ধর্ম সাহিত্য-সংস্কৃতির অপরিহার্য অংশ -মো: ইমাম হোসেন

সকল ধর্মেরই নিজস্ব সাহিত্য সংস্কৃতি রয়েছে। যারা তাদের ধর্মের সাহিত্য সংস্কৃতিকে যত বেশি প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন আজ তারাই পৃথিবীর নেতৃত্বের আসনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ধর্মীয় বিশ্বাস সংস্কৃতি অঙ্গনের একটি জীবন্ত শক্তি। শিল্প সাহিত্যই কেবল সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত নয়। মানুষের জীবনধারাও সংস্কৃতির অঙ্গ। মানুষের অধিকার, মূল্যবোধ, ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং ধর্ম বিশ্বাসও সাহিত্য সংস্কৃতির অঙ্গ। মুসলমানদের আজ অধঃপতনের কারণ হচ্ছে, তাদের সাহিত্য সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যাওয়া। একটি শিশু জন্মের পর থেকেই স্বাভাবিক সংস্কৃতি নিয়েই বেড়ে উঠতে থাকে। কিন্তু যখন সে পরিণত বয়সে উপনীত হয়, তখন অধিকাংশই নিজস্ব সাহিত্য সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যায়। কারণ হচ্ছে সমাজে যে সাহিত্য সংস্কৃতি বেশি প্রভাব বিস্তার করে, সে সেটাকে ধরার বেশি চেষ্টা করে।
David B. Barrettনামে এক গবেষক বিশ্বব্যাপী এক জরিপ চালিয়ে বড় ধরনের একটি ডাটাবেজ তৈরি করেন এবং Encyclopedia Britannica প্রকাশ করে যে বিশে^ বর্তমানে ধর্মের সংখ্যা ৪৩০০ বা এর বেশিও হতে পারে। ২০১৩ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী পৃথিবীর সাতশত কোটি মানুষের মধ্যে খ্রিষ্টান ধর্মের অনুসারী সংখ্যার দিক থেকে প্রথম অবস্থানে রয়েছে, যেটা ৩৩%, এবং দ্বিতীয় অবস্থানে ইসলাম ধর্ম, যেটা ২১%।
ইসলামী সাহিত্য সংস্কৃতি আন্দোলন ও ইসলামী আন্দোলন ভিন্ন কোন বিষয় নয়। একটি আরেকটির সাথে একেবারেই সম্পর্কযুক্ত। সকল যুগের সবার সেরা সাহিত্যিকদের শিরোমনি হযরত মুহাম্মদ (সা)। কারণ তিনি এমন একটি সমাজে আগমন করেছিলেন যা ছিল সাহিত্য সংস্কৃতিতে শীর্ষে অবস্থানকারী। সেখানে সুস্থ সংস্কৃতি থেকে অপসংস্কৃতি বেশি ছিল। সময়ের ব্যবধানে তিনি সেটাকে পরিবর্তন করেন। পরবর্তীতে আমরা তার বিশাল হাদিসশাস্ত্র থেকে সাহিত্য সংস্কৃতির জ্ঞান অর্জন করি। ইসলামী সাহিত্য সংস্কৃতি হচ্ছে- জীবনে এমন সব নীতি ও মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটবে যেগুলো হবে ইসলাম ও মানবতার জন্য, সকল মানুষের কল্যাণের জন্য।

ইসলামী সাহিত্যের পথিকৃৎ মিশরের নজিব কিলানি ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত তার “মাদখাল ইলাল আদব-আল ইসলামি” বইতে লিখেছেন ইসলামী সাহিত্য সংস্কৃতি হচ্ছে- মোমিনের অন্তর থেকে উৎসাারিত প্রভাবশালী সুন্দর শিল্প, যা হবে বিনোদন ও কল্যাণমুখী এবং আবেগ ও কল্পনা সঞ্চারকারী।
ইসলামী সংস্কৃতির কতিপয় বৈশিষ্ট্য :
# আল্লাহর একত্ববাদ।
# আখিরাত ও পরকালের চিন্তা।
# নৈতিক মূল্যবোধ।
# চিন্তা, চরিত্র ও কর্মের তৎপরতা।
# দায়িত্বানুভূতি ও কর্তব্যবোধ।
# উদারতা ও মনের বিশালতা।
# ভারসাম্যতা, সুষমতা ও সামঞ্জস্যতা।

ইসলামী সাহিত্য সংস্কৃতি আন্দোলনে রাসূল (সা)-এর অবদান

এ বিষয়ে আলোকপাত করার পূর্বে ইসলামের প্রাথমিক যুগের কিছু বিষয় তুলে ধরা যাক। আমরা জানি যে, ইসলামের প্রথম যুগের আরবদের অধিকাংশ মানুষই ছিল বর্বর। তৎকালীন আরবি সাহিত্য ছিল লোকজ সাহিত্য। আর সেই লোকজ সাহিত্য এত উন্নত ছিল যে, আরবি কাসিদাগুলো হোমারের “ইলিয়ড”কেও হার মানায়। ওকাজ মেলায় কাসাদায়ে যুদ্ধ ও কবিতার লড়াই চলত। আরব সমাজের সাহিত্য সাংস্কৃতিক বলগাহীন অবস্থার উত্তরণে এবং মানব জীবনের সকল দিকের প্রবর্তক হয়ে আগমন করেছিলেন হযরত মুহাম্মদ (সা)। পবিত্র কুরআনের সূরা আহজাবের ২১ নং আয়াতে বলা হয়েছে-
হযরত মুহাম্মদ (সা) এর আদর্শই হচ্ছে একমাত্র উত্তম আদর্শ। যার মূল ভিত্তি হলো মহাগ্রন্থ আল কুরআন।

রাসূল (সা) কবি ছিলেন না। কিন্তু কবিতার প্রতি তার অনুরাগ ছিল অসাধারণ। নবী করিম (সা)-এর একটি অমিয় বাণী ইসলামী সংস্কৃতি রূপরেখায় বলে মনে করা যেতে পারে-“প্রতিটি শিশু প্রকৃতিজাত সন্তান, মা-বাবা তাদের কাউকে হিন্দু, কাউকে খ্রিষ্টান, আবার কাউকে অগ্নি উপাসক বানায়”। একটি শিশু জন্মগত ভাবেই সে সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী লাভ করে। পিতা-মাতার বিশ্বাসের কারণে তা পরিবর্তন হয়। জন্মসূত্রে প্রাপ্ত বিশ^াসী মানুষের জীবন তৌহিদভিত্তিক। পবিত্র কুরআনেও কবিতা বা সাহিত্যের অসাধারণ উদাহরণ দেয়া হয়েছে।

২২৪. আর কবিরা! তাদের পেছনে চলে পথভ্রান্ত যারা । ২২৫. তুমি কি দেখ না তারা উপতক্যায় উপত্যকায় উদভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়ায়।
২২৬. এবং এমন সব কথা বলে যা তারা করে না? ২২৭. তারা ছাড়া যারা ঈমান আনে ও সৎ কাজ করে এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করে তারা তাদের প্রতি জুলুম করা হলে শুধুমাত্র প্রতিশোধ নেয়। আর জুলুমকারীরা শিগগিরই জানবে তাদের পরিণাম কী! (সূরা-শু’আরা ২২৪-২২৭)
উপরের চারটি আয়াতের প্রথম তিনটিতে তৎকালীন আরবি কবিদের প্রসঙ্গে বলা হয়েছে। যারা অসত্য, অশালীন, বিভ্রান্তিকর মুশরিকি চিন্তা চেতনার প্রতিনিধিত্ব করে। মহত্তম কোন প্রবণতা এতে নেই। সুতরাং এরা যেমন বিভ্রান্ত, এদের উত্তরসূরিরাও বিভ্রান্ত। শেষের আয়াতে সত্য-সুন্দর কল্যাণের কবিদের চারটি মৌলিক বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হয়েছে-
# তারা ঈমানদার।
# তারা সৎকর্মশীল।
# আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণকারী।
# সবরকম জুলুম নির্যাতন, অবিচার অন্যায়ের বিরুদ্ধে সর্বদা সোচ্চার।

মহাগ্রন্থ আল কুরআনের এই নীতি অনুযায়ী মহানবী (সা) সাহিত্য সংস্কৃতি, কবিতা রচনায় যথোপযুক্ত উৎসাহ প্রদান করতেন। সাহিত্য-সংস্কৃতি ও কবিদের পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করতেন এবং মাঝে মাঝে নিজ কবিতা আবৃত্তি করতেন এবং অন্যদের আবৃত্তি গভীর ভাবে শুনতেন। এ থেকে বোঝা যায় তিনি কতটা সাহিত্য সংস্কৃতিমনা ছিলেন।
ইসলামী সাহিত্য সংস্কৃতি সম্পর্কে তার নিচের মন্তব্য তাৎপর্যময় যে সেই সময়ের সাহিত্য সংস্কৃতি আন্দোলকে গতিশীল করতে সাহায্য করেছিল।
“মুমিন ব্যক্তি তার তরবারি দিয়ে এবং তার মুখের ভাষা দিয়ে জিহাদ করে। যার হাতে আমার প্রাণ সে মহান সত্তার কসম, তোমরা যে কাব্য দিয়ে ওদের আঘাত হানছো তা তীরের আঘাতের মতই প্রচণ্ড।” (মেশকাত শরিফ)
“যে ব্যক্তি কাফিরদের বিরুদ্ধে ভাষার মাধ্যমে জিহাদ করলো সেই তো মুমিন।” (মুসলিম শরিফ)

তাই আসুন আমরা কল্যাণের সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চা করি, মুসলমানদের হারানো ইতিহাস ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার জন্য এবং সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চায় এগিয়ে আসি। ধর্ম, ভাষা, সাহিত্য সংস্কৃতি, লোকাচার, সব কিছুর সমন্বয়ে আমাদের স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচয় দাঁড় করাতে পারলে, আমরা একটি সুসংহত ও মজবুত এবং সমৃদ্ধশালী জাতি হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে সক্ষম হবো।
লেখক : প্রাবন্ধিক

SHARE

Leave a Reply