নীরব পরিবেশ বিপর্যয় মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে বাংলাদেশ -ডা: জাহিদুল বারী

বহুমাত্রিক সমস্যায় জর্জরিত বাংলাদেশ। অর্থনৈতিক দৈন্যতা, জনসংখ্যার আধিক্য, নিরক্ষরতা, সামাজিক অবক্ষয়, রাজনৈতিক হানাহানি, সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থার ক্রমাবনতি, অপ্রতুল-শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের অভাব ইত্যাদি নানাবিধ সমস্যার ভিড়ে পরিবেশ বিপর্যয় ও এর প্রভাবে যে আমরা প্রতিনিয়তই বিভিন্ন কঠিন কঠিন রোগে আক্রান্ত হচ্ছি তা নিয়ে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ এমনকি শিক্ষিত মহলেও তেমন কোনো সাড়া শব্দ নেই। অন্য দিকে অনেক ক্ষেত্রেই পরিবেশ বিপর্যয়ের তাৎক্ষণিক ক্ষতি আঁচ করতে পারা যায় না বিধায় এই মরণ ছোবলের প্রতি আমাদের দেশের মিডিয়া ও সরকারি কর্তাব্যক্তিদের নজরও নিতান্তই অনভিপ্রেত। যদিও বাংলাদেশের কিছু পরিবেশবাদী সংগঠন ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরেই এগুলো নিয়ে কাজ করে আসছে তবে সময়ের দাবিতে সেগুলোও যথেষ্ট নয়।
‘নীরব’ পরিবেশ বিপর্যয় বলতে এখানে বোঝানো হচ্ছে পরিবেশের এমন সব ক্ষতি যা ধারাবাহিকভাবে হয়ে আসছে কিন্তু এগুলো তাৎক্ষণিকভাবে বড় ক্ষতি না করায় আমরা অবলীলায় তা এড়িয়ে যাচ্ছি। অথচ এগুলোই ধীরে ধীরে মানুষকে মারাত্মক স্থাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলে দিচ্ছে। জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, গত ১০ বছরে বাংলাদেশে প্রাকৃতিক বিপর্যয়বহির্ভূত কারণে পরিবেশ বিপর্যয় ৪৩% বৃদ্ধি পেয়েছে। এ তথ্যই বলে দিচ্ছে আমরা কতটা অনিরাপদ ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।
অপরিকল্পিত নগরায়ণ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক এবং স্বাস্থ্যগত উন্নয়নের পথে একটি বড় বাধা। দীর্ঘদিন যাবৎ এদেশের প্রথিতযশা পরিবেশবিদগণ এবং পরিবেশবাদী বেশ কয়েকটি সংগঠন এই অপরিকল্পিত নগরায়ণের বিরুদ্ধে বেশ সোচ্চার ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে কার্যত সেটার প্রভাব বাস্তবে খুব একটা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। বরং নগরায়ণের নামে বৃক্ষনিধনের মহোৎসব চলছে দেশের বড় সিটিগুলোতে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার কথা তো বলাই বাহুল্য। ঢাকায় সারি সারি গাছ দেখতে পাওয়া এখন স্বপ্নে দেখা চন্দ্রজয়ের মতোই দুঃসাধ্য হয়ে গেছে। অবাধে গাছ কেটে, ফসলি জমি ভরাট করে গড়ে উঠছে বিভিন্ন আবাসিক প্রকল্প। ব্যাপারটা এমন হয়ে গেছে যে মনে হয় সারা দেশের মানুষদের কেবল ঢাকা সিটি ও এর পাশের দুই সিটিতে (নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর) স্থায়ী ঠিকানা গড়ে দেয়ার দায়িত্ব এদেশের রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীরাই গ্রহণ করেছেন! সেই মহান দায়িত্ব পালনের জন্যই তারা যেন মরিয়া হয়ে বনাঞ্চল, ফসলি জমি, নদী, খাল-বিল সব ভরাট করে আবাসন প্রকল্প তৈরি করছেন হরহামেশা!!
আবাসন ব্যবসায়ীদের সাথে আমার কোনো শত্রুতা নেই। তবে এ নিয়ে কলম ধরেছি শুধুমাত্র এ জন্যই যে, বৃক্ষনিধন ও খাল-বিল ভরাটের ফলে এদেশের জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে; বাস্তুতন্ত্র (Ecology) মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে; শহরাঞ্চলে ভূমি ক্ষয় হচ্ছে; পানির স্তর ক্রমশই নিচে নেমে যাচ্ছে; দেশের পাহাড়ি অঞ্চলে বৃক্ষনিধনের ফলে ভূমিধস (Landslide) হচ্ছে; সর্বোপরি এ কারণে আমাদের স্বাস্থ্যের ওপর সবচেয়ে বেশি বিরূপ প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। আমরা চিকিৎসকরা এটা নিয়ে আরো বেশি শঙ্কিত কেননা পরিবেশের সকল ক্ষতিই বাস্তব অর্থে মানবদেহের স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার (Physiology) ব্যাঘাত ঘটায়। বাংলাদেশের মত অনুন্নত দেশ যেখানে অবকাঠামোগত সুযোগ সুবিধা নিতান্তই অপ্রতুল সেখানে পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি অবশ্যই অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় অনেক বেশি। বৃক্ষনিধন ও নদী ভরাটের কারণে বায়ুমন্ডলের ওজোনস্তরে প্রতিনিয়তই ক্ষয় হচ্ছে এবং এর ফলে মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি (Ultra violet ra) খুব সহজেই ওজোনস্তর ভেদ করে আমাদের শরীরে পড়ছে। এই ক্ষতিকর সূর্যরশ্মি আমাদের ত্বকে (Skin) এক বিশেষ উপাদান (Carcinogen) তৈরি করে যা শরীরের বিভিন্ন স্থানে ক্যান্সার সৃষ্টির জন্য দায়ী। International Agency for Research on Cancer (IARC) এর তথ্যমতে, বাংলাদেশে ক্যান্সারজনিত মৃত্যুহার ২০৩০ সাল নাগাদ ১৩% এ দাঁড়াবে। বায়ুমন্ডলের ওজোনস্তর ক্ষয়ের জন্য যে কেবলই বৃক্ষনিধন দায়ী তা নয়। আমাদের দেশে এখন নাগরিক চাহিদার সাথে তাল মেলাতে দিয়ে বাসাবাড়ি, শপিংমল, অফিস, গাড়ি এমনকি বিভিন্ন কারখানাতেও কারণে-অকারণে এসি ব্যবহার করা হয়। এসি থেকে নির্গত বিশেষ গ্যাস ক্লোরোফ্লোরো কার্বন (CFC) ওজোনস্তর ক্ষয়ের জন্য ভীষণভাবে দায়ী।
অপরিকল্পিত শিল্পায়ন আমাদের দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য আরেকটি অভিশাপ। প্রায় প্রতিটি শিল্প কারখানাই প্রচুর পরিমাণে শিল্প বর্জ্য (Industrial Waste) নির্গত করে যা সঠিকভাবে নিষ্কাশন না হওয়ায় বায়ু, পানি ও মাটি দূষণ হয়। শিল্প বর্জ্যরে অন্যতম হচ্ছে কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস (CO2) যা প্রাণিদেহের জন্য খুবই ক্ষতিকর। Global Air Report’ 2017 অনুসারে বায়ু দূষণের র‌্যাংকিংয়ে ঢাকা বিশ্বের দ্বিতীয় মেগাসিটি। এটি আমাদের জন্য মোটেও সুখকর সংবাদ নয়। বায়ুদূষণের ফলে মানুষ প্রতিনিয়তই বিভিন্ন দুরারোগ্য জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। স্বাস্থ্য বিষয়ক গবেষণা সংস্থা Center for Research & Rehabilitation in Endocrine, Diabetes, Ischemic heart diseases, Infectious diseases & Tuberculosis (CREDIT) এর গবেষণা মতে বাংলাদেশে ২০২৫ সাল নাগাদ যক্ষ্মারোগীর সংখ্যা ৮% বৃদ্ধি পাবে যার অন্যতম কারণ বায়ুদূষণ এবং শিল্প কারখানাগুলোতে শ্রমিকদের জনাকীর্ণ পরিবেশে (Overcrowding) কাজ করা। অন্যদিকে পশ্চিমা বিশ্বে বহুল সমাদৃত Natural Environment Website এর তথ্যমতে, পলিথিন ও অন্যান্য প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদনের কারণে প্রতিদিন বায়ুমন্ডলে শত শত টন কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস নিঃসরণ হয় যা Global Warming এর জন্য দায়ী। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে যত্রতত্র গড়ে ওঠা প্লাস্টিক ও কেমিক্যাল কারখানাগুলো সঙ্গত কারণেই এদেশের মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি ক্রমশ বাড়াচ্ছে। সাধারণ বর্জ্য ও শিল্প বর্জ্যগুলোকে একত্রিত করে সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক উপায়ে ডাম্পিং করায় ঢাকা ও এর আশপাশের প্রায় সব নদীর প্রায় অর্ধেকই ভরাট হয়ে গেছে। পাশাপাশি নদীগুলোতে চরম নাব্যতা সঙ্কটও দেখা দিচ্ছে যা পরিবেশের বাস্তুসংস্থান (Ecosystem) ধ্বংসের অন্যতম কারণ। আরো ভয়ঙ্কর ব্যাপার হচ্ছে এর ফলে নদীর পানিতে যে বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থগুলো মিশে যাচ্ছে তাতে নদীগুলোতে উৎপন্ন মাছ ও ফসল ঐসকল বিষ দিয়ে আক্রান্ত হচ্ছে। স্বাভাবিক ভাবেই বুঝা যাচ্ছে যে, আমরা যারা ঐ নদীগুলোর মাছ ও ফসলের ভোক্তা আমাদের শরীরে সেগুলো কি ক্ষতি করতে পারে। শুধুমাত্র একটি উদাহরণ দিলেই তা পরিষ্কার হয়ে যাবে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা The Environmental Working Group I ও যুক্তরাষ্ট্রের Stanford University এর যৌথ প্রতিবেদন অনুযায়ী শক্ত প্লাস্টিক উৎপাদন করতে গেলে বিশেষ এক কেমিক্যাল (Bis phenol-A) ব্যবহার করা হয় যা ঐ প্লাস্টিকে সংরক্ষিত খাবার ও পানির সাথে মিশে মানবদেহে প্রবেশ করে এবং প্রোস্টেট ও স্তনক্যান্সার ঘটায়। অপরদিকে, গত ২৫ অক্টোবর স্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান CREDIT একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে যাতে বলা হয়, বাংলাদেশে ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীরা যারা ইনসুলিন ব্যবহার করেন তাদের ৬% ক্ষেত্রে ইনসুলিন রেসিস্ট্যান্স (Insulin resistance The Environmental Working Group I যুক্তরাষ্ট্রের Stanford University Bis phenol-A CREDIT Insulin resistance) হয়ে ওঠে খাবারের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করা রেডিও অ্যাকটিভ (জধফরড় ধপঃরাব) উপাদানের কারণে।
পরিবেশ দূষণ কেবল বাংলাদেশেই নয় সমগ্র পৃথিবীতেই মানবসভ্যতার অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি। আমি স্বাস্থ্য ও পরিবেশ নিয়ে দেশে ও বিদেশে কাজ করছি অনেকদিন ধরেই। সেই সূত্রে বিশ্বের অনেক নামকরা প্রতিষ্ঠানের সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতাও হয়েছে। উন্নত দেশগুলো এ ব্যাপারে খুব সতর্ক এবং তারা রাষ্ট্রীয় তদারকিতে পরিবেশ বিপর্যয় ও স্বাস্থ্য সমস্যা কাটিয়ে ওঠার জন্য অত্যন্ত আন্তরিকভাবে কাজ করে। বাংলাদেশে এটাকে সরকারিভাবে এখনো বড় রকমের সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। এখানে শুধুমাত্র কিছু দিবসকেন্দ্রিক পরিবেশপ্রীতি দেখানো হয়। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী পরিষদ (বেলা), বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান পরিবেশ সুরক্ষা নিয়ে কাজ করছে দীর্ঘদিন যাবৎ। তার মধ্যে বেলার প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট সৈয়দা রেজোয়ানা হাসান এবং গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা: জাফরউল্লাহ চৌধুরীর ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসার দাবি রাখে। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ডা: জাফরউল্লাহ চৌধুরী বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে একজন কিংবদন্তিতুল্য মানুষ। তিনিও দীর্ঘদিন যাবৎ পরিবেশ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করে আসছেন। তবে এই মুহূর্তে প্রয়োজন সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশের দাবিতে গণজাগরণ। আশা করি পরিবেশবোদ্ধাদের পাশাপাশি সরকারও এই দাবির পক্ষে গণজাগরণ সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখবে।
লেখক : চিকিৎসক ও পরিবেশবিদ

SHARE

Leave a Reply