নজরুল কেন বড়ো কবি -আবদুল মান্নান সৈয়দ

দশ বছর ধরে নজরুলচর্চায় লিপ্ত আছি। ‘নজরুল-রচনাবলী’ প্রথমবার হাতে পেয়ে নজরুলের সাহিত্যের কিছু কিছু লুকানো জিনিস আবিষ্কারেই মগ্ন ছিলাম। এ রকম বেশ কিছুকাল যাবার পরে আমার মনে এই জিজ্ঞাসা উত্থিত হয়- কেন নজরুল নিয়ে এ রকম মগ্ন হয়ে আছি, কেন অনেক দিন নজরুলচর্চা করবার পর এখনো মনে হচ্ছে আরো অনেক কিছু বলবার আছে, কেন নজরুল নিয়ে কেউ কেউ অত্যুৎসুক আর কেউ কেউ অতি নীরব। অধ্যাপনাসূত্রে ছাত্রদের নানারকম জিজ্ঞাসার সম্মুখীন হয়েছি, অনেক সময় যা আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে নজরুল সম্পর্কে বিচিত্র কৌতূহল লক্ষ্য করেছি। দেখেছি, তরুণ লেখকদের এক বড় অংশের নজরুল সম্পর্কে অনীহা, যে-অনীহার অনেকটাই হয়তো এসেছে অপরিচয় থেকে। লক্ষ্য করেছি, তাঁকে নিয়ে সম্পূর্ণ বিরোধী প্রতিক্রিয়া ও বিতর্ক। একদিকে লোকপ্রিয়তা, আর একদিকে একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবীর বিমুখতা। রবীন্দ্রনাথের মতো কবি তাঁর ভক্তদের অসন্তোষ অগ্রাহ্য করে নজরুলকে নেহাত অল্প বয়সে গ্রন্থ উৎসর্গ করেন। মোহিতলালের মতো কবি সমালোচক নজরুলের প্রতিভার ঊষাকালেই তাঁকে সারস্বত মন্ডপে স্বাগত জানান। শুধু তাই নয়, নজরুলের উদ্দেশ্যে সাতটি কবিতায় তাঁর ভালোমন্দ প্রতিক্রিয়া জানান। নজরুলকে কেন্দ্র করেই প্রথমবারের মতো কয়েকজন বাঙালি-মুসলিম লেখকের হাতে সাহিত্য সমালোচনা দানা বাঁধে। নজরুলকে কেন্দ্র করেই এক দুষ্টনক্ষত্র জন্ম নেয়, যাঁর নাম সজনীকান্ত দাস, যাঁর বংশধরেরা কোনোদিন শেষ হবার নয়, সৃষ্টিশীল প্রতিভার সব উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের পাশে-পাশে এইসব দুষ্ট নক্ষত্রেরাও জ্বলে যায়। তিনি সমকালীন সাহিত্য-সংস্কৃতি-শ্লিষ্ট আরো অনেকের শ্রদ্ধা, প্রীতি ও ঈর্ষার লক্ষ্যস্থল হয়েছিলেন। লক্ষ্য করেছি, বয়সে নজরুলের প্রায় সমকালীন কিন্তু কাব্যচর্চায় উত্তরকালীন সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ও অমিয় চক্রবর্তীর লেখায় ঘুণাক্ষরেও নজরুলের উল্লেখ নেই; কিন্তু বুদ্ধদেব বসু, যিনি বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের পরে আধুনিক সাহিত্যের অলিখিত কিন্তু অর্জনযোগ্য সিংহাসনে আরূঢ় হয়েছিলেন, তাঁরই উদ্যোগে প্রকাশিত ‘কবিতা’ পত্রিকার একটি বিশেষ সংখ্যা নজরুলকে লুপ্তির আঁধার ও আচ্ছাদন থেকে বের করে আনে; জীবনানন্দ দাশের মতো মহান কবি তাঁকে নিয়ে রচনা করেন তাৎক্ষণিক কিন্তু আলাদা দু’টি নিবন্ধ। আমাদের দেশে ও পশ্চিমবঙ্গে খ্যাতিমান অসংখ্য মনীষীর দ্বারা তিনি আলোচিত সমালোচিত হতে থাকলেন; নীরব হয়ে যাবার পরে তাঁকে নিয়ে তাঁর অসংখ্য বন্ধু ও পরিচিতদের অনেকেই নানারকমভাবে তাঁদের শ্রদ্ধা ও প্রীতির অর্ঘ্য সাজিয়ে দ্যান। ১৯৬৫ সালে দেখলাম মুখোমুখি দুই যুদ্ধমান দেশ ব্যবহার করে চলেছে একজন কবির কবিতা। ১৯৭১ সালে দেখলাম যাঁকে বলা হতো Topical poet,, সমকালীন হৈ-চৈয়ের কবি, তাঁর নীরব হয়ে যাবার তিরিশ বছর পরে একটি রাষ্ট্রের জন্মে তাঁর উদ্দীপদ-সন্দীপক কবিতা-গান-গদ্যরচনাসমূহের দীপ্ত ভূমিকা। প্রাক্তন পূর্ব পাকিস্তান ও বর্তমান বাংলাদেশ এই দুই বিরোধী আদর্শের রাষ্ট্রে তিনি সম্মানিত হলেন শুধু বাংলাভাষার কবি বলে নন, এ জন্য, যে, তাঁর রচনাতেই পেয়ে যাওয়া যাচ্ছে দুই বিরোধী আদর্শের উজ্জ্বল উপকরণ। মনে হচ্ছে এই কবি দশ-আয়তনবান, যাঁর এক-একটি আয়তন নিয়ে এক-একটি ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠী মুগ্ধ থাকতে পারে। তিনি কি সত্যিকার উত্তররৈবিক কবি? রবীন্দ্রনাথ ও তিরিশের কবিতার মধ্যিখানে তাঁর প্রকৃত স্থান কোথায়? সব মিলিয়ে, নজরুলকে কি আমরা বড়ো কবি বলবো, বাংলা সাহিত্যের হিসেবে? বড়ো কবি (Major Poet) অর্থে বলছি। কেন বলবো? নজরুল প্রসঙ্গে এই জিজ্ঞাসার মোকাবেলা একদিন করতেই হয়; উপায় নেই এই জিজ্ঞাসার পাশ কাটিয়ে যাবার।
দীর্ঘকাল ধরে অনেক দিক বিবেচনার পরে, আমি এই নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি, যে, নজরুল আমাদের সাহিত্যের একজন বড়ো কবি বা Major Poet। কেন, এক-এক করে আমি তা বলছি; খুব বিস্তৃত আলোচনার অবকাশ নেই, বলছি সূত্রাকারে।

এক.
কোনো সাহিত্যের ধারায় একজন কবি হয়ে ওঠেন দু’ভাবে- স্বাভাবিক পথে আর সম্ভাবনারক্তিম পথে। রবীন্দ্রনাথ বাংলাভাষার সবচেয়ে স্বাভাবিক কবি, সে জন্য আশি বছর ধরে কবিতার নতুন-নতুন দেশ দখল করেও তিনি যা সাধন করেন, তা হচ্ছে নীরব বিপ্লব। কিন্তু বাংলাভাষার অন্তত তিনজন প্রধান কবির কথা আমরা বলবো, যাঁরা বাংলাভাষার মূল স্বভাবকেই বদলে দিয়েছেন, কিংবা আরো ভালো হয় যদি বলি সম্প্রসারিত করেছেন। মাইকেল মধুসূদন দত্ত, নজরুল ইসলাম ও সুধীন্দ্রনাথ দত্ত- বাংলাভাষার প্রধান কবিদের অন্তত এই তিনজনের নাম উল্লেখ আমি করবো, যাঁরা কবি হয়ে উঠেছেন অস্বাভাবিক পথে, কিন্তু যাঁদের বিরাট সৌজন্যে ও কৃতিত্বে ঐ অস্বভাবও এখন বাংলাভাষার স্বভাবের অন্তর্গত হয়ে গেছে। কিন্তু এ কথা ভুললে চলবে না, যে, এঁরা একদিন বাংলাভাষায় সম্পূর্ণ নতুন ও অজ্ঞাতপূর্ব শক্তি ও সম্ভাবনা আবিষ্কার করেন। আমাদের খন্ডিত জীবনের মধ্যেই মহাকাব্যিক আত্তি জাগ্রত করেন মাইকেল, নজরুল শান্ত রসের দেশে আনেন রৌদ্র রসের দহন ও দীপ্তি, শিথিল ও অতিভাষী বাংলাভাষাকে সুধীন্দ্রনাথ দান করেন নির্মেদ ও নির্বহুল এক টান-টান ছিলার সংহতি। লিরিকের সমতল দেশে মাইকেল আনেন মহাকাব্যিক সমুন্নতি; মধ্যযুগের রাশি-রাশি কাহিনী-কাব্যের নদী সমুদ্রে এসে পড়ে মাইকেলের হাতে; বাঙালি জীবনে ও মানসে আসে সেই প্রবহমানতা যা এক দাড়ি-দুই দাড়ি-নির্ভর মন্থর মসৃণ ছন্দযাত্রাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। সুধীন্দ্রনাথ শিথিল ও অতিভাষী বাংলা কবিতাকে এমন সংহতি ও দার্ঢ্য দ্যান, যা ছিলো এতকাল অভাবনীয়। নজরুল তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতায়, ও অন্যান্য বিদ্রোহমূলক কবিতায়, এমনকি কোনো কোনো গদ্যরচনায় নিয়ে আসেন এমন তেজ-জোশ-আলো-তাপ, যা নজরুলের আগে বাংলাভাষায় কল্পনাই করা যেতো না। ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ বা ‘বিদ্রোহী’ বা ‘অর্কেস্ট্রা’ বাংলা কবিতার ইতিহাসে বিষয়ে ও বিন্যাসে সেই নতুনত্বের সন্ধান দ্যায়, যা তার ছিলো না। সুধীন্দ্রনাথের ঘন সংহতি বা নজরুলের বিদ্রোহের বেগ- এঁরা বাংলা কবিতায় সম্পূর্ণ একটি নতুন আয়তন যুক্ত করে, এবং এর ফলে ভাষার ব্যাপ্তি বাড়ে। ভাষার এই গোপন ও নিহিত সম্ভাবনাকে যিনি আবিষ্কার করেন ও পূর্ণ রূপ দ্যান, তিনি বড়ো কবি। গৌণ কবিরা ঐসব আবিষ্কৃত পথেই চলাফেরা করেন, নতুন কোনো সাহস ও সম্ভাবনাকে তাঁরা জাগ্রত করতে পারেন না।

দুই.
এই নতুন সম্ভাবনা ও শক্তি সঞ্চয়ের সূত্রেই রবীন্দ্রনাথ থেকে আলাদা হয়ে যান নজরুল। রবীন্দ্রসমকালেই যাঁদের মধ্যে উত্তররাবীন্দ্রিক সুর সবচেয়ে সফলভাবে ঝংকৃত হয়েছে, নজরুল তাঁদের মধ্যে প্রধান। মোহিতলাল মজুমদার, যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত ও নজরুল ইসলাম- এই তিনজনই সেই প্রথম বাঁশিবাদক রবীন্দ্রনাথকে বিদীর্ণ করে বেজে উঠেছিলেন যাঁরা। কিন্তু এঁদের মধ্যে, নজরুলই সবচেয়ে সোচ্চার; এমনকি বিস্ময়কর ব্যাপার এই, যে, এঁদের দুজনকেই তিনি খানিকটা প্রভাবিতও করেছিলেন। বুদ্ধদেব বসু লিখেছেন, ‘কৈশোরকালে আমিও জেনেছি রবীন্দ্রনাথের সম্মোহন, যা থেকে বেরোবার ইচ্ছেটাকেও অন্যায় মনে হতো- যেন রাজদ্রোহের শামিল; আর সত্যেন্দ্রনাথের তন্দ্রা-ভরা নেশা, তাঁর বেলোয়ারি আওয়াজের জাদু- তাও আমি জেনেছি। আর এই নিয়েই বছরের পর বছর কেটে গেলো বাংলা কবিতার, আর অন্য কিছু চাইলো না কেউ, অন্য কিছু সম্ভব বলেও ভাবতে পারলো না- যতদিন না ‘বিদ্রোহী’ কবিতার নিশেন উড়িয়ে হৈ-হৈ করে নজরুল ইসলাম এসে পৌঁছিলেন। সেই প্রথম রবীন্দ্রনাথের মায়াজাল ভাঙলো।’ (রবীন্দ্রনাথ ও উত্তর সাধক) হ্যাঁ, মোহিতলাল ও যতীন্দ্রনাথ যতোই রবীন্দ্র-বিবাধী সুর সৃষ্টি করুন না কেন, নজরুল ইসলামই প্রথম রবীন্দ্রজাল ভেঙেছিলেন। আজকের দিনে সেই কোমল-কঠিন জাল যে কী-দুচ্ছেদ্য তা অবশ্য কল্পনাই করা যায় না; কিন্তু বুদ্ধদেব ও অন্যদের সাক্ষ্য থেকে, অসংখ্যের কবিতাচর্চা থেকে, তা বেরিয়ে আসে। এই মায়াজাল যিনি ভেঙেছিলেন, তিনি নিজে গৌণ কবি তথা অসংখ্যের অন্যতম হলে, তা কি সম্ভব হতো? তাঁর থাকতো কি সেই জোর? কিন্তু ঐ উক্তির পর-মুহূর্তে বুদ্ধদেব যখন উচ্চারণ করেন, নজরুল ইসলাম নিজে জানেননি যে, তিনি নতুন যুগ এগিয়ে আনছেন’ (ঐ) তখন তাতে বিচলিত বোধ করি আমরা। যিনি তাঁর প্রথম কবিতাগ্রন্থের প্রথম কবিতার প্রথম স্তবকেই লিখেছিলেন, ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর!! তোরা সব জয়ধ্বনি কর!!! ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখির ঝড়!’ (‘প্রলয়োল্লাস’, ‘অগ্নি-বীণা’) তাঁকে কি অতোটাই অনাত্মচেতন বলা চলবে? আর কাব্য বিচারে ঐ প্রশ্নও আসলে অনাবশ্যক আক্রমণ, আমরা কবির সচেতনতা বা প্রতিশ্রুতির চেয়ে কবিকর্মেই কি অধিক আস্থা রাখবো না? রবীন্দ্রনাথের পরে রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশাতেই যিনি নতুন যুগ এনেছেন, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ যাঁকে নেহাতই অল্প বয়সে বই উৎসর্গ করে স্বীকৃতি দিয়েছেন, যাঁর কাছে বাংলাসাহিত্যের তরফ থেকে দাবি জানিয়েছেন, তাঁকে অস্বীকার করে লাভ নেই। বুদ্ধদেবের পরবর্তী উক্তি আরো মারাত্মক, তাঁর রচনায় সামাজিক-রাজনৈতিক বিদ্রোহ আছে, কিন্তু সাহিত্যিক বিদ্রোহ নেই।’ (ঐ) যদি নজরুলের রচনায় কেবল সামাজিক-রাজনৈতিক বিদ্রোহ থাকতো, তাহলে আজ তাঁকে নিয়ে এতো আলোচনা-সমালোচনার দরকার হতো কি? কেননা আজ তো আমরা সেদিনকার থেকে একেবারে অন্য সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবেশে এসে পৌঁছেছি। বস্তুত সামাজিক-রাজনৈতিক বিদ্রোহ-বিপ্লবের মধ্য দিয়ে নজরুল সাহিত্যিক বিদ্রোহটিই সম্পন্ন করেছিলেন, কেননা, এতোকাল বাংলা কবিতায় সামাজিক-রাজনৈতিক বিদ্রোহ এরকম সাহিত্য চরিতার্থরূপে আসেনি; কিন্তু, এই তথ্যটিও এই সূত্রে স্মরণীয়, যে, সমকালীন বা তৎকালীন সামাজিক-রাজনৈতিক বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে নজরুল চিরন্তনের মঞ্জিলের উদ্দেশে রওনা হয়ে গিয়েছিলেন, সে জন্যই তা কেবল সমকালেই আলো জ্বালিয়ে স্ফুলিঙ্গের মতো পর্যবসিত হয়ে যায়নি। বুদ্ধদেবের ঐ প্রবন্ধ লেখা অবশ্য ১৯৫২ সালে, তখন নজরুল কিছুটা আচ্ছাদিত এবং সামাজিক-রাজনৈতিক বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে নজরুল যে সাহিত্যিক বিদ্রোহই সম্পন্ন করেছিলেন নজরুল-সাহিত্যের কালের দেয়াল ডিঙোনো চলিষ্ণুতার মধ্য দিয়ে তা তখনো পরীক্ষিত-প্রমাণিত হয়নি। এবং এর মধ্যে দিয়েই প্রমাণিত হলো, রবীন্দ্রনাথ-মোহিতলালের কাব্য-বিবেচনায় ভুল ছিলো না, নজরুলকে তুচ্ছার্থে ঞড়ঢ়রপধষ চড়বঃ বলে সরিয়ে রাখার যতোই চেষ্টা করা হোক তিনি নন সাময়িক কবি, ঈশ্বর গুপ্ত আর তাঁর কাব্যনিয়তি আলাদা, আসলে সাময়িক কবিতার কয়েকটি কুশলতা আয়ত্তে ছিলো তাঁর, অন্য কুশলতা ও প্রবণতাও অর্জনে ছিলো তার যা ছিলো না ঈশ্বর গুপ্ত বা অন্য ঞড়ঢ়রপধষ কবিদের। না, নজরুল সাময়িক কবি নন, সেই যে অসুস্থ হয়ে যাবার পরে আঁকা-বাঁকা ও কম্পিত হরফে লিখেছিলেন ‘চির দিনের কবি নজরুল’ তিনি তা-ই। কিন্তু ঐ আপাত-সাময়িক সামাজিক-রাজনৈতিক কবিতা রচনা করে রবীন্দ্রনাথের পরে বাংলা কবিতার তিনি সম্পূর্ণ নতুন এক দেশ জয় করে এনেছিলেন।

তিন.
আধুনিক বাংলা সাহিত্যের দশজন কবিকে আমি প্রধান মনে করি। মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মোহিতলাল মজুমদার, যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত, নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, অমিয় চক্রবর্তী, বুদ্ধদেব বসু ও বিষ্ণু দে। মোটামুটি দেড়শো বছরের আধুনিক বাংলা কাব্যেতিহাসে এই দশজন কবি দশ দিগন্তের একটি ভূলোক রচনা করেছেন। এঁদের মধ্যে বৈচিত্র্যে ও অভিনবত্বে রবীন্দ্রনাথ সন্দেহাতীতভাবেই শ্রেষ্ঠ; রবীন্দ্রনাথের পরেই কবিতায় যে-বহুমুখী প্রতিভার নাম করতে পারি আমরা, তিনি নজরুল ইসলাম। বৈপরীত্যকে আর কোনো বাঙালি কবি এমন একসঙ্গে আমন্ত্রণ জানাননি। উত্তাল আবেগের কবিতা, সূক্ষ্মতম ইন্দ্রিয়ানুকম্পনের কবিতা, ব্যঙ্গ-তীক্ষè কবিতা; সামাজিক কবিতা, প্রেমিক কবিতা, লিরিক কবিতা, নাটকীয় কবিতা, কাহিনী কাব্য,- একজন কবি জীবনের কবিতাকে এক বিরাট অর্কেস্ট্রার মতো ধারণ করেছেন। কতো বিচিত্র বিপরীত বিরোধী কবিতা তাঁর হাত থেকে বেরিয়ে আসে। ‘বিদ্রোহী’ (‘অগ্নি-বীণা’), ‘ফাতেহা-ই-দোয়াজদহম’ (‘বিষের বাঁশী’) ‘পূজারিণী’, (‘দোলন-চাঁপা’), ‘আপন-পিয়াসী’ (‘ছায়ানট’), ‘রৌদ্র-দগ্ধের গান’, (‘ছায়ানট’), ‘ইন্দ্রপতন’, (‘চিত্তনামা’), ‘সাম্যবাদী’, (‘সাম্যবাদী’), ‘প্যাক্ট’ (‘চন্দ্রবিন্দু’), ‘ভাঙার গান’ (‘ভাঙার গান’), প্রভৃতি। অতি পরিচয়ের ফলে এই কবিতাগুলো যে পরস্পরের কতো বিরোধী ও বিপরীত, তা আমাদের নজরে পড়ে না। ধার্মিক ‘ফাতেহা-ই-দোয়াজদহম’ এর সঙ্গে কোনো মিল নেই আধ্যাত্মিক ‘আপন-পিয়াসী’ কবিতার; ‘বিদ্রোহী’ কবিতার উত্তাল ঝঞ্ঝনার সঙ্গে কোনো সামঞ্জস্য নেই ‘সাম্যবাদী’র স্থির প্রত্যয়ের, আবার ‘ভাঙার গান’-এর মগ্ন, ফরৎবপঃ উচ্চারণ ঐ দুই কবিতা থেকেই দূরব্যবহিত; আত্মবলয়িত ‘রৌদ্র-দগ্ধের গান’ থেকে ‘প্যাক্ট’ কবিতার ব্যঙ্গনিষিক্ত সামাজিক হাস্যাস্ফার মেরুদূর। আমরা এখন বুঝতে পারি, কেন অনেকের মনÑখারাপ হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও, রবীন্দ্রনাথের পরে এই নামটি বার-বার উচ্চারিত হয়। মাইকেলে যেমন তেমনি নজরুলেও সম্ভাব্য কিন্তু অনিবার্য কাব্যনাট্য অলিখিতই রয়ে গেছে; কিন্তু নজরুলে সেই ঋণশোধ ঘটেছে, আংশিক হলেও ‘কামাল পাশা’ বা ‘আনোয়ার’ (‘অগ্নি-বীণা’)-এর মতো নাট্য-কবিতায়, একগুচ্ছ গীতিনাট্যে। বলা বাহুল্য, নজরুলের এই বহুমুখিতা স্রেফ বৈচিত্র্যপিয়াসার জন্য ঘটেনি, ঘটেছে জীবনের স্থল-সূক্ষ্ম বহু দেশ সম্পর্কে চেতনা ও অবহিতির কারণেই। বড় কবি যেমন গভীর তেমনি ব্যাপকও। আজকের দিনের কবিতার অতিপ্রকরণচেতনা আমাদের অনেকখানি বিষয়-বিমুখ করে দিয়েছে। ‘আধার নিশ্চয় গুরুত্বপূর্ণ’, কিন্তু আধেয়ের চেয়ে বেশি গুরুত্ব তার হতে পারে না। নজরুলের এই বহুধা বিস্তৃতি তাঁকে বড়ো পটভূমিকায় এনে দিয়েছে।
কবিতার বাইরেও তাঁর বিরাট বিচিত্রতাও নিশ্চয় অবিস্মরণ দ্যুতিময়। তাঁর গল্প, নাটক, উপন্যাস, প্রবন্ধচর্চা; পত্রিকা সম্পাদনা ও পরিচালনা; অভিনয় ও চলচ্চিত্র পরিচালনা; গীতিকার, সুরকার, গায়ক ও বক্তা হিসেবে দক্ষতা-সমস্ত মিলেই নজরুল। বিশেষ করে তাঁর গানের কথা বলবো, যে-গানের অনেকগুলো কবিতা হিসেবেই বিবেচ্য, এবং যে-গানের বিষয় ও সুরের বিচিত্রতা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গীতিকারদের তুল্য। না-মেনে উপায় নেই, রবীন্দ্রনাথের পরে আর-কোনো লেখকের মধ্যে এতো বিচিত্র বিষয়ে এতো বিপুল সাফল্য অর্জিত হতে দেখা যায়নি।

চার.
কবিতায় বিচিত্রপথগামী বলেই নজরুলের প্রভাব নজরুল পরবর্তী কবিতায় পড়েছে বিপুলভাবে। নজরুল নিজে বড়ো কবি না- হলে এতো বিশাল প্রভাব বিস্তার করতে পারতেন কি?
তাঁর পরবর্তী কবিতায় নজরুলের প্রভাব মোটামুটি তিনটি ধারায় অগ্রসর হয়েছে: ১. স্বপ্নকল্পনাচেতন ইন্দ্রিয়ঘনত্ব : জীবনানন্দ দাশ, প্রেমেন্দ্র মিত্র, ফররুখ আহমদ প্রমুখ; ২. লোকায়ত উম্মেষ : প্রেমেন্দ্র মিত্র, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, বিষ্ণু দে-র প্রথম পর্যায়, সুকান্ত ভট্টাচার্য, বেনজীর আহমদ, মহীউদ্দীন, মঈনুদ্দীন, দিনেশ দাস, মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায়, বিমলচন্দ্র ঘোষ, সমর সেন, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, সিকান্দার আবু জাফর প্রমুখ; ৩. ইসলামচেতন কাব্যোচ্চারণ : গোলাম মোস্তফা, শাহাদাৎ হোসেন, ফররুখ আহমদ, সৈয়দ আলী আহসানের প্রথম পর্যায়, সৈয়দ আলী আশরাফ, তালিম হোসেন, মুফাখখারুল ইসলাম প্রমুখ। যিনি বাংলা কবিতায় তিনটি ধারা খুলে দিলেন, যিনি জীবনানন্দ দাশ, ফররুখ আহমদ ও সুকান্ত ভট্টাচার্যের মতো পরস্পরবিরোধী উজ্জ্বল কবিদের প্রভাবিত করেছেন, তিনি নিজে বড়ো কবি না-হলে তা কি সম্ভব হতো? এই তিনটি ধারার যে-কোনো একটির স্রষ্টা হিসেবেই তিনি অমর হয়ে থাকতে পারতেন, কিন্তু তিনটি ধারার স্রষ্টা বলেই তিনি নিজে বিরাট ও মহান হয়ে উঠেছেন।

পাঁচ.
বড়ো কবি হন একটি জনগোষ্ঠীর প্রতিভূ। নজরুল ইসলাম শুধু বাঙালি-মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রতিভূ নন, প্রথম সাহিত্যিক স্রষ্টাও। বাঙালি-মুসলমানদের জীবনাচরণ ও ধর্মাচার, আবেগ ও স্বপ্ন এই প্রথম ছন্দোবদ্ধ হলো বাংলাভাষায়। বাঙালি-মুসলমানদের দৈনন্দিন জীবনে প্রচলিত আরবি-ফারসি শব্দ এই প্রথম মার্জিত সাহিত্যে স্থান পেলো, শুধু স্থান পাওয়াই যথেষ্ট ছিলো, নজরুল এমনকি তাঁর কাব্যিক ব্যবহার করলেন। তাঁর ইসলামি গান অসম্ভব লোকপ্রিয়তা অর্জন করলো। ইসলামি পুরাণ এই প্রথম ব্যবহৃত হলো বাংলা কবিতায়। মুসলিম দেশ ও জননেতা বন্দিত হলো। বাঙালি-মুসলমান এই প্রথম পেলো তার কবিকে। প্রথম বলে, পাঠকের অচেনা বলে নজরুল ইসলামকে মুসলিম পুরাণের উল্লেখ করতে হলো ফুটনোটে শব্দার্থ বুঝিয়ে দিয়ে, কবিতায়, এমনকি গদ্যরচনায়ও, এই একটি কীর্তিই সুসম্পন্ন করতে পারলেই তো নজরুল বড়ো কবি বলে পরিগণিত হতে পারতেন।

ছয়.
কিন্তু নজরুল আরো বড়ো কবি বলেই শুধু বাঙালি-মুসলমানের কবি হয়েই রইলেন না, হয়ে উঠলেন বাঙালির কবি। বাঙালি-হিন্দুর জীবনাচরণ ও ধর্মাচার কবিতায় ব্যবহৃত হয়ে আসছিলো বটে, কিন্তু নজরুল তাকে দিলেন আরো গাঢ় প্রত্যক্ষতা। নজরুলের কবিতায়- এবং বাংলা কবিতায় এই প্রথম, ফলত আলাদা হয়ে উঠলো- নজরুলের কবিতার পাশাপাশি ব্যবহৃত হলো সংস্কৃত শব্দ ও আরবি শব্দ, হিন্দু পুরাণের পাশে জেঁকে বসলো মুসলিম পুরাণ। হিন্দু-মুসলমান এদেশে পাশাপাশি বাস করলেও এই একবারই বাংলা কবিতায় এই একজনেরই কণ্ঠে বেজে উঠলো ইসলামি গান আর শ্যামাসঙ্গীত। কোন্ আশ্চর্য নৈপুণ্যে এ সম্ভব হলো তাতে আমরা কেবল অবাকই মানতে পারি। এই একবারই; আগেও না, পরেও না; নজরুলের পরে আমরা পেলাম বিষ্ণু দে ও ফররুখ আহমদের হিন্দু ও মুসলিম পুরাণের ও ইতিহাসের বিচ্ছিন্ন চর্চা।

সাত.
নজরুল আমাদের ঐতিহ্যের প্রথম স্রষ্টা ও দ্রষ্টা। বাঙালি-মুসলমানের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি বিষয় গত তিরিশ বছর ধরে বিরামহীন, জটিল ও বহুধাবিভক্ত তর্ক চলেছে। বস্তুত এই গিঁট খুলতে পারলে আমাদের অনেক সমস্যারই তল খুঁজে পাওয়া যেতো, পাওয়া যেতো তার স্বস্তিকর সমাধান। পঞ্চাশ বছর আগে আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিচেতনা এমন তীব্র, দীপ্র ও সর্বব্যাপী ছিলো না। বাঙালি-মুসলমানের সার্বিক আত্মচেতনা আমরা জানি, যে, আরো পরে জেগেছে। গৃহবিবাদ তখনো ছিলো, নজরুল ইসলামকে তার দন্ড দিতে হয়েছে। যিনি ইসলামি বিষয়কে প্রথমবার কবিতায় গানে গদ্যরচনায় সফল সাহিত্যিক রূপদান করলেন, তাঁকে দেওয়া হয়েছে ‘কাফের’ অভিধা। কিন্তু নজরুল কেবল ইসলমি গান লেখেননি, শ্যামাসঙ্গীতও রচনা করেছেন। পৌরাণিক যে চরিত্রটি তাঁর কবিতায় গদ্যরচনায় সর্বাধিকবার এসেছে, তিনি হচ্ছেন সৃষ্টি ও ধ্বংসের দেবতা, শিব, এই নজরুল ইসলামই হযরত মোহাম্মদকে কৃষ্ণের সঙ্গে তুলনা করেছেন ‘মরুভাস্কর’ কাব্যগ্রন্থে, ‘চিত্তনামা’ গ্রন্থে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনকে ‘নবি’ বলে সম্বোধন করেছেন, তিনিই এক নিঃশ্বাসে হিন্দু ও মুসলিম পুরাণকে ব্যবহার করেছেন, সংস্কৃত শব্দ ব্যবহার করতে দ্বিধা করেননি, ইতস্তত করেননি আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার করতে। এর ফলে প্রিয় যেমন হয়েছেন অনেকের, অপ্রিয়ও কম হননি। মূলত অস্তিবাদী বলে তার প্রকাশ ঘটেছে কম, চিঠিপত্রে কিছু সাক্ষ্য আছে। সে যাইহোক, বাঙালি-মুসলমান যে এক বিমিশ্র ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারক, নজরুলের সাহিত্য তারই সাক্ষ্য দ্যায়। নজরুলকে এই ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি বোধের জন্যে কোনো গ্রন্থের কাছে পাঠ নিতে হয়নি, এ তিনি অর্জন করেছিলেন তাঁর সরল ও অকৃত্রিম চেতনাতেই। নজরুলের ঐ চেতনাকে আমি বলবো ‘অপূর্ব স্বজ্ঞাবল’। আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি বিমিশ্র ও জটিল, সেজন্যই ধনী; নজরুলের কবিতা এই বিমিশ্র ও জটিল ঐতিহ্যের ঐশ্বর্যে ঋদ্ধ। তাঁর নিজস্ব ধর্ম-সমাজ বিষয়ে নিঃশব্দ থাকলে নজরুল এতো বড়ো কবি হতেন না; আবহমান বাংলা সাহিত্যের ও দেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি বিস্মৃত হলে নজরুল এতো বড়ো কবি হতেন না। বাঙালি-মুসলমান যেদিন এই বিমিশ্র ও জটিল ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে একক ও সমগ্র অবিচ্ছেদ্য প্রতীতি অর্জন করবে, সেদিন নজরুল ইসলামকে বরণ করে নেবে তাদের আদিপিতা হিসেবে।দশ বছর ধরে নজরুলচর্চায় লিপ্ত আছি। ‘নজরুল-রচনাবলী’ প্রথমবার হাতে পেয়ে নজরুলের সাহিত্যের কিছু কিছু লুকানো জিনিস আবিষ্কারেই মগ্ন ছিলাম। এ রকম বেশ কিছুকাল যাবার পরে আমার মনে এই জিজ্ঞাসা উত্থিত হয়- কেন নজরুল নিয়ে এ রকম মগ্ন হয়ে আছি, কেন অনেক দিন নজরুলচর্চা করবার পর এখনো মনে হচ্ছে আরো অনেক কিছু বলবার আছে, কেন নজরুল নিয়ে কেউ কেউ অত্যুৎসুক আর কেউ কেউ অতি নীরব। অধ্যাপনাসূত্রে ছাত্রদের নানারকম জিজ্ঞাসার সম্মুখীন হয়েছি, অনেক সময় যা আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে নজরুল সম্পর্কে বিচিত্র কৌতূহল লক্ষ্য করেছি। দেখেছি, তরুণ লেখকদের এক বড় অংশের নজরুল সম্পর্কে অনীহা, যে-অনীহার অনেকটাই হয়তো এসেছে অপরিচয় থেকে। লক্ষ্য করেছি, তাঁকে নিয়ে সম্পূর্ণ বিরোধী প্রতিক্রিয়া ও বিতর্ক। একদিকে লোকপ্রিয়তা, আর একদিকে একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবীর বিমুখতা। রবীন্দ্রনাথের মতো কবি তাঁর ভক্তদের অসন্তোষ অগ্রাহ্য করে নজরুলকে নেহাত অল্প বয়সে গ্রন্থ উৎসর্গ করেন। মোহিতলালের মতো কবি সমালোচক নজরুলের প্রতিভার ঊষাকালেই তাঁকে সারস্বত মন্ডপে স্বাগত জানান। শুধু তাই নয়, নজরুলের উদ্দেশ্যে সাতটি কবিতায় তাঁর ভালোমন্দ প্রতিক্রিয়া জানান। নজরুলকে কেন্দ্র করেই প্রথমবারের মতো কয়েকজন বাঙালি-মুসলিম লেখকের হাতে সাহিত্য সমালোচনা দানা বাঁধে। নজরুলকে কেন্দ্র করেই এক দুষ্টনক্ষত্র জন্ম নেয়, যাঁর নাম সজনীকান্ত দাস, যাঁর বংশধরেরা কোনোদিন শেষ হবার নয়, সৃষ্টিশীল প্রতিভার সব উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের পাশে-পাশে এইসব দুষ্ট নক্ষত্রেরাও জ্বলে যায়। তিনি সমকালীন সাহিত্য-সংস্কৃতি-শ্লিষ্ট আরো অনেকের শ্রদ্ধা, প্রীতি ও ঈর্ষার লক্ষ্যস্থল হয়েছিলেন। লক্ষ্য করেছি, বয়সে নজরুলের প্রায় সমকালীন কিন্তু কাব্যচর্চায় উত্তরকালীন সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ও অমিয় চক্রবর্তীর লেখায় ঘুণাক্ষরেও নজরুলের উল্লেখ নেই; কিন্তু বুদ্ধদেব বসু, যিনি বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের পরে আধুনিক সাহিত্যের অলিখিত কিন্তু অর্জনযোগ্য সিংহাসনে আরূঢ় হয়েছিলেন, তাঁরই উদ্যোগে প্রকাশিত ‘কবিতা’ পত্রিকার একটি বিশেষ সংখ্যা নজরুলকে লুপ্তির আঁধার ও আচ্ছাদন থেকে বের করে আনে; জীবনানন্দ দাশের মতো মহান কবি তাঁকে নিয়ে রচনা করেন তাৎক্ষণিক কিন্তু আলাদা দু’টি নিবন্ধ। আমাদের দেশে ও পশ্চিমবঙ্গে খ্যাতিমান অসংখ্য মনীষীর দ্বারা তিনি আলোচিত সমালোচিত হতে থাকলেন; নীরব হয়ে যাবার পরে তাঁকে নিয়ে তাঁর অসংখ্য বন্ধু ও পরিচিতদের অনেকেই নানারকমভাবে তাঁদের শ্রদ্ধা ও প্রীতির অর্ঘ্য সাজিয়ে দ্যান। ১৯৬৫ সালে দেখলাম মুখোমুখি দুই যুদ্ধমান দেশ ব্যবহার করে চলেছে একজন কবির কবিতা। ১৯৭১ সালে দেখলাম যাঁকে বলা হতো Topical poet,, সমকালীন হৈ-চৈয়ের কবি, তাঁর নীরব হয়ে যাবার তিরিশ বছর পরে একটি রাষ্ট্রের জন্মে তাঁর উদ্দীপদ-সন্দীপক কবিতা-গান-গদ্যরচনাসমূহের দীপ্ত ভূমিকা। প্রাক্তন পূর্ব পাকিস্তান ও বর্তমান বাংলাদেশ এই দুই বিরোধী আদর্শের রাষ্ট্রে তিনি সম্মানিত হলেন শুধু বাংলাভাষার কবি বলে নন, এ জন্য, যে, তাঁর রচনাতেই পেয়ে যাওয়া যাচ্ছে দুই বিরোধী আদর্শের উজ্জ্বল উপকরণ। মনে হচ্ছে এই কবি দশ-আয়তনবান, যাঁর এক-একটি আয়তন নিয়ে এক-একটি ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠী মুগ্ধ থাকতে পারে। তিনি কি সত্যিকার উত্তররৈবিক কবি? রবীন্দ্রনাথ ও তিরিশের কবিতার মধ্যিখানে তাঁর প্রকৃত স্থান কোথায়? সব মিলিয়ে, নজরুলকে কি আমরা বড়ো কবি বলবো, বাংলা সাহিত্যের হিসেবে? বড়ো কবি (Major Poet) অর্থে বলছি। কেন বলবো? নজরুল প্রসঙ্গে এই জিজ্ঞাসার মোকাবেলা একদিন করতেই হয়; উপায় নেই এই জিজ্ঞাসার পাশ কাটিয়ে যাবার।
দীর্ঘকাল ধরে অনেক দিক বিবেচনার পরে, আমি এই নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি, যে, নজরুল আমাদের সাহিত্যের একজন বড়ো কবি বা Major Poet। কেন, এক-এক করে আমি তা বলছি; খুব বিস্তৃত আলোচনার অবকাশ নেই, বলছি সূত্রাকারে।

এক.
কোনো সাহিত্যের ধারায় একজন কবি হয়ে ওঠেন দু’ভাবে- স্বাভাবিক পথে আর সম্ভাবনারক্তিম পথে। রবীন্দ্রনাথ বাংলাভাষার সবচেয়ে স্বাভাবিক কবি, সে জন্য আশি বছর ধরে কবিতার নতুন-নতুন দেশ দখল করেও তিনি যা সাধন করেন, তা হচ্ছে নীরব বিপ্লব। কিন্তু বাংলাভাষার অন্তত তিনজন প্রধান কবির কথা আমরা বলবো, যাঁরা বাংলাভাষার মূল স্বভাবকেই বদলে দিয়েছেন, কিংবা আরো ভালো হয় যদি বলি সম্প্রসারিত করেছেন। মাইকেল মধুসূদন দত্ত, নজরুল ইসলাম ও সুধীন্দ্রনাথ দত্ত- বাংলাভাষার প্রধান কবিদের অন্তত এই তিনজনের নাম উল্লেখ আমি করবো, যাঁরা কবি হয়ে উঠেছেন অস্বাভাবিক পথে, কিন্তু যাঁদের বিরাট সৌজন্যে ও কৃতিত্বে ঐ অস্বভাবও এখন বাংলাভাষার স্বভাবের অন্তর্গত হয়ে গেছে। কিন্তু এ কথা ভুললে চলবে না, যে, এঁরা একদিন বাংলাভাষায় সম্পূর্ণ নতুন ও অজ্ঞাতপূর্ব শক্তি ও সম্ভাবনা আবিষ্কার করেন। আমাদের খন্ডিত জীবনের মধ্যেই মহাকাব্যিক আত্তি জাগ্রত করেন মাইকেল, নজরুল শান্ত রসের দেশে আনেন রৌদ্র রসের দহন ও দীপ্তি, শিথিল ও অতিভাষী বাংলাভাষাকে সুধীন্দ্রনাথ দান করেন নির্মেদ ও নির্বহুল এক টান-টান ছিলার সংহতি। লিরিকের সমতল দেশে মাইকেল আনেন মহাকাব্যিক সমুন্নতি; মধ্যযুগের রাশি-রাশি কাহিনী-কাব্যের নদী সমুদ্রে এসে পড়ে মাইকেলের হাতে; বাঙালি জীবনে ও মানসে আসে সেই প্রবহমানতা যা এক দাড়ি-দুই দাড়ি-নির্ভর মন্থর মসৃণ ছন্দযাত্রাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। সুধীন্দ্রনাথ শিথিল ও অতিভাষী বাংলা কবিতাকে এমন সংহতি ও দার্ঢ্য দ্যান, যা ছিলো এতকাল অভাবনীয়। নজরুল তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতায়, ও অন্যান্য বিদ্রোহমূলক কবিতায়, এমনকি কোনো কোনো গদ্যরচনায় নিয়ে আসেন এমন তেজ-জোশ-আলো-তাপ, যা নজরুলের আগে বাংলাভাষায় কল্পনাই করা যেতো না। ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ বা ‘বিদ্রোহী’ বা ‘অর্কেস্ট্রা’ বাংলা কবিতার ইতিহাসে বিষয়ে ও বিন্যাসে সেই নতুনত্বের সন্ধান দ্যায়, যা তার ছিলো না। সুধীন্দ্রনাথের ঘন সংহতি বা নজরুলের বিদ্রোহের বেগ- এঁরা বাংলা কবিতায় সম্পূর্ণ একটি নতুন আয়তন যুক্ত করে, এবং এর ফলে ভাষার ব্যাপ্তি বাড়ে। ভাষার এই গোপন ও নিহিত সম্ভাবনাকে যিনি আবিষ্কার করেন ও পূর্ণ রূপ দ্যান, তিনি বড়ো কবি। গৌণ কবিরা ঐসব আবিষ্কৃত পথেই চলাফেরা করেন, নতুন কোনো সাহস ও সম্ভাবনাকে তাঁরা জাগ্রত করতে পারেন না।

দুই.
এই নতুন সম্ভাবনা ও শক্তি সঞ্চয়ের সূত্রেই রবীন্দ্রনাথ থেকে আলাদা হয়ে যান নজরুল। রবীন্দ্রসমকালেই যাঁদের মধ্যে উত্তররাবীন্দ্রিক সুর সবচেয়ে সফলভাবে ঝংকৃত হয়েছে, নজরুল তাঁদের মধ্যে প্রধান। মোহিতলাল মজুমদার, যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত ও নজরুল ইসলাম- এই তিনজনই সেই প্রথম বাঁশিবাদক রবীন্দ্রনাথকে বিদীর্ণ করে বেজে উঠেছিলেন যাঁরা। কিন্তু এঁদের মধ্যে, নজরুলই সবচেয়ে সোচ্চার; এমনকি বিস্ময়কর ব্যাপার এই, যে, এঁদের দুজনকেই তিনি খানিকটা প্রভাবিতও করেছিলেন। বুদ্ধদেব বসু লিখেছেন, ‘কৈশোরকালে আমিও জেনেছি রবীন্দ্রনাথের সম্মোহন, যা থেকে বেরোবার ইচ্ছেটাকেও অন্যায় মনে হতো- যেন রাজদ্রোহের শামিল; আর সত্যেন্দ্রনাথের তন্দ্রা-ভরা নেশা, তাঁর বেলোয়ারি আওয়াজের জাদু- তাও আমি জেনেছি। আর এই নিয়েই বছরের পর বছর কেটে গেলো বাংলা কবিতার, আর অন্য কিছু চাইলো না কেউ, অন্য কিছু সম্ভব বলেও ভাবতে পারলো না- যতদিন না ‘বিদ্রোহী’ কবিতার নিশেন উড়িয়ে হৈ-হৈ করে নজরুল ইসলাম এসে পৌঁছিলেন। সেই প্রথম রবীন্দ্রনাথের মায়াজাল ভাঙলো।’ (রবীন্দ্রনাথ ও উত্তর সাধক) হ্যাঁ, মোহিতলাল ও যতীন্দ্রনাথ যতোই রবীন্দ্র-বিবাধী সুর সৃষ্টি করুন না কেন, নজরুল ইসলামই প্রথম রবীন্দ্রজাল ভেঙেছিলেন। আজকের দিনে সেই কোমল-কঠিন জাল যে কী-দুচ্ছেদ্য তা অবশ্য কল্পনাই করা যায় না; কিন্তু বুদ্ধদেব ও অন্যদের সাক্ষ্য থেকে, অসংখ্যের কবিতাচর্চা থেকে, তা বেরিয়ে আসে। এই মায়াজাল যিনি ভেঙেছিলেন, তিনি নিজে গৌণ কবি তথা অসংখ্যের অন্যতম হলে, তা কি সম্ভব হতো? তাঁর থাকতো কি সেই জোর? কিন্তু ঐ উক্তির পর-মুহূর্তে বুদ্ধদেব যখন উচ্চারণ করেন, নজরুল ইসলাম নিজে জানেননি যে, তিনি নতুন যুগ এগিয়ে আনছেন’ (ঐ) তখন তাতে বিচলিত বোধ করি আমরা। যিনি তাঁর প্রথম কবিতাগ্রন্থের প্রথম কবিতার প্রথম স্তবকেই লিখেছিলেন, ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর!! তোরা সব জয়ধ্বনি কর!!! ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখির ঝড়!’ (‘প্রলয়োল্লাস’, ‘অগ্নি-বীণা’) তাঁকে কি অতোটাই অনাত্মচেতন বলা চলবে? আর কাব্য বিচারে ঐ প্রশ্নও আসলে অনাবশ্যক আক্রমণ, আমরা কবির সচেতনতা বা প্রতিশ্রুতির চেয়ে কবিকর্মেই কি অধিক আস্থা রাখবো না? রবীন্দ্রনাথের পরে রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশাতেই যিনি নতুন যুগ এনেছেন, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ যাঁকে নেহাতই অল্প বয়সে বই উৎসর্গ করে স্বীকৃতি দিয়েছেন, যাঁর কাছে বাংলাসাহিত্যের তরফ থেকে দাবি জানিয়েছেন, তাঁকে অস্বীকার করে লাভ নেই। বুদ্ধদেবের পরবর্তী উক্তি আরো মারাত্মক, তাঁর রচনায় সামাজিক-রাজনৈতিক বিদ্রোহ আছে, কিন্তু সাহিত্যিক বিদ্রোহ নেই।’ (ঐ) যদি নজরুলের রচনায় কেবল সামাজিক-রাজনৈতিক বিদ্রোহ থাকতো, তাহলে আজ তাঁকে নিয়ে এতো আলোচনা-সমালোচনার দরকার হতো কি? কেননা আজ তো আমরা সেদিনকার থেকে একেবারে অন্য সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবেশে এসে পৌঁছেছি। বস্তুত সামাজিক-রাজনৈতিক বিদ্রোহ-বিপ্লবের মধ্য দিয়ে নজরুল সাহিত্যিক বিদ্রোহটিই সম্পন্ন করেছিলেন, কেননা, এতোকাল বাংলা কবিতায় সামাজিক-রাজনৈতিক বিদ্রোহ এরকম সাহিত্য চরিতার্থরূপে আসেনি; কিন্তু, এই তথ্যটিও এই সূত্রে স্মরণীয়, যে, সমকালীন বা তৎকালীন সামাজিক-রাজনৈতিক বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে নজরুল চিরন্তনের মঞ্জিলের উদ্দেশে রওনা হয়ে গিয়েছিলেন, সে জন্যই তা কেবল সমকালেই আলো জ্বালিয়ে স্ফুলিঙ্গের মতো পর্যবসিত হয়ে যায়নি। বুদ্ধদেবের ঐ প্রবন্ধ লেখা অবশ্য ১৯৫২ সালে, তখন নজরুল কিছুটা আচ্ছাদিত এবং সামাজিক-রাজনৈতিক বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে নজরুল যে সাহিত্যিক বিদ্রোহই সম্পন্ন করেছিলেন নজরুল-সাহিত্যের কালের দেয়াল ডিঙোনো চলিষ্ণুতার মধ্য দিয়ে তা তখনো পরীক্ষিত-প্রমাণিত হয়নি। এবং এর মধ্যে দিয়েই প্রমাণিত হলো, রবীন্দ্রনাথ-মোহিতলালের কাব্য-বিবেচনায় ভুল ছিলো না, নজরুলকে তুচ্ছার্থে ঞড়ঢ়রপধষ চড়বঃ বলে সরিয়ে রাখার যতোই চেষ্টা করা হোক তিনি নন সাময়িক কবি, ঈশ্বর গুপ্ত আর তাঁর কাব্যনিয়তি আলাদা, আসলে সাময়িক কবিতার কয়েকটি কুশলতা আয়ত্তে ছিলো তাঁর, অন্য কুশলতা ও প্রবণতাও অর্জনে ছিলো তার যা ছিলো না ঈশ্বর গুপ্ত বা অন্য ঞড়ঢ়রপধষ কবিদের। না, নজরুল সাময়িক কবি নন, সেই যে অসুস্থ হয়ে যাবার পরে আঁকা-বাঁকা ও কম্পিত হরফে লিখেছিলেন ‘চির দিনের কবি নজরুল’ তিনি তা-ই। কিন্তু ঐ আপাত-সাময়িক সামাজিক-রাজনৈতিক কবিতা রচনা করে রবীন্দ্রনাথের পরে বাংলা কবিতার তিনি সম্পূর্ণ নতুন এক দেশ জয় করে এনেছিলেন।

তিন.
আধুনিক বাংলা সাহিত্যের দশজন কবিকে আমি প্রধান মনে করি। মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মোহিতলাল মজুমদার, যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত, নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, অমিয় চক্রবর্তী, বুদ্ধদেব বসু ও বিষ্ণু দে। মোটামুটি দেড়শো বছরের আধুনিক বাংলা কাব্যেতিহাসে এই দশজন কবি দশ দিগন্তের একটি ভূলোক রচনা করেছেন। এঁদের মধ্যে বৈচিত্র্যে ও অভিনবত্বে রবীন্দ্রনাথ সন্দেহাতীতভাবেই শ্রেষ্ঠ; রবীন্দ্রনাথের পরেই কবিতায় যে-বহুমুখী প্রতিভার নাম করতে পারি আমরা, তিনি নজরুল ইসলাম। বৈপরীত্যকে আর কোনো বাঙালি কবি এমন একসঙ্গে আমন্ত্রণ জানাননি। উত্তাল আবেগের কবিতা, সূক্ষ্মতম ইন্দ্রিয়ানুকম্পনের কবিতা, ব্যঙ্গ-তীক্ষè কবিতা; সামাজিক কবিতা, প্রেমিক কবিতা, লিরিক কবিতা, নাটকীয় কবিতা, কাহিনী কাব্য,- একজন কবি জীবনের কবিতাকে এক বিরাট অর্কেস্ট্রার মতো ধারণ করেছেন। কতো বিচিত্র বিপরীত বিরোধী কবিতা তাঁর হাত থেকে বেরিয়ে আসে। ‘বিদ্রোহী’ (‘অগ্নি-বীণা’), ‘ফাতেহা-ই-দোয়াজদহম’ (‘বিষের বাঁশী’) ‘পূজারিণী’, (‘দোলন-চাঁপা’), ‘আপন-পিয়াসী’ (‘ছায়ানট’), ‘রৌদ্র-দগ্ধের গান’, (‘ছায়ানট’), ‘ইন্দ্রপতন’, (‘চিত্তনামা’), ‘সাম্যবাদী’, (‘সাম্যবাদী’), ‘প্যাক্ট’ (‘চন্দ্রবিন্দু’), ‘ভাঙার গান’ (‘ভাঙার গান’), প্রভৃতি। অতি পরিচয়ের ফলে এই কবিতাগুলো যে পরস্পরের কতো বিরোধী ও বিপরীত, তা আমাদের নজরে পড়ে না। ধার্মিক ‘ফাতেহা-ই-দোয়াজদহম’ এর সঙ্গে কোনো মিল নেই আধ্যাত্মিক ‘আপন-পিয়াসী’ কবিতার; ‘বিদ্রোহী’ কবিতার উত্তাল ঝঞ্ঝনার সঙ্গে কোনো সামঞ্জস্য নেই ‘সাম্যবাদী’র স্থির প্রত্যয়ের, আবার ‘ভাঙার গান’-এর মগ্ন, ফরৎবপঃ উচ্চারণ ঐ দুই কবিতা থেকেই দূরব্যবহিত; আত্মবলয়িত ‘রৌদ্র-দগ্ধের গান’ থেকে ‘প্যাক্ট’ কবিতার ব্যঙ্গনিষিক্ত সামাজিক হাস্যাস্ফার মেরুদূর। আমরা এখন বুঝতে পারি, কেন অনেকের মনÑখারাপ হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও, রবীন্দ্রনাথের পরে এই নামটি বার-বার উচ্চারিত হয়। মাইকেলে যেমন তেমনি নজরুলেও সম্ভাব্য কিন্তু অনিবার্য কাব্যনাট্য অলিখিতই রয়ে গেছে; কিন্তু নজরুলে সেই ঋণশোধ ঘটেছে, আংশিক হলেও ‘কামাল পাশা’ বা ‘আনোয়ার’ (‘অগ্নি-বীণা’)-এর মতো নাট্য-কবিতায়, একগুচ্ছ গীতিনাট্যে। বলা বাহুল্য, নজরুলের এই বহুমুখিতা স্রেফ বৈচিত্র্যপিয়াসার জন্য ঘটেনি, ঘটেছে জীবনের স্থল-সূক্ষ্ম বহু দেশ সম্পর্কে চেতনা ও অবহিতির কারণেই। বড় কবি যেমন গভীর তেমনি ব্যাপকও। আজকের দিনের কবিতার অতিপ্রকরণচেতনা আমাদের অনেকখানি বিষয়-বিমুখ করে দিয়েছে। ‘আধার নিশ্চয় গুরুত্বপূর্ণ’, কিন্তু আধেয়ের চেয়ে বেশি গুরুত্ব তার হতে পারে না। নজরুলের এই বহুধা বিস্তৃতি তাঁকে বড়ো পটভূমিকায় এনে দিয়েছে।
কবিতার বাইরেও তাঁর বিরাট বিচিত্রতাও নিশ্চয় অবিস্মরণ দ্যুতিময়। তাঁর গল্প, নাটক, উপন্যাস, প্রবন্ধচর্চা; পত্রিকা সম্পাদনা ও পরিচালনা; অভিনয় ও চলচ্চিত্র পরিচালনা; গীতিকার, সুরকার, গায়ক ও বক্তা হিসেবে দক্ষতা-সমস্ত মিলেই নজরুল। বিশেষ করে তাঁর গানের কথা বলবো, যে-গানের অনেকগুলো কবিতা হিসেবেই বিবেচ্য, এবং যে-গানের বিষয় ও সুরের বিচিত্রতা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গীতিকারদের তুল্য। না-মেনে উপায় নেই, রবীন্দ্রনাথের পরে আর-কোনো লেখকের মধ্যে এতো বিচিত্র বিষয়ে এতো বিপুল সাফল্য অর্জিত হতে দেখা যায়নি।

চার.
কবিতায় বিচিত্রপথগামী বলেই নজরুলের প্রভাব নজরুল পরবর্তী কবিতায় পড়েছে বিপুলভাবে। নজরুল নিজে বড়ো কবি না- হলে এতো বিশাল প্রভাব বিস্তার করতে পারতেন কি?
তাঁর পরবর্তী কবিতায় নজরুলের প্রভাব মোটামুটি তিনটি ধারায় অগ্রসর হয়েছে: ১. স্বপ্নকল্পনাচেতন ইন্দ্রিয়ঘনত্ব : জীবনানন্দ দাশ, প্রেমেন্দ্র মিত্র, ফররুখ আহমদ প্রমুখ; ২. লোকায়ত উম্মেষ : প্রেমেন্দ্র মিত্র, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, বিষ্ণু দে-র প্রথম পর্যায়, সুকান্ত ভট্টাচার্য, বেনজীর আহমদ, মহীউদ্দীন, মঈনুদ্দীন, দিনেশ দাস, মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায়, বিমলচন্দ্র ঘোষ, সমর সেন, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, সিকান্দার আবু জাফর প্রমুখ; ৩. ইসলামচেতন কাব্যোচ্চারণ : গোলাম মোস্তফা, শাহাদাৎ হোসেন, ফররুখ আহমদ, সৈয়দ আলী আহসানের প্রথম পর্যায়, সৈয়দ আলী আশরাফ, তালিম হোসেন, মুফাখখারুল ইসলাম প্রমুখ। যিনি বাংলা কবিতায় তিনটি ধারা খুলে দিলেন, যিনি জীবনানন্দ দাশ, ফররুখ আহমদ ও সুকান্ত ভট্টাচার্যের মতো পরস্পরবিরোধী উজ্জ্বল কবিদের প্রভাবিত করেছেন, তিনি নিজে বড়ো কবি না-হলে তা কি সম্ভব হতো? এই তিনটি ধারার যে-কোনো একটির স্রষ্টা হিসেবেই তিনি অমর হয়ে থাকতে পারতেন, কিন্তু তিনটি ধারার স্রষ্টা বলেই তিনি নিজে বিরাট ও মহান হয়ে উঠেছেন।

পাঁচ.
বড়ো কবি হন একটি জনগোষ্ঠীর প্রতিভূ। নজরুল ইসলাম শুধু বাঙালি-মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রতিভূ নন, প্রথম সাহিত্যিক স্রষ্টাও। বাঙালি-মুসলমানদের জীবনাচরণ ও ধর্মাচার, আবেগ ও স্বপ্ন এই প্রথম ছন্দোবদ্ধ হলো বাংলাভাষায়। বাঙালি-মুসলমানদের দৈনন্দিন জীবনে প্রচলিত আরবি-ফারসি শব্দ এই প্রথম মার্জিত সাহিত্যে স্থান পেলো, শুধু স্থান পাওয়াই যথেষ্ট ছিলো, নজরুল এমনকি তাঁর কাব্যিক ব্যবহার করলেন। তাঁর ইসলামি গান অসম্ভব লোকপ্রিয়তা অর্জন করলো। ইসলামি পুরাণ এই প্রথম ব্যবহৃত হলো বাংলা কবিতায়। মুসলিম দেশ ও জননেতা বন্দিত হলো। বাঙালি-মুসলমান এই প্রথম পেলো তার কবিকে। প্রথম বলে, পাঠকের অচেনা বলে নজরুল ইসলামকে মুসলিম পুরাণের উল্লেখ করতে হলো ফুটনোটে শব্দার্থ বুঝিয়ে দিয়ে, কবিতায়, এমনকি গদ্যরচনায়ও, এই একটি কীর্তিই সুসম্পন্ন করতে পারলেই তো নজরুল বড়ো কবি বলে পরিগণিত হতে পারতেন।

ছয়.
কিন্তু নজরুল আরো বড়ো কবি বলেই শুধু বাঙালি-মুসলমানের কবি হয়েই রইলেন না, হয়ে উঠলেন বাঙালির কবি। বাঙালি-হিন্দুর জীবনাচরণ ও ধর্মাচার কবিতায় ব্যবহৃত হয়ে আসছিলো বটে, কিন্তু নজরুল তাকে দিলেন আরো গাঢ় প্রত্যক্ষতা। নজরুলের কবিতায়- এবং বাংলা কবিতায় এই প্রথম, ফলত আলাদা হয়ে উঠলো- নজরুলের কবিতার পাশাপাশি ব্যবহৃত হলো সংস্কৃত শব্দ ও আরবি শব্দ, হিন্দু পুরাণের পাশে জেঁকে বসলো মুসলিম পুরাণ। হিন্দু-মুসলমান এদেশে পাশাপাশি বাস করলেও এই একবারই বাংলা কবিতায় এই একজনেরই কণ্ঠে বেজে উঠলো ইসলামি গান আর শ্যামাসঙ্গীত। কোন্ আশ্চর্য নৈপুণ্যে এ সম্ভব হলো তাতে আমরা কেবল অবাকই মানতে পারি। এই একবারই; আগেও না, পরেও না; নজরুলের পরে আমরা পেলাম বিষ্ণু দে ও ফররুখ আহমদের হিন্দু ও মুসলিম পুরাণের ও ইতিহাসের বিচ্ছিন্ন চর্চা।

সাত.
নজরুল আমাদের ঐতিহ্যের প্রথম স্রষ্টা ও দ্রষ্টা। বাঙালি-মুসলমানের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি বিষয় গত তিরিশ বছর ধরে বিরামহীন, জটিল ও বহুধাবিভক্ত তর্ক চলেছে। বস্তুত এই গিঁট খুলতে পারলে আমাদের অনেক সমস্যারই তল খুঁজে পাওয়া যেতো, পাওয়া যেতো তার স্বস্তিকর সমাধান। পঞ্চাশ বছর আগে আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিচেতনা এমন তীব্র, দীপ্র ও সর্বব্যাপী ছিলো না। বাঙালি-মুসলমানের সার্বিক আত্মচেতনা আমরা জানি, যে, আরো পরে জেগেছে। গৃহবিবাদ তখনো ছিলো, নজরুল ইসলামকে তার দন্ড দিতে হয়েছে। যিনি ইসলামি বিষয়কে প্রথমবার কবিতায় গানে গদ্যরচনায় সফল সাহিত্যিক রূপদান করলেন, তাঁকে দেওয়া হয়েছে ‘কাফের’ অভিধা। কিন্তু নজরুল কেবল ইসলমি গান লেখেননি, শ্যামাসঙ্গীতও রচনা করেছেন। পৌরাণিক যে চরিত্রটি তাঁর কবিতায় গদ্যরচনায় সর্বাধিকবার এসেছে, তিনি হচ্ছেন সৃষ্টি ও ধ্বংসের দেবতা, শিব, এই নজরুল ইসলামই হযরত মোহাম্মদকে কৃষ্ণের সঙ্গে তুলনা করেছেন ‘মরুভাস্কর’ কাব্যগ্রন্থে, ‘চিত্তনামা’ গ্রন্থে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনকে ‘নবি’ বলে সম্বোধন করেছেন, তিনিই এক নিঃশ্বাসে হিন্দু ও মুসলিম পুরাণকে ব্যবহার করেছেন, সংস্কৃত শব্দ ব্যবহার করতে দ্বিধা করেননি, ইতস্তত করেননি আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার করতে। এর ফলে প্রিয় যেমন হয়েছেন অনেকের, অপ্রিয়ও কম হননি। মূলত অস্তিবাদী বলে তার প্রকাশ ঘটেছে কম, চিঠিপত্রে কিছু সাক্ষ্য আছে। সে যাইহোক, বাঙালি-মুসলমান যে এক বিমিশ্র ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারক, নজরুলের সাহিত্য তারই সাক্ষ্য দ্যায়। নজরুলকে এই ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি বোধের জন্যে কোনো গ্রন্থের কাছে পাঠ নিতে হয়নি, এ তিনি অর্জন করেছিলেন তাঁর সরল ও অকৃত্রিম চেতনাতেই। নজরুলের ঐ চেতনাকে আমি বলবো ‘অপূর্ব স্বজ্ঞাবল’। আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি বিমিশ্র ও জটিল, সেজন্যই ধনী; নজরুলের কবিতা এই বিমিশ্র ও জটিল ঐতিহ্যের ঐশ্বর্যে ঋদ্ধ। তাঁর নিজস্ব ধর্ম-সমাজ বিষয়ে নিঃশব্দ থাকলে নজরুল এতো বড়ো কবি হতেন না; আবহমান বাংলা সাহিত্যের ও দেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি বিস্মৃত হলে নজরুল এতো বড়ো কবি হতেন না। বাঙালি-মুসলমান যেদিন এই বিমিশ্র ও জটিল ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে একক ও সমগ্র অবিচ্ছেদ্য প্রতীতি অর্জন করবে, সেদিন নজরুল ইসলামকে বরণ করে নেবে তাদের আদিপিতা হিসেবে।

SHARE