প্রত্যাশিত বিপ্লবের জন্য সফল নেতৃত্বের ভূমিকা অনস্বীকার্য -মোবারক হোসাইন

নেতৃত্ব একটি শিল্প। পৃথিবীতে এই শিল্পের কুশলীর অভাব প্রচন্ড। নেতৃত্ব শব্দটি ছোট্ট কিন্তু ব্যাপক অর্থবোধক। এই ছোট্ট শব্দটির প্রায়োগিক গুরুত্ব এত বেশি যে ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র কোনো কিছুই এর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করতে পারে না। যেকোনো সংগঠন, সমাজ বা রাষ্ট্রে সুষম উন্নয়ন ও এর ইপ্সিত লক্ষ্যে পৌঁছার কেবলমাত্র উপায় হলো একটি যোগ্য নেতৃত্ব। যোগ্য নেতৃত্ব যেমন কোনো সংগঠন, সমাজ বা জাতিকে সফলতার চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে, আবার বিপরীত দিকে অযোগ্য নেতৃত্ব ঠিক একটি সংগঠন, সমাজ বা জাতিকে ধ্বংসের অতল তলে নিমজ্জিত করতে পারে। মাঝি ছাড়া যেমন নৌকা চলে না তেমনি নেতৃত্ব ছাড়া দেশ, জাতি ও সমাজ চলতে পারে না। নেতা যদি যোগ্য হন তাহলে তিনি তার জনগোষ্ঠীকে সফলতার সাথে লক্ষ্যপানে নিয়ে যেতে পারেন। সফলতার সাথে যদি আদর্শের সমন্বয় ঘটে তাহলে ঐ নেতৃত্ব হয় মডেল নেতৃত্ব। Elder L. Tom Perry বলেন, “We live in a world that is crying for righteous leadership based on trust worthy Principles.

নেতৃত্বের প্রকারভেদ
১. আনুষ্ঠানিক বিচারে
ক. আনুষ্ঠানিক নেতৃত্ব (Formal Leadership): প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে যে নেতৃত্ব সৃষ্টি হয় তাকে আনুষ্ঠানিক নেতৃত্ব বলে। যথা- সভাপতি, সহসভাপতি, সাধারণ সম্পাদক।
খ. অনানুষ্ঠানিক নেতৃত্ব (Informal Leadership) : ব্যাপক জনগোষ্ঠী একসঙ্গে কাজ করতে গিয়ে এদের মধ্যে যে নেতৃত্ব সৃষ্টি হয় তাকে অনানুষ্ঠানিক নেতৃত্ব বলে। এরূপ নেতৃত্বের আনুষ্ঠানিক ক্ষমতা থাকে না। কিন্তু এরা দলভুক্তদের ওপর যথেষ্ট প্রভাব বিস্তারকারী হন।

২. প্রেষণার ধরন বিচারে
ক. ইতিবাচক নেতৃত্ব (Positive Leadership): উৎসাহ ও স্বীকৃতি প্রদানের মাধ্যমে কাজ আদায় করে নেয়াকে ইতিবাচক নেতৃত্ব বলে।
খ. নেতিবাচক নেতৃত্ব (Negative Leadership) : ভয়-ভীতি প্রদানের মাধ্যমে যে নেতৃত্ব কাজ আদায় করে নেয় তাকে নেতিবাচক নেতৃত্ব বলে।
৩. ক্ষমতা প্রয়োগের ধরন বিচারে
ক. স্বৈরতান্ত্রিক নেতৃত্ব (Autocratic Leadership) : যে নেতৃত্ব ইচ্ছামত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখে তাকে স্বৈরতান্ত্রিক নেতৃত্ব বলে।
খ. পিতৃসুলভ নেতৃত্ব (Paternalistic Leadership) : যে নেতৃত্ব স্নেহ-মমতার মাধ্যমে শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত করে কাজ আদায়ের চেষ্টা করে তাকে পিতৃসুলভ নেতৃত্ব বলে।
গ. অংশগ্রহণমূলক নেতৃত্ব(Participative Leadership) : প্রয়োজনীয় কর্তৃত্ব অধস্তনদের কাছে হস্তান্তর ও অধস্তনদের সাথে পরামর্শ গ্রহণের মাধ্যমে নেতৃত্ব প্রদান করাকে অংশগ্রহণমূলক নেতৃত্ব বলে।
ঘ. লাগামহীন নেতৃত্ব (Free-rein Leadership) : নেতা অধস্তনদেরকে লক্ষ্য নির্ধারণ করে দিয়ে অধস্তনদের কাছ থেকে দূরে থাকেন। এক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনই নেতার সফলতা নির্ভর করে।
৪. সম্পর্কের দিক-বিচারে
ক. ব্যক্তিগত নেতৃত্ব (Personal Leadership) : নেতৃত্বে নেতা ও কর্মীদের মধ্যে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক বিরাজ করাকে ব্যক্তিগত নেতৃত্ব বলে।
খ. অব্যক্তিগত নেতৃত্ব (Impersonal Leadership) : কতিপয় উপনেতার মাধ্যমে অধস্তনদের পরিচালনা করাকে অব্যক্তিগত নেতৃত্ব বলে।
নেতার ক্ষমতার উৎস
ক. আইনানুগ ক্ষমতা : সাংগঠনিক কাঠামোতে পদমর্যাদাগত ক্ষমতাকে বোঝায়। যথা- বিভাগীয় সম্পাদকদের ওপর সাধারণ সম্পাদকের ক্ষমতা।
খ. বাধ্য করার ক্ষমতা : অধস্তনদের বাধ্য করা বা শাস্তি প্রদানের ক্ষমতাকে বোঝায়।
গ. পুরস্কৃতকরণের ক্ষমতা : যে নেতৃত্বে অধস্তনরা মনে করে দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করলে পদোন্নতি বা পুরস্কৃত হওয়া যাবে।
ঘ. প্রশংসা অর্জনের ক্ষমতা : অন্যের প্রশংসা অর্জনের মাধ্যমে সৃষ্ট পরিবেশ নেতার জন্য এক ধরনের ক্ষমতায় রূপ নেয়।
ঙ. বিশেষজ্ঞজনিত ক্ষমতা : নেতার যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা সম্পর্কে উচ্চ ধারণার ফলে সৃষ্ট ক্ষমতাকে বোঝায়।
চ. মানবীয় বা আন্তঃব্যক্তিক দক্ষতা : মানবীয় গুণাবলি ও দক্ষতা এক ধরনের ক্ষমতায় রূপ নেয়।
ছ. যোগাযোগব্যবস্থা : তথ্য আদান-প্রদানের পদ্ধতি ও যোগাযোগের সক্ষমতা নেতার ক্ষমতা নির্ধারণ করে।
জ. অধস্তনদের মান ও মনোভাব : অধস্তনদের মান, যোগ্যতা, দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গি নেতৃত্বের ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
ঝ. আনুগত্য ও শৃঙ্খলা
ঞ. প্রাতিষ্ঠানিক ঐতিহ্য

নেতার কাজ
ক. প্রাতিষ্ঠানিক দিক বিচারে
১. পরিকল্পনা প্রণয়ন ও নীতিনির্ধারণ
২. উপযুক্ত সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি
৩. কর্মী নির্বাচন ও মানোন্নয়ন
৪. নির্দেশ প্রদান
৫. তত্ত্বাবধান ও সমন্বয় সাধন
৬. কার্যকর নিয়ন্ত্রণ
খ. কর্মীর দিক বিচারে
১. আস্থা সৃষ্টি : অধস্তন জনশক্তি ও সংশ্লিষ্ট সকলের নিকট।
২. দলগত প্রচেষ্টার উন্নয়ন : অধস্তনদের সমানভাবে কাজে লাগানো।
৩. প্রেষণা দান
৪. যোগাযোগ রক্ষা

নেতৃত্বের গুণাবলি
নেতৃত্বের দুই ধরনের গুণাবলি হতে পারে-
ক. জন্মগত গুণাবলি
খ. অর্জিত গুণাবলি
ক. জন্মগত গুণাবলি
* উচ্চ বংশ হওয়া
* মেধাবী হওয়া
* সাহসী ও দৃঢ় মনোবল
* আমানতদার হওয়া
* ধৈর্য ও সংযমী হওয়া
* শালীনতা
* দয়া ও ক্ষমাশীল হওয়া
* শক্তিমত্তা থাকা
* স্বভাবজাত আকর্ষণ ও ব্যক্তিত্ব
* মানসিক শক্তি
* দৃঢ় সঙ্কল্প ও স্থিতিশীলতা
* নম্র ও সদ্ব্যবহার
* অল্পে তুষ্ট ও ত্যাগী হওয়া
* দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হওয়া
* দায়-দায়িত্ব গ্রহণের মানসিকতা থাকা
খ) অর্জিত গুণাবলি
১. জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্ব
* ইসলামের জ্ঞান
* নিজ পেশা ও কাজের সার্বিক জ্ঞান
* ভাষা জ্ঞান
* ইতিহাস সংক্রান্ত জ্ঞান
* সমকালীন দেশ ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি
* বিজ্ঞানের আবিষ্কার সম্পর্কিত জ্ঞান
* মনোবিজ্ঞান সম্পর্কিত জ্ঞান
২. উন্নত আমল
* সুন্দর মুয়ামালাত-মুয়াশারাত
৩. সাংগঠনিক দক্ষতা
* সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা
* আনুগত্যের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন
* সাংগঠনিক প্রজ্ঞা
* অন্যদের পরিচালনার যোগ্যতা
* অফিস ব্যবস্থাপনা
* সৃজনশীলতা
* নেতৃত্ব সৃষ্টির যোগ্যতা
* পরামর্শভিত্তিক কাজ করা
* যোগাযোগের দক্ষতা
৪. সামাজিক হওয়া
* অপরের অধিকারকে প্রাধান্য দেয়া
* অপরের প্রতি সদয় হওয়া
৫. বাগ্মিতা
৬. সময়ানুবর্তিতা
* সময় হত্যা না করা
* অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কাজ করা
* দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দূর করা
* সঠিক সময়ে সঠিক কাজ করা
* একত্রে অনেক কাজ করা
৭. ভারসাম্যপূর্ণ আচরণ
* কর্মীদের মাঝে ইনসাফ কায়েম করা
* প্রটোকল রক্ষা করা
* স্বজনপ্রীতি না করা
৮. প্রেরণা সৃষ্টির যোগ্যতা
৯. সর্বোচ্চ কোরবানি দেয়া
* সময়ের কোরবানি
* শ্রমের কোরবানি
* অর্থের কোরবানি
১০. টার্গেটভিত্তিক কাজ করা

নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য
* নেতা বিলাসপ্রিয় হবে না
* নেতা রাগ বা বিদ্বেষভাবে, স্বজনপ্রীতি বা স্বেচ্ছাচারিতা করবেন না।
* নেতা হবেন কাজ ও সম্মানের পথপ্রদর্শক।
* নেতা অবশ্যই হবেন মিতব্যয়ী ও দুর্নীতিমুক্ত।
* নেতা হবেন গাম্ভীর্যপূর্ণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী।
* নেতা তার অধস্তন নেতাদের সাথে তিনভাবে যোগাযোগ করবেনÑ তার দেয়া নির্দেশের মাধ্যমে, তার পাওয়া তথ্যের মাধ্যমে, তার পরিদর্শনের মাধ্যমে।
* সত্যিকার নেতা তার কৃতকর্মের দায়কে সর্বদাই কাঁধে নিতে প্রস্তুত থাকবেন।
* নেতা অবশ্যই জানবেন কখন, কিভাবে, কী করতে হবে।
* মহান নেতা হচ্ছেন মহান ব্যক্তিত্বের অধিকারী।
* ধৈর্যধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রবণতা।
* সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা।
* পরিবেশ ও পরিস্থিতি পর্যালোচনা।
* দলীয় কারণে প্রচুর আবেগ।
* শৃঙ্খলা বিধানের যোগ্যতা।
* পরিস্থিতি বিশ্লেষণ।
* ক্ষমা করা।
* প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মীবাহিনী গঠন।
* বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার।
* অন্যকে বোঝার কৌশল।

নেতৃত্ব গঠনপদ্ধতি
১. টার্গেট করা
২. টার্গেটকৃত ব্যক্তিকে সান্নিধ্যে রেখে যোগ্য করে গড়ে তোলা
৩. দীক্ষা দেয়া
৪. পূর্ণাঙ্গ দীনের অনুশীলন করানো
৫. জ্ঞান দান করা
৬. প্রশিক্ষণ দেয়া
৭. আত্মত্যাগ, শ্রম ও সাধনার মানসিকতা তৈরি করা
৮. মূর্খতা, সঙ্কীর্ণতা, কৃপণতা, দুনিয়াপ্রীতি, কাপুরুষতামুক্ত হওয়ার মনন গঠন করা
৯. উদারতা, দানশীলতা, পরকালমুখী চিন্তা ও বীরত্বপূর্ণ মনোভাবসহ মৌলিক মানবীয় গুণাবলির প্রকাশ ঘটানোর মনন গঠন করা
১০. আন্তরিকতার সাথে ভুল সংশোধন করা
১১. ভালো কাজে উৎসাহ প্রদান
১২. স্বপ্ন সৃষ্টি করা
১৩. ইসলামী আন্দোলনের প্রেরণা সৃষ্টি করা

আজকে বিশ্ব নয়া নেতৃত্বের প্রত্যাশী
“It is essential for mankind to have a new leadership!
It is necessary for rhe new leadership to preserve and develop the material fruits of the creative genius of Europe, and also to provide mankind with such high ideals and values as have so far remined undiscovered by mankind, and which will also acquaint humanity with a way of life which is harmonious with human nature, which is positive and contructive, and which is practicable.
Islam is the only system which possesses those values and this way of life.’’ (Mile Stone, সাইয়েদ কুতুব শহীদ)
অনুবাদ : অনাগত দিনের নতুন নেতৃত্বকে ইউরোপের সৃজনশীল প্রতিভার অবদানগুলোকে সংরক্ষণ ও উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে মানবজাতির সামনে এমন মহান আদর্শ ও মূল্যবোধ পেশ করতে হবে যা আজ পর্যন্ত অনাবিষ্কৃতই রয়ে গেছে। ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে মানবজাতির সামনে একটি ইতিবাচক গঠনমূলক ও বাস্তব জীবন বিধান পেশ করতে হবে যা মানব স্বভাবের সঙ্গে সুসামঞ্জস্যশীল। একমাত্র ইসলামী ব্যবস্থাই উল্লিখিত মূল্যবোধ ও জীবনবিধান দান করতে সক্ষম।
বিশ্ব আজ যে নয়া নেতৃত্বের প্রত্যাশী সে নেতৃত্বকে জ্ঞান ও অন্তর্দৃষ্টি নিয়ে কাজ করতে হবে। এবং আল্লাহ প্রদত্ত বিশ্বনেতৃত্বের দায়িত্ব পালনের জন্য কাক্সিক্ষত গুণাবলি অর্জন করতে হবে। আজকে বিশ্ব নেতৃত্বে যারা অধিষ্ঠিত তাদের বিজ্ঞান, কারিগরি ও বস্তুতান্ত্রিক অগ্রগতিকে খুব স্বল্পসময়ের মধ্যে আমরা চ্যালেঞ্জ করতে পারবো না। তাই আমাদের এমন সব গুণাবলি অর্জন করতে হবে যা আধুনিক সভ্যতায় বিরল।
“To attain the leadership of mankind, we must have something to offer beside material progress, and this other quality can only be a faith and a way of life which on the one hand conserves the benefits of modern science and technology, and on the other, fulfils the basic human needs on the same level of excellence as technology has fullfilled them in the sphere of material comfort.’’ (Mile Stone, সাইয়েদ কুতুব শহীদ)
অনুবাদ : মানবজাতির নেতৃত্ব দানের জন্য আমাদের বৈষয়িক উন্নতি ছাড়াও অতিরিক্ত কিছু পেশ করতে হবে। আর তা হচ্ছে মানবজীবনকে মৌলিক বিশ্বাস (ঈমান) এবং ঐ বিশ্বাসের ভিত্তিতে রচিত একটি জীবনবিধান। এ বিধান বিস্ময়কর বিজ্ঞান প্রযুক্তি ও কারিগরি বিদ্যায় সকল অবদান সংরক্ষণ করবে। সাথে সাথে মানবজাতির মৌলিক প্রয়োজন পূরণের জন্য আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান মানুষের কল্যাণের যেসব চমকপ্রদ উদ্যোগ আয়োজন করেছে, তার মান বজায় রাখতে সক্ষম হবে। আর এ বিশ্বাস (ঈমান) ও জীবনবিধান মানবসমাজে তথা মুসলিম সমাজে বাস্তবরূপ ধারণ করে আত্মপ্রকাশ করবে।
“টাফ ট্রুথস” বইয়ের লেখিকা ডেইড্রি ম্যালোনি এ ব্যাপারে বলেন, “ভালো নেতৃত্বের পূর্বশর্ত হচ্ছে নিজের প্রতিটি পদক্ষেপের প্রভাব সম্পর্কে অবগত থাকা।” বইটিতে তিনি সুদৃঢ় নেতৃত্ব নিয়ে আরো বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
হ সাফল্য লাভ করায় ধীরে ধীরে আপনার জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়বে, সুতরাং মানসিকভাবে তৈরি থাকুন নিজের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত ধারণা লাভ করুন
হ প্রত্যেক মানুষেরই কিছু দুর্বলতা থাকে, সুতরাং দুর্বলতাকে আঁকড়ে ধরতে শিখুন
হ আপনার প্রত্যেক পদক্ষেপ সবাই পর্যবেক্ষণ করছে, তাই সবসময় নিজেকে সামলে রাখুন
হ বুদ্ধি খাটিয়ে নিজের শক্তি সংরক্ষণ করুন
হ নিজেই নিজের প্রশংসায় পঞ্চমুখ না হয়ে অন্যকে আপনার তারিফ করার সুযোগ দিন
হ কখনোই অন্য কারো সমালোচনা করবেন না
হ নিজের দায়িত্বসীমার বাইরেও কাজ করুন
হ যোগাযোগ ব্যবস্থাপনায় নিজেকে সুদক্ষ করে তুলুন
হ অফিসে বাইরেও ব্যক্তিগত/পারিবারিক জীবনের জন্যও সময় রাখুন

সফল নেতৃত্বের গুণাবলি
১. সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ
২. উৎসাহ দেয়ার মানসিকতা
৩. কর্মচঞ্চলতা
৪. সরাসরি যোগাযোগ
৫. নীতিতে অটল থাকা
৬. অন্যদের সুযোগ দেয়া
৭. সঠিক চিন্তা
৮. সৎ থাকা
৯. ভিশন ও মোটিভেশন
১০. নিপুণতা
১১. সমস্যা সমাধান
১২. দায়িত্ব গ্রহণের মানসিকতা

মহৎ নেতৃত্ব বিকাশের উপায়
মহৎ নেতৃত্ব বিকাশের ক্ষেত্রে চারটি মৌলিক ভিত্তি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা অপরিহার্য :
ক. সাহস (Courage)
খ. সুদৃষ্টি বা দূরদৃষ্টি (acumen):
গ. জ্ঞানের দক্ষতা(Expert of knowledge) :
ঘ. সংগঠিত করার ক্ষমতা(ability to organize) :
সফলভাবে নেতৃত্ব বিকাশের ক্ষেত্রে উপরোক্ত মৌলিক উপাদানসমূহ অর্জনের ক্ষেত্রে নিম্নক্ত দক্ষতাসমূহ (Skills) অর্জন করা অপরিহার্য :
হ দলগত ব্যবস্থাপনা (Team management)
হ কৌশলগত দক্ষতা (Strategic tools)
হ সমস্যা সমাধানের দক্ষতা (Problem solving skills)
হ সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা (Decision making skills)
হ সময় ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত দক্ষতা (Time management skill)
হ স্ট্রেস ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত দক্ষতা (Stress management skill)
হ কমিউনিকেশন দক্ষতা(Communication skill)
হ সৃজনশীল কৌশল সংক্রান্ত দক্ষতা (Creativity techniques skill)
হ শিক্ষণ দক্ষতা(learning skill)
হ ক্যারিয়ার দক্ষতা (Career skill)
হ একটি কার্যকর ও সফল পরিবর্তনের (change) জন্য বিকশিত নেতৃত্বের নি¤ল্লিখিত চারটি স্তরে (যা একটির সাথে অন্যটি সম্পৃক্ত) কিছু গুরুত্বপূর্ণ যোগ্যতা থাকা একান্ত অপরিহার্য।
প্রথম স্তর
পূর্ণজ্ঞান বা বোধশক্তিসম্পন্ন যোগ্যতা (Cognitive competences) :
এই স্তরে যে সমস্ত গুণাবলি থাকা প্রয়োজন-
ষ সৃজনশীলতা (Creativity)
ষ স্বনির্ভরতা (Self rellience)
ষ সমস্যা সমাধানের যোগ্যতা(Problem solving capabilities)
ষ বিশ্লেষণধর্মী যোগ্যতা(Analytical abilities)
ষ বহুমুখী চিন্তা (Divergent thinking)
ষ ভবিষ্যৎমুখিতা (Future oriented)
ষ ভালো পরার্শক(Good consolation)
ষ সূক্ষ্ম বিবেচনাবোধ (Critical approach)
দ্বিতীয় স্তর
আনুষ্ঠানিক যোগ্যতা (Functional competences)
এই স্তরে যে সমস্ত গুণাবলি থাকা প্রয়োজন-
ষ কমিউনিকেশন দক্ষতা(Communication skill)
ষ প্রযুক্তিনির্ভর বা বিশেষ জ্ঞানভিত্তিক দক্ষতা Technological or special knowledge)
ষ ক্যারিয়ার পরিকল্পনা (Career planning)
ষ ব্যবস্থাপনা যোগ্যতা(Managerial abilities)
ষ শক্তিশালী সিদ্ধান্ত গ্রহণের যোগ্যতা (Strong decision making abilities)
ষ জ্ঞানের দক্ষতা(knowledge abilities)
তৃতীয় স্তর
সামাজিক যোগ্যতা (social competence)
এই স্তরে যে সমস্ত গুণাবলি থাকা প্রয়োজন-
ষ আন্তঃব্যক্তি সম্পর্কীয় দক্ষতা (Inter-personal skill)
ষ কর্মক্ষমতা (Working abilities)
ষ বহুমুখী সাংস্কৃতিক দক্ষতা (Cross-cultural abilities)
ষ উদারতা (Flexible to others)
ষ চাপ প্রশমন দক্ষতা(Stress management capabilities)
ষ মোটিভেশন ভূমিকা(Motivational role)
ষ নৈতিক দক্ষতা (Ethical skill)
ষ সমন্বিত দক্ষতা (Integration skill)
চতুর্থ স্তর
সফল পরিবর্তন (Successful change):
এই স্তরে যে সমস্ত গুণাবলি থাকা প্রয়োজন-
ষ উৎপাদন/ফলাফলমুখিতা বৃদ্ধি(Increase in productivity)
ষ সম্পর্ক বৃদ্ধি (Increase in relationship quality)
ষ শক্তিশালী সমন্বয়(strong co-operation)
ষ সাংগঠনিক সংস্কৃতি ও পরিবেশ শক্তিশালীকরণ (Strengthen organizational culture & climate
ষ জনশক্তির সন্তুষ্টি অর্জন (Manpowers satisfaction)
ষ বিবাদ/ ভুল বোঝাবুঝি দূরীকরণ(Reduce conflict)
সফল নেতৃত্বের মডেল হচ্ছেন হজরত মোহাম্মদ (সা)
এ বিশ্বের সবচেয়ে সফল নেতৃত্বের মডেল হচ্ছেন ইসলামের শেষ নবী মোহাম্মদ (সা)। নেতৃত্বের ইতিহাসে তাঁর সমান অবস্থায় পৌঁছতে পেরেছেন এমন অন্য কোন ব্যক্তি মানবজাতির ইতিহাসে পাওয়া যায় না। কিভাবে মানুষকে নেতৃত্ব দিতে হয় এবং নেতৃত্ববিষয়ক আধুনিক বিশ্বের লেখকদের সকল বইপুস্তক পড়লে দেখা যায় সেগুলাতে নবীজির নেতৃত্বের গুণাবলির কথাই বলা হয়েছে। তিনি বিশ্বের সবচেয়ে বড় নেতা এবং মানবতার জন্য মডেল।
নেতৃত্বের মডেল প্রিয়নবীর (সা) জীবন, বিশেষ করে নেতা হিসেবে তাঁর নিজের ও তাঁর সহচারী তথা সাহাবীদের নেতৃত্বের গুণাবলি পরীক্ষা করলে দেখা যায় তাঁরা:
হ মানুষকে সত্য ও ন্যায়ের পথে অনুপ্রাণিত করেছেন।
হ অনুগামীদের প্রতি ছিল তাদের অফুরন্ত ভালোবাসা ও উদারতা এবং প্রচুর দরদ।
হ পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সর্বদা ছিল অটুট।
হ তাঁরা ছিলেন একে অন্যের বিশ্বাসী ও আস্থা ভাজন।
হ পরামর্শের দরজা ছিল সর্বদা উন্মুক্ত তাদের কাছে।
হ অন্যের স্বার্থে তারা নিজেদের স্বার্থ ত্যাগ করেছেন।
হ তাদের ছিল দায়িত্ববোধ এবং আল্লাহর ওপর অটল বিশ্বাস।
হ তাঁদের ছিল খোলা মন
হ তাঁদের ছিল দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা
হ মানুষের সমস্যা বুঝার ক্ষমতা
হ যোগাযোগ দক্ষতা(Communication skills)
হ সুদূরদর্শী ও পরিকল্পনাকারী(Farsighted and Planning)
হ প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা ও আমানতের খেয়ানত না করা।
হ জবাবদিহিতার নেতৃত্ব।
হ কখনও তাঁরা প্রতিহিংসাপরায়ণ ছিলেন না।

নেতৃত্ব থেকে মুসলমানদের বিচ্যুতির কারণ
ষ মুসলমানরা কুরআন হতে দূরে সরে আসা।
ষ আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানে অবদান না রাখা।
ষ বিলাসপ্রিয় হওয়া।
ষ অন্যের সভ্যতা গ্রহণ করা।
ষ জ্ঞান চর্চা না করা।
ষ ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা না থাকা।
ষ ইসলাম থেকে রাজনীতি আলাদা করা।
ষ ইসলামের ইতিহাস না পড়া।
ষ আল্লাহর ওপর ভরসা না থাকা।
বর্তমানে মুসলিম উম্মাহ পাঁচটি প্রধান সমস্যার সম্মুখীন
১. অনৈসলামিক আচরণ
২. অদক্ষতা
৩. পশ্চাৎপদতা
৪. ফিকির (বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান) এবং
৫. নেতৃত্ব।

যেকোনো সংগঠন বা সমাজে একটি সফল ও অনিবার্য পরিবর্তনের জন্য সৎ, যোগ্য ও মহৎ নেতৃত্বের কোনো বিকল্প নেই। সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব তৈরির জন্য দরকার একদল প্রতিশ্রুতিশীল সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্নচারী জনগোষ্ঠী যারা জীবনের মিশন হিসেবে নেতৃত্বকে বেছে নেবেন এবং উল্লিখিত বিষয়সমূহ অর্জনে সম্মুখপানে ধাবিত হবেন সুপরিকল্পিতভাবে। তাদের মিশন হবে ইংরেজ কবি রবার্ট ফ্রস্টের ভাষায়-
ঞThe woods are lovely, dark and deep.
But I have promises to keep, and
miles to go before I sleep
miles to go before I sleep.
সুতরাং আমরাও যদি নিজেদেরকে এবং কর্মীদেরকে নেতৃত্বের গুণাবলিতে গুণান্বিত করতে পারি তাহলে এই দেশ ও জাতির নেতৃত্ব আমাদের হাতেই আসবে, ইনশাআল্লাহ।
লেখক : সম্পাদক

SHARE

Leave a Reply