নতুন ভোরের স্বপ্ন দেখি -মুহাম্মদ ইয়াছিন আরাফাত

একবিংশ শতাব্দীর আরো একটি বছর শেষ হয়ে গেল। সময়ের গতির সাথে মিশে হারিয়ে গেল ২০১৭ সালের বহমান স্রোতধারা। বহমান সময়ের ফ্রেমে ২০১৭ সাল এখন শুধুই কেবল স্মৃতি। ইতিহাসের ফ্রেমে বন্দী বিদায় নেয়া গত বছরটি। বছর শেষে চলছে সালতামামি। চলছে চাওয়া-পাওয়া এবং পাওয়া-না-পাওয়ার হিসাব। যার যার অবস্থান থেকে চলছে বিশ্লেষণ। সাফল্য-ব্যর্থতা পাওয়া-না-পাওয়ার সব হিসাবই ২০১৭ সালের ঘটনাবহুল সময়ের অংশ। কেউ সফল কেউ ব্যর্থ, আবার কেউ আছেন সফলও নয় আবার ব্যর্থও নয়।
একটি বছর কিংবা একটি সময় শেষ হয়ে গেলে কিছু মানুষ চলে যাওয়া সময়ের পর্যালোচনা করেন। সচেতন প্রতিটি মানুষেরই শেখার জন্য, পরবর্তী বছরের প্রস্তুতির জন্য বিগত বছরের পর্যালোচনা করা জরুরি। আমাদেরও যার যার অবস্থান থেকে বিগত বছরের পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। বিগত বছরে কী পেলাম কী হারালাম তার পর্যালোচনা প্রয়োজন। সুযোগ থাকার পরও কোন বিষয়টি অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছি তারও পর্যালোচনা প্রয়োজন। প্রতিটি পর্যালোচনায় ছোট থেকে বড় ব্যর্থতা কিংবা গ্লানি আমাদের সামনে উঠে আসে। এসব ছোট বড় ব্যর্থতার পর্যালোচনা নিজেকে হতাশায় নিমজ্জিত করার জন্য নয়। বরং আগামী দিনের প্রত্যয়ী পথচলার জন্য অতীব জরুরি।
নতুন একটি ভোরের জন্য পুরাতন ভোরগুলোর পর্যালোচনা প্রয়োজন। প্রয়োজন নতুন সিদ্ধান্তের। প্রয়োজন নতুনভাবে প্রত্যয়ী হওয়ার। কোন একটি সময় বা বিষয়কে যখন পর্যালোচনা করা হয় তখন প্রয়োজন হয় দূরের দিকে দৃষ্টি দেয়া। কেউ আছেন নিজের অবস্থানকেই শুধু মূল্যায়ন করেন। দূরের দিকে দৃষ্টিকে প্রসারিত করেন না। ২০১৭ সালের পর্যালোচনায় দৃষ্টি দেয়া দরকার দূরের দিকে। ব্যক্তিগতভাবে আমি ২০১৭ সালের দুঃখ কষ্ট ব্যর্থতা গ্লানিকে পেছনে ফেলে রেখে দূরের দিকে দৃষ্টি দিতে চাই। শুধু স্মৃতি রোমন্থন করে সময় না কাটিয়ে আগামী দিনের জন্য একটি নতুন ভোরের স্বপ্ন বুনতে চাই। স্বপ্নের পেছনে ছুটে চলতে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে চাই। পুরাতন দিনগুলোর চাইতে নতুন বছরের দিনগুলো ভালোভাবে কাটানোর প্রস্তুতি নিতে চাই। পুরাতন দিনের চাইতে নতুন দিনগুলোতে ভালো করা রাসূল সা:-এরও শিক্ষা। মানবতার মহান শিক্ষক রাসূল সা: বলেছেন, ধ্বংস তার জন্য যার আজকের দিনটি গতকালের চাইতে ভালো হলো না।
নতুন করে পথ চলতে নতুন ভোর প্রয়োজন। প্রয়োজন নতুন পরিবেশ। কিন্তু আমাদের সমাজের সামগ্রিক যে চিত্র তা সত্যিই শিউরে ওঠার মত। হত্যা গুম খুনে বিপর্যস্ত দেশ। গণতান্ত্রিক দেশ বলা হলেও গণতন্ত্রের কবর ইতোমধ্যেই রচিত হয়েছে। কেড়ে নেয়া হয়েছে মানুষের ভোটাধিকার। লুণ্ঠিত হয়েছে বাকস্বাধীনতা। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এখন সরকারের ইচ্ছার কাছে বন্দী, চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ। পেটোয়া বাহিনীর মতো সরকারের হাতিয়ারে পরিণত হওয়া পুলিশের বুটের তলায় পিষ্ট মানবাধিকার। প্রতিহিংসা আর বিভেদের দেয়াল ক্ষত-বিক্ষত করেছে সামাজিক বন্ধনকে। মানবিক মূল্যবোধের চলছে চরম বিপর্যয়। সন্তান খুন করছে জন্মদাতা পিতা ও গর্ভধারিণী মাকে। আর মা খুন করছেন নাড়িছেঁড়া ধন সন্তানকে। সামান্য টাকার জন্য হত্যা করা হচ্ছে নিষ্পাপ শিশুকে। দেশের স্বার্থের চাইতে ব্যক্তিগত কিংবা দলীয় স্বার্থসিদ্ধিকেই গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। শিক্ষাঙ্গনে সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠনের সন্ত্রাস, প্রশ্নফাঁস, ডিজিটাল জালিয়াতির মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরির কারখানাকে ধ্বংস করা হচ্ছে। ক্যাম্পাসগুলোকে বানানো হয়েছে মিনি ক্যান্টনমেন্ট।
এত সব কিছুর মাঝেও একটি নতুন ভোরের স্বপ্ন দেখি। নতুন ভোরে এমন একটা সুন্দর সমাজ চাই, যে সমাজে শাসকেরা জনগণের শোষক না হয়ে সেবক হবেন। এমন একটা শাসনব্যবস্থা চাই যে ব্যবস্থা শোষণ করবে না বরং জনগণের কাছে জবাবদিহি করবে। রক্তের স্রোত দেখাবে না। ক্ষমতার দাপট দেখাবে না। থাকবে না হিংসা-বিদ্বেষ। থাকবে গণতন্ত্রের বিকাশ। ইসলামী তাহজিব-তমদ্দুন চর্চার অবিরত সুযোগ। দল মত ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলের মতপ্রকাশ করার সুযোগ থাকবে। নতুন ভোরে চাই ভালো একটি সরকার, যে সরকার হবে জনগণের জন্য নিবেদিতপ্রাণ সরকার। নতুন বছরে আমি আমার ভোটাধিকার সুষ্ঠুভাবে প্রয়োগ করতে চাই। চাই গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার মতো সকলের অংশগ্রহণে একটি উৎসবমুখর নির্বাচন। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি চাই। ঘরের ভেতরে বাইরে সকল স্থানে নিরাপদে চলাচলের গ্যারান্টি চাই। যেকোনো মূল্যে আমরা সুন্দর একটা আগামী চাই। নতুন প্রজন্মের স্বপ্নের সোনার বাংলা চাই। নতুন আলোয় উদ্ভাসিত একটি ভোর চাই।
চলে যাওয়া ২০১৭ সাল ঘটনাবহুল একটা বছর। আমরা চাইলেও এ সালটাকে এত সহজে ভুলতে পারব না। ভুলতে পারবো না নানা ঘটনাকে। তবুও আমরা জাতির বৃহত্তর স্বার্থে এ বছরের অনেক কিছুই ভুলে যেতে চাই। ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা আমরা ভুলে যেতে চাই। প্রতিশোধপরায়ণ মনোভাব থেকে বেরিয়ে এসে উদার মনোভাব আর কোমল হৃদয়ের অধিকারী হতে চাই। সকলকে একই সুতোয় একই বন্ধনে ঐক্যবদ্ধ করতে চাই। সব বিভেদ ভুলতে চাই মূলত নতুন বছরটা সুন্দর থাকার প্রত্যাশায়। ৪৬ বছর আগে বহু ত্যাগের বিনিময়ে আমরা একটা স্বাধীন সার্বভৌম ভূখণ্ড পেয়েছি। স্বাধীনতার চেতনা বা মূলমন্ত্র ছিল বিভক্তি নয় বরং ইস্পাতকঠিন ঐক্য। বিজয়ের সুফল চাই, বিভেদ নয় ঐক্য চাই। ঠিক সে ধরনের একটি ঐক্যবদ্ধ সোনার বাংলাদেশ দেখতে চাই।
বাংলাদেশ বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ। এ দেশের জনসংখ্যার শতকরা ৯০ ভাগ মুসলমান। একটি মুসলিম দেশ হিসেবে এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠী মুসলিম হিসেবে আমরা যদি প্রকৃত মুসলিম আদর্শের অনুসারী হতে পারি তাহলে সত্যিই একটি নতুন ভোরের উদয় হওয়া সম্ভব। নতুন বছরে খোলাফায়ে রাশেদার ঐতিহ্যের আলোকে শান্তিপূর্ণ একটি সমাজব্যবস্থা দেখতে চাই। যে সমাজের স্বপ্ন বুনি প্রতিনিয়ত। খোলাফায়ে রাশেদার স্বর্ণযুগে সে সময়ে অর্ধপৃথিবী মুসলমানেরা শাসন করেছিল তবুও না খেয়ে একটি কুকুরও মারা যায়নি। সমাজে শান্তি ছিল। নারীরা সম্ভ্রম নিয়ে নিরাপদে রাতের বেলায়ও চলাচল করেছেন। নতুন বছরে তেমনি একটি সমাজ চাই। আবু বকর রা:-এর মতো ন্যায়পরায়ণ শাসক চাই। হযরত ওমর রা:-এর মতো মানবদরদি সেবক চাই। নতুন বছরে ভালোভাবে দিনাতিপাত করতে চাই।
কেউ বলবেন চাইলেই কি ভালো থাকা সম্ভব। চাইলেই কি নতুন ভোরের উদয় হওয়া সম্ভব? আমরা আশাবাদী মানুষ। আর আশাবাদী বলেই আমরা শত বেদনায় জর্জরিত হয়েও নতুন ভোরের স্বপ্ন দেখি। আমরা সাহস নিয়েই ভাবি, এই তো আগামীকালের নতুন ভোরের আলো মানবসভ্যতার জন্য নতুন বার্তা নিয়ে আসবে। প্রত্যেকটা ভোর নতুনের বার্তা বয়ে নিয়ে আসে মানুষের সার্বিক কল্যাণের অভিপ্রায়ে। সেই কল্যাণময় বার্তা মানুষকে পৌঁছে দেয় স্বপ্নময় জীবনের দ্বারপ্রান্তে। যারা বুদ্ধিমান কিংবা বিবেক খাটিয়ে চলে তারা সত্যের সন্ধান পায়। নতুনের গভীরে অসীমের ছবি দেখে আশাবাদী মানুষ জীবনের গান গেয়ে ওঠে। সেখানে কোনো মলিনতা থাকে না। আশাবাদীরা অন্ধকারেও আলোর ছোঁয়া দেখতে পায়।
নতুন বছরে নতুন ভোরের স্বপ্ন মানুষ প্রতিনিয়ত দেখেছে বলেই পৃথিবীর সভ্যতা এতটা আলোকিত হয়েছে। নতুন ভোরের স্বপ্ন দেখেছে বলেই মানুষ পুরাতন ভোরের গ্লানি মুছতে পেরেছে। নতুন বছর আমাদের চেতনায় সুন্দরের বীজ রোপণ করে সত্যকে প্রকাশ করবে- এটাই মানুষের আকাক্সক্ষা। আমাদের দৃঢ়বিশ^াস সত্য ঠিকই উদ্ভাসিত হবে নতুন সূর্যের ন্যায়। আমাদের বিশ্বাস মিথ্যার অন্ধকার নতুন ভোরের আলোর কাছে পরাজিত হবে। আমাদের বিশ্বাস মিথ্যাকে ব্যবহার করে যারা সমাজে শোষণ নিপীড়ন আর জুলুমের স্টিমরোলার চালাচ্ছে তারা মিথ্যার গহবরেই নিমজ্জিত হবে, ইনশাআল্লাহ।
লেখক : এমফিল গবেষক

SHARE

Leave a Reply