নতুন ভাবনায় আল্লামা ইকবাল – খুরশীদ আলম বাবু

গত শতাব্দীর চল্লিশ-পঞ্চাশের দিকে বাংলা সাহিত্য সাময়িকীর পাতা খুললেই প্রায়শ ইকবাল সম্পর্কে এমনকি ইকবালের কবিতার অজস্র অনুবাদ সাহিত্য পাঠকের চোখে পড়তো। কিন্তু এখন কদাচিৎ ইকবাল সম্পর্কে লেখা চোখে পড়ে। শুধু ইকবাল সম্পর্কে মুসলমান কবি ও সমালোচকরা লিখেছেন তা নয়, অমিয় চক্রবর্তী থেকে সত্য প্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায়সহ আজকের পশ্চিম বঙ্গের বিশিষ্ট কবি শঙ্খ ঘোষ তার কবিতার অনুবাদ করেছেন। এদের মধ্যে সত্য প্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায় প্রায় একান্নটি (ইকবালের গজলও রয়েছে) কবিতা অনুবাদ করেছিলেন। তার অনুবাদগুলো এক সময় বেশ জনপ্রিয় হয়েছিলো। তবুও তিনি মনে করতেন ইকবাল ছিলেন একজন সাম্প্রদায়িক কবি। তবে এটা কেন মনে করতেন তার যথাযথ ব্যাখ্যা পাই না। পাশাপাশি কবি শঙ্খ ঘোষ তার বিখ্যাত ইকবাল বিষয়ক (প্রবন্ধটির নাম ‘কেন ইকবাল’) প্রবন্ধে ইকবালের গ্রহণযোগ্যতা বিষয়ে বেশ কিছু চমৎকার নান্দনিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার অন্যতম মন্তব্য হলো- নিজের জাতি সত্তার চেনার প্রয়োজনে ইকবালকে জানা প্রয়োজন।
ইকবাল সম্পর্কে আরো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো এই যে, ইকবাল উর্দু ভাষার একজন প্রধান কবি হলেও এগারোটি গ্রন্থের মধ্যে উর্দু ভাষায় তিনটি পূর্ণাঙ্গ এবং একটি অর্ধ কাব্য-গ্রন্থ সৃজন করেছেন। তবে ইকবালের কবিতার আঙ্গিক বিষয়ে আলোচনার চেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে তার দার্শনিকতার বিষয়ে। উর্দু ভাষার আরেকজন বিশিষ্ট বামবাদী চেতনার কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজ ইকবালের দ্বিতীয় কাব্য-গ্রন্থ ‘বাঙ্গে দারা’ (ঘণ্টার ধ্বনি) কে যতটা গুরুত্ব দিয়েছেন দুর্ভাগ্যবশত অন্য কোনো কাব্য-গ্রন্থকে তেমনভাবে গুরুত্ব দেননি। তিনি ইকবাল ভক্ত হয়ে অভিযোগ করেছেন এই বলে- “সমালোচকেরা ইকবালের কবিতার ঐন্দ্রজালিক শিল্পকলা ও প্রকরণের উপর গুরুত্ব না দিয়ে দার্শনিকতা বোধ ও রাজনীতির উপর বেশি জোর দিয়েছেন।” তার মতে ইকবাল উর্দু কবিতায় অর্ধ-ডজনের মত ছন্দ আবিষ্কার করেছেন। আর এটাও কবি হিসেবে আল্লামা ইকবালের অসামান্য কবি প্রতিভারও একটি বিশিষ্ট দিকও বটে, তবে আমার কেন যেন কবি ইকবালকে বর্তমান কালে একজন অবহেলিত কবি বলেই মনে হয়েছে। আমার এই মন্তব্যে অনেকে হয়তো একটু বিস্ময় বোধ করবেন। ইকবাল তার কবিতায় নানা ধরনের দার্শনিক চিন্তা-ভাবনার পরিচয় দিয়েছেন। এতে করে একার্থে ইকবালকে বোঝা একটু কঠিন হয়ে পড়ে। প্রথম পর্বের কবিতাবলিতে ইকবালকে দেখা যাচ্ছে চরমতম ভারতীয় জাতীয়তাবাদী (revivalist) যেখানে “তারানায়ে হিন্দ” (ভারতীয় জাতীয় সঙ্গীত) এর মত জনপ্রিয় কবিতা সঙ্গীতে রূপান্তরিত হয়ে জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছে যান।
একজন তরুণ সমালোচক জানিয়েছেন, ইকবাল মোট পনেরো হাজার শের-এর (পঙক্তি) মধ্যে নয় হাজার ফারসি ভাষায় এবং বাকিটা উর্দু ভাষায় সৃজন করেছেন। তাঁর ধারণা এই কারণেই ইকবালের স্বদেশে তাঁর কবিতার আলোচনা কম হয়েছে। আর আমরা যে অনুবাদ কবিতাবলি পাচ্ছি, সেটাও আবার ইংরেজি অনুবাদের মাধ্যমে। তবুও এই অসুবিধার মধ্যেও অকাল প্রয়াত আশরাফ আলী খান ও কবি ফররুখ আহমদ চমৎকারভাবে তার কবিতার অনুবাদ করে গেছেন। আশরাফ আলী খান ইকবালের কবিতামালাকে তিনভাবে বিভক্ত করেছেন, তিন পর্বের প্রথম পর্বের অধিকাংশ কবিতামালা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য নির্বাচিত হওয়ায়, শেষোক্ত দুই পর্বের কবিতা নিয়ে তেমন আলোচনা হয় না। জগন্নাথ আজাদের মত খ্যাতিমান ইকবাল বিশেষজ্ঞর লেখা বিখ্যাত গ্রন্থ “The Mind and Art of Iqbal” পড়লে এই মানসিকতা বোঝা যায়। পাশাপাশি প্রখ্যাত কলামিস্ট এবনে গোলাম সামাদ মনে করছেন- “ইকবাল কাব্যেও আছে তার দার্শনিক চেতনার পরিচয়। কিন্তু তা যথেষ্ট সুনির্দিষ্ট নয়।” (সূত্র : বাংলাদেশে ইকবাল দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা, বাংলাদেশ: সমাজ সংস্কৃতি রাজনীতি পরিক্রমা, পৃ.-১৭৩)
এবনে গোলাম সামাদের এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করলে ইকবালকে অনেকেই দার্শনিক কবি নামে আখ্যা দিতে ভয় পাবেন। যদিও ইকবাল দর্শনের মেধাবী ছাত্র হলেও দর্শনকে আবার খুব ভয় পেতেন। শোনা যাক স্বয়ং কবি ইকবালের ভাষ্য- “দর্শনশাস্ত্রকে আমি ভয় করি। কেননা দর্শনের এই নীরস নীতি আমার কাছে অপ্রীতিকর বলিয়া মনে হয়। মানবীয় সিদ্ধান্ত যখন ধর্ম বিধানের পরিপন্থী হইয়া দাঁড়ায়, তখনই আমি উহাকে অগ্রাহ্য করিতে বাধ্য হই। যে ভাবের কথা দার্শনিকগণ পছন্দ করেন, সে ভাবের অনেক কথা আমি বলিয়া থাকি বটে, তবে ওই সকল বিষয় আমার ব্যক্তিগত হইতে প্রাপ্ত- দার্শনিক কল্পনার দ্বারা নয়।” (সূত্র: আশরাফ আলী খান রচনাবলী, বাংলা একাডেমি, ১৯৮৯, পৃষ্ঠা-৩৭।)
বলা বাহুল্য, এসব সত্ত্বেও তার কবিতার দার্শনিকতাবোধ অনেকের হৃদয়কে স্পর্শ করেছে, যেমন মুগ্ধ করেছে “Passage to India” নামীয় বিখ্যাত উপন্যাসের সৃজনকারী এডওয়ার্ড মর্গান ফস্টারকে। উল্লেখ্য- ইকবালের মৃত্যুর তিরিশ বছর আগে লন্ডনে অল্প সময়ের জন্য তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিলো। ভারতে এসে তার কবর পরিদর্শন করে গেছেন। তিনি অবশ্য ইকবালের দর্শনের সমর্থক ছিলেন না, তা সত্ত্বেও এই দর্শনের যথার্থতাকে একার্থে স্বীকার করে নিয়েছেন। তিনি বলেছেন সুফিবাদের সঙ্গে আত্ম দৃঢ়করণ নীতি যুক্ত থাকায় তার কবিতাতে বিশিষ্টতা এনেছে। পাশাপাশি তার কবিতার দর্শনকেও আধুনিক বলে মনে করতেন- “…যদি বিদেশী কোন লোক সংক্ষিপ্ত আকারে বলতে যায় তবে এই হচ্ছে ইকবালের দর্শন। ব্যক্তিগতভাবে এ দর্শন আমার মনঃপূত নয়, কিন্তু সে হচ্ছে আলাদা কথা। এ দর্শনের কোথাও অস্পষ্টতা নেই, নেই কোন হেঁয়ালির ধূম্রজাল। এ আমাদেরকে সচকিত করে এবং নিজেদের সম্বন্ধে অবহিত করে। এ দর্শন খ্রিষ্টধর্ম বহির্ভূত; এর থেকেই এসেছে তাঁর কাব্যের প্রেরণা। আঙ্গিকের দিক থেকে গতানুগতিক হলেও তার বিষয়বস্তু আশ্চর্যজনক আধুনিক।” (সূত্র: ইকবাল, ইএম ফস্টার, ইকবাল মানস, পাকিস্তান পাবলিকেশন, ১ম সং, ১৯৬৪, পৃষ্ঠা-৩০)
এই ফস্টার মহোদয় আমাদের এও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন ইকবাল ছিলেন একজন সংগ্রামী চেতনার মানুষ। মুসলমানের সর্বতোভাবে অহং বর্জনকে মনে করতেন পাপের মতো। অতএব সংগ্রাম মুসলমানদের করতে হবে- কারণ পৃথিবীতে মানুষ হচ্ছে খোদার প্রতিনিধি। ফস্টারের বিখ্যাত উপন্যাস Passage to India-তে উর্দু কবি হালির পাশাপাশি ইকবালের উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে ইকবালের কবিতায় দার্শনিকতা বোধ কেবলমাত্র ইসলাম থেকে এসেছে বললে ভুল বলা হবে। কারণ তিনি ছিলেন অসামান্য পড়ুয়া এবং সমকালীনে একজন জ্ঞানী ব্যক্তি। তার পড়ালেখার পরিধি ছিলো বিরাট। বিভিন্ন প্রবন্ধ, বক্তৃতাবলী ও সেই সঙ্গে অসংখ্য চিঠিপত্র পড়লে সেটা বোঝা যায়। আর ছিলো অসামান্য তন্ময়তাবোধ যা তাকে নিয়ে যেত খোদা ভাবনার অতলে। তিরিশের দশকের বিশিষ্ট বাংলা ভাষার কবি অমিয় চক্রবর্তী ছিলেন তার কবিতার অন্যতম ভক্তদের একজন। তিনি স্বয়ং লাহোরে গিয়ে ইকবালের সাথে দেখা করেন, নির্দ্বিধায় স্বীকার করেন- “ইকবাল ছিলেন প্রতিভাধর কবি। তার মত চোস্ত ইংরেজি লেখার ব্যক্তি সারা ভারত বর্ষে একজনও ছিলেন না।” তবে তিনি কবি হিসেবে সব সময় সমালোচনা বহির্ভূত অবস্থায় কাটিয়েছিলেন এটা বললে ভুল বলা হবে। অন্তত এখানে দু’টি ঘটনার উল্লেখ করলে যথেষ্ট হবে। প্রথমত, তার উর্দুতে লেখা ‘আফতাব’ (সূর্য) নামে কবিতা লেখার কারণে সেই সময়কার বিখ্যাত মওলানা আবু মোহাম্মদ সৈয়দ দীদার শাহ তাকে কাফের বলে ঘোষণা করে মন্তব্য করেছিলেন- এই কবিতা যিনি লিখতে পারেন তিনি আর মুসলমান হতে পারেন না। আর দ্বিতীয়ত, শেকোয়া (অভিযোগ) লেখার কারণে একসময় তার জীবন বিপন্ন হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিলো।
তাহলে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে ইকবাল তার সমকালীনে স্ব স্ব সম্প্রদায়ের কাছে চূড়ান্ত ভাবে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব হতে পারেননি। অথচ তিনি সারাজীবন ইসলামকে গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করেছেন। সেই স্বীকারোক্তি দিয়েই ১৯৩০ সালে অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ-এর সভাপতির ভাষণ শুরু করেছেন। এই দীর্ঘ ভাষণকে তার অসামান্য জ্ঞানের বহিঃপ্রকাশ বলা যায়। আমার কেন যেন মনে হয়েছে স্বামী বিবেকানন্দ-এর শিকাগো ঐতিহাসিক ভাষণের চেয়ে অনেক উন্নতমানের। আসলে এটা সত্য, এই ভাষণেই ভারতীয় মুসলমানেরা পেয়ে গেল তাদের সংগ্রামের সুনির্দিষ্ট গন্তব্য। আর কবি ইকবাল হয়ে গেলেন Dreamers of Pakistan নামে খ্যাতিমান। বস্তুতপক্ষে ইকবাল কখনই Dreamers of Pakistan ছিলেন না। তার উজ্জ্বল উদাহরণ, পাকিস্তান প্রস্তাব উত্থাপন হয় ১৯৪০ সালে আর ইকবাল মারা যান ১৯৩৮ সালে। যারা ইকবাল নিয়ে গবেষণা করে থাকেন, তারা বিষয়টি নিয়ে তুলনামূলক আলোচনা করবেন। ইকবালের ঐতিহাসিক সেই ভাষণের কিছু অংশ শোনা যাক-
“… I lead no party; I follow no leader. I have given the best part of my life to careful study of Islam, its law and polity, its culture, its history and its literature. This constant contact with the spirit of Islam, as it unfolds itself in time, has, I think, given me a kind of insight into the significance as a world fact.” (সূত্র: Speeches, Writings and Statements of Iqbal, Compiled and Edited by Latif Ahmed Sherwani, Adorn Publisher and Distributor, New Delhi, 2006.)
এবার আসা যাক ইকবালের কবিতা প্রসঙ্গে। ইকবাল ইসলাম নিয়ে কেবল কবিতা লিখেছেন, দার্শনিক কবি ছিলেন, মুসলমান সম্প্রদায়ের সফলতা কামনা করেছেন এই তথ্য দিয়ে কেবলমাত্র তার কবিতার মূল্যায়ন করা যাবে না। আগেই উল্লেখ করেছি ইউরোপ যাত্রার আগে ইকবাল ছিলেন পুরোপুরি ভারতীয় জাতীয়তাবাদী, আর সেই কারণে তার শিবালয়, হিমালয় ও আফতাবের মত কবিতা সৃজন করেছেন। কিন্তু তিনি ইউরোপের ভোগবাদী চেতনাকে মোটেও গ্রহণ করতে পারেননি, উপরন্তু তিনি ছিলেন সেই চেতনার ঘোরতর সমালোচক। পরবর্তীতে ইসলামের মহান আদর্শে হৃদয়-মন দিয়ে বিশ্বাস স্থাপন করলেন। ধর্মের বিষয়-আশয় নিয়ে কবিতা সৃজন করা বিশ্ব-সাহিত্যে নতুন কিছু নয়, আমাদের কিংবদন্তি কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনূদিত গীতাঞ্জলী তার উজ্জ্বল উদাহরণ। বিশ্ব সাহিত্যে টি. এস. এলিয়ট ক্যাথলিক ধর্মের অনুসারী হওয়ার দ্বিধাহীন চিত্তে ঘোষণা করেছেন। এইজন্য তাকে কঠোর সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছে, এমনটি কখনো শোনা যায়নি। এজরা পাউন্ড জীবনের এক সময়ে চীনের দার্শনিক কনফুসিয়াসের ভক্ত হয়ে পড়েছিলেন। ইয়েটস তো সোলাইমান ও রাণী সেবার উপর কবিতা সৃজন করে আইরিশ সাহিত্যে নতুন জগৎ সৃষ্টি করেছিলেন। এরা সবাই ছিলেন ঐতিহ্যবাদী।
কেবল এজরা পাউন্ড বাদে বাকি তিনজন নোবেল প্রাইজ পেয়েছিলেন। তবে ইকবালের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘আসরারে খুদী’র বাণী পশ্চিমের পাঠকদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় করে তোলে। এই কাব্য-গ্রন্থে তিনি মুসলমানদের নিজের শক্তির বলে বলীয়ান হওয়ার আহ্বান দিয়েছিলেন। পশ্চিমের ধর্মবিমুখ ভাববাদী মনোভাবের দিকে তার কোনো আস্থা ছিলো না। তবে তাদের জ্ঞানমদমত্ত গতিময়তার প্রশংসা করেছেন। এই চেতনা বোধ এতটাই প্রবল ছিলো যে, পশ্চিমের পাঠকেরা বলতে গেলে দিশেহারা হয়ে উঠেছিলো। কালক্রমে আরো কাব্য-গ্রন্থের অনুবাদ হতে শুরু করে, যদিও সমালোচকরা মনে করেন ইকবাল কিছুটা হলেও খ্যাতিমান জার্মান দার্শনিক এই চেতনা গ্রহণে নীটশের কাছে ঋণী ছিলেন। তবে সমালোচকদের এই দাবি সত্য হলেও হতে পরে, মূল পার্থক্য থাকছে অন্য জায়গায়-নীটশে ছিলেন নাস্তিকতাবাদী কিন্তু ইকবাল ছিলেন আস্তিক খোদায়ী সত্তায় পরিপূর্ণ বিশ্বাসী প্রাণ। ‘আসরারে খুদী’র পরতে পরতে তার উদাহরণ ছড়িয়ে আছে। অবশ্য এই কাব্য-গ্রন্থের সফল অনুবাদক ডক্টর নিকলসন তার ভূমিকায় নির্দ্বিধায় স্বীকার করেছেন, অনেক জায়গায় এই কাব্য-গ্রন্থে ব্যবহৃত শব্দ ও বক্তব্যের সঠিক মর্মার্থ তিনি অনুধাবন করতে পারেননি। তবুও তার (নিকলসন) অসামান্য অনুবাদ দক্ষতায় এই কাব্য-গ্রন্থটি পশ্চিমে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা উপার্জিত হয়।
এই কাব্য-গ্রন্থের প্রথম ‘ইঙ্গিতপর্বে’ দেখা যায়- ফারসি কবিদের মত সাকিকে প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেছেন। জীবনে অশান্ত প্রহর থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য খোদার দরবারে প্রার্থনা জানানোর পাশাপাশি জমজম-এর কূপও হয়ে উঠেছে আদর্শবাদী চেতনার প্রতীক। যেমন-
জম্জমের উৎস হতে এক কাত্রা পানি যদি
কেহ করে পান-
যদিও সে সর্বহারা, সার্থক হইবে তা’র
অমৃত সন্ধান।
সুগভীর হবে চিন্তা, দৃষ্টি হবে সুতীক্ষ্ণ করুণ,
মাটির কণিকা হবে পর্বতের শৃঙ্গে দ্বীপ্ত নতুন অরুণ।
(আসরারে খুদী, ইঙ্গিতপর্ব, অনুবাদ, সৈয়দ আলী আহসান)
তবে আমার বলতে দ্বিধা নেই- ইকবালের দ্বিতীয় কাব্য-গ্রন্থ ‘বাঙ্গে দারা’র (প্রথম প্রকাশ-১৯১৫) কবিতাবলী আজও অনেকের মত আমাকে আকর্ষণ করে থাকে। প্রকৃত কবি প্রতিভার স্বাক্ষর এই কাব্য-গ্রন্থে প্রতিটি কবিতায় ঝরে পড়েছে। অবশ্য ইকবালের বয়স যতই বেড়েছে কবিতায় বেড়েছে দার্শনিকতার প্রতাপ। আর সেখানে বিশ্বকালীন মানসিকতা বোধ বেশি কার্যকর হয়েছে। আমার কেন যেন মনে হয়েছে প্রাণের রোম্যান্টিক আকুতিমালা বুদ্ধির প্রকোপে ক্রমশ কমে এসেছে। পরবর্তীতে প্রতিবাদের যে ঝড় বইতে শুরু করেছিলো, তার প্লাবিত রূপ হলো- শেকোয়া ও জওয়াবে শেকোয়া দু’টি দীর্ঘ কবিতায়। তবুও ইকবালকে আমাদের বেশি রোম্যান্টিক বলে মনে হয়েছে। যেমন ‘তারানায়ে মিল্লি’ কবিতায় যখন বলে-
যুগ যুগ ধরে শতবার করা হয়েছে আমার ইমতিহান
সে দিনের কথা মনে আছে কি গো আন্দালুসের হে গুলবাগ?
যে দিন তোমার শাখায় শাখায় বেঁধে মোরা গাহিনু গান।
(অনুবাদ- সত্যপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায়)
কিংবা দেখা যাক তার ‘কিনারে রাভী’ (রাভী নদীর তীরে) কবিতার কিছু অংশ-
বিকেলের স্তব্ধতায় রাভী নদী হয়েছে চঞ্চল
এখন হৃদয়ে তার সংগীতের সুর
চেওনা জানাতে কভু কি করে এই হৃদয়ের সাথে
এক সুরে হলো ভরপুর।
কোমল সুরের দোলা, আন্দোলিত এখানে এখন
ডাক এলো প্রার্থনার তার
পৃথিবীকে মনে হয় আল্লাহর এবাদত খানা
চারিদিকে রয়েছে যা ভাব
চঞ্চল নদীর তীরে দাঁড়ায়ে রয়েছি একা
জানি না কোথায় আছি আজ
আমার অস্তিত্ব ভুলে গতকাল নদীর কিনারে
শুনি মিহি সুরের আওয়াজ।
(অনুবাদ- মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ)
একার্থে এই কাব্য-গ্রন্থে কবি ইকবালের রোম্যান্টিকতা নানাবিধ ধারায় প্রবাহিত হয়েছে। সত্যি বলতে কি ইকবাল উর্দু কবিতার খোল-নলচে পাল্টে দিয়েছেন। কারণ তার সমসাময়িক কবিদের মধ্যে শুধু নয়, পূর্ববর্তী কবিদের তুলনায় অসম্ভব জ্ঞানী ও সেই সংগে মননশীলতার শিখর স্পর্শ করেছিলেন। অকাল প্রয়াত কবি আশরাফ আলী খান অনেকটা ঠিকই ধরেছিলেন- “মহাকবি হালী এবং আকবরের পর মওলানা শিবলীর স্থান ছিলো। কিন্তু এই নতুন দার্শনিক কবির আবির্ভাবে মওলানা সাহেবের দীপ্তি চন্দ্রালোকের ন্যায় নিষ্প্রভ হইয়া গেল। প্রতিভা স্বভাবসত্ত মানুষ সেটা গড়িয়া লইতে পারে না। এই প্রবচনটি স্যার মোহাম্মদ ইকবাল জীবনে বেশ সুন্দর ভাবে খাটিয়া যায়।” (সূত্র: আশরাফ আলী খান রচনাবলী, বাংলা একাডেমি-১৯৮৯।)
প্রয়াত আশরাফ আলী খানের এই অসামান্য মতামতের বিপক্ষে আমাদের বলার কোনো কিছু নাই। এস ওয়াজেদ আলী মনে করেন- ইকবাল দর্শনের চর্চায় নানা দেশ, তীর্থ দর্শন করেছেন। এক সময় বেদান্ত দর্শনের দিকেও ঝুঁকে ছিলেন। তার প্রথম দিককার বয়সের কবিতায় বেদান্তের ও হেগেলের যথেষ্ট প্রভাব দেখা যায়। পরিণত বয়সে কিন্তু ইসলামের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। পাশাপাশি আবার ইংরেজি কবিতার প্রভাবও তার উপর পড়েছিলো। এই সূত্রের পাশাপাশি আর একটি সূত্র উল্লেখ করতে চাই সেটি হলো এই যে, ইকবাল ইংরেজ কবি মিল্টনের ‘প্যারাডাইজ লস্ট’ পড়ে বহুদিন ধরে সেই আঙ্গিকে একটি কাব্য-গ্রন্থ লেখারও পরিকল্পনা করেছিলেন। সেই পরিকল্পনার ফসল হলো ‘জাভেদ নামা’ কাব্য-গ্রন্থটি। সমালোচকেরা অবশ্য দান্তের ‘ডিভাইন কমেডি’র সাথে তুলনা করেছেন। আসলে হালী আকবর, শিবলীর মত উর্দু কবিদের সেই সুযোগ হয়নি। পাশাপাশি এলিয়ট কথিত ঐতিহ্য চেতনাকে কবিতায় কাজে লাগিয়েছেন। তবে তার চেতনা অন্যান্য বিখ্যাত ইংরেজি কবিদের মত কখনই দুঃখবাদী, কিংবা অশান্ত ও ধোঁয়াশে নয়। তিনি ছিলেন পুরোপুরি গতিবাদের সমর্থক। তার একটি কবিতায় পাচ্ছি-
দুর্বার তরঙ্গ এক ব’য়ে গেল তীর-তীব্র বেগে,
বলে গেল : আমি আছি, যে মুহূর্তে আমি গতিমান;
যখনি হারাই গতি সে মুহূর্তে আমি আর নাই॥
(অনুবাদ- ফররুখ আহমেদ)
আরেক পঙক্তিতে বলেন-
ব্যক্তির প্রাণ সমাজ সঙ্গ
আর কিছুতেই নয়,
সিন্ধু-বক্ষে বাঁচে তরঙ্গ
আর কিছুতেই নয়॥
(অনুবাদ- ফররুখ আহমেদ)
তবে শেষাবধি একটি প্রশ্ন উত্থাপন করে এই প্রবন্ধ শেষ করবো সেটি হলো এই যে, আগের তুলনায় বাংলাদেশে ইকবাল চর্চা কম হচ্ছে কেন? আমি আগেই বলেছি ইকবালের কবিতাবলী ভুলবশত রাজনীতির সাথে জড়িয়ে গেছে। ১৯৩০ সালে এলাহাবাদে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সভাপতি হিসেবে পাকিস্তানের রূপরেখা প্রদান করে যে অবিস্মরণীয় ভাষণ দেন তখন থেকে ‘Dreamers of Pakistan’ বলে তিনি বেশি পরিচিতি পেয়েছিলেন। সমালোচকদের ধারণা এই ভাষণ না দিলে তার ‘তারানায়ে হিন্দ’ কবিতাটি হয়তো ভারতীয় জাতীয় সংগীত মর্যাদা পেত। স্বয়ং উর্দুভাষী জওহর লাল নেহেরু তার কবিতার ভক্ত ছিলেন। একবার লাহোরে ইকবালের বাড়িতে দেখা করতে গিয়েছিলেন। তবে তাদের মধ্যে কী কথাবার্তা হয়েছিলো তা জানা যায় না। আমি আগেই বলেছি তার কবিতার রস আস্বাদন করতে হলে উর্দু ও ফারসি ভাষায় দক্ষতা থাকা দরকার। তাই ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ পড়ে তার কবিতার তাৎপর্য বোঝা একটু দুষ্কর। এই দুই ভাষা কেবল এখন বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক হওয়ায় ইকবালে কবিতার গবেষণা তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। তবে সেই গবেষণা নিতান্তই একাডেমিক। আজকের তরুণদের কাছে আদর্শবাদী কবি হিসেবে গ্রহণ করার ক্ষমতা ক্রমশ কমে আসছে। সাংবাদিক ও কলামিস্ট মাসুদ মজুমদার সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করে লিখেছেন-
“There was a time when Iqbal was being done in a limited form at the drowing room of the pandits, at the high stage speechual, gatherings at the religious speech, function and with in the narrow space of the text books. Even then this was used in Pakistan.

(সূত্র : আবদুল ওয়াহিদ সম্পাদিত, ইকবাল স্টাডিজ, অক্টোবর-ডিসেম্বর ১৯৯৮ সংখ্যা, পৃষ্ঠা-১৩৩)
তাহলে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে আল্লামা ইকবাল এখন অবধি আমাদের কাছে অপরিচিত কবি হিসেবেই থেকে যাচ্ছেন, কারণ আমাদের বড় বড় কবিরা (আল মাহমুদ ও সৈয়দ শামসুল হক বাদে) কবিদের কবিতায় প্রবন্ধে ইকবালের কোনো প্রসঙ্গই দেখি না। ইকবালে কবিতার আস্বাদ পেতে হলে মূল ভাষার চর্চা আগের তুলনায় বাড়াতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। সে সম্ভাবনা এখন আগের তুলনায় খুব কম তা বলাই বাহুল্য।

পরিশিষ্ট:
১. আল্লামা ইকবালকে যে কবিতার জন্য তার সময়ে বিখ্যাত মওলানা আবু মোহাম্মদ দিদার শাহ কাফের বলে ঘোষণা করেছিলেন, সে কবিতার নাম ‘আফতাব’ (সূর্য), কবিতাটির অনুবাদ করেছিলেন সত্য প্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায়। এই কবিতার শিরোনামের নিচে লেখা ছিলো ‘গায়ত্রি মন্ত্রের অনুবাদ’। বলা বাহুল্য সেটাই ছিলো তাঁর ক্ষোভের কারণ। তার কিছু অংশ পাঠকদের উদ্দেশে তুলে ধরলাম।
সব বস্তুর জীবনের হও তুমি হে পালক একা-
দেবদূতগণ প্রধানের তাজ তোমার শীর্ষে লেখা।
নাহিক তোমার সূচনা কোথাও নাহি এ অবসান
শুরু ও শেষের বন্ধন হতে তুমি মুক্ত মহান।
(অনুবাদ- সত্য প্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায়)
‘আফতাব’ শব্দটি আমাদের বাংলা কবিতায় খুব একটা দেখা যায় না। ইকবাল ভক্ত কবি ফররুখের একটি কবিতায় এই উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে। কবিতাটি কয়েকটি পঙক্তিমালা চয়ন করে দিলাম-
জংগী জোয়ান দাঁড় ফেলে করি দরিয়ার পানি চাষ,
আফতাব ঘোরে মাথার উপরে মাহ্তাব ফেলে দাগ;
তুফান ঝড়িতে তোলপাড় করে কিশ্তীর পাটাতন;
মোরা নির্ভীক সমুদ্র স্রোতে দাঁড় ফেলি বারো মাস।
(সাত সাগরের মঝি, সিন্দবাদ)

২. আমাদের প্রকাশনা শিল্পে ইকবাল অনূদিত কবিতামালা সংকলন নতুন করে প্রকাশিত হচ্ছে, এটা ইকবালপ্রেমীদের জন্য রীতিমত সুখবর বটে। কিন্তু, তথ্যগত বিভ্রাট দেখি তখন একটু বিস্ময় বোধ করি। যেমন বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র প্রকাশনা থেকে কবি গোলাম মোস্তফার অনূদিত ইকবালের ‘শেকওয়া ও জওয়াবে শেকওয়া’ গ্রন্থের ভূমিকায় যখন আহমদ মাযহার লিখেন-
“বাংলায় ইকবালের যে ক’টি কাব্য অনূদিত হয়েছে তার মধ্যে শেকওয়া ও জওয়াবে শেকওয়া অনূদিত হয়েছে বেশি। শেকওয়া ও জওয়াবে শেকওয়ার কয়েকজন উল্লেখযোগ্য অনুবাদক হচ্ছেন মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, গোলাম মোস্তফা, ফররুখ আহমদ, সৈয়দ আলী আহসান, মনিরুদ্দীন ইউসুফ। এদের মধ্যে গোলাম মোস্তফার অনুবাদ ছন্দময়তা, বাণীকারুময়তা, স্বচ্ছতায় ও প্রজ্বলতায় অসাধারণ।”
এই সমস্ত অনুবাদকের মধ্যে আশরাফ আলী খানের বাদ পড়াটা রহস্যময় মনে হচ্ছে। কারণ আশরাফ আলী খান ছিলেন ইকবালের প্রথম সফল অনুবাদক। তার অনুবাদকেই সমালোচকেরা এ যাবৎ কালের সেরা বলেই ব্যাখ্যায়িত করেছেন। ইকবালের শেকওয়া অনুবাদের ইচ্ছে ছিলো কবি কাজী নজরুল ইসলামের। তিনি সেটা করতে না পারলেও স্বরবৃত্ত ছন্দে অনুবাদ করে আশরাফ আলী খান। তার অনুবাদটি উৎসর্গ করেন কবি কাজী নজরুল ইসলামকে। সাংগঠনিক ও সাহিত্যিক আবুল কালাম শামসুদ্দীন তার ‘অতীত দিনের স্মৃতি’ গ্রন্থে এই অনুবাদের জোরালো প্রশংসা করেছেন। তবু এই ভূমিকায় বেশ কয়েক জায়গায় চমৎকার উক্তি করলেও সেখানেও রয়েছে রাজনীতি তাড়িত চেতনা। শোনা যাক-
“তবে কবি ইকবালের চেয়ে পাকিস্তানের স্বপ্নস্রষ্টা ইকবাল ছিলেন সেই আলোচনার প্রধান বিষয়। অথচ দার্শনিকতা ও কবিত্ব এই দুই করণেই ইকবাল রবীন্দ্রনাথের মতোই প্রাসঙ্গিক এই উপমহাদেশের মানুষের কাছে। তাই পাকিস্তানের চেতনামুক্ত এই বাংলাদেশে ইকবালের কবিত্ব ও দার্শনিকতা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা শিক্ষিত বাঙালির কাম্য। না হলে অন্তত একজন মহৎ কবির ঋদ্ধিমান পৃথিবী থেকে বঞ্চিত থাকবো।” (সূত্র: শিকওয়া ও জওয়াবে শিকওয়া, গোলাম মোস্তফা, বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র সংস্করণ, ১৯৯৪)
স্বাধীন বাংলাদেশে এখন কেউ আর পাকিস্তানি চেতনা নিয়ে ইকবালকে বিশ্লেষণ করবেন এটা কি ভাবা যায়?

৩. ইকবালের প্রথম কাব্য-গ্রন্থ ‘আসরারে খুদী’ (Secret of Self) অনুবাদক ছিলেন Reynald A Nicolon, তিনি এই অনুবাদ করেছিলেন মূল ফারসি থেকে। তার অনুবাদের দক্ষতা এই মনোমুগ্ধ করেছিলো যে, পাঠকদের কাছে ইকবালের কবি প্রতিভা চমৎকার উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। তবুও এই কাজ গ্রন্থ অনুবাদ করতে গিয়ে তাকে কিছু সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। তাই কিছু উল্লেখ পাচ্ছি তার অসামান্য ভূমিকায়, শোনা যাক-
“Often, however, the ideas themselves, being associated with peculiarly Oriental ways of thinking, are hard for our minds to follow. I am not sure that I have always grasped the meaning or rendered it correctly; but I hope that such errors are few…” (সূত্র: Introduction, p-xi, Reprint 1950, Shah Muhammad Asraf, Kashmir Bazar, Lahore

৪. বিশিষ্ট কলামিস্ট এবনে গোলাম সামাদ মনে করেন- “ইকবাল কবিতা চর্চা আরম্ভ করেছিলেন উর্দুতে। পরে উর্দু ভাষাকে পরিত্যাগ করে ফারসিতে কাব্য চার্চা শুরু করেন। কারণ তার মনে হয়েছিলো উর্দু যথেষ্ট উন্নত ভাষা নয়। কেবলমাত্র ফারসি ভাষার মাধ্যমেই তিনি যথাযথভাবে পারেন তার মনের সূক্ষ্ম অনুভবসমূহকে প্রকাশ করতে।” (সূত্র: বাংলাদেশে ইকবাল দর্শনের প্রাসংগিকতা, বাংলাদেশ : সমাজ সংস্কৃতি রাজনীতি পরিক্রমা, পৃ.-১৭৪)
এবনে গোলাম সামাদ সাহেব কোন জায়গায় পেলেন ইকবাল উর্দু ভাষা যথেষ্ট উন্নতমানের নয় বলে মনে করেছিলেন? ইকবাল আসলে চেয়েছিলেন আঞ্চলিক ভাবে বেশি পাঠকের কাছে যেতে। তা কেবল হিন্দুস্তানের নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে সেটা তিনি কখনো চাননি। আসলে আফগানিস্তান পেরিয়ে ইরান-তুরানসহ এশিয়ার বৃহৎ পরিসরে এমনকি ইউরোপ পর্যন্ত পৌঁছে যাবার ইচ্ছায় ফারসিকে গ্রহণ করেছিলেন শক্ত হাতে। সমালোচকদের ধারণা- হয়তো এই জন্য খোদ স্বদেশেই ইকবাল চর্চা একটু কমে আসলেও ইরানে কিন্তু ব্যাপক ইকবাল চর্চা হয়ে থাকে। সে দেশে তিনি ইকবাল লাহোরি নামে পরিচিত।

৫. ভারত ও পাকিস্তান ভাগ হবার পর পরই ভারতের কিছু লেখক-রাজনীতিকরা ইকবালকে মৌলবাদী কবি হিসেবে আখ্যায়িত করতে থাকেন। অথচ ইকবাল ছিলেন একজন বিশাল দেশপ্রেমিক। আসলে তিনি চেয়েছিলেন মুসলমানদের জন্য আলাদা সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্য। ইকবাল সম্পর্কে চমৎকার বিশ্লেষণ করেছেন ভূপালের প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ কমরুল হাসান। উল্লেখ করা দরকার এই ভূপালেই ইকবাল চিকিৎসার জন্য নবাব হামিদুল্লাহর রাজপ্রাসাদে বেশ কিছুদিন অবস্থান করেছিলেন। এখনো সেই রাজপ্রাসাদের সামনে ইকবালের সম্মানার্থে একটি বাজ পাখির প্রতিকৃতি তৈরি করেছেন একজন বিখ্যাত ভাস্কর্য শিল্পী জগদীশ স্বামী নাথান। শোনা যাক কমরুল হাসানের সেই হতাশাবোধক মন্তব্য- “আল্লামা ইকবাল ‘তারানায়ে হিন্দি’ লিখেছিলেন ১৯০৫ সালে। যিনি স্বামী রামতীর্থ, রাম, হামারা দেশ, নানক সম্বন্ধে লিখেছেন, তিনি হলেন ফির্কাপুরস্ত! যার শবযাত্রায় লাহোরে প্রায় ৮০ হাজার মানুষ, হিন্দু-মুসলমান-শিখ সবাই যোগ দিয়েছিলেন- তিনি হলেন ফির্কাপুরস্ত! যিনি প্রথম শ্লোগান দেন ইনকিলাব জিন্দাবাদ তিনি হলেন ফির্কাপুরস্ত! আপনি জানেন সাহিত্য সেবার জন্য দুইজন মনীষীকে ব্রিটিশ সরকার নাইটহুড উপাধি দিয়েছিলেন- একজন টেগর আর দ্বিতীয়জন হলেন আল্লামা ইকবাল। ইকবালও টেগরের মতো নাইটহুড পরিত্যাগ করেন। (সূত্র: ধূসর ক্যানভাস, তরুণ কুমার ভাদুড়ী, শারদীয় দেশ ১৪০৩ সংখ্যা, পৃ.-৯৫।)
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও সাহিত্য সমালোচক

SHARE

Leave a Reply