পাঠ্যবই নিয়ে সঙ্কট কাটছে না বছরের প্রথম দিন সব বই পাবে না শিক্ষার্থীরা -সামছুল আরেফীন

প্রতি বছর ১ জানুয়ারি সারাদেশে বই উৎসবের আয়োজন করা হয়। তবে আগামী বছরের প্রথম দিনেই শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন পৌঁছাবে কিনা তা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে সংশয়। শেষ সময়ে এসে কিছু কিছু ছাপাখানা মালিক নিম্নমানের কাগজে বই ছাপছেন। তড়িঘড়ি করে বই ছাপতে গিয়ে রাতের আঁধারে তারা এ কাজ করছেন। নিম্নমানের কাগজও জব্দ করেছে সংশ্লিষ্টরা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পাঠ্যপুস্তক ছাপতে টেন্ডার কার্যক্রম সম্পন্ন করা, মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানকে পান্ডুলিপি সরবরাহ করে ওয়ার্ক অর্ডার দিতে দেরি করায় এই সঙ্কট তৈরি হয়েছে। প্রাথমিক বই ছাপার ধীরগতি ও নবম-দশম শ্রেণীর সুখপাঠ্য বইয়ের দরপত্র প্রক্রিয়া সময় মতো শেষ করতে না পারায় সঙ্কট আরো গভীর হয়।
১ জানুয়ারি পাঠ্যপুস্তক উৎসব উদযাপনের দিন কতটি বই পাবে শিক্ষার্থীরা, তা দেখার বিষয়। প্রতি বছর বই উদযাপনে শুভঙ্করের ফাঁকি দেয় এনসিটিবি। উৎসবের দিনে শিক্ষার্থীপ্রতি মাত্র এক-দুইটি করে বই দিয়ে প্রচার করা হয় ৩৪-৩৫ কোটি পাঠ্যপুস্তক তুলে দিয়েছে। বিভিন্ন শ্রেণীর সব পাঠ্যবই পেতে শিক্ষার্থীদের মার্চ থেকে এপ্রিল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।
জানা যায়, আগামী শিক্ষাবর্ষে (২০১৮) প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, মাধ্যমিক, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং ব্রেইল বই বিনামূল্যে বিতরণের জন্য ছাপা হবে ৩৪ কোটি ৯৩ লাখ ৭৮ হাজার ৮৫৭টি। ৫টি টেন্ডারে ভাগ করে এসব বই মুদ্রণ কাজ চলছে। এ দিকে মাধ্যমিকের পরিমার্জিত সুখপাঠ্য বই ছাপা হবে পৌনে ৩ কোটির মতো।

সুখপাঠ্য নিয়ে অসুখ

এবার বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের দিয়ে নবম-দশম শ্রেণীর বাংলা, ইংরেজি, বিজ্ঞান, গণিতসহ ১২টি পাঠ্যবই পরিমার্জন করে সুখপাঠ্য করা হয়েছে। এ জন্য এই ১২টি বিষয়ের ১ কোটি ৯৮ লাখ বই ছাপানোর কাজ পৃথক দরপত্রে করা হচ্ছে।
মাধ্যমিক স্তরের সংশোধিত (সুখপাঠ্য) পাঠ্যবই ছাপার কাজ শেষ হওয়া নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। গত ২৩ অক্টোবর সুখপাঠ্য করা বইয়ের কার্যাদেশ দেয়া শুরু হয়। নিয়মানুযায়ী কাজ পাওয়া প্রতিষ্ঠান সাত দিনের মধ্যে সম্মতিপত্র দেবে। এর পর থেকে ২১ দিনের মধ্যে চুক্তি করতে হবে। চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান কাজ শেষ করার জন্য ৫৫ দিন সময় পাবে। ফলে হিসাব অনুযায়ী ১৩ জানুয়ারি কাজ শেষ হবে প্রায় দুই কোটি পাঠ্যবইয়ের। ফলে বছরের প্রথম দিন শিশুদের হাতে সব বই তুলে দেয়া যাবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। ৬০টির অধিক প্রতিষ্ঠানকে ১০২ লটে প্রায় পৌনে ২ কোটি পাঠ্যবইয়ের কার্যাদেশ দেয়া হয়।
একটি ছাপাখানার ব্যবস্থাপক জানান, ছাপা সম্পন্ন, বাঁধাই এবং জেলা-উপজেলায় পৌঁছাতে কার্যাদেশ দেয়ার পর কমপক্ষে ৫৫ দিন সময় দিতে হবে। এর পরও জরিমানা দিয়ে আরও ২৮ দিন পর্যন্ত বই ছাপাতে পারবে ছাপাখানাগুলো। এ হিসাবে এসব পাঠ্যবই ১ জানুয়ারি শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছানো অনিশ্চিত।

নানা জটিলতায় বিলম্ব

এনসিটিবি এবং মুদ্রণ শিল্প সমিতি ও মুদ্রাকরদের সূত্রে জানা গেছে, আগামী শিক্ষাবর্ষের (২০১৮) বিনামূল্যের পাঠ্যপুস্তকের মধ্যে শুধু মাধ্যমিকের পরিমার্জিত ও কথিত সুখপাঠ্য বই নিয়েই সমস্যা লেগেছিল দীর্ঘ সময়, প্রাথমিকের বই ছাপা কাগজের অনুমোদন নিয়ে চলেছে নানা ধরনের টালবাহানা, বেশ কয়েক দিন ধরে প্রাথমিকের পাঠ্যবই ছাপা বন্ধ ছিল বিভিন্ন ছাপাখানায়, আর প্রাথমিকের যেসব বই ছাপা হয়েছে, সেগুলোর কাভার পেজের কাগজ সরবরাহ নিয়েও চলেছে নানা টানাপড়েন।
সরকারের পক্ষ থেকে সমস্যা তৈরির অভিযোগও রয়েছে। নিয়মানুযায়ী চুক্তির ৮৪ দিনের মধ্যে প্রাথমিকের বই ছাপিয়ে মাঠপর্যায়ে পাঠানোর কথা। ৪২ দিনের মধ্যে অর্ধেক এবং বাকি ৪২ দিনের মধ্যে বাকি বই দেয়ার কথা। বিদ্যালয়ে বই দেয়ার আগে সেগুলো মাঠপর্যায়ে গুদামে রাখা হয়। পরে সেখান থেকে বিদ্যালয়ে বই যায়। প্রাথমিক স্তরের বই ছাপার চুক্তি হয় ১৭ জুলাই। কিন্তু দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ করে চুক্তির ৩৪ দিন পর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর পরিদর্শন সংস্থা নিয়োগ করে। ফলে প্রাথমিক স্তরের বই ছাপার কাজ শুরু করতেই ৩৪ দিন পিছিয়ে যায়। পরে মুদ্রণকারীরা দরকষাকষি করে সময় বাড়িয়ে ২৯ নভেম্বরের মধ্যে বই ছাপিয়ে মাঠপর্যায়ে পাঠানোর সময় পান। কিন্তু দরপত্র মোতাবেক কাজ নিলেও মুদ্রণকারীরা বলছেন, দরপত্র অনুযায়ী প্রাথমিক স্তরের বই বাঁধাইয়ের কাজ করতে গেলে নির্ধারিত সময়ে কাজ দেয়া সম্ভব হবে না।
মুদ্রণ সমিতির কর্মকর্তারা বলছেন, অন্যান্যবার জুনের মধ্যেই বই ছাপার কাজ শুরু করেন তারা। অথচ এবার আগস্ট-সেপ্টেম্বরে পুরোদমে কাজ শুরু করা যায়নি। ফলে সঠিক সময়ে বই ছাপার কাজ শেষ করতে পারবে কি না তা নিয়ে সংশয়ে প্রকাশ করেছেন।

নিম্নমানের কালি-কাগজ

পাঠ্যবই নিম্নমানের কালি ও কাগজে ছাপানোর অভিযোগ উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে কাগজের পুরুত্ব, উজ্জ্বলতা ও বাঁধাইয়ের মান নিয়েও। প্রথম থেকে নবম শ্রেণী পর্যন্ত সব বইয়ের ক্ষেত্রেই কম-বেশি একই চিত্র। প্রাথমিকের সব এবং নবম শ্রেণীর ১২টি পাঠ্যবই এবার চার রঙে ছাপা হচ্ছে। কিন্তু ওইসব বইয়ের ছবি দেখে স্পষ্ট বোঝা যায় না সেগুলোতে আসলে কিসের ছবি। পাতায় পাতায় লেপ্টে আছে কালি। বাঁধাইয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে নিম্নমানের আঠা। এর ফলে বইয়ের স্থায়িত্ব নিয়েও আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এনসিটিবি সূত্রে জানা যায়, কয়েক দিন আগে সরেজমিন পরিদর্শনকালে দেশের একটি বড় প্রতিষ্ঠানে নিম্নমানের কাগজে ছাপানো বই ধরা পড়ে। তাৎক্ষণিক প্রমাণিত হয়, ৫৫ জিএসএমের (পুরুত্ব) কাগজে বই ছাপানো হয়েছে। অথচ ওই বই ৬০ জিএসএমে ছাপানোর কথা। তখন সেখানেই ২৫ হাজারের বেশি বই বাতিল করা হয়। এ ছাড়া এনসিটিবির নিজস্ব টিমের অভিযানে পিএ প্রিন্টার্সেও কাগজের মান নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। শুধু এই দুই প্রতিষ্ঠান নয়, বিভিন্ন স্তরের কাজ নেয়া অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের কাগজ, ছাপা, বাঁধাই ইত্যাদির মান নিয়ে প্রশ্ন আছে।
নভেম্বরের শুরুতে প্রাথমিক স্তরের বইয়ের ওপর একটি অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা পড়ে মন্ত্রণালয়ে। তাতে দেখা যায়, এ স্তরের বই ছাপায় নিম্নমানের কাগজ ব্যবহার করায় বলাকা প্রিন্টার্সের ১১০ টন, লেটার অ্যান্ড কালারের ১৪০ টন, লিখন আর্ট প্রেসের ৫০ টন, এস আর প্রিন্টার্সের ৬০ টন, প্রিয়াংকা ৫০ টন, জুপিটার ও সীমান্ত নামে দুটি প্রিন্টার্সের ১০০ টন, সাগরিকা ১৯০ টন, পিএ প্রিন্টার্স ২০ টনসহ আরও কয়েকটি ছাপাখানার নিম্নমানের কাগজ বাতিল করা হয়। এ ছাড়া ছোট ছোট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাগজের ছাড়পত্র না দিয়ে বাতিল করা হয়। এভাবে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক মিলিয়ে প্রায় দুই হাজার টন কাগজ বাতিল করা হয় বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা যা বলেন

মুদ্রণ শিল্প সমিতির সভাপতি তোফায়েল খান বলেন, বইয়ের কাজ শুরু করতে না পারার দায় এনসিটিবির। আমরা একাধিক চিঠি দিয়ে এনসিটিবিকে সতর্ক করেছি। সেপ্টেম্বরে প্রাথমিকের ওয়ার্ক অর্ডার করেও তারা ভুল সিডি দেয়। সেই সিডি ফেরত নিয়ে পুনরায় সিডি দিয়েছে এক মাস পর ২০ আগস্ট।
তিনি বলেন, এনসিটিবি আমাদেরকে বই ছাপার জন্য যে শর্ত দিয়েছে সেই শর্ত তারাই যেন মেনে চলে এটাই আমাদের দাবি। কারণ, তারা নিম্নমানের কারখানাকে কাজ দিয়েছে। তারা এনসিটিবির শর্ত মেনে কাজ করে না। তাদের কাজের ব্যর্থতার দায় আমরা কেন নেবো? এতো কিছুর মধ্যেও আমরা মোটামুটি নিশ্চিত সঠিক সময়ের মধ্যে আমরা বই দিতে পারবো না।
জাতীয় পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা বলেন, নবম শ্রেণীর উল্লিখিত ১২টি বিষয়ে দুই কোটি বই ছাপা হবে। যথাসময়ে এগুলোর ছাপা শেষ করা কোনো ব্যাপার নয়।
তিনি আরও বলেন, কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নিম্নমানের কাগজ বা কালিতে ছেপেছে বলে অভিযোগ এসেছে। কিন্তু অভিযোগ প্রমাণ ছাড়া তো ব্যবস্থা নেয়া যায় না। এ ব্যাপারে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

লেখক : সাংবাদিক

SHARE

Leave a Reply