প্রত্যাশার বাংলাদেশ প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য ও সৎ নেতৃত্ব -মো: আতিকুর রহমান

আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে আজ থেকে পঁয়তাল্লিশ বছর আগে। যে স্বাধীনতা অর্জনের মধ্য দিয়ে এ দেশের জনগণ পেয়েছে একটি লাল-সবুজ পতাকা, পেয়েছে একটি স্বাধীন ভূখন্ড। পৃথিবীর অন্যান্য অনেক দেশের মতো বাংলাদেশ তথা ভারতীয় উপমহাদেশও এক সময় ব্রিটিশ কলোনি ছিল। দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের পর ব্রিটিশ শাসন-শোষণের নাগপাশ থেকে মুক্তি পেয়ে ১৯৪৭ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আবার হয়ে পড়ে পাকিস্তানের কলোনি। ১৯৭১ সালে দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তান অর্জন করে স্বাধীনতা। পৃথিবীর বুকে নতুন করে জন্ম নেয় একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র- বাংলাদেশ।
পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক শোষণ, রাজনৈতিক নিপীড়ন ও সর্বক্ষেত্রে বৈষম্য থেকে মুক্তির আশায় সেদিন স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এ দেশের আপামর মুক্তিকামী ছাত্র-জনতা, ছিনিয়ে এনেছিল কাক্সিক্ষত বিজয়। যে বিজয় ছিল পাকিস্তানের ক্ষমতালোভী অগণতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে মুক্তিকামী জনতার বিজয়। কেননা জনগণের দাবি ছিল গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। এর দাবিতে জনগণ গড়ে তুলেছিল এক অপ্রতিরোধ্য শান্তিপূর্ণ আন্দোলন। মুক্তিকামী জনগণের এ ন্যায্য, গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের ওপর সেদিন রাতের আঁধারে সামরিক আগ্রাসন চালায় পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী। তারপরের ইতিহাস রক্তঝরা সংগ্রামের ইতিহাস!
যে আশা-প্রত্যাশার স্বপ্ন বুকে ধারণ করে সেদিন এ দেশের জনগণ দেশমাতৃকার জন্য জীবন বিলিয়ে দিয়েছে, স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর আজ দেশের জনগণের প্রত্যাশা কতটুকু পূরণ হয়েছে কিংবা আমাদের অর্জনে স্বাধীনতার প্রত্যাশার প্রতিফলন কতটুকু ঘটেছে সেটাই আজকের বিবেচ্য বিষয়। আমরা যা অর্জন করেছি, স্বাধীনতা-পরবর্তী এ দীর্ঘ সময়ে, এর জন্যই কি এ দেশের জনগণ ঢেলে দিয়েছে এত রক্ত, এতগুলো তাজা প্রাণ! এর জন্যই কি অপেক্ষা করছেন আমাদের বেঁচে থাকা গর্বিত মুক্তিযোদ্ধারা!
স্বাধীনতাযুদ্ধ নিয়ে চলছে আজ রাজনীতির নামে অপরাজনীতি। অপরাজনীতির হাতে পড়ে আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধ এবং এর অর্জন আজ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হওয়ার পথে। দেশের আপামর জনসাধারণ স্বাধীনতার জন্য জীবনবাজি রেখে লড়াই-সংগ্রাম করার পরও তা আজ কিছু মানুষ এবং দলের উত্তরাধিকারসূত্রে লব্ধ পৈতৃক সম্পত্তিতে রূপ নিয়েছে। স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ বলে জাতিকে করা হয়েছে বিভক্ত। অথচ স্বাধীনতা-সংগ্রাম হতে পারত দেশের ঐক্য ও সংহতির প্রতীক।
আজ স্বাধীনতার ৪৫ বছর পার করেও আমাদের কাছে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে আমরা কি আমাদের সেই গণতান্ত্রিক মুক্তি লাভ করতে পেরেছি? গণতন্ত্রের মূল প্রেরণাই হলো অন্যের মত, পথ ও আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতা। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে আজ পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা অবশিষ্ট আছে বলে সচেতন জনগোষ্ঠী মনে করে না। দেশের রাজনীতিবিদদের আচরণ ও মুখের ভাষা প্রতিনিয়ত জনগণের কাছে হাসি-ঠাট্টার বিষয় হিসেবে পরিণত হচ্ছে। দেশের রাজনীতিবিদদের আচরণ আজ এমন যে আমরা যা বলি তাই শতভাগ ঠিক এবং বিরোধীরা কখনোই ঠিক করতে বা বলতে পারে না। জাতীয় কোনো সমস্যায়ই রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পর ঐকমত্যে পৌঁছতে পারে না। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এখন সীমিত। সব সরকারের আমলেই তাদের বিরোধী কোনো মতামত প্রকাশে পূর্ণ স্বাধীনতা পাওয়া যায়নি এবং বর্তমানেও পাওয়া যাচ্ছে না।
সরকারের সমালোচনামূলক কোনো তথ্য বা বার্তা প্রকাশের অপরাধে(!) কোনো কোনো মিডিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। প্রকাশক বা পরিচালকের বিরুদ্ধে আনা হয়েছে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলাসহ নানা অভিযোগ। সরকারের কোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নাগরিক সমাজ কর্তৃক নানা সমালোচনা, মিটিং-মিছিল ও মানববন্ধন সত্ত্বেও সরকার তার সিদ্ধান্তে অটল থাকাকে বিজয় বিবেচনায় কাজ করে যাচ্ছে। নিজেদের ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী ও পাকাপোক্ত করার জন্য বিরোধী দলকে রাজনৈতিক ময়দান থেকে বিতাড়িত করাই আজ ক্ষমতাসীনের মূল রাজনৈতিক লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে।
স্বাধীনতা অর্জনের দীর্ঘ সময়ে প্রশ্নমুক্ত কোনো নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে এখনো দেখা যায়নি, যেখানে পরাজিত দল স্বেচ্ছায় নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়েছে। এখানে বিজয়ী দল সবসময় নির্বাচন স্বচ্ছ ও অবাধ নিরপেক্ষ হওয়ার দাবি করে, অপর দিকে পরাজিত দল ভোট কারচুপি, কেন্দ্র দখল ও নানা অনিয়মের অভিযোগ করে থাকে। নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম প্রায় সময়েই প্রশ্নবিদ্ধ হতে দেখা যায়। কোনো বিশেষ দলকে বিশেষ দৃষ্টিতে দেখা এবং অবৈধ সুযোগ দেয়ার অভিযোগও ওঠে তাদের বিরুদ্ধে।
নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণ নিয়েও চলে রাজনীতি। ভোটবাণিজ্য নির্বাচনের পূর্ববর্তী সময়ে রাজনীতিবিদদেরকে একটা অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ করে। যার যত টাকা নির্বাচনের মাঠে সে তত বেশি প্রভাবশালী। দেশের অশিক্ষিত, অসচেতন মানুষ বিক্রি হয় টাকার কাছে, ফলে পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য তারা দেশকে তুলে দেয় অযোগ্য নেতৃত্বের হাতে। টাকার জোরে নমিনেশন নিয়ে ব্যবসায়ীরা রাজনীতির মূল নেতা হয়ে বসেন। হিসাব মতে, বাংলাদেশে বর্তমান সংসদ সদস্যদের মধ্যে শতকরা ৫৬ জনই ব্যবসায়ী। ফলে সিদ্ধান্তগ্রহণে ব্যবসায়িক স্বার্থই প্রাধান্য পায় এবং সাধারণ জনগণের প্রয়োজন সিদ্ধান্তগ্রহণকে খুব একটা প্রভাবিত করতে পারে না। ব্যক্তি, দল এবং গোষ্ঠীকেন্দ্রিক স্বার্থ এবং সুবিধার কাছে দেশের জনগণের চাহিদা বিলীন হয়ে যায়।
দীর্ঘ সময়েও দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল কোনো আদর্শের ওপর দাঁড়াতে পারেনি। ফলে দেশের বর্তমান রাজনীতি হয়ে পড়েছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক। বিশেষ কোনো ব্যক্তির মাহাত্ম্য বর্ণনাই দলগুলোর রাজনীতির মূল ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিযোগিতা চলে ব্যক্তি পূজনীয়ের গুণ প্রচার করার এবং প্রতিপক্ষের রাজনীতিবিদদের চরিত্র হননের। ফলে রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে আজ গণতন্ত্র প্রায়ই অনুপস্থিত। সাধারণ দলগুলোতে দলীয় প্রধান যা বলেন তাই দলের জন্য অবধারিত, এর বাইরে যাওয়ার কিংবা ভিন্ন কোনো মতপ্রকাশ করে দলে টিকে থাকার সুযোগ সেখানে খুবই সীমিত। ফলে রাজনীতি আজ জ্ঞানভিত্তিক না হয়ে তোষামোদভিত্তিক হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক দেশ। কেননা বাংলাদেশের সংবিধানে আছে, ‘আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা-যেখানে সব নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত করা হবে।” এটি আামাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রেরণাও বটে। আমরা আমাদের শাসন করব এবং নিজেদের শাসনে আমরা আগের চেয়ে ভালো থাকব, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদের উন্নয়ন ঘটবে, বিশেষ করে আইন-শৃঙ্খলার উন্নয়ন এবং জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তা থাকবেÑ এটাই ছিল আমাদের প্রত্যাশা। কিন্তু বর্তমানে আমাদের দেশ অনেকাংশে তার দিক পরিবর্তন করে উল্টোপথে হাঁটা শুরু করেছে। স্বাধীনতার পর রক্ষীবাহিনীর অত্যাচার এ দেশের মানুষের স্বাভাবিক জীবন-যাপনকে যেমন দুর্বিষহ করে তুলেছিল বর্তমান সময় রাষ্ট্রীয় বাহিনীর অত্যাচার তেমনিভাবে দেশের মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে, যা অনেকটাই স্বাধীন দেশের বন্দী নাগরিকের মতো।
সাধারণ জনগণের নিরাপত্তা দেয়ার জন্য যারা নিয়োজিত তাদের কাছেই আজ জনগণ সবচেয়ে বেশি অনিরাপদ। যাদের ছায়ায় জনগণ নিরাপত্তা বোধ করার কথা ছিল, পারতপক্ষে নিরাপত্তার জন্য জনগণ আজ তাদের ছায়াও মাড়ায় না। বিপদে পড়লেও জনগণ সহজে থানামুখী হতে আগ্রহী হন না। কারণ জনগণের মাঝে এ ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে যে, থানায় গেলে বিপদ তো কমেই না, উল্টো হয়রানি বাড়ে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এখন বাঘ থেকেও ভয়ঙ্কর বিবেচিত। সেই ভয় থেকেই প্রবাদ প্রচলিত, ‘বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা, আর পুলিশ ছুঁলে ছত্রিশ ঘা’। সম্ভবত বর্তমানে ছত্রিশ ঘা-তেও পুলিশের হিংস্রতা যথেষ্টভাবে ফুটে ওঠে না। গুমের রাজনীতি বা গুমবাণিজ্যের সাথে পুলিশ বা র‌্যাব (র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন) এর সম্পর্কতো বর্তমানে প্রমাণিত সত্য। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যবহার এখন একটা রাজনৈতিক প্রথায় পরিণত হয়েছে। বিরোধী দলের মিছিল-সমাবেশ, সরকারবিরোধী কোনো মিছিল বা সরকারের পছন্দ নয় এমন কোনো দাবিতে আন্দোলনে সরাসরি গুলি করে মানুষ হত্যার যে নজির বর্তমান সরকারের সময়ে পুলিশ কর্তৃক সৃষ্টি হয়েছে তা মানবমনে ত্রাসের জন্ম দিয়েছে।
পুলিশের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ক্রমেই বেড়ে চলছে। পুলিশ সদর দফতর সূত্র জানায়, ২০১৩ সালে বিভিন্ন অপরাধে সংশ্লিষ্টতার কারণে ১৪ হাজার ৫০০ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয় পুলিশ সদর দফতর। কিন্তু এতে অপরাধপ্রবণতা কমেনি, উল্টো ২০১৪ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ হাজার ৫০০ জনে। অর্থাৎ এক বছরে সাজাপ্রাপ্ত পুলিশের সংখ্যা বেড়েছে ১ হাজার। এমতাবস্থায় পুলিশবাহিনীর ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে নানা পদক্ষেপ নেয়া সত্ত্বেও পুলিশের অপরাধপ্রবণতা না কমে বরং ক্রমেই বেড়ে চলেছে। পুলিশের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের মধ্যে রয়েছে প্রধানত জনসাধারণের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ, ক্ষমতার অপব্যবহার করে অর্থ উপার্জন, ঘুষ আদায়, চাঁদাবাজি, নারীকেলেঙ্কারি, মাদক ব্যবসাসহ আরো নানা অনৈতিক কর্মকান্ড। পুলিশকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার ও নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে দুর্নীতির আশ্রয় নেয়ার কারণে পুলিশ সদস্যরা দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছেন, যার ফলে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা ব্যাহত হচ্ছে।
পুলিশের অপরাধসমূহ নানাভাবে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করা হয়। যেটুকু প্রকাশ হয়ে পড়ে তা-ও সবসময় সরাসরি অস্বীকার করা হয়। আর যখন তা-ও পারা যায় না তখন সেটাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে ঘোষণা করা হয়।
আইনশৃঙ্খলার অবনতি সমাজ ও প্রশাসনে অনিয়ম ও দুর্নীতি বিস্তারে সহায়ক পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। আজ প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনায় স্থবির দেশ। অনিয়ম, দুর্নীতি জেঁকে বসেছে সর্বত্র। ঘুষ রূপ নিয়েছে প্রথায়।
প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতিসহ সকল ক্ষেত্রেই দুর্নীতি। নিয়োগের অস্বচ্ছতার দরুন মামা-খালুদের জোরে অযোগ্যরাই বড় বড় পদ দখল করে আছে। ফলে প্রশাসন হয়ে পড়ছে দুর্বল এবং অকার্যকর। প্রশাসনিক দুর্বলতা জাতীয় নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে, বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা। প্রশাসনিক দুর্নীতি কার্যসম্পাদনব্যয় বৃদ্ধি করে যা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থানকে খারাপভাবে প্রভাবিত করছে।
দেশ ও জাতির উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য যারা চিন্তা করেন তারা বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার অব্যবস্থাপনায় দারুণ চিন্তিত। শিক্ষার্থীদের পাসের হার ব্যাপক হারে বৃদ্ধি করেই সরকার বিজয়ের বাঁশি বাজিয়ে যাচ্ছেন। প্রশ্নপত্র ফাঁস, পরীক্ষাকেন্দ্রে নকল করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির দিকে নজর দিচ্ছেন না দায়িত্বরত কর্তাব্যক্তিরা। পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে সর্বোচ্চ ফলাফল করেও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলোতে পাস নাম্বার অর্জন করতেও ব্যর্থ হচ্ছে অধিকাংশ শিক্ষার্থী, যা আমাদের শিক্ষার দুর্বলতা ও অকার্যকারিতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।
সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত করে অন্যায়, অপরাধ ও দুর্নীতি বন্ধ করতে হলে বিচার বিভাগকে স্বাধীন, কার্যকর ও স্বচ্ছতা বজায় রাখা জরুরি। কেননা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য অপরিহার্য। কিন্তু বিচার বিভাগ আজ ক্ষমতাসীনদের নিকট বন্দী, বিচার বিভাগ আজ ব্যবহৃত হচ্ছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য। বিরোধীদের দমন, নিপীড়ন ও হয়রানি করতে বিচারব্যবস্থা একটি মোক্ষম হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। সরকার কর্তৃক বিরোধীদের নামে কারণে-অকারণে মামলা ঠুকে দেয়া বর্তমান রাজনীতির একটা সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু সরকারি দলের নেতাকর্মীরা অবাধে অপরাধ করে পার পেয়ে যাচ্ছে।
সম্প্রতি সংবিধান সংশোধন করে বিচারকদের অভিশংসন ও অপসারণের ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে সংসদের হাতে। এর ফলে বিচার বিভাগ হয়ে পড়েছে সংসদের কাছে জিম্মি।
সড়কযোগাযোগের বেহাল দশার দরুন দুর্ঘটনা আমাদের দেশের নিত্যদিনের সঙ্গী। রেল যোগাযোগব্যবস্থা অবহেলা আর দুর্নীতির ফলে প্রায় ধ্বংসের দুয়ারে দাঁড়িয়ে। অথচ একটু নজর দিলেই এ খাত একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারত।
বর্তমানে বাংলাদেশে বেকার প্রায় ৩০ লাখ যুবক। অনলাইনে চাকরির বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে প্রতিদিন এক লাখ বিশ হাজার গ্রাহক চাকরি খোঁজেন। চাকরিদাতাদের নজর কাড়তে সংশ্লিষ্ট একটি সাইটে রেজিস্ট্রেশন করে জীবনবৃত্তান্ত রেখে দিয়েছেন ১১ লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি শিক্ষিত বেকার। সরকারের হিসাব অনুযায়ী গত পাঁচ অর্থবছরে সরকারি খাতে কর্মকর্তা-কর্মচারী হিসেবে মোট নিয়োগ পেয়েছেন ২ লাখ ৬৬ হাজার ২৭৫ জন। এই পাঁচ অর্থবছরে সরকারি চাকরিতে কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ৬০ হাজার ২৯২ জন। তাদের সবাই স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাস। বেসরকারি খাত দেশের কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বেশি জোগানদাতা। কিন্তু দেশের কর্মক্ষম জনসংখ্যা যে হারে বাড়ছে, বেসরকারি খাত সে হারে সম্প্রসারিত হচ্ছে না। এ দেশে প্রতি বছর গড়ে ২০ লাখেরও বেশি মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। এর মধ্যে সাড়ে পাঁচ লাখ উচ্চশিক্ষিত।
২০১৫ সালে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের শহুরে যুবকদের ৩৬ শতাংশ এবং পল্লী যুবকদের ৪২ শতাংশ পুরোপুরি বেকার। ২০১৪ সালের ইকোনমিস্ট ইনটেলিজেন্স ইউনিটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু ৪৭ শতাংশ স্নাতক পাস বেকার। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে আফগানিস্তান (৬৫ শতাংশ) ছাড়া আর কোনো দেশে এত বেশি উচ্চশিক্ষিত বেকার নেই। বেকারদের মধ্যে কলা ও মানবিক বিষয়ে অধ্যয়নকারী উচ্চশিক্ষিতরাই বেশি। এ বিশাল জনগোষ্ঠীকে দক্ষ কর্মীতে রূপান্তর ও কর্মে নিয়োগ ব্যতিরেকে জাতীয় অগ্রগতি অসম্ভব।
বর্তমান রাজনৈতিক অরাজকতা ও দুর্নীতির ফলে বিনিয়োগকারীরা অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। ফলে দেশীয় বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদেশী বিনিয়োগও উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে।
তৈরী পোশাক খাত বর্তমানে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত। এ খাতও দুর্নীতি, অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার দরুন আশানুরূপ উন্নতি করতে পারেনি। আমাদের দেশের অন্যতম পোশাক আমদানিকারক দেশ আমেরিকা তাদেরGSP (General System of Preference) বাতিল করে দিয়েছে।
বিগত ৪৫ বছরে অনেক অনেক দল ও মতের সরকার এসেছে কিন্তু জনসাধারণের অবস্থার খুব বেশি উন্নয়ন হয়নি। শোষণ-বঞ্চনা ও দমন-নির্যাতনের অবসান ঘটানোর পাশাপাশি ভোটের অধিকার তথা গণতন্ত্র অর্জন করাই ছিল যেখানে স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রধান উদ্দেশ্য, সেখানে দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, স্বাধীনতার কথিত একক দাবিদার বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে সে গণতন্ত্রই নির্বাসিত হয়েছে। অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে জনদাবির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে অবিলম্বে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সকল দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনের ব্যবস্থা করে দেশে সুষ্ঠু গণতন্ত্র ও শান্তি ফিরিয়ে আনবে বলেই সরকারের প্রতি দেশের জনগণের প্রত্যাশা।
বাংলাদেশ সত্যিকারার্থে আজ মহাসঙ্কটে নিপতিত। আমাদের সার্বভৌমত্ব আজ হুমকির সম্মুখীন। দেশের মানুষের নৈতিক পদস্খলন আগের তুলনায় অনেক গুণ বেড়ে গেছে। ধর্মীয় অনুশাসনের চর্চা কমে যাওয়ায় মানুষের মাঝে পশুত্বসুলভ আচরণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অপসংস্কৃতির করাল গ্রাসে আমাদের বর্তমান প্রজন্ম ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। অঙ্কুরেই নষ্ট হওয়ার পথে আমাদের আগামীর সম্ভাবনাগুলো। দেশ ও জাতির এ ক্রান্তিলগ্নে আমাদের উচিত হবে বর্তমান এ সঙ্কট থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে বের করা, জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে সে লক্ষ্যে কাজ করে যাওয়া। নেতৃত্বের মাঝে সৎ গুণাবলির বিকাশ সাধনের চেষ্টা করা। ফলে তারা দুর্নীতিগ্রস্ত হবে না, দেশের সম্পদ আত্মসাৎ করবে না। কেননা দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করা ছাড়া দেশের সামগ্রিক অগ্রগতি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। তাই আমাদের বর্তমান প্রজন্মকে ধর্মীয় অনুশাসন পালনে অভ্যস্ত করে গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। এতে করে তারা সৎ হয়ে গড়ে উঠতে পারবে। সে জন্য অবশ্যই শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। আসুন সকল ভেদাভেদ ভুলে আমরা যার যার অবস্থান থেকে দেশকে গড়ার এবং দেশের সমৃদ্ধি আনয়নে ভূমিকা পালন করি। এ দেশ আমার, আপনার এবং আমাদের সকলের। অযুত সম্ভাবনার বাংলাদেশ আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বিশ্বের বুকে সগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াক- এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
লেখক : এমফিল গবেষক

SHARE

Leave a Reply