পহেলা বৈশাখ ও বাঙালিত্বের বাগাড়ম্বর -এবনে গোলাম সামাদ

আজকের পৃথক রাষ্ট্র বাংলাদেশের উদ্ভব হয়েছে সাবেক পাকিস্তান ভেঙে। সাবেক পাকিস্তান রাষ্ট্রটির উদ্ভব হয়েছিল মুসলিম জাতীয়তাবাদকে নির্ভর করে। যে মুসলিম জাতীয়তাবাদের উদ্ভব হতে পেরেছিল ব্রিটিশ শাসনামলে। নববর্ষের কথা আলোচনা করতে যেয়ে পাকিস্তান প্রসঙ্গ টানছি, কেননা এখন বলা হচ্ছে যে, পহেলা বৈশাখ হলো বাঙালি জাতিসত্তার উৎস। কিন্তু খোঁজ নিলে জানা যায় যে, এই সাল গণনার পদ্ধতি উদ্ভূত হয়েছে এমন জনসমষ্টির মধ্যে, যার সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের জাতিসত্তা গঠনের কোনো যোগসূত্রই নাই। যাকে আমরা বলছি বাংলা সাল, সেটা বাংলাদেশের কোনো অঞ্চলে উদ্ভূত হয়নি। আমরা এখন বারো মাসে বছর ধরি। এই রীতি কোথায় প্রথম কিভাবে সৃষ্টি হতে পেরেছিল, তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে যথেষ্ট মতভেদ আছে।
মানুষ অনেক প্রাচীনকাল থেকেই আকাশের অনেক নক্ষত্রের নাম প্রদান করেছে। তার নামগুলো এসেছে বিভিন্ন বারটি নক্ষত্রের নাম থেকে। প্রতি মাসে একবার করে পূর্ণিমা হয়। পূর্ণিমার চাঁদকে থাকতে দেখা যায় এই বারোটি নক্ষত্রের কোনো না কোনো একটির কাছে। আর এই নক্ষত্রের নাম থেকে হতে পেরেছে মাসের নাম। যে বারোটা নক্ষত্রের নাম থেকে বাংলা বারো মাসের নাম এসেছে এগুলো হলো : বিশাখা, জ্যেষ্ঠা, পূর্বাষাঢ়া, শ্রবণা, পূর্বভাদ্র পদ, আশ্বিনী, কৃত্তিকা, মৃগশিরা, পুষ্যা, মঘা, পূর্বাফাল্গুনী ও চিত্রা। এই নামগুলো কেবল যে বাংলাভাষাতেই আছে তা নয়। হিন্দি ভাষাতেও আছে। এই নামগুলো এসেছে শকাব্দ থেকে। শকাব্দের প্রচলন করেন স¤্রাট কনিষ্ক। এরকমই বলে থাকেন বিভিন্ন ইতিহাসবিদ। বাংলাদেশের একটা প্রাচীন স্থান হল মহাস্থানগড়। এখানে সম্রাট কনিষ্কের একটা স্বর্ণমুদ্রা পাওয়া গেছে। মনে করা যায় সম্রাট কোনিষ্কের রাজত্ব বর্তমান বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। আর তাই এখানে এক সময় প্রচলিত ছিল শকাব্দ।

আর এদেশের মানুষ শকাব্দ অনুসারে করেছে বছর গণনা। এর মধ্যে বাঙালিত্বের কোনো পরিচয় তাই খুঁজে দেখতে যাওয়া ভুল। শকাব্দে অবশ্য নববর্ষ ধরা হয় পহেলা চৈত্র থেকে। বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলে কেন পহেলা বৈশাখ থেকে বাংলা বছরের আরম্ভ ধরা হয় সেই ইতিহাস এখনো রয়েছে অজ্ঞাত। ভারত সরকার শকাব্দকে এখন গ্রহণ করেছে সরকারি অব্দ হিসেবে। হয়তো একদিন দেখা যাবে যে বাংলাভাষী পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ভারতের অন্যান্য প্রদেশের মানুষের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে পহেলা চৈত্রকেই গ্রহণ করছে নববর্ষের সূচনা হিসাবে। বাংলাদেশে যাকে দাবি করা হয় বঙ্গাব্দ, তা সংস্কার সাধন করা হয়েছে। এই সংস্কার সাধন করা হয়েছে পোপ গ্রেগোরি প্রবর্তিত খ্রিস্টীয় ক্যালেন্ডার বা বর্ষপঞ্জি অনুকরণে। বৈশাখ থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত প্রতি মাস ধরা হয়েছে ৩১ দিন। আর আশ্বিন থেকে চৈত্র পর্যন্ত ধরা হয়েছে ৩০ দিন। আর গ্রেগোরিয়ান ক্যালেন্ডারে যে বছর হবে লিপ ইয়ার, সে বছর ফাল্গুন মাসকে ধরা হবে ৩১ দিনে। কারণ গ্রেগোরীয় ক্যালেন্ডারে ফেব্রুয়ারি মাস হচ্ছে বাংলা ফাল্গুন মাস। এই হিসাব অনুসারে বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ হবে প্রতি বছর গ্রেগোরীয় ক্যালেন্ডারের ১৪ এপ্রিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বাংলাভাষাভাষীরা বাংলাদেশের এই হিসাবকে মেনে নেননি। তারা অনুসরণ করছেন পুরনো হিন্দু পঞ্জিকার হিসাবকে। যাতে পহেলা বৈশাখ কোনো বছরে হবে ১৪ এপ্রিল আবার কোনো বছরে হবে ১৫ এপ্রিল। যাকে বলা হয় হিন্দু জ্যোতিষ, তাতে যে পদ্ধতিতে বছর গণনা করা হয়, তাকে বলতে হয় চন্দ্র-সৌর (খঁহর- ঝড়ষধৎ) পদ্ধতি। এতে মাস গণনা করা হয় চাঁদের তিথি অনুসারে। কিন্তু বছর গণনা করা হয় রাশিচক্রের সূর্যের অবস্থান বিবেচনা করে। হিন্দু জ্যোতিষের অব্দের হিসাব ঠিক সৌর অব্দের হিসাব নয়। এই হিসাব হলো চন্দ্র ও সৌর বর্ষের মিশানো হিসাব। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান বঙ্গাব্দ ধরা হচ্ছে কেবলই সৌর বছরের হিসাব অনুসারে। এটাকে কোনোভাবেই বলা চলে না বাঙালিত্বের পরিচায়ক হিসাবে। আমরা এখন বছর গণনা করছি আসলে গ্রেগোরীয় পদ্ধতি অনুসরণ করে।

বাংলা সনের ইতিহাস এখনো যথেষ্ট স্পষ্ট নয়। এ সম্পর্কে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ (কলকাতা, ১৯৫৯ খ্রি:) কর্তৃক সংকলিত ভারত কোষের প্রথম খণ্ডে বলা হয়েছে, এই সনের প্রবর্তক হলেন সম্রাট আকবর। স¤্রাট আকবরের সময়ই ৯৬৩ হিজরি থেকে সৌর অব্দ হিসাবে এক নতুন সন গণনার সূত্রপাত হয়। হিজরি হল বিশুদ্ধ চন্দ্র অব্দ। চন্দ্র অব্দের সঙ্গে ঋতু পরিবর্তনের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। স¤্রাট আকবর সৌর অব্দ হিসাবে এই নতুন সন গণনার প্রবর্তন করেন খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য। কিন্তু বাংলা সনের যথেষ্ট মিল খুঁজে পাওয়া যায় ইরানের সৌর সনের সঙ্গে। মোগল স¤্রাটরা বিশেষভাবে ইরানি সভ্যতার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। আর তাই গ্রহণ করেছিলেন রাজকার্য পরিচালনার জন্য ইরানি সনের ধারা। এ কথা সত্য হলে নববর্ষের উৎসবের একটা ঐতিহাসিক সূত্র খুঁজে পাওয়া যায়। ইরানিরা তাদের সৌর বছরের প্রথম দিনে পালন করেন বিশেষ উৎসব। যাকে বলে নওরোজ। আমরা যে পহেলা বৈশাখ পালন করছি, ধারণা করা যায় তার ঐতিহ্য এসেছে ইরান থেকে। একে বিশুদ্ধ বাঙালি উৎসব বলা চলে না।

আমাদের দেশে আগে দোকানে দোকানে হালখাতা করা হতো। হালখাতা বলতে বোঝাত নতুন বছরের জন্য হিসাবের নতুন খাতাকে। হালখাতার দিনে দোকানিরা তাদের পরিচিত খরিদ্দারদের নিমন্ত্রণ করে করাতেন মিষ্টিমুখ। হাল শব্দটি আরবী আর খাতা শব্দটি ফারসি। আগের দিনে হালখাতা করা হতো খুবই শালীনভাবে। হৈ হুল্লোড় করে নয়। হৈ হুল্লোড় করে নববর্ষ পালন আরম্ভ হয়েছে বাংলাদেশ হওয়ার পর। এটাকে আমাদের প্রাচীন সংস্কৃতির অংশ হিসাবে বিবেচনা করা যায় না। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হলো পহেলা বৈশাখ বাঙালির প্রাণের উৎসব। কিন্তু এই উৎসব আরম্ভ হয়েছে মাত্র বাংলাদেশ হওয়ার পর। এই উৎসবের এই ধরন আগে ছিল না। আগে নববর্ষে কেউ বিশেষভাবে পান্তা খাবার প্রয়োজন দেখেনি ইলিশ মাছ দিয়ে। বাজারে ইলিশের দাম রাতারাতি হয়ে ওঠেনি ৩৫০০ টাকা কেজি। এভাবে পান্তা খেয়ে উৎসব করতে পারেন এদেশের কয়জন মানুষ, সেটা নিয়ে ওঠানো যায় প্রশ্ন। আমাদের দেশের তথাকথিত বামপন্থীরা বিশেষভাবে নিয়ে এসেছেন পহেলা বৈশাখের সঙ্গে বিশেষ রাজনীতির সংশ্লিষ্টতা। যারা চিরকাল ভরপেট খেয়ে ভুখা নাচ নেচে আনতে চেয়েছেন গণজাগরণ। গড়তে চেয়েছেন শ্রেণিহীন সমাজব্যবস্থা।

আমরা ঘটা করে বাংলা নববর্ষ উৎসব পালন করছি। কিন্তু সরকারি কাজকর্ম করছি আসলে খ্রিষ্টাব্দকেই অনুসরণ করে। আমরা ইতিহাস চর্চা করছি খ্রিষ্টাব্দ ধরে, বঙ্গাব্দ ধরে নয়। বঙ্গাব্দ সীমিত হয়ে পড়েছে কেবলই নববর্ষ উদযাপনের মধ্যে। কৃষিজীবী মানুষ বাংলাদেশে বাংলা মাস ধরে তাদের কৃষিকাজ করেন। এদিক থেকে আমাদের জীবনে বাংলা মাসের হিসাবের আছে কিছুটা গুরুত্ব। কিন্তু অন্য আর কোনোভাবে নয়। এ প্রসঙ্গে আমার ব্যক্তিগত জীবনের একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে। বেশ কয়েক বছর আগের কথা। আমাদের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে পহেলা বৈশাখে আমাকে কিছু বলতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। আমি সেই সভায় বাংলা সনের উদ্ভব সম্পর্কে যা জানতাম সে সম্পর্কে কিছু বলি। আরও বলি ইরানের নওরোজ উৎসব সম্পর্কে। এতে ঐ বিভাগের কিছু অধ্যাপক আমার ওপর ক্ষুব্ধ হন। তারা বলেন, বাংলা সন গণনা শুরু হয়েছে রাজা শশাঙ্কের সময় থেকে। বাঙালি রাজাগণের মধ্যে শশাঙ্কই হলেন প্রথম সার্বভৌম নরপতি। কিন্তু তারা বলতে চান না শশাঙ্ককে বাঙালি হিসাবে দাবি করছেন কিভাবে। কারণ শশাঙ্ক কেবল রাজত্ব করেছেন পশ্চিমবঙ্গের কিছু অংশজুড়ে। তিনি ছিলেন বিহার ও উড়িষ্যারও নরপতি। তিনি কী ভাষায় কথা বলতেন আমরা তা জানি না। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার তাঁর বহুল পঠিত বাংলা দেশের ইতিহাস গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে বলেছেন- শশাঙ্ক সম্ভবত প্রাচীন বঙ্গরাজ্যে রাজত্ব করেননি। করেছিলেন কি না তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। ঘটনা যদি তাই হয়, তবে শশাঙ্ককে বাংলার রাজা হিসাবে গ্রহণ করার কোনো যুক্তি আছে বলে মনে হয় না।

বিখ্যাত চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন্থ্ সাং (ওয়াং চুয়াং) তাঁর ভ্রমণ বৃত্তান্তে বলেছেন- শশাঙ্ক ছিলেন গোঁড়া হিন্দু এবং ভয়ঙ্কর রকমের বৌদ্ধবিদ্বেষী। বৌদ্ধরা এদেশে তাদের বিশেষ সাল গণনার পদ্ধতি অনুসরণ করেন। তাদের নববর্ষ শুরু হয় বৈশাখী পূর্ণিমা থেকে। বৈশাখ থেকে নববর্ষ গণনার ক্ষেত্রে হয়তো আমরা অনুসরণ করছি এই প্রাচীন বৌদ্ধ ঐতিহ্যকে। বর্তমান বাংলাদেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে ছিল বিশেষ বৌদ্ধ প্রভাব। এটাই অনেক ঐতিহাসিকের সাধারণ অভিমত। বাংলা মাস অগ্রহায়ণ অনেকের মতে একসময় ধরা হতো বছরের আরম্ভ হিসাবে। সংস্কৃত ভাষায় ‘অগ্র’ মানে ‘আগা’ আর ‘হায়ন’ মানে ‘বছর’। মার্গশীর্ষ মাসকে এই জন্য বলা হয় অগ্রহায়ণ মাস। এই সময় পূর্ণিমার চাঁদ থাকে মার্গশীর্ষ নক্ষত্রের কাছে। অগ্রহায়ণ মাস হলো হৈমন্তিক ধানের মাস। এই ধান ছিল এক সময় বাংলাদেশের মূল ধান। এই ধান যখন কৃষকের ঘরে উঠতো কৃষক তখন করতেন বিশেষ উৎসব। অগ্রহায়ণ থেকে বছর না গণনা করে কেন বৈশাখ থেকে বছর গণনা আরম্ভ হয় সে সম্বদ্ধে কোনো ঐতিহাসিক এখনো আলোকপাত করেননি।

মানুষের বছর গণনাপদ্ধতি সবদেশে সবসময় এক হয়ে থাকেনি। আমাদের দেশেও হয়েছে এর পরিবর্তন। যাদের বলা হয় আদিম জাতি, তারা চন্দ্র ও সূর্যের অবস্থান দেখে বছরের শুরু গণনা করে না। ভারতের হো নামক আদিম উপজাতি বছর শুরু হওয়া ধরতো শালগাছের ফুল ফোটা দিয়ে। অর্থাৎ শালগাছে যখন ফুল ফোটা আরম্ভ হতো তখন তারা মনে করত, এক বছর শেষ হয়ে আরম্ভ হলো আর এক বছরের। মানুষ চিরকাল বাঁচে না। মানুষের জীবনে এই না বাঁচা থেকে এসেছে সম্ভবত সময়ের ধারণা। মানুষের জীবন সময় দিয়ে সীমিত। কিন্তু কাউকে যদি জিজ্ঞাসা করা যায়, সময় বলতে ঠিক কী বুঝতে হবে, তবে সে প্রশ্নের উত্তর সে দিতে পারে না। কারণ, সময়ের ধারণা সত্যিই যথেষ্ট জটিল। অনেক দার্শনিকের মতে কাল নিরবধি, আর সৃষ্টি অনন্ত। কালের শুরু ও শেষ সম্পর্কে আমরা কোনো ধারণা করতে পারি না। কারণ, শুরুরও আছে শুরু আর শেষের পরেও আসে অনাগত ভবিষ্যৎ।
লেখক : বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply