নৈতিকতার উৎকর্ষ সাধনে হযরত মুহাম্মদ (সা) -ফারহানা সুমাইয়া মিতু

cs-mohamodসাফারি পার্কে এক কৌতূহলী দুঃসাহসী কিশোর! হঠাৎ তার খেয়াল হলো দেয়ালের ওপর উঠে বাঘকে খাবার দেবে। দেয়ালে উঠে যেই না খাবার দিতে গেল অকৃতজ্ঞ বাঘ লাফিয়ে উঠে তার হাতটাকে ঘাড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিলো!
গল্পের মতো শুনাচ্ছে, তাই না? অথচ এটা একেবারেই বাস্তব, সাম্প্রতিক একটি ঘটনা!! কেমন হতো যদি বাঘটা উল্টো তাকে হামলা না করে কৃতজ্ঞতাস্বরূপ ছেড়ে দিতো? আমরা কখনও দেখেছি কোন অসহায় শিশুকে একা পেয়ে বিষধর সাপ তাকে ছেড়ে দিয়েছে? এমনটা হয় না কখনও। কারণ, পশুদের বিবেক থাকে না। মনুষ্যত্ব থাকে না। তাদের থাকে পশুত্ব। এই পশুত্ব শুধুই তাদের দৈহিক চাহিদা, ক্ষুধার কথা ভাবায়। তাই উচিত, অনুচিত বা ভালো-মন্দ চিন্তার শক্তি নেই তাদের। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব হলেও তাদের মধ্যে পশুত্ব আর মনুষ্যত্ব দুটোই বর্তমান। মানুষ কখনও কখনও তার মনুষ্যত্বকে প্রাধান্য দিয়ে পশুত্বকে দমন করে, তখন ক্ষুধা, প্রবৃত্তির দাবি পূরণ করার চাইতে ভালো-মন্দ বা উচিত-অনুচিত বিবেচনাকেই প্রাধান্য দেয়। নিজের কল্যাণের জন্য এমন কিছুকে বেছে নিতে পারে না যা বৃহত্তর স্বার্থে অকল্যাণকর। আবার বৃহত্তর স্বার্থ রক্ষায় এমন অনেক কিছু গ্রহণ করে যা তার জন্য কষ্টকর।
অন্য দিকে যারা পশুত্বকেই প্রাধান্য দেয় তারা নিজের স্বার্থে, দৈহিক চাহিদা পূরণে এমন সব কাজ করতে শুরু করে যা অন্যের জন্য বা বৃহত্তর স্বার্থে অকল্যাণকর। এরা জীবনের অধিকাংশ সময় অতিবাহিত করে শুধু নিজেদের ভোগ বিলাস আর মন ও শরীরের তৃপ্তি আস্বাদনে।
একটা সমাজে যখন অধিকাংশ মানুষ দৈহিক ও জৈবিক চাহিদা পূরণে ব্যস্ত হয়ে পশুত্বকে বেছে নেয় সেই সমাজ অন্ধকারে ঢেকে যায়। সেই সমাজের অন্ধকার দূর করার প্রধান অস্ত্রই হয় নৈতিকতাসম্পন্ন একদল মানুষ যারা মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটায় পশুত্বকে দমন করে।
আজ থেকে সাড়ে চৌদ্দশত বছর আগের সমাজটাও ঠিক এই কারণে জাহেলিয়াতপূর্ণ ছিল। মানুষ আর পশু একাকার হয়ে গিয়েছিল। মদ, জুয়া, নারীর প্রতি অসম্মান, চুরি-ডাকাতি, খুন এক নিয়ন্ত্রণহীন পশুত্বের বিস্তারে একাকার হয়ে গিয়েছিল তখনকার সমাজ। ঠিক এমন জাহেলি পরিবেশে হযরত মুহাম্মদ (সা) এর জন্ম।
এই কদর্য সমাজটাকে পরিবর্তন করতে হবে। এই পশুর মতো মানুষগুলোর মধ্য থেকে হযরত ইবরাহিম (আ)- এর মতো আল্লাহপ্রেমিক, ইউসুফ (আ)-এর মতো চরিত্রবান লোক খুঁজে বের করতে হবে। ঠিক কোথা থেকে শুরু করবেন সমাজ আলোকিত করার জন্য এই কাজ। কাকে সাথে নিয়ে শুরু করবেন। খুব অবাক লাগছে? যেই সমাজে জীবন্ত কন্যাকে মাটিতে পুঁতে ফেলা হয় সেই সমাজে নারীকে মর্যাদার আসনে বসানোর কাজটা কিভাবে শুরু করবেন তিনি? এক বিশাল গুরু দায়িত্ব তাঁর মাথায়।
বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমান নবীজী (সা) গাছের পাতায় নজর না দিয়ে গোড়ায় নজর দিলেন। প্রত্যেকটি সমস্যার আলাদা আলাদা সমাধান না খুঁজে সমস্যাগুলোর কারণের দিকে নজর দিলেন। আর তার কাজে সহযোগিতার জন্য উত্তম সহযোগী বাছাই করে নিলেন। মহিলাদের মধ্য থেকে হযরত খাদিজা (রা), পুরুষদের মধ্য থেকে হযরত আবু বকর (রা), কিশোরদের মধ্য থেকে হযরত আলী (রা) এবং দাসদের মধ্য থেকে হযরত যায়েদ (রা)কে নিজের সঙ্গী করে নিলেন। আর সমাজ সংস্কারে মনুষ্যত্বকে পুঁজি হিসেবে গড়ে তুললেন।
সত্যবাদিতা : কখনও মিথ্যা বলতেন না, তাই তাকে সাদিক বলতো সবাই।
আমানতদারিতা : আমানতের রক্ষণাবেক্ষণে জীবন বাজি রাখতেন। সবাই তাকে আল আমিন বলতো।
লজ্জাশীলতা : যে নির্লজ্জ সমাজে নারী, পুরুষ পোশাকবিহীন অবস্থায় কাবা শরীফ তাওয়াফ করতো, সেই সমাজে বালক অবস্থাতেও কখনও অনাবৃত থাকেননি তিনি। বরং ইট মাথায় তোলার জন্য সবাই কাপড় খুলে মাথায় দিয়ে নিলেও তিনি এই কাজ করতে উদ্যত হয়েই অজ্ঞান হয়ে পড়েন।
মূলত এই তিনটি গুণ ছিলো দায়ী হিসেবে তাঁর প্রাথমিক পুঁজি। যেসব মানুষ মানুষ্যত্বহীনতায় ভোগে তাদের যে সম্পদ কখনই থাকে না তা হলো চরিত্র। আর আল্লাহর রাসূল (সা) মানুষের চরিত্রে সেই নৈতিকতার প্লাবন ঘটিয়েই এই মানুষদেরকে সম্পদশালী করতে চেয়েছিলেন। আর প্রত্যেকটি মানুষের মনের চোখ খুলে দিতে চেয়েছেন যা দিয়ে সে নিজেই নিজের মধ্য থেকে অন্ধকারের সব কিছুকে দূর করবে।
যেখানে বাজারকে নিকৃষ্ট জায়গা হিসেবে মহিলাদের যাতায়াতকে অপছন্দ করা হয়েছে সেখানে বর্তমান সমাজে মার্কেটে যাওয়া-আসা কিংবা মেলায় যাওয়া পর্দাহীনতার সাথে, এসব কাজ খুব উপভোগ্য হয়ে গিয়েছে। আর এরই ফলাফল পহেলা বৈশাখের উৎসবে নারীদের লাঞ্ছিত করা, ইভটিজিংসহ আরো অন্যান্য অনাচার। ইসলাম নারীকে যে অধিকার দিয়েছে তার সঠিক বাস্তবায়ন না থাকায় পারিবারিক অশান্তি বাড়ছে। মানুষের বিবেকের চাইতে নফ্সের প্রভুত্ব বেড়ে যাওয়ায় লোভ, দুনিয়াপ্রীতি আর শুধু পাওয়া না পাওয়ার হিসাব মানুষকে এতটাই ব্যতিব্যস্ত করেছে যে তারা আত্মহত্যার মত জঘন্য পথও বেছে নিচ্ছে। সমাজে অশ্লীলতাকে উসকে দেয়ায় বাড়ছে নারীদের ধর্ষণ বা নির্যাতনের সংখ্যাও। আল্লাহর ভয় না থাকায় পিতা-মাতার অগোচরে সন্তানরা নানা অন্যায় অনাচারে শরিক হচ্ছে। এভাবেই আমাদের সমাজটাও সেই জাহেলি সমাজে রূপ নিচ্ছে।
তাই আপনার-আমার পরিবার, ক্লাস, সমাজ, পরিজন নিয়ে আরো একটু সবারই ভাবা উচিত। কেমন আছি আমরা? কেমন আছে সবাই? কেমন থাকার কথা? কেমন হওয়ার কথা? এর উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যাবে বুকের ভেতর একটা চিনচিন ব্যথা রাতের ঘুম কেড়ে নেবে। একটা অদ্ভুত কষ্ট তাড়া করে ফিরবে। ঠিক তখনই রাসূল (সা) এর নৈতিক বিপ্লবের কথা স্মরণ- বুকের ব্যথাটা প্রশান্তি হয়ে ডানা মেলবে সুদূর আকাশে। রঙধনু হয়ে রাঙিয়ে দেবে আমার প্রিয় এই বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের মনকে, আর গুনগুনিয়ে গেয়ে উঠবে :
“এক অনুপম সত্যের সন্ধান
তুমি দিয়ে গেলে হে প্রিয় হযরত
আমি ধন্য জীবন মরণে
হয়েছি তোমার উম্মত।”

SHARE

Leave a Reply