পর্দা ও প্রগতি

মো: জিয়াউল হক

নারী-পুরুষের সমন্বিত প্রচেষ্টায় গঠিত হয় পরিবার, সমাজ, জাতি ও রাষ্ট্র। একটি আদর্শ পরিবার ও সমাজ গঠনে নারীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। পুরুষের ভূমিকার পাশাপাশি নারীর ভূমিকাও মুখ্য। কিন্তু নারী ও পুরুষের সমান অধিকারের নামে অবাধ মেলামেশাকে ইসলাম সমর্থন করে না। তাই ইসলাম পর্দার বিধান ফরজ করে দিয়েছে। নারী ও পুরুষের প্রত্যেকেরই নিজস্ব অঙ্গনে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। একমাত্র ইসলামই নারীর অধিকার যথার্থভাবে সংরক্ষণ করেছে। তাকে বানিয়েছে গৃহের রাণী। রাসূল (সা) বলেছেন, “নারী নিজ গৃহের দায়িত্বশীলা, তার গৃহ সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে।” তাই বলে ইসলাম তাকে ঘরের আসবাবপত্র বানায় নাই। বরং প্রয়োজনের তাগিদে হিজাব পরিধান করে বা পর্দা সহকারে মার্জিতভাবে বাড়ি থেকে বের হওয়ার এবং প্রয়োজনীয় সকল প্রকার হালাল কাজের অনুমতি দিয়েছে। তবে শর্ত তা-পর্দা সহকারে করতে হবে এবং সৌন্দর্য প্রদর্শন করা যাবে না। পর্দা সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মধ্যে এমন একটা সংযম, ত্যাগ, শালীনতার সীমারেখা তৈরি করে যা ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও সংস্কৃতিকে অসুস্থ প্রতিযোগিতা, অশালীন, অনৈতিক ও অপসংস্কৃতির আগ্রাসন থেকে রক্ষা করে এবং সেই সাথে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক শৃঙ্খলা, নৈতিক মূল্যবোধ, ব্যক্তি ও পরিবারে শান্তি, মানসিক ও সাংস্কৃতিক স্থিরতা ও সময়ের যথার্থ মূল্যায়নের নিশ্চয়তা প্রদান করে। শরীরভিত্তিক ও বস্তুতান্ত্রিক চিন্তা-ভাবনা থেকে বিরত রেখে সমৃদ্ধ দেশ ও সমাজ গড়ার দিকে ফিরিয়ে আনে। ইসলামী শরীয়তের প্রতিটি ইবাদতের কাযা, কাফ্ফারা ও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে কসর রয়েছে। যেমন, মুসাফির অবস্থায় নামাজ, রোযা, অসুস্থাবস্থায় হজ ইত্যাদি। কিন্তু পর্দা এমন একটি অলংঘনীয় ইবাদত যার কোন কাযা বা কাফ্ফারা নেই। ইহা সার্বক্ষণিক একটি ফরয বিধান। আল্লাহ তায়ালাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্মরণের জন্য আমাদেরকে দিনে রাতে পাঁচ বার প্রস্তুত থাকতে হয়। রোজার জন্য বছরে এক মাস, জাকাতের জন্য বছরে একবার আর হজের জন্য জীবনে একবার প্রস্তুত থাকলেই হয়। কিন্তু পর্দা বা হিজাবের জন্য প্রস্তুত থাকতে হয় সার্বক্ষণিক। তাই ইহার গুরুত্ব অপরিসীম এবং পুরস্কার সুমহান। আর পর্দাহীনতার পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ।
পর্দা বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত উর্দু ভাষার শব্দ। ইহার আরবি হলো হিজাব, মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে হিজাব শব্দটি এসেছে পাঁচবার, যার আভিধানিক অর্থ হলো প্রতিহত করা, ফিরিয়ে আনা, আড়াল করা, আবৃত্ত করা, আচ্ছাদিত করা ইত্যাদি। ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় পর্দা বা হিজাব সেই বিধিব্যবস্থা ও চেতনা যার মাধ্যমে ঘর থেকে শুরু করে, রাস্তা, ঘাট, ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সভা, সমাবেশসহ সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণহীন কথাবার্তা, দর্শন, দৃষ্টি বিনিময়, সৌন্দর্য প্রদর্শন ও বলগাহীন আচরণ থেকে বিরত থাকা যায়।
সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে যাবতীয় অন্যায়, অশ্লীলতা, অনাচার, ব্যভিচার, সন্ত্রাস ও ধ্বংসাত্মকমূলক কাজ পরিহার করে সামাজিক ন্যায়নীতি, শান্তিশৃঙ্খলা, ভ্রাতৃত্ব ও ন্যায়ের সৌধের ওপর এক আধুনিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইসলাম তিন ধরনের সংস্কার আনয়ন করেছে।
(ক) আধ্যাত্মিক সংস্কার।
(খ) শাস্তির বিধান।
(গ) প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা।
আধ্যাত্মিক সংস্কারের দ্বারা মানুষকে এমনভাবে উপযোগী করে গড়ে তোলা হয় যে, সে আপনা-আপনিই এই সামাজিক ব্যবস্থার আনুগত্যের জন্য অগ্রসর হয়। ইহার জন্য তাকে কোন বল প্রয়োগকারী সংস্থা বা সংগঠনের প্রয়োজন হয় না। শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আধ্যাত্মিক সংস্কার কাজে না এলে ইসলাম শাস্তিমূলক বিধান আনয়ন করেছে। যা ধ্বংসাত্মক সকল প্রকার কাজ যা অপরাধের পথ রুদ্ধ করেছে।
সমাজে যাতে অন্যায় সংঘটিত না হয় এবং মানুষ শান্তিতে থাকতে পারে তার জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার আইন প্রয়োগ করতে না হয় এই লক্ষ্যে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন ধর্মে এ ব্যবস্থার নজির নেই। ইসলামে পর্দার বিধান হলো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার বিধান। যা অস্বাভাবিক উত্তেজনা ও কৃত্রিম গতি-বিধি হতে সমাজের পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র করে এবং যৌন উচ্ছৃঙ্খলতার আশঙ্কা একেবারেই হ্রাস করে। নৈতিক শিক্ষার দ্বারা যার আধ্যাত্মিক সংস্কার হয় না এবং শাস্তিমূলক আইনের ভয় যাকে বিরত রাখতে পারে না। তাদের জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এমন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে যে, যৌন উত্তেজনার প্রতি তার কোন আগ্রহ, কামনা, বাসনা থাকা সত্ত্বেও তা সম্পাদন করা তার পক্ষে সম্ভব হয় না। উপরন্তু ইহা এমন এক পদ্ধতি যা নারী-পুরুষের কাজের ক্ষেত্র পৃথক করে দিয়েছে, পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় করেছে এবং ঐ সকল সীমারেখা নির্ধারণ করেছে যা নারী-পুরুষের জীবনে পার্থক্য প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলাম নির্দেশ দিয়েছে।
পর্দা ইসলামী শরীয়তের অলংঘনীয় ইবাদত। ইহা এমন একটি ফরজ যার কাযা বা কাফফারা নেই। ইহা নারী-পুরুষ সকলের ওপর সমান ফরজ। পুরুষের সতর নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত। নারীর সতর মুখমণ্ডল, উভয় হাতের কবজি ও পায়ের পাতা ব্যতীত সমস্ত শরীর। তাই নারীদেরকে মাথার চুল ও মুখমণ্ডল থেকে শুরু করে শরীরের সমস্ত সৌন্দর্যের ওপর জিলবাব বা চাদর ঝুলিয়ে দিতে বলা হয়েছে। এতে করে তারা সচ্চরিত্রবান হিসেবে পরিচয় লাভ করবে। ফলে তারা কাউকে ফিৎনায় ফেলবে না এবং তারাও অন্যের সাথে ফিতনায় জড়াবে না। আল্লাহতায়ালা বলেছেন “আপনি আপনার পতœীগণকে ও কন্যাগণকে এবং মুমিনা স্ত্রীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের ওপর টেনে দেয়। এতে করে তাদেরকে খুব কমই চেনা যাবে। ফলে তাদেরকে কেউ ইভটিজিং বা উত্ত্যক্ত করবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। (সূরা আল আহজাব-৫৯) পর্দা নারী-পুরুষ সকলের জন্যই ফরজ এবং ইহা বাস্তবায়নে সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন : “হে নবীপতœীগণ তোমরা অন্য নারীদের মত নও; তোমরা যদি আল্লাহকে ভয় কর তবে অন্য পুরুষের সাথে কোমল ও আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে কথা বলো না। সে ব্যক্তি কুবাসনা করে যার অন্তরে ব্যাধি রয়েছে। তোমরা সঙ্গত কথাবার্তা বলবে এবং নিজ গৃহে অবস্থান করবে, আর জাহেলি যুগের নারীদের ন্যায় সৌন্দর্য প্রদর্শন করবে না। নামাজ কায়েম করবে, জাকাত প্রদান করবে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে। (সূরা আল আহজাব ৩২-৩৩) এ আয়াত দু’টি পুরুষ থেকে নারীর পর্দার আবশ্যকতার সুস্পষ্ট প্রমাণ। উক্ত আয়াতে আল্লাহ তায়ালা পর্দাকে নারী পুরুষ সকলের হৃদয়ের জন্য অতিপবিত্রতার কারণ বলে দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেছেন। পর্দা অশ্লীলতা, নোংরামি, মন্দকাজ ও তার উপায় উপকরণ থেকে অনেক দূরে রাখে। বেপর্দা ও অবাধ চলাফেরাকে ময়লা আবর্জনা এবং নাপাক বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইসলামী শরীয়তে পর্দার তিনটি উদ্দেশ্য রয়েছে। প্রথমত নারী ও পুরুষের চারিত্রিক হেফাজত করা এবং অবাধ মেলামেশার কারণে যে ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয় সেগুলো প্রতিরোধ করা। দ্বিতীয়ত, নারী ও পুরুষের কর্মক্ষেত্রকে পৃথক করা, যাতে তাদের ওপর প্রকৃতি যে গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেছে তা নিরাপত্তার সাথে পালন করতে পারে। তৃতীয়ত পারিবারিক ব্যবস্থাকে সুরক্ষিত ও সুদৃঢ করা। জীবণের অন্যান্য সকল ক্ষেত্রের চেয়ে পারিবারিক ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু গুরুত্বপূর্ণই নয় বরং জীবণব্যবস্থার মূল বুনিয়াদ। তাই যে সমাজে পর্দাপ্রথাকে বাদ দিয়ে পারিবারিক ব্যবস্থাকে সুরক্ষিত করার চেষ্টা করা হয়েছে সে সমাজেই নারী পুরুষের দ্বারা লাঞ্ছিত হয়েছে। এমনকি নারী সেবিকার মর্যাদা পেয়েছে। ফলে পারিবারিক ব্যবস্থা হয়েছে বিপন্ন। আর ইসলাম নারীর ন্যায্য অধিকার দেয়ার পরে তা রক্ষার এবং পারিবারিক ব্যবস্থা সুরক্ষার জন্য পর্দার বিধান নাজিল করেছে। কাজেই যে পর্যন্ত নারীর পর্দার বিধান মান্য না করবে সে পর্যন্ত তার অধিকার সংরক্ষণ হবে না এবং ইসলামের উদ্দেশ্য মোটেই সফল হবে না।
আমাদের দেশের কিছু জ্ঞান-পাপী বুদ্ধিজীবী রয়েছেন যারা হর-হামেশায় বলে থাকেন পর্দাপ্রথা নারীর অধিকার হরণ করে এবং ইহা প্রগতির অন্তরায়। অবশ্যই এদের নিকট নৈতিক চরিত্রের প্রশ্নটি নিতান্তই বাহুল্য। তারা মনে করে থাকেন ইভটিজিং ও নারীর উন্নয়ন প্রতিবন্ধকতার জন্য পর্দা দায়ী। তারা আরও বলে থাকেন, নারীদেরকে পুরুষের সামনে বেশি বেশি করে খোলামেলাভাবে উপস্থাপন করলে এবং দৈহিক সৌন্দর্য প্রদর্শন করলে ইভটিজিং বন্ধ হবে ও নারীর প্রতি পুরুষের শ্রদ্ধাবোধ বৃদ্ধি পাবে। আমি দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি যারা এ ধরনের চিন্তা করে থাকেন তারা বিকৃত মস্তিষ্কের অধিকারী। কারণ যে সমাজে পর্দা প্রথার বিসর্জন দিয়ে চারিত্রিক মেরুদণ্ড ধ্বংস করা হয়েছে এবং নারীকে স্বাধীন করে দেয়া হয়েছে সেখানেই নারীদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তো দূরের কথা বরং নারীর সুমহান মর্যদাকে নগ্নতা, অশ্লীলতার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছিয়েছে। ফলে সেখানে ব্যভিচারকে উৎসাহিত করা হয়েছে এবং প্রকাশ্যে ব্যভিচার সংঘটিত হয়েছে। এর অনিবার্য প্রতিক্রিয়া স্বরূপ সমাজের বিভিন্ন স্তরে কিরূপ ভাঙন ও বিপর্যয় সৃষ্টি হতে পারে তা ইউরোপের দিকে লক্ষ করলে বুঝা যায়। আমার মনে হয় মা-বোনেরাও এমন সামাজিক অবস্থা চান না। বর্তমানে আমাদের দেশে নারী-পুরুষের আচার অনুষ্ঠান, সভা-সমাবেশ ও কর্মক্ষেত্র সম্মিলিত হওয়ার কারণে মেয়েদের সৌন্দর্য প্রদর্শনী বৃদ্ধি পেয়েছে। যার ফলে হালাল উপায়ে উপার্জনের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছে। অপর দিকে সুদ ঘুষ, ছিনতাই, রাহাজানি, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ যাবতীয় অন্যায় কর্মকাণ্ড ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ সমস্ত অন্যায়ের অভিশাপেই সামাজিক কাঠামো ঘুনেধরা কাঠের ন্যায় দুর্বল হয়ে পড়ছে। ফলে আইনের শাসন নীরবে নিভৃতে কাঁদছে। সম্মানিত পাঠক, একবার চিন্তা করুন যারা নিজেদের ব্যক্তিগত কামনা, বাসনা পূর্ণ করার জন্য কোন নিয়ম-নীতি মানতে নারাজ তারা কিভাবে সামাজিক নিয়ম-নীতি মেনে চলবে? আর যে ব্যক্তি পারিবারিক নিয়মনীতি বিধি বিধান অনুসরণ করে না তারা কিভাবে রাষ্ট্রের বা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে পারে।
ইসলাম নারী ও পুরুষের কর্মক্ষেত্র পৃথক করে দিয়েছে। প্রকৃতি মাতৃত্বের পবিত্র দায়িত্ব অর্পণ করেছে নারীর ওপর এবং সেই উপযোগী করে সৃষ্টি করেছেন। আর মাতৃত্বের ন্যায় গুরুদায়িত্বের বিনিময়ে তাকে অন্য যেসব কাজ করতে হবে তাও সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছে। আর আল্লাহ পুরুষকে দায়িত্ব দিয়েছে পিতৃত্বের ও সর্বাবস্থায় নারীর ভরণ- পোষণের। উপরন্তু এ উভয়বিদ দায়িত্ব পালনের জন্য নারী ও পুরুষের দৈহিক কাঠামো শক্তি সামর্থ্য ধৈর্য, ঝোঁক-প্রবণতা, এমনকি শরীরের তাপ মাত্রারও বিশেষ পার্থক্য করে সৃষ্টি করেছেন। প্রকৃতি মাতৃত্বের যে পবিত্র দায়িত্ব অর্পণ করেছে নারীর ওপর তার জন্য তাকে ধৈর্য, মায়া, মমতা, স্নেহ, ভালোবাসা, কমলতা ইত্যাদি বিশেষ গুণে গুণান্বিত করেছে। যদি এমনটি করা না হতো তাহলে তার দ্বারা মাতৃত্বের কাজ পূর্ণভাবে পালন করা সম্ভব হতো না। সে সাথে নারীকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে পিতৃত্বের কঠিন দায়িত্ব থেকে।
বর্তমানে যারা নারীর সকল ক্ষেত্রে সমানাধিকারের নামে চিৎকার করছেন তাদের উদ্দেশে প্রশ্ন রাখতে চাই, আপনারা কি মনে করেন; এ যুগে কি মাতৃত্বের প্রয়োজন নেই? যদি প্রয়োজন নাই মনে করেন তাহলে তো আপনারা আণবিক বোমা ছাড়াই মানবতার চূড়ান্ত সমাধি রচিত করবেন। আর যদি মাতৃত্বের প্রয়োজন মনে করেন সে সাথে এও মনে করেন যে নারীদেরকে পুরুষের মত রাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস-আদালতে, কৃষিকাজে, শিল্পকার্যে, যুদ্ধ পরিচালনায় ইত্যাদিতে সমভাবে অংশগ্রহণ করতে হবে তাহলে নিঃসন্দেহে তা নারীর ওপর অবিচার করা হবে। আল্লাহতায়ালা নারীদেরকে যে দায়িত্ব অর্পণ করেছে নিঃসন্দেহে তা প্রকৃতির অর্ধেক বা ৫০ শতাংশ এবং ইহা সফলতার সাথেই পালন করে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে পুরুষের নিকট থেকে বিন্দুমাত্র সহযোগিতা পাচ্ছে না। অথচ পুরুষের অবশিষ্ট ৫০ শতাংশ দায়িত্বের মধ্যে ২৫ শতাংশ বা অর্ধেক দায়িত্ব চাপিয়ে দিতে চাচ্ছেন নারীর প্রতি। তাহলে ফলাফল দাঁড়ায় পুরুষ মানবতার মোট দায়িত্বের মধ্যে পালন করবে ২৫ শতাংশ আর নারী পালন করবে ৭৫ শতাংশ, যা নারীর প্রতি চরম অবিচারের শামিল হবে এবং পুরুষের জন্য অপমানজনক। অবশ্য মেয়েরা এ জুলুম, অবিচারকে মেনে নিচ্ছে এবং কোন কোন ক্ষেত্রে তারা নিজেরা সানন্দে কাঁধে তুলে নিচ্ছে এ কারণে যে তারা পুরুষের নিকট থেকে যথাযোগ্য মর্যাদা পাচ্ছে না, অথচ তারা যে কাজগুলো করে তা পুরুষের কাজের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। বস্তুত এ কারণেই মেয়েরা আজ অনন্যোপায় হয়ে দ্বিগুণ দায়িত্ব পালনে অগ্রসর হচ্ছে। তারা এ বিষয় উপলব্ধি করছে যে পুরুষালী কাজে অংশগ্রহণ না করলে যথাযোগ্য মর্যাদা নেই।
ইসলাম নারীকে মাতৃত্বের দায়িত্ব পালন করার দরুন শুধু পুরুষের সমান মর্যাদাই দেয়নি বরং কোন কোন ক্ষেত্রে পুরুষের চাইতে বেশি মর্যাদা দিয়েছে। ইসলাম নারীকে অতুলনীয় মর্যাদা দিয়েছে মা হিসেবে, যা ইতঃপূর্বে কেহ দেয়নি। আল্লাহতায়ালার পরেই মাতা-পিতার প্রতি সম্মান ও সম্মানজনক আচরণ করতে নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন :

“তোমার রব নির্দেশ দিয়েছেন যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে উত্তম আচরণ করবে। তোমাদের মাঝে যদি তাদের মধ্য থেকে দু’জন অথবা একজন জীবিত থাকে বার্ধক্যাবস্থায় তাহলে তাদের সাথে এমন আচরণ করবে না যাতে তারা “উফ” শব্দ উচ্চারণ করে এবং মুখ বাঁকিয়ে বা কর্কশভাবে কথা বলবে না বরং তাদের সাথে কথা বলবে বিনয় নম্র ভদ্রভাবে ও কোমল সুরে এবং তাদের সামনে গর্বের সাথে বা উভয় বাহু বা বুক উঁচু করে কথা বলবে না। আল্লাহর কাছে দোয়া করবে এই বলে হে পরম করুণাময় তুমি তাঁদের প্রতি দয়া কর সেভাবে ঠিক যেভাবে তারা শিশুকালে আমাদের প্রতি দয়া মায়া স্নেহ ভালোবাসা দিয়ে লালন পালন করেছিলেন।” (সূরা বনি ইসরাইল ২৩-২৪) ইসলাম মানুষকে এমন শিক্ষা দিয়েছে যে মাতা-পিতার সাথে মন্দ আচরণ তো করা যাবেই না উপরন্তু তারা মনে কষ্ট পাবে এমন বৈধ কাজও করা যাবে না। তাদের সামনে কথা বলতে হলে বিনয়ের সাথে সম্মানের সাথে এবং মমতামাখা কণ্ঠে কথা বলতে হবে। অত্র আয়াতে আল্লাহতায়ালা মাতা-পিতার সম্মান ও মর্যাদার কথা বলেছেন। কিন্তু অন্যান্য আয়াত ও হাদীসে পিতার ৩ গুণ মাতার অধিকারের কথা বলা হয়েছে। যেমন আল্লাহতায়ালা বলেছেন, “আমি তাদেরকে নির্দেশ দিয়েছি পিতা-মাতার অধিকারগুলো আদায় করতে। তবে তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট ভোগ করে পেটে ধারণ করেছে। আরো দুই বছর তার দুধ ছাড়াতে সময় লেগেছে। আমার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করো এবং তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করো।” (সূরা লোকমান-১৪) অনুরূপভাবে আল্লাহ তায়ালা মানুষকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, “সে তার পিতা-মাতার সাথে উত্তম আচরণ করবে, তার মা অনেক কষ্ট সহ্য করে তাকে পেটে ধারণ করেছিল। আর অনেক ব্যথা সহ্য করে তাকে প্রসব করেছিল এবং তাকে গর্ভে ধারণ ও দুধ ছাড়াতে ত্রিশটি মাস সময় লেগেছে। অতঃপর যখন সে পূর্ণ যৌবন লাভ করল এবং চল্লিশ বছরে পদার্পণ পড়ল তখন সে বলল, হে আমার রব! আমাকে তাওফিক দিন যেন, আমি এসব নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতে পারি, যা আপনি আমাকে এবং আমার পিতা-মাতাকে দিয়েছেন যেন আমি এমন নেক আমল করতে পারি, যা আপনি পছন্দ করেন। আর আমার সন্তানদেরকেও নেককার বানিয়ে আমাকে সুখী করুন। আমি আপনার নিকট তওবা করছি এবং আপনার অনুগত বান্দাদের মধ্যে শামিল আছি।” (সূরা আহকাফ-১৫) মুসনাদে আহমদ ও ইবনে মাজাহ শরীফে বর্ণিত আছে “জান্নাত রয়েছে মায়ের পদ তলে।” হাদীসটির অর্থ এই নয় যে পথচলার সময় পায়ের নিচে যা পড়বে তাই জান্নাতে পরিণত হয়ে যাবে বরং এর মানে আপনার ওপর অর্পিত সকল দায় দায়িত্ব পালন করলে এবং মাতা-পিতা সন্তুষ্ট থাকে এমন আচরণ, কথা ও কাজ করলে আল্লাহ তাকে অবশ্যই জান্নাত দিয়ে দেবেন। সহীহ আল-বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে “এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট জানতে চাইলো আমার ওপরে সবচাইতে বেশি অধিকার কার রয়েছে। উত্তরে রাসূল (সা) বললেন, তোমার মায়ের। সে আবার জিজ্ঞাসা করল তার পরে। উত্তরে রাসূল (সা) বললেন, তোমার মায়ের। লোকটি তৃতীয়বার জিজ্ঞাসা করল তার পরে। জবাবে রাসূল (সা) বলেন, তোমার মায়ের। অতঃপর যখন চতুর্থবার জিজ্ঞেস করল। তার পর রাসূল (সা) জবাব দিলেন তোমার পিতার। এ হাদীসের আলোকে শতকরা ২৫ ভাগ অধিকার দেয়া হয়েছে পিতাকে আর ৭৫ ভাগ অধিকার দেয়া হয়েছে মাতাকে, যা এভাবেও বলা যায় যে ৪ ভাগের ৩ ভাগ অধিকার মায়ের আর ১ ভাগ অধিকার পিতার। কুরআন ও হাদীসের আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে এ ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের চেয়ে ৭৫ ভাগ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
ইসলাম নারীদেরকে এত সম্মান দেয়ার পরও এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবী বলে থাকেন নারীকে ঠকানো হয়েছে। ফলে সমান অধিকারের নামে তাদের ওপর অতিরিক্ত দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। এ কারণে নারী তার মৌলিক দায়িত্ব থেকে দূরে সরে পুরুষের সাথে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়ে অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থ হচ্ছে, কারণ নারীর দৈহিক কাঠামো শক্তি, সামর্থ্য পুরুষের চেয়ে অনেক দুর্বল, তবে দুই একটি ক্ষেত্রে নারী প্রতিযোগিতায় উত্তীর্ণ হলেও নারীত্বের বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদা বিসর্জন দিয়েই তা হতে হচ্ছে। ফলে সঠিক ভাবে সন্তান লালন পালনে ব্যর্থ হচ্ছে। মাতৃস্নেহ বঞ্চিত সন্তান বড় হচ্ছে পারিবারিক, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষাহীনভাবে। তাই সে এক পর্যায়ে বখাটে, নেশাখোর, সর্বশেষ সন্ত্রাসী হিসেবে নিজেকে আবিষ্কার করছে। ইহা সামাজিক শৃঙ্খলা বিনষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এ কারণেই ইসলাম পর্দার বিধান প্রবর্তন করেছে।
ইসলাম নিধারিত পর্দাপ্রথা বিলুপ্ত করে পারিবারিক ও সামাজিক ব্যবস্থাকে ভেঙে চুরমার করে দিয়ে নারীর সমান অধিকার সামাজিক ও পারিবারিক মর্যাদাকে বিপর্যয়ের কবল থেকে রক্ষা করা কোনক্রমেই সম্ভব নয়। তাই তথাকথিত প্রগতিবাদীদের চিন্তা করা দরকার যে তারা কী বিসর্জন দিয়ে কী পেতে চায়। কারণ প্রগতি একটি ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ, এর কোন নির্দিষ্ট সীমারেখা নেই। মুসলমানরা এক সময় বঙ্গোপসাগর থেকে আটলান্টিক মহাসাগর তথা অর্ধ পৃথিবী শাসন করেছে। সে যুগে শিক্ষা, সংস্কৃতি, সভ্যতা, বিজ্ঞানে, চিকিৎসায় মুসলমানরাই ছিল শ্রেষ্ঠ। ইহা প্রগতির সবচেয়ে বড় প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আর মুসলমানেরা তা করেছিল পর্দার বিধান পালন করেই। ইসলামের ইতিহাসে বড় বড় বিজ্ঞানী, দার্শনিক, চিকিৎসক, ইসলামী স্কলার ও দক্ষ সেনাপতির নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। নিঃসন্দেহে এসব কৃতিত্বপূর্ণ ব্যক্তিগণ কোন মূর্খ মায়ের কোলে লালিত পালিত হননি। আবার ইসলামের ইতিহাসের দিকে লক্ষ্য করলে হজরত আয়েশা (রা), রাবেয়া বসরীর ন্যায় বহু মহীয়সীর নাম দেখা যায়। তাঁরা এগুলো অর্জন করেছিলেন পর্দার বিধান পূর্ণভাবে মান্য করে। তাই যারা মনে করেন পর্দা প্রগতির অন্তরায় তাদের ইসলাম সম্পর্কে জানা উচিত। হতে পারে তারা ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ যার কারণে না বুঝেই বিরোধিতা করে নয়তো তারা নারীর উন্নতির নামে পারিবারিক ও সামাজিক ব্যবস্থাকে কবর দিয়ে নিজেদের কামনা বাসনাকে পূর্ণ করতে চায়।

যারা পশ্চিমা সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী, পারিবারিক ও সামাজিক শৃংখলাবিরোধী এবং নারী লিপ্সু তাদের দৃষ্টিতে পর্দা প্রগতির অন্তরায়। অথচ তাদের চিন্তা করা উচিত পশ্চিমারা পারিবারিক ও সামাজিক শৃংখলা বিপর্যয়ের কারণে বৈবাহিক জীবনের চাইতে হোটেল, রেস্তোরাঁ, ক্লাব ও চৎড়ংঃরঃঁঃরড়হ এর জীবনকে বেশি পছন্দ করছে। সেখানে বহু শিশু জন্মগ্রহণ করছে এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করছে। আর যারা বেঁচে থাকছে তারা মাতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়ে উটকো পরিবেশে বেড়ে উঠছে। ফলে পশ্চিমা সভ্যতা মানুষের জীবন ধারাকে এমন একপর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে সেখানে মানবতার ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। এরূপ নিয়ন্ত্রণহীন, উশৃঙ্খল জীবণধারাকে কেহ যদি প্রগতির পরিচায়ক মনে করে তাহলে সে সানন্দে গ্রহণ করতে পারে। তবে ইসলাম এরূপ অভিশপ্ত জীবনকে কখনো সমর্থন করে না বরং উক্ত সমস্যাগুলোকে উৎস মূলেই নিয়ন্ত্রণের জন্য আল্লাহতায়ালা পর্দাপ্রথার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আর যারা বে-পর্দায় চলতে এবং সমাজ চালাতে বিশ্বাসী তাদের সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা সূরা আন-নূরের ১৯ নম্বর আয়াতে বলেছেন: “নিশ্চয়ই যারা চায় ঈমানদারদের সমাজে নির্লজ্জতার বিস্তার হোক তারা পার্থিব এবং পরকালীন জিন্দেগিতে শাস্তি ভোগ করবে। আল্লাহই সবকিছু জানেন তোমরা তা জানো না।” পর্দা নারীর ওপর যেমন ফরজ পুরুষের ওপরও তেমন ফরজ। পুরুষের পর্দা সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা বলেন,
“(হে নবী সা) আপনি মুমিন পুরুষদেরকে বলুন, যেন তারা নিজেদের চোখ নিচু রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটাই তাদের জন্য পবিত্র নিয়ম। তারা যা কিছু করে আল্লাহ এর খবর রাখেন।” (সূরা আন-নূর ৩০) কোন গৃহে প্রবেশ করতে হলে বাড়ির মালিকের সাথে সালাম বিনিময় এবং অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করা যাবে না। অনুমতি না দিলে সেখান থেকে ফিরে আসতে হবে। পর্দার এ বিষয়ে আল্লাহতায়ালা সতর্কতা অবলম্বন করতে বলেছেন।
পরিশেষে আমরা এ কথা বলতে পারি যে পর্দা এমন একটি ইবাদত যা ধনী-গরিব, নারী-পুরুষ সকলের ওপর ফরজ। ইহা অবিশ্বাস করলে সে কাফির। আর বে-পর্দা হয়ে চলাফেরা করলে দুনিয়াতে তার জন্য লাঞ্ছনা এবং পরকালে কঠিন পীড়াদায়ক শাস্তি রয়েছে। অতএব ইসলামে পর্দার অপরিসীম গুরুত্বের দাবি রাখে। তাই আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত সমাজে শান্তি এবং পরকালে মুক্তির লক্ষ্যে পর্দার অনুশীলন করা। বিশেষ করে আমরা যারা ইসলামী আন্দোলনের কর্মী তাদের এবং পরিবারের সদস্যদের আরও বেশি যত্নশীল হওয়া।
লেখক : প্রভাষক
নাটোর সিটি কলেজ, নাটোর

SHARE

Leave a Reply