ধর্মনিরপেক্ষ দলের ধর্মীয় রাজনীতির খতিয়ান -দেলোয়ার হোসেন ফাহিম

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর, বাংলাদেশের ইতিহাসে উদিত হয় স্বাধীনতার ধ্রুবতারা, বাংলাদেশ মুক্ত হয় পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ইনসাফকে মুক্তিযুদ্ধের মূলনীতি হিসেবে নির্ধারণ করা হলেও স্বাধীনতা-পরর্বতী সরকার কর্তৃক মুক্তিযুদ্ধের প্রধান উদ্দেশ্যে হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতাকে ইঙ্গিত করা হয়। অথচ এ সংগ্রাম ছিল শাসকের বিরুদ্ধে শোষিতের, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বঞ্চিতদের। শুধু মুক্তিযুদ্ধ নয়, সব আন্দোলন সংগ্রামের পেছনের গল্প ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের অন্যায় আচরণ। পাকিস্তানের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মুফতি মাহমুদ বলেছেন, বাঙালি মাজলুম হ্যায়। তার এই কথার মাঝেই মুক্তিযুদ্ধের কার্যকারণ নিহিত আছে। সত্যিকারার্থে ভারত ভাগ হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের অভ্যুদয় পর্যন্ত কোন কালেই এ অঞ্চলে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্ন ওঠেনি। এমনকি শব্দটি এক প্রকার অপরিচিত ছিল এ দেশের মানুষের কাছে। কোনো ঐতিহাসিক দলিলেও স্বাধীনতা-সংগ্রাম ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য হয়েছে বলে উল্লেখ নেই। এ দেশের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বইগুলো, পৌরনীতির বইগুলো পড়লেই এর যথার্থতা খুঁজে পাওয়া যায়। তারপরও প্রচলিত বিজ্ঞতায় বলা হয় বঙ্গবন্ধু তথা আওয়ামী লীগ ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতীক। আর ধর্মনিরপেক্ষ এক বাংলাদেশ সৃষ্টি করাই নাকি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় এ দাবির পক্ষে পেশ করার মতো ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে বঙ্গবন্ধু এমন কিছু বলেননি বা করেননি যার দ্বারা তাঁকে ধর্মনিরপক্ষতার স্বপ্নদ্রষ্টা বলা যায়।
আওয়ামী লীগের জন্ম ১৯৪৯ সালের মুসলিম লীগের পেট থেকে। তখন তার নাম ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ। শুরুতে মুসলিম লীগের আদর্শ থেকে আওয়ামী মুসলিম লিগের আদর্শ আলাদা কিছু ছিল না এবং শেখ মুজিবসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ বাঙালিদের জন্য লড়েছেন ঠিকই, তবে ইসলাম বা মুসলমান হিসেবে তার ইতিহাস ও পরিচয় ভুলে গিয়ে নয়। এই দলের গঠনতন্ত্রের ১১টি উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের দশম ধারাটি ছিল, ‘জনগণের মাঝে ইসলামের জ্ঞান, উন্নত নৈতিকতা এবং ধর্মীয় মূলনীতি প্রচার। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়লেও এর দলিল পাওয়া যায়। তিনি লিখেছেন : “আবার দিল্লি শহরকে ভালো করে দেখে নিলাম। শত শত বছর মুসলমানরা দিল্লি থেকে সমস্ত ভারতবর্ষ শাসন করেছে। তখন কি জানতাম, এই দিল্লির ওপর আমাদের কোন অধিকার থাকবে না। দিল্লির লালকেল্লা, কুতুব মিনার, জামে মসজিদ আজও অনন্য মুসলিম শিল্পের নিদর্শন ঘোষণা করছে। পুরনো দিল্লি ও তার আশপাশে যখনই বেড়াতে গিয়েছি দেখতে পেয়েছি সেই পুরনো স্মৃতি।’’ (পৃ: ৫৫) এই বইতে মুসলিম ইতিহাসও সংস্কৃতি নিয়ে তার হৃদয়ের যে হাহাকার শোনা যায় সেগুলো আজকের বাঙালি জাতীয়তাবাদী তথা ধর্মনিরপেক্ষবাদের ধারকরা স্বীকার করতে চান না। ১৯৫৬ সালের ২১ জানুয়ারি পাকিস্তানি গণপরিষদের বৈঠকে বঙ্গবন্ধু নিজেও ইসলামিক সংবিধান প্রণয়নের আহবান জানিয়ে বলেন, ‘যদি তারা ইসলামের প্রতি আন্তরিক এবং সৎ থাকে, তাহলে ন্যায়ের ভিত্তিতে ইসলামিক সংবিধান করা হোক, যেখানে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত হবে”। এমনকি তাকে কমিউনিস্ট বলে আখ্যায়িত করলে জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার বন্ধুদের অনেকে আমাকে কমিউনিস্ট বলে ডাকে, আমি বুঝতে পারি না কিভাবে তারা আমায় কমিউনিস্ট বলে! আমি একজন মুসলিম।
অবশ্য মুক্তিযুদ্ধের পরপরই বঙ্গবন্ধুকে একপ্রকার ইউটার্ন করতে দেখা গেছে। একসময় ইসলামের ছায়াতলে সম্পদের সুষম বণ্টনের দাবি জানালেও স্বাধীনতাত্তোর সমাজতন্ত্রে আশ্রয় খোঁজেন তিনি।
বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর থেকেই জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য ইসলামী দলগুলোর বিরুদ্ধ ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করার বিষয়ে ব্যাপক প্রোপাগান্ডা চালানো হয়েছে। আর তা করেছে তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি। এর মাধ্যমে এ অঞ্চলে ইসলামী মুভমেন্টের প্রতি জনগণের মনে এক ভয়াবহ কিসিমের ভীতি-সঞ্চার করাই ছিল মূল গন্তব্য। জামায়াত নিজেকে ইসলামী দল বলেই পরিচয় দিয়ে আসছে। রাষ্ট্রীয় পরিসরে ইসলামী তাহজিব-তমদ্দুন প্রতিষ্ঠাই তাদের উদ্দেশ্য। জামায়াতসহ বাকি ইসলামী দলগুলো সেই কাজটা ইসলামের নিয়মাধীন থেকেই করে যাচ্ছে। তারা ধর্ম নিয়ে রাজনীতি নয় বরং ধর্মের সাথে রাজনীতি তথা রাষ্ট্রের মাঝে শত বছরের সৃষ্ট দূরত্ব কমানোর কাজটাই করে যাচ্ছে। মজার বিষয় হচ্ছে এদেশে যারা রাজনীতি থেকে ধর্মকে ঠেকাতে চান, নিজেদেরকে ধর্মনিরপেক্ষতার চাদরে আবৃত করেন, তারাই প্রকৃতার্থে ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করেন।
ভারতীয় রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মাইদুল ইসলাম মনে করেন, ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের পরে ধর্মনিরপেক্ষ শেখ হাসিনা রাষ্ট্রীয় জীবনে ইসলাম অনুসরণের প্রশ্নে এতটাই আপসকামিতা দেখান যা কার্যত, আওয়ামী লীগ ও বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপির মধ্যে আদর্শগত পার্থক্য ঘুচিয়ে দেয়। আওয়ামী লীগ তখন থেকে ধর্ম প্রশ্নে ‘রূপান্তররণকৃত’ এবং বিএনপির সঙ্গে এই বিষয়ে একটি ‘পুরোপুরি অভিন্ন চরিত্র’ ধারণ করে। ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি থেকে প্রকাশিত খরঃসধং ড়ভ ওংষধসরংস: ঔধসধঃ-ব-ওংষধসর রহ পড়হঃবসঢ়ড়ৎধৎু ওহফরধ ্ ইধহমষধফবংয বইয়ে ওই মন্তব্য ছাপা হয়েছে। বইটির লেখক কলকাতা প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক। বইটি মূলত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টরাল থিসিস, লেখক মর্যাদাসম্পন্ন ক্লারেনডন বৃত্তি পান। ২০০৭ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে তিনি থিসিসটি লিখেছেন পরবর্তীতে বই আকারে বেরিয়েছে। অধ্যাপক ইসলাম বলেন, বাংলাদেশী রাজনীতিতে যদি ইসলাম ধর্মের উপস্থিতিকে জামায়াত কতটা ধারণ করে আছে তার সঙ্গে দেশের প্রধান দুই দলের তুলনা করা হয়, তাহলে ভোটাররা দেখবেন যে, জামায়াতের তুলনায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি-দুই দলের কেউই তার চেয়ে পিছিয়ে নেই। আহমদ শরীফ তার মানবতা ও ধর্মনিরপেক্ষতা বইয়ে ইসলামকে সমাজতন্ত্রের বাপ বলে সম্বোধন করেছিলেন। বর্তমানে সমাজতন্ত্রের স্লোগানধারীদের প্রকাশ্যে ইসলাম পালন দেখে মনে হচ্ছে সন্তান তার বাপের কাছে ফিরে আসছে।
থিসিসে দাবি করা হয়, ‘যেহেতু দেশটির উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠীই ‘খোদাভীরু’ সে কারণে এমনকি ধর্মনিরপেক্ষ শেখ হাসিনাকেও ইসলাম ধর্মের প্রতি আনুগত্য থাকার প্রমাণ দিতে হয়। শেখ হাসিনা কতিপয় প্রতীকী পদক্ষেপ গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে এই প্রমাণ রাখেন”। সেখানে আরো উল্লেখ করা হয় ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ এই একটি শব্দ আওয়ামী লীগের ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করা ছাড়া আর কিছুই নয়। আর এই শব্দটি আওয়ামী লীগ ব্যবহার করে ১০-১৫% সংখালঘুদের ভোট পাবার জন্য। এবং এটাতে তারা প্রায় পুরোটাই সফলতা দেখিয়েছে।
৭২-এর সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম মূলনীতি হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ প্রতিষ্ঠা করার যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছে, ‘মুক্তিযুদ্ধই নাকি এই ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের জন্য হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে ধর্মনিরপেক্ষতার অঙ্গীকারের প্রশ্নে আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি বরাবরই দুর্বলতার পরিচয় দিয়েছে। সে কারণে অষ্টম সংশোধনীতে যখন ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করা হলো, তখন আওয়ামী লীগ বা বিএনপি কাউকেই এর বিরুদ্ধে বড় আকারে কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে দেখা গেল না। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এটাই সত্যি যে, ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করার ব্যাপারে বাংলাদেশের রাজপথে জনতার ঢল কেউ কখনও দেখেনি। আবার ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম কেন করা হলো, তার বিরোধিতা করতেও তারা রাস্তায় নামেনি। বঙ্গবন্ধুর মর্মান্তিক মৃত্যুর পর ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত সংসদীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আসন সংখ্যার দিক দিয়ে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে এবং শেখ হাসিনা পঞ্চম জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী নির্বাচিত হন। একটি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবলিত বিধান সংবিধানে সংযোজনের দাবিতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ১৯৯৪ সালে আন্দোলন শুরু করে। আশির দশকে এরশাদ বিরোধী এবং পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে তাদের ভাষায় ধর্মভিত্তিক দল জামায়াত আর ধর্মনিরপেক্ষ আওয়ামী লীগ একই সঙ্গে রাজপথের আন্দোলনে শরিক ছিল।
শেখ হাসিনা বুঝতে পারেন যে অর্থ, পেশিশক্তি এবং প্রতিবেশী বন্ধুরাষ্ট্রের সর্বাত্মক সহযোগিতা থাকা সত্ত্বেও স্রেফ ধর্মবিরোধিতার কারণে আওয়ামী লীগ ভোটের রাজনীতিতে বারবার মার খাচ্ছে। ১৯৯৬ সালে নির্বাচনের প্রাক্কালে ধর্মনিরপেক্ষ আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনী প্রচারণায় এক ধর্মভীরু মুসলিম নেত্রীর আবির্ভাব ঘটায়। ঐ সময় শেখ হাসিনা হিজাব ও স্কার্ফ পরে পর্দানশিন হয়ে ওঠেন। ঘন ঘন উমরাহ করেন। তার সাথে আস্তিক-নাস্তিক নির্বিশেষে সবাই ওমরা করতে শুরু করেন। নেতাকর্মীদের মসজিদে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোতে ‘আল্লাহু আকবর ও লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, নৌকার মালিক তুই আল্লাহ’ শ্লোগান সংযুক্ত করা হয়। আওয়ামী মিছিলে ‘নৌকার মালিক তুই আল্লাহ’ স্লোগানে বাংলার আকাশ-বাতাশ মুখরিত হয়ে ওঠে। তাসবির সাথে হিজাব পরিহিত নেত্রীকে দেখে কারও বুঝার উপায় ছিল না যে তিনি বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ দলের প্রধান নেত্রী। নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনা মাথায় পুরোদস্তুর স্কার্ফ বেঁধে, নিজের মুনাজাতরত ছবি দিয়ে পোস্টার বানিয়ে ক্ষমতায় আসেন। তাই ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবী ড. সিরাজুল ইসলাম আফসোস করে তার বাঙালির জাতীয়তাবাদ বইয়ে লিখেন,“একুশ বছর পরে ক্ষমতায় এসে নামে মাত্র ধর্মনিরপেক্ষ আওয়ামী লীগ সরকার শিক্ষা সংস্কারের যে-কমিটি গঠন করেছিল তার সুপারিশে বিদ্যমান মাদরাসা শিক্ষারীতিকে যে গুটিয়ে ফেলেছিল তা নয়, বরঞ্চ আধুনিক উপাদান যোগ করে তাকে নতুন জীবন দানের পক্ষেই বলা হয়েছে”।
২০০৬ সালের নির্বাচনের পূর্বে ধর্মভিত্তিক দল খেলাফত মজলিশকে কাছে টানতে আওয়ামী লীগ তাদের সাথে একটি লিখিত ফতোয়া চুক্তি করেন যাতে লেখা হয় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার আহমদিয়াদের অমুসলিম হিসাবে ঘোষণা দেবেন, ক্ষমতায় আসলে আওয়ামী লীগ দেশে ব্লাশফেমি আইন করবে, ফতোয়াকে আইনগতভাবে লিগ্যাল ও মানতে বাধ্য করা হবে। ওই নির্ধারিত ইলেকশন হয়নি বলে আওয়ামী লীগ পরবর্তীকালে ওই ফতোয়া চুক্তি বাতিল করেন। খেলাফত মজলিস এই ফতোয়া চুক্তির মাধ্যমে যেটা করেছে এটা তাদের ধর্মীয় রাজনীতি, কারণ তারা এই ফতোয়ায় বিশ্বাস করে। আওয়ামী লীগ এই ফতোয়া চুক্তির মাধ্যমে যেটা করেছে এটা তাদের শতভাগ ধর্ম নিয়ে রাজনীতি কারণ তারা এই ফতোয়ায় বিশ্বাস করে না।
একইভাবে ২০০৮ সালের নির্বাচনের পূর্ব মুহূর্তে হঠাৎ করে আবারো আওয়ামী লীগ ঘোষণা করে “আসন্ন নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হলে কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী আইন প্রণয়ন করা হবে না”। মজার ব্যাপার হলো, কথাটা প্রথমে বলেন সাবেক সমাজতন্ত্রী নেত্রী মতিয়া চৌধুরী। সমাজতন্ত্র তো কুরআন কেন কোন ধর্মের অস্তিত্বেই বিশ্বাস করতে পারে না। কার্ল মার্কস ও অ্যাঙ্গেলস ধর্মের প্রতি তাদের মনোভাব তো অনেক আগেই স্পষ্ট করে গেছেন। অতঃপর বিষয়টা স্পষ্ট ভাষায় উচ্চারণ করেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। পূর্বের অভিজ্ঞতার আলোকে কথাটা খুবই অস্বাভাবিক ও অবিশ্বাস্য মনে হলো। এটা মূলত অশিক্ষিত, অসচেতন ধর্মপ্রাণ মানুষকে ভুলিয়ে ভোট পাওয়ার জন্য করা হয়েছিল। প্রমাণস্বরূপ আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় ও কার্ল জে সিওভাক্কোর (ঈধৎষ ঔ. ঈরড়াধপপড়) হার্বাট ইন্টারন্যাশনাল রিভিউতে ছাপানো লেখাটি পেশ করা যেতে পারে। ছাপা হয়েছে ১৯ নভেম্বর ২০০৮ তারিখে। লেখার শিরোনাম ছিল, ‘স্টেমিং দ্য রাইজ অব ইসলামিক এক্সট্রিমিজম’ অর্থাৎ বাংলাদশে ইসলামিক উগ্রপন্থীদের উত্থানে প্রতিরোধ। এই প্রবন্ধে তিনি কোনো রাখঢাক না রেখে সোজা সাপ্টা বলে দিয়েছেন, ইসলামপন্থীরাই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শত্রু। তারপর বলেছেন, যদি আসন্ন নির্বাচনে (২৯ ডিসেম্বর ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত) আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়, তাহলে সেনাবাহিনী, মাদরাসা ব্যবস্থাসহ সকল বিভাগ থেকে ইসলামিজমকে ঠেকানো হবে। দেশের উন্নতিতে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর এই আমূল পরিবর্তনের ব্যাপক প্রয়োজন বলেও দাবি করেন তিনি। বাংলাদেশের সাফল্যের জন্য ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ প্রতিষ্ঠার এখনই সর্বোৎকৃষ্ট সময় বলে উল্লেখ করা হয়। দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য আওয়ামী লীগকে অবশ্যই এই পথে এগোতে হবে। একদিকে বলা হলো কুরআন-হাদিস বিরোধী কোন আইন করা হবে না, অন্য দিকে ইসলামকে ঠেকাতে হবে বিশ্বদরবারে আবদার রাখা হলো।
ধর্মনিরপেক্ষ এমপি-মন্ত্রীরা ধর্মনিরপেক্ষতার হাকিকত বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন ‘বুখারি শরিফে মহান আল্লাহ বলেন, ‘লাকুম দিনুকুম অলিইয়াদিন অর্থাৎ যার ধর্ম সে পালন করবে। প্রতীক হিসেবে নৌকা মার্কার শরিয়তসম্মত বৈধতা দেয়ার লক্ষ্যে বলা হয়, ‘সেই নূহ নবীর আমল থেকেই নৌকায় আশ্রয় দেয়া হয়েছে মানুষদের। দুর্যোগ-দুর্বিপাকে নৌকাই মানুষকে রক্ষা করেছে তাই নৌকায় ভোট দিয়ে মানুষ আর্থিকভাবে সচ্ছল হয়েছে। সমস্যা হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষ সরকারপ্রধান কিভাবে নুহ (আ) এর উদাহরণ টেনে ইসলামের নবীদের সিলসিলার সাথে একটি ধর্মনিরপেক্ষ দলকে সম্পৃক্ত করেন। এতে কি অন্য ধর্মাবলম্বীরা মনঃক্ষুন্ন হয় না? এতে কি বিধর্মীদের প্রতি করুণা বা উপহাস করা হয় না? মা দুর্গা গজে করে আসায় বাম্পার ফলন হয়েছে, এ ধরনের উক্তি করার পরেও একটি সরকার কিভাবে ধর্মনিরপেক্ষ থাকে সে বিষয়টা একজন সচেতন ব্যক্তির মনে নাড়া না দিয়ে পারে না। ক্ষমতার মালিকানার প্রশ্নে নেত্রী বলেন, ‘ক্ষমতার মালিক আল্লাহ। আগামীতে দেশের ক্ষমতায় কে যাবে না যাবে, তা আল্লাহ নির্ধারণ করবেন। আর ইসলাম প্রচারে আওয়ামী লীগই কাজ করছে, অতীতেও করেছে এবং ভবিষ্যতেও করবে”। অথচ ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের সাথে ধর্মের মূল দ্বন্দ্বটাই এখানে। যেকোনো ধর্মনিরপেক্ষ আন্দোলন আল্লাহর সার্বভৌমত্বের পরিবর্তে জনগণকেই সকল ক্ষমতার উৎস বলে সরাসরি ঘোষণা করে। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ যদি সকল ধর্মের সমানাধিকারে বিশ্বাসী হয় তাহলে কোরআনের আয়াতকে রেফার করতে পারে না আর ধর্মহীন ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী হলে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব তথা ক্ষমতার মালিক আল্লাহ ঘোষণা করার কোনো মানে থাকে না।
আওয়ামী লীগের ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করার সর্বশেষ দালিলিক প্রমাণ হলো তাদের পঞ্চদশ সংশোধনী। বাংলাদেশ বর্তমানে দুনিয়ার একমাত্র দেশ যা কিনা সাংবিধানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ এবং সেই সংবিধান শুরু হয় বিসমিল্লাহির রাহমানের রাহিম দিয়ে, যার রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা, বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম, অথবা রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম এর কোনটাই আওয়ামী লীগের বিশ্বাসের কারণে সংবিধানে আসেনি আর তিনটা একসাথে বিশ্বাস করাও সম্ভব না। এর তিনটাই আওয়ামী লীগ এর ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করার ফল। রাষ্ট্রধর্ম বহাল রেখে কি করে ধর্মনিরপেক্ষতা বজায় রাখা যায়? পৃথিবীর কোন দেশের সংবিধানেই এরকমটি করা হয়নি। অবশ্য সাম্প্রতিককালে সংবিধান থেকে ইসলামকে বাদ দেয়ার কথা বলা হচ্ছে এবং এটা নিয়েও অনেক খেলা হবে। এমনিতেই ধর্মনিরপেক্ষ শব্দটির ব্যঞ্জনা বহুমাত্রিক। এসব কর্মকান্ডের মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যঞ্জনা বহুগুণে প্রহসনের রূপ নিয়েছে। কথিত ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলোর রাজনৈতিক আচরণের সাথে ধর্মীয় আচরণকে গুলিয়ে ফেলায় অপরাপর ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে ধর্মনিরপেক্ষ আওয়ামী লীগ ও সমাজতন্ত্রী বাম দলগুলোর আচরণের পার্থক্য নির্ণয় করা দুরূহ হয়ে পড়েছে।
লেখক : শিক্ষার্থী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

SHARE

Leave a Reply