পাওয়া না-পাওয়ার হিসাব

এম ইসলাম

ইন্টারন্যাশনাল ট্রাইব্যুনাল ফর দি ল অব দি সি (আইটিএলওএস)

মিয়ানমারের সঙ্গে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তিতে তিন বছরের আইনি লড়াই শেষে ১৯৮২ সালের ইউএন কনভেনশন অন দি ল অব দি সি (আনক্লজ) অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণ করে ১৪ মার্চ ২০১২ তারিখে রায় দিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল ট্রাইব্যুনাল ফর দি ল অব দি সি (আইটিএলওএস)। প্রতিবেশী মিয়ানমারের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তিতে বাংলাদেশই প্রথম ট্রাইবুন্যালের শরণাপন্ন হয়। পরে মিয়ানমার এ বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার মেনে নিলে বিভিন্ন পর্যায়ের দীর্ঘ শুনানি শেষে এ রায় ঘোষণা করে জাতিসঙ্ঘ গঠিত এ ট্রাইব্যুনাল।
(আইন অনুযায়ী, উপকূল রেখা থেকে ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত সার্বভৌম সমুদ্রসীমা (টেরিটোরিয়াল সি), এবং উপকূল রেখার থেকে ২০০ নটিক্যাল মাইল বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন) ও পরের ২০০ নটিক্যাল মাইলকে মহাদেশীয় সোপান (কন্টিনেন্টাল শেলফ) হিসেবে ধার্য করা হয়। ফলে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে ‘উপকূল রেখা’ নির্ধারণ। কারণ এর ওপরই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও মহাদেশীয় ঢালের সীমানা নির্ভর করে।)
ট্রাইব্যুনালে পেশ করা আরজি ও চূড়ান্ত শুনানিতে বাংলাদেশের তিনটি দাবি ছিল :
বাংলাদেশের প্রথম দাবি ছিল, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার ১৯৭৪ সালে নিজেদের মধ্যকার সার্বভৌম সমুদ্রসীমার বিষয়ে একমত হয়ে একটি চুক্তি করেছে। ২০০৮ সালে আবারো ওই ঐকমত্যের বিষয়টি দুই দেশ পুনর্ব্যক্ত করেছে আর একটি চুক্তির মাধ্যমে। তা ছাড়া ২০০৮ সালের চুক্তিতে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও মহাদেশীয় ঢাল শুরুর যাত্রাবিন্দুর বিষয়ে সম্মত হয়েছে দুই দেশ। বাংলাদেশ দাবি করে এখন ট্রাইব্যুনাল ১৯৭৪ সালে সম্মত ও ২০০৮ সালে পুনর্ব্যক্ত এই সমুদ্রসীমাকেই দুই দেশের মধ্যে কার্যকর সমুদ্রসীমা হিসেবে ঘোষণা করে দিক।
১৯৭৪ ও ২০০৮ সালে দুই দেশ এ বিষয়ে চুক্তি করেছিল বলে বাংলাদেশ দু’টি মূল দলিল পেশ করে ট্রাইব্যুনালে। দলিল দু’টি হচ্ছে ওই দুই বছরে সমুদ্রসীমা বিষয়ে কয়েক দফা আলোচনা করার পর ওই সব ‘সভার কার্যবিবরণী’, যাতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার দুই পক্ষের প্রতিনিধিদলের সদস্যরা স্বাক্ষর করেন। বিপরীতে মিয়ানমার ট্রাইব্যুনালে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে যে, ওই সব ‘সভার কার্যবিবরণী’ কোনো আইনত ‘চুক্তি’ নয়। ওগুলোকে দুই পক্ষের মধ্যে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভার কার্যবিবরণী হিসেবেই স্বাক্ষর করা হয়েছিল, কোনো কিছুতে সম্মতি বা অসম্মতি প্রকাশ করার জন্য স্বাক্ষর করা হয়নি।
দাবির পক্ষে বাংলাদেশের দাখিল করা দলিলপত্র ও উপস্থাপিত যুক্তিতর্ক এবং বিপক্ষে মিয়ানমারের যুক্তিখণ্ডন বিচার করে ট্রাইব্যুনাল বাংলাদেশের প্রথম দাবি খারিজ করে দেয়। ট্রাইব্যুনাল সাব্যস্ত করে যে ১৯৭৪ সালে দুই দেশের প্রতিনিধিদলের সভার পর স্বাক্ষরিত ‘সভার কার্যবিবরণী’টি ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী কোনো দিক থেকেই কোনো ‘আন্তর্জাতিক চুক্তি’ নয় এবং সংশ্লিষ্ট আনক্লজের ১৫তম অনুচ্ছেদ অনুসারেও তা কোনো ‘চুক্তি’ নয়। ফলে রায়ের ১২৬ অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে, দুই দেশের মধ্যে কোনো ‘ঘোষিত’ বা ‘সম্মত’ সার্বভৌম সমুদ্রসীমা (টেরিটোরিয়াল সি) নেই।
এরপর ট্রাইব্যুনাল দুই দেশের মধ্যে সার্বভৌম সমুদ্রসীমা নির্ধারণে নিজেদের সিদ্ধান্ত দেন।
সার্বভৌম সমুদ্র নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, সেন্টমার্টিন দ্বীপকে আইনত ‘দ্বীপ’ হিসেবে পূর্ণ মর্যাদা দিয়ে তার থেকে সার্বভৌম সমুদ্রের সীমানা হিসাব করা হবে কি না। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পূর্ণ দ্বীপ হিসেবে সেন্টমার্টিনের মর্যাদার বিরোধিতা করে মিয়ানমার। ফলে এই দ্বীপ থেকে বাংলাদেশের সার্বভৌম সমুদ্রের সীমা টানা হতে পারে না, এ সীমা হবে টেকনাফের সমুদ্রসীমা থেকে। মিয়ানমারের দাবি নাকচ করে দিয়ে ট্রাইব্যুনাল সেন্টমার্টিন দ্বীপ থেকে সার্বভৌম সমুদ্রের সীমা টানার বাংলাদেশের দাবি গ্রহণ করে। ফলে এক দিকে মিয়ানমারের উপকূল অন্য দিকে সেন্টমার্টিন দ্বীপ থেকে ১২ নটিক্যাল মাইলের সার্বভৌম সমুদ্রসীমারেখা টানা হয়।
(এর মানে এই নয় যে, সেন্টমার্টিন দ্বীপ থেকে মিয়ানমারের দিকে পুরো ১২ নটিক্যাল মাইল সীমানা পেয়েছে বাংলাদেশ। কারণ অনেক জায়গায় দেখা গেছে, মিয়ানমারের উপকূল থেকে সেন্টমার্টিন দ্বীপের উপকূলের দূরত্ব ২৪ নটিক্যাল মাইলের কম। এমনসব ক্ষেত্রে ১২ নটিক্যাল মাইল হিসেবের বদলে মধ্যবর্তী বিন্দুকে সার্বভৌম সমুদ্রের সীমা হিসেবে ধরা হয়েছে।)
বাংলাদেশের দ্বিতীয় দাবি ছিল : প্রথমত, সেন্টমার্টিন দ্বীপকে বাংলাদেশের ‘উপকূলরেখার’ অন্তর্ভুক্ত ধরে নিয়ে উপকূলরেখা থেকে ন্যায্যদূরত্ব নীতির মাধ্যমে ‘বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল’ নির্ধারণ করতে হবে। সার্বভৌম সমুদ্র নির্ধারণে ট্রাইব্যুনাল সেন্টমার্টিন দ্বীপকে পূর্ণ দ্বীপের মর্যাদা দিলেও এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ‘উপকূলরেখা’ নির্ধারণের ক্ষেত্রে সেন্টমার্টিন দ্বীপকে উপকূলরেখায় অন্তর্ভুক্ত রাখার বাংলাদেশের দাবি নাকচ করে দেয়। এ ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনাল মিয়ানমারের দাবি মেনে নিয়ে টেকনাফ পর্যন্ত বাংলাদেশের উপকূলরেখা সীমাবদ্ধ বলে সিদ্ধান্ত নেন। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ দাবি করে যে উপকূলরেখা থেকে ন্যায্যদূরত্বের ভিত্তিতে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের সীমানা নির্ধারণ করতে হবে। কারণ বাংলাদেশ থেকে আসা পলির স্তরের ওপরই এ অঞ্চল গঠিত হয়েছে। আনক্লজের ৭৬.১ ধারার পলিপাতন নীতি অনুযায়ী বাংলাদেশ এ দাবি করে। পলিপাতন নীতি তুলে ধরে বাংলাদেশ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে যে, এ অঞ্চল আইনত অন্যান্য সমুদ্রের মতো সাধারণ পরিস্থিতির নয় যে এখানে সমান দূরত্বের ভিত্তিতে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ভাগ করে দেয়া চলে। ফলে মিয়ানমারের উপকূলের সংলগ্ন হলেও আইনত এ অঞ্চলের ওপর বাংলাদেশের অধিকার বেশি। বিপরীতে মিয়ানমার দাবি করে সমদূরত্ব নীতির। ট্রাইব্যুনাল মিয়ানমারের সমদূরত্ব নীতির দাবি গ্রহণ করে। ট্রাইব্যুনাল নাফ নদের মুখকে সমদূরত্ব রেখা শুরুর বিন্দু সাব্যস্ত করে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের সীমানা নির্ধারণ করে।
(সমাধান এখানে ন্যায্যতাভিত্তিক নয়। একদিকে সেন্টমার্টিন দ্বীপকে বাংলাদেশের উপকূলরেখায় অন্তর্ভুক্ত না করা অন্য দিকে সমদূরত্বভিত্তিক রেখা টানায় বাংলাদেশ সেন্টমার্টিন দ্বীপের সোজা দক্ষিণ বরাবর ২০০ নটিক্যাল মাইলের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও মহাদেশীয় সোপানের বিশাল অঞ্চল হারিয়েছে, যা আইনত বাংলাদেশের পাওয়ার কথা ছিল।)
বাংলাদেশের তৃতীয় দাবি ছিল ২০০ নটিক্যাল মাইল সীমারেখার বাইরে স্বাভাবিক প্রলম্বিতকরণ (Natural Prolongation) নীতি অনুযায়ী মহাদেশীয় সোপানের সীমারেখা নির্ধারণ। বিপরীতে মিয়ানমারের যুক্তি গ্রহণ করে ট্রাইব্যুনাল সিদ্ধান্ত দেয় যে, বাংলাদেশ ২০০ নটিক্যাল মাইলের পরে যেই মহাদেশীয় সোপানের দাবি করছে সেটি মিয়ানমারের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে পড়ে। (অর্থাৎ সেন্টমার্টিন দ্বীপকে উপকূলরেখা থেকে বাদ দিয়ে ইতঃপূর্বে ট্রাইব্যুনালের সাব্যস্ত করা উপকূল রেখা থেকে সমদূরত্বের নীতির ভিত্তিতে হিসাব করলে দেখা যায় এই অঞ্চলটি মিয়ানমারের উপকূল রেখা থেকে হিসাব করা ২০০ নটিক্যাল মাইল বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে পড়ে।) ফলে, ট্রাইব্যুনাল সিদ্ধান্ত দেয় যে, মিয়ানমারের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল কোনোভাবেই বাংলাদেশ মহাদেশীয় সোপান হিসেবে পেতে পারে না। আগে নির্ধারিত সমদূরত্ব রেখাটিই ট্রাইব্যুনাল ২১৫ ডিগ্রি দক্ষিণ-পশ্চিম দিগংশ বরাবর টেনে দুই দেশের মহাদেশীয় সোপানের আপাতত সীমানা নির্ধারণ করে দেয়। (‘আপাতত’ এই কারণে যে, পশ্চিমে এই রেখাটি কোন পর্যন্ত যাবে তা বাংলাদেশ-ভারত সমুদ্রসীমা নির্ধারণের আগে স্থির করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের দাবি করা ‘স্বাভাবিক প্রলম্বিতকরণ’ নীতির ভিত্তিতে মহাদেশীয় ঢালের সীমানা নির্ধারণ না করার ফলে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরে নেমে যাওয়া নিজের ভূখণ্ডের ঢালের বা মহাদেশীয় সোপানের অধিকাংশই হারিয়েছে।)
লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

SHARE

Leave a Reply