পত্রিকায় ফিচার লিখবেন যেভাবে? আযাদ আলাউদ্দীন

প্রতিদিন খবরের কাগজে অনেক ফিচার ছাপা হয়। কখনো কখনো পত্রিকার লিড নিউজসহ অসংখ্য নিউজ ও ছবির ভিড়ে ‘আকর্ষণীয় ফিচার’ পাঠককে সহজেই আকৃষ্ট করে। নির্দিষ্ট ফিচার পাতা ছাড়াও অনেক সময় দৈনিক পত্রিকার প্রথম এবং শেষ পাতায়ও ফিচার প্রকাশিত হয়।
ফিচারের নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা নেই। একেকজন এটিকে একেকভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। আমার দৃষ্টিতে ফিচার হচ্ছে এক ধরনের সফ্ট নিউজ। হার্ড নিউজ বা কারেন্ট নিউজের বিপরীতে যে ধারার নিউজ এবং ভিউজ সংযুক্ত হয়ে পাঠককে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে তাই হচ্ছে ‘ফিচার’।

একজন পাঠক যখন কেনো ফিচার পড়বেন তখন তার কাছে বিষয়টির বর্ণনাভঙ্গি গল্পের মতো মনে হবে। আসলে তা হবে পুরোপুরি বাস্তবতানির্ভর। তাই বলতে পারি ফিচার হচ্ছে- ‘বাস্তবতার গল্প’।
ফিচার লেখার প্রথম কাজ হচ্ছে বিষয় নির্ধারণ। বিষয় নির্ধারণের পর আসবে লেখার কৌশলের বিষয়টি। এজন্য আপনি যে বিষয়ে লিখবেন সে বিষয়টির প্রতি স্থির হয়ে লেখার কৌশলে প্রবেশ করবেন। ফিচার লেখার বিষয়ের কোনো অভাব নেই। যে কেনো বিষয়ে ফিচার লেখা যায়। যেমন- মনে করুন, প্রায় দেড় বছর যাবৎ দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজসহ সকল ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। যখন শত শত ছাত্রছাত্রীর প্রাণবন্ত উপস্থিতিতে আপনার প্রাণপ্রিয় শিক্ষাঙ্গনের ক্যাম্পাস সরব ছিলো- তখন আপনার অনুভূতি কেমন ছিলো? আর এখন শিক্ষার্থীবিহীন নিষ্প্রাণ ক্যাম্পাসটি আপনার কাছে কেমন লাগছে? এই অনুভূতি যদি হৃদয় দিয়ে গভীরভাবে অনুভব করতে পারেন তাহলে এ বিষয়েও একটি ভালো মানের ফিচার তৈরি হতে পারে। এমনিভাবে ক্যাম্পাসের অসংখ্য বিষয় নিয়ে নতুন নতুন আইডিয়ার ফিচার তৈরি করা যায়।
একজন ফিচার লেখককে ভালোমানের ফিচার তৈরির জন্য অনেকগুলো বিষয় মাথায় রাখতে হয়। ফিচারের শিরোনাম থেকে শুরু করে লেখার সমাপ্তি পর্যন্ত পাঠকের মনোযোগ ধরে রাখতে হয়। অনেক পাঠক শিরোনাম দেখেই সিদ্ধান্ত নেন তিনি ফিচারটি পড়বেন কিনা। তাই একজন ফিচার লেখককে সবচেয়ে বেশি কৌশলী হতে হয় ফিচারের শিরোনাম দেয়ার ক্ষেত্রে।

ফিচারের শিরোনাম দেয়ার সময় খেয়াল রাখতে হবে-
এক. শিরোনাম অবশ্যই আকর্ষণীয় হতে হবে, যাতে পাঠক পুরো লেখাটি পড়তে আগ্রহী হয়।
দুই. শিরোনাম হবে সুস্পষ্ট ও যথাযথ। অপ্রাসঙ্গিক শব্দ শিরোনামে ব্যবহার করা ঠিক নয়। একটি সুনির্দিষ্ট শিরোনাম ব্যবহার করার মাধ্যমে পাঠকের মনে ঝাঁকি দেয়া গেলেই সেটি আদর্শ শিরোনাম। এমন শিরোনাম ব্যবহার করতে হবে যেটি সব বয়সের পাঠকদের নজর কাড়তে সক্ষম হবে। কিছু কিছু ফিচারের ক্ষেত্রে হৃদয়স্পর্শী, কৌতূহলোদ্দীপক, চোখা, তুখোড় ও লক্ষ্যভেদী শিরোনাম ব্যবহার করতে হবে।
তিন. শিরোনাম ছোট হওয়া উত্তম। পত্রিকা ভেদে শিরোনামের শব্দসংখ্যা ভিন্ন হতে পারে। তবে সর্বোচ্চ আট শব্দের মধ্যেই পুরো কথাটি তুলে ধরা উচিত।
চার. শিরোনামে সহজ শব্দ ব্যবহার ও বানানের দিকে খেয়াল রাখতে হবে।
পাঁচ. এমনভাবে শিরোনাম লিখতে হবে যেন পাঠকের কাছে বিষয়টি নতুন মনে হয়।
ছয়. বিভিন্ন পত্রিকা ও ম্যাগাজিনে প্রকাশিত ফিচারগুলোর শিরোনাম দেয়ার স্টাইল ফলো করে নিজের মধ্যে একটা স্বতন্ত্র বলয় তৈরি করতে পারলে ফিচারের আকর্ষণীয় শিরোনাম দেয়া সম্ভব।
ফিচার লেখার কৌশল
ফিচারের বিষয়বস্তু ও আকর্ষণীয় শিরোনাম তৈরির পর কিভাবে আপনি ফিচার লেখা শুরু করবেন, সেই সূচনাপর্বটি হওয়া চাই সবচেয়ে আকর্ষণীয়। যেন পাঠক একবার পড়তে শুরু করে আর ফিচারটি পড়া থেকে বের হয়ে না যান। সূচনা লেখার ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হবে-
– প্রথম বাক্য থেকেই পাঠককে ধরে রাখতে হবে।
– লেখার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত টেনে নিতে হবে।
– সূচনা একাধিক অনুচ্ছেদে লেখা যেতে পারে।
– যে কথাটি মানুষ জানে সেটি ব্যবহার করার প্রয়োজন নেই।
– শিরোনামের সাথে সঙ্গতি রেখে সূচনা লিখতে হবে।
– গল্পভেদে এটি কখনো নাটকীয়, কখনোবা মর্মস্পর্শী, রহস্যময় ও কৌতুকধর্মী হতে পারে।
– সরাসরি কোনো কথা না বলে গল্পের ঢঙে বলতে হবে।

ফিচারের নানা রকম সূচনা ও উদাহরণ

ক. উদ্ধৃতিমূলক সূচনা
ফিচারের বিষয়ের উপর নির্ভর করে সূচনা তৈরির ব্যাপারটি। যেমন- ছাত্রজীবনে আমরা একবার বরিশাল সরকারি বিএম কলেজের বাংলা বিভাগ থেকে শিক্ষা সফরে গিয়েছিলাম মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়িতে। সেখান থেকে ফিরে আমি একটি ফিচার লিখেছিলাম। যার শিরোনাম ছিলো- ‘মধুসূদনের সাগরদাড়িতে একদিন’ সেই লেখাটি শুরু করেছিলাম মাইকেলের ‘বঙ্গভাষা’ কবিতার উদ্ধৃতি দিয়ে-
‘হে বঙ্গ, ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন;
তা সবে, (অবোধ আমি!) অবহেলা করি,
পর-ধন-লোভে মত্ত, করিনু ভ্রমণ
পরদেশে, ভিক্ষাবৃত্তি কুক্ষণে আচরি’।
বহুদেশ ঘুরে কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত অবশেষে প্রশান্তি খুঁজে পেয়েছেন নিজ বাড়ির দরজায় সেই কপোতাক্ষ নদের তীরে।

খ. পলিসি বুঝে সূচনা তৈরি
আপনি যে পত্রিকা বা ম্যাগাজিনে ফিচারটি লিখছেন- ওই পত্রিকার পলিসি বুঝে আপনাকে ফিচারটির সূচনা করতে হবে। যেমন: বরিশালে আমার আইটি ফার্মের (সাতরং সিস্টেমস্) বেলকনির পাশেই রয়েছে একটি চালতা গাছ। একদিন দেখলাম চালতা গাছে অনেকগুলো চমৎকার ফুল ফুটেছে। আমি সেই ফুলের আকর্ষণে মুগ্ধ হলাম। ভাবলাম এটি নিয়ে তো একটি ফিচার লেখা যায়। আমি মোবাইল ফোনে চালতা ফুলগুলোর ছবি তুললাম। কয়েকদিন যাবৎ চালতা ফুল নিয়ে স্টাডি শুরু করলাম। গুগলে সার্চ দিয়ে একাধিক ফিচার পড়লাম। অবশেষে লিখলাম ‘চালতা ফুলের গল্প’ শিরোনামের একটি ফিচার। যেটির শুরু করলাম কবি গোলাম মোহাম্মদের লেখা সেই বিখ্যাত গান ‘চালতা পাতার কাজ, দেখে আমি বুঝেছি, শিল্পীর চেয়ে তিনি বড় শিল্পী… সেই একই ফিচারের মাঝে আমি চালতা ফুল নিয়ে কবি জীবনানন্দ দাশ এবং বুদ্ধদেব বসুসহ অনেকের লেখার রেফারেন্স ব্যবহার করলেও শুরুটা করেছিলাম গোলাম মোহাম্মদের গান দিয়ে।
আমি যদি এই ফিচারটি ‘নয়া দিগন্তে’ না লিখে ‘জনকণ্ঠে’ লিখতাম- তাহলে অবশ্যই আমি কবি গোলাম মোহাম্মদের লেখা দিয়ে শুরু করতাম না। সেখানে হয়তো জীবননানন্দ দাশের লেখা দিয়েই শুরু করতাম। এখানেই হচ্ছে মিডিয়ার সূক্ষ্ম পলিসির প্রয়োগ! এসব টেকনিকগুলো মাথায় রেখেই কিন্তু আপনাকে ফিচার লিখতে হবে।

গ. নাটকীয় সূচনা
২০০৭ সালে সিডরের পর আমি পটুয়াখালীর গলাচিপার চর বিশ্বাসের দশ বছরের একটি শিশুর বেঁচে থাকা ও জীবন সংগ্রাম নিয়ে ফিচার লিখেছিলাম। ওই ফিচারটির শিরোনাম দিয়েছিলাম বরিশালের আঞ্চলিক ভাষায়- ‘ডেক্সোডা (বাক্স) না থাকলে হেইদিন মোরা মইরর‌্যাই যাইতাম’। সেই ফিচারটি শুরু করেছিলাম এভাবে- ‘রাত তিনটা! লম্বা হুইসেল বাজিয়ে বরিশাল নদী বন্দর থেকে গলাচিপার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ‘এমএল অন্তরা’ নামের লঞ্চটি….
পাঠক হয়তো ভাবতে পারেন কথা নেই বার্তা নেই, হঠাৎ রাত তিনটা! ঘটনা কী? এভাবে নাটকীয় শুরু করে পাঠককে ফিচারের ভেতরে নিয়ে যেতে পারাই একজন সফল ফিচার লেখকের কৃতিত্ব।

ফিচারের ভেতরের বর্ণনা কেমন হবে?
– ফিচার হবে বিষয়বস্তু নির্ভর, বিশ্লেষণ হবে তথ্যবহুল।
– সহজে বোঝা যায় এমন বাক্য ব্যবহার করতে হবে।
– সূচনার সঙ্গে বিশ্লেষণের সম্পর্ক রাখতে হবে।
– প্রকৃত ঘটনার বাইরে যাওয়া যাবে না।
– আকর্ষণীয় উদ্ধৃতি ব্যবহার করতে হবে।
– সর্বোচ্চ ছয় অনুচ্ছেদে বিশ্লেষণ শেষ করতে হবে।
– গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-উপাত্ত যোগ করতে হবে।

ফিচারের সমাপ্তি টানবেন কিভাবে?
– ফিচার শেষ করতে হবে ছোট গল্পের মতো।
– তথ্য ও বক্তব্যের সাথে সঙ্গতি থাকতে হবে।
– অল্পকথায় ফিচারের পুরো গল্প বলতে হবে।
– ভবিষ্যতের জন্য কোনো আবেদনমূলক প্রশ্ন রেখেও ফিচার শেষ করা যায়।
লেখক : বরিশাল ব্যুরো চিফ, দৈনিক নয়া দিগন্ত

SHARE

Leave a Reply