পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজন সংবিধান সংশোধন

রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য বিভীষিকাময় এক-এগারো খুব বেশি দিন আগের ঘটনা নয়। মানুষের মন থেকে এখনো মুছে যায়নি সে সময়কার দিনগুলো। তখন সাধারণ মানুষ একপর্যায়ে রাজনীতিকদের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেই এক এক-এগারো আবার নতুন রূপে আভির্ভূত হোক, তা জনগণের পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতারাও চান না। কারণ, ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়।  এবার যদি অনাকাক্সিক্ষত কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, সে ক্ষেত্রে জনগণ রাজনীতিবিদদের  থেকেই মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে।
এ ছাড়া এবার গণতন্ত্রের প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে কারা লাভবান হবে, আর কারা হোঁচট খাবে, তা হিসাব-নিকাশ না করেও বলে দেয়া যায়। আমরা এর আগে দেশের সব ’কটি অসাংবিধানিক সরকারের আগমনে সরকারি দলকেই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেখেছি। এবারও রাজনৈতিক দলগুলোর বিবাদের সুযোগে যদি কোনো অসাংবিধানিক সরকার দেশের মানুষের ওপর সওয়ার হয়, তাহলে সরকারি দলকেই এর দায় নিতে হবে, ভুগতেও হবে তাদেরই বেশি। আর সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে গণতন্ত্রের, সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক প্রত্যাশার।
এ সরকারের আমলে ভূমিধস দুর্নীতি হলো শেয়ারবাজার, হলমার্ক, পদ্মা সেতু, ডেসটিনি, বিসমিল্লাহ গ্রুপের কেলেঙ্কারি। কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ নিয়েও বড় দুর্নীতির অভিযোগ আছে। এসব দুর্নীতির কথা এখন মানুষের মুখে মুখে।
কিন্তু দেশকে সুস্থির করার স্লোগান তুলে ক্ষমতায় এলেও, অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, ২০০৬ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারির আগে যেমন সারা দেশ বিভীষিকাময় ছিল, তেমনি জরুরি অবস্থার পর জনগণ আতঙ্কমুক্ত ছিল বলা যাবে না। সারাক্ষণ জনগণ অজানা দুঃসংবাদের অপেক্ষায় দিন গুনত। কেননা, ওই সরকারের কাছে ভালো কিছু প্রত্যাশা করাই ছিল অপ্রত্যাশিত। এক-এগারোর ফলে জনগণ দুই দলের বিবাদ থেকে রক্ষা পেয়েছিল বটে, কিন্তু তাদের মনে স্বস্তি ছিল না। জনগণ স্বাধীনভাবে চলাফেরা কিংব ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারেনি। সেনাবাহিনীর কতিপয় কর্মকর্তার দাপট যেন আইরিশ জেনারেলদের ক্ষমতাকেও হার মানিয়েছিল। অথচ তারা এ দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বলেছিলেন। আবার কোনো এক-এগারোর ঘটনা এড়াতে তাই প্রয়োজন দুই দলের সমঝোতা।
দেশের বর্তমান সংকটটি মূলত সৃষ্টি হয়েছে নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো একটি মীমাংসিত নির্বাচন পদ্ধতি যেখানে সারা বিশ্ব গ্রহণ করেছে, সেখানে আমরা এটাকে বাতিল করেছি। আর এ জন্য প্রধানমন্ত্রীই এককভাবে দায়ী। কেননা, পঞ্চদশ সংশোধনীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের সুপারিশ সংসদীয় বিশেষ কমিটি করেনি। এটি হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তে। তাই এই সংশোধনী অসাংবিধানিক ও অবৈধ।
তবে সরকারের শেষ সময়ে এসেও প্রধানমন্ত্রী যে সঙ্কট উত্তরণে  বিরোধীদলীয়  নেত্রীকে ফোন করেছেন, তারা ৩৭ মিনিট কথা বলেছেন, এটাও নিশ্চয়ই সমঝোতার লক্ষণ।  তাই এখনই সময় খোলামন নিয়ে দুই পক্ষের আলোচনায় বসার। বিএনপির কর্মসূচি শেষে প্রধামন্ত্রী যদি আবার বিরোধীদলীয় নেতাকে ফোন করেন, তাহলে এ দেশে নিশ্চয়ই গণতন্ত্রের পথচলা অব্যাহত থাকবে। আর বিরোধীদলীয় নেত্রীরও উচিত হবে দরজা খোলা রাখার। জনগণের প্রত্যাশাও এমনটাই।
দেশ এখন নৈরাজ্যের পথে অগ্রসর হচ্ছে। আগেই বলা হয়েছে এর জন্যে একজনের একটি ইচ্ছাই দায়ী। সেই ইচ্ছাটি হচ্ছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির বিলোপ সাধন। এখন যদি দেশকে নৈরাজ্যের পথ থেকে স্বস্তির পথে ফিরিয়ে আনতে হয় তাহলে ফোনালাপ, সংলাপ কিংবা দিল্লী-ওয়াশিংটনের কোনো ফর্মুলা কাজ করবে বলে মনে হয় না। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবার আগে সংবিধান সংশোধন যারা করেছেন তারা পুনরায় সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃস্থাপন করবেন। তা না হলে যে অবস্থার সৃষ্টি হবে তা কারোর জন্যই মঙ্গল বয়ে আনবে না।

SHARE

Leave a Reply