নির্যাতিতদের আল্লাহ পুরষ্কৃত করবে।

ড. মুহাম্মদ আব্দুল মান্নান

إِنَّ الَّذِينَ يَكْفُرُونَ بِآيَاتِ اللَّهِ وَيَقْتُلُونَ النَّبِيِّينَ بِغَيْرِ حَقٍّ وَيَقْتُلُونَ الَّذِينَ يَأْمُرُونَ بِالْقِسْطِ مِنَ النَّاسِ فَبَشِّرْهُمْ بِعَذَابٍ أَلِيمٍhadith (২১) أُولَئِكَ الَّذِينَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَمَا لَهُمْ مِنْ نَاصِرِينَ (২২)
অনুবাদ : যারা আল্লাহর বিধান ও হেদায়াত মানতে অস্বীকার করে এবং তাঁর নবীদেরকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে, আর এমন লোকদের প্রাণসংহার করে, যারা মানুষের মধ্যে ন্যায়, ইনসাফ ও সততার নির্দেশ দেয়ার জন্য এগিয়ে আসে, তাদের কঠিন শাস্তির সুসংবাদ দাও। এরা এমন সব লোক যাদের কর্মকান্ড (আ’মল) দুনিয়া ও আখেরাত উভয় স্থানেই নষ্ট হয়ে গেছে, এবং তাদের কোন সাহায্যকারী নেই। (সূরা আলে ইমরান : ২১ ও ২২)
নামকরণ
এই সূরার এক জায়গায় ‘আলে ইমরানের’ কথা বলা হয়েছে। একেই আলামত হিসেবে এর নাম গণ্য করা হয়েছে।
নাজিলের সময়কাল ও বিষয়বস্তুর অংশসমূহ
প্রথম ভাষণটি সূরার প্রথম থেকে শুরু হয়ে চতুর্থ রুকুর প্রথম দুই আয়াত পর্যন্ত চলেছে এবং এটি সম্ভবত বদর যুদ্ধের নিকটবর্তী সময়ে নাজিল হয়।
দ্বিতীয় ভাষণটি
إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَى آدَمَ وَنُوحًا وَآلَ إِبْرَاهِيمَ وَآلَ عِمْرَانَ عَلَى الْعَالَمِينَ
(আল্লাহ আদম, নূহ, ইবরাহিমের বংশধর ও ইমরানের বংশধরদের সারা দুনিয়াবাসীর ওপর প্রাধান্য দিয়ে নিজের রিসালাতের জন্য বাছাই করে নিয়েছিলেন।) আয়াত থেকে শুরু হয়ে ষষ্ঠ রুকুর শেষে গিয়ে শেষ হয়েছে। ৯ হিজরিতে নাজরানের প্রতিনিধিদলের আগমনকালে এটি নাজিল হয়।
তৃতীয় ভাষণটি সপ্তম রুকুর শুরু থেকে নিয়ে দ্বাদশ রুকুর শেষ অব্দি চলেছে। প্রথম ভাষণের সাথে সাথেই এটি নাজিল হয়।
চতুর্থ ভাষণটি ত্রয়োদশ রুকু থেকে শুরু করে সূরার শেষ পর্যন্ত চলেছে। ওহুদ যুদ্ধের পর এটি নাজিল হয়।
সম্বোধন ও আলোচ্য বিষয়াবলি
এই বিভিন্ন ভাষণকে এক সাথে মিলিয়ে যে জিনিসটি একে একটি সুগ্রথিত ধারাবাহিক প্রবন্ধে পরিণত করেছে সেটি হচ্ছে এর উদ্দেশ্য, মূল বক্তব্য ও কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তুর সামঞ্জস্য ও একমুখিতা। সূরায় বিশেষ করে দু’টি দলকে সম্বোধন করা হয়েছে। একটি দল হচ্ছে, আহলি কিতাব (ইহুদি ও খ্রিস্টান) এবং দ্বিতীয় দলটিতে রয়েছে এমন সব লোক যারা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ঈমান এনেছিল।
সূরা বাকারায় ইসলামের বাণী প্রচারের যে ধারা শুরু করা হয়েছিল প্রথম দলটির কাছে সেই একই ধারায় প্রচার আরো জোরালো করা হয়েছে। তাদের আকিদাগত ভ্রষ্টতা ও চারিত্রিক দুষ্কৃতি সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়ে তাদেরকে জানানো হয়েছে যে, এই রাসূল এবং এই কুরআন এমন এক দ্বীনের দিকে নিয়ে আসছে প্রথম থেকে সকল নবীই যার দাওয়াত দিয়ে আসছেন এবং আল্লাহর প্রকৃতি অনুযায়ী যা একমাত্র সত্য দ্বীন। এই দ্বীনের সোজা পথ ছেড়ে তোমরা যে পথ ধরেছো তা যেসব কিতাবকে তোমরা আসমানি কিতাব বলে স্বীকার করো তাদের দৃষ্টিতেও সঠিক নয়। কাজেই যার সত্যতা তোমরা নিজেরাও অস্বীকার করতে পারো না তার সত্যতা স্বীকার করে নাও।
দ্বিতীয় দলটি এখন শ্রেষ্ঠতম দলের মর্যাদা লাভ করার কারণে তাকে সত্যের পতাকাবাহী ও বিশ্বমানবতার সংস্কার ও সংশোধনের দায়িত্ব দান করা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে সূরা বাকারায় যে নির্দেশ শুরু হয়েছিল এখানে আরো বৃদ্ধি করা হয়েছে। পূর্ববর্তী উম্মতদের ধর্মীয় ও চারিত্রিক অধঃপতনের ভয়াবহ চিত্র দেখিয়ে তাকে তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করা থেকে দূরে থাকার জন্য সতর্ক করা হয়েছে। একটি সংস্কারবাদী দল হিসেবে সে কিভাবে কাজ করবে এবং যেসব আহলি কিতাব ও মুনাফিক মুসলমান আল্লাহর পথে নানা প্রকার বাধাবিপত্তি সৃষ্টি করছে তাদের সাথে কী আচরণ করবে, তা-ও তাকে জানানো হয়েছে। ওহুদ যুদ্ধে তাঁর মধ্যে যে দুর্বলতা দেখা দিয়েছিল তা দূর করার জন্যও তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।
এভাবে এ সূরাটি শুধুমাত্র নিজের অংশগুলোর মধ্যে ধারাবাহিকতা রক্ষা করেনি এবং নিজের অংশগুলোকে একসূত্রে গ্রথিত করেনি বরং সূরা বাকারার সাথেও এর নিকট সম্পর্ক দেখা যাচ্ছে। এটি একেবারেই তার পরিশিষ্ট মনে হচ্ছে। সূরা বাকারার লাগোয়া আসনই তার স্বাভাবিক আসন বলে অনুভূত হচ্ছে।
নাজিলের কার্যকারণ : সূরাটির ঐতিহাসিক পটভূমি
এক. এই সত্য দ্বীনের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারীদেরকে সূরা বাকারায় পূর্বাহ্নেই যেসব পরীক্ষা, বিপদ-আপদ ও সঙ্কট সম্পর্কে সতর্ক করে দেয়া হয়েছিল তা পূর্ণ মাত্রায় সংঘটিত হয়েছিল। বদর যুদ্ধে ঈমানদারগণ বিজয় লাভ করলেও এ যুদ্ধটি যেন ছিল ভিমরুলের চাকে ঢিল মারার মতো ব্যাপার। এ প্রথম সশস্ত্র সংঘর্ষটি আরবের এমন সব শক্তিগুলোকে অকস্মাৎ নাড়া দিয়েছিল যারা এ নতুন আন্দোলনের সাথে শত্রুতা পোষণ করতো। সবদিকে ফুটে উঠছিল ঝড়ের আলামত। মুসলমানদের ওপর একটি নিরন্তর ভীতি ও অস্থিরতার অবস্থা বিরাজ করছিল। মনে হচ্ছিল, চার পাশের সারা দুনিয়ার আক্রমণের শিকার মদিনার এ ক্ষুদ্র জনবসতিটিকে দুনিয়ার বুক থেকে মুছে ফেলে দেয়া হবে। মদিনার অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর এ পরিস্থিতির অত্যন্ত বিরূপ প্রভাব পড়েছিল। মদিনা ছিল তো একটি ছোট্ট মফস্বল শহর। জনবসতি কয়েক শ’ ঘরের বেশি ছিল না। সেখানে হঠাৎ বিপুল সংখ্যক মুহাজিরের আগমন। ফলে অর্থনৈতিক ভারসাম্য তো এমনিতেই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তার ওপর আবার এই যুদ্ধাবস্থার কারণে বাড়তি বিপদ দেখা দিলো।
দুই. হিজরতের পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনার আশপাশের ইহুদি গোত্রগুলোর সাথে যে চুক্তি সম্পাদন করেছিলেন তারা সেই চুক্তির প্রতি সামান্যতমও সম্মান প্রদর্শন করেনি। বদর যুদ্ধকালে এই আহলি কিতাবদের যাবতীয় সহানুভূতি তাওহিদ ও নবুওয়াত এবং কিতাব ও আখেরাত বিশ্বাসী মুসলমানদের পরিবর্তে মূর্তিপূজারি মুশরিকদের সাথে ছিল। বদর যুদ্ধের পর তারা কুরাইশ ও আরবদের অন্যান্য গোত্রগুলোকে প্রকাশ্যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে প্রতিশোধ গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করতে থাকে। বিশেষ করে বনি নাজির সরদার কাব ইবনে আশরাফ তো এ ব্যাপারে নিজের বিরোধমূলক প্রচেষ্টাকে অন্ধ শত্রুতা বরং নীচতার পর্যায়ে নামিয়ে আনে। মদিনাবাসীদের সাথে এই ইহুদিদের শত শত বছর থেকে যে বন্ধুত্ব ও প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক চলে আসছিল তার কোন পরোয়াই তারা করেনি। শেষে যখন তাদের দুষ্কর্ম ও চুক্তি ভঙ্গ সীমা ছাড়িয়ে যায় তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদর যুদ্ধের কয়েক মাস পর এই ইহুদি গোত্রগুলোর সবচেয়ে বেশি দুষ্কর্মপরায়ণ ‘বনি কাইনুকা’ গোত্রের ওপর আক্রমণ চালান এবং তাদেরকে মদিনার শহরতলি থেকে বের করে দেন। কিন্তু এতে অন্য ইহুদি গোত্রগুলোর হিংসার আগুন আরো তীব্র হয়ে ওঠে। তারা মদিনার মুনাফিক মুসলমান ও হিজাজের মুশরিক গোত্রগুলোর সাথে চক্রান্ত করে ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য চার দিকে অসংখ্য বিপদ সৃষ্টি করে। এমনকি কখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রাণনাশের জন্য তাঁর ওপর আক্রমণ চালানো হয় এই আশঙ্কা সর্বক্ষণ দেখা দিতে থাকে। এ সময় সাহাবায়ে কেরাম সবসময় সশস্ত্র থাকতেন। নৈশ আক্রমণের ভয়ে রাতে পাহারা দেয়া হতো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি কখনো সামান্য সময়ের জন্যও চোখের আড়াল হতেন সাহাবায়ে কেরাম উদ্বেগ আকুল হয়ে তাঁকে খুঁজতে বের হতেন।
তিন. বদরে পরাজয়ের পর কুরাইশদের মনে এমনিতেই প্রতিশোধের আগুন জ্বলছিল, ইহুদিরা তার ওপর কেরোসিন ছিটিয়ে দিলো। ফলে এক বছর পরই মক্কা থেকে তিন হাজার সুসজ্জিত সৈন্যের একটি দল মদিনা আক্রমণ করলো। এ যুদ্ধটি হলো ওহুদ পাহাড়ের পাদদেশে। তাই ওহুদের যুদ্ধ নামেই এটি পরিচিত। এ যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য মদিনা থেকে এক হাজার লোক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে বের হয়েছিল। কিন্তু পথে তিন শ’ মুনাফিক হঠাৎ আলাদা হয়ে মদিনার দিকে ফিরে এলো। নবীর (সা) সাথে যে সাত শ’ লোক রয়ে গিয়েছিল তার মধ্যেও মুনাফিকদের একটি ছোট দল ছিল। যুদ্ধ চলাকালে তারা মুসলমানদের মধ্যে ফেতনা সৃষ্টি করার সম্ভাব্য সব রকমের প্রচেষ্টা চালালো। এই প্রথমবার জানা গেলো, মুসলমানদের স্বগৃহে এত বিপুলসংখ্যক আস্তিনের সাপ লুকানো রয়েছে এবং তারা এভাবে বাইরের শত্রুদের সাথে মিলে নিজেদের ভাই-বন্ধু ও আত্মীয়-স্বজনদের ক্ষতি করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে।
চার. ওহুদের যুদ্ধে মুসলমানদের পরাজয় যদিও মুনাফিকদের কৌশলের একটি বড় অংশ ছিল তবুও মুসলমানদের নিজেদের দুর্বলতার অংশও কম ছিল না। একটি বিশেষ চিন্তাধারা ও নৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তিতে যে দলটি এই সবেমাত্র গঠিত হয়েছিল, যার নৈতিক প্রশিক্ষণ এখনো পূর্ণ হতে পারেনি এবং নিজের বিশ্বাস ও নীতির সমর্থনে যার লড়াই করার এই মাত্র দ্বিতীয় সুযোগ ছিল তার কাজে কিছু দুর্বলতা প্রকাশ হওয়াটা একটা স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। তাই যুদ্ধের পর এই যাবতীয় ঘটনাবলির ওপর বিস্তারিত মন্তব্য করা এবং তাতেই ইসলামের দৃষ্টিতে মুসলমানদের মধ্যে যেসব দুর্বলতা পাওয়া গিয়েছিল তার মধ্য থেকে প্রত্যেকটির প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করে তার সংশোধনের জন্য নির্দেশ দেবার প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। এ প্রসঙ্গে এ কথাটি দৃষ্টি সমক্ষে রাখার উপযোগিতা রাখে যে, অন্য জেনারেলরা নিজেদের যুদ্ধের পর তার ওপর যে মন্তব্য করেন এ যুদ্ধের ওপরে কুরআনের মন্তব্য তা থেকে কত ভিন্ন!
সূরা বাকারার ৬১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন,
وَإِذْ قُلْتُمْ يَا مُوسَى لَنْ نَصْبِرَ عَلَى طَعَامٍ وَاحِدٍ فَادْعُ لَنَا رَبَّكَ يُخْرِجْ لَنَا مِمَّا تُنْبِتُ الْأَرْضُ مِنْ بَقْلِهَا وَقِثَّائِهَا وَفُومِهَا وَعَدَسِهَا وَبَصَلِهَا قَالَ أَتَسْتَبْدِلُونَ الَّذِي هُوَ أَدْنَى بِالَّذِي هُوَ خَيْرٌ اهْبِطُوا مِصْرًا فَإِنَّ لَكُمْ مَا سَأَلْتُمْ وَضُرِبَتْ عَلَيْهِمُ الذِّلَّةُ وَالْمَسْكَنَةُ وَبَاءُوا بِغَضَبٍ مِنَ اللَّهِ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَانُوا يَكْفُرُونَ بِآيَاتِ اللَّهِ وَيَقْتُلُونَ النَّبِيِّينَ بِغَيْرِ الْحَقِّ ذَلِكَ بِمَا عَصَوْا وَكَانُوا يَعْتَدُونَ (৬১)
সরলানুবাদ : স্মরণ করো যখন তোমরা বলেছিলে, “হে মুসা! আমরা একই ধরনের খাবারের ওপর সবর করতে পারি না, তোমার রবের নিকট দোয়া করো যেন তিনি আমাদের জন্য শাক-সবজি, গম, রসুন, পেঁয়াজ, ডাল ইত্যাদি কৃষিজাত দ্রব্যাদি উৎপন্ন করেন।” তখন মুসা বলেছিলো, “তোমরা কি উৎকৃষ্ট জিনিসের পরিবর্তে নিকৃষ্ট জিনিস নিতে চাও? তাহলে তোমরা কোন নগরে গিয়ে বসবাস করো, তোমরা যা কিছু চাও সেখানে পেয়ে যাবে।” অবশেষে অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছাল, যার ফলে লাঞ্ছনা, অধঃপতন, দুরবস্থা ও অনটন তাদের ওপর চেপে বসল এবং আল্লাহর গজব তাদেরকে ঘিরে ফেললো। এ ছিলো তাদের আল্লাহর আয়াতের সাথে কুফরি করার এবং পয়গম্বরদেরকে অন্যায়ভাবে হত্যা করার ফল। এটি ছিলো তাদের নাফরমানির ও শরিয়তের সীমালংঘনের ফল।
অনুরূপভাবে সূরা আল-মায়েদার ৭০-৭১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন,
لَقَدْ أَخَذْنَا مِيثَاقَ بَنِي إِسْرَائِيلَ وَأَرْسَلْنَا إِلَيْهِمْ رُسُلًا كُلَّمَا جَاءَهُمْ رَسُولٌ بِمَا لَا تَهْوَى أَنْفُسُهُمْ فَرِيقًا كَذَّبُوا وَفَرِيقًا يَقْتُلُونَ (৭০) وَحَسِبُوا أَلَّا تَكُونَ فِتْنَةٌ فَعَمُوا وَصَمُّوا ثُمَّ تَابَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ ثُمَّ عَمُوا وَصَمُّوا كَثِيرٌ مِنْهُمْ وَاللَّهُ بَصِيرٌ بِمَا يَعْمَلُونَ (৭১)
সরলানুবাদ : আমি বনি ইসরাঈল থেকে পাকাপোক্ত অঙ্গীকার নিয়েছিলাম এবং তাদের নিকট অনেক রাসূল পাঠিয়েছিলাম কিন্তু যখনই তাদের কাছে কোন রাসূল তাদের প্রবৃত্তির কামনা বাসনা বিরোধী কিছু নিয়ে হাজির হয়েছেন তখনই কাউকে তারা মিথ্যুক বলেছে এবং কাউকে হত্যা করেছে, আর এতে কোন ফেতনা সৃষ্টি হবে না ভেবে তারা অন্ধ ও বধির হয়ে গেছে। তারপর আল্লাহ তাদেরকে মাফ করে দিয়েছেন। এতে তাদের অনেকেই আরো বেশি অন্ধ ও বধির হয়ে চলেছে। আল্লাহ তাদের সব কাজ পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছেন।
আলোচ্য আয়াতগুলোতে ৩টি গুরুত্বপুর্ণ বিষয় সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়, সেগুলো নি¤œরূপ :
১. দ্বীন বিরোধীদের বৈশিষ্ট্য
১. তারা আল্লাহর বিধানকে অস্বীকার করে ২. নবী-রাসূলদেরকে হত্যা করে ৩. নবী-রাসূলদের অনুসারীদেরকেও হত্যা, নির্যাতন ও কারাবন্দী করে ৪. তাদের প্রতি মিথ্যা অপবাদ আরোপ করে ৫. আল্লাহর আয়াতের ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন কনে ৬. দুনিয়াতে নাফরমানিতে লিপ্ত হয় ৭. ক্ষমতায় টিকে থাকবে মনে করে অন্ধ ও বধির হয়ে যায়।
২. বিরোধিতার কারণ
১. শরিয়তের বিধান যখন তাদের প্রবৃত্তির (কামনা-বাসনার) বিরোধী হয়েছে তখনই তারা এহেন জঘন্যতম অন্যায় করতে কুণ্ঠাবোধ করেনি ২. কুরআন তাদের এহেন জঘন্যতম অন্যায়কে মিথ্যা ও অযৌক্তিক বলেছে ৩. মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়ন করাই তাদের একমাত্র অপরাধ।
৩. বিরোধিতার পরিণতি
১. দুনিয়া ও আখেরাতে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হবে ২. তাদের অধঃপতন অবশ্যম্ভাবী ৩. অভাব, অনটন, মঙ্গা ও দরিদ্রতা দেখা দেবে ৪. তাদের জন্য কঠিন ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি অপেক্ষা করছে ৫. দুনিয়া ও আখেরাতের সকল আমল নষ্ট হয়ে যাবে ৬. দুনিয়া ও আখেরাতে তাদের কোন সাহায্যকারী থাকবে না ৭. তাদের জন্য খোদায়ি গজব ঘিরে থাকবে বা অত্যাসন্ন হবে।
প্রাসঙ্গিক আয়াতগুলোর ব্যাপারে মুফাস্সিরিনদের বক্তব্য
উপরোক্ত আয়াতগুলো নাজিলের ব্যাপারে নি¤েœর হাদিসটি প্রণিধানযোগ্য
উবাদাতা ইবনুল র্যারাহ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন আমি রাসূল (সা) কে জিজ্ঞাসা করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সা)! কিয়ামতের দিন কোন ব্যক্তির আজাব অত্যন্ত কঠিন হবে? রাসূল (সা) বললেন, ঐ ব্যক্তি যে কোন নবীকে হত্যা করেছে অথবা যে ব্যক্তি সৎকাজের আদেশ করে এবং অসৎকাজের নিষেধ করে এমন লোকদের হত্যা করে। অতঃপর রাসূল (সা) নি¤েœর আয়াত তেলাওয়াত করলেন-{ إِنَّ الَّذِينَ يَكْفُرُونَ بِآيَاتِ اللَّهِ وَيَقْتُلُونَ النَّبِيِّينَ بِغَيْرِ حَقٍّ وَيَقْتُلُونَ الَّذِينَ يَأْمُرُونَ بِالْقِسْطِ مِنَ النَّاسِ فَبَشِّرْهُمْ بِعَذَابٍ أَلِيمٍ } [إلى قوله: { وَمَا لَهُمْ مِنْ نَاصِرِينَ] } এরপর রাসূল (সা) বললেন হে উবাদাতা! বনি ইসরাঈলরা একদিন দিনের প্রথমভাগে এক ঘণ্টার ভেতরে ৪৩ জন নবীকে হত্যা করেছিল, এ কারণে ১৭০ জন সৎলোক হত্যাকারীদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করলে সেই দিনের শেষ প্রহরে সকলকেই হত্যা করেছিল। সেই নবী ও তাদের অনুসারীদের ব্যাপারে এ আয়াত নাজিল হয়েছে। (বাজ্জার, মাজমাউজ যাওয়ায়িদ, লিল হাইছামি খন্ড, ৭; তাফসিরে তাবারি ৬ষ্ঠ খন্ড, ২৮৫ পৃ.)
অন্য একটি বর্ণনায় আছে,
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) বলেন, বনি ইসরাইলরা একদিনে ৩০০ জন নবীকে হত্যা করেছিল। দিনের শেষভাগে বাজারে যারা প্রতিবাদে দাঁড়িয়ে ছিল তাঁদের সকলকে তারা হত্যা করেছিল।
অন্যত্র বলা হয়েছে, তারা একদিনে বায়তুল মুকাদ্দাছে ৩০০ নবীকে হত্যা করেছিল।
বিভিন্ন সময় নবী-রাসূল ও তাঁদের অনুসারীদের হত্যা, বন্দী ও নির্যাতনের খন্ড চিত্র
বনি ইসরাইল নিজেদের এই অপরাধকে নিজেদের ইতিহাস গ্রন্থে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছে। উদাহরণস্বরূপ বাইবেলের কয়েকটি ঘটনা এখানে উদ্ধৃত করছি।
এক. হজরত সুলাইমানের পর ইসরাইলি সা¤্রাজ্য দু’টি রাষ্ট্রে (জেরুসালেম ইহুদিয়া রাষ্ট্র এবং সামারিয়া ইসরাইল রাষ্ট্র) বিভক্ত হয়ে যায়। তাদের মধ্যে যুদ্ধ বিগ্রহ চলতে থাকে অবশেষে ইহুদিয়া রাষ্ট্র নিজের ভাইদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য দামেস্কের আরামি রাষ্ট্রের সাহায্য প্রার্থনা করে। এতে আল্লাহর নির্দেশে হানানি নবী ইহুদিয়া ও রাষ্ট্রের শাসক ‘আসা’ কে কঠোরভাবে সতর্ক করে দেন। কিন্তু ‘আসা’ এই সতর্কবাণী গ্রহণ করার পরিবর্তে আল্লাহর নবীকে কারারুদ্ধ করে। (২ বংশাবলি, ১৭ অধ্যায়, ৭-১০ শ্লোক)
দুই. হজরত ইলিয়াস (আ) যখন বাল দেবতার পূজার জন্য ইহুদিদের তিরস্কার করেন এবং নতুন করে আবারও তাওহিদের দাওয়াত দিতে থাকেন তখন সামারিয়ার ইসরাইল রাজা ‘আখিআব’ নিজের মুশরিক স্ত্রীর প্ররোচনায় তাঁর প্রাণনাশের সর্বাত্মক প্রষ্টোয় মেতে ওঠে। ফলে তাঁকে সিনাই উপদ্বীপের পার্বতাঞ্চলে আশ্রয় নিতে হয়। এ সময় হজরত ইলিয়াস (আ) যে দোয়া করেন তার শব্দাবলি ছিল নি¤œরূপ :
“বনি ইসরাইল তোমার সাথে কৃত অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছে… তোমার নবীদেরকে তলোয়ারের সাহায্যে হত্যা করেছে এবং একমাত্র আমিই বেঁচে আছি। তাই তারা আমার প্রাণনাশের চেষ্টা করছে।” (১ রাজাবলি, ১৭ অধ্যায়, ১-১০ শ্লোক)
তিন. সত্য ভাষণের অপরাধে ‘মিকাইয়াহ’ নামে একজন নবীকেও এই ইসরাইলি শাসক ‘আখিআব’ কারারুদ্ধ করে। সে হুকুম দেয়, এই ব্যক্তিকে বিপদের খাদ্য খাওয়াও এবং বিপদের পানি পান করাও। (১ রাজাবলি, ২২ অধ্যায়, ২৬-২৭ শ্লোক)
চার. আবার যখন ইহুদিয়া রাষ্ট্রে প্রকাশ্যে মূর্তিপূজা ও ব্যভিচার চলতে থাকে এবং হজরত জাকারিয়া (আ) এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হন তখন ইহুদি রাজা ‘ইউআস’-এর নির্দেশে তাঁকে মূল হাইকেলে সুলাইমানিতে ‘মাকদাস’ (পবিত্র স্থান) ও জবেহ ক্ষেত্রÑএর মাঝখানে প্রস্তারাঘাতে হত্যা করা হয়। (২ বংশাবলি, ২৪ অধ্যায়, ২১ শ্লোক)
পাঁচ. আশুরিয়াদের হাতে যখন সামারিয়াদের ইসরাইলি রাষ্ট্রের পতন হয় এবং জেরুসালেমের ইহুদিয়া রাষ্ট্র মহা ধ্বংসের সম্মুখীন হয় তখন ‘ইয়ারমিয়াহ’ নবী নিজের জাতির পতনে আর্তনাদ করে ওঠেন। তিনি পথেঘাটে, অলিতে-গলিতে নিজের জাতিকে সম্বোধন করে বলতে থাকেন, ‘সতর্ক হও, নিজেদেরকে সংশোধন করো, অন্যথায় তোমাদের পরিণাম সামারিয়া জাতির চাইতেও ভয়াবহ হবে।’ কিন্তু জাতির পক্ষ থেকে বিরূপ জওয়াব আসতে থাকে। চারদিক থেকে তাঁর ওপর প্রবল বৃষ্টি ধারার মতো অভিশাপ ও গালিগালাজ আসতে থাকে। তাঁকে মার-ধর করা হয়। ক্ষুধা ও পিপাসায় শুকিয়ে মেরে ফেলার জন্য রশি দিয়ে বেঁধে তাঁকে কর্দমাক্ত কুয়ার মধ্যে ঝুলিয়ে রাখা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করার এবং বিদেশী শত্রুর সাথে আঁতাত করার অভিযোগ আনা হয়। (জিরমিয়, ১৫ অধ্যায়, ১০ শ্লোক; ১৮ অধ্যায়, ২০-২৩ শ্লোক; ২০ অধ্যায়, ১-১৮ শ্লোক; ৩৬-৪০ অধ্যায়)।
ছয়. ‘আমুস’ নামক একজন নবী সম্পর্কে বলা হয়েছে : যখন তিনি সামারিয়ার ইসরাইলি রাষ্ট্রের ভ্রষ্টতা ও ব্যভিচারের সমালোচনা করেন এবং এই অসৎকাজের পরিণাম সম্পর্কে তাদেরকে সতর্ক করে দেন তখন তাঁকে চরমপত্র দিয়ে বলা হয় এখান থেকে বের হয়ে যাও এবং বাইরে গিয়ে নিজের নবুওয়াত প্রচার করো। (আমুস, ৭ অধ্যায় , ১০-১৩ শ্লোক)
সাত. হজরত ইহইয়াহ (আ) যখন ইহুদি শাসক হিরোডিয়াসের দরবারে প্রকাশ্যে অনুষ্ঠিত ব্যভিচার ও নৈতিকতা বিরোধী কার্যকলাপের প্রতিবাদ জানান, তখন প্রথম তাঁকে কারারুদ্ধ করা হয়। তারপর বাদশাহ নিজের প্রেমিকার নির্দেশ অনুসারে জাতির এই সবচেয়ে সৎ ও নিষ্ঠাবান ব্যক্তিটির শিরñেদ করে। (মার্ক, ৬ অধ্যায়, ১৭-২৯ শ্লোক)
আট. সবশেষে ঈসা (আ) এর বিরুদ্ধে বনি ইসরাইলের আলেমসমাজ ও জাতীয় নেতৃবৃন্দের ক্রোধ উদ্দীপিত হয়। কারণ তিনি তাদের পাপ কাজ ও লোক দেখানো সৎকাজের সমালোচনা করতেন। তাদেরকে ঈমান ও সৎকর্মের দিকে আহবান জানাতেন। এসব অপরাধে তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা তৈরি করা হয়। রোমান আদালত তাঁকে প্রাণদন্ডের সিদ্ধান্ত দেয়। রোমান শাসক পিলাতিস যখন ইহুদিদের বললো, আজ ঈদের দিন, আমি তোমাদের স্বার্থে ঈসা ও বারাব্বা ডাকাতের মধ্য থেকে একজনকে মুক্তি দিতে চাই। আমি কাকে মুক্তি দিবো? তারা সমস্বরে বললো, আপনি বারাব্বাকে মুক্তি দিন এবং ঈসাকে ফাঁসি দিন। (মথি, ২৭ অধ্যায়, ২০-২৬ শ্লোক)
আসহাবুল উখদুদের ঘটনা
সুহায়েব (রা) থেকে বর্ণিত রাসূল (সা) বলেন, তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতের মধ্যে এক বাদশাহ ছিল। তার ছিল এক জাদুকর। জাদুকর যখন বৃদ্ধ হয়ে গেল তখন বাদশাহকে বলল, আমি তো বৃদ্ধ হয়ে পড়েছি, তাই আমার নিকট এক যুবককে পাঠিয়ে দিন, যাতে তাকে আমি জাদুমন্ত্র শিখিয়ে দিতে পারি। বাদশাহ জাদুমন্ত্র শেখার জন্য একজন যুবককে পাঠিয়ে দিল। যুবকের রাস্তার ধারেই ছিল এক ধর্মযাজক। যুবক তাঁর কাছে বসে তাঁর কথা শুনল এবং তার নিকট খুবই ভালো লাগল। তাই যুবক যখনই জাদুকরের নিকট যাইত তখনই সে রাস্তায় যাজকের নিকট গিয়ে বসত। এরপর জাদুকরের নিকট গেলে সে তাকে মারধর করত। যুবক দরবেশের নিকট অভিযোগ করলে তিনি তাকে বললেন, যখন তুমি জাদুকরের মারধরের ভয় করবে তখন বলবে, আমাকে আমার স্বজনেরা বিরত রেখেছিল। আর যখন তোমার স্বজনদের ভয় করবে, তখন বলবে আমাকে জাদুকর আসতে বিরত রেখেছে। এভাবে সে আসা যাওয়া করছিল। ঘটনাক্রমে একদিন রাস্তায় এক বিরাটকায় জন্তু উপস্থিত ছিল, যা মানুষের যাতায়াতের পথ রোধ করে রেখেছিল। যুবক মনে মনে বলল, আজ আমি দেখব, জাদুকর শ্রেষ্ঠ না কী দরবেশ শ্রেষ্ঠ? তখন সে একটা পাথর হাতে নিয়ে বলল, হে আল্লাহ! যদি দরবেশের কাজ তোমার কাছে জাদুকর অপেক্ষা প্রিয় হয়ে থাকে, তবে তুমি এ জন্তুকে পাথর দ্বারা মেরে ফেল, যাতে লোকজন যাতায়াত করতে পারে। এরপর সে পাথর নিক্ষেপ করলে জন্তুটা মারা গেল এবং লোকজন পার হয়ে গেল। যুবক দরবেশকে এসে এ ব্যাপারে জানালে দরবেশ বললেন, বৎস! আজ তুমি আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ হয়ে গেলে। আমি যতটুকু দেখছি তোমার কাজ সিদ্ধ হয়েছে, তবে তোমাকে অচিরেই কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হবে। যদি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হও, তাহলে আমার সম্পর্কে কিছুই জানাবে না। যুবক আল্লাহর হুকুমে জন্মান্ধ ও শ্বেতরোগী আরোগ্য করত এবং মানুষের যাবতীয় রোগের চিকিৎসা করত। রাজার এক সভাসদ মন্ত্রী অন্ধ ছিল। সে খবর শুনে বহু উপঢৌকন নিয়ে যুবকের কাছে এসে বলল, তুমি যদি আমাকে আরোগ্য করতে পার তাহলে আমি যা কিছু এনেছি সবই তোমাকে দান করব। যুবক বলল, আমি কাউকে আরোগ্য করতে পারি না। একমাত্র আল্লাহই আরোগ্য করতে পারেন। তুমি যদি আল্লাহর প্রতি ঈমান আন তবে আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করব তাহলে তিনি তোমাকে আরোগ্য করবেন। এ কথা শুনে ঐ সভাসদ ঈমান আনল এবং আল্লাহ তাকে আরোগ্য দান করলেন। ভালো হয়ে সে পূর্বের ন্যায় রাজার কাছে এসে বসল। রাজা তাকে দেখে (বিস্মিত হয়ে) বলল, তোমার চোখ কে ফিরিয়ে দিল? মন্ত্রী বলল, আমার প্রভু আল্লাহ। রাজা জিজ্ঞাসা করল, আমি ছাড়াও তোমার কোন প্রভু আছে নাকি? মন্ত্রী বলল, আমার ও আপনার প্রভু আল্লাহ। উত্তর শুনে বাদশাহ তাকে পাকড়াও করে কঠিন শাস্তি দিতে লাগল। শাস্তির কষ্টে সে যুবকের কথা বলে দিল। যুবককে উপস্থিত করে রাজা বলল, বেটা! তোর জাদুর সম্পর্কে আমি সংবাদ পেলাম। জাদু দিয়ে তুই জন্মান্ধ ও শ্বেতরোগী অরোগ্য করছিস। আরও কি কী করছিস? যুবক বলল, আমি কাউকে আরোগ্য করতে পারি না, একমাত্র আল্লাহই আরোগ্য দান করেন। উত্তর শুনে রাজা তাঁকে পাকড়াও করে কঠিন শাস্ত দিতে লাগল। শাস্তির তীব্রতায় অবশেষে যুবক দরবেশের কথা বলে দিল। এরপর দরবেশকে উপস্থিত করা হলো এবং তাঁকে বলা হলো, তুমি তোমার ধর্ম থেকে ফিরে আস। দরবেশ অস্বীকার করলে রাজা করাত এনে তাঁর মাথার তালুর মাঝখানে স্থাপন করে তাঁকে দ্বিখন্ডিত করল। এরপর তার মন্ত্রীকে তার ধর্মকে ছেড়ে দিতে বললে সেও অস্বীকৃতি জানালে তাকেও করাত দিয়ে দ্বিখন্ডিত করা হলো। অতঃপর যুবককে উপস্থিত করে তাকেও বলা হলো, তুমিও তোমার ধর্ম ছেড়ে দাও। সে অস্বীকার করলে রাজা তার একদল সহচরের হাতে তাকে অর্পণ করে আদেশ করল, একে অমুক পাহাড়ে নিয়ে যাও এবং যখন পাহাড়ের শীর্ষদেশে পৌঁছবে, তখন তাকে ধর্মত্যাগ করতে বলবে। যদি ধর্ম ত্যাগ করে তো ভালো, অন্যথায় তাকে পাহাড়ের ওপর থেকে নিচে নিক্ষেপ করবে। আদেশ পেয়ে তারা তাঁকে নিয়ে পাহাড়ের ওপরে আরোহণ করল। এ সময় যুবক আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করল, “হে আল্লাহ! তোমার যা ইচ্ছা আমার ও এদের ব্যাপারে তুমিই ব্যবস্থা গ্রহণ করো।” এরপর পাহাড়ে বিরাট কম্পন সৃষ্টি হলে যুবক ছাড়া সবাই নিচে পতিত হয়ে মারা গেল। অবশেষে যুবক নিরাপদে রাজার নিকট পৌঁছাল। রাজা প্রশ্ন করলো, তোমার আর সাথীদের কী হলো? যুবক বলল, আল্লাহ তাদের হাত থেকে আমাকে বাঁচিয়েছেন। এরপর রাজা তাকে আরেক দল সহচরের হাতে অর্পণ করে বলল, একে নিয়ে যাও এবং একটা নৌকাতে উঠিয়ে সমুদ্রের মাঝখানে নিয়ে যাও। সেখানে যেয়ে তাকে ধর্ম ত্যাগ করতে বলবে, যদি করে তো ভালো, অন্যথায় তাকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করবে। তারা তাঁকে নিয়ে সমুদ্রের মাঝখানে নিয়ে গেলে যুবক দোয়া করল, হে আল্লাহ! তোমার ইচ্ছানুযায়ী আমাকে এদের হাত থেকে বাঁচাও। সঙ্গে সঙ্গে নৌকা উল্টে গিয়ে তারা সবাই ডুবে মরল। যুবক পদব্রজে রাজার নিকট এসে পৌঁছাল। রাজা প্রশ্ন করলো, তোমার সাথীদের কী হলো? যুবক বলল, আল্লাহ তাদের হাত থেকে আমাকে বাঁচিয়েছেন। অতঃপর যুবক রাজাকে বলল, তুমি ততক্ষণ আমাকে মারতে পারবে না যতক্ষণ না আমার পরামর্শ মোতাবেক কাজ না কর। রাজা জিজ্ঞাসা করল, তা কেমন? যুবক বলল, প্রথমে সব লোক এক স্থানে একত্রিত করবে, আর আমাকে একটা শূলিকাষ্ঠে ঝুলাবে। এরপর আমার থলি থেকে একটা তীর বের করে কামানের মাঝখানে স্থাপন করবে। অতঃপর ‘বিসমিল্লাহি রাব্বিল গোলামি’ বলে তা আমার প্রতি নিক্ষেপ করবে। যখন তুমি এরূপ করবে তখন তুমি আমাকে মারতে পারবে। এ কথা শুনে রাজা সব লোক একত্রিত করল এবং তাঁকে শূলে ঝুলাল। অতঃপর তাঁর থলি থেকে একটা তীর বের করে তা কামানের মাঝখানে স্থাপন করল। অবশেষে ‘বিসমিল্লাহি রাব্বিল গোলামি’ বলে তাঁর দিকে নিক্ষেপ করলে সেটি গিয়ে তাঁর কানের নি¤œাংশে পৌঁছালে যুবক নিজ হাতে কানের নি¤œাংশে তীরের স্থানে রেখে প্রাণত্যাগ করল। রাজ্যের সবলোক এ দৃশ্য দেখে ঘোষণা করল, আমরা সবাই এ যুবকের প্রভুর ওপর ঈমান আনলাম। এরপর রাজা ঘটনাস্থলে পৌঁছালে তাকে বলা হলো, তুমি যে আশঙ্কা করেছিলে আল্লাহর কসম; সে আশঙ্কাই তোমার ওপর পতিত হয়েছে। সব লোক তো ঈমান এনে ফেলেছে। এর পর সে আদেশ করল, “রাস্তার মোহনায় বিরাট গর্ত খনন কর এবং তাতে আগুন জ্বালাও।” তার আদেশে বিরাট গর্ত খনন করে আগুন জ্বালান হলো। অতঃপর আদেশ করল, যারা ঐ ধর্ম থেকে ফিরে না আসবে তাদেরকে এর মধ্যে পুড়িয়ে ফেল-অথবা তাদেরকে বলা হলো- এর মধ্যে প্রবেশ করো। যুবকের অনুগামীরা তাই করল। শেষ পর্যন্ত এক মহিলা একটা শিশুকে নিয়ে অগ্নিগহবরের নিকট এসে তাতে ঝাঁপ দিতে ইতস্তত করছিল। দুধের শিশু তাকে বললো, ‘ওহে মা! ধৈর্য ধারণ করুন আপনি সত্য ধর্মে কায়েম আছেন।’ (সহিহ মুসলিম হাদিস নম্বর ৭২৯৩)
এছাড়া আমরা দেখি ইউসুফ (আ) কে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে দীর্ঘ দিন কারাগারে আটক রাখা হয়েছিল, ইবরাহিম (আ) কে অগ্নিকুন্ডলীর ভেতরে নিক্ষেপ করা হয়েছিল, সূরা ইয়াসিনে আছে হাবিবে নাজ্জারকে হত্যা, মাগফিরাত ও পুরস্কারের ঘটনা, রাসূল (সা) কেও বিভিন্ন সময়ে হত্যা চেষ্টা করেছিল এবং দীর্ঘদিন শিয়াবে আবু তালেবে নির্মমভাবে বন্দী করে রাখা হয়েছিল, সাহাবা (রা) ঈমান আনার কারণে অসহ্য জুলুম নির্যাতনের মুখোমুখি হয়ে কখনও ঈমান ত্যাগ করেননি, যার দৃষ্টান্ত খাব্বাব, খুবাইব বেলাল (রা) প্রমুখ। নবী রাসূল ও সাহাবা (রা) সহ কিয়ামত পর্যন্ত যারা সত্য, ন্যায় পথে টিকে থাকবে তাদেরকেও একই পরিণতি বরণ করতে হবে। যার সবচেয়ে বড় প্রমাণ বাংলাদেশ, মিসর, গাজা ইত্যাদি।
সমসাময়িক বিশ্ব পরিস্থিতি
বর্তমান মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত সংগঠন ১৯২৯ সালে প্রতিষ্ঠিত মুসলিম ব্রাদারহুড বা ইখওয়ানুল মুসলিমিন। ১৯৩৯ সালে জালেম বাদশাহ ফারুকের নির্দেশে একদিন মসজিদে যাওয়ার সময় বিশ্বনন্দিত ইসলামিক স্কলার ইমাম হাসানুল বান্নাকে গুলি করে শহীদ করা হয়। ১৯৫৪ সালে মিসরের ডিক্টেটর প্রধানমন্ত্রী কর্নেল জামাল আবদুন নাসের ব্রাদারহুডের শীর্ষ নেতা ড. হাসান হোদায়বি, মাহমুদ আবদুুল লতিফ, ইউসুফ তালাত, আবদুল কাদের আওদাহ, হিন্দওয়ায়ে দেওয়ার, ইবরাহিম আল তৈয়ব ও মুহাম্মদ ফরাগ আলিকে গ্রেফতার করে তথাকথিত সামরিক আদালতে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। সমগ্র বিশ্বের চাপে ড. হাসান হোদায়বিকে মৃত্যুদন্ড দেয়া থেকে বিরত থাকলেও বাকি ৬ জনকে ১৯৫৪ সালের ৭ ডিসেম্বর সকাল ৮টা থেকে ১১টার মধ্যে আধা ঘণ্টা অন্তর ফাঁসিতে ঝুলিয়ে শহীদ করে। প্রসঙ্গত তারা কেউই যুদ্ধাপরাধী বা মানবতা বিরোধী ছিলেন না বরং সুয়েজ খালে ইংরেজদের আধিপত্য বিস্তারের বিরোধিতা করাই ছিল তাদের অপরাধ। ৮০ বছর পর জুন ২০১২ তে ৫১.৭ শতাংশ ভোট পেয়ে মুরসি মিসরের প্রথম গণতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেও মাত্র ১২ মাসের ব্যবধানে জেনারেল সিসির অবৈধ ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে শেষ হয়ে যায়। এতে ১৪০০ জন নেতাকর্মী শাহাদত বরণ করেন এবং ২২০০০ নেতাকর্মীকে আটক করে নির্যাতন করা হচ্ছে। এখনও তথাকথিত বিচারের নামে আদালত শত শত ইসলামী আন্দোলনের নেতাদের ফাঁসির রায় দিয়ে যাচ্ছে।
২০১৪ সালের আগস্টে ইসরাইলি বাহিনীর নির্মম আক্রমণে গাজায় প্রায় ২১০০ মুসলিম শাহাদত বরণ করেন। গোটা জনপদকে বিরান ভূমিতে পরিণত করা হয়।
চলমান বাংলাদেশের কিছু খন্ডচিত্র
২০০৮ সালে ডিজিটাল কারচুপির মাধ্যমে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় এসে যুদ্ধাপরাধ বিচারের নামে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃবৃন্দ যথাক্রমে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, সাবেক আমীর বিশ্ববরেণ্য ইসলামী চিন্তাবিদ প্রফেসর গোলাম আযম, প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন মাওলানা এ কে এম ইউসুফ, জননন্দিত ও বিশ্বনন্দিত মুফাসসিরে কুরআন মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, বারবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য মাওলানা আবদুস সুবহান, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সহকারী সেক্রেটারি কামারুজ্জামান, আব্দুল কাদের মোল্লা, আজহারুল ইসলাম, নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রতিষ্ঠাতা কেন্দ্রীয় সভাপতি মীর কাসেম আলীকে বিভিন্ন সময়ে অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করে। সরকার পরিকল্পিতভাবে জামায়াতের শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে হত্যার অংশ হিসেবে বিচার চলাকালীন আইন পরিবর্তন করে এবং সেই আইনে ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা প্রদান করে সুপরিকল্পিতভাবে ১২ ডিসেম্বর ২০১৩ শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লাকে অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করে। বিশ্ববরেণ্য আলেমে দ্বীন মুফাসসিরে কুরআন মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ট্রাইব্যুনালের ফাঁসির রায়কে কেন্দ্র করে সারা দেশের মানুষ প্রতিবাদে ফুঁসে উঠলে সরকার নির্বিচারে গুলি চালিয়ে তিন শতাধিক নারী-পুরুষকে হত্যা করে। হাজার হাজার প্রতিবাদী জনতাকে চিরতরে পঙ্গু করে দেয়। কুকুরের মত পাগল হয়ে সরকার ২৯ অক্টোবর ২০১৪ তে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসির রায় ঘোষণা করে। এই রেশ কাটতে না কাটতেই ২ নভেম্বর মীর কাসেম আলী সাহেবের ফাঁসির রায় এবং ৩ নভেম্বর কামারুজ্জামান ভাইয়ের চূড়ান্ত ফাঁসির রায় ঘোষণা করে। জালিমের কারাগারে ১০০০ দিন অতিবাহিত করে ৯৪ বছর বয়সী অধ্যাপক গোলাম আযম ২৩ নভেম্বর ২০১৪ পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। লক্ষ লক্ষ জনতা অশ্রুসিক্ত নয়নে প্রাণপ্রিয় নেতাকে বিদায় জানায়। এর আগে প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন মাওলানা এ কে এম ইউসুফ জালিমের কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন।
২০১১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর থেকে সরকার জামায়াত- শিবিরের ওপর অমানবিক জুলুম নির্যাতন শুরু করে। ৫০ হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। ৩০ হাজারের বেশি মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়। ৮ লক্ষাধিক নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়। ৮ জন নেতাকে গুম করা হয়। পায়ে বন্দুক ঠেকিয়ে শত শত যুবককে চিরতরে পঙ্গু করে দেয়া হয়। এই জনপদের মানুষ এখন বলছে “হে আল্লাহ! আমাদের জন্য অভিভাবক ও সাহায্যকারী পাঠাও।”
একটি ভ্রান্তির উত্তর
অনেকে বলেন, জামায়াত বিভিন্ন সময়ে অনেক ভুল করেছে এবং ’৭১ সালের সমস্যা না থাকলে আমরা আজকের এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতাম না। তাদের জন্য উত্তর হলো নবী-রাসূলগণ এবং তাদের অনুসারীদের কেন অন্যায়ভাবে হত্যা করা হলো? কেন মিথ্যা অপবাদ দিয়ে তাদেরকে জেল-জুলুম ও নির্যাতন করা হলো? এসব কি তাদের ভুলের কারণে হয়েছিল? না কখনই না, বরং এটাই আল্লাহর সুন্নাত এবং আল্লাহর সুন্নাতের কোন পরিবর্তন হবে না। কাজেই কিয়ামত পর্যন্ত হকপন্থীদের ওপর বাতিলের এই গুম, খুন, জুলুম, নির্যাতন আসবে এবং এটাই আল্লাহর পরীক্ষা। ধৈর্যের মাধ্যমে সত্যের ওপর টিকে থাকাই আমাদের ঈমানের দাবি। আর এ দাবি পূরণ করার মাধ্যমে আমাদের ইহকালীন ও পরকালীন সফলতা আসবে। সে কারণে ফাঁসির রায় ঘোষণার পরও নেতৃবৃন্দ বিজয় চিহ্ন দেখাচ্ছেন।
আয়াতের শিক্ষা
১. শত জুলুম নির্যাতনের মুখে ঈমানের ওপর টিকে থাকা ২. নির্যাতিতদের আল্লাহ পুরস্কৃত করবেন ৩. নির্যাতনকারীদের সকল ‘আমল বরবাদ হয়ে যাবে। ৪. জাতির ওপর অভাব অনটন ও খোদায়ি গজব নেমে আসবে ৫. চূড়ান্ত বিপদের সময় তাদের কোন সাহায্যকারী থাকবে না।
উপসংহার
ওরা মুখের ফুৎকারে আল্লাহর দ্বীনকে নিভিয়ে দিতে চায়, কিন্তু আল্লাহ তাঁর নূরকে অবশ্যই প্রজ্বলিত রাখবেন। আমরা ঈমানের দাবি অনুযায়ী ময়দানে ভূমিকা রাখলে আল্লাহ অবশ্যই আমাদেরকে দুনিয়া ও আখেরাতে বিজয় দান করবেন। আমিন!
লেখক : শিক্ষক, বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

SHARE

Leave a Reply