পানামা পেপারস কেলেঙ্কারি বিশ্বমোড়লদের লুটপাটের আসল রহস্য -মো: কামরুজ্জামান বাবলু

কী আশ্চর্য!(What a surprise!) সম্ভবত কিছুদিন ধরে পৃথিবীর কোটি মানুষের মুখে এমন শব্দই বেশি উচ্চারিত হয়েছে। অভিজাত শ্রেণীর ক্ষমতাধর যেসব ব্যক্তির একটু ইশারায় লাখ-কোটি মানুষ দেশপ্রেমে জেগে ওঠেন, অকাতরে বিলিয়ে দেন নিজের জীবন; সেই কর্তাব্যক্তিদের মুখোশের আড়ালে এ কোন চেহারা! উঁচু তলার এই মানুষগুলো তাদের জীবনের শান-শওকত ও ঠাট-বাট বজায় রাখতে কতটা নিচে নামতে পারেন, দেশের মানুষের সাথে কতটা ঠগবাজি আচরণ করতে পারেন তারই যেন এক জ্বলজ্যান্ত দৃষ্টান্ত দেখলো বিশ্ববাসী। অথচ এদেরই কথার মায়াজালে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে বেমালুম ভুলে যান কত শত চাওয়া-পাওয়া।
বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনার কথা বলছি। এটি হচ্ছে বিশ্বব্যাপী করফাঁকির সবচেয়ে বড় গোপন তথ্য (Documents) যা পানামা পেপারস কেলেঙ্কারি (Panama Papers scandal)  নামেই সবার কাছে পরিচিত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে বড় বড় রাঘববোয়াল কিভাবে বিভিন্ন কৌশলে কর ফাঁকি দিয়ে নিজেদের সম্পদের পাহাড় গড়েছেন তার ১ কোটি ১৫ লাখ গোপন নথিপত্র ফাঁস করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে মোসাক ফনসেকা নামে পানামার একটি আইনি প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের অনলাইন থেকে ফাঁস হওয়া নথিপত্রগুলোকেই বলা হচ্ছে পানামা পেপারস বা পানামা পেপারস কেলেঙ্কারি। ইতোমধ্যে কেলেঙ্কারিকে ‘ক্রাইম অব দ্য সেঞ্চুরি’ বা ‘শতাব্দীর অপরাধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
এরইমধ্যে এই কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে বেকায়দায় পড়েছেন খোদ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। চলতি বছরের গত ৯ এপ্রিল ক্যামেরনের পদত্যাগ চেয়ে তার বাসভবনের সামনে ব্যাপক বিক্ষোভ দেখিয়েছেন দেশটির হাজার হাজার মানুষ। মোসাক ফনসেকার মাধ্যমে কর ফাঁকি দিয়ে তার বাবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিকানা পেয়েছিলেন এমন স্বীকারোক্তির পর এবার নিজের ব্যর্থতার কথাও স্বীকার করলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, তার বাবার কোম্পানির কর ফাঁকির বিষয়ে সঠিক ব্যবস্থাপনা করতে পারেননি।
প্রকাশিত নথিতে দেখা যায়, ক্যামেরনের প্রয়াত বাবা ইয়ান ডোনাল্ড ক্যামেরন একটি অফশোর কোম্পানি স্থাপন করেছিলেন যা তিরিশ বছর ধরে ব্রিটেনে কোন কর দেয়নি। যদিও প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের দফতর থেকে জানানো হয়েছে, এই কোম্পানিতে মিস্টার ক্যামেরনের কোন শেয়ার নেই।
তবে, এমন আতত্মপক্ষ সমর্থনকে মেনে নিতে পারেছেন না ব্রিটিশ নাগরিকরা। তারা পানামা হ্যাট পরে এবং ক্যামেরনের পদত্যাগের দাবিসংবলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে সমবেত হয়ে বিক্ষোভ করেন। বিশাল একটি শূকরের মুখে ক্যামেরনের মুখোশ লাগিয়ে জনতা স্লোগান তোলেন “ডেভিড ক্যামেরন মাস্ট রিজাইন, ট্যাক্স ইভেশন ইজ এ ক্রাইম।”
এদিকে, অফশোর বিনিয়োগ থেকে সুবিধা পাওয়ার কথা স্বীকার করার পর ক্যামেরনের পদত্যাগ দাবি করেছেন লেবার দলের এমপি জন মান। তাকে সমর্থন করেছেন লিবারেল ডেমোক্র্যাট দলের নেতা টিম ফ্যারোন। একই সঙ্গে সরকারের অন্য মন্ত্রীদের আয়কর রিটার্ন প্রকাশ করারও আহ্বান জানান লেবার দলের এমপিরা।
যদিও প্রাথমিক সমালোচনার মুখে ক্যামেরন বলেছিলেন, বাবার অফশোর কোম্পানিতে তার পরিবার কোনো সুবিধা পায়নি। কিন্তু ঘটনার তিন দিন পর  ক্যামেরন স্বীকার করেন, তিনি ও তার স্ত্রী সামান্থা ক্যামেরন তার বাবা ইয়ান ক্যামেরনের অফশোর ট্রাস্টের শেয়ারের মালিকানা পেয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগেই তিনি ওই অংশীদারিত্ব বিক্রি করে দিয়েছেন এবং লভ্যাংশের ওপর যুক্তরাজ্যের নিয়ম অনুযায়ী আয়করও  দিয়েছেন।
এদিকে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের ছেলেমেয়েদের করফাঁকি ও অর্থপাচারের তথ্য ফাঁস হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে লংমার্চের ডাক দেন সাবেক ক্রিকেটতারকা ও বিরোধীদলীয় নেতা ইমরান খান। অন্যদিকে ভারতের রাজনীতিবিদ ও তারকাদের কর ফাঁকির বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদনের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এএফপি, টেলিগ্রাফ, পাক ট্রিবিউন ও ডেইলি মেইলসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মোসাক ফনসেকার ফাঁস হওয়া নথিতে পাঁচ শতাধিক ভারতীয়ের নাম রয়েছে।
পানামা পেপারস কেলেঙ্কারির ঘটনায় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠজনদেরও নাম এসেছে। তবে, কেলেঙ্কারিতে উঠে আসা ‘দুর্নীতি’র কথা অস্বীকার করেছেন পুতিন। তিনি দুর্নীতির কথা অস্বীকার করে উল্টো অভিযোগ করেন, বিরোধীরা রাশিয়াকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। পুতিন পানামা পেপারসে আসা তার দীর্ঘদিনের বন্ধু সার্গেই রদুগিনের প্রশংসা করে বলেন, তার মত নাগরিকের জন্য গর্ব করা উচিত। সঙ্গীতের যন্ত্র থেকে তিনি তার অর্জিত সব সম্পদ সম্প্রতি সরকারি প্রতিষ্ঠানে দান করেছেন। তা ছাড়া একটি কোম্পানির সঙ্গে পুতিনের মেয়ে ক্যাটরিনারও সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তথ্য এসেছে নথিতে।
মোসাক ফনসেকার ফাঁস হওয়া পৌনে তিন টেরাবাইট নথিতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের পাশাপাশি আগামী বিশ্বের প্রধান পরাশক্তি হিসেবে যাকে ভাবা হচ্ছে সেই চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নিকটাত্মীয়দের নামও রয়েছে। এই তালিকায় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের শ্যালক ডেং জিয়াগুইসহ দেশটির ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামের(Politburo Standing Committee) অন্তত আটজন সাবেক ও বর্তমান সদস্য রয়েছেন।
এ তালিকায় আরও আছে সৌদি আরবের বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ বিন আবদুল রহমান আল সৌদ এবং মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের ছেলে আলা মোবারক। রাজনৈতিক ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের পাশাপাশি ফুটবল তারকা লিওনেল মেসি, ভারতের চলচ্চিত্র জগতের খ্যাতিমান অভিনেতা অমিতাভ বচ্চন ও তার পুত্রবধূ অভিনেত্রী ঐশ্বরিয়া রাইয়ের নামও পাওয়া গেছে ওই নথিতে।
এ ছাড়া ফাঁস হওয়া নথিতে বাংলাদেশেরও বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ীর নাম রয়েছে। তবে এই প্রতিবেদন তৈরির সময় পর্যন্ত তারা কী পরিমাণ অর্থ পাচার করেছেন, সে ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য জানা যায়নি। অবশ্য পানামা পেপারস-এ যে বাংলাদেশীদের নাম এসেছে, তাদের বিষয়ে অনুসন্ধানে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গত ৭ এপ্রিল (২০১৬) দুদকের উপ-পরিচালক এস এম এম আখতার হামিদ ভুঁইয়াকে প্রধান করে এ বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়।
নথিতে উঠে আসা উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে আরও রয়েছেন ইরাকের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আয়াদ আল্লায়ি ও দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট জ্যাকব জুমা। ট্যাক্স ফাঁকির মাধ্যমে এ ব্যক্তিত্বরা বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা করেছেন নিজেদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে। এ ছাড়া এ সুবিধা নিয়েছেন ব্রিটেনের হাউজ অব লর্ডসের ছয়জন সদস্য, রক্ষণশীল দলের সাবেক তিনজন এমপি, ব্রিটিশ রাজনৈতিক দলগুলোতে ডোনেশন দেয়া কয়েক ডজন ডোনার। আছেন লিবিয়ার সাবেক নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি ও সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের ট্যাক্স ফাঁকি দেয়ার তথ্য। এ ছাড়া মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের এক ছেলে ও ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা ফিফার  নৈতিকতা বিষয়ক কমিটির কয়েকজনের নামও উঠে এসেছে নথিতে। এ ছাড়া মাদক ও অস্ত্র ব্যবসায় এবং উত্তর কোরিয়া ও ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে মার্কিন সরকার কর্তৃক কালো তালিকাভুক্ত হওয়া কমপক্ষে ৩৩ জনের কর ফাঁকির তথ্য রয়েছে পানামা পেপারসে।
তবে, পানামা পেপার্স কর ফাঁকির কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছেন আইসল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী সিগমুন্ডুর গুনলাউগসন। বিক্ষোভের মুখে গত ৫ এপ্রিল (২০১৬) তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। অফশোর অ্যাকাউন্ট খুলে তিনি কর ফাঁকি দিয়েছেন এমন খবর ফাঁস হওয়ার পর থেকে তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চলছিল।
ফাঁস হওয়া গোপন দলিলে দেখা গেছে মিস্টার গুনলাউগসন এবং তাঁর স্ত্রী ‘উইনট্রিস’ নামের একটি অফশোর কোম্পানির মালিক। তিনি এবং তার পরিবার বহু মিলিয়ন ডলারের সম্পদ গোপন করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে। তবে মিস্টার গুনলাউগসন কোন অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
বিশ্বজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টিকারী এই পানামা পেপারস ফাঁসের পর রাজনৈতিকভাবে মারাত্মক চাপের মুখে পড়েছেন অর্থপাচারকারী রাষ্ট্রপ্রধান ও ক্ষমতাবানরা। এ নথি ফাঁসের পর বিশ্বের ২০০টিরও বেশি দেশের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব, ৭২ জন বর্তমান ও সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান, কয়েক শ’ রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, সেলিব্রেটি আর নামীদামি ক্রীড়াব্যক্তিত্বের গোমর ফাঁস হয়ে গেছে। এসব প্রভাবশালীর সম্পদ আড়াল, ট্যাক্সফাঁকি আর অর্থপাচারের খবর বিশ্বের সামনে উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে।
উল্লেখ্য, মোসাক ফনসেকা নামে এই প্রতিষ্ঠানটি বৈশ্বিক ব্যবসায়িক আইনের ওপর ভর করে ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেন পানামার দুই নাগরিক জার্গেন মোসাক ও রঞ্ঝামন মোসাক। বিশ্বের ৪২টির বেশি দেশে প্রতিষ্ঠানটির বর্তমানে শাখা রয়েছে। এসব শাখায় কর্মরত আছেন প্রায় ৬০০ কর্মী। তবে এই প্রতিষ্ঠানের ব্যবহারকারী পানামার বাইরেরও হতে পারে। এতে ব্যক্তিগত হিসাব ছাড়াও যে কোনো কোম্পানির নামে হিসাব খোলা যায়। মূলত গ্রাহক আকৃষ্ট করতে ব্যবসায়িক সহযোগীদের নিজেদের ব্র্যান্ড নাম ব্যবহারের সুযোগ দেয় মোসাক ফনসেকা। এ প্রতিষ্ঠানটি সুইজারল্যান্ড, সাইপ্রাস, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসসহ বিভিন্ন স্থানে ট্যাক্স হ্যাভেন পরিচালনা করে। নিজ দেশের বাইরে অর্থ রাখার বিষয়ে দুনিয়াজুড়ে যেসব প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের সেবা প্রদান করে তার মধ্যে মোসাক ফনসেকার অবস্থান বর্তমানে চতুর্থ। সারা বিশ্বে অন্তত তিন লক্ষাধিক কোম্পানির সঙ্গে তারা কাজ করে।
তবে, সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো পানামা পেপারস কেলেঙ্কারিতে কোনো মার্কিন নাগরিকের নাম এখনো উচ্চারিত হয়নি। অনেকেরই ধারণা, আগামী নভেম্বর মাসে মার্কিন নির্বাচনকে ঘিরে এই পানামা পেপারস কেলেঙ্কারি সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ইস্যু হয়ে উঠতে পারে। কারণ ২০১১ সালে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা যখন পনামা ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট সাইন করেন তখন সেক্রেটারি অব স্টেটস ছিলেন হিলারি রডহ্যাম ক্লিনটন। হিলারি যেহেতু এবার ডেমোক্র্যাট দলীয় প্রেসিডেন্সিয়াল প্রার্থী এবং এখন পর্যন্ত নিজ দলীয় বার্নি স্যানডার্সের তুলনায় প্রাথমিকে এগিয়ে আছেন। তাই হিলারি বা ডেমোক্র্যাট বধ নাটকের প্রধান ঘুঁটি হতে পারে এই পানামা পেপারস। আর মুসলিমবিদ্বেষী রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য পানামা পেপারস কেলেঙ্কারি শেষ পর্যন্ত আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে।
ধারণা করা হচ্ছে, ২০১০ সালে উইকিলিকস এবং ২০১৩ সালে মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা অ্যাডওয়ার্ড স্নোডেনের ফাঁস করা নথির চেয়েও পানামা পেপারস-এর পরিমাণ বেশি। ফাঁস হওয়া নথিগুলোতে দেখা যাচ্ছে, কিভাবে গোপনীয়তার আড়ালে এই আইনি প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বনেতাদের অর্থপাচার, নিষেধাজ্ঞা এড়ানো এবং করফাঁকিতে সহযোগিতা করেছে। সারা বিশ্বের  স্বৈরশাসকসহ সাবেক ও বর্তমানসহ অন্তত ৭২ জন রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানের নিজেদের দেশ থেকে অর্থ লোপাটের ভয়াবহ চিত্র রয়েছে এই পানামা পেপারসে।
বিবিসি, গার্ডিয়ান ও ভারতের ইন্ডিয়া এক্সপ্রেসসহ বিশ্বের ১০৭টি মিডিয়া হাউজের ৩২৫ জন সাংবাদিক এবং ৭৮টি দেশ এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের সংগঠন আইসিআইজের (ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টস) ডিরেক্টর জেরার্ড রাইল বলেছেন, “নথিগুলোতে প্রতিষ্ঠানটির গত ৪০ বছরের প্রাত্যহিক কার্যক্রমের তথ্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। যদি এগুলোর সত্যতা নিশ্চিত হয়, তবে তা পুরো দুনিয়াকে সত্যি সত্যিই কাঁপিয়ে দেবে।”
মজার ব্যাপার হলো, এত বড় গোপন তথ্যফাঁসের বিষয়ে খোদ মোসাক ফনসেকা কোনো বিস্তারিত আলোচনায় যেতে আগ্রহী নয়। যদিও তারা এখনো দাবি করছে গ্রাহকদের গোপনীয়তার রক্ষার দিকেই অধিক নজর তাদের। মোসাক ফনসেকা বলতে চাইছে তারা মানি লন্ডারিংবিরোধী আইন মেনে চলছেন। সেদিকে খেয়াল রেখেই তারা মক্কেলদের সেবা দিয়েছেন। নিজেদের সেবার যে কোনো ধরনের অপব্যবহার রোধে তারা সচেষ্ট ছিলেন এবং থাকবেন।
সারা বিশ্বের ২ শ’ দেশের বর্তমান ও সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান, খেলোয়াড়, অভিনেতা, ব্যবসায়ীদের ব্যাংক হিসাবসহ সব মিলিয়ে ২ লাখ ১৪ হাজার লোকের নাম রয়েছে মোসাক ফনসেকার  তালিকায়। যাদের মধ্যে অন্তত ১৪০ জনের বেশি রাজনীতিবিদ। এর আগে ব্যাংকিং সেক্টরে গোপন নথি ফাঁস করে ২০১৪ সালে প্রথম নজরে আসে মোসাক ফনসেকা। তখন ইউরাপের ক্ষুদ্রতম দেশ লুক্সেমবার্গের বেশ কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানি ও কয়েকজন কোটিপতির ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস করেছিল। এ ছাড়া ১৯৮০ দশকে একজন পাকিস্তানি বিনিয়োগকারীর প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স ব্যাংকের অর্থপাচারের তথ্য এই মোসাক ফনসেকা থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। মোসাক ফনসেকার কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও মানি লন্ডারিংয়ের প্রচুর অভিযোগ রয়েছে। বিগত ২০১০ সালে এই প্রতিষ্ঠানের ব্রাজিল কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ উঠেছিল, যার তদন্ত এখনও চলছে। তবে মোসাক ফনসেকা সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
সত্যিই কিভাবে বড় বড় শাসক নিজেদের সম্পদ রক্ষায় নির্লজ্জের মতো শেল কোম্পানি (Offshore)  খুলে জনগণের ওপর অর্থের বোঝা চাপিয়েছেন সেই দৃশ্য অবলোকন করে যেন হতবাক বিশ্ববাসী। উল্লেখ্য, মূল অর্থের মালিকের নাম গোপন রাখার পাশাপাশি ওই অথের্র ব্যবস্থাপনা করাই এই ধরনের কোম্পানির প্রধান কাজ। সাধারণত আসল মালিকের নাম এসব কোম্পানির কোনো কাগজে থাকে না। শেয়ার মালিকদের মধ্যে থাকেন আইনজীবী ও অ্যাকাউন্ট হোল্ডাররা। কখনও কখনও মালিকের অফিসের অফিস সহকারীও এসব শেল কোম্পানির পরিচালক বনে যান। কাগজে-কলমে একটি ঠিকানা ছাড়া আর কিছুই থাকে না বলে অনেক সময় শেল কোম্পানিগুলো ‘লেটারবক্স’ কোম্পানি নামেও পরিচিত।
বিশ্বের প্রায় সব বড় বড় দেশের সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে কর্তাব্যক্তিদের বাস্তবজীবন যখন এমন কলঙ্কময়, তখন সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি প্রতিরোধে করণীয় কী?
বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ সময় চিন্তাভাবনা করেও কোন সদুত্তর খুঁজে পেলাম না। তবে, আমরা যারা ইসলামের অনুসারী তাদের সামনে অন্তত শত শত উদাহরণ রয়েছে ন্যায়বিচার, নিষ্ঠা ও সততার। যেখানে খলিফা উমরের (রা.) মতো শাসক রয়েছে ইসলামের সোনালি ইতিহাসের পাতায়, সেখানে অন্তত মুসলিম দেশের কোন শাসক বা কোন মুসলিমের ললাটে যেন এমন কলঙ্কের দাগ না লাগে সেই কামনা করছি।
গত বছরের (২০১৫) জুন মাসের ১৬ তারিখে কানাডার টরেন্টো থেকে প্রকাশিত ‘বেঙ্গলি টাইমস’ নামে একটি অনলাইন পত্রিকায় প্রকাশিত এক খবরে দেখা যায় দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী ও আম আদমি পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল খলিফা ওমরের প্রশংসা করেছেন। এমনকি তিনি বলেন, “খলিফা উমরের (ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা) শাসনব্যাবস্থা আমাকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। আমি জনসাধারণের উন্নতির লক্ষ্যে তার এই শাসনব্যবস্থা অনুসরণ করার চেষ্টা করব”।
ইন্ডিয়া ইসলামিক কালচারাল সেন্টার (আইআইসিসি) এবং নোবেল এডুকেশন ফাউন্ডেশন কর্তৃক আয়োজিত ‘পার্সোনালিটি ডেভেলপমেন্ট ওয়ার্কশপ’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে খলিফা উমর ফারুকের জীবনী নিয়ে আতিকা সিদ্দিকি নামে এক শিক্ষার্থীর একটি বই উপহার দেয়ার সময় দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়াল খলিফা উমর সম্পর্কে এরূপ মন্তব্য করেছিলেন।
কেজরিওয়াল আরও বলেছিলেন, তিনি উমরের জীবনী নিয়ে পুরো বই অধ্যয়ন করবেন এবং কর্মক্ষেত্রে উমরের শাসনব্যবস্থাকে মডেল হিসাবে গ্রহণ করবেন।
পরিশেষে এসব ঘটনায় আমার কাছে মনে হয়, যতই মুখে সুশাসন তথা পশ্চিমাদের ভাষায় (good governance)  বলতে বলতে মুখে ফেনা তোলা হোক না কেন, মানুষের মধ্যে ধর্মীয় অনুশাসন ও সত্যিকারার্থে পরকালীন জবাবদিহিতার অনুভূতি জাগিয়ে না তোলা পর্যন্ত পৃথিবী থেকে অন্যায়, লুটপাট, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে শুরু করে সব ধরনের পাপাচার ও দুরাচার দূর করা সম্ভব হবে না।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক

SHARE

Leave a Reply