দ্বীন প্রতিষ্ঠায় কর্মীদের প্রয়োজনীয় গুণাবলী – মনসুর আহমদ

ধর্মহীনতা, ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মবিরোধিতা বর্তমান বিশ্বের জন্য মূল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জীবনের নানা সমস্যা বিশ্বব্যাপী মূল সমস্যারই অংশ। বেশি ফল পেতে যদি মানুষ মূলকে ছেড়ে দিয়ে শুধু বৃক্ষের কাণ্ড ও শাখা প্রশাখায় প্রচুর পানি ঢালে তা হলে যেমন মানুষের জন্য তা ফল ছায়া কিছুই দিতে পারে না; তদ্রুপ জীবন সমস্যার মূল দ্বীন পরিহারে আসতে পারে না বিশ্বব্যাপী সমস্যার সমাধান। সচেতন সমাজবিজ্ঞানীরা সমস্যার দাওয়াই খোঁজ করতে গিয়ে বারবার ব্যর্থ হচ্ছেন । জগতের মানুষ ব্যস্ত এসব সমস্যার নিগড় থেকে মুক্তি পেতে। জীবন সমস্যার অন্যতম সামাজিক সমস্যা রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কযুক্ত। বিভিন্নজনে একে বিভিন্ন ভাবে মূল্যায়ন করে থাকেন।
যেমন-বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী পি. বি. হর্টনের মতে, “সামাজিক সমস্যা বলতে এমন একটি সমস্যা বুঝায় যা সমাজের যথেষ্ট সংখ্যক লোকের উপর অনিষ্টকর প্রভাব বিস্তার করে এবং যা সম্পর্কে যৌথ সামাজিক কার্যক্রমের মাধ্যমে কিছু করার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়।”
মানবজীবনের বিভিন্ন সমস্যার জন্য দায়ী মানুষ নিজেই। মানবজীবনের বিভিন্ন দিকের সমস্যা নিরসনের জন্য বিভিন্ন জন বিভিন্ন কথা বলেছেন। তবে এই সমস্যার মূল যে ধর্মহীনতার সাথে সম্পর্কযুক্ত তা দ্বিপ্রহরের সূর্যকরোজ্জ্বলের মতো সত্য। ধর্মহীনতা আজ গোটা বিশ্বকে বিভ্রান্তির পথে পরিচালিত করে এই জীবন্ত গ্রহটিকে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডলীতে রূপান্তরিত করেছে। মানুষের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধ, নিরাপত্তাবোধ, অর্থনৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধ সবকিছু নষ্ট হয়েছে ধর্মহীনতার কারণে। সমাজবিজ্ঞানীরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন ধর্মহীনতার কুফল। আজ অনেকেই বুঝতে সক্ষম হয়েছেন যে, বিশ্বময় যে অশান্তির দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে তা নিভাতে পারে একমাত্র ধর্ম ইসলাম।
ড. পেটেল বলেন, “রাষ্ট্রনৈতিক ক্রমবিকাশের প্রাচীনতম এবং সবচেয়ে সংকটপূর্ণ কালে ধর্মই শুধু বর্বরসুলভ নৈরাজ্য দমন করতে এবং ভক্তি ও আনুগত্য শিক্ষা দিতে পারে।”
কেউ হয়ত প্রশ্ন করবেন যে, অতীতে ধর্ম কি পৃথিবী থেকে অশান্তির দাবানল দূর করতে সক্ষম হয়েছে? অনেক সময় হয়েছে, আবার যখন পারেনি তখন তিক্ত হলেও সত্য যে, ধর্মের নামে তখন জগতে যা প্রচলিত ছিল তা ছিল ধর্মের বিকৃত রূপ। যে কারণে ইসলামের পরিপূর্ণতা ও স্বরূপ নিয়ে আগমন করলেন আল্লাহর রাসূল (সা.)। প্রতিষ্ঠিত হলো শান্তির সমাজ। রাসূলের আবির্ভাবের পরে কিছু দিন যেতে না যেতেই ধর্মের রূপে বিকৃতি ঘটেছে। এ কারণে কিছু সমাজসচেতন ব্যক্তি এতে সংস্কার আনতে চেষ্টা করেন।
আমরা সংস্কার বলতে বুঝি কোন কিছুর কল্যাণমূলক পুনর্গঠন ও পরিবর্তন। আর এই কাজটি তথা সমাজ সংস্কার আন্দোলন দেশে দেশে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জনে করেছে। যেমন হিন্দুদের সতীদাহ প্রথার বিলুপ্তি, হিন্দু বিধবা বিবাহ প্রণয়ন, মুসলমানদের ফরায়েজি আন্দোলন প্রভৃতি। এ কাজ করতে আন্দোলন করতে হয়েছে। এগুলো ছিল সমাজ সংস্কার আন্দোলন। সমাজ সংস্কার আন্দোলন বলতে সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, The general movement or any specific request of that movement which attempts to climinate or mitigate the evils that request from the that functioning of the social system or any part of life.
সমাজ সংস্কার আন্দোলন হলো সাধারণ আন্দোলন যা বা সেই আন্দোলনের কোন নির্দিষ্ট ফল যা সমাজব্যবস্থা বা তার অংশ বিশেষের অকার্যকারিতা থেকে উল্লিখিত অবাঞ্ছিত অবস্থার মূলোৎপাটন বা লাঘব করার চেষ্টা করে। এসব আন্দোলন জীবনের খণ্ডিত অংশের উপর ভিত্তি করে উঠেছিল। কিন্তু মানবজীবনের পূর্ণ নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজন ইসলামী আন্দোলন।
ইসলামী আন্দোলন সাধারণ ধরনের একটি আন্দোলন মাত্র নয়। বরং মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক হোক তা বস্তুগত বা অবস্তুগত, সামাজিক, সমাজ কাঠামোগত, আন্তঃব্যক্তি আন্তঃগোষ্ঠীয়, সামাজিক মূল্যবোধ ও রীতিনীতির পরিবর্তন ও সংস্কার যা একটি বিশেষ আদর্শকে সামনে রেখে অর্থাৎ আল্লাহ প্রদত্ত বিধান যা রাসূল সা. মানবসমাজের জন্য রেখে গেছেন, তার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে ইসলামী আন্দোলন।
তাই এই আন্দোলন পরিচালনার জন্য প্রয়োজন আদর্শ জনশক্তি ও আদর্শ সংগঠন। আদর্শ জনশক্তি বলতে এমন জনশক্তিকে বুঝায় যাদের মধ্যে রয়েছে মানবিক মূল্যবোধ, সৃজনশীল ক্ষমতা, অনুসন্ধান, গবেষণা ও আবিষ্কারের জ্ঞান। এই জনশক্তি আল্লাহর দীনকে একমাত্র জীবনব্যবস্থা হিসেবে জগতে প্রতিষ্ঠা করার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন একটি কাজ তথা কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়। যে রাষ্ট্র শুধুমাত্র শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা ও নিয়ন্ত্রণ করেই ক্ষান্ত হয় না বরং যা কিছু মানুষের জন্য কল্যাণকর যা কিছু করার তাই করে। আর এই কাজটি করার জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন কালে কত না সমাজ গড়ে উঠেছে নানা ধরনের মানুষের প্রচেষ্টার ও পরিশ্রমের ফসল রূপে। কিন্তু একমাত্র জীবনব্যবস্থা হিসেবে সর্বকালের মানুষের জন্য এসেছে যে জীবনব্যবস্থা তা বাস্তবায়িত হয়েছে মহাজ্ঞানী আল্লাহর বাছাইকৃত নবী ও রাসূলগণের মাধ্যমে। এরশাদ হচ্ছে, “তোমাদের জন্য আনুগত্যের বিধান ধার্য করা হয়েছে যা নূহ (আ)কেও নির্দেশ করা হয়েছিল। এবং যা তোমার নিকট ওহি করেছি যা ইবরাহিম, মূসা ও ঈসাকেও নির্দেশ দেয়া হয়েছিল যে তোমরা দীনকে কায়েম কর এবং এ বিষয়ে মতবিরোধ কর না।
এ আয়াতখানি থেকে সুস্পষ্টভাবে দেখা যায় যে, দীন কায়েমের দায়িত্ব দিয়েই পাঠান হয়েছে নবী-রাসূল বিভিন্ন যুগে আর চূড়ান্ত পর্যায়ে দীনকে বিজয়ী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব দিয়ে পাঠান হয়েছে প্রিয় রাসূল হজরত মুহাম্মদ সা.-কে । এরশাদ হচ্ছে- “তিনি সেই সত্তা যিনি তাঁর রাসূলকে হেদায়েত ও একমাত্র দীনে হক দিয়ে পাঠিয়েছেন যেন আর সব দীনের উপরে এ দীনকে বিজয়ী করেন।” (সূরা তওবা: ৩৩, সূরা ফাতহ: ৮, সূরা সফ: ৯)
এসব আয়াত থেকে এটাই মনে হওয়া স্বাভাবিক যে দীন প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব শুধু মাত্র রাসূলেরই ছিল। আসলে ব্যাপারটি তা নয়, বরং কোরআন ও হাদিস থেকে দেখা যায় যে প্রত্যেক মুমিনকে জান ও মাল নিয়ে রাসূলের সাথে একামতে দীনের কাজে শরিক হওয়া জরুরি ছিল। যারা এ কাজে রাসূল থেকে দূরে সরে গিয়েছে তাদেরকে আল্লাহ তা’য়ালা মুনাফেক বলে ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ বলেন, “হে নবী আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করুন। তুমি লোকদেরকে জিহাদে অংশগ্রহণ করতে বিরত থাকার অনুমতি কেন দিলে? তোমার এ অনুমতি দেয়াটা সমীচীন ছিল না। জিহাদই এমন এক মাপকাঠি যা দ্বারা তোমাদের খাঁটি ঈমানদার ও মিথ্যা ঈমানদারের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য প্রমাণিত হতে পারে। বস্তুত যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, জান ও মাল দিয়ে জিহাদের দায়িত্ব হতে নিষ্কৃতি লাভের জন্য তারা কখনো তোমার কাছে আবেদন করতে পারে না। অবশ্য যারা না খোদার প্রতি বিশ্বাসী, না পরকালের প্রতি বিশ্বাসী একমাত্র তারাই পারে এ জিহাদের কর্তব্য হতে বিরত থাকার আবেদন করতে, অন্য কেউ নয়।”
আসলে যে এ দীন প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব রাসূলের সব সাথীদের জন্য জরুরি ছিল এ কথাই ঠিক। আর এ কারণে যারা সামান্যতম আলসেমি করেছেন তাঁরাই কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিলেন। আল্লাহ ও রাসূলের পক্ষ হতে হজরত কায়াব, মুরারা, হিলাল ও আবু লুবাস ইবনে আবদুল মুনযির ও তাঁর সঙ্গীদের ইতিহাস এ কথারই সাক্ষ্য প্রদান করছে। এ আলোচনা থেকে এ কথা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে রাসূলের আনুগত্য তথা দীন প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব প্রতিটি মুমিনের এবং এ দায়িত্বের কারণেই মুসলিম জাতিকে শ্রেষ্ঠ জাতি ও মর্যাদা প্রদান করা হগয়েছে। এরশাদ হয়েছে, “তোমরা সর্বোত্তম জাতি। তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে মানবজাতির জন্য। তোমরা তাদেরকে সুকৃতির আদেশ দেবে ও দুষ্কৃতি হতে বিরত রাখবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান পোষণ কর।”
কিন্তু আল্লাহর অসীম ও ব্যাপক জ্ঞানে বর্তমান ছিল যে, নবুয়ত যুগ শেষ হওয়ার পর মুসলমানদের ঈমান ক্রমশ দুর্বল হতে থাকবে। কালের অগ্রগতির সাথে সাথে এ জাতি ক্রমশ অধঃপতনের দিকে যেতে থাববে। এমনকি একদিন কোটি কেটি মুসলমান দুনিয়ায় বর্তমান থাকবে, কিন্তু তাদের ঈমানের দীপে অতি নিকট পরিবেশকে আলোকিত করার মতো দীপ্তিও বাকি থাকবে না। বরং কুফরির গাঢ় অন্ধকারে তাদের নিজেদের আলো নিভে যাবার আশঙ্কা দেখা দেবে। এমন একটি পরিস্থিতির জন্য বলা হয়েছে, “তোমাদের মধ্যে অন্তত একটি দল থাকা উচিত যা কল্যাণের দিকে আহ্বান জানাবে এবং দুষ্কৃতির প্রতিরোধ করবে। কারণ তোমাদের মধ্যে যদি এমন একটি দলও না থাকে তা হলে খোদায়ী আজাব ও চরম ধ্বংস ও বিনাশ থেকে কোন জিনিসই তোমাদেরকে রক্ষা করতে পারবে না।
অতএব প্রতিটি মুসলমানের পক্ষে দীন প্রতিষ্ঠার কাজ ফরজ হওয়ার পরেও দীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সংগঠন ও কর্মীবাহিনীর উপরে এ দায়িত্ব এসে যায় যে, সব মুসলমান যদিও বা নিস্তেজ হয়ে যায় তবুও এদের দায়িত্ব হবে-
* কল্যাণের দীপশিখাকে জ¦ালিয়ে রেখে কমপক্ষে খোদায়ী আজাব ও লানত থেকে জাতিকে রক্ষার ব্যবস্থা করা। এ কাজ করতে গেলে পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে জাহেলিয়াত। তাই তাদের দ্বিতীয় দায়িত্ব হচ্ছে-
* জাহেলিয়াতের উচ্ছেদ সাধন করে সমাজে ইসলামী মূল্যবোধ ও ইসলামী রীতিনীতি প্রবর্তন করা। এ কাজ করতে গেলে কর্মীদেরকে অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন হতে হবে বাতেল শক্তি তথা জাহেলি শক্তির মোকাবেলায়। যেমন হতে হয়েছিল অতীতে। কোরআনের ইতিহাস বলে দিচ্ছে, “ঈমানদারদের সাথে তাদের শত্রুতার কারণ হচ্ছে এই যে, তারা প্রবল পরাক্রান্ত ও প্রশংসিত আল্লাহর প্রতি ঈমান পোষণ করে।”
এ অবস্থায় আল্লার সৈনিকদের দায়িত্ব হচ্ছে-
ক) কর্তব্য কাজে অটল থেকে দুনিয়া হতে বিদায় গ্রহণের ইচ্ছা দৃঢ়ভাবে অন্তরে পোষণ করা।
খ) আল্লাহ তাদের দিয়ে যে কাজ করাতে চান, যে স্থান ও যে পদ্ধতিতে কাজ করিয়ে নিতে চান ঠিক সেভাবেই কর্তব্য সম্পন্ন করে নির্দিষ্ট পুরস্কার গ্রহণের জন্য প্রস্তুত থাকা এবং তার উপরে সন্তুষ্ট থাকা ।
এই মূল্যবান দায়িত্বের কারণে আসে কর্তব্য পালনের বিষয়টি। যার প্রথম অংশ পরিপূর্ণভাবে ঈমানের সাথে সম্পৃক্ত। যার উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলো হলো-
১) আল্লাহকে চরম ও পরম কাম্য হিসেবে গ্রহণ করা
২) আকিদা বিশ্বাসকে জীবনের চেয়ে অধিকতর মূল্যবান মনে করা।
গ) কঠিন পরীক্ষায় নিপতিত হলে ঈমানী শক্তির বলে সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালান।
ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের দ্বিতীয় প্রকার কর্তব্য ইলমি যোগ্যতা অর্জন। এ পর্যায়ে তাদেরকে দু’টি কাজ করতে হবে।

১) আন্দোলনকে সঠিকভাবে পরিচালনার জ্ঞান সঞ্চয়: কর্মীদের কাজ হবে কোন পথ ধরে যাত্রা শুরু করতে হবে, চলার পথে তাদের কোন কোন বিপদের সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা আছে, ইসলামের আলোকোজ্জ্বল পথে মহান সাকাবীগণ কিভাবে সফলতা অর্জন করেছিলেন এসব বিষয়ে ভালোভাবে জ্ঞান অর্জন করা।

২) ইসলাম সম্পর্কে সঠিক ও পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের সাধনা: একমাত্র ইসলামই মানুষের সার্বিক কল্যাণ দিতে সক্ষম এবং এর বিপরীতে অন্যসব বিধানই অপরিপূর্ণ, ভ্রান্ত ও অক্ষম, এ ব্যাপারে স্ফটিক স্বচ্ছ ও ইস্পাত কঠিন ধারণা ও বিশ্বাস অর্জন করতে হবে ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদেরকে কোরআন, হাদিস ও ইসলামী সাহিত্য অধ্যয়নের মাধ্যমে।

৩) ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের আমলি যোগ্যতা অর্জন: আমলি যোগ্যতাকে দুই ভাবে ভাগ করা চলে। যথা-
ক) সমাজকেন্দ্রিক
খ) আত্মকেন্দ্রিক তথা আত্মশুদ্ধি।
সমাজকেন্দ্রিক আমলি যোগ্যতা- এ পর্যায়ে প্রথম কাজ হবে সমাজের সর্বস্তরের লোকদেরকে জীবন সমস্যার সমাধানে ইসলামের ভূমিকা ও অবদান সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান দান করা এবং জনসাধারণের মধ্য থেকে সজাগ, সক্রিয় ও সচেতন জনগোষ্ঠীকে বেছে নিয়ে তাদেরকে ইসলামী আদর্শ প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে উদ্বুদ্ধ করা। এরশাদ হচ্ছে- “ঈমানদারদের সকলেরই বের হয়ে পড়া জরুরি ছিল না। কিন্তু এ রূপ কেন হলো না যে, তাদের অধিবাসীদের প্রত্যেক অংশ থেকে কিছু লোক বের হয়ে আসত ও দীনের জ্ঞান লাভ করতো এবং ফিরে গিয়ে নিজ নিজ এলাকায় বাসিন্দাদেরকে সাবধান করত যেন তারা (অমুসলমানী আচরণ থেকে) বিরত থাকতে পারে।”
দ্বিতীয় কাজ: এ আন্দোলনের কর্মীদেরকে ব্যক্তিজীবনে ইসলামের বাস্তব প্রতীক হতে হবে। জীবনের সেই আদর্শের অনুসারী হতে হবে যে আদর্শের জন্য সে কাজ করে আসছে। এককথায় কথায় ও কাজের মিল ঘটাতে হবে তাদের জীবনে। এরশাদ হচ্ছে-“তোমরা অন্য লোকদেরকে ন্যায়ের পথ অবলম্বন করতে বল কিন্তু নিজেদেরকে তোমরা ভুলে যাও; অথচ তোমরা কিতাব পড়। তোমরা বুদ্ধি কি কোন কাজে লাগাও না?” (সুরা বাকারা : ৪৪)
অন্যদেরকে সুন্দর পথে ডাকার সাথে নিজকেও অটল থাকতে হবে ঐ পথে। অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে- “ঐ ব্যক্তির চেয়ে উত্তম কথা আর কী হতে পারে যে আল্লাহর দিকে ডাকলো, নেক আমল করলো আর ঘোষণা করে- আমি একজন মুসলান।” (সূরা ফুসসিলাত: ৩৩)
ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদেরকে তাদের সাধ্যানুযায়ী লোকদের সামনে ইসলামের সঠিক রূপ তুলে ধরতে হবে; যতক্ষণ পর্যন্ত অনুভব করবে যে, কেউ না কেউ এর দ্বারা উপকৃত হতে প্রস্তুত।
বুদ্ধি প্রয়োগের ব্যাপারে এরশাদ হচ্ছে- “তুমি উপদেশ দিয়ে যাও, যদি উপদেশ ফলপ্রসূ হয়।” অতএব তার কাজই হবে আল্লাহর বান্দাহদের থেকে ঐ সব লোক খুঁজে বের করা যারা এই নসিহত দ্বারা উপকৃত হয়ে সঠিক পথ অবলম্বন করবে। আর শুধুমাত্র এই সব লোকদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে। এদেরকে ছেড়ে ঐ সমস্ত লোকদের পিছনে ব্যস্ত হয়ে সময় ব্যয় করার কোন প্রয়োজন নেই, অভিজ্ঞতার আলোকে যাদের সম্পর্কে জানতে পারা যাবে যে, তারা এই নসিহত কবুল করতে ইচ্ছুক নয়।
দৃঢ় ও স্থির চিত্ততা উত্তম গুণ। আল্লাহ বলেন, “হে নবী! আপনার রবের নিকট থেকে অবতীর্ণ ওহির অনুসরণ করুন, তিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। মুশরিকদের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়বেন না। যদি আল্লাহর ইচ্ছা হতো তবে এরা শিরক করতো না। আমি আপনাকে এদের ওপর পাহারাদার নিযুক্ত করিনি, আপনি তাদের উপর কোন হাবিলদারও নন।”
আত্মশুদ্ধি ও আত্মকেন্দ্রিক কাজ- এসব পর্যায়ের কাজ পরিচালনার প্রয়োজনে ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের কাজ হবে কোরআনের নিম্নবর্ণিত গুণাবলী অর্জন করা। আত্মশুদ্ধি, আত্মগঠন ও সৈনিকসুলভ চরিত্র নির্মাণে সামনে আদর্শ রাখতে হবে সাহাবা চরিত্র যা তাঁরা অর্জন করেছিলেন কোরআনের মাধ্যমে। তাঁদের গুণাবলী হচ্ছে-
খোদার দিকে বারবার প্রত্যাবর্তনকারী তথা তওবাকারী
তাঁর বন্দেগি পালনকারী
তাঁর প্রশংসার বাণী উচ্চারণকারী
তাঁর জন্য জমিনে পরিভ্রমণকারী
তাঁর সামনে রুকু-সিজদায় বিনীত
ভাল কাজের আদেশকারী, খারাপ কাজে বাধাদানকারী এবং নির্দিষ্ট সীমা রক্ষাকারী
যখন ইসলামী আন্দোলনের কর্মীরা এই ধরনের কাজ করবে তখনই তাদের মাঝে বাতিল শক্তির মোকাবেলায় বিজয়ী হওয়ার গুণ অর্জিত হবে। ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের সাফল্যের দ্বারে পৌঁছাতে যেসব মৌলিক গুণাবলীর অধিকারী হওয়া দরকার তার ইঙ্গিত পাই কোরআনে। যেমন-

ক) তারা হবে ধৈর্যশীল ও পারস্পরিক সম্প্রীতি রক্ষাকারী: ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের সর্বাবস্থায় ধৈর্যশীল হওয়া প্রয়োজন। এছাড়াও প্রয়োজন আন্দোলনকে সাফল্যমণ্ডিত করার জন্য পরস্পরের প্রতি পরস্পরের আন্তরিকতা। আল্লাহ বলেন, তোমরা পরস্পরে ঝগড়ায় লিপ্ত হয়েও না। যদি তা কর তবে তোমরা কাপুরুষ হয়ে পড়বে এবং তোমাদের প্রভাব চলে যাবে। আর তোমরা ধৈর্য ধারণ কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে রয়েছেন।” (সূরা আনফাল : ৬৪)

খ) প্রাঞ্জলভাষী ও উত্তম ভঙ্গির অধিকারী: দায়ী ইলাল্লাহদের উত্তম বর্ণনাকারী ও প্রাঞ্জলভাষী হওয়া প্রয়োজন। এগুলো এমন গুণ যার ফলে ছোট বড় সবাইকে প্রভাবান্বিত করা যায়। রাসূল সা. ছিলেন এ সমস্ত গুণের পূর্ণ অধিকারী। হজরত হারুন (আ) এসব গুণে গুণান্বিত হওয়ার কারণে তাকে সহায়তাকারী হিসেবে পেতে চেয়েছেন হজরত মূসা (আ)। মূসা (আ) প্রার্থনা করেছেন, “আমার ভাই হারুন। সে প্রাঞ্জলভাষী অতএব তাঁকে আমার সাহায্যকারী পাঠাও।” (সূরা কাসাস : ৩৪)

গ) উত্তম বিতর্ককারী: দায়ী ইলাল্লাহদের হিকমাহ, সদুপদেশ এবং উত্তম পন্থায় তর্ক-বিতর্কের মাধ্যমে দাওয়াতি কাজ করতে হয়। অতএব তাদেরকে জ্ঞান ও মাওয়েজাতে হাসানার অধিকারী হতে হয়, তদ্রুপ হতে হয় উত্তম বিতর্ককারী। কিছু লোক আছে যারা সন্দেহ, দ্বিধা-দ্বন্দ্বে জড়িয়ে থাকার কারণে দায়ীদের সাথে তর্ক-বিতর্ক করতে উদ্যত হয়। তখন দায়ীদের বিতর্কের ভাষা সহানুভূতিপূর্ণ এবং মার্জিত ও কোমল রাখতে হবে। আল্লাহ বলেন- “ওয়া যাদিলহুম বিল্লাতি হিয়া আহ্সান”- তাদের সাথে তর্ক-বিতর্ক করুন পছন্দযুক্ত পন্থায়।

ঘ) প্রজ্ঞাবান ও দূরদর্শিতার অধিকারী: ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদেরকে বিভিন্ন পরিবেশ, পরিস্থিতিতে কাজ করতে হয়। তাই স্থান ও কালের বিবেচনায় কী ধরনের কার্যপদ্ধতি অবলম্বন করা দরকার এ ব্যাপারে পূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী হওয়া প্রয়োজন। আমরা দেখি হজরত ইবরাহিম (আ) প্রতিমা পূজার ব্যাপারে সরাসরি কঠোর ভাষা ব্যবহার করেছেন। বলেছেন, তুমি কি প্রতিমাসমূহকে উপাস্য মনে কর? আমি দেখতে পাচ্ছি যে, তুমি ও তোমার সম্প্রদায় প্রকাশ্য পথভ্রষ্ট।” (সূরা আনয়াম : ৭৫)
কিন্তু নক্ষত্র পূজার ভ্রান্তি ও ভ্রষ্টতা জাতির কাছে সুস্পষ্ট ছিল না বিধায় কঠোরতার পরিবর্তে তাদের সন্দেহ দূরীভূত করতে তাদের সন্দেহ দূরীভূতকরণের পন্থা অবলম্বন করতে নিজের অবস্থা বর্ণনা করেছেন যেন বিরোধীশক্তি জেদের বশবর্তী হয়ে না পড়ে। তিনি বলেছেন, “ইয়া কওমি ইন্নি বারিউম মিম্মা তুশরেকুন।” হে আমার জাতি! আমি তোমাদের এসব মুশরেকসুলভ ধারণা থেকে মুক্ত। তোমরাতো আল্লাহর সৃষ্ট বস্তুকেই আল্লাহর অংশীদার স্থির করে নিয়েছ।
এ অবস্থা থেকে স্পষ্ট যে অবস্থা ভেদে দায়ীদের কঠোরতা বা নম্রতা অবলম্বন করা দরকার।

ঙ) দাওয়াতি কাজে আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহারকারী: যুগের হাওয়া বদলে যায় যুগের সাথে সাথে। তাই দায়ী ইলাল্লাহদের কাজ হবে এ কাজে যুগোপযোগী উপাদানের প্রয়োগ। যেভাবে মানুষকে বোঝানো সহজ হবে সে সবের ব্যবহার উপেক্ষা না করে প্রয়োগের কৌশল চালাতে হবে। কর্মীদের এ ব্যাপারে হজরত আলী (রা)-এর একটি প্রজ্ঞাপূর্ণ বাণীর প্রতি খেয়াল রাখা প্রয়োজন। তিনি বলেন- মানুষের বোঝার সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের সামনে কথা বলো, তোমরা কি চাও যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে লোকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করুক?

আমাদের মনে রাখা দরকার সমকালীন চিন্তাধারায় যারা প্রভাবিত, তাদেরকে প্রাচীন পদ্ধতির যুক্তিবিন্যাস দিয়ে বুঝান সম্ভব নয়। চিরন্তন সত্যকে অক্ষুন্ন রখে সমকালীন বিশ্বের পরিবেশ ও পরিস্থিতি অনুযায়ী কৌশল প্রয়োগ করতে হবে।
চ) উন্নত মেধা ও প্রতিভার বিকাশ সাধন-দায়ী ইলাল্লাহদেরকে স্থায়ী সম্মান ও মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত হওয়া প্রয়োজন। বিশ্বের মানুষ জ্ঞান-বিজ্ঞানে যত শীর্ষে পৌঁছেছে, তাদের চেয়ে সব ব্যাপারে অধিকতর জ্ঞানের অধিকারী না হতে পারলে তাদের উপরে কোনো প্রভাব বিস্তার করা সম্ভব হবে না। তাই বলা চলে দায়ীদের মাঝারি ধরনের মেধা ও প্রতিভা এ যুগের জন্য যথেষ্ট নয়। তাই প্রয়োজন নৈতিক উৎকর্ষতা ও গভীর পাণ্ডিত্য অর্জনের সাধনা। বর্তমান মানুষের চিন্তাধারায়, সংকট ও সমস্যার বিরাট পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। তাই নব নব সংকট সমস্যার সমাধান ও নতুন প্রশ্নের উত্তর প্রদানের যথোপযুক্ত জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ হতে হবে ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের চিত্ত ও মস্তিষ্ক।
যখন আল্লাহর পথের সৈনিকরা এসব গুণাবলী অর্জন করতে সক্ষম হবে তখন আল্লাহ তাদেরকে চূড়ান্ত বিজয় দান করবেন যেমন করেছিলেন অতীতে।
লেখক : কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক

SHARE

Leave a Reply