প্রথম বিশ্বযুদ্ধ : শতবর্ষ পর

এস.এম. মুনীর

Storyপ্রথম বিশ্বযুদ্ধ। এটি গ্রেটওয়ার বা মহাযুদ্ধ নামেও পরিচিত। এর শুরু ১৯১৪ সালের ২৮ জুলাইয়ে। আর সমাপ্তি ১৯১৮ সালের ১১ নভেম্বরে। এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ১৯৩৯ সালে শুরু হওয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত সময়ে এটিকে মানুষ শুধু ‘ওয়ার্ল্ড ওয়ার’ বা ‘গ্রেটওয়ার’ নামেই চিনত। এর পর থেকে মানুষ পেল দু’টি বিশ্বযুদ্ধ : প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৮) এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-৪৬)। আসছে জুলাইয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনার শতবর্ষ পূর্ণ হবে। এ প্রেক্ষাপটেই এ লেখায় আমরা ফিরে তাকাব প্রথম বিশ্বযুদ্ধের নানা দিকের ওপর।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ছিল ইউরোপকেন্দ্রিক একটি বিশ্বযুদ্ধ। সে জন্য প্রথম দিকে আমেরিকায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধকে ‘ইউরোপিয়ান ওয়ার’ বলেও অভিহিত করা হতো। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঘটনাবলি বিংশশতাব্দীর পৃথিবীকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করে। এই মহাযুদ্ধের প্রতিটি দিক নিয়ে লেখা হয়েছে হাজার হাজার বই। এখনো চলছে এই লেখালেখি। আগামী দিনেও তা চলবে। ১৯১৮ সালের পরবর্তী সময়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে কমপক্ষে ২৫ হাজার পাণ্ডিত্যপূর্ণ বই ও প্রবন্ধ লেখা হয়েছে। তবুও এখনো এই যুদ্ধ সম্পর্কে জানার শেষ নেই। এই যুদ্ধে কমপক্ষে এক কোটি সৈনিক মারা যায়। এর দ্বিগুণেরও বেশিসংখ্যক মানুষ হয় মারাত্মক আহত। এই নিহিত ও আহতদের স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকা বেসামরিক লোকের সংখ্যাও অগুনতি। স্বজনদের মৃত্যুজনিত শোকাহত ও বাস্তুচ্যুত বেসামরিক লোকজনের অনেকেই মানসিকভাবে হয়ে পড়েন বিপর্যস্ত। এই বিশ্বযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অভিজাত শিল্পসমৃদ্ধ দেশগুলো তাদের সর্বাধুনিক প্রযুক্তিসমৃদ্ধ মারণাস্ত্র নিয়ে নামে এক ধরনের আত্মঘাতী ধ্বংসলীলায়। এটি ছিল মানব ইতিহাসের ভয়াবহতম দ্বন্দ্বগুলোর অন্যতম এক দ্বন্দ্ব। এ যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে বয়ে আনে নানা ধরন ও মাত্রার রাজনৈতিক পরিবর্তন। এ যুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কোনো কোনো দেশে সংঘটিত হয় বিপ্লব। এ যুদ্ধ অবসান ঘটায় কিছু সাম্রাজ্যের, কোনোটি দ্রুত ও কোনোটি ধীরলয়ে। জন্ম দেয় কিছু বদমেজাজি (ফ্রাকটিয়াস) জাতিরাষ্ট্র তথা ন্যাশন স্টেটের। ব্রিটিশ ডমিনিয়মগুলো তাদের জাতিসত্তার উপলব্ধি করার সুযোগ পায়। আমেরিকাকে বাধ্য করে একটি বিশ্বশক্তি হতে। সরাসরি নিয়ে আসে সোভিয়েত কমিউনিজম। প্রথম বিশ্বযুদ্ধই কার্যত উত্থান ঘটায় হিটলারের। বীজ বপন করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও হলোকাস্টের। বলা হচ্ছে, আজকের মধ্যপ্রাচ্যে যে ধ্বংসকর বিপর্যয়, এর শেকড় প্রোথিত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঘটনাই। সে ঘটনার সূত্র ধরে আজকের মধ্যপ্রাচ্য সঙ্কটের বিস্তার। জার্মান-আমেরিকান ইতিহাসবিদ ফ্রিটজ স্টার্নের অভিমত, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ নামে দ্বন্দ্বটি হচ্ছে : ‘দ্য ফার্স্ট ক্যালামিটি অব দ্য টুয়েনটিয়েথ সেঞ্চুরি, দ্য ক্যালামিটি ফ্রম হুইচ অল আদার ক্যালামিটি ¯প্রাং’। সোজা কথায়Ñ প্রথম বিশ্বযুদ্ধটি ছিল বিংশ শতাব্দীর একটি চরম বিপর্যয়, আর এই চরম বিপর্যয় থেকেই অন্য সব বিপর্যয়ের বিস্তার।
এ থেকেও ব্যাখ্যা পাওয়া যায়, কোথায় কোন স্বার্থে এই যুদ্ধ বেধেছিল। আর কিভাবেই বা যুদ্ধরত অন্যান্য চার শক্তিধর দেশের তুলনায় অধিকতর হিংস্রতা নিয়ে ব্রিটেনে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, তাও স্পষ্ট হয় না। এ যুদ্ধে চলেছে আতঙ্কজনক মানুষ হত্যা। শুধু ব্রিটেনেই নিহত হয়েছে আট লাখ ৮৭ হাজার সামরিক লোক। ফ্রান্স, রাশিয়া, জার্মানি ও অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি এগুলোর প্রত্যেকটির লোক ক্ষয় ঘটেছে ব্রিটেনের চেয়ে বেশি। স্পষ্টত শেষ তিনটি দেশের জন্য এ যুদ্ধ ছিল একটু ভিন্নতরÑ এসব দেশের পরাজয়ের মধ্য দিয়েই এ যুদ্ধের অবসান ঘটে।
জার্মানিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ছায়া এতটাই গভীরভাবে পড়েছিল যে, দেশটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে ভাবার তেমন সুযোগই পায়নি। এর পরিবর্তন আসে ১৯৬০-এর দশকের প্রথম দিকে যখন জার্মান ইতিহাসবিদ ফ্রিট্জ ফিশ্চার অভিমত দেন যে, তার দেশের ‘অ্যানেক্সেশোনিস্ট অ্যাইম’-এর সূচনা প্রথম মহাযুদ্ধের আগে। আর সেই লক্ষ্য ও নাৎসিদের লক্ষ্য একই। ফিশ্চারের থিসিসের বিষয়াবলি এক ধরনের সেন্সেশন তৈরি করলেও পরে তা বিতর্কিত হয়। তবে অনেক জার্মান এর ব্যাপকভিত্তিক উপসংহার মেনে নেয়।
কমিউনিস্ট-উত্তর রাশিয়ার বেলায় ১৯৪১-৪৫ সময়ে ‘গ্রেট প্যাট্রিয়টিক ওয়ার’-এর বীরত্ব ও ত্যাগ বরং ১৯১৭ সালের বিপ্লবের চেয়ে বেশি চেতনা সৃষ্টি করেছিল। আর অস্ট্রো হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ে এবং যুদ্ধ হয়ে দাঁড়াল ভিন্ন অর্থ, সাবেক এ সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশে।
প্রধান দুই বিজয়ী মিত্র যুদ্ধ সম্পর্কে তাদের প্রবণতায় ভিন্নতা প্রদর্শন করে। ফ্রান্স রাশিয়ার মতোই এ যুদ্ধকে একটি পরিব্যাপক, বিয়োগান্তক ও মহৎ প্রয়াস হিসেবে শেষ যুদ্ধ বিবেচনা করল। যার সমাপ্তি ঘটেছে মাতৃভূমি থেকে গৌরবদীপ্ত বাহিনীর মাধ্যমে আগ্রাসী শক্তির বিতাড়নের মধ্য দিয়ে। এর বিপরীতে ১৯৪০ সালের ফ্রান্সের আত্মসমর্পণ হচ্ছে পুরোদস্তুর।
ব্রিটেনের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছিল একটি ‘ভালো যুদ্ধ’Ñ এ যুদ্ধ শুধু নৈতিক জটিলতা বিবর্জিতই ছিল না, সেই সাথে এটি ছিল ব্রিটেনের জন্য কম বেদনাদায়কও। আগের বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটেনের যে পরিমাণ সার্ভিসমেন মারা গিয়েছিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মারা গেছে তার অর্ধেকের চেয়েও কম। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটেনের অংশ নেয়া ভুল ছিল না সঠিক ছিলÑ তা ছিল কম স্পষ্ট। যুদ্ধ-পূর্ব ব্রিটিশ মন্ত্রিসভা ছিল বিভক্ত এবং আজো তা বিতির্কত। তা সত্ত্বেও ব্রিটেন যুদ্ধে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত একবার যখন নিলো, এ ধরনের সব সন্দেহের অবসান ঘটল। এমনকি যখন হতাহতের ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছিল, ১৯১৬ সালের জুলাইয়ের সম্মি (ঝড়সসব) যুদ্ধের ভয়াবহতার খবরও যখন ঘরে ঘরে পৌঁছছিল, তখন এ যুদ্ধের প্রতি ছিল ব্যাপক জনসমর্থন। তাদের কাছে এটি ছিল একটি প্রয়োজনীয় যুদ্ধ, যা এড়ানোর মতো ছিল না। উল্লেখ্য, সম্মি ব্যাটল ‘সম্মিপেনসিভ’ নামেও পরিচিত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অংশ ছিল এই সম্মি যুদ্ধ। ব্রিটিশ ও ফরাসি বাহিনী ছিল এক দিকে। অপর দিকে ছিল জার্মান সাম্রাজ্য। ১৯১৬ সালে ১ জুলাই এ যুদ্ধের শুরু, শেষ ১৮ নভেম্বর। ফ্রান্সের সম্মি নদীর উভয় তীরে ছিল দুই বিবদমান পক্ষের অবস্থান। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম বড় যুদ্ধ ছিল এই সম্মি যুদ্ধ। এ যুদ্ধে কমপক্ষে ১০ লাখ লোক নিহত কিংবা আহত হয়েছিল। ফলে এটি ছিল মানবেতিহাসের ‘ব্লাডিয়েস্ট ব্যাটল’ অর্থাৎ সবচে বড় রক্তপাতের যুদ্ধ। এ যুদ্ধে কমপক্ষে ২০ হাজার ব্রিটিশ সৈন্য নিয়োগ করা হয়েছিল। তার পরও ব্রিটেনের মানুষ এ যুদ্ধে অংশগ্রহণকে বিতর্কিত করেছিল। যদিও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল ও ডেভিড লয়েড জর্জও (যিনি ১৯১৬ সালের ডিসেম্বরে সে দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন।) শক্তিক্ষণের যুদ্ধ সম্পর্কে বিরক্তিবোধ করেছিলেন। কিন্তু তারা ছিলেন ব্যতিক্রম। ট্র্যাজেডির মধ্যে এক ধরনের একগুঁয়ে স্টয়িসিজম (গ্রিক দার্শনিক জেনোর মতবাদ। জীবনের যাবতীয় অর্জন ও বেদনার প্রতি অভিযোগহীনতা ও ঔদাসীন্য) যুদ্ধক্ষেত্রে, পরিখায় ও ব্রিটেনের ঘরে ঘরে বিদ্যমান ছিল। যুদ্ধ যখন হঠাৎ করে থেমে গেলÑ ঠিক ১০০ দিনের অফেনসিভের পরÑ তখন যেমন এই স্টয়িসিজম ব্রিটিশদের মধ্যে ছিল, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার দিন ১৯১৮ সালের ১১ নভেম্বরেও তা বিদ্যমান ছিল। একে তখন গ্রহণ করা হয় একটি বিজয় হিসেবে।
এরপরও একটি গভীর ও অপরিহার্য এক প্যাসিফিস্ট (চধপরভরংঃ) তথা শান্তিবাজী মোহযুক্তি শিগগিরই ব্রিটেনকে আকর্ষিত করল। যুদ্ধের স্মৃতির ক্ষীণ স্রোতধারা এক সময় বন্যা ধারায় রূপ নিলো। এতে প্রাধান্য বিস্তার করল উইন্সটন চার্চিল ও লয়েড জর্জের তুখোড় ও আংশিক স্মৃতিচারণ। তখন ক্ষতির উপলব্ধি ব্রিটিশদের মধ্যে বেড়ে গেল। ডগলাস হেগ ছিলেন ব্রিটিশ কমান্ডার ইন চিফ। তার আমেরিকান প্রতিপক্ষ জন পাশিং তাকে বর্ণনা করেছেন ‘ঞযব সধহ যিড় ড়িহ ঃযব ধিৎ’ অভিধায়। তাকেই পরে বর্ণনা করা হলো ‘নঁঃপযবৎ ড়ভ ঃযব ংড়সসব’ হিসেবে। বলা হলো একজন ‘ঈধষষড়ঁং রহ পড়সঢ়ড়ষরহঃ’ ব্যক্তি হিসেবে, যার কারণে ২০ লাখ ব্রিটিশের প্রাণহানি ঘটেছে।

প্রশমিতকরণের ভিত
সন্দেহ জাগল, কে ছিলেন এর জন্য দায়ী। যুদ্ধোত্তর ভার্সাই চুক্তির মাধ্যমে, বিশেষ করে ফ্রান্স জার্মানির কাছে যে ক্ষতিপূরণ দাবি করেছিল তা পরিশোধ করা হয়নি। ব্রিটেনের অনেক উপলব্ধি করেছিলেন এই ক্ষতিপূরণ দাবি ছিল এক ধরনের নিষ্ঠুরতা। ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ জন ম্যানার্ড কিনস তার ‘দ্য ইকোনমিক কনসিকুয়েন্স অব পিস’ বইয়ে ভার্সাই চুক্তির সমালোচনা করেন। ১৯৩০-এর দশকে তার এই বইটি বেস্টসেলার মর্যাদা পায়। এ ছাড়া বইটি জার্মানের প্রতি অন্যায় আচরণের ক্ষেত্রে প্রশমিত করার একটি হ্যান্ডবুক হিসেবে চিহ্নিত হয়। ব্রিটেন ও আমেরিকার এমন অভিমতও আন্দোলিত হয় যে, জার্মান বিদেশ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ বিভাগের পরিচালিত অপব্যবহারের ফলেই এ যুদ্ধ বেধেছিল। এর ফলে চুক্তিতে জার্মানির ওপর ক্ষতিপূরণের অনুচ্ছেদ সংযোজনকে যুক্তসঙ্গত করে তোলা হয়। জনপ্রিয় ও ব্যাপক পঠিত ব্রিটিশ সামরিক তত্ত্ববিদ বাসিল লিডডেলের ব্যাটালিয়নের প্রায় পুরোটাই সম্মিতে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। তিনি হামলা করেছিলেন এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রতি আগ্রহ কিছু সময়ের জন্য অনেকটা কমে যায়। কিন্তু তখন আরেক নতুন ঘটনা ঘটে। ১৯১৪ সালের প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ৫০ বছর পূর্তি যখন এগিয়ে আসে ব্রিটিশ বিবেকে এই ‘গ্রেট ওয়ার’ একটি দুর্ভাগ্যজনক ‘অনাচার’ বলে অনুভূত হতে লাগল। এর জন্য ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্যতা রাখে আমেরিকান ইতিহাসবিদ বারবারা টাকম্যানের লেখা ‘দ্য গানস অব আগস্ট’ বইটি। এটি ছিল অস্বাভাবিক। আমেরিকার বেশির ভাগ লেখক ও পাঠক প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কে কম আগ্রহী ছিল ইউরোপীয়দের চেয়ে। বারবারার বইটি গভীরভাবে প্রভাব ফেলে প্রেসিডেন্ট কেনেডির ওপর, কারণ তিনি ১৯৬২ সালের কিউবান মিসাইল ক্রাইসিস সমাধানের চেষ্টা করছিলেন। অ্যালান ক্লার্কের ‘দ্য ডাঙ্কিজ’ বইটি মূলত প্রথম দিকের সামরিক নেতৃত্বের ব্যর্থতাকেন্দ্রিক। ক্লার্ক ব্যর্থ হয়েছেন ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের শিক্ষাকে স্বীকৃতি জানাতে। পরবর্তী সময়ে তিনি তা স্বীকার করে নেন ‘লায়নস লেড বাই ডাঙ্কিজ’ বাগধারার জন্ম দিতে। এ থেকে বইটির নাম দেন ‘দ্য ডাঙ্কিজ’। ক্লার্কের বই থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ১৯৬৩ সালে লিটল উডস উপহার দেন তার স্যাটায়ার মিউজিক ‘ওহ্, হোয়াট অ্যা লাভলি ওয়ার’। পরে এটিকে চলচ্চিত্রে রূপ দেয়া হয়। আর এখন স্কুলের শিশুদের পাটিতে এর নাট্যরূপ উপস্থাপন করা হচ্ছে লিটল উডেসের পুরনো থিয়েটারে, লন্ডনের স্ট্যানকোর্ড ইস্টে।
১৯৬৪ সালে ২৬ পর্বে প্রদর্শন করে এর মহাকাব্য ‘দ্য গ্রেট ওয়ার’। তখন গড়ে এর প্রতিটি পর্ব দেখে ৮০ লাখ মানুষ। সে যুদ্ধে বেঁচে যাওয়া লোকদের চলমান সাক্ষাৎকার ব্রিটিশদের মনে এ ধারণা দেয় যে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সে জাতির ইতিহাসে ছিল একটি বড় মাপের ট্র্যাজেডি। এই প্রেক্ষাপটে প্রথম বিশ্বযুদ্ধকে দেখতে হবে। এ যুদ্ধের কারণ, কৌশল ও পরিণতি সমসাময়িক উদ্বেগের বিষয়।

চালাকির খেলা
ব্রিটিশ ও ফরাসি জেনারেলরা যে বিষয়টি দেখতে পেরেছিলেন, তাদের রাজনীতিবিদেরা সে বিষয়টি দেখতে পাননি : যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারিত হবে ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টে; নতুন অস্ত্র কিভাবে ব্যবহার করা যায়, আক্রমণের বেলায় তা বুঝতে সময় লাগবে। প্রথম দিকে এসব অস্ত্রÑ অর্থাৎ মেশিনগান ও ফাস্ট-লোডিং ফিল্ড আর্টিলারি শুধু কষ্টকর প্রতিরক্ষার জন্য ব্যবহার হতো; আর দু’টি প্রতিশ্রুত শিল্পসমাজের মধ্যকার যুদ্ধ জয় করা যাবে না শুধু চালাকির খেলার মাধ্যমে, জয় করা যাবে শুধু প্রবল সঙ্ঘাত-সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে।
তরুণ চার্লস দ্য গল এরই মধ্যে দু’বার আহত হন। ১৯১৪ সালের ডিসেম্বরে উপলব্ধি করা হয় : এটি কোনো দ্বন্দ্বযুদ্ধ নয়, এটি একে অপরের সম্পূর্ণ ধ্বংস করার যুদ্ধ। অপরিমেয় ত্যাগ ছাড়া এ যুদ্ধে বিজয়ী হওয়া যাবে না। জয়ী হবে সেই পক্ষ, যে পক্ষ দ্রুত সে উপলব্ধি করবে। মি. ইবলিপট তার লেখা বই ‘ব্লাডি ভিক্টরি : দ্য সেক্রিফাইস অন দ্য সম্মি অ্যান্ড মেকিং অব দ্য টুয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি’-তে পাঁচ মাসের সম্মি যুদ্ধকে দেখেন জার্মানির বিজয়ের আশা শেষ হয়ে যাওয়ার লড়াই হিসেবে। ‘দ্য চিফ : ডগলাস হেগ অ্যান্ড দ্য ব্রিটিশ আর্মি’ বইটিতে আলোকপাত করা হয়েছে এমন একজন কমান্ডারের ওপর, যার সুখ্যাতি অতি সম্প্রতি পুনর্বাসিত করা হয়েছে। হেগ আকর্ষণীয় কোনো চরিত্র নয়। তবে এই বইয়ের লেখক শেফিল্ড দেখিয়েছেন, হেগ তার ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছিলেন; তিনি স্বাগত জানিয়েছিলেন নতুন প্রযুক্তি যেমনÑ বিমান ও ট্যাংকে। তিনি এগুলো ব্যবহারে কৌশল অবলম্বন করেছিলেন। ১৯১৮ সালের মধ্যে তিনি ব্রিটিশ আর্মিকে একটি ভয়ঙ্কর ফাইটিং মেশিনে রূপ দিয়েছিলেন।

না-ভোলা নামগুলো
মার্নি, সম্মি, ভেরডান। এগুলো দক্ষিণ ও পূর্ব ফ্রান্সের নদী সমতই। এ নামগুলো মিশে আছে প্রথম যুদ্ধের ইতিহাসের সাথে। এগুলোতে লেগে আছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের নানা ক্ষতÑ এখানে-সেখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য পরিখা, শত শত মিলিটারি সেমিটারি। ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টে ফ্রান্স ছিল যুদ্ধের মূল বঙ্গ মঞ্চ। ফ্রান্স হারায় ১৪ লাখ সৈন্য, মিত্রশক্তির পশ্চিমা যেকোনো দেশের চেয়ে ফ্রান্সের ক্ষয়ক্ষতি হয় বেশি। এই বড় ধরনের ক্ষতির মধ্য দিয়ে ফ্রান্স ছিনিয়ে আনে বীরত্বপূর্ণ বিজয় এবং ব্যাপক এই ক্ষয়ক্ষতির মধ্য দিয়ে আসে জাতীয় ঐক্য। ইতিহাসবিদেরা আজ বলছেন : পরিখায় ফ্রান্সের সৈনিক ও কর্মকর্তারা আত্মত্যাগ করেছেন ফ্রান্সের জন্য। নিকোলাস ম্যারিয়টেসের একটি বইয়ে ৪২ জন বুদ্ধিজীবীর কথা তুলে ধরা হয়, যারা যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে আছেন লেখক, আইনবিদ, শিক্ষক, এমনকি একজন বেহালা বাদকও। সে সময় জার্মানের ২ শতাংশ লোক ছিল স্কুল সমাপনী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। অনেক সৈনিকের শুধু প্রাথমিক ফরাসি ভাষা জ্ঞান ছিল। অনেক লেখক এসব সাহসী সৈনিকদের নিয়ে বই লিখেছেন।

SHARE

Leave a Reply