প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে কী পেল বাংলাদেশ? -মো: কামরুজ্জামান (বাবলু)

সত্যিকার অর্থে কূটনীতিতে বন্ধুত্ব বলে কিছু নেই। কূটনীতিতে সর্বোচ্চ সৌজন্যতা বলতে বলা যেতে পারেÑ অপর দেশের ক্ষতি না করে নিজ দেশের স্বার্থ যতটা সম্ভব আদায় করা। কিন্তু বন্ধুত্বের দোহাই দিয়ে নিজ দেশের ক্ষতি করে অপর দেশের স্বার্থ  রক্ষা করা কখনোই কোনো কূটনীতির মধ্যে পড়ে না; বরং এটা স্পষ্টতই স্বদেশবিরোধিতা ও বিশ্বাসঘাতকতার পর্যায়ে পড়ে। শুধুমাত্র ক্ষমতার লোভে এই বিশ্বাসঘাতকতার কাজটিই সুচারুরূপে সম্পন্ন করে চলছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। আর দলটির এই দেশবিরোধী অপতৎপরতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে এদেশেরই কিছু মিডিয়া, বুদ্ধিজীবী ও দলকানা কিছু রাজনীতিবিদ। সর্বোপরি ঘুমিয়ে থাকা দেশের আমজনতাও এই পরিস্থিতির জন্য কম দায়ী নয়। আর তাই বিজ্ঞজনদের আশঙ্কা অচিরেই সবাইকে খুব নির্মমভাবে এর মাশুল দিতে হবে।
আগে থেকেই ধারণা করা হচ্ছিল, ঠিক ধারণা বললে কম বলা হবে, দেশের সচেতন নাগরিকরা বহু দিন ধরে বিশ্বাস করেন যে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা ও ভোটারবিহীন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসা যেই আওয়ামী লীগ প্রধানত ভারতের একচেটিয়া আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে অদ্যাবধি ক্ষমতায় টিকে আছে, সেই দল আসন্ন ১১তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে ফের ভারতীয় অন্ধ সমর্থনের জন্য মরিয়া হয়ে উঠবে। আর কূটচালে অত্যন্ত পারদর্শী ভারত যে এই সুযোগটি লুফে নেবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই তিস্তা চুক্তি তো দূরের কথা, বলার মতো কোনো অর্জন বাংলাদেশের না হলেও দাদাদের অনেক কিছু দিতে হবে এবং বিনিময়ে ফের ৫ জানুয়ারি স্টাইলের আরেকটি নির্বাচনে তাদের সমর্থন লাভের গোপন প্রতিশ্রুতি নিয়ে শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন তা অনেকেই বুঝতে পেরেছিলেন।
একটু খেয়াল করে দেখুন ভারতীয় ন্যাকামির মাত্রাটা কোন পর্যায়ে ছিল যে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদি প্রোটোকল ভেঙে শেখ হাসিনাকে বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানাতে বিমানবাহিনীর পালাম স্টেশনে স্বশরীরে হাজির হয়েছিলেন। রীতিমতো শেখ হাসিনাকে আকাশে তোলার অবস্থা। এমনকি ভারতীয় গণমাধ্যমের খবর থেকে আরো জানা যায়, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীও জানতেন না, বিমানবন্দরে মোদি উপস্থিত থাকবেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও আবুধাবির প্রিন্সকে ওই ঘাঁটিতে অভ্যর্থনা জানানো হয়েছিল। তাছাড়া, এ ঘাঁটিতে আর কোনও নেতাকে সংবর্ধনা দেয়া হয়নি। এটাকে বিরল সম্মান বলছেন দুই দেশের কর্মকর্তারা। অথচ ইনিয়ে-বিনিয়ে এবং হাজারো মারপ্যাঁচ ও কথার জাদুর মধ্যেই আটকে থাকলো তিস্তার পানি বণ্টনের মতো বাংলাদেশের গণমানুষের দীর্ঘদিনের আকাক্সিক্ষত ইস্যুটি। তাহলে শেখ হাসিনাকে আকাশে তোলার ন্যাকামিটা না দেখালে কি হতো না? আসলে এটাই ভারতীয় কূটনীতি, ভারতীয় চানক্য নীতি।
দেখুন, আহলাদে একেবারে গদ গদ ভারতীয় আরেক রাজনীতিক জনসম্মুখে বলে ফেললেন ভারত-পাকিস্তানের বিরোধ নিষ্পত্তিতে তারা শেখ হাসিনাকে মধ্যস্থতার ভূমিকায় দেখতে চান। “ভারত-পাকিস্তান ইস্যুতে শেখ হাসিনার মধ্যস্থতা চান আদভানি”Ñ এই শিরোনামে গত ১১ এপ্রিল “বাংলাদেশ প্রতিদিন” পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, “ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিনের বৈরী সম্পর্কের অবসানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মধ্যস্থতা চেয়েছেন বিজেপি নেতা ও ভারতের সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী এল কে আদভানি। সম্প্রতি নয়াদিল্লি সফররত শেখ হাসিনার জন্য আয়োজিত এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ভারতীয় জনতা পার্টির উপদেষ্টা পরিষদের চেয়ারম্যান আদভানি এ প্রস্তাব রাখেন।”
অর্থাৎ ভারতীয় রাজনীতিবিদরা রীতিমতো তেলের সাগরে ভাসিয়ে দিলেন আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে। বিশ্বরাজনীতি সম্পর্কে সামান্যতম জ্ঞান রয়েছে এমন যে কেউ চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারেন, ভারত-পাকিস্তানের বিরোধ নিষ্পত্তিতে শেখ হাসিনা তথা বাংলাদেশের ভূমিকা কোনো কাজে আসবে না এবং বাংলাদেশ সেই অবস্থানেও নেই। এটা শুধু মুখের কথা দিয়ে ভিজিয়ে দেয়ার জন্যই যে বলা হয়েছে তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। আর আমরা সবাই জানি শুধু মুখের কথায় চিঁড়া ভিজে না। বাস্তবেও তাই হলো। এত প্রশংসা, এত স্তুতিবাক্য, কিন্তু বাংলাদেশের আসল চাওয়া তিস্তা চুক্তির ধারে কাছেও গেল না ভারত। সত্যিই ভারতের কূটচালের প্রশংসা না করে পারা যায় না।
এবার আসা যাক বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রসঙ্গে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস বাংলাদেশকে ফাঁদে ফেলে ভারতের একচেটিয়া সুবিধা আদায়ের কৌশলটি শেখ হাসিনা ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন। কিন্তু শুধুমাত্র ক্ষমতার লোভে তিনি সবকিছু উপেক্ষা করেছেন। কারণ আগামীতে শেখ হাসিনা নিজের অধীনে আরেকটি ৫ জানুয়ারির মতো নির্বাচন দিয়ে ফের ক্ষমতায় আসতে চান। আর সেজন্য ভারতের একচেটিয়া সমর্থন তার অতীব জরুরি। তাই তিনি ভারতীয় সব মেকি আচরণ ও ভণ্ডামিকে মুখ বুজে মেনে নিয়েছেন। শেখ হাসিনার এই কর্মের ফলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব খর্ব হলে তাকে অবশ্যই একদিন ইতিহাসের কাঠগড়ায় ও জনতার আদালতে আসামি হতে হবে। কিন্তু ততদিনে দেশ কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় সেটাই হলো শঙ্কার বিষয়।
এদিকে, এককালে ভারতে দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন কাটানোর ফলে এবং ভারতীয় রাজনীতিবিদদের সঙ্গে বহুদিনের সখ্যতার মধ্য দিয়ে মানুষের মগজ ধোলাইয়ের কাজটি বেশ ভালোভাবেই রপ্ত করেছেন শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগ। আর সে কারণেই এবারের ভারত সফরের তারিখ বেশ কয়েক দফা পেছানো হয় এবং নানাভাবে আওয়াজ তোলা হয় যে তিস্তাচুক্তিসহ নানা বিষয়ে ভারতের দিক থেকে ইতিবাচক সাড়া না মেলাতেই শেখ হাসিনার সফর বার বার পেছানো হচ্ছে। অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে একটা আবহাওয়া তৈরি করা হয়েছিল যাতে মানুষ মনে করে যে শেখ হাসিনা ভারতের ব্যাপারে নতজানু নীতি অনুসরণ করছেন না। তিনি দেশের স্বার্থকেই বড় করে দেখছেন এবং এজন্য প্রয়োজনে ভারতের মতো দেশের সাথে বোঝাপড়া করার মতো হিম্মত রাখেন। কিন্তু সেটা যে শুধুই আইওয়াশ তা এখন দিবালোকের মতো পরিষ্কার। তা না হলে কেন তিস্তাচুক্তি হলো না, অথচ বিতর্কিত সামরিক সমঝোতা থেকে শুরু করে দুই ডজনের ওপর চুক্তি হয়ে গেলো?
গত ৭ থেকে ১০ এপ্রিল শেখ হাসিনার চারদিনের ভারত সফরের দুই সপ্তাহ আগে গত ২২ মার্চ “হঠাৎ করে শেখ হাসিনা কেন ‘র’-এর সমালোচনায় মুখর”Ñ এই শিরোনামে বিবিসি বাংলায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেই প্রতিবেদনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুলের মন্তব্য নেয়া হয়। অধ্যাপক নজরুল বলেন, “ভারতের কাছ থেকে তিনি (শেখ হাসিনা) যদি কিছু আদায় করতে না পারেন, তখন ওনার ইমেজটা হবে যে ভারতের কাছে সব সমর্পণ করে দিয়ে আসেন উনি। সে সমালোচনার একটা কাউন্টার (বিপরীত) পরিবেশ তিনি আগে থেকেই তৈরি করে রাখলেন।” অর্থাৎ সফরটা বার বার পিছিয়ে এবং মাঝে মধ্যে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’- এর সমালোচনা করে দেশের ভেতরে ইমেজ সঙ্কট কাটানোর কর্মটি আগেই সেরে ফেলেন শেখ হাসিনা।
দেশের বিজ্ঞজনরা যা আশঙ্কা করেছিলেন বাস্তবেও তাই ঘটলো। ভারত যা যা চেয়েছিল তার সবই হলো। কিন্তু বাংলাদেশের মূল চাওয়াটাই অপূর্ণ থেকে গেল। “কি আছে ভারত-বাংলাদেশের ২২টি চুক্তি এবং সমঝোতায়”Ñ এই শিরোনামে গত ৮ এপ্রিল (২০১৭) তারিখে বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, “বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনার পর দু’দেশের মধ্যে ২২টি চুক্তি এবং সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এসব চুক্তি এবং সমঝোতার বেশির ভাগই হচ্ছে প্রতিরক্ষা এবং শান্তিপূর্ণ কাজে পরমাণু শক্তির ব্যবহার সংক্রান্ত। ভারতের পররাষ্ট্র দফতর থেকে চুক্তি এবং এমওইউর যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে প্রথম তিনটি সমঝোতা স্মারক হচ্ছে প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত। এর প্রথমটি হচ্ছে ‘ডিফেন্স কো-অপারেশন ফ্রেমওয়ার্ক’ বা প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কাঠামো বিষয়ে। অপর দু’টি ভারতের দু’টি ডিফেন্স স্টাফ কলেজের সঙ্গে বাংলাদেশের ডিফেন্স সার্ভিসেস স্টাফ কলেজের।”
এদিকে, পরিস্থিতি এখন এমন দিকে গড়ালো যে তিস্তা চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা এখন প্রায় শূন্যের কোঠায়। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি সেই রাস্তা বেশ ভালোভাবেই বন্ধ করে দিয়েছেন। অত্যন্ত কুটিল ও দীর্ঘমেয়াদি বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছেন মমতা। “তিস্তার বিকল্প প্রস্তাব দিলেন মমতা”- এই শিরোনামে গত ৮ এপ্রিল (২০১৭) দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদনের এক অংশে বলা হয়, “শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক শেষে মমতা সাংবাদিকদের বলেন, তিস্তার সমস্যা তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে বুঝিয়ে বলেছেন। তিনি বলেন, তিস্তায় কোনো পানি নেই। পানির অভাবে এনটিপিসির বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। সেচের জন্য পানি পেতে সমস্যা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, উত্তরবঙ্গে তোর্সা, জলঢাকাসহ চারটি নদী আছে। সেখানে পানি আছে। ফলে তিস্তার বিকল্প হিসেবে এই চারটি নদীর পানি ব্যবহার করা যেতে পারে।”
মজার বিষয় হলো ভারতের সেই একই কূটকৌশলের এতটুকু কমতি পড়েনি এখানেও। প্রতিবেদনটির আরেক অংশ হলো: “পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বলেন, তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কলকাতা সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। বলেছেন, কলকাতায় বঙ্গবন্ধুর নামে ভবন হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ার হতে পারে। তাঁদের আলোচনায় দুই বাংলায় দুই দিন পয়লা বৈশাখ উদযাপনের বিষয়টি উঠে আসে।”
বাংলাদেশের মানুষের জীবন-জীবিকার সাথে একান্তভাবে জড়িত তিস্তার পানি। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী উজানের সেই পানিতে বাঁধ দেয়ার কিংবা সেটাকে ডাইভার্ট করে অন্যদিকে প্রবাহিত করার কোন অধিকার ভারতের নেই। কিন্তু সেই অপকর্মটি বহাল তবিয়তে করেই যাচ্ছে ভারত। এখন অনেক কিছুর বিনিময়ে পানির ন্যায্য ভাগ চাইতে গেলে উল্টো আরেকটি জটিল প্রস্তাব হাতে ধরিয়ে দিয়ে পুরো বিষয়টিকে ঘোলাটে করা হলো। রীতিমতো “বাঁশ, হাতে হারিকেন” পরিস্থিতি বাংলাদেশের। আর সেখান থেকে নজরটা আরেকদিকে ঘোরাতে ফের মুখের কথায় চিঁড়া ভেজানোর পুরোনো চালটি চাললেন মমতা। আমাদের দরকার পানি, আর উনি বললেন, বঙ্গবন্ধুর নামে ভবন ও চেয়ার হওয়ার কথা। দুই বাংলায় পয়লা বৈশাখ উদযাপনের কথা। বাংলাদেশের মানুষ কি এসব ধুয়ে পানি খাবেন?
অপরদিকে, মমতার বিকল্প প্রস্তাব যে খুব একটা কাজে দিবে না তা ভারতীয় রাজনীতিবিদদের কথায়ও বোঝা যায়। “তিস্তা নিয়ে  যে আস্থা মোদিতে, মমতায় নয় : হাসিনা”Ñ এই শিরোনামে গত ১১ এপ্রিল (২০১৭) তারিখে বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা বলা হয়, “মমতা ব্যানার্জি যে তোর্সা নদীর জল ব্যবহার করার কথা বলেছেন তা প্রবাহিত হয়েছে কোচবিহার দিয়ে, আর ওই জেলাতেই তাঁর দলের বিধায়ক উদয়ন গুহ। তিনি বিবিসিকে বলছিলেন, অসম্ভব হলে নেত্রী এই প্রস্তাব দিতেন না বলেই তার বিশ্বাস। তবে ওই এলাকার বাসিন্দা হিসেবে মি. গুহর অভিজ্ঞতাও কিন্তু বলে, তিস্তা বা তোর্সার মতো পাহাড়ি নদীগুলোতে জলের পরিমাণ কমবেশি হতেই থাকে এবং পাহাড়ে বৃষ্টির ওপর অনেকটা নির্ভর করে, জল ভাগাভাগির ক্ষেত্রে সে বিষয়টাও মাথায় রাখতে হবে।”
কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, বাংলাদেশের গণমানুষের মাত্র একটি জোরালো চাওয়াও ভারতের কাছ থেকে আদায় করতে ব্যর্থ হওয়ার পরও শেখ হাসিনা বললেন তিনি এই সফরে তৃপ্ত। এমনকি তিস্তা নদীর ওপর ভারত যে বাঁধ দিয়ে রেখেছে তার জন্য তিনি উল্টো বিএনপি-জামায়াত জোটকেই দুষলেন। একদিকে, স্বীকার করলেন, তিস্তার পানি ভারত বাঁধ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করছে, পরক্ষণেই আবার বলছেন, বাংলাদেশ যেহেতু ভাটির দেশ পানি পাবেই, ফের বিরোধী রাজনৈতিক জোটকে আবার দোষ দিচ্ছেন। প্রশ্ন হলো ভারতকে তাহলে অকৃত্রিম বন্ধু বলার যৌক্তিকতা কোথায়, ভারতপ্রেমী হয়েই বা লাভ কী?
বিষয়টি পরিষ্কার করতে “সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী : ভারত সফর ফলপ্রসূ, আমি তৃপ্ত”- এই শিরোনামে  দৈনিক মানবজমিনে গত ১১ এপ্রিল (২০১৭) তারিখে প্রকাশিত প্রতিবেদনের একটি প্যারা হুবহু তুলে ধরলাম: “সাম্প্রতিক ভারত সফর সফল দাবি করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এই সফর ফলপ্রসূ হয়েছে। এবং সফর নিয়ে আমি সম্পূর্ণ তৃপ্ত। বিকেলে গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি একথা বলেন। তিনি বলেছেন, এ সফরে ভারত বাংলাদেশকে একটি সার্বভৌম দেশ হিসেবে সমান মর্যাদা দিয়েছে। তিস্তা চুক্তির বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, ভাটির দেশ হিসেবে পানি এমনিতে আসবে। কেউ পানি আটকে রাখতে পারবে না। তিস্তার গজলডোবায় ভারত যে বাঁধ দিয়েছে তা দেয়ার সময় যারা ক্ষমতায় ছিল তারাতো কিছু বলেনি। কোনো সরকার এ নিয়ে কথা বলেনি। টুঁ শব্দটিও করেনি। তখন নদীর ওপর ব্যারাজ তৈরি করা হলো। এটা কি উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল? এর ফলাফলটা আমরা এখন ভোগ করছি।”
তবে, ভারতের কূটচালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে মারাত্মকভাবে ধরাশায়ী তা অকপটে স্বীকার করেছেন সরকারেরই প্রভাবশালী অংশ। উদাহরণস্বরূপ, বেসরকারি বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেননের এক বক্তব্য তুলে ধরা যেতে পারে। “Mamata spoiled Hasinas India tour: Menon অর্থাৎ “হাসিনার ভারত সফর অকার্যকর করে দিল মমতা: মেনন”- এই শিরোনামে গত ১১ এপ্রিল (২০১৭) তারিখ ইংরেজি দৈনিক “দি ডেইলি স্টার”-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনের খানিকটা তুলে ধরছি:
`Civil Aviation and Tourism Minister Rashed Khan Menon today blamed West Bengal Chief Minister Mamata Banerjee for spoiling Prime Minister Sheikh Hasina`s India visit’. Referring to Mamata’s no change of stand on Teesta water sharing, Menon said Teesta has no alternative to save desertification in the northern region of the country. Tears cannot make a river, likewise, Torsa cannot replace Teesta অর্থাৎ “বেসরকারি বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন শেখ হাসিনার ভারত সফরকে অকার্যকর করে দেয়ার জন্য আজ দুষলেন পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিকে। তিস্তার পানি ভাগাভাগি ইস্যুতে মমতার অবস্থানে পরিবর্তন না হওয়ার দিকে ইঙ্গিত করে মেনন বলেন, দেশের উত্তরাঞ্চলকে মরুভূমি হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে তিস্তার কোনো বিকল্প নেই। চোখের জলে যেমন নদী তৈরি হয় না, তেমনি তিস্তার বিকল্প কখনও তোর্সা হতে পারে না।”
অবশ্য, এখনো বলা হচ্ছে হাসিনা-মোদি আমলেই তিস্তা চুক্তি হবে বলে দুই দেশ আশাবাদী। অর্থাৎ সেই একই মুলা ঝুলেই থাকলো। শেখ হাসিনার ভারত সফরের দ্বিতীয় দিন ৮ এপ্রিল (২০১৭) দিল্লির হায়দ্রাবাদ হাউসের বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জি ও শেখ হাসিনা। পরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি ঘোষণা করেন, দিল্লিতে তার ও ঢাকায় শেখ হাসিনা সরকার মিলেই খুব শীঘ্রই তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে বলে তিনি নিশ্চিত।
“আমার এবং হাসিনার সরকারই পারবে তিস্তা চুক্তি করতে”- এই শিরোনামে বিবিসি বাংলায় ৮ এপ্রিল (২০১৭) তারিখে প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়: “পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী যে আজ আমার আতিথ্য গ্রহণ করেছেন তাতে আমি খুব খুশি। আমি জানি বাংলাদেশের জন্য তার আন্তরিক হৃদ্যতা ও অনুভূতির উষ্ণতা আমার চেয়ে কোনও অংশে কম নয়। আমি বাংলাদেশের মানুষকে কথা দিচ্ছি, তাড়াতাড়ি এই চুক্তি সম্পাদনের জন্য আমাদের প্রয়াস অব্যাহত থাকবে। এবং আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি আমার ও শেখ হাসিনার সরকারই পারবে এই চুক্তি স্বাক্ষর করতে এবং আমরা তা করেও দেখাব।”
ভারতের প্রধানমন্ত্রীর এমন সুস্পষ্ট ঘোষণার পরিণতি নিয়ে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বিবিসির প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, “ভারতে বর্তমান নরেন্দ্র মোদি সরকারের মেয়াদ শেষ হচ্ছে ২০১৯-র মে মাসে, আর বাংলাদেশে শেখ হাসিনার এখনকার সরকারের মেয়াদ ফুরোবে তার মাস পাঁচেক আগে। কাজেই প্রধানমন্ত্রী মোদির কথা সত্যি হলে ধরে নেওয়া যায় ২০১৮-র শেষের মধ্যেই এই দুই সরকার মিলে তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষর করার কাজ শেষ করবে। বহু বছর ধরে অমীমাংসিত এই বিষয়টি নিয়ে অবশেষে একটি প্রকাশ্য সময়সীমা বা টাইমফ্রেম অন্তত ভারত ঘোষণা করল, এটিকে এই সফরের একটা ইতিবাচক দিক হিসেবে অনেকে তুলে ধরছেন।”
তবে, মোদির বক্তব্য আর মমতার বিকল্প প্রস্তাব এবং ভারতীয় রাজনীতির বাস্তবতায় প্রায় নিশ্চিত করেই বলা যায় যে, মোদির ওই বক্তব্য বা প্রতিশ্রুতি কেবলই রাজনৈতিক। এর বাস্তবায়ন এই মেয়াদে হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। তবে, একটি বিষয়ের প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। আর তা হলো বাংলাদেশের আসন্ন ১১তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে বিষয়টি উঠতে পারে এবং ভারতের পক্ষ থেকে আরো জোরালোভাবে তিস্তা চুক্তির সম্ভাব্য আরেকটি সময়সীমা বলা হতে পারে। আর সেটি অবশ্যই বাংলাদেশের ১১তম সংসদ নির্বাচনের পরে। অর্থাৎ আবারো শেখ হাসিনাকে নির্বাচিত করুন, তাহলে তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে।
কঠিন বাস্তবতা হলো ভারতের সাথে চুক্তি করা আর না করার মধ্যে খুব একটা তফাত নেই। কোনদিন তিস্তা চুক্তি হলেও বাংলাদেশ পানি পাবে কি না সন্দেহ। ভারত এখন যেভাবে পানি নিজের ইচ্ছে মতো নিয়ন্ত্রণ করছে তখনও সেভাবেই করবে। আর মমতার মতো ডাহা মিথ্যা অকপটে বলবে যে তিস্তায় পানি নেই, কোথা থেকে দেব? যেই দেশ ফারাক্কার মতো মারণফাঁদ দিয়ে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলকে ক্রমেই মরুভূমি বানিয়ে ফেলছে, প্রয়োজনের সময় পানি দেয় না এবং বর্ষা মওসুমে ফারাক্কার সব গেট খুলে দিয়ে পানিতে ডুবিয়ে দেয় আমাদের। তাদের সাথে আবার চুক্তি।
বড়ই অবাক লাগে শেখ হাসিনার এবারের সফরেও এতগুলো চুক্তি হলো, কিন্তু তিস্তা চুক্তি হলো না। ফারাক্কাসহ অভিন্ন আরো অর্ধশতাধিক নদীতে ভারত যে বাঁধ নির্মাণ করে বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে চলেছে সে ব্যাপারেও এই সফরের সময় টুঁ শব্দটি করলেন না শেখ হাসিনা। চলছে সুন্দরবনের বাংলাদেশের অংশ ধ্বংসের গভীর ষড়যন্ত্র। অথচ এরই মধ্যে ট্রানজিটের নামে সমুদ্রবন্দর গেল, সামরিক সমঝোতার নামে অনেক কিছু খোয়াবার জোগাড় এবং আরো যতটুকু বাকি আছে ভবিষ্যতে সেটা কড়ায় গণ্ডায় আদায় করতে তিস্তার মুলাটা ঝুলে আছে। আর স্বাধীনতার তথাকথিত চেতনাধারী ও ফেরিওয়ালারা যে খুব শীঘ্রই সিকিমের লেন্দুপ দর্জির কাতারে পুরোমাত্রায় শামিল হতে যাচ্ছেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে, রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যেই বাংলাদেশের জন্ম তাকে যে সহসা সিকিম বা হায়দ্রাবাদ বানানো যাবে না সেই সুমতি ভারত ও তার এদেশীয় দোসরদের যেন আসে সেই প্রত্যাশাই সবার।
লেখক : সাংবাদিক

SHARE

Leave a Reply