নাজুক ব্যাংকিং খাত সুশাসন ছাড়া মুক্তি নেই -হারুন ইবনে শাহাদাত

‘অর্থ সকল অনর্থের মূল’- কথাটি গাছ থেকে ফল পেড়ে খেতে ব্যর্থ হয়ে গল্পের সেই চালাক শিয়ালের উক্তি ‘আঙ্গুর ফল টক’ এর মতোই অসত্য। এ কথা কেউ বিশ্বাস করুক আর নাই করুক- দেশের ব্যাংকিং খাতের সাথে সংশ্লিষ্টরা ঠিকই বুঝতে পেরেছেন। তাদের এই বুঝের খেসারত দিতে হচ্ছে গোটা জাতিকে। দেশের ব্যাংকিং খাতের অবস্থা এতটাই নাজুক যে, সরকার সমর্থক, মিডিয়াগুলো সরব না হয়ে পারছে না। কারণ তারা এর ভয়াবহতার পরিণতি ভেবে চরম অস্বস্তিতে আছে। সুজনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ব্যাংকিং খাতে গত ৭ বছরে ৬টি বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারিতে ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি চুরি হয়েছে।
গত ৯ অক্টোবর ২০১৬ দৈনিক জনকণ্ঠ লিখেছে, ‘দেশের ব্যাংকিং খাত খুবই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বিশেষ করে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত ব্যাংকগুলোর অবস্থা খুবই নাজুক। এসব ব্যাংকে সুশাসন বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক চেষ্টা করলেও খুব একটা সফল হতে পারছে না। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অব্যবস্থাপনা ও তদারকির অভাবে ব্যাংকিং খাতে মন্দ ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। এতে ব্যাংকগুলো মূলধন সঙ্কটে পড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, সরকারি মালিকানাধীন ৮ ব্যাংকের মধ্যে ৭ ব্যাংকই মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে। যেখানে সামগ্রিকভাবে ব্যাংকিং খাতে মাত্র ৯টি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, এভাবে চলতে থাকলে ব্যাংকিং খাতের আর্থিক পরিস্থিতি নাজুক হয়ে যাবে। বিশেষ করে সরকারি ব্যাংকগুলোর পরিস্থিতি খুবই খারাপ। খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি, ঋণপুনর্গঠন, ঋণ অবলোকন, ঋণ ও আমানতের উচ্চ সুদহারসহ বেশকিছু চ্যালেঞ্জে রয়েছে ব্যাংকিং খাত। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হলে বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) পূরণ কঠিন হয়ে যাবে বলে মনে করেন জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদরা। ২০১৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে মাত্র ৩১ শতাংশ মানুষ ব্যাংকিং সেবার আওতায় এসেছে। বাকি ৬৯ শতাংশ মানুষ ব্যাংকিং সেবার বাইরে রয়েছে। তাছাড়া ২০১১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী ব্যাংক অ্যাকাউন্টের আওতায় এসেছে ৭০০ মিলিয়ন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ। তবে এ সময়ে ২ বিলিয়ন মানুষ ব্যাংকিং সেবার বাইরে রয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের নানা উদ্যোগের পরও মূলধন ঘাটতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না সরকারি ব্যাংকগুলো। গত জুনে সরকারি খাতের ৭ ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৯২২ কোটি টাকা। গত মার্চে ৫ ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ছিল ১৩ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকা। তিন মাসের ব্যবধানে ঘাটতিতে পড়া ব্যাংকের সংখ্যা ও পরিমাণ উভয় বেড়েছে। নিয়মানুযায়ী ব্যাংকগুলোকে ৪০০ কোটি টাকা অথবা ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের ১০ শতাংশের মধ্যে যা বেশি সেই পরিমাণ অর্থ মূলধন হিসেবে সংরক্ষণ করতে হয়। জুন শেষে সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৪২ হাজার ৭০৫ কোটি টাকা। এর বিপরীতে ১৪ হাজার ১৭০ কোটি মূলধন সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ৮ হাজার ২০০ কোটি টাকা মূলধন সংরক্ষণ করতে সক্ষম হওয়ায় ৬ হাজার ৭১ কোটি টাকা ঘাটতি পড়েছে। সামগ্রিকভাবে ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৪৩ হাজার ৬৬৭ কোটি টাকা। এর বিপরীতে ৭৭ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল।
এর মধ্যে ব্যাংকগুলো ৭৬ হাজার ৮৮৪ কোটি টাকা সংরক্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। যার ফলে সামগ্রিকভাবে ব্যাংক খাতে ৬৪০ কোটি টাকা মূলধন ঘাটতি হয়েছে। দেশের মোট ৫৬টি ব্যাংকের মধ্যে ৯টি বাদে ৪৭টি ব্যাংক প্রয়োজনের তুলনায় বেশি পরিমাণে মূলধন রাখতে সক্ষম হয়েছে। যার ফলে এই ৯ ব্যাংকের ১৬ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা ঘাটতি হলেও অন্য ব্যাংকের অতিরিক্ত মূলধন সংরক্ষণ করায় সামগ্রিকভাবে ঘাটতি কমে এসেছে। এছাড়া জুন শেষে ব্যাংক খাতে মূলধন পর্যাপ্ততার হার দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৩৪ শতাংশ। মার্চে এর পরিমাণ আরও বেশি ছিল ১০ দশমিক ৬৪ শতাংশ। তিন মাসের ব্যবধানে ব্যাংকিং খাতে মূলধন পর্যাপ্ততার হার কমেছে। খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার ফলে খেলাপি ঋণসংক্রান্ত মামলার জট সৃষ্টি হয়েছে। ঋণপুনর্গঠন হতাশাজনক হারে বেড়েছে। একই ঋণ বারবার পুনর্গঠন করা হচ্ছে। উচ্চ সুদের কারণে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ঋণখেলাপি হওয়ার সংস্কৃতি বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত জবাবদিহি না থাকা ও স্বচ্ছতার অভাব সত্ত্বেও সম্প্রসারণশীল ব্যাংক খাত এ দেশের অর্থনীতির উন্নয়নে অবদান রেখে চলেছে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, ব্যাংকের দুর্নীতির সূত্রপাত ঘটেছিল ১৯৭৭-৭৮ সাল থেকে। আশির দশকে ব্যাংকে দুর্নীতির ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটে। জেনারেল এরশাদ দুর্নীতিকে বাধামুক্ত করার জন্য সবচেয়ে সৎ ব্যাংকারদের সামরিক আইনে জেলে পুরেছিলেন। সেসব স্বনামধন্য ব্যাংকার হলেনÑ লুৎফর রহমান সরকার, মুশফেকুস সালেহীন, সৈয়দ আলী কবির প্রমুখ। সৎ ও দক্ষ ব্যাংকারদের শাস্তি দিয়ে এরশাদ দুর্নীতির পথ প্রশস্ত করেছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় পরবর্তী সরকারগুলো ব্যাংকে হানা দিয়ে অর্থ লোপাটের অপসংস্কৃতির চর্চা করেছে। দুর্ভাগ্য, বর্তমান সরকারও সরকারি ব্যাংকে অর্থ অপচয়ের ধারায় পানি সিঞ্চন করছে।’
অবশ্য অর্থ খাতের সাথে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বর্তমান সরকার শুধু পানি সিঞ্চন করছে না, রীতিমতো নার্সিং করছে। ব্যাংক-বীমা শেয়ারসহ অর্থ খাতের প্রত্যেকটিতেই এত বেশি লুটপাট হচ্ছে যা অতীতে অন্য কোনো সময় হয়নি। এই দুর্নীতির চিত্র সরকার সর্মথক বলে পরিচিত সাপ্তাহিকের একটি প্রতিবেদন তুলে ধরা হলো, ‘বাংলাদেশে ব্যাংকিং খাতের অব্যবস্থাপনা চরমে পৌঁছেছে। সরকারি ও বেসরকারি, উভয় ধরনের ব্যাংকই অস্বচ্ছতা, অব্যবস্থাপনা ও লুটপাটের আধারে পরিণত হয়েছে। বড় ধনী ও শিল্পপতি গ্রাহকরা অর্থ আত্মসাৎ করে পরিণত হচ্ছেন ঋণখেলাপিতে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ব্যাংকের ঊর্ধ্বতনদের দুর্নীতি। একের পর এক ব্যাংকের নাম আসছে এই তালিকায়। এমনকি এই খাতের পরিচালনা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংকও সম্প্রতি লুটের শিকার হয়েছে। ব্যাংকিং খাতের এই দুরবস্থার কোনো প্রতিকার সাধনে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। খেলাপি ঋণকে তফসিলি সুবিধা দিয়ে চলমান ঋণে পরিণত করে এবং বাকি অংশকে ‘মন্দ ঋণ’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে অবলোপনের তালিকায় ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে। এভাবে সরকার ব্যাংকিং খাতের দুরবস্থাকে দৃশ্যত সহনশীল কিন্তু বাস্তবে চাপা দিয়ে রাখছে। ফলে এই খাতের দুর্নীতি আরও বাড়ছে। মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে বেশ কিছু ব্যাংক। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে মানুষের অনাস্থা। যার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে শেয়ারবাজারেও। এসবের পরেও সরকারের দিক থেকে কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। এই খাতের বিশেষজ্ঞরা তাই সরকারের ব্যর্থতাকেই দায়ী করেছেন।

বাড়ছে খেলাপি ঋণ ও অবলোপন
ঋণ নিয়ে তা ফেরত না দেয়া তথা আত্মসাৎ করাকেই বলা হয় খেলাপি ঋণ। আর একটি ব্যাংকে যখন এ ধরনের ঋণের পরিমাণ অনেক বেশি হয়ে যায় তখন সেই ব্যাংকটিকে মুনাফা ও বিনিয়োগের ভারসাম্য ধরে রাখতে গেলে সুদের হার বাড়াতে হয়। কিন্তু সুদের হার বাড়ালে গ্রাহক হারাতে হবে বিধায় ব্যাংকগুলো খেলাপি হয়ে যাওয়া ঋণ নতুন শর্ত ও সুযোগ দিয়ে সুদের হার কমিয়ে বা মওকুফ করে। এভাবে খেলাপি ঋণকে আবার চলতি ঋণে রূপান্তরিত করা হয় এবং একে বলা হয় তফসিলি সুবিধা। তারপরও যদি খেলাপি ঋণ থেকে যায় বা তফসিলির পর আবারও ওই ঋণ খেলাপি ঋণে পরিণত হয় তখন এর বড় একটি অংশকে ‘মন্দ ঋণ’ সাব্যস্ত করা হয়। পরবর্তীতে সেগুলোকে ভিন্ন একটি খাতায় টুকে রেখে ব্যাংকের দৈনন্দিন হিসাব থেকে সরিয়ে ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য ধরে রাখা হয়। ভিন্ন খাতায় টুকে রাখার এই পদ্ধতিকেই বলা হয় অবলোপন। এই পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরকারি অনুমতির ব্যাপারটি যুক্ত থাকে। বাংলাদেশে ব্যাংকিং খাতে ক্রমাগত বাড়ছে খেলাপি ঋণ ও অবলোপনকৃত ঋণের পরিমাণ। বারবার বিভিন্ন নামে তফসিলি সুবিধা দিয়েও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না।
জুন, ২০১৬ বাংলাদেশ ব্যাংকের দেয়া সর্বশেষ হিসাবে দেখা যায়, দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৬৩ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা। যা কিনা মোট ঋণের ১০ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। এও জানা যায় যে, খেলাপি ঋণের হার ভারতে ৬ ও শ্রীলঙ্কায় ৪ শতাংশের নিচে। খেলাপি হওয়া এই পরিমাণ ঋণের পাশাপাশি রয়েছে অবলোপনের তালিকায় ঢুকে যাওয়া আরও অতিরিক্ত মন্দ ঋণ। জুন, ২০১৬তে এর পরিমাণ প্রায় ৪৪ হাজার ২৩৭ কোটি টাকা বলে জানায় বাংলাদেশ ব্যাংক। অর্থাৎ খেলাপি ও অবলোপন মিলিয়ে এ ধরনের মোট ঋণ ১ লাখ কোটি টাকা পেরিয়ে গেছে। এর মধ্যে ২০১৬ সালের প্রথম ৬ মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা এবং অবলোপনকৃত ঋণ বেড়েছে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। যা কিনা আগের সব হিসাবকে ছাড়িয়ে গেছে। এই খাতের বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা যে, বছরের প্রথমার্ধেই যদি এ অবস্থা হয় বছর শেষে এই হার আরও বেড়ে যাবে।

নিয়ন্ত্রণহীন অফশোর ব্যাংকিং
দেশে কোনো পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা ছাড়াই চলছে অফশোর ব্যাংকিং। এটা হচ্ছে ব্যাংকের ভেতর আলাদাভাবে পরিচালিত এক ধরনের ব্যাংকিং ব্যবস্থা। যার মাধ্যমে বিদেশি কোনো কোম্পানিকে ঋণ দেয়া ও বিদেশি উৎস থেকে আমানত সংগ্রহ করা যায়। এ ব্যবস্থায় স্থানীয় মুদ্রার পরিবর্তে লেনদেন হয় বৈদেশিক মুদ্রায়। প্রচলিত ব্যাংকিং নিয়ম ও নীতিমালা অফশোর ব্যাংকিংয়ে প্রয়োগ হয় না। কেবল মুনাফা ও লোকসানের হিসাব যোগ হয় ব্যাংকের মূল হিসাবে। এ ধরনের ব্যাংকিং প্রক্রিয়ায় দেয়া ঋণখেলাপি হলে আশঙ্কা থেকে যায় সমঝোতামূলক অর্থ পাচারের। আগে বিদেশি ব্যাংকগুলো এই সেবায় থাকলেও ক্রমে দেশের ব্যাংকগুলোও এতে যুক্ত হয়েছে। জানা গেছে, দেশে কার্যরত ৫৬টি ব্যাংকের মধ্যে এখন ৫১টি অফশোর ব্যাংকিংয়ের অনুমোদন নিয়েছে। তবে অফশোর কার্যক্রমে আছে ৩৫টি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, গত জুন পর্যন্ত অফশোর ব্যাংকিংয়ের ঋণ দাঁড়িয়েছে ৩৮ হাজার ৮৭ কোটি টাকা। তিন মাস আগের তুলনায় যা ৪ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকা বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংক ১৯৮৫ সালে ব্যাংকগুলোর অফশোর ব্যাংকিং পরিচালনার জন্য একটি নীতিমালা জারি করে। নীতিমালায় কারা ঋণ পাবে, ঋণগ্রহণের সীমা, ঋণের ব্যবহার এসব বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ নেই। এ সুযোগে ব্যাংকগুলো এর অপব্যবহার করছে। বিদেশ থেকে আমানত সংগ্রহের নিয়ম থাকলেও মূল ব্যাংক থেকে ঋণ করে বিদেশে ঋণ দিচ্ছে অফশোর ইউনিট। আবার এসব ঋণের গ্রহীতাদেরও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অর্থাৎ অর্থ পাচারে ব্যবহৃত হচ্ছে ইউনিটগুলো। ৩০ বছর পার হলেও অফশোর ব্যাংকিংয়ের জন্য কোনো পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা হয়নি। গত জুন পর্যন্ত অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটে সবচেয়ে বেশি ঋণ রয়েছে বিদেশি মালিকানার এইচএসবিসি ব্যাংকে। ব্যাংকটিতে অফশোর ঋণ রয়েছে ৯ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ঋণ স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে, ৫ হাজার ১৫৭ কোটি টাকা। শীর্ষ ১০ তালিকায় থাকা অন্য ব্যাংকগুলোর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ঋণ ২ হাজার ৪৯২ কোটি টাকা। এরই মধ্যে বেসরকারি আরব বাংলাদেশ তথা এবি ব্যাংকের মাধ্যমে অফশোর ব্যাংকিং সুবিধায় ৩৪০ কোটি টাকা পাচারের বিষয় ধরা পড়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে। সরকার নীতিমালার বিষয়ে আশ্বাস দিচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে তার দেখা মিলছে না।

বাড়ছে কর্মকর্তাদের সুবিধা
ব্যাংকিং খাতে এসব অনিয়মের পাশাপাশি যোগ হয়েছে নিয়মবহির্ভূতভাবে ব্যাংক কর্মকর্তাদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি। দীর্ঘদিন ধরে দেশের ব্যাংকিং খাতের সূচক নিম্নগামী। শেয়ারহোল্ডারদেরও ভালো লভ্যাংশ দিতে পারছে না অধিকাংশ ব্যাংক। তারপরও ব্যাংক থেকে কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা নেয়ার পরিমাণ কমেনি বরং বেড়েছে। প্রধান নির্বাহী তথা সিইওদের পাশাপাশি কোম্পানি থেকে টাকা নেয়ার পরিমাণ বাড়িয়েছেন পরিচালকরাও। জানা গেছে, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৩০ ব্যাংকের সিইও ২০০৬ সালের প্রথম ৬ মাসে বেতন-ভাতা বাবদ নিয়েছেন ১৭ কোটি ৬৫ লাখ ৬১ হাজার টাকা। আগের বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ১৫ কোটি ৫৫ লাখ ৮৯ হাজার টাকা। ৬ মাসে সিইওরা বেশি নিয়েছেন ২ কোটি ৯ লাখ ৭২ হাজার টাকা।
প্রতিষ্ঠানগুলো অনেকটা ইচ্ছামাফিকই সিইওর বেতন-ভাতা নির্ধারণ করছে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী বড় ব্যাংকের সিইওর বেতন-ভাতা বেশি হবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে বড় ব্যাংকের চেয়ে কোনো কোনো ছোট ব্যাংকের সিইওরা বেশি বেতন-ভাতা নিচ্ছেন। আমানত সংগ্রহ ও ঋণ বিতরণের দিক থেকে ইস্টার্ন ব্যাংক আছে ২৬তম স্থানে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির সিইওর বেতন-ভাতা সবচেয়ে বেশি। গড়ে প্রতি মাসে তিনি পান ১৫ লাখ ৯১ হাজার টাকা। একই ধারায় আছেন ব্যাংকের পরিচালকরাও। ৩০ ব্যাংকের পরিচালকরা চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে ফি বাবদ নিয়েছেন ৬ কোটি ৭৮ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। আগের বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৫ কোটি ৬৬ লাখ ৫৩ হাজার টাকা। পরিচালকদের ফি বাবদ সবচেয়ে বেশি খরচ করেছে আল-আরাফা ইসলামী ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৬ সালের জুন অবধি পরিচালকদের ফি হিসেবে দিয়েছে ৯৬ লাখ ৭ হাজার টাকা। আগের বছরের একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটি এ খাতে ব্যয় করে ৬৫ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। এভাবে ব্যাংক কর্মকর্তাদের সুযোগ-সুবিধা তথা ব্যয় বাড়লেও ব্যাংকগুলোর লাভ কিন্তু বাড়ছে না। ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন শেয়ারহোল্ডাররা। কিন্তু সরকার এক্ষেত্রেও কোনো প্রতিকারের ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

কমছে শেয়ারের দর
বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এমনিতেই বিধ্বস্ত। পুঁজিবাজারে পরিকল্পিত অর্থ লুটের ব্যাপারটি সবার জানা থাকলেও সরকার এর মূল হোতাদের ধরেনি বা ধরতে পারেনি। তারপরও যেভাবে পুঁজিবাজার এগোচ্ছে, তার মধ্যে ব্যাংক ও আর্থিক খাতই বেশি নির্ভরযোগ্য বলে মনে করেন বিনিয়োগকারীরা। এ খাত থেকে বিনিয়োগকারীরা ভালো ডিভিডেন্ড পান এবং এখানে লোকসানের আশঙ্কাও কম থাকে। কিন্তু নানা কারণে ব্যাংকগুলো খারাপ করছে। ফলে এর প্রভাব পড়ছে শেয়ারবাজারেও।
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৩০টি ব্যাংকের মধ্যে ২৭টির শেয়ার দর সম্পদ মূল্যের (এনএভি) নিচে অবস্থান করছে। ভালো অবস্থায় আছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক ও ট্রাস্ট ব্যাংক। শেয়ারদর সম্পদমূল্যের নিচে অবস্থান করছে এমন ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে এবি ব্যাংক, আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, সিটি ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, এসআইবিএল, রূপালী ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক প্রভৃতি।
এই পরিস্থিতি পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের ক্ষুব্ধ করছে। অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ গ্রাহকরা শেয়ার ছেড়ে দিচ্ছেন। শেয়ার চলে যাচ্ছে কারসাজি চালানো গ্রুপগুলোর হাতে। ফলে পুঁজিবাজার প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হচ্ছে। যদিও এতদিনের বাজে অবস্থার মধ্যে ব্যাংকগুলোই মূলত সাধারণ গ্রাহকদের ধরে রেখেছিল। এখন ব্যাংকগুলোর শেয়ারের এই দুরবস্থার কারণে সামগ্রিকভাবে পুরো পুঁজিবাজারই ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।

৯ ব্যাংক মূলধন হারিয়েছে
একটি ব্যাংক যে ঋণ দেয় তা ব্যাংকের নিজের এবং গ্রাহকদের। কিন্তু গ্রাহকের বিনিয়োগ মিটিয়ে দেয়ার বাধ্যবাধকতা থাকায় ঋণ উঠিয়ে আনা না গেলে বা বাজে ঋণ দিলে চাপটা গিয়ে পড়ে ব্যাংকের সঞ্চিত মূলধনে। নিয়মানুযায়ী ব্যাংকগুলোকে ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের ১০ শতাংশের পরিমাণ অর্থ মূলধন হিসেবে সংরক্ষণ করতে হয়। বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের কারণে এখন অনেক ব্যাংক তাই পড়েছে মূলধন ঘাটতিতে। বর্তমানে এ অবস্থায় আছে ৯টি ব্যাংক। এর মধ্যে সরকারি ব্যাংক ৭টি। যদিও বিগত গত দুই অর্থবছরে সরকারি ব্যাংকগুলোর ঘাটতি পূরণে ৫ হাজার ২১০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার।
জানা গেছে, ২০১৬ সালের জুন অবধি সব মিলিয়ে ৯টি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা। সরকারি খাতের ৭টি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৯২২ কোটি টাকা। এর মাত্র ৩ মাস আগে তাদের ঘাটতি ছিল ১৩ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকা। তখন মূলধন ঘাটতিতে ছিল ৫ ব্যাংক। সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে মূলধন ঘাটতি সবচেয়ে বেশি সোনালী ব্যাংকের। এর মূলধন ঘাটতি হয়েছে ২ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা। বেসিক ব্যাংকের ঘাটতি ২ হাজার ২৮৬ কোটি, রূপালী ব্যাংকের ঘাটতি ১ হাজার ৫৩ কোটি টাকা, জনতা ব্যাংকের ঘাটতি ৬৬৪ কোটি টাকা, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ঘাটতি ৭ হাজার ৪১৫ কোটি টাকা, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ঘাটতি ৬৯৯ কোটি টাকা। বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের ঘাটতি হয়েছে ১ হাজার ৪৩৬ কোটি টাকা ও বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ঘাটতি ২৯৮ কোটি টাকা।
নিয়মানুযায়ী, ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের জোগান দেয়া অর্থ ও মুনাফার একটি অংশ মূলধন হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়। কোনো ব্যাংক মূলধন ঘাটতি রেখে শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দিতে পারে না। ফলে এই ব্যাংকগুলো মূলধন ঘাটতিতে পড়ায় এখন সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে। মূলধন ঘাটতি পূরণে সরকার বরাবরই রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে অর্থের জোগান দিয়ে যাচ্ছে। গত অর্থবছরে ৫ হাজার কোটি টাকা এ খাতে বরাদ্দ রাখা হলেও দেয়া হয় শেষ পর্যন্ত ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। বেশির ভাগটাই যায় বেসিক ব্যাংকের হিসাবে। সাহায্য চালিয়ে গেলেও এই পরিস্থিতি থেকে ব্যাংকগুলোকে বের করে আনতে পারছে না সরকার।

বিচারহীনতা ও অনিয়ম
সরকারের গত মেয়াদে সংঘটিত পুঁজিবাজার, হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, বেসিক ব্যাংক ও ডেসটিনি কেলেঙ্কারির সঙ্গে এই মেয়াদে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা চুরির ঘটনা। কিন্তু এসব ঘটনার কোনোটিরই বিচার হয়নি। এর ফলে ব্যাংকিং খাতে অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ক্রমান্বয়ে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ারও একই কারণ। ব্যাংকিং খাতে অপরাধীদের বিচার ও সময়মতো উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণের অভাবকেই এই খাতের দুরবস্থার জন্য দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বর্তমানে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে মূল সমস্যাগুলো হচ্ছে, কোনো কোনো ব্যাংকে অলস টাকা পড়ে থাকা, ব্যাংকগুলো যে ঋণ দিচ্ছে তা আদায় করতে না পারা কিংবা কাকে ঋণ দেয়া হবে তা নিয়ে সঙ্কট তৈরি হওয়া, নানা অনিয়ম ও জালিয়াতি, ব্যাংকগুলোর কেবল লাভের পেছনে ছোটা, বিপুল অঙ্কের খেলাপি ও মন্দ ঋণ, ব্যাংকগুলোর আইটি সিস্টেম সুরক্ষিত না থাকা, বেসরকারি ও সরকারি ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি, আমানত সংগ্রহে অসম প্রতিযোগিতা, ব্যবস্থাপনার সংকট, পরিচালকদের অযাচিত হস্তক্ষেপ ও রাজনৈতিক প্রভাব।
এসব সংকট থেকে ব্যাংকিং খাতকে বের করে আনতে প্রয়োজন একগুচ্ছ সমন্বিত উদ্যোগ এবং যোগ্য লোকদের দায়িত্ব দেয়া ও অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করা। সর্বোপরি সরকারের আন্তরিকতা ও কঠোর মনোভাবই কেবল এ পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে পারে। কিন্তু তেমন কোনো উদ্যোগ এখন অবধি দেখা যাচ্ছে না। ফলে ব্যাংকিং খাতের দুরবস্থা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
ব্যাংকিং খাত বিশেষজ্ঞ খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘শতকরা এক বা দেড় ভাগ ঋণখেলাপি হলে তা স্বাভাবিক গণ্য হয়। যদি এটা দুই ভাগে গড়ায় তাহলে ব্যাপারটা আশঙ্কাজনক। ৫ ভাগ হলে পরিস্থিতিটা আতঙ্কের। আর ১০ ভাগ হলে তা ভয়ানক। এখন ১০ ভাগের সীমাও পেরিয়ে গেছে। এটাকে বলতে হবে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে এবং এই খাতটি অরাজকতার কবলে পড়েছে। সরকারকে অবশ্যই এই খাতের সাংঘর্ষিক আইনগুলো দূর করতে হবে। প্রয়োজনের বিবেচনা না করে এভাবে একের পর এক ব্যাংকের অনুমোদন বন্ধ করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ব্যাপক সংস্কার দরকার, এর ব্যবস্থাপনা যে অদক্ষ তা নতুন করে প্রমাণের প্রয়োজন নেই। সমন্বিত নীতিমালা প্রয়োগের সক্ষমতা অর্জন করতে হবে এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ বা অপরাধীকে ছাড় দেয়ার কোনো সুযোগই রাখা যাবে না। কিন্তু এরকমটা দেখা যাচ্ছে না। যারা ভালো করছে, সেটা তাদের একান্ত নিজস্ব উদ্যোগ। এখানে সরকারের কোনো অবদান দেখছি না।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘ব্যাংকিং খাতের মূল সমস্যাটা আমি বলব সুশাসনের অভাব। বিশেষ করে সরকারি ব্যাংকগুলোতে এটা সবচেয়ে বেশি। দুর্নীতিতে নিমজ্জিতদের বিচারের মুখোমুখি না করা গেলে এই খাতের বেহাল দশা কাটানো সম্ভব হবে না। শুধু নিয়ন্ত্রণ আরোপের পরিকল্পনা দিয়ে কাজ হবে না। বেশি নিয়ন্ত্রণ অবশ্যই নেতিবাচক। আর রাজনৈতিক ভাবনা থেকে যদি দেখা হয় কোন ব্যাংকের উদ্যোক্তা কে, তাহলে এই খাত আরও খারাপ অবস্থায় পড়বে। সরকারকে কার্যকর কিছু উদ্যোগ নিতে হবে। খেলাপি ঋণসহ অন্য যেসব অপরাধ বেড়ে যাচ্ছে এগুলোর রাশ টেনে ধরতে হবে। ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও তা তদারকির জন্য সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করার বিধান রেখে নিয়ন্ত্রক কমিশন গঠন করতে হবে এবং তাকে দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে সাংবিধানিক ক্ষমতা দিতে হবে।’
অর্থনীতিবিদ ও বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ অনেক বেড়ে গেছে। এর ফলে অর্থঋণ আদালতে খেলাপি ঋণসংক্রান্ত মামলার জট সৃষ্টি হয়েছে। এটা দ্রুত কমাতে হবে। এই খাতে রাইট অফ বা ঋণ অবলোপন বেড়েছে। ঋণ পুনর্গঠনও হতাশাজনক হারে বেড়েছে। একই ঋণ বারবার পুনর্গঠন করা হচ্ছে। অকার্যকর ঋণের উচ্চ সুদের কারণে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে করণীয় হচ্ছে, ঋণ ও আমানতের সুদহার কমাতে হবে। খেলাপিদের ধরতে হবে। ব্যাংক কোম্পানি আইনেরও কিছু ধারা সংশোধন করা লাগতে পারে। কিন্তু কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখতে পাচ্ছি না। আশা করি সরকার দ্রুত এই সংকট মোকাবিলায় যথার্থ পদক্ষেপ গ্রহণের দিকে এগোবে।’
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার কী ভাবছে জানতে আমরা কথা বলেছি অর্থ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ড. মো. আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সরকার অবশ্যই সঙ্কটগুলো বিবেচনায় রেখেছে। অকার্যকর ঋণের পরিমাণ বেড়ে যে বোঝা তৈরি হয়েছে তা অবশ্যই নামাতে হবে। সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে এই খাতকে শক্তিশালী করার কাজ চালাচ্ছে। অফশোর ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রণ করার জন্য একটি খসড়া নীতিমালা করা হয়েছে। পর্যালোচনা শেষে এটি দ্রুতই বাস্তবায়নের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। ব্যাংকিং খাত ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি স্বতন্ত্র কমিশন গড়ে তোলার ভাবনাও সরকারের রয়েছে। বিভিন্ন দিক বিচার করে দেখা হচ্ছে। খেলাপি ঋণ আদায়ে বেসরকারি এজেন্ট নিয়োগসহ আরও কিছু পদ্ধতির কথা ভাবছি আমরা। কেউ অপরাধ করলে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য অর্থঋণ আদালত আছে। তারপরও সরকার বসে নেই, সংকটগুলো সমাধানে আমরা কাজ করছি। প্রয়োজন সব মহলের সচেতনতা ও সহযোগিতা।’
এখন এই রাজনীতির জাদুর কবলে পড়ে দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি ব্যাংক ব্যবস্থা হাওয়ার আতঙ্কে আছেন অর্থনীতিবিদরা। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংকের নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকার পরও রাষ্ট্র খাতের সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকের অবস্থার উন্নতির কোনো লক্ষণ নেই। অর্থনীতিবিদদের পর্যবেক্ষণ সরকারের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক বিবেচনায় এই ব্যাংকগুলোর পরিচালক ও শীর্ষ ব্যবস্থাপনা পদে লোকবল নিয়োগ দেয়া, ঋণ বিতরণ থেকে পদোন্নতিসহ সব ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক প্রাধান্যের কারণে সংকট দিন দিন বাড়ছে। অথচ সম্পদ ও কাঠামোগত দিক বিবেচনায় দেশের ব্যাংকিং খাতের মধ্যে সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংক। এই বিপুল পরিমাণ সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব যে পরিচালনা পরিষদ তার বেশির ভাগ সদস্যই নিয়োগ পেয়েছেন রাজনৈতিক বিবেচনায়। পেশাদারিত্বের চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয়কে বেশি গুরুত্ব দেয়ায় অপেশাদারদের হাতে পড়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে গ্রাস করছে দুর্নীতি আর অনিয়ম।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দূর না করে যারা উন্নয়নের দুঃস্বপ্ন দেখেন তাদের উদ্দেশে হ্যান্স এফ সেনহলজ  ( Hans F. Sennholz ) বলেছেন,, The connection between economics and politics is clearly visible. Economic production sustains human life which, for most people, is the most important concern in life. The prestige of democratic government, its rise and fall, usually depend on its economic performance. Economic policies must please the greatest number of people who decide democratic elections and re-elections.  অর্থাৎ অর্থনীতির সাথে রাজনীতির সম্পর্ক সুস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। অর্থনীতির উৎপাদনমুখী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা সাথে অধিকাংশ মানুষের অস্তিত্ব জড়িত। একটি গণতান্ত্রিক সরকারের উত্থান-পতন নির্ভর করে তাদের আর্থিক কর্মকান্ডে সাফল্যের ওপর। অধিকাংশ জনগণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত বা পুনঃনির্বাচিত তাদেরকেই করার সিদ্ধান্ত নেয়, যাদের অর্থনৈতিক পলিসি তাদের উন্নয়নে সহায়ক।’ দেশের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দূর না হলে দীর্ঘ মেয়াদে এই সঙ্কট শুধু ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে নয় অর্থনীতিকেই গ্রাস করবে।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

SHARE