প্রকৌশলে উচ্চশিক্ষা নৈতিক ভিত্তি ও প্রস্তুতি

মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সাবিত

Processorআর সবকিছুর মতো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উচ্চশিক্ষার ধারণা আর পদ্ধতির মধ্যে পরিবর্তন এসেছে। সময়ের পরিক্রমা পেরিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষার দ্বার এখন অনেক বেশি উন্মুক্ত এ অর্থে যে কেবল মেধার ভিত্তিতে এখন যে কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেন। বাংলাদেশে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মেধাভিত্তিক যে ভর্তিপদ্ধতি চালু রয়েছে, সংগত কারণেই তা ভীষণ প্রতিযোগিতামূলক; আজকের আলোচনা যেহেতু প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিসংক্রান্ত তাই উচ্চশিক্ষার এই ক্ষেত্রটিতে প্রবেশ করার নৈতিক দৃষ্টিকোণ, ভর্তির সুযোগ এবং পাস করার পর সুপরিসর কর্মক্ষেত্র নিয়েই কথা বলতে চাই।
সবার আগে চাই সঠিক মানসিকতা। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছুদের আগ্রহ, প্রতিযোগী মনোভাব নিখাদ এবং নিরেট এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। জীবনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তার স্বার্থে সময়ের এই বাঁকে ক্যারিয়ার যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ এ ব্যাপারে সবাই ওয়াকিবহাল। নিঃসন্দেহে এই সচেতনতা একটি আশার দিক; কিন্তু শিক্ষাকে কেবলমাত্র ব্যক্তি সাফল্যের উপায় হিসেবে ব্যবহার করার মানসিকতা যদি সমান্তরালভাবে অগ্রসর হয় তাহলে সেই আশার গুড়ে বালি। কেননা শিক্ষা তখন শল্যচিকিৎসকের উপকারী ছুরির বদলে দুষ্কৃতকারীর অস্ত্রে পরিণত হয় যা সমাজকে আলোকিত না করে শোষণ-নিপীড়নে নতুন মাত্রা যোগ করে। তাই উচ্চশিক্ষা অর্জনের প্রেিত্যাগিতায় পদার্পণ করার আগে মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য যেখানে ব্যক্তি তার অর্জিত জ্ঞানকে আত্মোন্নয়নের পাশাপাশি বৃহত্তর সামাজিক কল্যাণের জন্যও ব্যবহার করার শপথ গ্রহণ করবে।
সমাজের অবকাঠামোগত উন্নতিকল্পেই প্রকৌশল পেশার উৎপত্তি ঘটেছিল। প্রাকৃতিক আইনগুলোর বাস্তব প্রয়োগে জীবনকে সহজ ও গতিশীল করার নৈতিক আবেদনই মানুষকে প্রকৌশলী হতে বাধ্য করেছে। তাই প্রকৌশল পেশা এবং এর ক্রমোন্নতি সভ্যতার সূচনা থেকে আজ অবধি মানুষের নিরবচ্ছিন্ন সম্পর্ককে প্রতিবিম্বিত করে। সেই নিরিখে কেবল পেশা হিসেবেই নয় বরং সভ্যতাকে এগিয়ে নেয়ার মহান দায়িত্ব হিসেবেই প্রকৌশলবিদ্যাকে মূল্যায়ন করতে হবে। আর যারা অগ্রগতির এই মিছিলে শামিল হতে চায় সাময়িক চাকচিক্যের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নকে প্রাধান্য দেয়ার মানসিকতাই তাদেরকে আরো বেশি সফল করে তুলবে।
বাংলাদেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সরকারি অনুদান ও ভর্তুকিপ্রাপ্ত; শিক্ষার ন্যূনতম মান নিশ্চিত করতে যতটুকু অর্থনৈতিক সামর্থ্যরে প্রয়োজন তার জোগান দিতেই সরকারি তহবিল হিমশিম খায়। আর আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা পরিচালনার জন্য যে বেসরকারি সহযোগিতা দরকার তার ক্ষেত্র এখনো তৈরি হয়নি। এমন প্রেক্ষাপটে আমাদের দেশের গবেষকরাই বিশ্বের যে সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে যুগান্তকারী গবেষণা হয় সেখানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। অর্থাৎ বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা তাদের জন্য প্রশিক্ষণের কাজ করে এবং উচ্চতর শিক্ষা অর্জনের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে বিবেচিত হয়। দেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে এ উপযোগ কম কিছু নয়। বরং বাংলাদেশে শিক্ষার ব্যয় তূলনামূলকভাবে অনেক কম হওয়ায় এই সুযোগটির সদ্ব্যবহার করে বৃহত্তর কল্যাণের জন্য কাজ করার সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে। উচ্চমাধ্যমিক-উত্তর বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির ঐকান্তিক প্রচেষ্টা তাই সহজেই অনুমেয়। প্রতিযোগিতা যেহেতু আকাশচুম্বী সে জন্য পাঠ্যসূচিভিত্তিক প্রস্তুতির পাশাপাশি ইতিবাচক নৈতিক মূল্যবোধ নিয়ে অগ্রসর হলেই কেবলমাত্র নিজেকে অধিক যোগ্য প্রমাণিত করা সম্ভব হবে।
কিছুদিন আগেই ২০১৪ সালের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। অবশ্য ইতোমধ্যেই প্রকৌশলসহ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল। সব-মিলিয়ে আগামী দেড়-মাস থেকে দুই মাসের মধ্যেই ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে।ব ুয়েট, রুয়েট, কুয়েট বা চুয়েট-এ ভর্তিপ্রস্তুতি নিতে থাকা অনেকেই হয়ত ফলাফলভিত্তিক প্রাথমিক বাছাইয়ে বাদ পড়ে যেতে পারেন। এ ব্যাপারে হতাশার কিছু নেই। বরং প্রকৌশল ভর্তি কোচিং করে যোগ্যতার যে উন্নতি হয়েছে তা ধরে রাখতে হবে এবং অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদে সর্বোচ্চ ফলাফল করার চেষ্টা করতে হবে। প্রথমিক বাছাইয়ে উত্তীর্ণ হওয়ার পর পরীক্ষার আগে যে ক’দিন সময় পাওয়া যায় তার সর্বোচ্চ ব্যবহার করাই ভর্তির নিশ্চয়তা দিতে পারে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ববর্তী বছরের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সমাধান, বিষয়ভিত্তিক এবং সামগ্রিক সিলেবাসের ওপর মডেল টেস্ট দেয়ার ওপর জোর দিতে হবে। পরীক্ষা দরজায় কড়া নাড়তে শুরু করলে আমরা সবচেয়ে বড় যে ভুলটি করি তা হলো হঠাৎ মনে আসা পাঠ্যসূচির এমন কিছু বিষয় নিয়ে মেতে ওঠা যার কৌশলগত গুরুত্ব কম। একটা বিষয় আমাদের খুব ভালোভাবে মনে গেঁথে নিতে হবে; দু বছর উচ্চমাধ্যমিকের পুস্তকগুলো অধ্যয়নের পরও এর কিছু বিষয় আমাদের আয়ত্তের বাইরে থেকে যাওয়াটা অসম্ভব কিছু নয়। এর পরিমাণ নিতান্তই সামান্য। আর ভর্তি নিশ্চিত করার জন্য সম্পূর্ণ উত্তর করার চেয়ে সঠিকভাবে সর্বোচ্চ উত্তর করাই জরুরি। তাই এ সমস্ত ছোটখাটো বিষয় নিয়ে হতাশ হবার চেয়ে নিজের সামর্থ্যরে সবটুকু উজাড় করে দেবার প্রস্তুতিই নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, যারা ভর্তি পরীক্ষায় সাফল্য পায় না তা এ জন্য নয় যে তারা কম জানে বরং জানা জিনিসটি সঠিক উত্তর করতে না পারাই তাদের ব্যর্থতার কারণ হয়। পাঠ্যবইয়ের সকল প্রশ্নের সমাধান যদি কারো কাছে পরিষ্কার হয় তাহলে তার ভর্তির সুযোগ কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না ইনশাআল্লাহ। বিজ্ঞানের বিষয়গুলোর পাশাপাশি ইংরেজিতে একটু বিশেষ খেয়াল রাখলে অন্য প্রতিযোগীর চেয়ে এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়; কেননা ভর্তি পরীক্ষায় খুব সামান্য নম্বরের ব্যবধানেই সুযোগ প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নির্ভর করে।
এবারে ভর্তিপরীক্ষা সংক্রান্ত কিছু বিষয় বিশেষভাবে নজরে আনতে চাই। ভর্তিপরীক্ষার প্রস্তুতি যেমন এক মহাকর্মযজ্ঞ তেমনি এ পরীক্ষার ফরম পূরণ করা থেকে শুরু করে প্রবেশপত্র সংগ্রহও কোন লঘু-কর্ম নয়। প্রতিটি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়েই আবেদন করতে হবে অনলাইনে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ওয়য়েবসাইটে গিয়ে। এরপর নির্ধারিত নিয়মে মোবাইলের মাধ্যমে (অধিকাংশ ক্ষেত্রে টেলিটক) টাকা জমা দিতে হবে। এক্ষেত্রে খুব ভালোভাবে লক্ষ রাখতে হবে যেন প্রয়োজনীয় প্রতিটি কোড নম্বর, পিন নম্বর পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে লেখা হয়। কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইনে আবেদনপত্র জমা নিলেও অনেক সময় প্রিন্টেড কপির প্রয়োজন পড়ে। তাই আবেদনপত্র অনলাইনে জমা দেয়ার আগে এর একটি প্রিন্টেড কপি রাখা প্রয়োজন। বিশেষভাবে লক্ষ রাখতে হবে আবেদন, আবেদন ফি ইত্যাদি জমা দেয়ার শুরু ও শেষের তারিখ এবং কোন অবস্থাতেই শেষ মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করা যাবে না; বরং হাতে এমন সময় নিয়ে আবেদন করতে হবে যাতে আবেদন প্রক্রিয়ায় কোন ভুল ধরা পড়লে সেটা সংশোধন করা যায়। বুয়েট, চুয়েট, রুয়েট, কুয়েট-এ ভর্তিসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন তারিখ, জমা দেয়ার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এ সমস্ত বিষয়ের একটি তালিকা তৈরি করে ফেলা যায় যেন সবকিছু হাতের কাছেই থাকে। বিশেষ করে কোটাভিত্তিক আবেদনকারীরা নিজ নিজ কোটা সত্যায়নকারী বিভিন্ন কাগজপত্র তৈরি রাখতে হবে। পরীক্ষার অন্তত একদিন আগে থেকে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষাকেন্দ্রের নিকটবর্তী কোথাও থাকার প্রয়োজনীয়তা ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন। বিশেষ করে পরীক্ষার আগের রাত যানবাহনে কাটিয়ে পরদিন পরীক্ষা দেয়ার পরিকল্পনা থেকে অবশ্যই বের হয়ে আসতে হবে। পথ পাড়ি দেয়ার ধকল তোলাই রইল; যান্ত্রিক বা রাজনৈতিক গোলযোগ, মহাসড়কে যানজটসহ তাৎক্ষণিক উদ্ভূত নানা সমস্যায় সময়মত পরীক্ষার হলে পৌঁছাতে না পারার অগুণতি উদাহরণ রয়েছে। দীর্ঘ প্রস্তুতির এই অকাল ও অনভিপ্রেত প্রয়াণ গভীর দুঃখের কারণ হতে পারে; অতএব সাধুরা সাবধান!
মানুষের জীবনে সময়ের তুলনায় কাজের পরিমাণ অনেক বেশি। গতিময় জীবনে ছন্দপতনের ফাঁদ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সর্বত্র। আজকে মুহূর্তের সামান্য অসতর্কতা আগামীকাল অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হতে পারে। আমাদের জীবন অনিশ্চিত, সীমিত; অথচ মৃত্যু অনিবার্য, অনন্তকালের যাত্রাপথের সূচনাকাল। তাই উচ্চশিক্ষাকে কেবল একটি সুন্দর জীবনের প্রস্তুতি হিসেবে দেখলেই চলবে না বরং এর মধ্য থেকেই পরকালীন জীবনের পাথেয় সংগ্রহ করতে হবে। শিক্ষাপ্রদত্ত শক্তিকে যারা অবিচার, দুর্নীতি আর শোষণের হাতিয়ারে পরিণত করেছে, তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের ফল সম্পর্কে সচেতন করতে হবে, তাদের লোলুপ দৃষ্টি থেকে সমাজকে সংরক্ষণের চেষ্টা চালাতে হবে। তাহলেই উচ্চশিক্ষার ইতিবাচক ফল লাভ করা সম্ভব। ভবিষ্যতের প্রকৌশলী আর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছু বিদ্যোৎসাহীদের প্রতি অনেক শুভকামনা। সমাজের অবকাঠামো ও পরিকাঠামোগত উন্নয়নে তাদের ভূমিকা আরশের মালিক কবুল করুন। আমিন।

SHARE

Leave a Reply