নতুন ভোরের প্রত্যাশায় স্বপ্নচারী সেনানীরা -সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা

বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে মরণপণ মুক্তিসংগ্রামের মাধ্যমে আমরা কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা অর্জন করেছি। কিন্তু একশ্রেণির রাজনীতিকের ধারাবাহিক ব্যর্থতার কারণেই আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্নগুলো আজও অধরায় রয়ে গেছে। আমাদের স্বাধীনতার মূল চেতনায় ছিল উদার গণতন্ত্র। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে আমাদের সংবিধানেও বহুদলীয় গণতন্ত্রের স্বীকৃতি মিলেছে। কিন্তু স্বাধীনতার পাঁচ দশকেও আমরা কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারিনি; প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি আমাদের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ। বস্তুত, গণতন্ত্রের মূল কথা হলো ব্যক্তিস্বাধীনতা, নানাবিধ অধিকার এবং শাসিতের সম্মতি-সাপেক্ষে গঠিত সরকার।

নাগরিক জীবনের পৌর ও রাষ্ট্রিক অধিকারের স্বীকৃতি, আইনের শাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের গণতান্ত্রিক বিধি-ব্যবস্থার সঙ্গে উদারনীতির সুসংঘবদ্ধ সম্পর্ক হলো এই প্রত্যয়ের মূল কথা। অবশ্য কালের বিবর্তনে গণতন্ত্রে বিবর্তন হয়েছে; এসেছে পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জনও। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মিশ্র অর্থনীতি ও গণতান্ত্রিক পরিকল্পনা অবাধ বাণিজ্যের স্থান অধিকার করেছে। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে আমাদের অর্জন যৎসামান্যই। সঙ্গত কারণেই আমরা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় খুব একটা সাফল্য দেখাতে পারছি না বরং ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছি। কিন্তু আশাহত হননি স্বপ্নচারীরা। তারা এখনও মরুপ্রান্তরকে পুষ্পকাননে সুশোভিত করতে চান; আশায় বুক বাঁধেন এক স্বপ্নিল প্রভাতের প্রত্যাশায়।

মূলত, স্বাধীনতার চেতনার ক্ষেত্রে প্রথম যা বিবেচ্য তা হচ্ছে আমাদের নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য রক্ষার প্রশ্ন। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর হাতে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও স্বতন্ত্র-সত্তা হুমকির সম্মুখীন হয়েছিল। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের আত্মত্যাগ এবং উর্দুর সমান্তরালে বাংলা ভাষাকেও পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতির দাবি আদায় এর দৃশ্যমান উদাহরণ। বস্তুত ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমেই আমাদের স্বাধিকারের চেতনার উন্মেষ ঘটে এবং ১৯৭১ সালে তা ফুলে-ফলে সুশোভিত হয়ে মুক্তিসংগ্রাম এবং বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ নামের নতুন রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের পথকে সুগম করে।

মূলত পাক শাসকগোষ্ঠীর স্বৈরাচারী ও অগণতান্ত্রিক মানসিকতার কারণেই পাকিস্তানের রাজনীতিতে এক অস্বস্তিকর অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। তারা ১৯৭৩ এর সাধারণ নির্বাচনের পর সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে গরিমসি করে। ফলে পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে পূর্ব পাকিস্তানের সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। এক সময় সর্বাত্মক মুক্তি সংগ্রামে রূপ নেয়। ফলশ্রুতিতে বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। মূলত গণতান্ত্রিক চর্চার অভাবেই দুই পাকিস্তান এক ও অভিন্ন থাকতে পারেনি। কিন্তু স্বাধীনতার পাঁচ দশক অতিক্রান্ত হলেও আমাদের দেশে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এখনও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। ফলে দেশে গণতন্ত্রের নামে জুলুমতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অভিযোগ জোরালো ভিত্তি পেয়েছে। সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার, আইনের শাসন ও উদারনৈতিক গণতন্ত্র আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম চেতনা হলেও উড়নচণ্ডী রাজনীতির কারণেই সে অবস্থার বিচ্যুতি ঘটেছে। ফলে স্বাধীন দেশে সুশাসনের আশাবাদ এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে।

স্বাধীনতার অন্যতম চেতনার একটি ছিল বৈষম্যের অবসান। পশ্চিমী শাসকচক্র আমাদেরকে সরকারি দায়িত্বপূর্ণ পদ ও কর্তৃত্বের ক্ষেত্রে অবমূল্যায়ন করেছে শুরু থেকেই। তাদের পক্ষপাতমূলক আচরণ, অবিচার, নির্যাতন, নিপীড়ন, শোষণ ও বঞ্চনার ফলে আমরা পাকিস্তানের অন্য নাগরিকদের তুলনায় নিজেদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক মনে করতে বাধ্য হয়েছিলাম। ফলে পূর্ব পাকিস্তানিদের মধ্যে একটা গণঅসন্তুষ্টির সৃষ্টি হয়।
আমাদের কাছে এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, নিজস্ব স্বকীয়তা রক্ষা, বৈষম্যের অবসান এবং নানা ধরনের সামাজিক অন্যায়-অবিচার থেকে মুক্তির জন্য আমাদের একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রকাঠামো প্রয়োজন; যার শাসন ও পরিচালন ভার নিতে হবে আমাদের নিজেদের হাতেই। ফলে এক অনিবার্য বাস্তবতায় সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমেই পাকিস্তান ভূখণ্ডের পূর্ব পাকিস্তান অংশ আলাদা হয়ে একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের অভ্যুদয় ঘটেছিল।

অবাধ গণতন্ত্র ও জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবিতেই আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল। দীর্ঘ নয় মাসের মুক্তি সংগ্রামের মাধ্যমে আমরা সেই কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা অর্জন করেছি। কিন্তু যে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকে সামনে রেখে আমরা মরণপণ মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম সেই গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ আজও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পায়নি। নেতিবাচক ও ক্ষয়িষ্ণু রাজনীতির কারণে আমাদের দেশে গণতন্ত্র বারবার হোঁচট খেয়েছে। গণতন্ত্রের সুবিধাবাদী ব্যাখ্যার কারণে নাগরিকরা গণতন্ত্রের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। মধ্যস্বত্ব ভোগ করছে একশ্রেণির মতলববাজ ও সুবিধাবাদী রাজনীতিক। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ক্ষেত্রে নতুন আশাবাদের সৃষ্টি হলেও রাজনৈতিক চৌর্যবৃত্তির কারণে সে অর্জনও ধরে রাখা সম্ভব হয়নি বরং ১/১১ এর অঘটনের মাধ্যমে আমাদের সে অর্জন শূন্যে মিলিয়ে গেছে। সাথে সাথে গণতন্ত্রের ভাগ্যাকাশে নেমে এসেছে দুর্যোগের ঘনঘটা। আর তা ক্রমেই আরও ঘনীভূতই হচ্ছে।

জনগণের ম্যান্ডেটের পরিবর্তে স্থলাভিষিক্ত হয়েছে সাজানো, পাতানো ও প্রহসনের নির্বাচনের সংস্কৃতি। সে ধারাবাহিকতায় ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদের তামাশা ও ভাঁওতাবাজির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কথিত নির্বাচনে ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে ১৫৪ আসনে সরকারদলীয় প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। বাদবাকি আসনগুলোতে ভোট কেন্দ্রগুলোতে ভোটার খরা ছিল রীতিমতো চোখে পড়ার মত। শুধুমাত্র ঢাকা সিটির ২৯টি কেন্দ্রেই কোন ভোটারকে ভোটকেন্দ্রে ভোট প্রদান করতে দেখা যায়নি। কিন্তু ভোট গণনায় ভোটের কোন অভাব হয়নি। একদলীয় নির্বাচনে সরকারদলীয় প্রার্থীরা নির্বাচন কমিশনের তেলেসমাতিতে ব্যাপক সংখ্যক ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। আমাদের চরম দুর্ভাগ্য যে, এমন প্রহসনের সংসদও সফলভাবে মেয়াদ উত্তীর্ণ করতে সক্ষম হয়েছে। যা জাতি হিসেবে আমাদের সকল অর্জনকেই ম্লান করে দিয়েছে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিরোধীরা অংশগ্রহণ করায় যদিও নতুন আশাবাদের সৃষ্টি হয়েছিল। আশা করা হয়েছিল যে, এই নির্বাচনে জনমতের প্রতিফলন ঘটবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের পিছু ছাড়েনি। অংশগ্রহণমূলক হওয়ায় কেউ কেউ এই নির্বাচনকে স্তালিনগ্রাদের প্রতিরোধ যুদ্ধের সাথে তুলনা করেছিলেন। যদিও স্তালিনগ্রাদের প্রেক্ষাপট ও আবহ আমাদের নির্বাচন যুদ্ধের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। এ কথা ঠিক যে, নানা প্রতিকূলতা ও সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বিরোধী দল নির্বাচনে অংশ নিতে বাধ্যই হয়েছিল বলা যায়। স্তালিনগ্রাদে সোভিয়েত বাহিনীর ক্ষেত্রেও তেমনটিই হয়েছিল।

কারণ, জার্মান বাহিনী একে একে সোভিয়েতের অনেক ভূখণ্ড দখল করে নিয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত নাৎসি বাহিনী স্তালিনগ্রাদেও আক্রমণ করে বসেছিল। তাই অস্তিত্বের প্রশ্নেই লাল বাহিনী জার্মান বাহিনীর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলতে বাধ্য হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত জার্মানির সিক্সথ আর্মিকে ফাঁদে ফেলে সোভিয়েত সেনাবাহিনী যুদ্ধে জয়লাভ করে। প্রেক্ষাপট বিবেচনায় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বিরোধী দলের স্তালিনগ্রাদের প্রতিরোধের সাথে তুলনা করেছিলেন কেউ কেউ। কিন্তু তাদের সে আশাবাদ বাস্তবরূপ পায়নি বরং গণতন্ত্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের কাছে এই প্রতিরোধও পরাস্ত হতে বাধ্য হয়েছে। যা গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষকে আশাহতই করেছে।

সার্বিক দিক বিবেচনায় একাদশ জাতীয় নির্বাচনে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতিফলন যেভাবে হওয়া উচিত ছিল তা হয়নি। এমনকি কথিত এই নির্বাচনকে দেশী ও আন্তর্জাতিক মহলে ‘মিডনাইট ইলেকশন’ হিসেবেই আখ্যা পেয়েছে। এ বিষয়ে ভারতের কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ এর সে সময় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের কিয়দংশ উল্লেখ করা যেতে পারে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘২৮৮ আসনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট জয়লাভ করলেও বিরোধীরা ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলে পুনরায় নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানিয়েছে। ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেনি বলে অভিযোগ করা হয়েছে। প্রধান বিরোধী জোটের নেতা এই নির্বাচনকে প্রহসন উল্লেখ করে তা বাতিলের আহ্বান জানিয়েছেন। অনেক পোলিং এজেন্ট জানিয়েছে তারা ভয়ে কেন্দ্র থেকে দূরে ছিলেন। আবার অনেকে অভিযোগ করেন তাদের মারধর করে কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।….. এমনকি ক্ষমতাসীন দলের নেতারা ব্যালটে সিল মেরে ব্যালটবাক্স ভরাট করেছে। একজন নারী ভোটার দাবি করেন, পুলিশ তাদের স্বাধীনভাবে ভোট দিতে দেয়নি। পুলিশ বলেছে যদি নৌকায় ভোট দেয় তাহলেই কেবল ভোট দিতে পারবে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, শেখ হাসিনার ক্ষমতা দিন দিন শক্তিশালী হয়ে উঠেছে এবং দেশটি একদলীয় শাসনে পরিণত হতে চলেছে।

আমাদের দেশে নির্বাচনে অনিয়ম নিয়ে অভিযোগ নতুন কিছু নয়। তা অতীতে ছিল, এখনও আছে, হয়তো আগামী দিনে হয়তো আরও জোরালো হবে। অতীতে নির্বাচনে ‘সূক্ষ্ম’ ও ‘স্থুল’ কারচুপির অভিযোগ ছিল বহুল আলোচিত। ভোট গণনায় অনিয়ম, নির্বাচনী কর্মকর্তাদের পক্ষপাতিত্ব, একজনের ভোট আরেকজন দেয়ার অভিযোগ অতীতেও শোনা গেছে। কোন কোন ক্ষেত্রে কেন্দ্র দখল করে বিশেষ প্রার্থীর পক্ষে গণহারে সিল মারার অভিযোগেও কোন অভিনবত্ব নেই। কিন্তু সারাদেশেই ভোটারদের ভোটদানে নিরুৎসাহিত করা, পোলিং এজেন্ট দিতে বাধা প্রদান, ক্ষেত্র বিশেষে মারধর বা প্রায় সকল কেন্দ্র দখল করে নিয়ে গণহারে সিল মারার ব্যাপক অভিযোগ সর্বসাম্প্রতিকই বলতে হবে। কিন্তু এসব অভিযোগ খণ্ডনের কোন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো। ফলে অভিযোগগুলো জোরালো ভিত্তি পাচ্ছে। ঘটনার ধারাবাহিকতায় আমাদের বৈশ্বিক গণতান্ত্রিক সূচকে অবনমন ঘটছে তা অনেকটাই স্পষ্ট।

এ কথা আরও জোরালো ভিত্তি পেয়েছে লন্ডনভিত্তিক সাময়িকী ‘দ্য ইকোনমিস্ট-এর ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ)’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনের মাধ্যমে। সংস্থাটি ১৬৫টি দেশে জরিপ পরিচালনা করে দেখায় যে, গণতন্ত্রের সূচকে বাংলাদেশের অবনতি হয়েছে। ২০১৬ সালে যেখানে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৮৪তম সেখানে ২০১৭ সালে ৮ ধাপ নিচে নেমে হয়েছে ৯২তম। আগের বছরের মতো এবারও সূচকে বাংলাদেশ ‘হাইব্রিড শাসনব্যবস্থার’ বিভাগের মধ্যেই রয়েছে। অর্থাৎ ২০১৮ সালে এসে সে সূচকের আরও অবনতি ঘটেছে। ‘হাইব্রিড’ বলতে এমন শাসন ব্যবস্থাকে বোঝায়, যেখানে প্রায় অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়। নির্বাচনে জনমতের প্রতিফলন উপেক্ষিত থাকে। স্বাধীনতা অর্জনের প্রায় অর্ধশতাব্দী পরেও এমন অপবিশেষণে বিশেষিত হওয়া আমাদের জন্য হতাশারই বলতে হবে।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ ও লালন করে সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুরাষ্ট্রের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’। অর্থাৎ বাংলাদেশের জনগণের নিজেদের শাসন করার অধিকারসহ একটি সার্বভৌম ভূখণ্ড, যেখানে বাংলাদেশীরা নিজেদের বৈশিষ্ট্য ও স্বকীয়তা নিয়ে সব ধরনের বৈষম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচার পরিপন্থী কর্মকাণ্ড থেকে মুক্ত থাকবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও তার ভিত্তিতে সৃষ্ট বাংলাদেশের দু’টি প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে-
প্রথমত, বাংলাদেশ হবে জনগণের এবং জনগণের দ্বারা পরিচালিত দেশ। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ হবে সব ধরনের বৈষম্যমুক্ত, অন্যায়, অবিচার ও শোষণমুক্ত; অর্থাৎ সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক গণপ্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র। আমাদের সংবিধানেও এ চেতনার উপস্থিতিও বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়। সংবিধানের প্রস্তাবনার তৃতীয় প্যারায় বলা হয়েছে,
আমরা আরও অঙ্গীকার করিতেছি যে, আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হইবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা, যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে। অনুচ্ছেদ ১-এ বলা হয়েছে, বাংলাদেশ একটি একক, স্বাধীন ও সার্বভৌম প্রজাতন্ত্র, যাহা ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ নামে পরিচিত হইবে। ৭ অনুচ্ছেদের দফা-১ এ বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্ব কার্যকর হইবে।’
সাংবিধানিকভাবেই বাংলাদেশ জনগণের রাষ্ট্র; জনগণ সকল ক্ষমতার মালিক; তারা নিজের দেশ নিজেরাই শাসন করার অধিকার সংরক্ষণ করে। তাই সংবিধান অনুযায়ী জনগণ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করার বিষয়ে ক্ষমতাবান। এই প্রতিনিধিদের একটি অংশ তাদের হয়ে ক্ষমতা প্রয়োগ করে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে। অন্য অংশ জনগণের হয়ে সংসদের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার কার্যক্রমের ভুলত্রুটি তুলে ধরে শাসকদের জবাবদিহির আওতায় আনবে। জনগণ এ প্রক্রিয়া শুধু সরকার গঠনে নয়, তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণে সক্ষম হবে।

এ পদ্ধতিকে কার্যকর ও ফলপ্রসূ করার জন্য অত্যাবশ্যকীয় শর্ত হলো অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধি নির্বাচন। এর পরপরই প্রয়োজন কার্যকর সংসদ; যেখানে একটি শক্তিশালী বিরোধী দলের উপস্থিতির আবশ্যকতাও অনস্বীকার্য। বস্তুত, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রাধান্য লাভ করে এবং সম্পদের সুষম বণ্টন; অন্যায়, অবিচার, শোষণ, নিষ্পেষণ হ্রাস পায়; মানবাধিকার, বাকস্বাধীনতা সভা-সমাবেশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থানটা একেবারেই তলানিতেই বলতে হবে।

গণতন্ত্রকে সঙ্কটমুক্ত করে একটি শোষণ ও বঞ্চনামুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠাই ছিল স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম চেতনা। আর সে চেতনার ভিত্তিতেই আমাদের দেশ একটি গণপ্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র। কিন্তু একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের যেসব বৈশিষ্ট্য থাকা বাঞ্ছনীয় অনেক ক্ষেত্রেই তার বিচ্যুতিটা রীতিমত চোখে পড়ার মত। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের দেশে শাসনকার্যে জনগণের অংশগ্রহণের সুযোগের বিষয়টি এখনও প্রশ্নমুক্ত হয়নি। স্বাধীনতার ৫ দশকে আমাদের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ তো বিকশিত হতে পারেনি বরং বিপন্নই হয়েছে। যা স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য বৈষম্যমুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, অন্যায়, অবিচার, শোষণ, নিষ্পেষণমুক্ত সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক বাংলাদেশ। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে আমাদের অর্জন যৎসামান্যই বলতে হবে।

স্বাধীনতার পর দেশে দশটি জাতীয় সংসদের নির্বাচনের মধ্যে শুধুমাত্র কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে যেসব নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল সেগুলো অপেক্ষাকৃত গ্রহণযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ হয়েছিল বলে মনে করা হয়। কিন্তু দলীয় সরকারের অধীনে যত নির্বাচন হয়েছে তার কোনটাই গণতান্ত্রিক মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে পারেনি। আর ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিরোধী অংশ না নেয়ায় ক্ষমতাসীনরা বিনা বাধায় দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। সে নির্বাচনে বিরোধী দলের নির্বাচন বর্জনের যৌক্তিকতা প্রমাণ হয়েছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। আমাদের দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির বাতাবরণে যে দলীয় সরকারের অধীনে কোনোভাবেই অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয় তা আবারও সুস্পষ্টভাবেই প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতিতে পক্ষ বিশেষে এই বাস্তবতাকে স্বীকার করা হচ্ছে না। আর সেটিই হচ্ছে চলমান সঙ্কটের অন্যতম কারণ। তাই দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে আমাদেরকে এই অশুভ বৃত্ত থেকে অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে।
আসলে আমাদের দেশের রাজনীতির কক্ষচ্যুতির কারণেই প্রচলিত রাজনীতিতে নানা ধরনের উপসর্গ স্থান করে নিয়েছে। এ কথা তিক্ত হলেও সত্য যে, দেশের চলমান রাজনীতি এখন আর কল্যাণমুখী নেই বরং রাজনীতি এখন শ্রেণিবিশেষের আত্মবিনোদন ও রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ চরিতার্থের অন্যতম হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচনের পর তা আরও গতি পেয়েছে। মূলত এসব প্রশ্নবিদ্ধ নির্বচনের মাধ্যমেই দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসনের গোড়াপত্তন হয় এবং এখনও তা অব্যাহত আছে। এখন তা স্থায়িত্ব দেয়ারই চেষ্টা করা হচ্ছে।

একথা বলতে দ্বিধা নেই যে, সরকারের পরিকল্পিত বিরাজনীতিকরণের কারণেই বিরোধী দলগুলো এখন ধ্বংসস্তূপের উপর দাঁড়িয়ে। বিরোধী শক্তির প্রদীপ একেবারে নিভে না গেলেও তারা যে শক্তিহীন হয়ে পড়েছে তা সর্বসাম্প্রতিক বিরোধী দলীয় কর্মতৎপরতায় উপলব্ধি করা যায়। সরকারের অগণতান্ত্রিক মনোভাব ও দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসনের কারণেই বিরোধী দলগুলো সকল দিক থেকেই কোণঠাসা। তাই তারা নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেয়ার জন্যই বিভিন্ন উপনির্বাচন ও স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে আমাদের দেশের নির্বাচন ব্যবস্থার বিচ্যুতিকে স্পষ্ট করে তুলছে। এ ছাড়া তাদের আর কোন সাফল্য আছে বলে মনে হয় না। এ বিষয়ে মহল বিশেষ বিরোধী দলের সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করা হলেও এ ছাড়া তাদের কাছে কোন বিকল্প পথ আছে বলে মনে হয় না।

যেমন বিকল্প ছিল না স্তালিনগ্রাদ যুদ্ধে সোভিয়েত বাহিনীর ক্ষেত্রে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যেমন হিটলারের জার্মান বাহিনী একের পর এক সোভিয়েত জনপদ দখলের পর স্তালিনগ্রাদে এসে লালফৌজের প্রবল ও পরাক্রমী প্রতিরোধের মুখে পড়েছিল। ঠিক তেমনিভাবে তিন মেয়াদে সরকার নিরঙ্কুশ ও একচ্ছত্র ক্ষমতাচর্চার পর বিভিন্ন উপনির্বাচন ও স্থানীয় নির্বাচনে এসে বিরোধীদের বেশ প্রতিরোধের মুখেই পড়েছে বলেই দৃশ্যত মনে হচ্ছে। বিরোধী পক্ষ সবকিছু হারিয়ে এবারের নির্বাচনকেই অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম বলেই মনে করছে। এ বিষয়ে বিরোধী দলের সম্ভাবনা যাই হোক না কেন তারা সরকারকে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে প্রায় অবরুদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছে। সাড়ে পাঁচ মাস অবরুদ্ধ থাকার পর জার্মান বাহিনী যেমন লাল ফৌজের কাছে চূড়ান্তভাবে পর্যুদস্ত হয়েছিল, ঠিক তেমনিভাবে সরকার আগামী দিনে গণরায়ে হেরে যাবে বলে বিরোধী মহল আশায় বুক বেঁধেছে। স্তালিনগ্রাদের মহাবীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল, ঠিক তেমনিভাবে এবারের ব্যালট যুদ্ধ আমাদের জাতীয় রাজনীতির খোলনলচেও পাল্টে দিতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে। যা ফরাসি বিপ্লব ও বাস্তিল দুর্গের পতনের কথায় স্মরণ করিয়ে দেয়।

শাসকগোষ্ঠী যখন অন্যায় ও অনাচারের সকল সীমা অতিক্রম করেছিল তখন ফরাসিদের জন্য এই বিপ্লবের কোন বিকল্প ছিল না। বস্তুত ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯-১৭৯৯) ফরাসি, ইউরোপ এবং পশ্চিমা সভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ফরাসি বিপ্লব পশ্চিমা গণতন্ত্রের ইতিহাসে একটি জটিল সন্ধিক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। যার মাধ্যমে পশ্চিমা সভ্যতা নিরঙ্কুশ রাজনীতি এবং অভিজাততন্ত্র থেকে নাগরিকতাবাদের যুগে পদার্পণ করে। ১৭৮৯ সালের ১৪ জুলাই ফ্রান্সের বাস্তিলে এক গণবিক্ষোভে বাস্তিল দুর্গের পতনের মধ্য দিয়ে ফরাসি বিপ্লব সংঘটিত হয়। এই বিপ্লব ছিল তদানীন্তন ফ্রান্সের শত শত বছর ধরে নির্যাতিত ও বঞ্চিত সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।

মূলত দেশে গণতেন্ত্রর নামে ফ্যাসিতন্ত্র স্থায়ী রূপ নিতে চলেছে। সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে জনগণের ভোটাধিকার নিয়ে যেভাবে তামাশা ও ভাঁওতাবাজির আশ্রয় নেয়া হচ্ছে, তা বিশ^ ইতিহাসে নজিরবিহীন। কারণ, গণতন্ত্রের নামে এমন ন্যক্কারজনক ঘটনা আর কখনো দেখা যায়নি। তবে আশাবাদী মানুষরা এখন আশাহত হচ্ছেন না বরং পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তনের আশা করছেন। সরকারের অগণতান্ত্রিক ও কর্তৃত্ববাদী শাসন বেশি দিন স্থায়ী হবে না বলে মনে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন সেদিন বেশি দূরে নয় যেদিন সরকার, বিরোধী পক্ষ, নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টরা জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে একযোগে কাজ করবে। অগণতান্ত্রিক শক্তিকে স্তালিনগ্রাদের প্রতিরোধের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে খুব শীঘ্রই; বাস্তিল দুর্গের পতনও অবশ্যাম্ভাবী হয়ে উঠবে। এমন স্বপ্নই দেখছেন স্বপ্নচারী সেনানীরা।

পুরনো দিনের গ্লানি মুছে ফেলে আমাদেরকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে এক নতুন প্রভাতের স্বপ্নিল সূর্য, যা আমাদের জরাধরা সমাজ-রাষ্ট্রকে নতুন করে আলোকিত। থাকবে না মানুষে মানুষে কোন বৈষম্য। সময় এসেছে বিপন্ন গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধার ও অগণতান্ত্রিক শক্তিকে প্রতিহত করে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে ন্যায়-ইনসাফভিত্তিক শান্তির সমাজ প্রতিষ্ঠার। এমনই এক স্বপ্নিল প্রভাতের প্রত্যাশা করছেন স্বপ্নচারী বীর সেনানীরা। হয়তো সেদিন খুব দূরে নয়!

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply