নৈতিক মূল্যবোধে তরুণ সমাজ -মোঃ খালেদ হোসেন

একটি সমাজ ও রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি হলো তরুণ সমাজ। তরুণেরা যত বেশি আদর্শিক, কর্মঠ ও দেশপ্রেমিক হবে সেই সমাজ ও রাষ্ট্র তত বেশি উন্নত ও সুশৃঙ্খল হবে। সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় যুবসমাজ বোঝা নয় অমূল্য সম্পদ। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় এই বিশ্বসভ্যতার ইমারত নির্মাণে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে যে শ্রেণি তার নাম তরুণ সমাজ। বিশ্বনবী রাসূলে আরাবী সা. যখন মানবতার মুক্তির জন্য নতুন একটি সভ্যতা তথা ইসলামী সমাজ বিনির্মাণের সংগ্রামের অবতারণা করলেন, কায়েমি স্বার্থবাদীরা মরু ঝড়ের মতো রাসূল সা.-এর ওপর আঘাত করে বাধা দিতে লাগল। তখন আরবের এক শ্রেণীর তেজস্বী তরুণ মর্দে মুজাহিদ রাসূলের হাতে হাত মিলিয়ে প্রতিরোধ করতে লাগল। যারা দিনের বেলায় আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠায় জিহাদ করতো আর রাতের বেলায় মাবুদের কাছে সেজদায় অশ্রু ঝরাতো। যাদের তারুণ্যের উচ্ছ্বাস ও ঈমানি চেতনা ভেঙে চুরমার করেছিল তৎকালীন দুই পরাশক্তি পারস্য আর রোম সাম্রাজ্য। যাদের তাকবির ধ্বনি নদীর গতিপথ পাল্টে দিয়েছিল, তছনছ করে দিয়েছিল শয়তানি সাম্রাজ্য, পদানত করেছিল অর্ধ জাহান। যাদের সততা, ন্যায়পরায়ণতা, উন্নত চরিত্র, আল্লাহর প্রতি ঈমান ছিল আকাশচুম্বী, বিশ্বনেতৃত্ব তাদের কদম চুম্বন করেছে। সেই যুবসমাজের মানদণ্ড আর বর্তমান সমাজের যুবসমাজের মানদণ্ড বিবেচনা করলে শুধু হতাশাই বাড়বে। প্রশ্ন হলো কেন এমন হলো? এই নিবন্ধে আমরা আলোচনা করব বাংলাদেশের তরুণ সমাজের বর্তমান অবস্থা কী, কেন তাদের অধঃপতন ও আমাদের কী করণীয়।

কোন দিকে যাচ্ছে আমাদের তরুণ সমাজ? কারা দায়ী?
বাংলাদেশের সামাজিক অবস্থা বিবেচনা করলে এটাই প্রতীয়মান হয় যে সামাজিক অবক্ষয় সামাজিক অস্থিরতার দিকে দিনদিন প্রকটভাবে নিয়ে যাচ্ছে যা আমাদেরকে আতঙ্কিত না করে পারে না। জিনা, ধর্ষণ, হত্যা, লুটপাট, মাদক সেবন, চোরাকারবারি, ছিনতাই, রাহাজানি, পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস, অশ্রদ্ধার অতিমাত্রা একটি শান্তিপূর্ণ সমাজকে অশান্ত করে তুলেছে। এই সমাজে সব কিছু সহজলভ্য হলেও অভাব দেখা যাচ্ছে উন্নত চরিত্র, মূল্যবোধসম্পন্ন তরুণ সমাজ। অথচ এমন তো হবার কথা ছিল না। জন্মের সময় কোন মানুষই পাপী হয়ে জন্মগ্রহণ করে না। তাহলে কারা তাদের কলঙ্কিত করে? এর উত্তরে অনেক কিছু জড়িত থাকলেও আমরা বলতে পারি সবচেয়ে বেশি দায়ী সমাজের পারিপার্শ্বিকতা ও রাষ্ট্রব্যবস্থা।

সামাজিক পারিপার্শ্বিকতা কিভাবে দায়ী? ঘর থেকে বের হয়ে রাস্তাঘাট, হাটবাজার যেদিকে নজর পড়ে দেখা যায় শুধু অশ্লীল পোস্টার, নগ্নছবি, পাড়ায় মহল্লায় যাত্রাপালা, টেলিভিশন পর্দায় অশ্লীল নাটক, সিনেমা, ইন্টারনেটে বিদেশি নোংরা সংস্কৃতির সহজলভ্যতা মানুষের লজ্জার দৃষ্টিকে লজ্জাহীন করে তুলেছে। এই অবস্থায় যৌনতাকে স্বাভাবিক নিয়ম নৈতিকতায় আবদ্ধ রাখা অনেকের পক্ষে কঠিন হয়ে উঠেছে। সমাজে অশ্লীলতার সয়লাব হয়ে গেছে। যে যুবকের উচিত ছিল রাতের গভীরে তাহাজ্জুদে আল্লাহর ভয়ে অশ্রু ঝরাবে সে এখন রাত্রি কাটায় নোংরা ছবি দেখে, অনৈতিক সম্পর্কে হারিয়ে গিয়ে। সমাজে দেবর-ভাবী, শালী-দুলাভাই, গায়রে মাহরুমের অবাধ চলাফেরা এমন একটি সামাজিক কালচার জন্ম দিচ্ছে যেখানে ওপরে ওপরে দেখা যায় মুসলিম সমাজ কিন্তু ভেতরে যাচাই করলে দেখা যায় এক নব্য জাহেলিয়াত। পাপের আগ্রাসন মিশে গিয়েছে সমাজের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে; বাতাসে; ইথারে। মনে হচ্ছে আসমান থেকে আল্লাহর গজব নাযিল হচ্ছে। আল্লাহর ভয়, আখেরাতের জবাবদিহিতার কথা চিন্তা করার সময় মনে হচ্ছে কারো নেই। অথচ পরিবার থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত এই বিষয়ে উল্লেখ করার মতো কারো কোনো চিন্তা ও পরিকল্পনা দেখা যাচ্ছে না।

রাষ্ট্রব্যবস্থা কিভাবে দায়ী?
একটি রাষ্ট্র হলো তার সামাজিক অবস্থার প্রতিচ্ছবি। সমাজ রাষ্ট্র থেকে আলাদা নয় বরং রাষ্ট্রব্যবস্থারই একটি ইউনিট। রাষ্ট্রের অন্যতম কাজ হলো সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা, দুষ্টের দমন ও শিষ্টের লালন চর্চায় প্রশাসনিক শক্তির কাঠামো বিন্যাস করে উন্নত জাতিগঠনে সার্বক্ষণিক তৎপরতা চালানো। অথচ এখন যা চলছে এর উল্টো কার্যক্রম। নীতিহীন রাজনীতি, পেশিশক্তি, বিভাজন আর ঘৃণা ছড়ানোতে লিপ্ত রয়েছে রাষ্ট্রের বিশেষ এক শ্রেণী। এই কাজে যাদেরকে সবচেয়ে বেশি যুক্ত করা হচ্ছে সমাজের তরুণ সমাজকে। জমি দখল, ক্যাম্পাস দখল, বিরোধী মত ও দল দমন চলছে তাদের ছত্রছায়ায়। আজকের সামাজিক নেতৃত্ব সেই জবর দখলকারীদের হাতে বন্দী। তারাই তৈরি করছে ত্রাসের রাজত্ব। আজ জাতির শিক্ষাব্যবস্থ্যা জাতীয় বিপদে নিপতিত হয়েছে। ধর্মহীন শিক্ষাব্যবস্থা চালু করার প্রতিযোগিতায় নেমেছে এক শ্রেণীর কুচক্রী মহল। মানবিকতা, নৈতিকতা বিবর্জিত শিক্ষাব্যবস্থা একটি সমাজকে মানসিকভাবে, নৈতিকভাবে পঙ্গু করার হীন চক্রান্তে লিপ্ত। যে শিক্ষা মানুষকে মানুষ না বানিয়ে ভোগবাদী পৃথিবীর দাস বানিয়ে ছাড়বে। সেই শিক্ষা গ্রহণ করতে বাধ্য করা হচ্ছে শিক্ষাঙ্গনে।

আমাদের করণীয় কী?
তরুণ সমাজের এই অবক্ষয় ও ধ্বংসাত্মক পথ থেকে আমাদের বাঁচাতে হবে। বিভিন্ন উপায়ে আমরা কাজ করতে পারি। এই আলোচনায় আমরা দু’টি উপায় বর্ণনা করব। প্রথমত, সামাজিক সচেতনতা দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রীয় পরিচর্যা।
সামাজিক সচেতনতা : সচেতন, শিক্ষিত, সমাজদরদি, দায়ী ইলাল্লাহদের যুবসমাজের অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ দায়িত্বের দৃষ্টান্ত রাখতে হবে। প্রতিটি পরিবারের সদস্যকে বুঝাতে হবে তাদের সন্তানদের বর্তমান অবস্থা ও তাদের কর্তব্যসমূহ। মসজিদে, পাড়ায়, মহল্লায়, আলোচনায় নিয়ে আসতে হবে অবক্ষয়ের কুফল ও এর পরিণাম। ভালো মানুষদের এগিয়ে আসতে হবে সামাজিক সংগঠন গঠন করে সমাজের সব অনৈতিকতার বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করা এখন সময়ের দাবি। আরও অনেক কাজ করা যেতে পারে যেমন: আর্থিক ফান্ড গঠন করে বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। সমন্বিত কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রতিটি মানুষের আত্মিক বিকাশে একটি সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রতিজ্ঞা করা। ইসলামী সাহিত্য, দ্বীনি শিক্ষার প্রসার ঘটানো। নৈতিক মান বৃদ্ধিতে সবাই সবার প্রতি দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয়া। সমাজের অভিভাবক, শিক্ষক ও সচেতন শ্রেণী তরুণ সমাজকে ভবিষ্যতের জন্য সুন্দর স্বপ্ন দেখাতে হবে, তাদেরকে বুঝাতে হবে আল্লাহর দেয়া নিয়ামত এই জীবন। তার একটি সুন্দর অর্থ আছে, স্বপ্ন আছে, একটি কল্যাণমূলক সভ্যতা নির্মাণের নেতৃত্ব তাকে দিতে হবে। সেই লক্ষ্যে তার জীবনকে প্রস্তুত করতে হবে।

রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা : বাংলাদেশের তরুণ সমাজ নিয়ে সরকারকে নতুনভাবে ভাবতে হবে। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় তাদেরকে অসামাজিক ও অনৈতিক কাজে ব্যবহার করা রোধ করতে হবে। দলীয় লোক ছাড়া অন্য যোগ্য প্রার্থীর নিয়োগ না দেয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। বেকারত্বের বিশাল সমস্যার সমাধান করতে হবে এই বিষয়ে আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থা নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে যেখানে ধর্ম, মানবিকতা, নৈতিক মূল্যবোধ মৌলিক প্রেরণা হিসেবে কাজ করবে। প্রতিটি মানুষ তার নিজের প্রতি, সমাজের প্রতি, রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব স্পষ্ট করে বুঝতে পারবে। মানবতার কল্যাণে জীবন উৎসর্গ করার নেতৃত্ব তৈরি করতে সহায়ক হবে। ধর্মহীন শিক্ষানীতি বাদ দিয়ে ইসলামী শিক্ষার ব্যাপক বিস্তার করতে হবে। আইনের সঠিক প্রয়োগ ও সুবিচার নিশ্চিত করে সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। ইন্টারনেটের অশ্লীল ওয়েবসাইট ব্লক করতে হবে। নির্লজ্জতা ছড়ানোর সমস্ত উৎস বন্ধ করতে হবে। প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধকল্পে সবাইকে উৎসাহী করতে হবে। প্রশাসন ও সমাজের বিভিন্ন স্তরের গ্রহণযোগ্য দায়িত্বশীল ব্যক্তির সমন্বয়ে যুবসমাজের উন্নয়নে বিভিন্ন ট্রেনিং ও উন্নয়ন প্রকল্প সঠিক ও কার্যকরভাবে গ্রহণ করে যুবসমাজকে মানবসম্পদে রূপান্তর করতে হবে।
বর্তমান সমাজ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশের সহায়ক নয়। সামাজিক সচেতনতা আর রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হতাশাগ্রস্ত তরুণ সমাজকে মানবসম্পদে রূপান্তর করা যায়। দরকার শুধু আমাদের আন্তরিক ইচ্ছা ও যথাযথ প্রচেষ্টা। আল্লাহ আমাদের সহায় হউন।

লেখক : পিএইচডি গবেষক; ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি, মালয়েশিয়া

SHARE

Leave a Reply