ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বনাম অন্ধ প্রগতিশীলতা

এবনে গোলাম সামাদ

ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নতুন কিছু নয়। রাজনীতি করতে গেলে করতে হয় কতগুলো মূল্যবোধের ভিত্তিতে। আর আমাদের মূল্যবোধ বহু ক্ষেত্রেই হতে চায় ধর্মীয় ধ্যানধারণা দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। ধর্মবিহীন রাজনীতি তাই হতে পারে না। কোন্টা ভালো, কোন্টা মন্দ, কোন্টা ন্যায়, কোন্টা অন্যায়Ñ এসবের বিচার করতে যেয়ে শেষ পর্যন্ত আমাদের বিশ্বাস আমাদের নিয়ন্ত্রিত করে। ধর্ম থেকে আসতে চাই আমাদের ন্যায়-অন্যায় ও ভালো-মন্দের ধারণায়। আমরা আমাদের আধুনিক গণতন্ত্রের ধারণা লাভ করেছি বিলাতের কাছ থেকে। বিলাতে গণতান্ত্রিক চিন্তাচেতনার উন্মেষ ঘটতে পেরেছে ধর্মের হাত ধরে। খ্রিষ্টীয় চতুর্দশ শতাব্দীতে জন বল (John Ball) নামে একজন ধর্মজাজক বলেন-
When Adam delved
And Eve span
Who was then the
Gentleman
এর বাংলা করলে দাঁড়াবে কতকটা এ রকম-
আদম যবে চষিতেন জমি
আর হাওয়া বিবি যখন কাটিতেন সুতা
তখন কে ছিল ধনী, কে ছিল ভদ্র
এই সব কিছুই ছুতা।
এই ছড়ার মধ্যে ফুটে উঠেছে মানবসমতার বাণী। একসময় সব মানুষই খেটে খেত। ধনী-দরিদ্র ও চাষা- ভদ্রের ব্যবধান গড়ে উঠেছে অনেক পরে। জন বল বলেন- এই বিভেদকে তাড়াতে হবে। এই বিভেদ মানুষের সৃষ্ট; বিধাতার সৃষ্ট নয়। এভাবে ধর্মের যুক্তির ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠতে চায় মানবাধিকার ও ভোটাধিকারের ধারণা। ধর্মকে তাই খাটো করে দেখার কোনো যুক্তি আছে বলে মনে করা যায় না। গণতন্ত্রে একটা গোড়ার কথা হলো- আলোচনার মাধ্যমে সরকার পরিচালনা করা (Government by discussion)। ইসলাম গণতন্ত্রের পরিপন্থী কোনো ধর্ম নয়। কারণ কুরআন শরিফে বলা হয়েছে- আলোচনার মাধ্যমে সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয় (সূরা ৪২, আয়াত ৩৮)। অনেকে আমাদের দেশে প্রমাণ করতে চাচ্ছেন, ইসলাম হচ্ছে একনায়কতন্ত্রী ধর্মবিশ্বাস; কিন্তু আল কুরআন থেকে এর কোনো সমর্থন পাওয়া যায় না। কুরআন শরীফে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, সিদ্ধান্ত নিতে হবে আলোচনার মাধ্যমে। ইসলাম একটি অজাগতিক ধর্ম নয়। কারণ ইসলামে বলা হয়েছে, যারা এই জগতে ভালো কাজ করবেন কেবল তারাই পুরস্কৃত হওয়ার আশা করতে পারেন পরকালে ( সূরা ২, আয়াত ১১২)। একটা হাদিস আছে এই রকম- ‘একদা এক ব্যক্তি নবীজীকে (সা) এসে বলেন, আমার মায়ের মৃত্যু হয়েছে। আমি তার স্মৃতিরক্ষার জন্য কিছু একটা করতে চাই। আপনি আমাকে উপদেশ দেন, আমার মায়ের স্মৃতিরক্ষার জন্য আমার কী করা উচিত হবে, সেই সম্বন্ধে। নবীজি (সা) তাকে জিজ্ঞাসা করলেন- ‘আপনার গ্রামে কি কোনো ইন্দারা আছে? যদি না থাকে তবে আপনার মায়ের নামে একটি ইন্দারা খননের ব্যবস্থা করেন। সেটাই হবে আপনার মায়ের স্মৃতিরক্ষার জন্য উত্তম কাজ।’ নবীজী (সা) উত্তম কাজ বলতে বোঝাতেন এমন কর্মকে, যা হলো মানুষের জন্য কল্যাণকর। আমি অনেক দিন আগে (প্রায় ৬০ বছর আগে) একজন মার্কিন অধ্যাপকের লেখা তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের একটি বই পড়েছিলাম। তাতে ছিল অনেক ধর্ম নিয়ে আলোচনা। ইসলাম নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ইসলামে জনকল্যাণ সম্পর্কে যেমন সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়, অন্য ধর্মে তা পাওয়া যায় না। ওপরে যে হাদিসটির কথা বলা হলো, সেটা তার বই থেকেই পাওয়া। আমি স্মৃতি থেকে উদ্ধৃতি দিলাম। যত দূর মনে পড়ছে, হাদিসটি আরো অনেকে উদ্ধৃত করেছেন। এটা পাওয়া যেতে পারে স্যার আবদুল্লাহ আল-মামুনের The Sayings of Muhammad নামে হাদিস সঙ্কলনে, যা বিলাতের Wisdom of the East কর্তৃক প্রকাশিত হয় ১৯৪৫ সালে। এই একই বইতে আছে, ‘নবীজিকে এসে আর এক ব্যক্তি প্রশ্ন করল, ভালো কাজ বলতে কী বুঝতে হবে? নবীজি (সা) এর উত্তরে বলেন- এমন কাজ, যা আপনার প্রতিবেশীর মুখে আনন্দের হাসি ফুটাতে সক্ষম হবে।’ এসব হলো ইসলামের কথা। মানবসমাজে ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা, তাই ক্ষতিকর হবে এ রকম ধরে নেয়ার কোনো কারণ নেই। সুতরাং ইসলামী রাজনীতিকে অমঙ্গলকর বলার যুক্তি কোথায়?
জামায়াতে ইসলামী একটি ইসলামপন্থী দল। কিন্তু বাংলাদেশে আরো একাধিক ইসলামপন্থী দল আছে। জামায়াতের রাজনীতি আমাদের পছন্দ না হতে পারে, কিন্তু তাই বলে ইসলামকে বাতিল করে দেয়ার যুক্তি কোথায়? কারণ ইসলামের ওপর কেবল জামায়াতের একাধিকার (Monopoly) নেই। অন্য দলও ইসলামী আদর্শবাদকে নির্ভর করে রাজনীতি করতে পারে। ভারত একটি সেকুলার রাষ্ট্র। কিন্তু মুসলিম লীগকে ভারতে বেআইনি করা হয়নি। এখানে ইসলামপন্থী দলগুলোকে বেআইনি করার যুক্তি কোথায়? তাজউদ্দীন সাহেব বাংলাদেশে যত দূর মনে পড়ছে মুসলিম লীগকে বেআইনি করেছিলেন। কিন্তু সেই একই সময় ভারতে ইন্দিরা কংগ্রেস কেরেলায় মুসলিম লীগের সাথে হাত মিলিয়েছিল নির্বাচনে কম্যুনিস্টদের হারানোর লক্ষ্যে। রাজনীতিতে অনেক দলের সাথে অনেক দলের নির্বাচনী ঐক্য হতে পারে; আদর্শ অনেক ভিন্ন হলেও।
আজকে জামায়াতে ইসলামীর সাথে বিএনপির জোট বাঁধাকে সমালোচনা করা হচ্ছে; কিন্তু কেন? নির্বাচনী ঐক্য দু’টি দলের মধ্যে হতে পারে আদর্শগত ঐক্য ছাড়াও। অবশ্য বিএনপি ইসলামবিরোধী কোনো দল নয়। বরং বলতে হয় ইসলামমনা দল। জিয়াউর রহমানের নীতিকে বিলাত থেকে মুদ্রিত একটি এনসাইক্লোপিডিয়ায় বলা হয়েছিলÑ ভাষা ও ভৌগোলিক অঞ্চলভিত্তিক ইসলামী আদর্শবাদ (Linguistic, Territorial, Islamic Nationalism)। অর্থাৎ জিয়ার রাজনীতিতে ছিল ভাষাগত স্বাতন্ত্র্যবোধ। ছিল মাতৃভূমিচেতনা। আবার সেই সাথে জড়িয়ে ছিল বেশ কিছুটা ইসলামী আবেগ। এই তিনে মিলেই এখনো চলেছে বিএনপির রাজনৈতিক নীতিনির্ধারণ। বিএনপি জিয়ার আদর্শ থেকে সরে এসেছে এমন নয়। জামায়াতের সাথে সে হাত মিলিয়েছে আওয়ামী লীগকে প্রতিহত করার জন্য। আওয়ামী লীগের সাথে তার আছে বিশেষ বিরোধ। এই বিরোধের একটি বড় কারণ হলো আওয়ামী লীগের সন্তু লারমার সাথে কৃত শান্তিচুক্তি, বিএনপি যেটাকে মানতে ইচ্ছুক নয়। কারণ এই চুক্তি বাংলাদেশের সংবিধানের পরিপন্থী। এ ছাড়া এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের সৈন্য ওই অঞ্চল থেকে সরিয়ে নিতে হবে। সৈন্য সরিয়ে নিলে ওই অঞ্চলের ওপর বাংলাদেশ সরকার হারাবে তার নিয়ন্ত্রণ। এর ফলে বাংলাদেশের দশ ভাগের এক ভাগ জমি হয়ে যাবে বাংলাদেশের হাতছাড়া, যেটাকে বিএনপি মানতে পারে না। বাংলদেশ জামায়াতে ইসলামী এটা চায় না। বাংলাদেশের রাষ্ট্রিক অখণ্ডতা এই উভয় দলই বজায় রাখতে চায়। আওয়ামী লীগের অতি উদারতা এই দুই দলের কাছেই মনে হচ্ছে বাংলাদেশের মৌলিক স্বার্থের পরিপন্থী। আমরা দেখতে পাচ্ছি, আরাকাণে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর অত্যাচার হতে। সম্প্রতি ওআইসি চেয়েছিল আরাকানে তার দফতর খুলতে। তার মাধ্যমে সে চেয়েছিল রোহিঙ্গাদের খাদ্য, বস্ত্র ও ঔষধ সরবরাহ করতে। কিন্তু মিয়ানমারের বৌদ্ধভিক্ষুরা রাস্তায় রাস্তায় প্রতিবাদ মিছিল করে। ফলে মিয়ানমার সরকার ওআইসির দফতর খুলতে দিতে রাজি হয় না। বৌদ্ধভিক্ষুরা রাজনীতি করলে সেটা চিহ্নিত হয় না কোনো মৌলবাদ হিসেবে। কিন্তু মুসলমানেরা ইসলামী আদর্শকে অনুসরণ করতে গেলে সেটাকে চিহ্নিত করা হয় মৌলবাদ হিসেবে। আমাদের পক্ষে এর তাৎপর্য বোঝা দুরূহ হয়ে উঠেছে। মুসলমানেরা রাগ করে দুই-চারটা বুদ্ধমূর্তি ভাঙলে তা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হতে পারে মানববন্ধন। কিন্তু রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর অত্যাচার হলে এ দেশের প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীরা তার কোনো নিন্দা জ্ঞাপনের প্রয়োজন দেখেন না। এই হলো আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবীদের প্রগতিশীলতার নিদর্শন। এ দেশে যারা বৌদ্ধ আছেন, তারা কেউ রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর অত্যাচারের প্রতিবাদ করেননি। ধর্মীয় কারণে তারা যেন চাচ্ছেন রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচার। ধর্ম তাদের রাজনীতিকে প্রভাবিত করছে। যে বড়–য়া মগ যুবক ফেসবুকে ইসলামের নিন্দা করার জন্য রামুতে গণ্ডগোল বাধে, তাকে ধরা হয়নি। ধরা হয়েছে কিছু ছাত্রশিবিরের সমর্থক বলে কথিত যুবককে। এ দেশে ‘হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ’ গঠিত হলে তাকে বলা হয় না সাম্প্রদায়িক জোট। কিন্তু জামায়াতের সাথে বিএনপি জোট বেঁধেছে বলে বলা হচ্ছে বিএনপি সঙ্কীর্ণচেতা সাম্প্রদায়িক দলে পরিণত হয়েছে। আমাদের কাছে এটাকে মনে হয় আত্মসঙ্গতিহীন বিচারবুদ্ধি বলে। জামায়াত একটি নিষিদ্ধ দল নয়। সে চেয়েছিল সমাবেশ করতে। সমাবেশ করার অধিকার তার আছে। কারণ সভা সমাবেশ করে জনমত তৈরি করতে না পারলে গণতন্ত্র অকেজো হয়ে পড়ে। তাকে সমাবেশ করতে বাধা দেয়ার কারণে সে ডেকেছিল হরতাল। বিএনপি এতে দিয়েছিল নৈতিক সমর্থন। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই দলটি দিয়েছিল এই নৈতিক সমর্থন। একে কোনোভাবেই অনৈতিক বলা যেতে পারে না। কিন্তু আমাদের প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীরা একে বলছেন, ইসলামী মৌলবাদের সমর্থন। যা-ই হোক, ৪ ডিসেম্বরের (২০১২) হরতাল থেকে এটুকুই প্রমাণিত হয়েছে যে, জামায়াত-বিএনপি জনসমর্থনবিহীন নয়। পত্রপত্রিকা, টকশোতে অনেক কিছুই প্রচার করা হলো; কিন্তু তা কি জনমনে সেভাবে কোনো প্রভাব রাখতে পারবে? ভারতীয় নেতারা এক বছর আগেও আওয়ামী লীগকে করছিলেন বিরাট প্রশংসা; কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি, তার সুর বদলাতে। তারা বলছেন, তারা বাংলাদেশের কোনো দলের সাথে নয়, তারা চান বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কের উন্নয়ন। খালেদা জিয়া ভারতে যেয়ে এবার পেলেন বিপুল সংবর্ধনা। কেবল লাল গালিচা বিছানোই ছিল বাকি। আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবীরা বলছেন, ধর্ম নিয়ে রাজনীতির দিন শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু ইউরোপের দেশে দেশে খ্রিষ্টীয় গণতান্ত্রিক দল যথেষ্ট শক্তিশালী। জার্মানিতে এরা এখন ক্ষমতাতেই আছে। ইউরোপে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার প্রশ্ন উঠছে না। জার্মানিতে আমরা দেখতে পাচ্ছি, খ্রিষ্টীয় গণতান্ত্রিকদের সাথে হতে পারছে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রীদের জোটবন্ধন। কিন্তু আমাদের দেশে তথাকথিত বামপন্থী বুদ্ধিজীবীরা বলছেনÑ ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে বন্ধ করার কথা। মনে হচ্ছে দেশটা যেন বড় বেশি প্রগতিশীল হয়ে পড়ছেÑ যাকে চিহ্নিত করা চলে অন্ধ প্রগতিশীলতা হিসেবে। ধর্মান্ধতার চেয়েও এই অন্ধ প্রগতিশীলতা হয়ে উঠতে পারে আমাদের জন্য ভয়াবহ ক্ষতির কারণ। এই সম্পর্কে হুঁশিয়ার হওয়া প্রয়োজন।
লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ, কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply