাড়ার সাথে সাথে বিভিন্ন স্থানে হামলা ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের খবর আসতে লাগল। মহানগরী থেকে ফোন এলো কিছু লোক পাঠাতে। শিপন ভাইকে ফোন দিলে তিনি বললেন, আমি যেতে পারব। কিন্তু কাল সমাবেশে আমার সাথে বেশ কয়েকজন যাবে। তারা আমাকে ছাড়া নাও যেতে পারে। আমি বললাম, ঠিক আছে আপনি সকালেই যান। জ্বালাও, পোড়াও, তান্ডব আর আতঙ্কের মধ্য দিয়ে সেই কালো রাত পার করলাম। দেশবাসী ভাবেনি পরদিন এত কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হব। আমরা সবাই ২-৩ জন করে রিকশায় দৈনিক বাংলা মোড়ে একত্রিত হই। প্রায় ৪০-৪৫ জন সকাল ১১টা সুশৃঙ্খল, সারিবদ্ধভাবে দ্বীনি ভাইদের বিভিন্ন স্থানে দাঁড়ানো দেখে, তখনো বুঝিনি যে পল্টন মোড়ে রক্তের হোলি খেলায় মেতেছে নরপিশাচরা। ভাইদের শুধু বলল আপনারা সামনে যেতে থাকেন। উত্তর গেটে আসার পূর্বে ধোঁয়ার কুন্ডলী আর চিৎকার শুনে সকলেই নারায়ে তাকবির বলে সবাই সামনে এগোলাম। আমার ডান পাশে ছিলেন শহীদ মাসুম ভাই। তার মুখের আল্লাহু আকবার ধ্বনি এখনও কানে বাজে। শহীদ শিপন ভাইয়ের নিথর দেহকে সামনে রেখে তারা লাশ নিয়ে যেতে বলে আর উল্লাস করতে থাকে। নিজেকে তখন খুবই অসহায় মনে হয়েছিল।
একটু পর দেখি শহীদ মাসুম ভাইকে কাঁধে করে উনার বড়ভাই শামসুল আলম মাহবুব এবং হাসান মাহমুদ শিবলী ভাই নিয়ে আসছেন দৌড়ে গিয়ে আমিও ধরলাম। মহানগরী জামায়াতের পাঁচ তলায় নিয়ে যাই, সেখানে দেখি অসংখ্য আহত ভাই কাতরাচ্ছেন। ডাক্তার দ্রুত মতিঝিল হাসপাতালে নিতে বললেন। সেখান থেকে নেয়া হলো সেন্ট্রালে। ঈদের ছুটিতে অনেক ডাক্তারই অনুপস্থিত। দেরি হলো সব কিছু করতে। তখনও মাসুম ভাইয়ের নিঃশ্বাস চলছিল। আইসিইউতে নেয়া হলো। সেখান থেকে ইবনে সিনা হাসপাতালে ৪ দিন পর মাসুম ভাই আমাদের ছেড়ে মহান প্রভুর দরবারে চলে গেলেন। আর শহীদ শিপন ভাইয়ের চেহারাকে তারা খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বিকৃত করে ফেলে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর শিপন ভাইয়ের বড় ভাই ডা: আব্দুল্লাহ আল মামুন ভাই লাশ শনাক্ত করে ঢাকা মেডিক্যাল থেকে নিয়ে আসেন। তাদের কাছে থাকতে পেয়ে নিজেকে অত্যন্ত সৌভাগ্যবান মনে হয়।
ব্যক্তিত্বপূর্ণ ও সাহসিকতার কারণে বিভিন্ন স্কুলের প্রবীণ ও আওয়ামী নেতাদের কাছে ছাত্র সংবাদ ও অন্যান্য প্রকাশনীসহ তাদেরকেসহ যেতাম। তাদের কাছে অনেক বিষয়ে নিজেকে অনেক ছোট মনে হতো কিন্তু দায়িত্বশীল হিসেবে যথেষ্ট শ্রদ্ধার এবং ভালোবাসার পাত্র ছিলাম। মাঝে মাঝে তাদের পাশাপাশি নিজেকে দাঁড় করালে তাদের ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও একাগ্রতার কাছে নিজেকে বড়ই অপরাধী মনে হয়। দ্বীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তাদের রক্ত বৃথা যাবে না ইনশাআল্লাহ। আগামী প্রজন্ম, নিরপরাধ, দ্বীনের খাদেম, নিষ্কলুষ চরিত্রের অধিকারী শহীদ সাইফুল্লাহ মাসুম ও হাফেজ গোলাম কিবরিয়া শিপনের রেখে যাওয়া কাজকে বেগবান করে সকল জুলুমের প্রতিরোধ করবোই ইনশাআল্লাহ।
লেখক : শহীদের তৎকালীন থানা সভাপতি, সবুজবাগ থানা

SHARE

Leave a Reply