পলাশী প্রহসনের বিয়োগান্তক ইতিহাস : প্রেক্ষিত আজকের বাংলাদেশ

 আতিকুর রহমান

গত সংখ্যার পর

6ক্লাইভের বিশ্বস্ত সহচর স্ক্রাফটন লিখেছেন, ২১ জুন মীর জাফরের পত্র পেয়ে ক্লাইভ ঘুরে বসে ছিলেন এবং তার আদেশে ২২ শে জুন সকাল ৫ ঘটিকার সময় ব্রিটিশ বাহিনী গঙ্গা পার হয়েছিল।
In this doubtful interval the majority of our officers were against crossing the river and everything before the face of disappointment but on the 21st of June, the colonel received a letter from meer Jaffor, which determined him to hazard a battle and he passed the river at five in the next morning Seraftion.
মীর জাফরের পত্র
That the Nabab had halted at Muncara, a village six Miles to the south of Cassimbazar and intended to entrench and wait the evening at that place, where jaffar proposed that the English should attack him by surprise, marching round by the inland part of the island.
ক্লাইভের উত্তর
That he should march to Plassey without delay and would that the next morning advance six miles further to the village of Daudpoor; but if meer jaffor did not join him there he would make peace with the Nabab.

ক্লাইভের প্রত্যুত্তরে স্পষ্টই বুঝা যায় যে তিনি ২১ জুন অপরাহ্ন যুদ্ধযাত্রা করেননি, তবে পত্র পাবার পর যুদ্ধযাত্রা করতে কৃত সঙ্কল্প হয়ে মীর জাফরকে সংবাদ পাঠিয়েছেন। মীর জাফরের উপদেশ না পেয়ে, ইংরেজরা সসৈন্যে কাটোয়ায় অপেক্ষা করছিলেন এবং সিদ্ধান্ত নেবার জন্য সমর সভার অধিবেশন আহবান করেছিলেন। মীর জাফরের উপদেশ পাওয়া মাত্র আবার ইংরেজ সেনাপতির শৌর্যবীর্য জাগরিত হয়ে উঠেছিল। ক্লাইভ নিজেও স্বীকার করে গেছেন যে সমর সভার অধিবেশন শেষ হলে ২৪ ঘণ্টার বিশেষ গবেষণার পরে তার মত পরিবর্তন হয় এবং ২২ জুন সকালে সেনাদল গঙ্গা পার হয়।
মীর জাফরের পূর্বকথিত সঙ্কেতানুসারে ইংরেজ বাহিনী ২২ শে জুন সকালে ভাগীরথী পার হয়ে দলে দলে পলাশীর দিকে অগ্রসর হতে লাগল। নবাব সেনারা পলাশী অধিকার করে নেয় কি না এই আশঙ্কায় ইংরেজরা বৃষ্টি বাদল মাথায় করে তাড়াতাড়ি ছুটে চললো এবং রাত ১টার সময় পলাশীর আম্রবনে পৌঁছল।
২৩ জুন ১৭৫৭ সালে রজনী প্রভাত হলো। যে প্রভাতে ভারত-গগনে ব্রিটিশ সৌভাগ্য-সূর্য উদিত হবার সূত্রপাত হয়েছিল। ১১৭০ হিজরি ৫ শাওয়াল, বৃহস্পতিবার পলাশী প্রান্তরে ইংরেজ ও বাঙালি শক্তি পরীক্ষার জন্য একে একে গাত্রোত্থান করতে লাগলো।
ইংরেজরা আম্রকাননের পশ্চিম-উত্তর কোণে লক্ষবাগের উত্তরে উন্মুুক্ত প্রান্তরে ব্যূহ রচনা করলেন। সিরাজউদ্দৌলা প্রত্যুষেই মীর জাফর, ইয়ার লতিফ, রায়দুর্লভকে শিবির হতে অগ্রসর হওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন। তারা অর্ধচন্দ্রাকারে ব্যূহ রচনা করে ধীর মন্থরগতিতে আম্রবন বেষ্টন করার জন্য অগ্রসর হতে লাগলেন। মীর মদনের সিপাহি সেনা সম্মুখস্থ সরোবর তীরে সমবেত হয়েছিল। এক পাশে ফরাসি বীর সিনফ্রে, এক পাশে বাঙালি বীর মোহনলাল, মধ্যস্থলে বাঙালি বীর সেনাপতি মীর মদন সেনাচালনার ভার গ্রহণ করলেন।
সিরাজ বাহিনীর রণহস্তী, সুশিক্ষিত অশ্বসেনা এবং সুগঠিত আগ্নেয়াস্ত্র যখন ধীরে ধীরে সম্মুখে অগ্রসর হতে লাগল তখন ইংরেজরা ভাবলো সিরাজ-ব্যূহ দুর্ভেদ্য। বেলা ৮ ঘটিকার সময় মীর মদন সরোবরতীরে কামানে অগ্নিসংযোগ করলেন। প্রথম গোলাতেই ইংরেজ পক্ষে একজন হত এবং একজন আহত হলো। তার পর মুহুর্মুহু কামান পরিচালনায় একের পর এক ইংরেজ সেনা ধরাশায়ী হতে লাগল। মাত্র ৩০ মিনিটের যুদ্ধে ১০ জন গোরা এবং ২০ জন কালা সিপাহির মৃত্যু হলো। ইংরেজ সেনাদের কামান পরিচালনায় নবাবের গোলন্দাজদের ক্ষতি করতে পারেনি, তারা অক্ষত দেহে বিপুল বিক্রমে ইংরেজ সেনার মধ্যে মিনিটে মিনিটে গোলাবর্ষণ করতে লাগল। এমতাবস্থায় আত্মরক্ষার জন্য ক্লাইভ আম্রবনে লুকিয়ে বৃক্ষ-অন্তরালে বসে পড়ল। নবাব সেনার ব্যূহ রচনায় এবং সমর কৌশলে ক্লাইভের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠেছিল। তিনি উমিচাঁদকে ভর্ৎসনা করে বলতে লাগলেন, “তোমাদের বিশ্বাস করে বড়ই ভুল করেছি” তোমাদের সঙ্গে কথা ছিল যে যৎসামান্যই যুদ্ধাভিনয় হলেই মনস্কামনা পূর্ণ হবে; সিরাজসেনা যুদ্ধক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি প্রদর্শন করবে না। এখন যে তার সকল কথাই বিপরীত মনে হচ্ছে। উমিচাঁদ বিনীতভাবে নিবেদন করলেনÑ যারা যুদ্ধ করছে তারা মীরমদন এবং মোহনলালের সেনাদল; তারাই কেবল প্রভুভক্ত। তাদের কোনো রকমে পরাজিত করতে পারলেই হয়; অন্যান্য সেনানায়কগণ কেউ অস্ত্র চালনা করবেন না।
অন্য দিকে মীরমদন ধীরে ধীরে সম্মুখে অগ্রসর হয়ে বিপুল বিক্রমে গোলা চালনা করতে লাগলেন। সেই সময়ে মীর জাফরের চক্রব্যূহ যদি আর একটু অগ্রসর হয়ে কামানে অগ্নিসংযোগ করতো তাহলে আর রক্ষা ছিল না। কিন্তু মীর জাফর, ইয়ার লতিফ, রায়দুর্লভ যেখানে সেনা সমাবেশ করেছিলেন, সেখানেই পুতুলের ন্যায় দাঁড়িয়ে রণকৌতুক দর্শন করতে লাগলেন। ঠিক মধ্যাহ্ন সময়ে বৃষ্টি শুরু হলো; মীরমদনের অনেক বারুদ ভিজে গেল কামানগুলোর ওপর ঢাকনা না থাকায় তা শিথিল হয়ে পড়ল। মীর মদন আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার পর ধরাধরি করে তাকে সিরাজউদ্দৌলার সম্মুখে উপনীত করলে তিনি শুধু বলতে পারলেন “শত্রুসেনা আম্রবনে পলায়ন করেছে, তথাপি নবাবের প্রধান সেনাপতিগণ কেউ যুদ্ধ করছে না, সসৈন্য চিত্রার্পিতের ন্যায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন। মীর মদনের অকস্মাৎ মৃত্যুতে সিরাজের বল-ভরসা অকস্মাৎ তিরোহিত হয়ে গেল। সিরাজউদ্দৌলার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। কারণ দেশপ্রেমিক মীর মদনের ভরসা পেয়ে সিরাজউদ্দৌলা শত্রুদলের কুটিল কৌশলে ভ্রƒক্ষেপ করেননি।
সিরাজউদ্দৌলা নিরুপায় হয়ে আবারও রাজমুকুট রেখে দিয়ে ব্যাকুল হৃদয়ে মীর জাফরকে বলে উঠলেন যা হওয়ার তা হয়েছে, তুমি ভিন্ন রাজমুকুট রক্ষা করার এমন আর কেউ নেই। মাতামহ জীবিত নেই। তুমিই এখন তার স্থান পূর্ণ কর। মীর জাফর! আলীবর্দীর পুণ্যনাম স্মরণ করে দেশের মান সম্ভ্রম এবং আমায় জীবন রক্ষায় সহায়তা কর। নবাবের অনুরোধে আবারও মীর জাফর প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে রাজমুকুটকে কুর্নিশ করে বুকের ওপর হাত রেখে বিশ্বস্তভাবে বলতে লাগলেন অবশ্যই শত্রু জয় করব। কিন্তু আজ দিবা অবসান প্রায় হয়ে পড়েছে; আজ সেনাদল শিবিরে প্রত্যাগমন করুক; প্রভাতে আবার যুদ্ধ করলেই হবে; সিরাজ বললেন নিশারণে ইংরেজ সেনাশিবিরে আক্রমণ করলেই যে সর্বনাশ হবে? মীর জাফর সগর্বে বলে উঠলেন আমরা রয়েছি কেন?
মীর জাফরের প্রতারণায় নবাবের আবারও মতিভ্রম হলো। মীর জাফর যে ক্লাইভের পরামর্শে নবাবের সেনাদের যুদ্ধবিরতি করতে বলল তা তিনি বুঝে উঠতে পারেননি। তিনি মীর জাফরের পরামর্শকে গুরুত্ব দিয়ে সেনাদলকে প্রত্যাগমন করার জন্য আদেশ প্রদান করলেন। নবাবের এ সিদ্ধান্ত মোহনলাল মেনে নিতে পারছিলেন না। তিনি তখনও বিপুল বিক্রমে শত্রুসেনার দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। তিনি সমস্বরে বলে উঠলেন “আর দুই চারি দণ্ডের মধ্যেই যুদ্ধ শেষ হবে এখন কি শিবিরে প্রত্যাগমন করার সময়? পদযাত্রা পশ্চাদগামী হলে, সিপাহিদল ছত্রভঙ্গ হয়ে সর্বনাশ হবেÑ ফিরব না যুদ্ধ করব? মীর জাফরের মৌখিক উত্তেজনায় আত্মবিস্মৃত সিরাজউদ্দৌলা পুনরায় মোহনলালকে শিবিরে প্রত্যাগমনের নির্দেশ দিলেন। রাগে ক্ষোভে মোহনলালের নয়ন যুগল হতে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বহির্গত হতে লাগল। কিন্তু তিনি আর কী করবেন? সমর ক্ষেত্রে সেনাপতির আদেশ লঙ্ঘন করতে পারলেন না।
মীর জাফরের মনস্কামনা পূর্ণ হলো। তিনি তাৎক্ষণাৎ ক্লাইভকে চিঠি লিখে পাঠালেন। “মীর মদন গতায়ু হয়েছে, আর লুকিয়ে থাকা নি®প্রয়োজন। ইচ্ছা হয় এখনই অথবা রাত ৩ ঘটিকার সময় শিবিরে আক্রমণ করবেন, তাহলে সহজে কার্য সিদ্ধি হবে।”
মোহন লালকে শিবিরে প্রত্যাগমন করতে দেখে, ইংরেজ সেনা আম্রবন হতে বের হতে লাগল। এতদর্শনে নবাব সেনাদের অনেকই পলায়ন করতে লাগল। কিন্তু ফরাসি বীর সিনফ্রে এবং বাঙালি বীর মোহন লাল ঘুরে দাঁড়ালেন; তাদের সেনাদল হটল না। তারা অকুতোভয়ে অমিতবিক্রমে প্রাণপণে যুদ্ধ করতে লাগলেন।
ইতোমধ্যে প্রহসনের অন্যতম নায়ক রায়দুর্লভ তাদের ষড়যন্ত্রের সফলতার দ্বারপ্রান্তে এসে সিপাহি সেনাকে ইতস্তত পলায়ন করতে দেখে সিরাজউদ্দৌলাকেও পলায়ন করার জন্য উত্তেজনা প্রদান করতে লাগলেন। সিরাজ সহসা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পরিত্যাগ না করতে চাইলেও বিপুল সেনা প্রবাহের অল্পলোকই তার জন্য যুদ্ধ করছে এরূপ অবস্থা তার মনে হলো, পলাশীতে পরাজিত না হয়ে রাজধানী রক্ষার জন্য মুর্শিদাবাদে গমন করাই বুদ্ধিমানের কাজ। মুসলমান ইতিহাস লেখকগণও সিরাজের সমরক্ষেত্র পরিত্যাগকে সমর্থন করেননি। বোধ হয় পারিপার্শ্বিক অবস্থা এবং সেনাপতিদের ষড়যন্ত্র আঁচ করে শেষ পর্যন্ত কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় সিরাজ দুই সহ¯্র অশ্বারোহী নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে রাজধানী ফিরে গিয়েছিলেন। অন্য দিকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত অবিশ্রান্ত যুদ্ধ করতে করতে মোহনলাল এবং সিনফ্রে বিশ্বাসঘাতক নবাব সেনানায়কদের ওপর বিরক্ত হয়ে সমরক্ষেত্র পরিত্যাগ করতে বাধ্য হলেন। নবাবের পরিত্যক্ত জনশূন্য পটমণ্ডপের দিকে ইংরেজ সেনা মহাদম্ভে অগ্রসর হয়ে, পলাশী যুদ্ধের শেষ চিত্রপট উদঘাটিত করল। সেনাপতিদের বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে এভাবে প্রায় বিনাযুদ্ধে পলাশী প্রান্তরে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়ে গেল।
রাজধানীতে প্রত্যাগমন করতে না করতে সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় কাহিনী চারদিকে বিদ্যুৎবেগে ছড়িয়ে পড়ল। লুণ্ঠন ভয়ে যে যেখানে পারল পলায়ন করতে আরম্ভ করল। মোগল প্রতাপ তখন ধীরে ধীরে অস্তাচলগামী। ভারতবর্ষের রতœ সিংহাসন বালকের ক্রীড়া কৌতুকে পরিণত হয়েছিল। সিরাজউদ্দৌলার রাজধানী রক্ষার জন্য পাত্র-মিত্রগণকে পুনঃপুন আহবান করতে লাগলেন। অন্যের কথা দূরে থাক এমনকি তার শ্বশুর মো: ইরিচ খান পর্যন্ত সিরাজের আহবানে কর্ণপাত না করে ধন রতœ নিয়ে প্রাণরক্ষার ভয়ে পলায়ন করলেন। সকল দিকের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় পরও ভগ্নমনোরথ না হয়ে সিরাজ নিজেই সেনা সংগ্রহের জন্য চেষ্টা করতে লাগলেন। গুপ্ত ধনাগার উন্মুক্ত করা হলো প্রভাত হতে সায়াহ্ন এবং সায়াহ্ন হতে প্রথম রাত্রি পর্যন্ত সেনাদলকে উত্তেজিত করার জন্য মুক্ত হস্তে অর্থদান চলতে লাগল। রাজকোষ উন্মুুক্ত পেয়ে শরীররক্ষক সেনাদল যথেষ্ট অর্থ শোষণ করল এবং প্রাণপণে সিংহাসন রক্ষা করবে বলে ধর্ম প্রতিজ্ঞা করে একে একে পলায়ন করতে আরম্ভ করল।
শেষ প্রচেষ্টাও বিফল হওয়ায় মাতামহের অতিসাধের হিরাঝিলের বিচিত্র রাজপ্রাসাদ এবং বঙ্গ বিহার-উড়িষ্যার গৌরবময় মোগল রাজসিংহাসন পশ্চাদে রেখে নবাব সিরাজউদ্দৌলা পথের ফকিরের ন্যায় রাজধানী হতে বের হয়ে পড়লেন। চির সহচরী লুৎফুন্নেসা বেগম ছায়ার ন্যায় পশ্চাতে পশ্চাতে অনুগমন করতে লাগলেন। সিরাজ স্থলপথে ভগবান গোলায় উপনীত হয়ে, তথা হতে নৌকারোহণে পদ্মার প্রবল তরঙ্গ অতিক্রম করে মহানন্দা নদীর ভেতর দিয়ে উজান বেয়ে উত্তরাভিমুখে চলতে আরম্ভ করলেন। সিরাজউদ্দৌলা যে আত্মপ্রাণ তুচ্ছ করে কেবল স্বাধীনতা রক্ষা করার জন্যই জনশূন্য রাজধানী হতে পলায়ন করেছিলেন, তার পলায়ন তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। কোনোরূপে পশ্চিমাঞ্চলে পলায়ন করে মাসিয়ে লা সাহেবের সেনাসহকারে পাটনা পর্যন্ত গমন করা ও তথায় বিহারের শাসনকর্তা রামনারায়ণের সেনাবল নিয়ে সিংহাসন রক্ষার আয়োজন করাই সিরাজউদ্দৌলার উদ্দেশ্য ছিল। সিরাজের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে গিয়ে মহারাজ মোহন লালও কারারুদ্ধ হলেন। মীর জাফর মোহনলালকে বিদ্রোহী সেনানায়ক রায়দুর্লভের হস্তে সমর্পণ করলেন। মোহন লালকে দীর্ঘকাল কারাক্লেশ ভোগ করতে হলো না। রায়দুর্লভ তার ধনসম্পদ ও জীবনহরণ করে মীর জাফরের আকাক্সক্ষা পূরণ করলেন। ২৯ জুন ২০০ গোরা এবং ৫০০ কালা সিপাহি সমভিব্যাহারে ইংরেজ সেনাপতি মন্সুরগঞ্জ আগমন করেন। ক্লাইভ বলে গেছেন “সে দিন যত লোক রাজ পথের পাশে সমবেত হয়েছিল তারা ইংরেজ নির্মূলে কৃতসঙ্কল্প হলে কেবল লাঠিসোটা এবং ইস্টক নিক্ষেপেই তৎকার্র্য সাধন করতে পারতো।” অতঃপর পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ক্লাইভ মীর জাফরকে মসনদে বসিয়ে দিয়ে, কোম্পানি বাহাদুরের প্রতিনিধিস্বরূপ স্বয়ং সর্বপ্রথমেই ‘নজর’ প্রদান করে মীর জাফরকে বঙ্গ-বিহার-উড়িষ্যার নবাব বলে অভিবাদন করলেন। অন্য দিকে সিরাজউদ্দৌলার খোঁজে চারিদিকে সিপাহি সেনা ছুটে চলল। সিরাজের নৌকা যখন বখর বরহাল নামক পুরাতন পল্লীর নিকটবর্তী হলো, তখন সহসা তার গতিরোধ হলো। আকস্মিক দুর্ঘটনায় সিরাজউদ্দৌলার সর্বনাশের সূত্রপাত হলো। সিরাজ ভেবেছিলেন তার পরাজয়বার্তা তখন পর্যন্তও দূর-দূরান্তে পৌঁছায়নি। সে জন্য নদীতীরে অবতরণ করে খাদ্য সংগ্রহের জন্য নিকটস্থ একটি মসজিদে গমন করলেন। সেখানে দানশা নামক এক মুসলমান সাধু ছিল। মসজিদের লোকে ক্ষুদ্র পল্লীতে সিরাজউদ্দৌলার ন্যায় অতিথিপরায়ণ নৌকা দেখে বিস্ময়াবিষ্ট হয়েছিল। মীর দাউদ ও মীর কাশেমের সেনাদল সেদিন সিরাজের খোঁজে নিকটেই অবস্থান করছিলেন। অর্থলোভে লোকেরা তাদেরকে সিরাজউদ্দৌলার সন্ধান বলে দিল। সিরাজ ক্ষুধার অন্ন গলাধঃকরণ করারও অবসর পেলেন না, সপরিবারে মীর কাশেমের হাতে বন্দী হলেন। নিয়তির কী নিষ্ঠুর পরিণতি!
‘এ-কূল ভাঙে ও-কূল গড়ে, এই তো নদীর খেলা,
সকালবেলা আমীর রে ভাই, ফকির সন্ধ্যাবেলা, এই তো নদীর খেলা।’
মীর কাশিমের নিকট বন্দী হওয়া অবস্থায় সিরাজ ছিলেন নিরস্ত্র, নিঃসঙ্গ। মীর কাশেম লুৎফুন্নেসা বেগমের বহুমূল্যের রতœালঙ্কারগুলো আত্মসাৎ করলেন। আত্মভৃত্যবর্গের নিষ্ঠুর নির্যাতনে জীবমৃত অবস্থায় সিরাজউদ্দৌলা বন্দীবেশে মুর্শিদাবাদে উপনীত হলেন। সিরাজউদ্দৌলার সুকুমার দেহকান্তি নিষ্ঠুর নির্যাতনে মলিন হয়ে উঠেছিল। তাকে দেখামাত্র নাগরিকদের সহানুভূতি উদ্বেলিত হয়ে উঠল। সিরাজকে তার সাধের মুর্শিদাবাদে আনা হলো। যেখান থেকে বহুবার তিনি হুঙ্কার দিয়েছেন ইংরেজদের বিরুদ্ধে। কিন্তু আজ স্বাধীনতাকামী দেশপ্রেমিকের কী নিদারুণ পরিণাম! ক্লাইভের নির্দেশে মীর জাফর সিরাজকে রাজমহল থেকে এনে জাফরাগঞ্জ প্রাসাদে (মীর জাফরের প্রাসাদ যা বর্তমানে নিমকহারাম দেউড়ি নামে পরিচিত) একটা ছোট্ট কুঠরিতে আটক করে রাখলো। পরদিন গভীর রাতে মীর জাফরের পুত্র মীরণের নির্দেশে সিরাজের পিতা-মাতার অতি আদরে পালিত বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা মোহাম্মদী বেগের তরবারির নিষ্ঠুর আঘাতে অত্যন্ত নির্মমভাবে নিহত হলেন। হত্যার সময় ঘাতকের অট্টহাসিতে কেঁপে উঠেছিল জাফরগঞ্জ প্রাসাদ, কেঁপে উঠেছিল মুর্শিদাবাদ। সেদিন বাংলার স্বাধীনচেতা দেশপ্রেমিক নবাব ঘাতকের কাছে প্রাণ ভিক্ষা চেয়ে বাংলাকে, বাংলার জনগণকে অপমানিত করেননি, তিনি শুধু চেয়েছিলেন দুই রাকাত নামাজ পড়ার সময়। কিন্তু সে সময়টুকুও তাকে দেয়া হয়নি।
সেদিন ছিল ৩ জুলাই ১৭৫৭ সাল। সিরাজের রূপ লাবণ্যময় দেহ উপর্যুপরি তরবারির আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত করেছিল মোহাম্মদী বেগ। পরদিন ৪ জুলাই সেই ছিন্নভিন্ন দেহ হাতির পিঠে চাপিয়ে বের করা হলো আনন্দ মিছিল। নেতৃত্বে মীর জাফরের পুত্র মীরণ। চললো রাজপথ পরিভ্রমণ। সেই ভয়ঙ্কর মিছিল দেখে মুর্শিদাবাদের মানুষ শোকে বিস্ময়ে হাহাকার করে উঠল। তাদের আকুল আর্তনাদ নবাবের বেগম মহলে সিরাজ জননী আমিনা বেগমের কর্ণগোচর হয়। তিনি পুত্রশোকে আত্মবিস্মৃত হয়ে অবগুণ্ঠন উন্মোচনপূর্বক রাজপথ অভিমুখে ধাবিত হলেন। যার মুখমণ্ডল দর্শন ছিল যেকোনো লোকের জন্য সৌভাগ্যের ব্যাপার, আজ তিনি পুত্রের শোচনীয় পরিণতির সংবাদে উন্মুক্ত রাজপথে সমুপস্থিত। হাতির পৃষ্ঠ হতে পুত্রদেহ নামিয়ে তিনি তা পুনঃপুন চুম্বন করতে লাগলেন এবং বুকে জড়িয়ে ধরে মাটিতে শুয়ে পড়লেন। নিষ্ঠুর মীরণের নির্দেশে তার অভদ্র দ্বাররক্ষীগণ চড়-কিল-ঘুসি মেরে নবাবের কন্যা ও স্ত্রী এবং সন্তানের মৃতদেহ বক্ষে ধারণ করা মা আমিনা বেগমকে জোর করে অন্দরমহলে পাঠিয়ে দিল।
অতঃপর সিরাজের দলিত-মথিত লাশ কবর দেয়ার কোনো ব্যবস্থা না করে বাজারের আবর্জনা স্তূপের মধ্যে ফেলে দেয়া হলো। সারাদিন সিরাজের লাশ পড়ে রইল মুর্শিদাবাদের বাজারের সেই আবর্জনা স্তূপের মধ্যে। নবাবের মৃতদেহের ওপর একটি সামান্য কাপড়ের আচ্ছাদনও দেয়ার কেউ প্রয়োজন অনুভব করল না। ভয়ে কেউ লাশের কাছে আসছিল না। এই সময় মির্জা জয়নুল আবেদীন নামে এক দয়ালু ওমরাহ মীর জাফরের কাছে আরজি জানালেন ‘আপনাদের যা লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল তাতো সাধিত হয়েছে। এবার দয়া করে মৃতদেহটি দাফনের জন্য আমাকে অনুমতি দিন।’ মির্জা জয়নুল আবেদীন মানুষটি অত্যন্ত যতœ ও সম্মানের সাথে বুকে তুলে নিলেন হতভাগ্য নবাব সিরাজউদ্দৌলার ছিন্ন ভিন্ন দেহ। তারপর সম্মানের সাথে লাশ ধুয়ে মুছে নৌকায় তুলে ভাগীরথী পাড়ি দিয়ে চললেন খোশবাগে। খোশবাগ ছিল নবাব আলীবর্দী খানের আনন্দ-উদ্যান। এই খোশবাগের গোলাপ বাগানের এক প্রান্তে দাদু আলীবর্দী খানের কবরের পাশে অত্যন্ত সযতেœ মাটিতে অন্তিম শয়ানে শুইয়ে দিলেন বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার লাশ। বাংলার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিকে বুকে নিয়ে সেই থেকে খোশবাগ নীরব-নিথর-নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সিরাজ হত্যা নাটকের সমাপ্তির পর জাফর-ক্লাইভ-মীরণ গংদের নির্দেশে নবাব আলীবর্দী খানের বৃদ্ধা মাতা, সিরাজের খালা ঘসেটি বেগম, সিরাজের মাতা আমিনা বেগম, সিরাজের স্ত্রী লুৎফুন্নেসা বেগম ও তার শিশুকন্যাকে সাধারণ বন্দীর মতো ঢাকার বুড়িগঙ্গা তীরের জিঞ্জিরা প্রাসাদে রক্ষীদল কর্তৃক নিয়ে আসা হয়। জিঞ্জিরার নীরব নিভৃত বন্দিশালায় পাঠিয়েও মীর জাফর নিশ্চিত থাকতে পারেননি। ঢাকার ফৌজদার জসারত খানকে গোপনে নির্দেশ পাঠিয়ে ছিলেন তাদের গুপ্তভাবে হত্যা করার জন্য। জসারত খান এ দায়িত্ব পালনে অপারগতা প্রকাশ করলেন। মীর জাফর পুত্র মীরণ জসারত খানের বেয়াদবিতে অসন্তুষ্ট হয়ে তাকে নির্দেশ দিলেন রক্ষীদলের নায়ক বাকীর খানের মাধ্যমে বেগমদের যেন মুর্শিদাবাদে পাঠিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। অন্য দিকে বাকীর খানের ওপর গোপন নির্দেশ ছিল বেগমদের নৌকায় করে ধলেশ্বরী নদীর অতল গর্ভে সলিল সমাধি করতে। পরিকল্পনামাফিক এক গভীর নিশিথে সিরাজের খালা ঘসেটি বেগম ও মাতা আমিনা বেগমকে জিঞ্জিরার প্রাসাদ থেকে বের করে একটি নৌকায় ওঠানো হলো। তারা আশ্বাস পেয়েছিলেন তাদের মুর্শিদাবাদে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সিরাজ জননী আমিনা বেগম জীবনের শেষ সম্বল কুরআন শরীফ বুকে ঝুলিয়ে তাসবিহ হাতে নিঃসঙ্কোচে নৌকায় আরোহণ করলেন। ওদিকে ষড়যন্ত্রকারীরা আগে থেকেই নৌকায় কয়েকটি ছিদ্র করে ছিদ্রগুলি গোঁজ দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছিল। গভীর রাতে নৌকা ধলেশ্বরীর মধ্যস্থলে উপস্থিত হলে অনুচরেরা নৌকার গোঁজগুলি খুলে দিয়ে অন্য নৌকায় আরোহণ করে পলায়ন করলো। দু’জন সম্ভ্রান্ত মহিলাকে বহনকারী নৌকাটি ধীরে ধীরে ধলেশ্বরীর অতল তলে ডুবে গেল। দু’জন ভাগ্য বিতাড়িতা নির্দোষ মহিলার জীবন মহাকালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেল।
কথিত আছে যে মীরণ তার ভবিষ্যতের সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী সিরাজের ছোটভাই মির্জা মেহেদীকেও নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। শোনা যায় যে মেহেদীর শরীরের দুই পার্শে দু’টি কাঠের তক্তা বেঁধে দুই পাশ দিয়ে প্রচণ্ড চাপ দিয়ে তাকে হত্যা করা হয়।
বন্দী অবস্থায় সিরাজপতœী লুৎফুন্নেসা বেগম তার শিশুকন্যা উম্মে জহুরাকে নিয়ে মুর্শিদাবাদে যেতে রাজি হননি। এর একটা চমকপ্রদ কারণও আছে। সব বন্দী জিঞ্জিরা থাকাকালে মীরণের মাথায় এক নতুন ভূত চেপেছিল। তিনি লুৎফুন্নেসা বেগমকে বিয়ে করার প্রস্তাব পাঠালে লুৎফুন্নেসা তার জবাব দিলেন এই বলে ‘যে নারী চিরকাল হাতির পিঠে চড়ে অভ্যস্ত তার কি কখনো গাধার পিঠে চড়তে ইচ্ছা করে?’ তিনি তার চার বছরের শিশুকন্যাসহ বেছে নিয়েছেন ঢাকার জিঞ্জিরার লাঞ্ছিত অপমানিত কারাজীবন, কষ্টের জীবন বেছে নিয়েছেন তবুও মীরণের মতো একটা হীনমন্য অমানুষের কাছে আত্মসমর্পণ করেননি। সিরাজের সাথে বিপদে-আপদে, সুখে-দুঃখে, সকল দুঃসময়ে এই মহীয়সী নারী তাকে সান্ত্বনা দিয়েছেন। পলাশীতে বিপর্যয়ের পর নবাব যখন ছুটে এসছেন মুর্শিদাবাদে সবাই যখন তার কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন, তখন নিঃসঙ্গ নবাবের সেই বেদনাবিধুর সময়ে নিঃসঙ্কোচে তার সঙ্গী হয়েছেন বেগম লুৎফুন্নেসা। জীবনেও তিনি যেমনি ছিলেন নবাবের সঙ্গিনী, নবাবের মৃত্যুর পরও তিনি ছিলেন তার সঙ্গিনী। বেগম লুৎফুন্নেসার শুধু একটা মাত্র আর্জি ছিল জীবনের বাকি দিনগুলি তিনি তার স্বামী সিরাজের কবরের পাশে কাটাতে চান। বহু অনুনয় বিনয় করার পর সিরাজের মৃত্যুর আট বছর পর তিনি তার স্বামীর কবরের পাশে বসবাসের অনুমতি পেলেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি খোশবাগে স্বামীর কবরের পাশে অত্যন্ত দীন-হীনভাবে জীবন যাপন করেছেন। এভাবেই সিরাজের জন্য হাহাকার করতে করতে একদিন মৃত অবস্থায় লুৎফুন্নেসাকে পাওয়া গেল স্বামীর কবরের ওপর। নবাব সিরাজউদ্দৌলার কবরের দক্ষিণে তার পায়ের কাছে সমাহিত করা হয়েছে মহীয়সী লুৎফুন্নেসাকে।
১৭৬৫ সাল থেকে ১৭৮৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২১টি বছর তিনি অনাহারে-অর্ধাহারে খোশবাগে স্বামীর কবরের পাশে নিঃসঙ্গ জীবন কাটিয়েছেন একটি মাত্র কন্যাকে অবলম্বন করে। এ কথা ভাবতে আজও গা শিউরে ওঠে। এ-ও কি কল্পনা করা যায়?
দেশের জন্য যারা জীবন দেয় তারা মরেও অমর। পলাশীর বিয়োগান্তক ঘটনার ২৫৭ বছর পরও আজ সিরাজউদ্দৌলা বাংলার ঘরে ঘরে একটি জনপ্রিয় নাম। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সিরাজউদ্দৌলা সাফল্য লাভ করেননি সত্য কিন্তু তিনি দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি। জীবন দিয়েছেন তবু দেশকে তুলে দেননি বিদেশী সাম্রাজ্যবাদের হতে। নবাব সিরাজ কখনো ষড়যন্ত্রের পথ ধরে ক্ষমতায় আসেননি। ষড়যন্ত্র আর হঠকারিতার মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে থাকার চেষ্টাও করেননি। বরং স্বাধীনতার জন্য শাহাদাত বরণ করে ইতিহাসের স্বর্ণশিখরে নিজের জায়গা করে নিয়েছেন। তাইতো সিরাজউদ্দৌলা এবং দেশপ্রেম শব্দ দু’টি সমার্থক হয়ে এক অন্যের পরিপূরক হয়ে আছে। যেমন সমার্থক শব্দ হচ্ছে মীর জাফর ও বিশ্বাসঘাতকতা। মানুষের মনের মণিকোঠায় অবস্থানরত একটি অমর কিংবদন্তি হচ্ছে সিরাজউদ্দৌলা।
‘উদয়ের পথে শুনি কার বাণী
ভয় নাই ওরে ভয় নাই
নিঃশেষে প্রাণ যে করিছে দান
ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।’
সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলার যে স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম, চড়াইÑউৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের হাত থেকে বাংলা মুক্ত হয়। গঠিত হয় ভারত ও পাকিস্তান নামে আলাদা দু’টি রাষ্ট্র। তারও ২৪ বছর পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধের মধ্য দিয়ে একসাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা অর্জিত হয়। ২০২১ সালে সেই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপিত হওয়ার কথা। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতা ছিল দীর্ঘ দুই শ’ বছরের গোলামির জিঞ্জিরে আবদ্ধ থাকা হাঁপিয়ে ওঠা এ দেশের জনগণের জন্য আধিপত্যবাদীদের প্রদত্ত করুণা বা সান্ত্বনা আর ’৭১ সালের দীর্ঘ ৯ মাসের যুদ্ধের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর মানচিত্রে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় হলো এক আধিপত্যবাদীদের কবল থেকে মুক্ত হয়ে আরেক আধিপত্যবাদীদের কবল থেকে মুক্ত হওয়ার জোরালো সংগ্রামের অনিবার্য পরিণতি। কিন্তু প্রকৃত অর্থে আধিপত্যবাদ কিংবা সাম্রাজ্যবাদ হতে আজও আমাদের উত্তরণ হয়নি। পলাশী ট্র্যাজেডির পর থেকে এখনো আমরা বিদেশীদের কৃপা ও অনুগ্রহের পাত্র রয়ে গেছি। ব্যবসায়-বাণিজ্যে তাদের পদানত থেকে গেছি। যে সম্পদ বিদেশীরা এ দেশ থেকে লুট করে নিজ দেশে শিল্প বিপ্লব ঘটিয়েছে আমরা সে সম্পদের অংশীদার না হয়ে জোগানদাতা রয়ে গেছি। আমাদের সম্পদের জন্য তথা বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য আমরা তাদের কাছে হাত পাতছি। রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যে সুদূরপ্রসারী সাম্রাজ্যবাদী বিদেশীরা আমাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে আজও আমরা সে সাম্রাজ্যের পদতলে পিষ্ট হচ্ছি। যে শিক্ষা ও আইন ব্যবস্থার বিস্তৃতি তারা এ দেশে ঘটিয়েছিল তার আলোকে আমাদের দৈনন্দিন কার্যনির্বাহ ও বিচার প্রশাসন চলছে। উপরন্তু সাম্রাজ্যবাদের কালো থাবা এখন শুধু ইউরোপ থেকেই পড়ছে না; আরো ভয়ঙ্করভাবে পড়ছে আমেরিকা থেকেও। ফলে আমরা আগে গোলামি করতাম এক সাম্রাজ্যবাদের আর এখন নতুন নতুন সাম্রাজ্যবাদের কাছে আমাদের আত্মসমর্পণ করতে হচ্ছে।
পলাশী বিপর্যয়ের ২৫৭ বছর পর আজও স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ নিয়ে পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, বাস্তব পরিস্থিতি তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। দিন দিনই বাংলাদেশ একটি দুর্বল রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে। বাংলাদেশের ব্যবসায় বাণিজ্য থেকে শুরু করে প্রায় সমগ্র অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডই নিয়ন্ত্রণ করছে এমন ব্যক্তিরা যারা বাংলাদেশের স্বাধীন জাতিসত্তায় কতটা বিশ্বাসী তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অন্য দিকে রয়েছে বাংলাদেশকে অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করার অব্যাহত প্রচেষ্টা। জাতিসত্তাবিরোধী এনজিওদের অপতৎপরতা চলছে বেপরোয়াভাবে। তা যেন এ যুগের জগৎশেঠ, উমিচাঁদ। স্বাধীনতার ৪২ বছরেও আমরা পারিনি সার্বজনীন ও সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য কোন শিক্ষানীতি প্রণয়ন করতে। যার মাধ্যমে সৎ, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক প্রজন্ম তৈরি হবে। গড়ে ওঠেনি স্বাধীন অস্তিত্ব বজায় রাখতে নিজস্ব শক্তিশালী অর্থনৈতিক অবকাঠামো। আমরা পারিনি নিজস্ব সাংস্কৃতিক চর্চার বিকাশ ঘটাতে। বারবার জনগণকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করতে হয়েছে এবং এখনও করতে হচ্ছে। কখনো বাকশাল, কখনো স্বৈরাচার, কখনো গণতন্ত্রের লেবাসে ফ্যাসিবাদের কবলে পড়েছে বাংলাদেশ। রাজনৈতিক চোরাবালিতে বিপন্ন হয়েছে গণতন্ত্র। ক্ষমতায় এসেছে সামরিক বাহিনী, নির্যাতিত, নিগৃহীত, অপমানিত ও লাঞ্ছিত হয়েছেন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। ক্ষমতার লিপ্সা বা উচ্চাভিলাষী মনোভাব আজও আমাদের কুরে কুরে খাচ্ছে। গণতন্ত্রের লেবাসে আজ পচন ধরতে শুরু করেছে। ফলে আজ পর্যন্ত গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় দাঁড় করানো সম্ভব হয়নি। স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোয় চলছে দলবাজির খেলা। পরস্পরকে গালমন্দ, ভর্ৎসনা, কুৎসা রটনা, খাটো করার প্রশিক্ষণ যত হয়েছে তার তুলনায় দেশপ্রেমের প্রশিক্ষণ নেই বললেই চলে। কিন্তু কেন আজ আমাদের এই দুরবস্থা? এর কারণ আমরা আমাদের জাতিসত্তাকে এমনভাবে বিসর্জন দিয়েছি যে, সামান্য স্বার্থের লোভে আমাদের হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। জাতীয় স্বার্থের চাইতে দলীয় স্বার্থ, তার চাইতেও ব্যক্তিস্বার্থ আমাদের কাছে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। দেশপ্রেমিকের ছদ্মবেশে আমাদের স্বার্থান্বেষী নেতৃবৃন্দ কথায় কথায় বিদেশীদের তোষণ করছেন; তারা নিজেদের জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছেন বিদেশী দূতাবাসে বসে। বিদেশী দূতদের চায়ের দাওয়াতকে তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের নিয়ামক মনে করেন। সামান্য ব্যক্তিস্বার্থের লোভে জাতীয় সম্পদ উত্তোলনের দায়িত্ব অযোগ্য বিদেশী কোম্পানির হাতে তুলে দিয়ে দেশের শত শত কোটি টাকার জাতীয় সম্পদ বিনষ্ট করছেন। সুশীলসমাজের ছদ্মাবরণে এক শ্রেণীর অতি-উৎসাহী বুদ্ধিজীবী রয়েছেন যারা প্রতিনিয়ত জাতীয় ঐক্য বিনষ্টে কলকাঠি নেড়ে যাচ্ছেন। যারা এক দিকে গণতন্ত্রের কথা বলছেন, অন্য দিকে জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়াই অবৈধ সরকারের পদলেহন করে চলছেন। তারা জাতিকে অন্ধকারে রাখার মানসিকতা নিয়ে দালালি করছেন। এরা ঐ শ্রেণীর বুদ্ধিজীবীদের সমকক্ষ যারা ‘অন্ধকূপ নাটক’ সাজিয়ে পলাশীর যুদ্ধের অনিবার্যতা তৈরি করেছিল। পলাশীর প্রান্তরে যখন সিরাজউদ্দৌলার পতনের মধ্য দিয়ে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হওয়ার আশঙ্কা দৃশ্যমান দেখা যাচ্ছিল তখন বুদ্ধিজীবীরা এতই উদাসীন ছিলেন যে, তারা দেশপ্রেমিক নবাবের মৃত্যুকে নিছক ক্ষমতার হাত বদল বলেই ভেবেছিল। নবাবের লাশকে যখন মুর্শিদাবাদের রাস্তায় ঘুরানো হয়েছিল আর জনমনে তার প্রতি ঘৃণা এবং অশ্রদ্ধা সঞ্চারের চেষ্টা চলছিল, তখন প্রকৃত সত্যকে জনতার কাছে এবং ইতিহাসের পাতায় তুলে ধরার জন্য দায়িত্বশীল কণ্ঠ বা কলম বা নেতৃত্ব তখন পাল্টা প্রতিবাদ করতে ব্যর্থ হয়েছে। আজও সুশীলসমাজের নামে এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবী জাতিকে বিভক্ত ও জাতীয় ঐক্যকে বিনষ্ট করার জন্য সাম্প্রদায়িকতার শ্লোগানকে সামনে এনে এক ভয়ঙ্কর খেলায় মেতে উঠেছেন। এর পরিণতি কত ভয়াবহ দিকে যাবে তা তারা জেনেও না জানার অভিনয় করছেন। তারা বাংলাদেশে জঙ্গি, সন্ত্রাসী, মৌলবাদের কথা বেশি প্রচার করে সুপরিকল্পিতভাবে এ দেশে আধিপত্যবাদী গোষ্ঠীর হস্তক্ষেপের পরিবেশ তৈরি করতে ভূমিকা পালন করে চলছেন। কথিত আছে এ ভূমিকা পালন করতে গিয়ে তারা নিয়মিত মাসোহারাও পেয়ে থাকেন। এসবই হলো এ যুগের জগৎশেঠ, রায়দুর্লভ, উমিচাঁদ, রাজবল্লভ মীর জাফরদের কার্যকলাপ। দুঃখজনক হলেও সত্য যে পলাশীর বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে সেদিন স্বাধীনতার শত্রুদের সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি যার প্রেক্ষিতে জাতির অলক্ষ্যে জাতির স্বাধীনতা হারিয়ে গিয়েছিল কিন্তু এ যুগের জগৎশেঠদের আমরা ভালোভাবেই চিনি। কিন্তু তার পরও তাদেরকে আমরা নেতা বানাই, তাদের হাতে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দেই। তাদেরকে জাতির কর্ণধার মনে করি এবং তাদেরকে দিয়ে আমাদের ভাগ্যোন্নয়নের চেষ্টা করি। এ যেন পলাশী ট্র্যাজেডির অবিরাম ঘটনাপ্রবাহ।
পলাশী ট্র্যাজেডির পোস্টমর্টেম করলে দেখা যায় ঘরের শত্রুর সহায়তা ছাড়া বাইরের শত্রু বড় ধরনের ক্ষতি করতে পাওে না। আর এই ঘরের শত্রুকে চিনতে না পারা এবং বিশ্বাসঘাতকের পবিত্র গ্রন্থ ছুঁয়ে করা শপথকে বিশ্বাস করাই ছিল পলাশী ট্র্যাজেডির মূল কারণ। আজও কি সেই ষড়যন্ত্রকারীদের হাত থেকে আমরা মুক্ত হতে পেরেছি? পারিনি। আজও চলছে সেই একই ষড়যন্ত্র। শুধু পাল্টেছে কুশীলব। ১৭৫৭ সালের বাংলার মতোই আজকের বাংলাদেশের ভেতরে-বাইরে চলছে এক ধরনের ষড়যন্ত্র। সময়ের সাথে সাথে পাল্টেছে ষড়যন্ত্রের ধরন। একদা অর্থসম্পদ হলেও আজ তাদের লক্ষ্য এ দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য, ধর্ম-সংস্কৃতি ও সামাজিক মূল্যবোধ, যা ধ্বংস করা গেলেই সম্ভব এ দেশ ও জাতির অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধক্ষমতাকে ধ্বংস করা। এ পরিস্থিতিতে একটি আত্মনির্ভরশীল জাতিগঠনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারলে পলাশীর বিপর্যয় থেকে যথাযথ শিক্ষা গ্রহণ করা হয়েছে বলে মনে করা যাবে। নয়তো ইতিহাসের সেই নির্মম সত্যই বাস্তবে পরিণত হবে যে, ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেয়ার কারণেই বিপর্যয় নেমে আসে। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে আজ আমাদেরকে নব্য মীর জাফর, জগৎশেঠ ও রায়দুর্লভদের চিহ্নিত করতে হবে। যারা নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থে দেশ-জাতির স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিতে তৎপর যারা দেশের সার্বভৌমত্বকে বিকিয়ে দেয়ার জন্য ভিনদেশীদের সবকিছু উজাড় করে দিতে প্রস্তুত, যারা জাতির সামনে চোখের পানি ফেলে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে লেন্দুপ দর্জির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব নস্যাতে ভূমিকা রেখে চলছেন। এর পাশাপাশি সিরাজের সুযোগ্য উত্তরসূরিদের সহযোগিতা করাও জরুরি। সিরাজ এ দেশের দেশপ্রেমিকদের প্রেরণার অন্যতম প্রধান উদ্দীপক। সিরাজ আমাদের স্বাধীন অস্তিত্বের প্রতীক, আমাদের জাতীয় বীর।
লেখক : সেক্রেটারি জেনারেল,
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

SHARE

Leave a Reply