পথশিশু সমস্যা রাষ্ট্র ও সমাজের করণীয় মু. আসাদুজ্জামান

ওরা আর সব সাধারণ শিশুর মতো নয়। এ বয়সে ওদের কেউ মায়ের কোলে, কেউ স্কুলে থাকতে পারত। থাকতে পারত পরিবারের অটুট বন্ধনে। কিন্তু নিয়তির ফেরে এসব কিছুই পাওয়া হয় না ওদের। ওরা রাস্তায় ঘুমায়। পথে পথে ঘোরে। ক্ষুধার দায়ে রাস্তায়ই বেছে নেয় জীবিকার পথ। ওরা টোকাই, ওরা ছিন্নমূল পথশিশু। কেনই বা ওরা পথশিশু? ওদের জন্য রাষ্ট্র-সমাজের করণীয় কী? সামাজিক এ সমস্যার সমাধানই বা কোন পথে?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজবো…
এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান;
জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তূপ-পিঠে
চলে যেতে হবে আমাদের।
চলে যাব-তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে এ-শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি-
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।
কবিতায় শিশুদের জন্য পৃথিবীকে বসবাস উপযোগী করে যাওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার করেন কবি সুকান্ত বহুকাল আগে। আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ, দেশ ও জাতির ভবিষ্যতের কর্ণধার। শিশুদের মধ্যেই সুপ্ত থাকে ভবিষ্যতের কবি, শিল্পী, বৈজ্ঞানিক, সাহিত্যিক, চিকিৎসক ছাড়াও বিভিন্ন প্রতিভা। শিশুদেরকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে প্রতিটি অভিভাবক চেষ্টা করে থাকেন। কিন্তু আমাদের দেশে অনেক ছিন্নমূল শিশু আছে যারা তাদের অধিকার বঞ্চিত হয়ে অনাদরে-অবহেলায় দিন কাটায়। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদি মৌলিক অধিকারবঞ্চিত এ দেশের দরিদ্র ও অসহায় শিশুরা।
শিশু কারা? আন্তর্জাতিকভাবে জাতিসংঘ শিশু সনদ অনুযায়ী ১৮ বয়সের কম বয়সী সকলেই শিশু। সে অনুযায়ী বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৪৫ ভাগই শিশু। তবে আমাদের দেশে বিভিন্ন আইনে শিশুর বয়সসীমা বিভিন্ন রকমের। বাংলাদেশের জাতীয় শিশুনীতিতে শুধু ১৪ বছরের কম বয়সীদের শিশু ধরা হয়েছে। আবার বাংলাদেশের অনেক শিশু আবার ১৬ বছরের আওতায় অন্তর্ভুক্ত। আমাদের দেশে প্রচলিত কিছু আইনে ১৫ বছরের কম বয়সীদের শিশু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। শিশু শ্রমিকদের বয়স ১০ থেকে ১৪ বা ১৫ বছর। পেনাল কোড ধারা অনুযায়ী শিশু নির্ধারণে বয়স সীমার মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে। তবে তা কখনই ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে নয়।

২০১১ সালে পথশিশুদের নিয়ে একটা প্রতিবেদন প্রকাশ করে জাতিসংঘ। ওই প্রতিবেদনে পথশিশুদের সংজ্ঞায় বলা হয়, যেসব শিশু রাস্তায় দিনাতিপাত করে, রাস্তায় কাজ করে, রাস্তায় ঘুমায়, যাদের নির্দিষ্ট কোনো আবাসস্থল নেই, যাদের প্রতিদিনের জীবনযাপন রাস্তাকে কেন্দ্র করে, তারাই পথশিশু। জাতীয় শিশুনীতি ২০১১, জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ ১৯৮৯ এবং শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সীদের শিশু বলা হয়।
ঢাকার মিরপুর ১ নম্বর গোল চত্বরে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে চার শিশু। ওদের বয়স ৯ থেকে ১২ বছরের মধ্যে। ওদের এক হাতে ভাঙাড়ির বস্তা, অন্য হাতে পলিথিন। ওরা কী যেন ভাগাভাগি করতে ব্যস্ত। এ চারজনের একজন সর্দারের ভূমিকা নিয়ে একেকজনের পলিথিনে ঢেলে দিচ্ছে সেই উপকরণ। পরে নিশ্চিত হওয়া গেল এরা জুতার আঠা ড্যান্ডি ভাগাভাগি করছে শুঁকার জন্য। কাছে গিয়ে আলাপ জমাতে জানা গেল এদের নাম তপু, মাহি, তারেক ও তুষার। এই চারজনই রাতের বেলা মিরপুর ১ এর ফুট ওভারব্রিজে ঘুমায়। দিনের বেলা এরা ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় বোতল, প্লাস্টিকের টুকরা, ভাঙাড়ি সংগ্রহ ও বিক্রি করে। ক্ষুধা মেটাতে ড্যান্ডিতে আসক্ত হয়ে পড়েছে ওই চার পথশিশুই ।
দেশে সুবিধাবঞ্চিত পথশিশু আছে সাড়ে ১১ লাখ। এর মধ্যে সাড়ে পাঁচ লাখই মাদকাসক্ত। শিশুদের মাদকাসক্তি নিয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়। মাদকাসক্ত পথশিশুর এই সংখ্যা জেনে আমি শিউরে উঠলাম। কী ভয়াবহ কথা! মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর ও ঢাকা আহছানিয়া মিশন আয়োজিত ওই সেমিনারে উপস্থাপিত প্রবন্ধে বলা হয়, শিশুদের মাদকাসক্তি নিরাময়ের ক্ষেত্রে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা আছে। তার মধ্যে পর্যাপ্ত নিরাময়কেন্দ্র না থাকা, মাদকাসক্ত শিশুর প্রতি নেতিবাচক মনোভাব, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বয়ের অভাব, মাদকাসক্ত শিশুদের চিকিৎসায় দক্ষ জনবলের অভাব, চিকিৎসা-পরবর্তী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না থাকা উল্লেখযোগ্য।

বাংলাদেশের মতো একটি দরিদ্র দেশে এসব প্রতিবন্ধকতা থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক। শিশু মাদকাসক্ত হওয়ার পর তার নিরাময় করতে গিয়ে আমরা এসব প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছি। কিন্তু এমন কোনো ব্যবস্থা কি নেয়া যায় না, যাতে কোনো শিশুকে পথে জীবন যাপন করতে না হয়? সবাই চাইলে নিশ্চয়ই তা সম্ভব। সে জন্য খুঁজে বের করতে হবে শিশুদের পথশিশুতে পরিণত হওয়ার কারণ।
পথশিশুদের নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের মতে, মূলত দারিদ্র্যের কারণে শিশুরা পথশিশুতে পরিণত হচ্ছে। এছাড়া বাবা-মায়ের বিবাহবিচ্ছেদ বা একাধিক বিয়ে, তাদের মৃত্যু, পারিবারিক অশান্তি, শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতন, নদীভাঙন, হারিয়ে যাওয়াসহ নানা কারণে বাড়ি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শিশুরা পরিণত হয় পথশিশুতে।
সম্প্রতি এ রকমই এক পথশিশু মুনিরার দেখা পাই রাজধানীর শেরেবাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামের পাশে মিরপুর ২ এর মোড়ে। বয়স আনুমানিক ১৩ বছর। ফুল বিক্রি করছিল সে। যে বয়সে তার স্কুলে যাওয়ার কথা, সেই বয়সে সে পথে পথে ফুল বিক্রি করছে। মুনিরার কাছ থেকে কিছু ফুল কিনি। জিজ্ঞেস করি, কেন ফুল বিক্রি করছ? মুনিরার জবাব, ‘এই ফুল বিক্রি কইরা আমার আর ছুডু ভাইয়ের খাওন কিনি।’ ‘শুধু ফুল বিক্রি করে খাবারের টাকা জোগাড় হয়?’ মুনিরার উত্তর, ‘না ভিক্ষাও করি।’ জানতে চাই তাদের বাবা-মা কোথায় থাকেন। মুনিরা জানায়, মায়ের হাতে মার খেয়ে তারা দুই ভাইবোন পালিয়ে ঢাকায় চলে এসেছে। বাড়ি ফিরে যাচ্ছে না কেন জানতে চাইলে মুনিরার উত্তর, ‘কেমতে যামু? বাড়ির রাস্তা তো চিনি না।’ মুনিরার মতো প্রতিটি পথশিশুর পথে নামার পেছনে কারণ রয়েছে। কিন্তু কারণগুলো দূর করার চেষ্টা করিনি কেউই।

সঠিক হিসাব নেই পথশিশুর
ঢাকায় তপু, মাহিদের মতো কত পথশিশু রয়েছে, তার সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান নেই সরকারের হাতে। এক হিসাব মতে, দেশে বর্তমানে প্রায় ১১ লাখ পথশিশু রয়েছে, যার প্রায় অর্ধেকেরই বাস রাজধানী ঢাকায়। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) হিসাব মতে, শুধু ঢাকা শহরে প্রায় চার লাখ ৫০ হাজার পথশিশু রয়েছে। এই বিপুলসংখ্যক শিশু শিক্ষা, স্বাস্থ্য পুষ্টিসহ নানা সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত; যাদের নির্দিষ্ট কোনো ঠিকানা নেই। খোলা আকাশ, পার্ক, ফুটপাথ, রেলস্টেশন, ফেরিঘাট লঞ্চটার্মিনাল কিংবা বাসস্টেশনে এরা থাকে। রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশন, বিমানবন্দর রেলস্টেশন, টঙ্গী রেলস্টেশন, হাইকোর্ট মাজার, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, রমনা পার্ক, পলাশী মোড়, দোয়েল চত্বর, চানখাঁরপুল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, শহীদ মিনার, ঢাকা মেডিক্যাল, গাবতলী, সদরঘাট ও বিভিন্ন ফুট ওভারব্রিজ এলাকায় পথশিশুদের দেখা মেলে বেশি।
শিশুদের নিয়ে কাজ করে এমন একাধিক সংস্থা জানিয়েছে, পথশিশুদের নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই। তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো দেশটির সর্বশেষ আদমশুমারিতে ভাসমান মানুষ সম্পর্কে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে বলছে, দেশটিতে চার লাখের মতো পথশিশু রয়েছে, যার অর্ধেকই অবস্থান করছে রাজধানী ঢাকায়। অন্যদিকে জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফ বলছে, বাংলাদেশে পথশিশুর সংখ্যা ১০ লাখের বেশি। ঢাকার হিসাব অবশ্য তাদের কাছে নেই। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু ঢাকাতেই ছয় লাখ পথশিশু রয়েছে। সারা দেশে পথশিশুর সংখ্যা ১০ লাখ।

অন্ধকারের জীবন
পথশিশুরা ক্ষুধার জ্বালা, একাকিত্বের কষ্ট বা সঙ্গ দোষে তারা নানা ধরনের মাদক নিচ্ছে। এমন এক মাদক ড্যান্ডি। ড্যান্ডি সেবনের বিষয়ে রমনা পার্ক এলাকার পথশিশু রাহুল বলে, ‘ক্ষুধা লাগে। ড্যান্ডি খেলে ঝিমুনি আসে, ঘুম আসে। তখন ক্ষুধার কথা মনে থাকে না।’ বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য মতে, পথশিশুদের ৮৫ শতাংশই প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে মাদকে আসক্ত। সংগঠনটির তথ্যানুযায়ী ঢাকা শহরে কমপক্ষে ২২৯টি স্পট রয়েছে, যেখানে ৯ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশুরা মাদক সেবন করে। পথশিশুরা সাধারণত গাঁজা, ড্যান্ডি, পলিথিনের মধ্যে গামবেল্ডিং দিয়ে এবং পেট্রল শুঁকে নেশা করে। মানবাধিকার কর্মী সুলতানা কামাল বলেন, ‘পথশিশুদের অনিশ্চিত ও অন্ধকার জীবনের কথা আমরা সবাই জানি। আমাদের মনুষ্যত্ববোধই পারে তাদের মূল স্রােতে ফিরিয়ে আনতে। এখন দরকার যে যার অবস্থান থেকে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করা। তাহলেই পরিস্থিতির সমাধান সম্ভব।’

মেয়ে পথশিশুদের নির্মম জীবন
ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কথা হয় পথশিশু সুরাইয়ার সঙ্গে। সৎমায়ের অত্যাচার সইতে না পেরে সে বাড়ি ছাড়া বছর পাঁচেক আগে। এখন বয়স তার ১৩ বছর। সে জানায়, এই উদ্যানেই এক ভ্রাম্যমাণ নারীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল। সেই নারী সুরাইয়াকে বাসায় নিয়ে যায়। ওখানে দু’জন তাকে ধর্ষণ করে। পরে ওই নারী তাকে কোনোমতে রিকশায় তুলে দেয়। ওই বাসা থেকে আবারও সে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে চলে আসে। সুরাইয়া বলে, ‘বুঝতে পারিনি। কী থেকে কী হয়ে গেল, কারো কাছে এ কথাটা বললে কেউ তো বিশ্বাস করতে চায় না।’ মেয়েটি বলে, ‘লোকজন সুযোগ পেলে নানা রকম খারাপ কথা বলে।’ সদরঘাটের অপর পথশিশু সুলতানা। সে বলে, ‘বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করছে। আমি নানিবাড়ি আছিলাম। নানিবাড়িতে অভাব, তাই পথে আইয়া পড়ছি।’ সেও একাধিকবার যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। বেসরকারি সংগঠন সাজেদা ফাউন্ডেশনের প্রকল্প পথবাসী সেবাকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক রাসেল বারী বলেন, ‘আমরা অন্তত ১৫ হাজার পথশিশুর সেবা দিয়েছি, যারা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এ ছাড়া যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে, এ রকম শত শত কিশোরীকে সেবা দেওয়া হয়েছে।’

অধিকারবঞ্চিত এরা
এসব শিশুর শিক্ষার অধিকার নেই, স্বাভাবিক জীবনযাপনে মেলামেশার অধিকার নেই। ফলে এরা অপরাধ করতে কুণ্ঠাবোধ করে না। কাউকে সহজে বিশ্বাস করে না। ধ্বংসাত্মক কাজে আগ্রহ, নেতিবাচক আচরণে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পরিচয় ও ঠিকানা অনেক ক্ষেত্রে পাওয়া যায় না। অনেক সময় শিশুদের পিতা-মাতার নাম বলতে পারে না। ফলে তাদের জন্মনিবন্ধন করা যায় না। এসব শিশু ভবিষ্যতে নাগরিকসুবিধা থেকেও বঞ্চিত হয়।
প্রতি বছর ২ অক্টোবর আমাদের দেশে পালিত হয় ‘জাতীয় পথশিশু দিবস’। দিনটি পালন উপলক্ষে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। কিন্তু যাঁরা এসব কর্মসূচি পালন করেন, তাঁরা কি একবারও ভাবেন, কেন আমরা দিবসটি পালন করছি? এই দিবস পালনের মধ্যে যে আমাদের লজ্জাও লুকিয়ে আছে। শিশুদের এ অবস্থার জন্য দায়ী তো আমাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোই। তাহলে আমরা কেন দিবসটি পালন করছি? আর এ দিবস পালনের মধ্য দিয়ে তো পথশিশুদের আসলে কোনো লাভ হয় না।
আমাদের দেশে অনেকে পথশিশুদের জন্য অনেক কিছু করেন। কেউ ঈদের সময় নতুন পোশাক কিনে দেন, কেউ পিঠা উৎসবের, আবার কেউ খেলাধুলার আয়োজন করেন, কেউ কেউ পথশিশুদের জন্য স্কুল খুলে তাদের প্রাথমিক শিক্ষা দিচ্ছেন। কিন্তু এসব পদক্ষেপ পথশিশুদের দীর্ঘ মেয়াদে কোনো উপকার করে না। যথাযথভাবে পুনর্বাসন না হওয়ায় তারা আবার আগের জীবনেই ফিরে যায়।
উন্নত দেশগুলোয় দেখা যায়, প্রত্যেক শিশুর দায়িত্ব রাষ্ট্র কোনো না কোনোভাবে পালন করে। কিন্তু আমাদের দেশে এখনো এটা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। রাষ্ট্রযন্ত্র এদের সম্বন্ধে অসচেতন। ফুটপাথ, পার্ক, ট্রেন ও বাসস্টেশন, লঞ্চঘাট, সরকারি ভবনের নিচে বসবাসকারী এসব পথশিশুকে দেখার কেউ নেই।
অবহেলা, অনাদরে, খেয়ে না-খেয়ে তাদের দিন কাটে। তারা মাদকাসক্ত হচ্ছে, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক শিশু সনদ, শিশু আইনসহ দেশের প্রচলিত আইনে প্রতিটি শিশু তাদের সুষ্ঠু শারীরিক ও মানসিক বিকাশ লাভের জন্য শিক্ষা, খেলাধুলা, খাদ্য ও পুষ্টি, বিনোদন পাওয়ার অধিকার রাখে। শিশুদের সব ধরনের নির্যাতন ও বৈষম্যমূলক আচরণ থেকে আত্মরক্ষার ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে এসব সনদ ও আইনে। কিন্তু আমাদের দেশের পথশিশুরা এসব অধিকার থেকে বঞ্চিত।

সরকারকে এখন এসব পথশিশুর কথা নতুন করে ভাবতে হবে। শিশুরা যাতে আর পথে বসবাস না করে, তার জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। সে জন্য প্রথমে যা করতে হবে, তা হচ্ছে দেশ থেকে দারিদ্র্য দূর করা। যদিও এখন বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি এক হাজার ৩১৬ ডলার। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ। মাথাপিছু জিডিপি কিংবা জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত বহন করছে। কিন্তু দেশের আয় ও সম্পদ বণ্টনের বৈষম্য হ্রাসে এখনো তেমন সাফল্য অর্জিত হয়নি। ফলে দরিদ্র মানুষ দরিদ্রই রয়ে গেছে। দেশে দারিদ্র্যের হার এখন ২৪ দশমিক ৭ শতাংশ এবং অতি দারিদ্র্যের হার ১২ দশমিক ৪ শতাংশ। পথশিশুদের বাস্তব অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে ২০১৮ সালে গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সোশ্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক এনহ্যান্সমেন্ট প্রোগ্রাম (সিপ)। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, পথশিশুদের প্রায় ৪৪ শতাংশ মাদকাসক্ত, ৪১ শতাংশ শিশুর ঘুমানোর কোনো বিছানা নেই, ৪০ শতাংশ শিশু প্রতিদিন গোসলহীন থাকে, ৩৫ শতাংশ খোলা জায়গায় মলত্যাগ করে, ৫৪ শতাংশ অসুস্থ হলে দেখার কেউ নেই এবং ৭৫ শতাংশ শিশু অসুস্থতায় ডাক্তারের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ করতে পারে না। এ শিশুদের কল্যাণে নেই কোনো নীতিমালা। সরকার ঘোষিত ভিশন ২০২১ অর্জন করতে হলে এখনই এ শিশুদের কল্যাণে একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা তৈরি প্রয়োজন। প্রতি বছর জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ থাকলেও তার সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এসব শিশু। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের সভাপতি এমরানুল হক চৌধুরী বলেন, ‘রাষ্ট্রের দায়িত্ব এসব পথশিশুর লেখাপড়া, স্বাস্থ্যসেবাসহ সব সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা। সরকার উদ্যোগ নিলেই তা সম্ভব। একটা সমন্বিত নীতিমালা থাকলে পথশিশুরা এর সুফল পেত।’

তবে শুধু দারিদ্র্য দূরীকরণের মাধ্যমে শিশুদের পথে জীবন যাপন করা থামানো যাবে না। এর জন্য আরও অনেক কাজ করতে হবে। সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধ বাড়াতে হবে। পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করতে হবে। সন্তানকে ভালোবাসতে হবে। তাদের সুশিক্ষা দিতে হবে। শিশুর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় তার পরিবার। কিন্তু সেই পরিবারে যদি সে অবহেলা বা নির্যাতনের শিকার হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবে সেখানে সে থাকতে চাইবে না। মা-বাবা বা অভিভাবকের হাতে মার খেয়ে সন্তান বাড়ি থেকে পালিয়ে গেছে আমাদের দেশে এমন উদাহরণ রয়েছে ভূরি ভূরি। কাজেই পরিবারকে হতে হবে শান্তিপূর্ণ। এর জন্য সমাজ থেকে নারী-পুরুষের বৈষম্য দূর করতে হবে। সমাজকে অবক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। জানি অনেকেই বলবেন যে বলা সহজ, করা কঠিন। কিন্তু এই কঠিন কাজটিই করতে হবে সবাই মিলে। জাতিসংঘ জানায়, ক্ষুধা, দারিদ্র্য, নদীভাঙন, শৈশবে বাবা-মায়ের অকাল মৃত্যু, পিতা-মাতা সংসার পরিচালনায় অক্ষমসহ নানা কারণে ঢাকায় পথশিশু তথা সুবিধাবঞ্চিত শিশুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আমাদের সকলেরই পথশিশুদের প্রতি নৈতিক মূল্যবোধ বৃদ্ধি করতে হবে। নৈতিকতা ও মূল্যবোধ না থাকলে মানুষের জীবন বিপথে পরিচালিত হয়। যেসব শিশুর নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অভাব রয়েছে তারা অন্যায়ের দিকে পা বাড়ায়। শিশুদেরকে নৈতিকতার শিক্ষা দিতে হবে। এ ছাড়াও পথশিশুদের জন্য বৃত্তিমূলক শিক্ষার বিশেষ ব্যবস্থা করতে হবে। বাংলাদেশ বিশ্বের একটি দরিদ্র ও জনবহুল দেশ। আমাদের দেশের উন্নয়নের জন্য দেশের জনসংখ্যাকে কর্মমুখী শিক্ষা দিয়ে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করতে হবে।
মোটকথা, শিশুদের পরিপূর্ণ বিকাশের ওপর জাতীয় সমৃদ্ধি নির্ভরশীল। পথশিশুদের উন্নয়নের ব্যাপারে শুধু সরকারি কার্যক্রম নয় আমাদেরকে অনেক সচেতনতার সাথে কাজ করতে হবে। পথশিশুদের অধিকার, দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সজাগ করে তুলতে হবে, স্থায়ী সমাধানের চিন্তা করতে হবে। উপযুক্ত শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে তারা যেন আত্মনির্ভরশীল মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে পারে সে ব্যাপারে আমাদের সচেষ্ট হতে হবে। আলোকিত বাংলাদেশ গড়তে অবশ্যই পথশিশুদের জন্য মৌলিক অধিকারের সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে। আসুন, এমন একটি দেশ গড়ি, যেখানে ‘পথশিশু’ বলে কেউ থাকবে না।
লেখক : প্রাবন্ধিক

SHARE

Leave a Reply