নেপালের সংখ্যালঘু মুসলমান ইতিহাস ও ঐহিত্য ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দনেপালের সংখ্যালঘু মুসলমান ইতিহাস ও ঐহিত্য -ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ

[গত সংখ্যার পর]

নেপালি মুসলমানদের শিক্ষা
‘ইকরা’ অর্থাৎ ‘পড়’ শব্দের মধ্য দিয়েই ইসলামের যাত্রা শুরু হয়। ‘দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত শিক্ষা গ্রহণের সময়’। কিংবা প্রত্যেক মুসলিম (নর-নারীর) জন্য শিক্ষা গ্রহণ করা ফরজ। শিক্ষার গুরুত্ব সংবলিত এমন অসংখ্য হাদিস ও কুরআনের আয়াত থাকা সত্ত্বেও নেপালি মুসলমানগণ শিক্ষার আলো থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে। অবশ্য এর জন্য এককভাবে সেখানকার মুসলমানদের দায়ী করার সুযোগ নেই। ১৯৪০ সালের পূর্বে মুসলমানদেরকে কোনো নেপালি বিদ্যালয়ে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগই দেয়া হয়নি। এমনকি নিজেদের উদ্যোগে কোন স্কুল বা মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষা গ্রহণেরও কোনো অনুমতি ছিল না। এ প্রেক্ষাপটে মুসলমানরা শুধুমাত্র পারিবারিক প্রচেষ্টায় একান্ত ঈমানী প্রয়োজনে কুরআন শিক্ষা গ্রহণের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। কালেমা নামাজসহ ইসলামের কিছু মৌলিক ইবাদতের শিক্ষা গ্রহণ কিংবা কিছু দোয়া দরুদ শিক্ষাই ছিল মুসলমানদের শিক্ষা গ্রহণ। পবিত্র কুরআন ও হাদিসের অর্থ জানারও কোনো সুযোগ ছিল না। ফলে সাধারণ শিক্ষার আলো থেকে দূরে অবস্থান করায় আর্থ-সামাজিক দিক থেকেও তারা পিছিয়ে পড়ে।
রানা শাসনাধীনে নেপালে একটিমাত্র মুসলিম প্রাথমিক বিদ্যালয় চালু করা হয়। এই স্কুলটি ত্রিচন্দ্র ক্যাম্পাসের নিকট অবস্থিত মসজিদে এখনও ‘মাদ্রাসা ইসলামিয়া’ নামে চালু আছে । ১৯৪০-এর পর মুসলমানরা নেপালি স্কুল এবং কলেজে ভর্তি হবার সুযোগ পায়। তবে এক্ষেত্রে মুসলিম ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ছিল একেবারে হাতেগোনা। এ সময় মুসলমানরা নিজস্ব উদ্যোগে কিছু উর্দু স্কুলও প্রতিষ্ঠা করে। বর্তমান সময়ে মুসলিম প্রভাবিত প্রায় প্রত্যেক গ্রামেই এ ধরনের প্রতিষ্ঠান লক্ষ্য করা যায়। কিছু মুসলমান উর্দু এবং ফারসি শিক্ষার জন্য ভারতেও যেতে শুরু করেছে। নেপালের মুসলিম শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ হতে উচ্চতর ডিগ্রি তথা মাওলানা, হাফেজ, কারি এবং ফাজিল এ সকল ডিগ্রি প্রদান করা হয়। উল্লেখ্য, স্থানীয় ভাষায় যিনি কুরআনের অর্থ ও তাফসির করতে সক্ষম এমন ব্যক্তিকে ফাজিল বলা হয়ে থাকে। মুসলমানদের শিক্ষায় অনগ্রসরতার পেছনে মূলত দারিদ্র্যই দায়ী। ১৯৯১-এর আদমশুমারি অনুযায়ী নেপালে শিক্ষিতের হার প্রায় ৩৭.৫%। এক্ষেত্রে ১৯৯০ সালে মাধ্যমিক স্তরে মুসলমান ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ছিল মাত্র .৩৭%্। ১৯৯৩ সালে পরিচালিত এক জরিপ অনুযায়ী নেপালের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মোট ছাত্রছাত্রী ছিল ৮৭৩০ জন। এর মধ্যে মুসলিম ছাত্রের সংখ্যা ছিল ৮৯ জন এবং মুসলিম ছাত্রীর সংখ্যা ছিল মাত্র ১৫ জন।
মূলত ধর্মীয় চেতনার কারণেই মুসলমানগণ তাদের সন্তানদেরকে এ ধরনের অস্থায়ী মক্তব বা মাদরাসায় শিক্ষা গ্রহণের জন্য প্রেরণ করে থাকেন। তারা মৌলিকভাবে বিশুদ্ধ প্রক্রিয়ায় তাজবিদ সহকারে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত শিক্ষা করার জন্যই মাদরাসায় ভর্তি হয়। কেননা তারা অন্তত এটুকু ভালোভাবেই বোঝে যে, নামাজ আদায়ের জন্য সহীহ পদ্ধতিতে কুরআন তিলাওয়াত করা জরুরি। স্থানীয় ভাষা থাকলেও মুসলমানগণ অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের ক্ষেত্রে উর্দু ভাষাকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকে। সেই সাথে সেখানে অধিকাংশ ইসলামী বইপত্র উর্দু ভাষাতেই পাওয়া যায়। তাই অধিকাংশ মুসলমান তাদের সন্তানদেরকে উর্দু ভাষা শিক্ষা দেয়াতে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।
নেপালের অন্যান্য জনগোষ্ঠীর চেয়ে মুসলমানরা শিক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে পশ্চাৎপদ। অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা, দরিদ্রতা এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবই তাদের শিক্ষা ক্ষেত্রে অনগ্রসরতার অন্যতম প্রধান কারণ। তা ছাড়া সামাজিক সচেতনতার অভাবে তারা মক্তব ও মাদরাসার শিক্ষাকেই প্রাথমিক শিক্ষার সমমান মনে করে থাকে। অথচ সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে আধুনিকতার সমন্বয়ে এ শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো উচিত। কিন্তু সরকারের সেক্যুলার চিন্তা-চেতনার কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে হিন্দুধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক থাকলেও মুসলমানদের ধর্মীয় কোনো বিষয় সিলেবাসভুক্তভাবে অধ্যয়নের কোনো সুযোগ নেই। ফলে মুসলমানরা ঈমান বাঁচানোর তাগিদে মক্তব বা মাদরাসাতেই লেখাপড়া শেখার চেষ্টা করে থাকে। কিন্তু চাকরি ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে মাদরাসা শিক্ষার স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রেও সরকারের কার্পণ্যতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
মাদরাসাসমূহ সরকারের অনুদান ছাড়াই একান্তভাবে মুসলমানদের ব্যক্তিগত দানের মাধ্যমেই পরিচালিত হয়ে থাকে। যেহেতু মুসলমানদের অর্থনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। অসচ্ছল মুসলিম জনগণের পক্ষে নিজস্ব অর্থে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা নিঃসন্দেহে দুরূহ ব্যাপার। তাই অত্যন্ত দরিদ্রতার প্রকাশ্য রূপ পাওয়া যায় মাদরাসাসমূহ পরিচালনার ক্ষেত্রে। প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রী বৃদ্ধি করার প্রচেষ্টায় কর্মসূচি গ্রহণ করা তো দূরের কথা, প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত ছাত্রছাত্রীদের মাঝে বইসহ বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ করতেও তারা সক্ষম নয়। সময় অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরিমাণ বেতন দিতে না পারার কারণে প্রতিষ্ঠানসমূহে ব্যাপক শিক্ষক সংকট রয়েছে। তেরাই অঞ্চলের এমন অবস্থাও দেখা যায় যে, একজন শিক্ষকের মাসিক বেতন দেয়া হয় মাত্র একশত টাকা; যা মাত্র দুই ডলারেরও কম। অথচ সে সব শিক্ষকদের পরিশ্রম করতে হয় অনেক বেশি।
মাদরাসা শিক্ষিতদের মধ্যে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের প্রচেষ্টা থাকলেও অর্থ বুঝাতে পারা ছাত্রসংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য। তারা মূলত কুরআন তিলাওয়াত ও মুখস্থ করতে শেখে। সাধারণ শিক্ষার সাথে সমন্বয় করে ১৯৪১ সালে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে একটি নিম্ন মাধ্যমিক ইসলামিক স্কুল (খড়বিৎ ংবপড়হফধৎু ওংষধসরপ ঝপযড়ড়ষ) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। নেপালি জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা হায়াত হুসাইন নদভী প্রতিষ্ঠিত এ স্কুলটি অদ্যাবধি কাঠমান্ডুর একমাত্র নিম্নমাধ্যমিক ইসলামিক স্কুল। তবে সানসারি জেলায় আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া নামে একটি আলিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যেখানে আলিম পর্যন্ত পাঠদান করা হয়। সেখানে আরবির পাশাপাশি নেপালি, ইংরেজি, উর্দু, বিজ্ঞান, ভূগোল, সমাজবিজ্ঞান, গণিতসহ জাতীয় শিক্ষা কারিকুলামের সিলেবাস পড়ানো হলেও সরকারিভাবে কোন সহযোগিতা পাওয়া যায় না। একান্ত ব্যক্তিগত উদ্যোগেই মাদরাসাটি পরিচালিত হয়।
নেপানের অন্যান্য সকল জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে মুসলমান নারী শিক্ষার হার সর্বনিম্ন পর্যায়ে। তেরাই অঞ্চলের শহর ও গ্রামের এমন কোন নারী পাওয়া যাবে না যিনি ৭ম শ্রেণী পাস করেছেন। তবে কাঠমান্ডুুতে কিছু মুসলিম নারী পাওয়া যাবে যারা উচ্চতর শ্রেণীতে অধ্যয়ন করেছেন। কিন্তু তাদের মধ্যে খুব কম সংখ্যকই সেকেন্ডারি স্কুল পাস করে থাকেন। তবে বর্তমানে আশার দিক হচ্ছে, অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা, সামাজিক বৈরী পরিবেশ ও সাংস্কৃতিক সংকট উপেক্ষা করে বর্তমান সময়ে মুসলমানগণ খানিকটা শিক্ষার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠতে শুরু করেছেন। পুরুষ শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনেকেই ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য ভর্তি হচ্ছে। তবে এসব হচ্ছে মুসলমানদের একান্ত ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায়। সরকারিভাবে মুসলমানগণ শিক্ষার ক্ষেত্রে কোন ধরনের সহযোগিতাই পায় না। সরকারের মুসলিম শিক্ষার দৃষ্টিভঙ্গি প্রসঙ্গে গবেষক মোজাম্মেল হক মন্তব্য করেন, এড়াবৎহসবহঃ ড়ভ ঘবঢ়ধষ যধং হড়ঃ বাবৎ মরাবহ পড়হপবহঃৎধঃরড়হ ঃড় নৎরহম ঃযব গঁংষরস রহ ঃযব সধরহ পড়ঁহঃৎু’ং ংঃৎবধস. ঞযবু ফড় হড়ঃ ংঁঢ়ঢ়ড়ৎঃ ঃযব গধফৎধংধয ভরহধহপরধষষু ধহফ সড়ৎধষষু যিরপয রং ঢ়ষধুরহম ধ ংরমহরভরপধহঃ ৎড়ষব ঃড় বফঁপধঃব ঃযব গঁংষরস ঢ়বড়ঢ়ষব ধহফ যবষঢ়রহম ঃযব হধঃরড়হ ঃড় ৎবধপয ষরঃবৎধপু ৎধঃব. গড়ৎব ড়াবৎ রঃ যধং নববহ ভড়ঁহফ ঃযধঃ ঃযব মড়াবৎহসবহঃ ধঁঃযড়ৎরঃু পৎবধঃরহম ংবাবৎধষ ঢ়ৎড়নষবসং ফঁৎরহম ঃযব ৎবমরংঃৎধঃরড়হ ধহফ রংংঁধহপব ড়ভ পবৎঃরভরপধঃবং.
বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ভারত-নেপাল সীমান্ত (দৈর্ঘ্য প্রায় ১৭৫১ কিলোমিটার)-এর পাশে বিশেষত ভারতের উত্তর প্রদেশ এবং বিহারে অনেক মাদরাসা গড়ে ওঠে। এ সকল মাদরাসা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে অনেক মুসলমান জীবিকার তাগিদে নেপালে পাড়ি জমাতে শুরু করে। বর্তমানে ভারত-নেপাল সীমান্তের ১০ কিলোমিটার-এর ভেতর ভারতের মধ্যে প্রায় ৩০০ মাদরাসা ও ৩৪৩টি মসজিদ এবং নেপালের মধ্যে প্রায় ১৮১টি মাদ্রাসা এবং ২৮২টি মসজিদ রয়েছে। এছাড়া বিশ্বের অন্যান্য ধনী মুসলিম দেশ নেপালে মুসলিম এনজিওসমূহকে নিয়মিতভাবে সাহায্য প্রদান করে থাকে।

নেপালে মুসলমানদের সমাজ ও সংস্কৃতি
নেপালে বিভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাসের জনগোষ্ঠীর বসবাস। সে কারণে এটি একটি বহুরূপী মিশ্র সংস্কৃতির পরিবেশ সংবলিত দেশ হিসেবে পরিচিত। তবে অধিকাংশ জনগণ হিন্দু বা সনাতন ধর্মাবলম্বী হওয়ার কারণে সে প্রভাবটি সকল ধর্মমতের ওপর প্রভাব বিস্তার একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তাছাড়া অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা, শিক্ষা ক্ষেত্রে অনগ্রসরতা এবং ধর্মীয় জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে মুসলিম সমাজে বিশ্বাসী সংস্কৃতির সঠিক ধারা অনেকাংশে ম্রিয়মাণ। পক্ষান্তরে প্রতিবেশী হিন্দুদের সামাজিক রাজনীতি, বোধ বিশ্বাস ও লোকাচারের অনেক কিছুই এখন মুসলিম সমাজে ব্যাপকভাবে দৃশ্যমান। পবিত্র কুরআন ও হাদিসের পঠন পাঠন থাকলেও তার অর্থগত বিষয়টি গভীরভাবে জানার সুযোগ না পাবার কারণে নেপালি মুসলিম সমাজে ধর্মীয় ছদ্মাবরণে নানা রকম অমুসলিম রীতিনীতির অনুপ্রবেশ ঘটেছে। তাই মুসলমানদের সমাজ সংস্কৃতির একটি মৌলিক রূপ থাকলেও স্থান ও গোত্রভেদে বেশ খানিকটা পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও বিবর্তন পরিলক্ষিত হয়।
নেপালের তেরাই অঞ্চলের পাহাড়িয়া এলাকায় মুসলমানদের পরিবার গঠন, বিবাহ-শাদি, জন্ম-মৃত্যুকালীন আনুষ্ঠানিকতায় ধর্মীয় প্রকাশ কিছুটা স্বাভাবিক হলেও তাদের ভাষা, পোশাক-পরিচ্ছদ বাহ্যিক চলাফেরা ও সামাজিক লেনদেনের মধ্যে মুসলিম-অমুসলিম তেমন কোনো পার্থক্য নির্ণয় করা কঠিন। বিবাহ-শাদিতেও হিন্দু শাস্ত্রমতের নানা রকমের রীতিনীতি প্রচলিত আছে। এমনকি কোন কোন পরিবারে তাদের ইসলামী তাহজিব তমদ্দুনের সঠিক ধারণাই নাই। তবে খুতবা-দোয়া ও ইজাব-কবুলের ধারা ঠিক রেখেই বিবাহ-শাদি অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। গবেষক মুহাম্মদ সিদ্দিক উল্লেখ করেন, ঞযব ধপঃঁধষ বিফফরহম পবৎবসড়হু রং ংড়ষবসহরুবফ রিঃয ধহ অৎধনরপ ংবৎসড়হ (কযঁঃনধ) ধহফ ফঁ’ধধ (ংঁঢ়ঢ়ষরপধঃরড়হ). পাহাড়ি অঞ্চলের কোন মুসলমানের নিকটাত্মীয় মারা গেলে স্থানীয় হিন্দু প্রথা মোতাবেক মাথা নেড়ে করার প্রবণতাও লক্ষ্য করা যায়। মৃতব্যক্তির জানাজা ও কাফন দাফনে শরিয়াহর পদ্ধতি অনুসরণ করা হলেও বাহ্যিক কিছু রীতি পদ্ধতিতে স্থানীয় হিন্দু সংস্কৃতির প্রভাব লক্ষ্য করার মতো। এমনকি বিভিন্ন পূজা অর্চনাতে পাহাড়ি এলাকার কিছু কিছু মুসলিম পরিবারের সন্তানরা স্বেচ্ছা প্রণোদিত হয়েই অংশগ্রহণ করে থাকে। তেরাইয়ের অন্যান্য সমতল এলাকার মুসলমানদের মধ্যে ধর্মীয় অনুভূতি বেশ সরব। তারা তাদের জন্ম-মৃত্যু, বিয়ে-শাদি থেকে শুরু করে পারিবারিক আনুষ্ঠানিকতায় ইসলামের রীতিনীতি অনুসরণে বেশ সচেতন। ধর্মীয় সচেতনতার পাশাপাশি শিক্ষার ক্ষেত্রেও তারা বেশ যতœবান। স্থানীয় ভাষায় কথাবার্তা বললেও উর্দু ভাষার প্রতি তাদের আগ্রহ অনেক বেশি। ভারতীয় সংস্কৃতির প্রভাবে কোন কোন অঞ্চলে শিক্ষা ক্ষেত্রে কিছুটা অগ্রগতি সাধিত হলেও ঈমান আকিদা নিজস্ব সংস্কৃতির লালনে তারা অনেকটা পিছিয়ে পড়েছে। অন্যদিকে স্থানীয় হিন্দু সংস্কৃতি এবং ভারতীয় সংস্কৃতির প্রভাবে সমাজের অনেক ক্ষেত্রেই ব্যাপকভাবে প্রভাবিত।
ধর্মীয় সংস্কৃতি ও সামাজিক রীতিনীতিতে বেশ খানিকটা এগিয়ে তিব্বতীয়, কাশ্মিরি ও স্থানীয় নেপালি মুসলমানগণ। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষার ক্ষেত্রে তাদের অগ্রসরতা লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে কাঠমান্ডুসহ শহরকেন্দ্রিক অথবা গ্রামীণ সচ্ছল মুসলিম পরিবারগুলো ধর্মীয়ভাবে অনেক সচেতন। মুসলমানদের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক স্বকীয়তা বজায় রাখার ক্ষেত্রে তারা বেশ খানিকটা আন্তরিক। এদের অনেকেই ব্যবসাকেন্দ্রিক জীবিকা নির্বাহের কারণে সামাজিক সচেতনতাও বেশি। মাদরাসায় শিক্ষা গ্রহণ এবং মসজিদে নামাজ আদায়ের ক্ষেত্রেও এদেরকে অগ্রগামী মনে হয়।
নেপালি মুসলমানদের অধিকাংশই সুন্নি মতাবলম্বী। তারা ধর্মীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ব্যাপারে খুব সচেতন। মহানবী (সা) এর সিরাতচর্চা, তাঁর জীবনবোধ, জীবনচরিত, তাঁর প্রবর্তিত সাংস্কৃতিক ও সামাজিক জীবন ধারার ব্যাপারে খুবই আন্তরিক। ইসলামের মৌলিক বিধানসমূহ পালনে তারা সচেষ্ট থাকে। কুসংস্কার, অমুসলিম সংস্কৃতি ও বিদয়াতের ব্যাপারে তারা সচেতনতার পরিচয় দিয়ে থাকে। তবে শিক্ষার স্বল্পতা ও ধর্মীয় জ্ঞানের অভাব তাদের এ প্রয়াসকে অনেকাংশে ব্যাহত করে ফেলে। নেপালে শিয়া মতাবলম্বী মুসলমানদেরও দেখা যায়। তারা মূলত ধর্মীয় মৌলিক বিধি-বিধান পালনের চেয়ে আনুষ্ঠানিকতায় বেশি আগ্রহী। বিশেষ করে ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রা)-এর পুত্র ইমাম হোসাইন (রা)-এর ভীষণ ভক্ত তারা। মহররম মাসের কারবালা দিবসে তারা নানা রকম আনুষ্ঠানিকতা উদযাপন করে। তবে এসব আনুষ্ঠানিকতায় ধর্মীয় সংস্কৃতির সীমা ঠিক থাকে না। এদের সংখ্যা খুব বেশি না হলেও এরা নেপালের আনসারি জেলার রামনগর, ভুটাহা, হারনগর, কাপতানগঞ্জ ও বোখারা অঞ্চলে বসবাস করে।
সুন্নি মুসলমানদের মধ্যেও কয়েক মতাদর্শের মুসলমান রয়েছে। এদের মধ্যে দেওবন্দি, ব্রেলবি, হানাফি ও আহলে হাদিস অন্যতম। ইসলামের মৌলিক ইবাদত ও আকিদার ক্ষেত্রে এদের মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য নেই। মূলত দেওবন্দি উলামা, বালাকোটের সংগ্রামী চেতনাসহ ইসলামের প্রচার ও প্রসারে চেতনাগত কিছুটা পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। গবেষকগণ এ ধরনের শ্রেণীভেদকে ইতিবাচক দৃষ্টিতেই দেখেন।
বংশীয় মর্যাদাগত দিক থেকে মুসলমানদের মধ্যে প্রধানত চারটি শ্রেণী রয়েছে। এরা হলো সাইয়্যেদ, শেখ, পাঠান এবং মোগল। সাইয়্যেদ ও শেখরা নিজেদেরকে আরবীয় বংশোদ্ভূত হিসেবে দাবি করে। সেই সাথে তারা মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর বংশধর ও নির্ভেজাল অনুসারী হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিয়ে থাকে। পাঠানরা নিজেদেরকে আফগান বংশোদ্ভূত এবং মোগলরা নিজেদেরকে তুর্কি ও মঙ্গলদের পরবর্তী বংশধর হিসেবে দাবি করে। মধ্য এশিয়া থেকে ভারতে এসে বসতি স্থাপন করেছে বলে মোগল বংশীয়রা মনে করে। পশ্চিমাঞ্চল পাহাড়ি এলাকায় মির্জা ও ফকির বংশের লোকও পাওয়া যায়।
পেশাগত দিক থেকেও নেপালি মুসলমানদের মধ্যে কয়েক শ্রেণীর নাম পাওয়া যায়। এরা হলো আনসারি বা তাতি, সবজি ফারোস বা সবজি বিক্রেতা, ধৌবা বা ধোপা, নাদাফ বা সুতাকারিগর, দোফফালি বা পর্দা-চুড়িবিক্রেতা ও মুচি (জুতা শ্রমিক) ইত্যাদি। এ শ্রেণীর মুসলমানরা স্থানীয়ভাবে ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলামে দীক্ষা নিয়েছে। এদের অধিকাংশই মূলত জাত-ধর্মের শ্রেণীভেদে নির্যাতিত অমুসলিম ছিলো। নেপালের সারাদেশে এদের অবস্থান থাকলেও এদের অধিকাংশের বসবাস নেপালের পশ্চিমাঞ্চলীয় পাহাড়িয়া এলাকায় এবং তেরাই অঞ্চলে। কাঠমান্ডু অঞ্চলে ইরকু নামে আরো এক শ্রেণীর মুসলমানের অস্তিত্ব রয়েছে। এদের মাতৃভাষা উর্দু হলেও নেপালি ও নেওয়ারি ভাষায়ও এরা কথা বলে থাকে। বারা ও পার্নি অঞ্চলের মুসলমানেরা ভোজপুরি ভাষায় কথা বলে। নেপালের পূর্বাঞ্চলীয় মুসলমানের মৈথিলি ভাষায় কথা বলে থাকে।
(বাকি অংশ আগামী সংখ্যায়)

SHARE

Leave a Reply