পলাশীর বিপর্যয় ও আজকের বাংলাদেশ -মুহাম্মাদ শরীফুল ইসলাম

৭১২ ইসায়ী সালে মুহাম্মদ বিন কাশিমের ঐতিহাসিক সিন্ধু জয়ের মাধ্যমে এ উপমহাদেশে মুসলিম রাজশক্তির প্রভাব বিস্তারের যে শুভসূচনা হয়েছিল ১২০৩ সালে বখতিয়ার খিলজির বাংলা জয়ের মাধ্যমেই আমাদের এ বাংলায় তার প্রথম ছোঁয়া লাগে। মুঘল শাসনামলে সুবে বাংলার শাসন সরাসরি সাম্রাজ্যের কেন্দ্র কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হলেও ১৭১৭ সালে নবাব মুর্শিদ কুলী খান তৎকালীন ক্ষয়িষ্ণু মুঘল রাজশক্তি থেকে এক রকম বিচ্ছিন্ন হয়েই স্বাধীনভাবে বাংলা শাসনের সূত্রপাত করেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে এর মাত্র চার দশক যেতে না যেতেই ১৭৫৭ সালে ২৩ শে জুন তৎকালীন বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদের অদূরে পলাশীর আ¤্রকাননে এক রকম বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ণ যুদ্ধের মহড়ার মাধ্যমে বাংলার এ স্বাধীন নবাবি শাসনের পরিসমাপ্তি ঘটে। বাংলার স্বাধীনতা সূর্যের এ আকস্মিক অস্তগমনে যারা দাবার গুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিলেন দেশপ্রেমিক নবাব সিরাজউদ্দৌলা প্রশাসনের সেই প্রধান সেনাপতি মীর জাফর আলী খান, উপপ্রধান সেনাপতি ইয়ার লতিফ খান, নিকটাত্মীয় ঘসেটি বেগম প্রমুখ নবাবি লাভের মোহে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে ‘মৈত্রীর চুক্তি’ নামে এক দাসখত সম্পাদন করেছিলেন। নবাবের সাথে বিশ্বাসঘাতকতামূলক এ চুক্তির পরিণতি যে কত ভয়াবহ ও সুদূরপ্রসারী হবে সে সম্পর্কে তারা পূর্ব-পশ্চাৎ না ভাবলেও ষড়যন্ত্রের এ জাল বিস্তারকারী জগৎশেঠ, রায়দুর্লভ, রাজ বল্লভ, উমিচাঁদ, মানিক চাঁদ, মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র, নন্দকুমার কিংবা সুচতুর ইংরেজ লর্ড ক্লাইভ প্রমুখ অগ্রসর হয়েছিলেন সুদূরপ্রসারী ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে সামনে নিয়েই। ফলশ্রুতিতে টানা দু’শ বছর আমাদেরকে নিছক ইংরেজ বেনিয়াদের ঔপনিবেশিক শাসনের জাঁতাকলে পিষ্টই হতে হয়নি, সাড়ে পাঁচশ বছরের শাসকগোষ্ঠী মুসলমানদেরকে উইলিয়াম হান্টারের ভাষায় মাত্র একশ’ বছরের ব্যবধানে পরিণত হতে হয়েছে কাঠুরিয়া আর ভিস্তি ওয়ালার জাতিতে। ভারতের মুঘল শাসনের ঐতিহাসিক পরিক্রমা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, শাসক জাতির এ করুণ পরিণতির অশুভযাত্রা শুরু হয়েছিল পলাশীর বিপর্যয়ের বেশ পূর্ব থেকেই। কেননা তৃতীয় মুঘল সম্রাট বাদশাহ আকবরের রাজপুতনীতির ফলে হিন্দুরমণীদের পাণি গ্রহণের মাধ্যমে শাহিমহলে হিন্দু প্রাধান্য বিস্তারের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা এবং ‘দীন-ই-ইলাহি’ নামে এক অদ্ভুত ধর্মমত প্রচারের অপচেষ্টা সে সময় রাজকীয় মুঘল শক্তির হিন্দুত্ব তোষণের এক নতুন মাত্রার সূচনা করে। পরিণতিতে ইসলামী শক্তিকে অবদমিত করার হীন প্রচেষ্টায় রূপান্তরিত হয়েছিল এবং তৎকালীন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক চরম বিশৃঙ্খলার সূত্রপাত ঘটিয়েছিল। শেখ আহম্মদ শরহীন্দ মুজাদ্দিদে আলফে সানীর সংস্কার আন্দোলন তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। পরবর্তী মুঘল শাসক সম্রাট জাহাঙ্গীর ১৬০৮ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে সুরাটে বাণিজ্যকুঠি স্থাপনের অনুমতি দেন, খ্রিষ্টান ক্যাপ্টেন হকিন্সকে রাজকীয় সম্মানে বরণ করে নেন এবং স্যার টমাস রো ও রেভারেন্ড ই ফেবিকে রাজকীয় গুরুত্ব প্রদর্শন করার মাধ্যমে মুঘল মহলে হিন্দু সম্প্রদায়ের পাশাপাশি খ্রিষ্টান সম্প্রদায়েরও বিশেষ মর্যাদা সৃষ্টির আর এক অশুভ পরিণতির সূত্রপাত ঘটিয়েছেন। বিশেষ করে কয়েকজন শাহজাদার খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষা নিয়ে হকিন্সের সাথে মিছিল সহকারে গির্জায় যেয়ে প্রার্থনা করার ঘটনা তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। পরবর্তীতে বাদশাহ শাহজাহানের নিকট থেকে তার স্নেহভাজন কন্যার চিকিৎসার সাফল্যে ইংরেজ চিকিৎসক গ্যাবরিয়েল কাউটনকে রাজপুত্র শাহজাদা সুজার গৃহ চিকিৎসক হিসেবে নিযুক্তি দিয়ে ইংরেজদের জন্য যে বাণিজ্যিক সুবিধে আদায় করে দেয় তা ছিল ভবিষ্যতে এদেশে ইংরেজ রাজশক্তি প্রতিষ্ঠার আর এক সূচনাবিন্দু। কেননা ১৬৭০ সালে স¤্রাট আওরঙ্গজেবের নিকট থেকে লাভ করা ফরমানের ব্যাখ্যা নিয়ে ইংরেজ কোম্পানি নবাবের অফিসারদের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ার যে সাহস দেখিয়েছিল তা ছিল উপরোক্ত আশঙ্কার প্রাথমিক বহিঃপ্রকাশ। উল্লেখ্য, স্বল্পকাল পরে ১৬৮৫ সালে ১০০০ সৈন্যসহ ১০টি যুদ্ধজাহাজ নিয়ে মুঘলদের সাথে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার মাধ্যমে তারা স্পষ্টত এই আশঙ্কার বাস্তব নজির সৃষ্টি করে। আর এর মাধ্যমে ইংরেজ কোম্পানি যেন তাদের বর্ধিষ্ণু সামরিক শক্তির বিষয়টি মুঘল রাজশক্তিকে বুঝিয়ে দিতে চেয়েছে। কিন্তু তারপরও শাহজাদা আজিম-উশ-শানের সুবেদারি আমলে ১৬৯৮ সালে জব চার্নকের চেষ্টায় কোম্পানি মাত্র ১৬,০০০ টাকা ঘুষের বিনিময়ে সুতানটী, গোবিন্দপুর ও কলকাতা এ তিনটি গ্রামের জমিদারি স্বত্ব কেনার যে সুযোগ পায় তাকে পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে সেখানে ফোর্ট উইলিয়াম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে উপমহাদেশের মানচিত্রে এক অজ্ঞাত গ্রামাঞ্চলে ব্রিটিশ ভারতের ভবিষ্যৎ রাজধানী কলকাতা নগরীর গোড়াপত্তনে সক্ষম হয়। উল্লেখ্য, ১৭০৭ সালে স¤্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর তার দেয়া শাহি ফরমানের মেয়াদ শেষ হলে নবাব মুর্শিদ কুলী খান তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতাকে কাজে লাগিয়ে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে কাশিমবাজার, রাজমহল ও পাটনার ইংরেজ কুঠি বন্ধ করে দেন। কিন্তু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি জন সুরম্যানের নেতৃত্বে অনেকটা ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়ার মত দিল্লির দরবারে উপস্থিত হয় এবং সম্রাট র্ফরুখ শিয়রের শারীরিক অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে জনৈক ইংরেজ চিকিৎসকের চিকিৎিসায় সুস্থতা অর্জনের কৃতজ্ঞতাস্বরূপ ব্যবসায়ের ‘ম্যাগনাকার্টা’ হিসেবে অভিহিত এক শাহি ফরমান লাভ করতে সক্ষম হয়। তারা এর মাধ্যমে বার্ষিক মাত্র ৩০০০ টাকা শুল্ক দিয়ে কার্যত বিনা শুল্কে ব্যবসা পরিচালনা, নিজস্ব টাঁকশাল স্থাপন ও কলকাতার আশপাশে আরও ৩৮টি গ্রামের জমিদারি স্বত্ব ক্রয়ের অনুমোদন লাভ করে। এভাবে তারা অচিরেই এদেশে ইংরেজ রাজত্ব প্রতিষ্ঠায় সফলতার দ্বার উন্মোচনে সক্ষম হয়। সত্য বলতে কী, তাদের এ প্রচেষ্টা এত ত্বরিত সফলতা এনে দেয় যে মাত্র পাঁচ দশক যেতে না যেতেই ‘কেবলমাত্র উত্তর-পশ্চিমের দরজা দিয়েই ভারতে প্রবেশ করতে হয়’- মুগল শাসকদের এ সনাতন ধারণাকে তারা ভুল প্রমাণিত করে এবং ১৭৫৭ সালের পলাশীর বিপর্যয়ের মাধ্যমে পূর্ব ভারত দিয়েই ভারতে কোম্পানি শাসনের ছত্রছায়ায় আনুষ্ঠানিক ইংরেজ শাসনের সূচনা করে। এভাবে মাত্র ১০০ বছরের ব্যবধানে ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পরিসমাপ্তির মাধ্যমে সমগ্র ভারতব্যাপী ইংরেজ শাসনের বিস্তৃতি ঘটাতে সক্ষম হয়।
সুতরাং পলাশী বিপর্যয়ের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এ বিপর্যয়টি বাংলার ইতিহাসের কোন আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং এটি ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় মুঘল শাসকদের ভোগ বিলাস, অদূরদর্শিতা, পরস্পর হানাহানি ও প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের সুযোগে ইংরেজ এবং তার সহযোগী এ দেশীয় হিন্দু-শিখ-মারাঠা-জাঠ শক্তির সম্মিলিত ষড়যন্ত্রের পরিণতি মাত্র। কেননা দোর্দণ্ড প্রতাপে বিস্তার লাভ করা ভারতের মুঘল সা¤্রাজ্যের কর্ণধারগণ খুব দ্রুত যেভাবে নারী ও সুরা আসক্তি, ভ্রাতৃঘাতী সংঘর্ষে লিপ্ত হয় এবং শাহি মহলে রাজপুত রমণীদের প্রাধান্য থেকে হিন্দু রাজা-মহারাজাগণ নিকটাত্মীয়তার দাবিতে যেভাবে মুঘলশাহির অন্দর মহল ও দরবার দখল করে নেয়, তাতে ভারতে মুসলিম রাজশক্তির এ ধরনের বিপর্যয় ছিল অবধারিত। স্বাধীন বাংলা সাম্রারাজ্যেও মুগল শাসকদের ধারাবাহিকতায় নবাব মুর্শিদকুলী খান থেকে নবাব সিরাজউদ্দৌলা পর্যন্ত সেনাবাহিনীর বখ্শি (সেনাপতি), রাজস্ব বিভাগের দিওয়ান, প্রশাসন বিভাগের নায়েবে নাজিম প্রভৃতি বড় বড় পদগুলো ঢালাওভাবে হিন্দু রাজা মহারাজারাই অলংকৃত করছিলেন। সুতরাং রাজ ক্ষমতার এ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী ব্যক্তিদের এ ব্যাপক নিযুক্তি যে ভারতের মুসলিম সা¤্রাজ্যের জন্য হুমকি হতে পারে -এ দিকটি তারা কখনও বিবেচনা করেননি। এমনকি অত্যন্ত দৃঢ়চেতা বলে খ্যাত স্বাধীন বাংলার প্রথম নবাব মুর্শিদকুলি খানও ‘হিন্দুগণ স্বভাবতঃ শাসকগণের প্রতি অনুগত থাকে’- এ ধারণার বশবর্তী হয়ে তার শাসনামলে ভূপতি রায়, দর্পনারায়ণ, রঘুনন্দন, কিংকর রায়, আলম চাঁদ, লাহারীমল, দিলপত সিংহ, হাজারীমল প্রভৃতিকে দিওয়ান পদে নিযুক্তি দেন। পরবর্তী নবাব মুর্শিদকুলি খানের জামাতা সুজাউদ্দৌলাও একই ধারা অব্যাহত রেখে আলম চাঁদ, জগৎশেঠ, যশোবন্ত রায়, রাজবল্লভ, নন্দলাল প্রভৃতিকে এবং নবাব আলীবর্দী খানও চাঁদ রায়, বীরুদত্ত, কিরাত চাঁদ, উমেদ রায়, জানকীরাম, রাম নারায়ণ, রায়দুর্লভ, রাজবল্লভ, শ্যামসুন্দর, রাম রাম সিংহ প্রভৃতিকে বিভিন্ন বিভাগের প্রধান পদে নিযুক্ত দিতে দ্বিধাগ্রস্ত হননি। ফলশ্রুতিতে ভিন্ন বিশ্বাস ও কৃষ্টি কালচারের প্রতিনিধিত্বকারী এ বিশেষ সম্প্রদায়টি প্রকাশ্যে মুসলিম রাজশক্তির আনুগত্য দেখালেও নিজ সম্প্রদায়ের স্বার্থকে অন্তরে লালন করেই নানামুখী সুবিধা অর্জনে সক্রিয় থেকেছে। তারা সর্বদা ক্ষয়িষ্ণু মুঘল সাম্রাজে বা বাংলা সাম্রাজ্যের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে উদীয়মান রাজশক্তি ইংরেজ বণিকদের আহবানে সাড়া দিয়েছে এবং গোষ্ঠী স্বার্থে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে রক্ষা প্রচেষ্টার বিপরীতে অবস্থান নিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাগ্রস্ত হননি। বস্তুত ইঙ্গ-হিন্দু-শিখ-মারাঠা-জাঠশক্তি সম্মিলিতভাবে তাদের এ সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কৌশল হিসেবেই তারা অদূরদর্শী ও ক্ষমতার মোহান্ধ মীর জাফর, ইয়ার লতিফ, ঘসেটি বেগম প্রভৃতিকে সামনে রেখে অগ্রসর হয়েছে এবং অতি দ্রুত নবাবি শাসনের পতনকে নিশ্চিত করেছে। পরিণতিতে বাংলায় সাড়ে পাঁচশ বছরের মুসলিম শাসনের কার্যত পতন ঘটার ফলে শাসক মুসলিম শক্তি একদিকে যেমন অতি দ্রুত ভিস্তিওয়ালা ও কাঠুরিয়ার জাতিতে পরিণত হয়েছে, তেমনি ইংরেজ পদলেহী নবাবদের অব্যাহত অদূরদর্শিতায় মাত্র বিশ বছরের ব্যবধানে বাংলা থেকে ৩০০ কোটি টাকা ইংল্যান্ডে পাচার হয়েছে। এ সময়ে দ্বিগুণ মাত্রায় রাজস্ব আদায়ের ফলে সৃষ্ট এগার শ’ ছিয়াত্তরের মহাদুর্ভিক্ষে বাংলার তিন কোটি লোকের মধ্যে এক কোটি লোকই প্রাণ হারিয়েছিল। উল্লেখ্য, এদের পঁচাত্তর লক্ষই ছিল মুসলমান। পরবর্তীতে উইলিয়াম বেন্টিংক-এর সূর্যাস্ত আইনের কোপানলে পড়ে মুসলিম জমিদারগণ ব্যাপক হারে তাদের জমিদারি হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছে আর উঠতি হিন্দু জমিদার শ্রেণী নতুন ভূস্বামী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ভূমি রাজস্ব খাতে একচেটিয়া প্রাধান্য বিস্তার লাভে সক্ষম হয়েছে। উল্লেখ্য নতুন প্রবর্তিত রাজস্ব নীতির ফলে অসংখ্য লাখেরাজ সম্পত্তির আয়ে পরিচালিত মুসলিম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এ সময়ে আয়ের উৎস হারিয়ে ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়েছে এবং এককালের শাসক মুসলিম পরিবারের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষা লাভের দ্বার রুদ্ধ হয়েছে। উল্লেখ্য, জার্মান প্রাচ্য বিশারদ ম্যাক্স মুলারের মতে ইংরেজ রাজত্ব প্রতিষ্ঠার ৩০ বছর পূর্বে শুধু বাংলাতেই এ জাতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল ৮০ হাজার- অর্থাৎ প্রতি ৪০০ জনের জন্য একটি করে বিদ্যালয় যা উপরোক্ত সংকটের মুখোমুখি হয়ে ক্রমান্বয়ে ধ্বংস হয়। বস্তুত ক্ষমতালোভী ও অপরিণামদর্শী মীর জাফর গংদের বিশ্বাসঘাতকতায় মাত্র কয়েক দশকের মধ্যেই রত্ন ভাণ্ডারে সমৃদ্ধ বাংলার অর্থনীতি ছারখার হয়ে মহাদুর্ভিক্ষে পড়ে এক কোটি লোকের মৃত্যু ঘটেছে। এভাবে দেশের শাসন বিভাগ, রাজস্ব বিভাগ ও সৈন্য বিভাগের ন্যায় প্রভাব বিস্তারকারী সকল বিভাগ থেকেই মুসলিম শক্তি দ্রুত ছিটকে পড়েছে। অবস্থার নাজুকতায় বনেদি মুসলিম পরিবারগুলো নিজ শহর ছেড়ে পালিয়ে দেশান্তরিত হয়েছে। কেউ কেউ মূল পরিচয় গোপন করে টিকে থাকার চেষ্টা করেছে। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের পূর্ব পুরুষরাও এ জাতীয় নাজুক অবস্থার শিকার হয়ে পাটনার প্রধান কাজী বা বিচারকের চাকরি হারিয়ে কৌশলে বর্ধমানের চুরুলিয়া গ্রামে পালিয়ে এসে মসজিদের ইমামতি আর পীর-ফকিরি পেশাকে অবলম্বন করে আত্মগোপনের পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন।
উল্লেখ্য, বাংলার মুসলিম জাতির এ দুরবস্থা নিরসনে ফকির আন্দোলন, বালাকোটের মুজাহিদ আন্দোলন, তিতুমীরের আন্দোলন ও ফারায়েজি আন্দোলনের মত যেসব প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে উঠেছিল তা ইংরেজ ও হিন্দু রাজশক্তির সম্মিলিত দমন নিপীড়নের মাঝে গতিশীল থেকেও ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পরাজয়ের মাধ্যমে কার্যত মৃত্যুদশায় পরিণত হয়। এর মাঝে ১৮০১ সালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ, ১৮১৭ সালে হিন্দু কলেজ ও ১৮২৪ সালে সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠা করে পন্ডিত উইলিয়াম কেরি, রাম রাম বসু, মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকার প্রমুখ ও তাদের সহযোগী হিন্দু বুদ্ধিজীবীগণ মুসলিম জনগোষ্ঠীকে তাদের সাহিত্য সাংস্কৃতিক অঙ্গন থেকেও উৎখাতের চক্রান্ত করেছে। তারা পূর্বভারতীয় মুসলমানদের শ্রেষ্ঠ অবদান আরবি-ফারসি শব্দ বহুল বাংলা ভাষাকে সংস্কৃত জননীর কন্যা হিসেবে প্রমাণ করার জন্য বাংলা থেকে আরবি-ফারসি শব্দকে উৎখাত করে সংস্কৃত শব্দবহুল নতুন বাংলা ভাষা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালায়। পাশাপাশি ১৮৩৭ সালে ফারসির পরিবর্তে ইংরেজিকে প্রশাসনিক ভাষা হিসেবে নির্বাচন করে এবং ১৮৩৮ সালে মুসলিম আইনের পরিবর্তে ব্রিটিশ আইনকে আদালতে চালু করার মাধ্যমে সুচতুরভাবে এ সময়ে মুসলিম শক্তির অবশিষ্ট মেরুদণ্ডও ভেঙে দেয়। গায়ের রং ও জন্মসূত্রে ভারতীয় হলেও চিন্তা চেতনায় বিলেতি সৃষ্টির লক্ষ্যে ১৮৩৫ সালে লর্ড ম্যাকলে প্রবর্তিত ইংরেজি শিক্ষাকে গ্রহণ কিংবা তা বর্জন করে নিজস্ব শিক্ষাপদ্ধতিকে আঁকড়ে ধরার সিদ্ধান্তে মুসলিম শক্তি এ সময়ে দ্বিধা-বিভক্তিতে পড়ে আরও ক্ষয়িষ্ণু হয়েছে। ১৮৮৫ সালে বাংলায় ইংরেজ শাসনকে স্থায়ী করার লক্ষ্যে ইংরেজ শাসনের সুবিধাভোগীদের নিয়ে মি. এলান অক্টাভিয়ান হিউমের নেতৃত্বে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের প্রেক্ষিতে প্রধানত কলকাতা কেন্দ্রিক বর্ণ হিন্দুদের দ্বারা পরিচালিত বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ১৯০৬ সালে তৎকালীন পূর্ব বাংলার রাজধানী ঢাকায় মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা হওয়ার মাধ্যমে বাংলার মুসলিম সমাজে এক নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়েছিল । কিন্তু স্বল্পকাল পরেই ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হয়ে গেলে পূর্ববঙ্গের বাংলার মুসলিম সমাজে চরম এক হতাশা নেমে আসে। পূর্ববঙ্গের জনগণের মাঝে সৃষ্ট এ হতাশা ও বঞ্চনা দূর করার জন্য সান্ত্বনা পুরস্কার হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগকেও অন্তত ১৮ বার স্মারকলিপি দিয়ে বিলেতি কর্তৃপক্ষকে থামিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। পরবর্তীতে ভারত বিভক্তি ইস্যুতে একজাতিতত্ত্ব ও দ্বিজাতিতত্তরে প্রশ্নে পড়ে মুসলিম জনগোষ্ঠী আবারও দ্বিধা বিভক্তিতে পড়ে যায়।
অবশেষে দ্বিজাতিতত্ত্বের বিজয়ে ১৯৪৭ সালে বাংলা ভাগ হয়ে তৎকালীন পূর্ব বাংলা প্রদেশটি নবসৃষ্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হলেও স্বতন্ত্র জাতীয়তা ও ইসলামী আদর্শের চেতনা নিয়ে জন্ম নেয়া পাকিস্তান রাষ্ট্রটির তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে সে আদর্শের লালন করাকে সুকৌশলে এড়িয়ে যেয়ে মুসলিম শক্তিকে হতাশ করেছে। এমনকি রাষ্ট্রভাষা নির্ধারণ প্রশ্নেও জনসংখ্যার সংখ্যাধিক্যে প্রাপ্য পূর্ব বাংলার জনগোষ্ঠীর ন্যায্য অধিকার দিতেও তারা ব্যর্থ হয়েছে। ফলে ১৯৭১ সালে আবারও এক রক্তক্ষয়ী আত্মত্যাগের মাধ্যমে পাকিস্তান থেকে পূর্ব বাংলা বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের সৃষ্টি হওয়াকে অবধারিত করেছে। কিন্তু লক্ষণীয় যে, স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ সৃষ্টির পর প্রায় অর্ধশতাব্দী অতিক্রান্ত হলেও আমরা সত্যিকারের ভৌগোলিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা কতটুকু পেয়েছি তা নিয়ে আজও বিতর্ক থেকে গেছে। কেননা, প্রতিবেশী একটি বৃহৎ দেশ আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের সূচনালগ্নে স্বীকৃতি ও সহযোগিতা দেয়ার শর্তে অসহায় মুজিবনগর সরকারের নিকট থেকে স্বাক্ষর করানো শান্তিচুক্তি নামে ২৫ বছরের দাসখত চুক্তিটি যেভাবে নবায়ন করিয়ে নেয়, জাতীয় সংসদকে পাশ কাটিয়ে পারস্পরিক গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের চুক্তি করে রাষ্ট্রীয় গোপনীয় তথ্য হস্তগত করে, সকল আন্তর্জাতিক রীতিনীতিকে উপেক্ষা করে দক্ষিণ তালপট্টিতে ভারতীয় পতাকা উড়িয়ে দখলদারিত্ব কায়েম করে, বেরুবাড়ী দখলে নিয়েও দহগ্রাম ও আঙ্গরপোতা ছিটমহলে প্রবেশের তিন বিঘা করিডোর হস্তান্তরে যুগ যুগ ধরে দীর্ঘসূত্রতার আশ্রয় নেয়; তখন এদেশের ক্ষমতাসীন কোন কোন দল কিংবা জাতির বিবেক বলে খ্যাত চিহ্নিত বুদ্ধিজীবীগণ যখন নিশ্চুপ থাকেন তখন আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের অসহায়ত্বই যেন প্রকাশিত হয়ে পড়ে। জেনারেল নিয়াজীর আত্মসমর্পণের সময় মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানীকে অনুপস্থিত রাখা, এমনকি তার হেলিকপ্টারে গুলি চালিয়ে প্রাণনাশের প্রচেষ্টা চালানোর বিষয়ে যখন তারা মুখ খুলতে অপারগ হন তখন খুবই বিস্মিত হতে হয়। আন্তর্জাতিক নদী আইনকে উপেক্ষা করে প্রতিবেশী দেশটির গঙ্গা নদীসহ উজানের সবগুলো নদীর পানি একতরফা প্রত্যাহারের মাধ্যমে সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা বাংলাদেশকে মরুভূমিতে পরিণত করার ভয়াবহ অপচেষ্টা প্রশ্নে এদেশের একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী যেভাবে কলম ধরতে অপারগতা প্রকাশ করেন তখন তা বিস্ময় সৃষ্টি না করে পারে না। সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক হরহামেশা বাংলাদেশীকে গুলি করে হত্যা করার বিষয়ে কিংবা নোম্যান্স ল্যান্ডে কাঁটাতারের বেড়া ও পর্যবেক্ষণ টাওয়ার তৈরিসহ পুশব্যাকের মত সভ্য বনি আদমের সাথে অসভ্য ও অমানবিক আচরণের বিষয়েও এসব বুদ্ধিজীবী নিশ্চুপ থাকেন, উপরন্তু এ জাতীয় কর্মকাণ্ডকে নির্লজ্জভাবে হৃদয়হীনের মত সমর্থন জানিয়ে তাদের কেউ কেউ রাষ্ট্রীয় খেতাব পেয়ে ধন্য হন, তখন এদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের সীমাবদ্ধতাটি আরও স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। এমনকি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ‘আকিদাহ বিশ্বাস ও চেতনার লালনক্ষেত্র দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে কোন কোন মহল যখন তালিবানি যোদ্ধা ও হরকাতুল জেহাদের প্রশিক্ষণ শিবির হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং তাদের বশংবদ বুদ্ধিজীবী কলামিস্টরা যেভাবে এ নিকৃষ্ট প্রোপাগান্ডায় সমর্থন জানিয়ে অসাম্প্রদায়িক হওয়ার প্রতিযোগিতায় নামেন, তখন তাদের এ জাতীয় সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র দেশপ্রেমিক তৌহিদী জনতাকে নিঃসন্দেহে ভাবিয়ে তোলে। পশ্চিমা নানা দেশ ঘুরে অবশেষে প্রতিবেশী একটি রাষ্ট্রে আশ্রয় গ্রহণকারী স্বেচ্ছা নির্বাসিতা জনৈক বিতর্কিত লেখিকা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের কাল্পনিক কাহিনি লিখে আন্তর্জাতিক মহলে তোলপাড় তোলেন এবং এভাবে বাংলাদেশকে হেয়প্রতিপন্ন করার অপচেষ্টা চালান, আর তখন তাতে বিবেকবর্জিত ও পরান্নভোজী উক্ত চিহ্নিত বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠীটি অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়ে আন্দোলনে নামার সাহস দেখায় সেটি দেশের জন্য যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ। এমনকি নিজেরা অভিনয় করে সংখ্যালঘু নির্যাতনের কাল্পনিক ছবি তৈরি করে বিদেশে প্রদর্শনের মাধ্যমে কোন কোন মহল নিজ দেশের ভাবমূর্তি ভূলুণ্ঠিত করার আত্মঘাতী অপচেষ্টায় লিপ্ত বলে প্রমাণিত হন অথচ কোন প্রকার শাস্তির মুখোমুখি হওয়া থেকে তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান, তখন তা আমাদের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের নাজুকতার দিকেই যেন অঙ্গুলি নির্দেশ করে। এ দেশে কর্মরত এনজিওগুলো নারী অধিকারের নামে যেভাবে একতরফা প্রচারণায় চালিয়ে দাম্পত্য সম্পর্কে চিড় ধরিয়ে পারিবারিক জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলে ঐতিহ্যবাহী পরিবার ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার পাঁয়তারা করছে ও ধর্মীয় অনুভূতিতে ক্রমাগত আঘাত করে আমাদের ঈমান-আকিদাকে দুর্বল করতে অপচেষ্টা চালাচ্ছে তা কোনভাবেই গ্রহণীয় নয়।
এদিকে প্রতিবেশী একটি দেশকে বিনা শুল্কে পণ্য ও অন্যান্য সরঞ্জামাদি পরিবহনের সুযোগ তথা ট্রানজিট দেয়া, দেশব্যাপী একের পর এক গুম ও খুনের মহড়ার নজির সৃষ্টি হওয়া, শেয়ারবাজার, ডেসটিনি, হলমার্ক ও পদ্মা সেতুসহ সোনালী, জনতা ও বেসিক ব্যাংকের মত রাষ্ট্রীয় ব্যাংক কেলেঙ্কারি, এমনকি সকল ব্যাংকের অভিভাবক বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্ট থেকে রিজার্ভ চুরির ঘটনাটিও যেভাবে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়, তা যেন আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনায় নজিরবিহীন ব্যর্থতাকে নির্দেশ করে। ফারাক্কা বাঁধের কারণে সৃষ্ট ভয়াবহ ক্ষতিকর পরিণতির নজির থাকার পরও দেশপ্রেমিক ও সচেতন মহলকে উপেক্ষা করে টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে ও তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি সম্পাদনে ব্যর্থতা, বিশ্বের অপরূপ সৌন্দর্য ও প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প চালুর উদ্যোগগুলো এদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের দৈন্য দশাকেই যেন নির্দেশ করে। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখার জন্য বিদেশী ব্যক্তিত্বদের দেয়া ক্রেস্ট থেকে স্বর্ণ চুরি করা আর ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ দিয়ে খোদ মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষপদে আসীন থেকে নানারকম সুযোগসুবিধে নেয়ার বিষয়টিও যেভাবে ধামাচাপা পড়ে যায়, তা যেন দুর্নীতির মহোৎসবকে স্বীকৃতি দেয়।
দেশে স্বাধীন মতপ্রকাশের ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ চর্চায় বাধা দিয়ে একের পর এক পত্র-পত্রিকা, টিভি চ্যানেল এমনকি ফেসবুক ও ইউটিউবের মত সোশ্যাল মিডিয়াকেও বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করা, মিছিল-মিটিং সমাবেশের ন্যায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ করা এবং মাহমুদুর রহমান, শফিক রেহমান, জাফরুল্লাহ চৌধুরী, আদিলুর রহমান, মাহমুদুর রহমান মান্না বা ফরহাদ মযহারের মত দেশপ্রেমিক সাংবাদিক, সম্পাদক, লেখক বুদ্ধিজীবীদের গ্রেফতার করার ঘটনাগুলো ভিন্নমত প্রকাশের কণ্ঠবোধ করার অভিনব দৃষ্টান্ত। এ দেশে সরকারের মন্ত্রিসভায় থেকেও বিরোধী দলের মর্যাদা ভোগের দৃষ্টান্ত আজ বিশ্ববাসীর জন্য গণতন্ত্র চর্চায় যেন এক নতুন ও অভিনব দৃষ্টান্ত। কখনও যুদ্ধাপরাধী কখনও মানবতাবিরোধী অপরাধী উল্লেখ করে তাদের কার্যক্রমের বিচার নিয়ে গঠিত আদালতের ধরন ও মান প্রশ্নে হাজারো বিতর্ক থাকার পরও যেভাবে বিচারিক কার্যক্রম পরিচালিত হলো; তা এ দেশের বিচারব্যবস্থাকে বিশ্বব্যপী প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগের মর্যাদা ও ক্ষমতা প্রশ্নে যেভাবে সাম্প্রতিককালে দেশের প্রধান বিচারপতিকে অপসারণ করা হলো এবং তার পর পরই তার বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা অবৈধ আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ এলো, তা আমাদের দেশের সমগ্র বিচারব্যবস্থাকেই নানা প্রশ্নের মুখোমুখি এনে তাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
একবিংশ শতকের এ পর্যায়ে এসে জনপ্রতিনিধিত্বমূলক দলসমূহের অংশগ্রহণহীন ও ভোটারবিহীন এক তরফা নির্বাচনকে লুফে নিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকাটি কোনভাবেই কাম্য নয়। ভিন্নমত পোষণকারী সম্মানিত নেতৃবৃন্দ সম্পর্কে অব্যাহতভাবে অশ্লীল উচ্চারণে কুৎসা রটিয়ে সম্মানহানি করা, সাময়িক সুবিধা নেয়ার জন্য একের পর এক দেশের অতি সম্মানী ও মর্যাদাপূর্ণ সাংবিধানিক পদ ও চেয়ারগুলোকে বিতর্কিত করা প্রভৃতি যেন আজ দেশকে কোন অজানা আশঙ্কার দিকে নিয়ে যাওয়ারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সুতরাং পলাশীর বিপর্যয়কে সামনে রেখে দেশের বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করলে লক্ষ্য করা যায় যে, দুর্দিনের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে কিংবা উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে পরিচয় দিয়ে দেশে কর্মরত এনজিও, সাহায্য সংস্থা ও বিদেশী দূতাবাসগুলো সম্প্রতি যেভাবে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জাতীয় রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করার প্রয়াস পাচ্ছে তা একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য কোনভাবেই প্রত্যাশিত নয়। যদি দৃঢ়তার সাথে তাদের এসব অপচেষ্টাকে নিয়ন্ত্রণ করা না যায় তাহলে অতীতে ক্ষয়িষ্ণু মুঘল শাসকদের দুর্বলতার সুযোগে বণিকের মানদণ্ড যেভাবে শাসকের রাজদণ্ডে রূপান্তরিত হয়েছিল এবং দু’শ বছরের জন্য আমাদেরকে পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ করেছিল আজও তেমনি আমাদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ভিন্ন কোন অপশক্তিকে আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ছিনিয়ে নিতে আমন্ত্রণ জানানোর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে আরও মনে রাখা দরকার, ‘সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়’। অতীতে বাণিজ্য করার অনুমতিকে পুঁজি করে ইংরেজরা মুঘল সা¤্রাজ্য আক্রমণ করার ধৃষ্টতা দেখালে বাদশাহ আওরঙ্গজেব তাদেরকে কঠোর হাতে ভারত থেকে বিতাড়িত করেও পুনরায় ক্ষমার উদারতা দেখিয়ে বাণিজ্য করার অনুমতি দেয়ার ঐতিহাসিক ভুলটি যদি না করতেন, তাহলে হয়ত ভারত উপমহাদেশে ইংরেজ শাসনের আবির্ভাব ঘটতো না। দু’দুবার বিশ্বাসঘাতক প্রমাণিত করার পরও মীরজাফর আলী খানকে প্রথমে নবাব আলীবর্দী খান ও পরে নবাব সিরাজউদ্দৌলা ক্ষমা করে প্রধান সেনাপতির পদে বহাল রাখার ভুল সিদ্ধান্তটি যদি না নিতেন, তাহলে ক্লাইভের ৩,২০০ সৈন্যের মোকাবেলায় পলাশীতে নবাবের ৫০,০০০ সৈন্যের পরাজয়ের কালো অধ্যায়ের সূচনা হতো না। বস্তুত মি. হল ওয়েলের অন্ধকূপ হত্যার কাল্পনিক কাহিনী সৃষ্টির সফলতা যেভাবে ইংরেজদেরকে নবাব সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করার যৌক্তিকতা সৃষ্টি করেছিল, তথাকথিত তালেবানি যোদ্ধা ও হরকাতুল জেহাদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের ঢালাও প্রচারণাও এদেশে কোন বিদেশী প্রভুর হস্তক্ষেপকে যৌক্তিক করে তোলার ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে কি না সেদিকে আজ সতর্ক দৃষ্টি দেয়ার সময় এসেছে। উল্লেখ্য, মীর জাফরের সাথে ক্লাইভের তথাকথিত শান্তিচুক্তি সম্পাদনের ফলে যখন নবাব বাহিনীর দিকে ক্লাইভের অগ্রসর হবার ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়; তখন মেদিনীপুর, দিনাজপুর, বীরভূমের মহারাজারাও ক্লাইভের প্রতি অগ্রিম আনুগত্য প্রকাশ করে তাকে বাংলা আক্রমণের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। মনে রাখা দরকার, আজকের বাংলাদেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা বা উন্নয়নের নামে বিদেশী শক্তিকে আমন্ত্রণ জানিয়ে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে বিকিয়ে দেয়ার মত দল ও তাদের বশংবদ বুদ্ধিজীবীদের অভাব নেই। অব্যাহত দল বা জোট বদলের রাজনীতি করেও এদেশের কোন কোন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যেভাবে বারবার জাতীয় রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হচ্ছেন, তাদের ব্যাপারেও আজ সতর্ক সিদ্ধান্ত নেয়ার তীব্র প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। স্বাধীনতা অর্জনের প্রায় অর্ধশতাব্দী পরে এ দেশের গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থাকে শক্তিশালীকরণের পরিবর্তে আরো দুর্বল থেকে দুর্বলতর করে ফেলা হচ্ছে। সুতরাং সময় এসেছে দেশপ্রেমিক তৌহিদী জনতার ঐক্যবদ্ধ হওয়ার এবং পলাশী বিপর্যয়ের এ ঐতিহাসিক পরিণতি থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিনষ্টকারী সকল অপশক্তির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার ও সতর্ক থাকার। আশা করি, লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমি এ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার্থে, আমাদের ঈমান-আকিদাহ ও চেতনা-বিশ্বাসের সঠিক হেফাজতে আমরা সব ধরনের ত্যাগ স্বীকারের মাধ্যমে উপরোক্ত গুরুদায়িত্ব পালনে সতর্ক ও সচেষ্ট থাকবো। আল্লাহ আমাদেরকে সময়ের এ কঠিন সিদ্ধান্তে অনড় ও অবিচল থাকার তৌফিক দিন।

লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

SHARE

Leave a Reply