নিরাপদ অভিবাসন, রেমিট্যান্স ও কূটনৈতিক প্রয়াস – ড. মুহাম্মদ নাজমুস সাকিব

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণ এ দেশের প্রবাসীরা। তাদের পাঠানো আয়ের ওপর অনেকখানি নির্ভর করে বাংলাদেশের অর্থনীতি। বৈদেশিক রিজার্ভ বেড়ে চলার জন্য এ দেশবাসী গর্ববোধ করেন, তার পেছনেও রয়েছে প্রবাসীদের পাঠানো কষ্টার্জিত অর্থ। মানবসম্পদ বাংলাদেশের অমূল্য সম্পদ। এই সম্পদের সঠিক যত্ন ও পরিচর্যার মাধ্যমে দেশ হয়ে উঠছে সমৃদ্ধশালী। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি ও বিদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল হচ্ছে। বিশ্বায়ন, যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়ন, উন্নত জীবন জীবিকার আকাক্সক্ষার পরিপ্রেক্ষিতে অভিবাসন বর্তমান বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ আলোচিত বিষয়। বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতিতে প্রবাসীদের প্রেরিত রেমিট্যান্স অবদান জিডিপির ১৫ শতাংশের ওপর। অভিবাসীদের মর্যাদা ও অধিকার সমুন্নত রাখার প্রয়াসে প্রতি বছর ১৮ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস পালিত হয়ে আসছে। ২০০০ সালের ৪ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর থেকে প্রতি বছর এই দিন জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত সব দেশে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। ‘দক্ষ হয়ে বিদেশ গেলে অর্থ সম্মান দুই মিলে’ এই প্রতিপাদ্যে বাংলাদেশেও ২০১৯ সালে দিবস নানা আয়োজনে পালিত হয়েছে।
টেকসই উন্নয়ন ২০৩০-এর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অভিবাসন খাতে বিশেষ করে শোভন কাজ ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, অসমতা হ্রাসে সরাসরি জড়িত। বিশ্ব অভিবাসন রিপোর্ট-২০১৯ অনুযায়ী বর্তমান বিশ্বে অভিবাসী প্রায় ২৭ কোটি ২০ লাখ। এর মধ্যে বর্তমান বিশ্বের ১৭৩টি দেশে বাংলাদেশের ১ কোটি ৩০ লাখের মতো মানুষ অভিবাসী হিসাবে কর্মরত। বিশ্বের সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স অর্জনে বাংলাদেশের অবস্থান নবম। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স পরিমাণ ১৬.৪২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাওয়া গেছে যা ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরের তুলনায় ৯.৬১ শতাংশ বেশি। এটি নিঃসন্দেহে বলা যায় যে অভিবাসন বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অব্যাহত প্রচেষ্টায় ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে ৬ লাখ ৫৯ হাজার ৪৩ জন কর্মী বৈদেশিক কর্মসংস্থানের জন্য গিয়েছে। তন্মধ্যে পুরুষ কর্মীর সংখ্যা ৫ লাখ ৫১ হাজার ৪৭৮ এবং নারীর সংখ্যা ১ লাখ ৭ হাজার ৫৬৫ জন। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে যেসব খাত বিশেষ ভূমিকা রাখে তার মধ্যে বৈদেশিক কর্মসংস্থান অন্যতম। বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়া একদিকে বেকারত্বের সংখ্যা কমছে অন্যদিকে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স অর্থনীতির উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। সরকার ঘোষিত রূপকল্প-২০২১ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকারের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সংস্থা কাজ করে যাচ্ছে, যাতে করে বিদেশে কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্সের মাধ্যমে ঘোষিত রূপকল্প-২০২১ বাস্তবায়নে ভূমিকা পালন ও কার্যকর করতে পারে।
বাংলাদেশ সরকার এ দেশের শ্রমশক্তি বা জনবল যাতে দক্ষ হয়ে গড়ে ওঠে, সে জন্য জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এ পর্যন্ত ৭০টি কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৫৫টি ট্রেডে মোট ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৭২৭ জনকে প্রশিক্ষণ প্রদান করেছে। ২১ টিটিসিতে জাপানিজ, কোরিয়ান, আরবি, ইংরেজি ভাষা প্রশিক্ষণ কোর্স চালু করা হয়েছে। ২০১৭ সালে স্বাক্ষরিত এমওইউ এবং ২০১৮ সালে জাপান সরকারের সঙ্গে স্বাক্ষরিত এমওসি অনুযায়ী জাপানে বিনা অভিবাসন ব্যয়ে টেকনিক্যাল ইন্টার্নি প্রেরণ করা হচ্ছে। বিদেশ গমনেচ্ছু কর্মীদের সঠিক পন্থায় বিদেশ গমন ও গন্তব্য দেশের আবহাওয়া, কর্মপরিবেশ, স্বাস্থ্যবিধি, আইনকানুন, বিধিবিধান, করণীয় বা বর্জনীয়, বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রেরণ, উপার্জিত অর্থের সঠিক বিনিয়োগ প্রভৃতি সম্পর্কে ধারণা দেয়ার জন্য ৬০টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) ও ছয়টি ইনস্টিটিউট অব মেরিন টেকনোলজি (আইএমটি) প্রি-ডিপার্চার ট্রেনিং দেশব্যাপী পরিচালনা করা হচ্ছে।
তবে বিদেশ বিভূঁইয়ে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশীদের সমস্যার অন্ত নেই। কষ্টার্জিত অর্থ স্বদেশে পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা রাখার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও প্রবাসীদের দিন কাটাতে হয় নানামুখী সঙ্কটের মধ্যে। সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিক এর শীর্ষ সংবাদে ‘প্রবাসে ভালো নেই ওরা’ শিরোনামে সে কথাই জানিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, জালিয়াতের খপ্পর থেকে শুরু করে নানা সঙ্কটের মুখে দেশে ফিরে আসার মতো অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে তাদের। বেশ কয়েক মাস থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশীরা দেশে ফিরে আসছেন খালি হাতে। এ দিকে, মালয়েশিয়া একটি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে অবৈধ বাংলাদেশীদের দেশে ফেরত পাঠাতে। বিভিন্ন দেশের জেলহাজতে রয়েছে অনেক বাংলাদেশী প্রবাসী। এরা সেখানে নানা ধরনের প্রতারণার শিকার। পত্রিকাটি আরো জানিয়েছে, অসাধু জনশক্তি রফতানিকারক সিন্ডিকেটের কারণে অভিবাসন ব্যয় যেমন বেড়েছে, তেমনি বিদেশে যাওয়ার পর প্রতারণার শিকারও হচ্ছেন তারা। শুধু তা-ই নয়, তাদের অনেকে জীবননাশের হুমকিতেও পড়েছেন। বেশ কয় বছর থেকে খবর পাওয়া যাচ্ছে অনেকে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়ার জঙ্গল এলাকায় বন্দী অবস্থায় আছেন। অনেকেই ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি হয়েছেন, আবার কেউ কেউ মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছেন। দেশ দু’টিতে অনেক গণকবরও আবিষ্কার হয়েছে। ফলে নিরাপত্তায় মানবেতর দিন কাটাতে হচ্ছে অনেক প্রবাসীকে। সৌদি আরব, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া, মালয়েশিয়া, ব্রুনাই ও মালদ্বীপসহ আফ্রিকা, ইউরোপ-আমেরিকার অনেক দেশে প্রবাসীরা কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। এসব দেশে বন্দী হয়ে আছেন অনেক বাংলাদেশের শ্রমিক। আবার অনেকেই জুলুম-নির্যাতনের শিকার।
বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, যারা অবৈধ অভিবাসী শ্রমিক হিসেবে বিভিন্ন দেশের কারাগারে আটক রয়েছেন, আসলে জনশক্তি রফতানিকারক সিন্ডিকেটের নানাধর্মী প্রতারণার শিকার হয়েই তাদের এই পরিণতি। তাদের ভুয়া নিয়োগদাতার নামে বিদেশে পাঠানোর পর এক শ্রেণীর দালালের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। এদের মালয়েশিয়া সরকার অবৈধ প্রবাসী শ্রমিক হিসেবে চিহ্নিত করে কাউকে স্বদেশে ফেরত পাঠিয়ে দিচ্ছে, নয়তো কারাগারে পাঠাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব রফতানিকারক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে নানা সমালোচনা হলেও কারো বিরুদ্ধে তেমন কোনো ব্যবস্থা নেয়ার কথা শোনা যায়নি। এটি মনে করা যায় যে, এদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান না করলে, এদের হাতে আরো অনেক বাংলাদেশী প্রতারণার শিকারে পরিণত হবেন।

মালয়েশিয়া থেকে দেশে ফিরছেন অবৈধ শ্রমিকরা
মালয়েশিয়ায় এখন ডা: মাহাথির মোহাম্মদ সরকারের ২০১৯ সালের ১লা সেপ্টেম্বর থেকে চার মাসের জন্য সাধারণ ক্ষমায় (ব্যাক ফর গুড) কর্মসূচি চলছে। ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯ এ কর্মসূচির শেষ হবে। এ কর্মসূচি চলাকালীন সময়ে স্পেশাল পার্সে যেসব বাংলাদেশী ইতোমধ্যে মালয়েশিয়া থেকে দেশে ফিরেছেন তারা আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে কোনোভাবেই আর মালয়েশিয়ায় যেতে পারবেন না। দেশটির ইমিগ্রেশন বিভাগ এসব অবৈধদের ব্ল্যাকলিস্ট করে ১০ আঙুলের চাপ (ফিঙ্গার প্রিন্ট) নিয়ে পাস ইস্যু করেছেন।
এছাড়া কিছু কিছু দেশের অভিবাসী নীতির কারণেও অনেক প্রবাসী বাংলাদেশের শ্রমিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। সম্প্রতি সৌদি আরবে ব্যাপক ধরপাকড় শুরু হয়েছে। কাজের অনুমতিপত্র (আকামা) থাকলেও এসব শ্রমিককে দেশে ফেরত আসতে বাধ্য করছে। পাশাপাশি সৌদি আরব কাজের জায়গাও কমে আসছে। ভিসা জটিলতার কারণেও অনেকে ভিন্ন কাজ করতে হচ্ছে। তাতে আবার বাদ সাধছে সৌদি পুলিশ। তাদের গ্রেফতার করছে। বাংলাদেশী শ্রমিকদের সবচেয়ে বড় বাজার সৌদি আরব। ওই দেশ থেকে প্রায়ই শ্রমিকরা ফেরত আসছে। নারীশ্রমিক পাঠানো নিয়ে চলছে বিতর্ক। তেলসমৃদ্ধ দেশ সৌদি আরব ১৫ লক্ষাধিক নারী-পুরুষ কর্মী কঠোর পরিশ্রম করে প্রচুর রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। প্রবাসী সচিব মো: সেলিম রেজার নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে যোগদানের জন্য সৌদি আরব সফরে গিয়েছেন।
জনশক্তি রফতানির দ্বিতীয় বৃহত্তর দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতের দীর্ঘ ৭ বছর ধরে কর্মী নিয়োগ বন্ধ রয়েছে। বাহরাইন ও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের দুয়ার খুলছে না। কুয়েত, কাতার, ওমান, জর্ডান ও লেবাননের স্বল্প সংখ্যক কর্মী যাচ্ছে।
জনশক্তি রফতানির গতি বাড়াতে এবং বন্ধ শ্রমবাজার পুনরুদ্ধারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তৎপরতা আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছে বায়রার সাবেক সভাপতি মো: গোলাম মোস্তফা। তিনি শ্রমবাজার সম্প্রসারণে বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলোতে পর্যাপ্ত জনবল বৃদ্ধি এবং প্রবাসীদের সেবা নিশ্চিতকরণে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন।
আসলে প্রবাসী বাংলাদেশীদের সব রকম ঝামেলা থেকে মুক্ত করার জন্য জোরদার কূটনৈতিক তৎপরতা দরকার। একই সাথে ক্রমেই সঙ্কুচিত হওয়া বাংলাদেশের শ্রমবাজার চাঙ্গা করার জন্য বাংলাদেশী দূতাবাসগুলোকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। ভুললে চলবে না, এমনিতেই বাংলাদেশের বেকারত্ব খুবই প্রবল।
লেখক : কলামিস্ট ও উন্নয়ন গবেষক

SHARE

Leave a Reply