নগরের নব নববর্ষ সংস্কৃতি

আফসার নিজাম#

Songkrityনববর্ষ এলে আমাদের জীবনে শুরু হয় নবতর আনন্দের। আমরা ভাগ করে নিতে চাই বাংলার কৃষকের আনন্দ। নগরজীবনে কৃষকের ফসল তোলার আনন্দ না থাকলেও আমরা নবতর এক সংস্কৃতির উদ্ভব করেছি। এই সংস্কৃতি কৃষকের নয় এই সংস্কৃতি শহুরে জীবনে হাঁপিয়ে ওঠা মানুষের চিত্তবিনোদন। নগর সংস্কৃতির যে মূলভিত্তি থেকে তৈরি হয়েছে বা আমরা বলতে পারি নগর সংস্কৃতির মানুষজন যে অবস্থান থেকে ওঠে এসেছে তার ঋণ স্বীকার করে নেয়ার এক অনবদ্ধ আয়োজন বৈকি অন্য কিছু নয়। আমরা পূর্বস্মৃতি জাবরকেটে তৈরি করছি এ সংস্কৃতি বা আমরা যে এক সময় কৃষকের ছাওয়াল ছিলাম সে কথাই মনে করতে চাই বলেই বারবার সেই পান্তা, সেই আটপৌরে জীবন, সেই নবান্নের সিন্নি, পায়েস, পিঠা-পুলি, সেই জংলিপাড়ের মোটা কাপড় পরে বলতে চাই ‘আমরা বাঙালি ছিলাম রে’।
আমাদের নগর জীবনে ফুরসত কমে যাওয়ায় আমরা নতুন নতুন সংস্কৃতিকে আপন করে পেতে চাই। সেই সংস্কৃতি দেশীও হয় যদি তবুও তাকে নিজেদের মতো করে উপস্থাপন করতে বেশি ভালোবাসি। তা ছাড়া আন্তর্জাতিক সংস্কৃতির সাথে নগর সংস্কৃতির পরিচয় থাকে বলে দেশীয় সংস্কৃতিকে তারা আন্তর্জাতিক সংস্কৃতির সাথে ‘রিমিক্স’ সংস্কৃতি করে উপস্থাপন করে থাকে। সেই সংস্কৃতি উপস্থাপনের সময় দেশীয় সংস্কৃতির বিকৃতি তাদের চোখে ধরা না পড়লেও দেশীয় সংস্কৃতি লালনের তৃপ্তি অনুভব করে। এই যে দেশীয় সংস্কৃতির সাথে আন্তর্জাতিক সংস্কৃতির মিলনে দেশীয় সংস্কৃতি সতীত্ব হারাচ্ছে তার প্রতি নজর থাকে না। আর নগর সংস্কৃতি এমনিভাবে বিভিন্ন সংস্কৃতি থেকে ধার করে এক নবতর সংস্কৃতির জন্ম দেয়। সেই সংস্কৃতির সাথে না থাকে দেশীয় সংস্কৃতি না থাকে আন্তর্জাতিক কোনো সংস্কৃতির মূল প্রতিপাদ্য বিষয়।
বাংলার নবান্ন সংস্কৃতি কৃষকের জীবনপ্রবাহ থেকে উদ্ভূত বলেই সেখানে থাকে কৃষকের আনন্দ, বেদনা ও প্রাপ্তির তৃপ্তি। কৃষকের জীবনপ্রবাহকে ঘিরে তৈরি হয় নবতর জীবনানন্দ। সেইখানে নগর সংস্কৃতির কোনো মেলবন্ধ নেই। বরঞ্চ নগর সংস্কৃতি থেকে এসে তাদের আনন্দকে বেদনায় রূপ দিয়ে যেতেই বেশি দেখা গেছে। কৃষকের ফসল তোলার আনন্দ যখন ঘরে ঘরে। জারি-সারি ও পুঁথিপাঠে মগ্ন সেই সময় নগর সংস্কৃতি লালনের জন্য খাজনা নিতে দ্বারে উপস্থিত হয় জমিদার বাবুর পেয়াদা। সারা বছরের কষ্টে ফলানো ফসল বিনাবাক্যে ত্যাগ করতে হয়। তখন নবান্ন ঘিরে তৈরি হয় আর এক নববতর সংস্কৃতির। তার নাম বেদনা সংস্কৃতি।
আমরা নগর সংস্কৃতিকে ভুল না বুঝে একটু নতুন আদলে বলতে পারি। নগর সংস্কৃতি তো যে কোনো সংস্কৃতিই ধারণ করেত পারে। সে ব্যাপারে তার কোনো অনীহা নেই। সে ইচ্ছে করলে বিদেশী সংস্কৃতিও গ্রহণ করতে পারতো। তা না করে সে আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির উপস্থাপন করায় আমাদের জন্য কল্যাণেরই বলতে হয়। আমরা এর বিশুদ্ধতা যতটুকু গ্রহণ করতে পারি তাই কল্যাণকর। বাংলাভাষী জনগণের এমনিতে আনন্দের পরিমাণ কম। তারা জীবনের বৃহত্তম সময় ফসল উৎপাদনে ব্যয় করে বলে চিত্তবিনোদনের ফুরসত করে উঠতে পারে না। তার ওপর নগর জীবনেও ফুরসত নেই। সেখানে একটি দিন যদি চিত্তবিনোদনের জন্য হলেও শেকড় সংস্কৃতির চর্চা হয় তা হলে সেটাই আনন্দদায়ক সংবাদ বলতে হয়।
নগর সংস্কৃতির সাথে আমি পরিচিত বলেই নগর সংস্কৃতির কথা বারবার উপস্থাপন করছি। নগরজীবনে রমনাকেন্দ্রিক একটি সংস্কৃতি বিকাশ ঘটলেও বর্তমানে সারা শহরজুড়েই এই সংস্কৃতির প্রসার কয়েক বছর ধরে লক্ষণীয়। এখন প্রতিটি পাবলিক স্থানেই দেখা যায় এই সংস্কৃতির স্ফুরণ। নগরজুড়ে দেখা যায় লাল-সাদা পোশাক পরিহিত নর-নারী, বৃদ্ধ-শিশু। আর দেখা যায় নগরের বড় বড় মাঠগুলোতে বারোয়ারি মেলার আয়োজন। দেখা যায় বাড়িতে বাড়িতে ঈদের আনন্দ। ভালো খাবারের আয়োজন।
নগর সংস্কৃতিতে নবান্নের এই সংস্কৃতি যোগ হওয়ার ফলে তৈরি হয়েছে ব্যবসার নবতর প্রসার। মাসজুড়ে মেলাকেন্দ্রিক বেনিয়াদের পসরা সাজানো ডালা ভরে ওঠে হাজারো সামানে। নগর সংস্কৃতিতে ফুরসত না পাওয়া মানুষগুলো যেন এই সুযোগে তাদের নিত্যনৈমিত্তিক প্রয়োজনীয় সামানগুলো সংগ্রহ করে নেয়ার হিড়িক তোলে। তখন সবার হাতে হাতে থাকে নব-উপহারের এই সামান। ব্যবসার আরো একটি দিক এখানে উপস্থাপিত হয়। কৃষক জীবনের প্রয়োজনীয় সামানগুলো নগর সংস্করণ। যেমন মাটির হাঁড়ি-পাতিল ইত্যাদি ছোট ছোট আকারের, যা নগর সংস্কৃতিতে নিজের ঘর সাজানো যায় কৃষক পরিবারে আবহে। এতে করে নিজের সংস্কৃতির প্রতি যে একটি টান তা অনুভব করা যায় নগর সংস্কৃতিতে বসবাস  করেও।
এবার বলি আমাদের পহেলা বৈশাখ নিয়ে দু’চার বয়ান। আমাদের নগর সংস্কৃতি এই যে কৃষক সংস্কৃতি নবান্ন বা পহেলা বৈশাখ উদযাপন করে তার কোনো হদিস তাদের কাছে নেই। তারা জানেও না যে বাংলা পঞ্জিকার কোনো পহেলা সন নেই। এই পঞ্জিকা শুরু হয়েছে মাঝখানে থেকে। আরবি সনের সাথে মিল রেখে তৈরি হয়েছে এই বাংলা সন। ইতিহাসটা এ রকম ‘সম্রাট আকবরের সময় কৃষকদের থেকে কর আদায় করা হতো হিজরি সন অনুযায়ী। কিন্তু লুনার ক্যালেন্ডার (চন্দ্র বছর) অনুসরণ করা হিজরি সনের প্রথম দিন একেক বছর একেক সময়ে আসতো। ফলে অনেক সময় কৃষকদের ফসলহীন মৌসুমে কর দিতে হতো যা তাদের জন্য কষ্টকর হয়ে যেতো। সম্রাট আকবর এই সমস্যার সমাধান করার জন্য সে সময়ের বিশিষ্ট পন্ডিত ফতেউল্লাহ সিরাজীকে একটা নতুন ক্যালেন্ডার তৈরির আদেশ দেন। পরবর্তীতে ফতেউল্লাহ সিরাজী হিজরি ক্যালেন্ডার এবং জর্জিয়ান ক্যালেন্ডারের মধ্যে একটা ‘স্যুধ ট্রানজেশন’ ঘটন অর্থাৎ লুনার ধারণা অনুসরণ করা হিজরি সনকে জর্জিয়ান ধারণায় রূপান্তর করেন। যদিও এই ক্যালেন্ডার প্রবর্তন করা হয় ১৫৮৪ ঈষাব্দের ১০ (অথবা মতান্তরে ১১) মার্চ, তবে হিসেব গণনা করা শুরু করা হয় (ব্যাক ডেট) ১৫৫৬ সন থেকে, যা আকবরের সিংহাসন আরোহণের সন। ওই বছরের (১৫৫৬) হিজরি সনকে ফতেউল্লাহ সিরাজীর তৈরি করা জর্জিয়ান হিসাব অনুযায়ী বাংলা বর্ষ গণনা শুরু হয়। সে হিসেবে পেছন দিকে গুনতে থাকলে বাংলা ৯৬৩ সনের আগে আর কোনো সন পাওয়া সম্ভব নয়। আরেকটা বিষয় লক্ষ করে থাকবেন হয়তো পাঠক, বাংলা সন এবং হিজরি সন খুব কাছাকাছি বিরাজ করছে। বর্তমানে ১৪৩৬ হিজরি সন চলছে এবং বাংলা শুরু হলো ১৪২১।  ৪৫৩ বছর আগে ৩৫৫ দিনের (প্রায়) হিজরি সনকে ৩৬৫ দিনের (প্রায়) বাংলা সনে রূপান্তর করা হয়। ফলে অতিরিক্ত ১০ দিনের কারণে বাংলা সন ১৩ বছরের বেশি পিছিয়ে গিয়েছে হিজরি সন থেকে (৪৫৩ী১০ = ৪৫৩০? ৪৫৩০/৩৬৫ = ১২.৪১)। তা ছাড়া বাংলা সন সব সময় জর্জিয়ান ক্যালেন্ডার থেকে ৫৯৩ বছর পিছিয়ে থাকবে। সে জন্য বর্তমানে কত বাংলা সন চলছে সেটা জানার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো জর্জিয়ান সন থেকে ৫৯৩ বিয়োগ করা।’ এখানে একটা বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন যে বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ সব সময় ১৪ এপ্রিল পড়ে; কিন্তু ভারতে সেটা কখনও ১৪ আবার কখনও ১৫ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয়। এর কারণ বাংলাদেশে যে বাংলা ক্যালেন্ডার অনুসরণ করা হয় সেটাকে ১৯৬৬ সনের ১৭ ফেরুয়ারি ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে গঠিত বাংলা একাডেমির এক কমিটি সংশোধন করেছিলো। তখন বাংলা ক্যালেন্ডারে কোনো লিপি ইয়ার ছিলো না। ফলে জর্জিয়ান ক্যালেন্ডারের সাথে বাংলা ক্যালেন্ডারের একটা অসামঞ্জস্যতা সৃষ্টি হতো। সেই কমিটি ক্যালেন্ডারটিকে সংশোধন করে মাসের দিনগুলো পুনর্নির্ধারণ করে এবং জর্জিয়ান লিপ ইয়ারের বছরে ফাগুন মাসে একটা অতিরিক্ত দিন যোগ করে দিন সংখ্যাকে ঠিক রাখার প্রস্তাব দেয়। পরবর্তীতে ১৯৮৭ সন থেকে বাংলাদেশে এই ক্যালেন্ডারটি অনুসরণ করা হচ্ছে যদিও ভারতে সনাতন ক্যালেন্ডার মেনে এখনও নববর্ষ পালন করা হয়। তা ছাড়া ভারতে আকবরীয় ধারণার বিষয়টাকে বাংলা নববর্ষের প্রকৃত ইতিহাস হিসেবে মানা হয় না বরং রাজা শশাঙ্কের সময়ের (যার শাসনকাল ছিলো ৫৯০ থেকে ৬২৫ ঈসাব্দের মাঝামাঝি) ইতিহাসকে তারা বাংলা ক্যালেন্ডারের ইতিহাস মনে করে।
আরেকটি বিষয় এখানে একটু ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন বোধ করছি। প্রতি বছর বাংলা নববর্ষের সময় রাত ১২.১ মিনিটে মানুষ নববর্ষের শুভেচ্ছা জানায়। এই রীতিটা সম্পূর্ণ ভুল। জর্জিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী দিন শুরু হয় রাত ১২টার পর থেকে কিন্তু বাংলা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী দিন শুরু হয় সূর্যোদয়ের পর। ঠিক যেমনটা হিজরি ক্যালেন্ডারে দিন শুরু হয় সূর্যাস্তের পর থেকে। ফলে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানানো উচিত সকালে সূর্যোদয়ের সময়। বিষয়টা আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ মনে হলেও আমরা আসলে দিনের পুরো এক-চতুর্থাংশ তথা ছয় ঘন্টার হেরফের করে ফেলছি। তা ছাড়া শুভেচ্ছা যখন বাংলা নববর্ষের জানাচ্ছি তখন এই সামান্য অজ্ঞতাটুকু থেকে বের হয়ে আসতে দোষ কোথায়? আগামী বছর যদি লন্ডনের বা সিডনির বিখ্যাত বর্ষবরণ ফায়ারওয়ার্কস সন্ধ্যা ৬টায় করা হয় সেটা কি হাস্যকর হবে না? আমাদের নববর্ষ বিশ্বব্যাপী সুপরিচিত নয় বলে কি আমরা একটা ভুল রীতিকেই অনুসরণ করে যাবো? তাহলে ভিনদেশীরা আমাদের থেকে সঠিক শিখবে কী করে? তা ছাড়া বিশ্বব্যাপী সুপরিচিত নয় কথাটাও সম্ভবত ঠিক নয়। লন্ডনে অনুষ্ঠিত বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠান পুরো ইউরোপে অনুষ্ঠিত সর্ববৃহৎ এশিয়ান ফেস্টিভাল এবং বাংলাদেশ ও ভারতের বাইরে সর্ববৃহৎ বাংলা অনুষ্ঠান। ফলে আমাদের এই চর্চাগুলো হওয়া উচিত নির্ভুল যাতে আমাদের পরবর্তী বংশধর এবং ক্ষেত্রেবিশেষে ভিনদেশীরাও আমাদের থেকে সঠিকটা দেখতে এবং শিখতে পারে।’
বর্তমানে নগর সংস্কৃতির পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এবং আন্তর্জাতিক সংস্কৃতির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বাংলার গতানুগতিক উৎসব রীতির প্রকৃতি অনেকটাই বদলে গেছে। এই সংস্কৃতির ওপর আন্তর্জাতিক বিশেষ করে পশ্চিমা ও দিল্লি সংস্কৃতির এতটাই প্রভাব বিস্তার করেছে যে বাংলার সংস্কৃতির স্বকীয়তা ও স্বাতন্ত্র্য চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। তাই দেখি বাংলার তরুণ প্রজন্মের অনেকের কাছেই নববর্ষের গুরুত্ব হলো ‘বসুন্ধরা সিটি, ইস্টার্ন প্লাজা। মেলায় গিয়ে পান্তা ভাত খাওয়া আর বান্ধবীদের নিয়ে ঘুরে বেড়ানো। বাংলা মাস প্রচলিত না থাকায় অধিকাংশ মানুষই সচেতনতার ঊর্ধ্বে। বাউল গান, থিয়েটার, নাটক, যাত্রা, কবিতা পাঠ, আলাপ-আলোচনা এমনকি আড্ডার সংস্কৃতিতে বাংলার জীবন ক্রমেই তাৎপর্যহীন হয়ে পড়ছে। পাশ্চাত্য ও দিল্লি সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ করতে গিয়ে বাংলার জনগণ তাদের সভ্যতা, সংস্কৃতি, সাহিত্য এবং তাদের স্বতন্ত্র পরিচিতিকে হারিয়ে ফেলছে। তাইতো দেখি নববর্ষের পাশাপাশি ফ্রেন্ডশিপ ডে, ভ্যালেন্টাইন ডে, রোজ ডে, নিউ ইয়ার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নগর সংস্কৃতি যদি শেকড় সংস্কৃতিকে ধারণ না করে তা হলে এরকম অনেক সংস্কৃতিই ঢুকে পড়বে অনায়াসে। তাতে নতুন প্রজন্ম শেকড়বিহীন হয়ে পড়বে। আর শেকড়বিহীন গাছ যেমন বেশি দিন টিকে থাকে না তেমনি শেকড়হীন নগর প্রজন্ম একদিন উপড়ে পড়বে। তাই আজ থেকে শপথ নিতে হবে আমাদের নিজেদের সংস্কৃতি আমরা নিজেরাই সংরক্ষণ করবো।
লেখক : কবি ও সাহিত্যিক

SHARE

Leave a Reply