নবমূল্যায়নে নজরুল

মোশাররফ হোসেন খান
বাংলা সাহিত্যে তো বটেই, বিশ্বসাহিত্যেও ‘নজরুল-বিতর্ক’-এর মতো আর কোনো কবি-সাহিত্যিককে নিয়ে বিতর্ক কিংবা সমালোচনা এতটা প্রবল নয়। নজরুলের উত্থানকাল থেকেই তাঁকে নিয়ে টানা-হেঁচড়ার কমতি ছিল না। এমন একটি সময় ছিল, যখন বামপন্থীদের কাছে সুকান্তের চেয়েও নজরুলই ছিলেন ধন্বন্তরি ওষুধ। নজরুলকে তারা ব্যবহার করেছে শিকারের টোপ হিসেবে।
সন্দেহ নেই, এটা ঘটেছিল কেবল নজরুলের সাম্যবাদী চেতনালব্ধ রচনার কারণে। কিন্তু নজরুলসাহিত্য গভীরভাবে পাঠ করলে বামপন্থীদের এই কূটচাল ব্যর্থ হয়ে হতাশার কালো মেঘই ঘনীভূত হবার কথা। হয়েছেও। নজরুল সম্পর্কে আজ তার স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় একচক্ষু হরিণে পরিণত হয়েছে। যার কারণে নজরুলের ব্যাপারে তারা আজ একেবারেই নির্মোহ এবং নীরব।
আমি আগেও নজরুলসংক্রান্ত একটি লেখায় উল্লেখ করেছি যে, নজরুল শেষ পর্যন্ত স্থিত হয়েছিলেন ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে। এখানেই তিনি পেয়েছিলেন জীবন, জগৎ এবং তাবৎ ক্লান্তির স্বস্তিকর আরাম। ঐ লেখায় নজরুলের স্বীকারোক্তিমূলক বহু উদ্ধৃতির সমাবেশ ঘটিয়ে আমি এই সিদ্ধান্তের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছিলাম। নজরুল-বিতর্কের অবসানকল্পে নজরুলের স্বীকারোক্তিকেই যথেষ্ট মনে করি। যেখানে কবির স্বীকারোক্তিই স্পষ্ট, সেখানে আর গবেষণার অবকাশ কোথায়?
নজরুল-বিদ্বেষ কিংবা নজরুল-বিতর্ক-এটা একটি তথাকথিত সম্প্রদায়ের মতো ছুঁৎমার্গ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কারো কারো কাছে লোভনীয়ও বটে। কিন্তু আমার মনে হয় না-নজরুলকে নিয়ে অহেতুক বিতর্ক কিংবা বিতণ্ডার তেমন কোনো সুযোগ আছে। এক্ষেত্রে আজ এখানে নজরুলের আমার লীগকংগ্রেস শীর্ষক রচনাটি তুলে ধরবো। যার মধ্যে নজরুল-মানসচারিত্র, বিশ্বাস, তাঁর উদ্দেশ্য এবং অবস্থান-সকল কিছুই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
নজরুলের এই লেখাটিকে বলা যেতে পারে একটি জবাবী লেখা। চারপাশের বৈরী সমালোচনায় ব্যথাতুর, আহত, ক্ষুব্ধ নজরুল। সুতরাং তাঁর জাতির এবং সম্প্রদায়ের সন্দেহের কুয়াশা দূর করার জন্য নজরুলের তখন একটি জবাবী লেখারই প্রয়োজন ছিল। সেটাই তিনি করেছেন। নজরুল বলেছেন-
“আমার স্বধর্মী কোন কোন ভাই বা তাঁদের কাগজ প্রচার করছেন-আমি নাকি মুসলিম লীগবিদ্বেষী। বিদ্বেষ আমার ধর্ম-বিরুদ্ধ। আমার আল্লাহ নিত্য-পূর্ণ-পরম-অভেদ, নিত্য পরম- প্রেমময়, নিত্য সর্বদ্বন্দ্বাতীত। কোন ধর্ম, কোন জাতি বা মানবের প্রতি বিদ্বেষ আমার ধর্মে নাই, কর্মে নাই, মর্মে নাই। মানুষের বিচারকে আমি স্বীকারও করি না, ভয়ও করি না। আমি শুধু একমাত্র পরম বিচারক আল্লাহ ও তাঁর বিচারকেই মানি। তবু যাঁরা ভ্রান্ত ধারণা বা বিদ্বেষবশত আমার এই নিন্দাবাদ করছেন তাঁদের ও আমার প্রিয় মুসলিম জনগণের অবগতির জন্য আমার সত্য অভিমত নিবেদন করছি।
আমি নবযুগে যোগদান করেছি, শুধু ভারতে নয়, জগতে নবযুগ আনার জন্য। এ আমার অহঙ্কার নয়, এ আমার সাধ, এ আমার সাধনা। এই বিদ্বেষ-কলহ-কলঙ্কিত, প্রেমহীন, ক্ষমাহীন অসুন্দর পৃথিবীকে সুন্দর করতে, শান্তিতে প্রতিষ্ঠিত করতে-আল্লাহর বান্দা রূপেই কর্মক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়েছি। ইসলাম ধর্ম এসেছে পৃথিবীতে পূর্ণ শান্তি সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে- কুরআন মজিদে এই মহাবাণীই উত্থিত হয়েছে।… এক আল্লাহ ছাড়া আমার কেউ প্রভু নেই। তার আদেশ পালন করাই আমার মানব-ধর্ম। আমি যদি আমার অতীত জীবনে কোনো কুফর বা গুনাহ করে থাকি, তার শাস্তি আমি আমার প্রভু আল্লাহর কাছ থেকে নেব, তার শাস্তি কোনো মানুষের দেয়ার অধিকার নেই। আল্লাহ লা-শরিক, একমেবাদ্বিতীয়ম। কে সেখানে দ্বিতীয় আছে যে আমার বিচার করবে? কাজেই কারও নিন্দাবাদ বা বিচারকে আমি ভয় করি না। আল্লাহ আমার প্রভু, রাসূলের আমি উম্মত, আল-কুরআন আমার পথপ্রদর্শক।
এ ছাড়া আমার কেহ প্রভু নাই, শাফায়তদাতা নাই। আমার আল্লাহ আল-ফাদলিল আজিম-পরমদাতা। তিনিই আমাকে জাতির কাছ থেকে, কৌমের কাছ থেকে, কোন দান নিতে দেননি। যে দক্ষিণ হাত তুলে কেবল তাঁর কৃপা ভিক্ষা করেছি তাঁর দাক্ষিণ্য ছাড়া কারুর দানে সে হাত কলঙ্কিত হয়নি। আজ তিনিই এই পথভ্রষ্ট, অন্ধ, আশ্রয়-ভিক্ষুকের হাত ধরে একমাত্র তাঁর পথে নিয়ে যাচ্ছেন। আমি আমার ক্ষমা-সুন্দর আল্লাহর পূর্ণ ক্ষমা পেয়েছি, সত্য পথের সন্ধান পেয়েছি। তাঁর বান্দা হবার অধিকার পেয়েছি। আমার আজ আর কোনো অভাব নেই, চাওয়া নেই, পাওয়া নেই।
আমার কবিতা আমার শক্তি নয়; আল্লার দেয়া শক্তি-আমি উপলক্ষ মাত্র। বীণার বেণুতে সুর বাজে কিন্তু বাজান যে-গুণী, সমস্ত প্রশংসা তাঁরই। আমার কবিতা যাঁরা পড়েছেন, তাঁরাই সাক্ষী; আমি মুসলিমকে সংঘবদ্ধ করার জন্য তাদের জড়ত্ব, আলস্য, কর্মবিমুখতা, ক্লৈব্য, অবিশ্বাস দূর করার জন্য আজীবন চেষ্টা করেছি। বাঙলার মুসলমানকে শির উঁচু করে দাঁড়াবার জন্য- যে শির এক আল্লাহ ছাড়া কোন সম্রাটের কাছেও নত হয়নি-আল্লাহ যতটুকু শক্তি দিয়েছেন তাই দিয়ে বলেছি, লিখেছি ও নিজের জীবন দিয়েও তার সাধনা করেছি। আমার কাব্যশক্তিকে তথাকথিত খাট করেও গ্রামোফোন রেকর্ডে শত শত ইসলামী গান রেকর্ড করে নিরক্ষর তিন কোটি মুসলমানের ঈমান অটুট রাখাই চেষ্টা করেছি [তখন অখণ্ড বাংলার মুসলমানদের সংখ্যা ছিল তিন কোটি]। আমি এর প্রতিদানে সমাজের কাছে জাতির কাছে কিছু চাইনি। এ আমার আল্লাহর হুকুম, আমি তাঁর হুকুম পালন করেছি মাত্র। আজও আমি একমাত্র তাঁরই হুকুমবর্দাররূপে কর্মক্ষেত্রে অবতরণ করেছি-আমার দীর্ঘদিনের গোপন তীর্থযাত্রার পর। আমি আজ জিজ্ঞাসা করি : আমি লীগের মেম্বার নই বলে কি কোনো লীগ-কর্মী বা নেতার চেয়ে কম কাজ করেছি? আজও নবযুগে এসেছি শুধু মুসলমানকে সঙ্ঘবদ্ধ করতে-তাদের প্রবল করে তুলতে-তাদের আবার মার্টায়ার-শহীদী সেনা করতে। বাঙলার মুসলমান বাঙলার অর্ধেক অঙ্গ। কিন্তু এই ছত্রভঙ্গ ছিন্নদল মুসলমানদের আবার এক আকাশের ছত্রদলে, এক ঈদগাহের ময়দানে সমবেত করার জন্যই আমি চিরদিন আজান দিয়ে এসেছি। নবযুগে এসেও সেই কথা বলেছি ও লিখেছি। এই নবযুগে আসার আগে বাঙলার মুসলমান নেতায় নেতায় যে ন্যাতা টানাটানির ব্যাপার চলেছিল-সেই গ্লানিকর বিদ্বেষ ও কলহকে দূর করতেই আমি লেখনী ও তলোয়ার নিয়ে, আমার অনুগত নির্ভীক, দুর্জয়, মৃত্যুঞ্জয়ী নওজোয়ানদের নিয়ে-ভাই-এ ভাই-এ পূর্ণ প্রচেষ্টা চালাতে এসেছি। আমি কোনো ব্যক্তিকে সাহায্য করতে আসিনি। আল্লাহ জানেন, আর জানেন যারা আমার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত তাঁরা-আমি কোনো প্রলোভন নিয়ে এই কলহের কুরুক্ষেত্রে যোগদান করিনি। লীগ কেন, কংগ্রেসকেও আমি কোনদিন স্বীকার করিনি। আমার ধূমকেতু পত্রিকা তার প্রমাণ। মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে কোনদিন কিছু লিখিনি-কিন্তু তার নেতাদের বিরুদ্ধে লিখেছি। যে কোনো আন্দোলনেরই হোক নেতারা যদি পূর্ণ নির্লোভ, নিরহঙ্কার ও নির্ভয় না হন, সে-আন্দোলনকে একদিন না একদিন ব্যর্থ হতেই হবে।
লীগের আন্দোলন যেমন “গদাই লস্করী” চালে চলছিল তাতে আমি আমার অন্তরে কোনো বিপুল সম্ভাবনার আশার আলোক দেখতে পাইনি।… আমি “লীগ” “কংগ্রেস” কিছুই মানি না, মানি শুধু সত্যকে, মানি সর্বজনীন ভ্রাতৃত্বকে, মানি সর্বজনগণের মুক্তিকে। এক দেশের সৈন্য দেশ জয় করতে যায় এবং তাদেরও স্বীকার করি, কিন্তু স্বীকার করি না ভীরুর আস্ফালনকে, জেল-কয়েদিদের মারামারিকে। এক খুঁটিতে বাঁধা রামছাগল, এক খুঁটিতে বাঁধা খোদার খাসি, কারুর গলার বাঁধন টুটল না, কেউ খুঁটি মুক্ত হলো না, অথচ তারা তাল ঠুকে এ ওঁকে ঢুঁস মারে! দেখে হাসি পায়!
মুসলমানের জন্য আমার দান কোন নেতার চেয়ে কম নয়; যে সব মুসলমান যুবক আজ নব জীবনের সাড়া পেয়ে দেশের জাতির কল্যাণে সাহায্য করছে তাদের প্রায় সকলেই অনুপ্রেরণা পেয়েছে এই ভিক্ষুকের ভিক্ষা-ঝুলি থেকে।
আল্লাহর সৃষ্টি এই পৃথিবী আজ অসুন্দরে নির্যাতনে বিদ্বেষে পূর্ণ হয়ে উঠেছে। মানুষ আল্লার খলিফা অর্থাৎ প্রতিনিধি-ভাইসরয়। মানুষ আল্লাহর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। মানুষ চেষ্টা করলে সমস্ত ফেরেশতাকেও বশ্যতা স্বীকার করাতে পারে, ত্রিলোকের বাদশাহী পেতে পারে-এ আল্লাহর নির্দেশ। মানুষ মাত্রই আল্লার সৈনিক। অসুন্দর পৃথিবীকে সুন্দর করতে সর্ব নির্যাতন, সর্ব অশান্তি থেকে পৃথিবীকে মুক্ত করতে মানুষের জন্ম। আমি সেই কথাই আজীবন বলে যাব, লিখে যাব, গেয়ে যাব; এই জগতের মৃত্তিকা,জল, অগ্নি, বায়ু, আকাশকে আবার পূর্ণ শুদ্ধ, পূর্ণ নির্মল করব-এই আমার সাধনা। পূর্ণ চৈতন্যময় হবে আল্লার সৃষ্টি এই আমার সাধ। পূর্ণ আনন্দময়, পূর্ণ শান্তিময় হবে এ পৃথিবী-এ আমার বিশ্বাস। এ বিশ্বাস আল্লাহতে বিশ্বাসের মতই অটল! “ফিরদৌসআলা”-পূর্ণ আনন্দধাম থেকে আমরা এসেছি। পৃথিবীতে সেই আনন্দধামেরই প্রতিষ্ঠা করব-এই আমার তপস্যা। এই পৃথিবীর রাজরাজেশ্বর একমাত্র আল্লাহ। যারা এই পৃথিবীতে নিজেদের রাজত্বের দাবি করে তারা শয়তান। সে শয়তানদের সংহার করে আমরা আল্লাহর রাজত্বের প্রতিষ্ঠা করব। যে মুসলমানের ক্ষাত্রশক্তি নাই, সে মুসলমান নয়। যে ভীরু সে মুসলমান নয়। এই ভীরুতা, এই তামসিকতা, এই অপৌরুষকে দূর করাই আমার লীগ, আমার কংগ্রেস। এ ছাড়া আমার অন্য লীগ-কংগ্রেস নাই!
নজরুলের এই বক্তব্যের পর তাঁকে নিয়ে সন্দেহের আর কোনো অবকাশই থাকা সমীচীন নয়। কারণ এখানে সমগ্র নজরুলই স্পষ্টতর হয়ে উঠেছে। বরং পাল্টা প্রশ্ন তো জাগতেই পারে যে-আজকের যারা বাংলা সাহিত্যের দিকপাল হিসেবে নিজেদেরকে উপস্থাপন করেন সগৌরবে, সাড়ম্বরে-তাঁরা এই জাতি, এই দেশ, এই সমাজ এবং বিশ্বাস ও আদর্শের কাছে কতটুকু দায়বদ্ধ? তাঁদের রচনায় তো তেমনটির দূরতমও কোনো গন্ধ বা সন্ধান পাওয়া যায় না। নজরুলের মতো সত্য উচ্চারণের সৎ সাহস আজকের তথাকথিত সঘোষিত শ্রেষ্ঠ কবি-সাহিত্যিকদের [?] মধ্যে আদৌ আছে কি? এখানেও নজরুল অতুলনীয় এবং অদ্বিতীয়। সাহস ও বিশ্বাসের ফল্গুধারায় যে নজরুল ছিলেন জ্যোতিষ্মান। সথ্যের পথে যিনি ছিলেন অনড়, হিমাচল।
সুতরাং নজরুল-বিতর্কের আর কোনো অবকাশ আছে বলে মনে করি না।

লেখক : কবি ও সম্পাদক
নতুন কলম ও নতুন কিশোরকণ্ঠ

SHARE

Leave a Reply