পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আগ্রাসন এবং আমাদের করণীয়

আহসান হাবীব ইমরোজ

একবিংশ শতাব্দীর সূচনাতেই বিশ্ব পরিস্থিতি ঠাণ্ডা লড়াই থেকে লড়াইয়ের দিকে মোড় নিয়েছে। আজ দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ায় একটি দেশের সংস্কৃতিই হচ্ছে আগ্রাসী শক্তির প্রধান টার্গেট। সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের লক্ষ্যই হলো টার্গেটকৃত জাতিকে আত্মপরিচয় বিস্মৃত, শিকড়-বিচিছন্ন একদল মানুষে পরিণত করা, যারা গোলামিকে হাঁটু পেতে মেনে নেবে। ভৌগোলিক আগ্রাসনের লৌহজালও প্রতিরোধ করা সম্ভব; কিন্তু মানসিকভাবে গোলাম হয়ে পড়া নতজানু জাতিকে উদ্ধার করা সাধ্যাতীত বিষয়। সমসাময়িক আগ্রাসী শক্তির কাছে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের গুরুত্ব তাই একটি টপ এজেন্ডা। এই প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আগ্রাসন তথা অপসংস্কৃতির সয়লাব থেকে উত্তরণ এবং স্বকীয় সংস্কৃতির সর্বোচ্চ বিকাশ একটি মৌলিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কবি আল্লামা ইকবালের ভাষায় আমরা সেই বিশেষণেরই বিচ্ছুরণ দেখতে পাই :

“হারায় গরিমা সম্মান,-জাতি
আকাশ-খিলান তলায়
হারায় যখন সে আত্মজ্ঞান

ধর্মে; কাব্যকলায়।”

বাংলাদেশ : জাতিসত্তা ও তার বিকাশধারা
আমাদের জাতির সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল জানার জন্য জাতিসত্তা এবং তার বিকাশধারা জানা একান্ত জরুরি। আমাদের অতীতের দিকে তাকালে এক স্বর্ণোজ্জ্বল ঐতিহ্যের প্রেক্ষাপট দেখতে পাই।
“আলেকজান্ডারের সমসাময়িক গ্রিক বিবরণীতে গঙ্গার পূর্বদিকে গঙ্গারিড়ী নামে এক শক্তিশালী রাজ্যের উল্লেখ পাওয়া যায়। ‘খ্রিষ্টপূর্ব দু’হাজার বছর আগে বেবিলনীয় সেমিটিক গোষ্ঠীরা সিন্ধু-পাঞ্জাব থেকে দক্ষিণ ভারত হয়ে বাংলাদেশে আসে ও বসতি স্থাপন করে। এই দ্রাবিড় মঙ্গোলীয় মিশ্রণ থেকে যে সভ্যতার সৃষ্টি হয়েছিল, সেটাই আজকের বাংলাদেশের সভ্যতা।’’
রাজা লক্ষণ সেনের ভয়াবহ অত্যাচারে মুসলিম, বৌদ্ধ এমনকি নিম্নবর্ণের হিন্দুদের জীবন অতিষ্ঠ ছিল। বৌদ্ধদের স্থাপনাসহ নিঃশেষ করা হয়। ড. দীনেশচন্দ্র সেন লিখেন, “যে জনপদে (পূর্ববঙ্গ) এক কোটির অধিক বৌদ্ধ বাস করিত, সেখানে একখানি বৌদ্ধ গ্রন্থ ত্রিশ বছরের চেষ্টায় পাওয়া যায় নাই।” বিশ্বেশ্বর চৌধুরী লিখেছেন : “…বৌদ্ধ ধর্ম ও সমাজের অবলুপ্তি …কঠোর হস্তের একটি নির্মম হত্যাকাণ্ড।”

সোনারবাংলা : একটি প্রাচীন সমৃদ্ধ সভ্যতা
১২০৩ সালে বখতিয়ার খিলজী বাংলার রাজধানী আক্রমণ করলে লক্ষণ সেন পলায়ন করেন। এতে মুসলিমদের সাথে বৌদ্ধ এবং নিম্নবর্ণের হিন্দুরাও আনন্দোৎসব করে “…কারণ ইসলাম কোন জাতির ধর্ম নয়, …। ইহা অন্যকে জয় করেই ক্ষান্ত হয় না, কোলে তুলে নেয় ” অতঃপর মুসলমানদের সাড়ে পাঁচ শ’ বছর শাসনকালে বাংলাদেশ পৃথিবীর কাছে পরিচিত হয় ‘দুনিয়ার জান্নাত’ নামে। ইবনে বতুতা বাংলাকে বলেছেন “পৃথিবীর সবচেয়ে সম্পদশালী দেশ।” চীনা রাজ-প্রতিনিধিরা বলেছেন, “সপ্ত স্বর্গ এই রাজ্যে পৃথিবীর স্বর্ণরাজি ছড়িয়ে রেখেছে”। সম্রাট বাবর বলেছেন…“বাংলা মুলুক অঢেল প্রাচুর্যের দেশ।” সম্রাট হুমায়ুন “গৌড় দেখে নগরীর নতুন নাম রাখেন ‘জান্নাতাবাদ’।” মানরিক বলেন, “বাংলায় তখন স্বর্ণ-রৌপ্য মুদ্রার ছড়াছড়ি ছিল।” ফরাসি পর্যটক বার্নিয়ার লিখেন, “বাংলা মুলুক হিন্দুস্থানের সর্বাপেক্ষা সম্পদশালী অঞ্চল এবং পৃথিবীর সবচেয়ে সমৃদ্ধ দেশ।”

পলাশী-পরবর্তী দোজখের বিভীষিকা
১৬০০ সালে ইংরেজ বণিকদের আগমন শুরু হয়। “খ্রিষ্টান ও মুসলমানদের মধ্যে দীর্ঘদিন ক্রুসেড যুদ্ধ চলার ফলে এই ইউরোপীয় বণিকরা মুসলমানদেরকে শত্র“ ভাবতো। তারা এ দেশে আসে এক হাতে বাইবেল ও আরেক হাতে তরবারি নিয়ে।”
১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধের পর বাংলার মানুষের ভাগ্যে দোজখের বিভীষিকা নেমে আসে। “ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সারা বাংলার সম্পদ কলকাতায় জড়ো করে। তারপর তা পাচার হয়ে যায় ইংল্যান্ডে। বাংলাদেশের লুটের টাকায় ১৭৬০ সালের পর থেকে ইংল্যান্ডে শিল্প-বিপ্লব সৃষ্টি হয়।” এ ব্যাপারে কার্ল মার্কসের মন্তব্য উল্লেখযোগ্য, “অনধিকার প্রবেশকারী ইংরেজরাই বাংলাদেশের তাঁত ও তকলি ভেঙে চুরমার করে।”
১৭৭০ সালে (বাংলা ১১৭৬ ) দুর্ভিক্ষের ভয়াবহ বিবরণ দিয়ে এল এস এসও মলি লিখেছেন : “চাষীরা ক্ষুধার জ্বালায় তাদের সন্তান বিক্রি করতে বাধ্য হলো। কিন্তু কে তাদের কিনবে … বহু এলাকার জীবিত লোকেরা মরা মানুষের গোশত খেয়ে জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করেছে। নদী-তীর লাশ আর মুমূর্ষুদের দেহে ছেয়ে গিয়েছিল।… মুমূর্ষু লোকদের দেহের গোশত শিয়াল-কুকুরে খেয়ে ফেলতো।”
মুসলিম আমলে বাংলা ছিল মুঘল সাম্রাজ্যের শস্যভাণ্ডার। ইংরেজ শাসনে সেখানে প্রতি ষোল জনে ছয় জনের মৃত্যু হয়। এডমন্ড বার্ক এটাকে ‘মৃত্যুর শাসন’ বা নেকড়ের শাসন নামে অভিহিত করেছেন।”

আন্দোলনের পথ বেয়ে স্বাধীনতা
পলাশী যুদ্ধের ফলাফল সম্পর্কে ক্লাইভ তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন : ‘‘সেদিন স্থানীয় অধিবাসীরা ইউরোপীয়দেরকে প্রতিরোধ করতে চাইলে লাঠিসোটা আর ঢিল মেরেই ইংরেজদের খতম করে দিতে পারতো।’’ কিন্তু না, জনগণ ইংরেজদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়নি। কারণ জনগণ সচেতন ছিল না।
অতঃপর এ দেশে একের পর এক ফকির বিদ্রোহ, কৃষক বিদ্রোহ, ফরায়েজী আন্দোলন, জিহাদ আন্দোলনের পথ বেয়ে একশ নব্বই বছর পর জনগণ আবার ফিরে পায় তাদের স্বাধীনতা। এভাবে ঘাত-প্রতিঘাত অতিক্রম করে অগ্রসর হতে থাকে আমাদের গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি।

সংস্কৃতি কাকে বলে
ফুলের যেমন সৌরভ, মানুষের তেমন সংস্কৃতি। এটি যেন জাতির ব্যক্তিত্ব।
বাংলা সংস্কৃতির উৎপত্তি সংস্কার থেকে। সংস্কার অর্থ বিশুদ্ধীকরণ। দেহ, মন, হৃদয় ও আত্মার উৎকর্ষ সাধনই সংস্কৃতি। ইংরেজিতে একে কালচার বলে। কালচার শব্দটা এসেছে জার্মান CULTURA শব্দ থেকে। CULTURA এর অর্থ CULTIVATION বা কর্ষণ।
“ইংরেজি সাহিত্যে কালচার শব্দটা প্রথম আমদানি করেন ফ্রান্সিস বেকন ষোল শতকের শেষ দিকে। তাকে ডিফাইন করার চেষ্টা করেন সর্বপ্রথম ম্যাথু আর্নল্ড ইংল্যান্ডে এবং ইমার্সন আমেরিকায় উনিশ শতকের মাঝামাঝি। …ইংরেজিতে যাকে বলা হয় রিফাইনমেন্ট, আরবিতে তাহযিব, সংস্কৃতি শব্দটা সেই অর্থে ব্যবহার করা যাইতে পারে।”
সংস্কৃতির সংজ্ঞা দিতে গিয়ে প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী Taylor বলেন, Culture is that complex whole which includes knowledge, belief, art, morals, law, customs and any other capabilities and habits acquired by man as a member of society… Maciver এর মতে “Culture is what we are.” এ সজ্ঞাটি সংক্ষিপ্ত হলেও সংস্কৃতি যে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনপদ্ধতি সে দিকেই ইঙ্গিত প্রদান করে।
১৯৮২ সালে মেক্সিকো শহরে ইউনেস্কো একটি সম্মেলন করে। এতে সংস্কৃতির একটি সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয় । সেখানে বলা হয় :
“ব্যাপকতর অর্থে সংস্কৃতি হচ্ছে একটি জাতির আত্মিক, বস্তুগত, বুদ্ধিগত এবং আবেগগত চিন্তা এবং কর্মধারার প্রকাশ। শিল্প ও সাহিত্যই সংস্কৃতির একমাত্র অন্তর্ভুক্ত বিষয় নয়। মানুষের জীবনধারাও সংস্কৃতির অঙ্গ। মানুষের অধিকার, মূল্যবোধ, ঐতিহ্য এবং বিশ্বাসও সংস্কৃতির অঙ্গ।…

বাংলাদেশের সংস্কৃতি : বাঙালি জাতীয়তার প্রতীক
সাবেক  রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস বলেন, “আমাদের সংস্কৃতিতে আমাদের জনগণের আবহমান লালিত আদর্শ, বিশ্বাস, ইতিহাস, ঐতিহ্য, জীবনাচার ও জীবনপদ্ধতি বিধৃত হবে, এটাই স্বাভাবিক।”
সম্প্রতি প্রকাশিত আমেরিকান পণ্ডিত রিচার্ড এস ইন্টেনের The Rise of Islam and the Bengal Frontier 1214 to 1760 গবেষণামূলক বই প্রকাশিত হয়েছে। এতে তিনি বলেছেন যে,
“জঙ্গলের এলাকাকে বসতির জন্য দেয়া হতো। শর্ত ছিল একটা করে মসজিদ গড়ার। সেই হিসেবে তাদেরকে লাখেরাজসহ নানা রকম সনদ দেয়া হতো। এভাবে মুসলমানেরা জঙ্গল এলাকাকে আবাদ করেন। … এ দেশের সংস্কৃতিতে ইসলামের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে এটি অনস্বীকার্য বাস্তবতা।
৭৫০ থেকে ১১৬০ সাল পর্যন্ত ছিল পাল যুগ অতঃপর সেনযুগ। যে সময়গুলো বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জীবনে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষীতিমোহন শাস্ত্রী এ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন।
“গোপাল সিংহাসনে বসেই জাতিভেদ প্রথার বিলোপ সাধন করেন।…অতঃপর সেনরা প্রায় পঁচাত্তর বছর শাসন করেছিল। অত্যন্ত নিষ্ঠুর আকারে জাতিভেদ প্রথা প্রবর্তন করে বৌদ্ধদের উৎখাত করার চেষ্টায় সকল শক্তি নিয়োগ করে তারা যে কঠোরতার নিদর্শন রেখে গেছে তা বাংলা সংস্কৃতির মধ্যে প্রভাব বিস্তার করেছিল।”
তবে এ অবস্থা খুব বেশি দিন টিকেনি। বখতিয়ারের বঙ্গবিজয়ের মধ্য দিয়েই এর পরিবর্তন ঘটে ।

মূলত বাংলাদেশই বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ধারক ও বাহক, জীবন-সায়াহ্নে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তা স্বীকার করেছেন : “পূর্ব বাংলা এবং পশ্চিম বাংলা, দ্রাবিড় বাংলা এবং গৌড়ীয় বাংলা; এই যে তফাৎটা ছিল, এটা শুধু ভৌগোলিক বিভাজন নয়, এটা একটা অন্তরের বিভাজনও ছিল। এতকাল যে আমাদের বাঙালি বলা হয়েছে, তার সংজ্ঞা হচ্ছে আমরা বাংলা বলে থাকি।” সেই ’৪৭ সালেই ওপারের সব বাবুরা বঙ্গমাতাকে নিয়ে কান্না ছেড়ে ভারতমাতার কোলে ধরনা দিয়েছেন। আবুল মনসুর আহমদের ভাষায়, “এই ভাবে সুরেন্দ্রনাথ, বিপিন পাল, আশুতোষ, চিত্তরঞ্জন, শরৎচন্দ্র, সুভাষচন্দ্র ও বিশেষ করিয়া প্রফুল চন্দ্রের দেখা বাংলার জাতিত্ত্ব, ব্যক্তিত্ব, আমিত্ব, মন ও আত্মার যে জীবন্ত প্রতীক মহাভারতীয় জাতিত্ব, ব্যক্তিত্ব ও আত্মার নিঃসীম দিগন্তে হারাইয়া গিয়াছিল, একমাত্র ফজলুল হকের  বেলায় তা ঘটে নাই।” আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র বিষয়টি খোলাসা করার জন্য বলেন, “ফজলুল হক মাথার চুল হইতে পায়ের নখ পর্যন্ত খাঁটি বাঙালি। আর সেই সংগে মাথার চুল হইতে পায়ের নখ পর্যন্ত খাঁটি মুসলমান। খাঁটি বাঙালিত্ব ও খাঁটি মুসলমানত্বের এমন অপূর্ব সমন্বয়ই ভবিষ্যৎ বাঙালি জাতীয়তার প্রতীক।”
আমাদের সংস্কৃতি : বাঙালি মুসলিমরাই এর স্রষ্টা
নবী নূহ (আ) এর বংশধরেরাই এ দেশে আবাদ শুরু করেন। সূচনা থেকেই তাওহীদের ঝরণাতেই এখানকার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। ইসলামই কেবল মানবজীবনের সামগ্রিক জীবনধারায় পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক সমাধান দিতে পারে। প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ বলেন : “কোন ধর্ম সংস্কৃতির সাথে সঙ্গতি রক্ষা করে চলে নাই। ইংল্যান্ডের বিশিষ্ট শিক্ষিত ব্যক্তি ধর্মীয় জীবন যাপন করতে গিয়ে গায়ে চাম উকুনের চাষ করেছেন । … সকালে-বিকালে নিজ গায়ে বেত মেরে মেরে রক্ত সঞ্চার করেছেন ।…. লেইনপুল তার ‘মুরস ইন-স্পেন’ নামক বইয়ে লিখেছেন, তৎকালীন স্পেনে এমন খ্রিষ্টান-সাধিকা ছিলেন, যারা গর্ব করে বলতেন; ‘আমার বয়স সত্তর পার হয়ে গেছে; এর মধ্যে জর্ডন নদীর পানি ছাড়া আর কোন পানিতে আমার আঙুলের ডগাও ডুবাই নাই।’ … সমাজ এদের অকাতরে শ্রদ্ধা অর্ঘ্য দান করেছেন; কিন্তু সংস্কৃতি এদের জীবন থেকে সভয়ে পালিয়ে গেছে। অথচ মানুষের দেহ, মন ও সমাজের সংস্কারের জন্যই ধর্মের উদ্ভব। ইসলামের cleanliness is next to godliness, প্রবাদরূপে সেকালে ইউরোপময় ছড়িয়ে পড়েছিল। …ইসলামের সঙ্গে সংস্কৃতির বিরোধ নাই, বন্ধুত্ব আছে।”
তিনি আরোও বলেছেন : “কোন কোন ধর্মে না খেয়ে খেয়ে শরীরকে কষ্ট দেয়া ধর্মের পরিপোষক। ইছলাম বলে : খাও, দাও পান কর-শুধু অপচয় করো না। পেট ভরে ভালো জিনিস খেয়ে তৃপ্তির নিঃশ্বাস ছাড়ে, ইছলামে তাও এক রকম ইবাদাত।
…উলঙ্গ বা অর্ধউলঙ্গ থেকে সাধু সন্ন্যাসী হওয়ার বিধান ইসলামে নাই; বরং মসজিদে মজলিসে ভালো পোশাকে যাওয়ার তাকিদ আছে।… চোখে সুরমা, দাড়িতে মেহেদী, পোশাকে আতর, মাথায় পাগড়ি পরে মসজিদে যাওয়া সওয়াবের কাজ মনে করেন। … ইছলাম তার অনুসারীকে মুখভার করে থাকতে উৎসাহ দেয় না । অন্যের সঙ্গে হেসে কথা বলা ইছলামে ছওয়াবের কাজ।”
ইসলামী সংস্কৃতি শুধু আমাদের দেশ নয় সমগ্র পৃথিবীর সভ্যতার জন্যই এক বিরাট অবদান। এর কিছু উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে :
“স্থাপত্যে স্পেনের কর্ডোভা, আলহামরা, তাজমহল… বিশ্বের বিস্ময়। সাহিত্যে আরব্য কবি মুতান্নবী পারস্যের সাদী, রুমী, হাফিজ, খৈয়াম, ফেরদৌসী, উপমহাদেশের ইকবাল, নজরুল, জসীমউদ্দীন, ফররুখ প্রমুখ।… আব্বাসীয় শাসনকাল পৃথিবীর সঙ্গীত জগতে অমর অবদান রেখেছে। ছন্দ বিদ্যার প্রথম পুস্তক রচনা করেন খলিল। খলিফা আব্দুর রহমান কর্ডোভায় সঙ্গীত বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন। আরব, ইরান ও পাক ভারত উপমহাদেশের সুরের মিশ্রণে খেয়াল গানের উদ্ভাবন করেন আমীর খসরু। সেতার ও তবলা তিনিই উদ্ভাবন করেন।  মিঞা তানসেন, আলাউদ্দিন খান, ফৈয়াজ খাঁ, বড়ে গুলাম আলি খাঁ আমাদের দেশের আয়াত আলি খাঁ থেকে শুরু করে জমিরুদ্দিন খাঁ, নজরুল, আব্বাস উদ্দীন, লালন, হাসন রাজা প্রমুখরা সঙ্গীত শিল্পে বিশ্বজনীন অবদান রেখে গেছেন। চিত্রশিল্পে মেসোপটেমীয়া, ইলখানি, তৈমুরী, সাফাভী, বুখরা এবং মোগল চিত্রকলাকে বাদ দিয়ে বিশ্বের চিত্রশিল্প অস্তিত্বহীন।”
ড. শমশের আলী বলেন, “Culture is an integral part of islam.” তিনি আরো বলেন, “কথিত বুদ্ধিজীবীরা বলেন, বাংলা হতে এই আরবি, ফারসি বাদ দিলে ভাল হয়।” কিন্তু সমস্যা হলো এই বাদ কথাটাই আরবি, ….গানের আসর। …সেই আসরটা আরবি… মুসলমানরা এই অঞ্চলে আসার ফলে কত সমৃদ্ধ হয়েছে আরবি-ফারসি বাদ দিয়ে বাংলা কেমন হবে? একটি উদ্ধৃতিই যথেষ্ট : “বর্তমান সময়েও কোন অভিধান খুলিলে অন্তত ২৫০০ আরবি, ফারসি উদ্ভূত বাংলা শব্দ পাওয়া যায়। মুসলমানী পুঁথি সাহিত্য এই শব্দগুলোকে আশ্রয় করিয়াই গড়িয়া উঠিয়াছে। শুনিতে পাওয়া যায় এই পুঁথির মোট সংখ্যা ৮৩২৫টি।”
এ দেশের সংস্কৃতির স্রষ্টাই মুসলিমরা  চিন্তাশীল, গবেষক সবাই এর স্বীকৃতি দেন, যেমন প্রফেসর যতীন্দ্রনাথ সরকার বলেছেন:
“মুসলমানরা এ দেশে আসার আগে সংস্কৃতি এদেশে ছিল না। … শুধু যে বাংলাদেশেই সংস্কৃতির ভিত্তি ইসলাম তা নয়, সারা বিশ্বব্যাপী এর ভিত্তি। বিশ্বব্যাপী সংস্কৃতির ওপর ইসলামের প্রভাব রয়েছে। মুসলমানদের প্রবেশের পরে ইউরোপে সাংস্কৃতিক আন্দোলন এসেছিল। তার আগে তারা বর্বরতার গভীরে পৌঁছে গিয়েছিল।”
…“কমিউনিজমের পতনের পরে তারা নতুন করে ইসলামের দিকে তাকাচ্ছে এবং ইসলামের প্রতি তারা আকৃষ্ট হচ্ছে, এটা পশ্চিমা সভ্যতার কাছে গ্রহণীয় নয়।”
পাশ্চাত্যের সংস্কৃতির ভিত খুবই দুর্বল, তাই মুসলিমদের শক্তিশালী সংস্কৃতিকে তারা ভয় পায়। তাই হান্টিংটনের ফর্মুলায় তারা শুরু করেছে ‘ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশন’ তথা সভ্যতার সংঘাত। তারা জেনে বুঝেই হামলা করেছে ইরাক, আফগানিস্তান আমাদের ব্যাবিলনীয়, মুসলিম সভ্যতার চিহ্নসমূহ মুছে দিতে। যে মুসলমানরা পশ্চিমাদের প্রচারণায় মজে যাচ্ছে তারা ঠিক নিজের পায়ে কুড়োল মারছে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লেখক ইসমাঈল আল ফারুকী এর ভাষায় :
“…একজন মুসলিম নিজে পাশ্চাত্যের অনুকরণ করতে গিয়ে প্রকৃতপক্ষে সে নিজেকে অসভ্যে পরিণত করছে। বড়জোর তাকে আধুনিককালের এক সাংস্কৃতিক দানব হিসেবে আখ্যায়িত করা যেতে পারে।”
অথচ আজ মজার বিষয় হচ্ছে আধুনিক বিজ্ঞানের মোকাবেলায় এই পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সকল ভিত্তি তথা ডারউইনবাদ, ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্ব, বস্তুবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ এবং নাস্তিক্যবাদ ব্যাক ডেটেট প্রমাণিত হচ্ছে যেমন জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির স্কলার প্যাট্রিক গাইন তার God : The Evidence গ্রন্থে লিখেছেন : “আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ ও নাস্তিক চিন্তাবিদরা সৃষ্টিকর্তা তথা আল্লাহ সম্পর্কে যেসব গুরুত্বপূর্ণ অনুমান ও ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, তার প্রায় সবই বিগত দুই দশকের গবেষণায় ভুল প্রমাণিত হয়েছে। …. নাস্তিক্যবাদী বা বস্তুবাদী দর্শনের ভিত্তি হিসেবে এতদিন অবাধে উপস্থাপন করা হতো বিজ্ঞানকে। বর্তমানে ঠিক উল্টোটাই ঘটছে।”
Harvard Medical School এর Dr. Herbert Benson গবেষণায় প্রমাণ পান যে, স্রষ্টায় বিশ্বাস ও প্রার্থনা মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে, স্রষ্টায় বিশ্বাস মানুষের মনকে প্রশান্ত করে।”
কেবল ইসলামী সংস্কৃতিই মানুষের চরম উৎকর্ষতা বিধান করতে পারে, মানবতার জন্য তাই এটি মুক্তিসনদ। আমরা পিকথলের বক্তব্যে সেই প্রতিচ্ছবিই দেখতে পাই : “সংস্কৃতির অর্থ উৎকর্ষ বা অনুশীলন …সামগ্রিক মানবজীবনকে সুন্দরতর, মহত্তর, মহিমময় করে তোলাই ইসলামী সংস্কৃতির লক্ষ্য।”

অপসংস্কৃতির আগ্রাসন
স্যাটেলাইটের যুগে কোন জাতিকে পঙ্গু করে দেয়ার জন্য তার জাতিসত্তা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধের বিলোপ সাধনের জন্য সাংস্কৃতিক আগ্রাসনই যথেষ্ট।
কিন্তু আমরা কি সচেতন? কিভাবে হচ্ছে এই আগ্রাসন, কিভাবে জাতির শিরায় শিরায় ঢুকে যাচ্ছে বিষ? কয়েকটি নমুনা আমরা আলোচনা করি :
“পৃথিবীতে বহু দেশে শিল্পায়ণ ও প্রযুক্তির অপরিকল্পিত প্রয়োগের ফলে সংস্কৃতিতে আঘাত লেগেছে। আবার যুদ্ধ-বিগ্রহ ও উপনিবেশিকতা, বৈদেশিক প্রভাব সংস্কৃতিকে বিপর্যস্ত করে। সুতরাং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের মাধ্যমে একটি দেশ তার স্বাধীনতা এবং স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করতে পারে।” আমাদের ভাষা সংস্কৃতির ওপর আঘাত সাম্রাজ্যবাদীদের পক্ষ থেকে অত্যন্ত পরিকল্পিত উদ্যোগ। ইংরেজ আমলে এ দেশে ভাষা-সংস্কৃতির ওপর বিরাট একটা আঘাত আসে। এ আঘাত ইচ্ছে করেই করছিল “Devide and Rule Policy” এর একটা অঙ্গ হিসাবে।… বড় বড় সাহিত্যিক (রবীন্দ্রনাথসহ) সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির সমাজ, ধর্ম, সংস্কৃতি, আচার-ব্যবহার এগুলোকে ঝেটিয়ে বিদায় করলেন। এটা ইংরেজদের উৎসাহে অনুপ্রেরণায় ঘটল।”
যুবকরাই সবচেয়ে বড় শক্তি। তাদের অবস্থা দেখে আর্তনাদ করে উঠেছেন বিশিষ্ট শিল্পী ও কলামিস্ট ওবায়দুল হক সরকার : “আমাদের শিক্ষাঙ্গন আজ রণাঙ্গনে পরিণত হয়েছে, মাস্তান-চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্যে উন্নয়ন উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, মঙ্গল প্রদীপ মার্কা সংস্কৃতির ধাক্কায় আমরা প্রতিপদে শুধু পিছিয়ে পড়ছি।”
দেশের জন্মলগ্ন থেকেই যুবচরিত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৯৭১ সালে আওয়ামী লীগ এমপি ছিলেন এম এ মোহাইমেন। তিনি লিখেছেন:
“১৯৭২ সন হতে ১৯৭৪ সনের শেষ পর্যন্ত সারা দেশব্যাপী যুবকদের মধ্যে যে হানাহানি, গুপ্ত হত্যা প্রভৃতি চলেছিল তার অধিকাংশই হল লুটলব্ধ অর্থের ভাগাভাগি ও ঘরের দখল নিয়ে। …২৫ বৎসর ধরে শাসন ও শোষণ করে পশ্চিম পাকিস্তানিরা বাঙালিদের যতটুকু দুর্বল ও চারিত্রিক অধঃপতন ঘটাতে পারেনি, ’৭১ সনের পরে বাঙালিদের চারিত্রিক অধঃপতন তার চাইতে অনেক বেশি ঘটাতে পেরেছে। যুবক সম্প্রদায়ই বলতে গেলে শেষ হয়ে গেল।”
আমাদের কথোপকথন আজ ব্যাংলিশ। মিডিয়া উপস্থাপনায় হ্যালো, হাই ..বাই। বিজ্ঞাপনে, বিনোদনে, সাহিত্যে পশ্চিমবঙ্গীয় ঢং। ভাটিয়ালি, মুর্শিদী তথা দেশীয় গান বাদ দিয়ে সর্বত্র হিন্দি গানের রমরমা হাট। পোশাকে, খাওয়ায়, পরিভাষায় আমাদের পরিচয় কিম্ভূতকিমাকার। প্রেক্ষাগৃহ শূন্য, পাড়ায় পাড়ায় ভিডিও, তাতে বলিউডি আর হলিউডি জৌলুস। আমরা শহীদ, শহীদমিনার ও এ দেশবাসীর সাথে প্রতারণা করছি নাতো? এটি আমাদের সবার সামনে আজকে সবচেয়ে কঠিন, জটিল প্রশ্ন।      (চলবে)

SHARE

Leave a Reply