প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার রহস্যময় ছুটি অনেক প্রশ্ন সন্দেহ সংশয় -হারুন ইবনে শাহাদাত

বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা গত ১৩ অক্টোবর রাতে অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেছেন। যাওয়ার আগে রেখে গেছেন অনেক প্রশ্ন, সন্দেহ, সংশয় তর্ক-বিতর্ক এবং আলোচনা সমালোচনা। এর আগের দিন গত বৃহস্পতিবার ১২ অক্টোবর আইন মন্ত্রণালয় প্রধান বিচারপতির ছুটি সংক্রান্ত একটি আদেশ জারি করে। আইন সচিব আবু সালেহ শেখ মো. জহিরুল হক স্বাক্ষরিত এই আদেশে বলা হয়, প্রধান বিচারপতির আবেদনে এর আগে ৩ অক্টোবর থেকে ১ নভেম্বর পর্যন্ত ৩০ দিনের ছুটি মঞ্জুর করেছিলেন রাষ্ট্রপতি। উল্লেখ্য, ২৫ দিনের অবকাশ শেষে ৩ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট খোলার দিনই অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে ১ নভেম্বর পর্যন্ত এক মাসের ছুটিতে যান সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। এ নিয়ে রাজনৈতিক মহল ও আইনজীবীদের মধ্যে আলোচনার ঝড় ওঠে। এর আগে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে দেয়া রায় এবং বিচারিক আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলাবিধি সংক্রান্ত গেজেট নিয়ে সরকারের সঙ্গে প্রধান বিচারপতির মতপার্থক্য দেখা দেয়ায়, প্রধান বিচারপতিকে জোর করে ছুটিতে পাঠানোর অভিযোগ তোলেন বিএনপি-জামায়াতপন্থী আইনজীবীরা এবং সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নেতারা। তবে সরকার ও আওয়ামী লীগ এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে। বিষয়টি আরো জটিল আকার ধারণ করেছে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা বিমানবন্দরে যাওয়ার আগে সাংবাদিকদের সাথে দেয়া বক্তব্য এবং একটি লিখিত বিবৃতি এবং সুপ্রিম কোর্টের পাল্টা বিবৃতির পর।

বিবৃতি-পাল্টা বিবৃতি
অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ার আগে হেয়ার রোডের বাসার সামনে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আমি অসুস্থ না। আমি পালিয়েও যাচ্ছি না। আমি আবার ফিরে আসব। আমি একটু বিব্রত। আমি বিচার বিভাগের অভিভাবক। বিচার বিভাগের স্বার্থে, বিচার বিভাগটা যাতে কলুষিত না হয়, এ কারণেই আমি সাময়িকভাবে যাচ্ছি। আমার কারও প্রতি কোনো বিরাগ নেই। আমার দৃঢ়বিশ্বাস, সরকারকে ভুল বোঝানো হয়েছে। এই আমার বক্তব্য। আর কিছু বলব না। আমি লিখিত বক্তব্য দিচ্ছি। এই হলো আমার লিখিত বক্তব্য।’ বক্তব্যের কপি সাংবাদিকদের হাতে তুলে দিয়ে তিনি বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা দেন। সবুজ কালিতে তার স্বাক্ষরিত বক্তব্যটি হুবহু তুলে ধরা হলোÑ ‘আমি সম্পূর্ণ সুস্থ আছি। কিন্তু ইদানীং একটা রায় নিয়ে রাজনৈতিক মহল, আইনজীবী ও বিশেষভাবে সরকারের মাননীয় কয়েকজন মন্ত্রী ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে ব্যক্তিগতভাবে যেভাবে সমালোচনা করেছেন এতে আমি সত্যিই বিব্রত। আমার দৃঢ়বিশ্বাস, সরকারের একটা মহল আমার রায়কে ভুল ব্যাখ্যা প্রদান করে পরিবেশন করায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমার প্রতি অভিমান করেছেন, যা অচিরেই দূরীভূত হবে বলে আমার বিশ্বাস। সেই সঙ্গে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে আমি একটু শঙ্কিতও বটে। কারণ গতকাল (১২ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার) প্রধান বিচারপতির কার্যভার পালনরত দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রবীণতম বিচারপতির উদ্ধৃতি দিয়ে মাননীয় আইনমন্ত্রী প্রকাশ করেছেন যে, দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি অচিরেই সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনে পরিবর্তন আনবেন। প্রধান বিচারপতির প্রশাসনে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি কিংবা সরকারের হস্তক্ষেপ করার কোনো রেওয়াজ নেই। তিনি শুধু রুটিনমাফিক দৈনন্দিন কাজ করবেন। এটিই হয়ে আসছে। প্রধান বিচারপতির প্রশাসনে হস্তক্ষেপ করলে এটি সহজেই অনুমেয় যে, সরকার উচ্চ আদালতে হস্তক্ষেপ করছে এবং এর দ্বারা বিচার বিভাগ ও সরকারের মধ্যে সম্পর্কের আরও অবনতি হবে। এটি রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না।’
এর পরদিন ১৪ অক্টোবর শনিবার সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার সৈয়দ আমিনুল ইসলামের স্বাক্ষর করা দুই পৃষ্ঠার বিবৃতিতে বলা হয়, ‘প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, বিদেশে অর্থ পাচার, আর্থিক অনিয়ম ও নৈতিক স্খলনসহ সুনির্দিষ্ট ১১টি অভিযোগ উঠেছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগের বিচারপতিদের বঙ্গভবনে ডেকে এস কে সিনহার বিরুদ্ধে দুর্নীতির দালিলিক প্রমাণাদি হস্তান্তর করেন রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদ।’ সুপ্রিম কোর্টের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মহামান্য রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতি মো: আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞাকে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির অনুপস্থিতিতে প্রধান বিচারপতির অনুরূপ কার্যভার পালনের দায়িত্ব প্রদান করেন।’ এতে বলা হয়, ‘প্রধান বিচারপতির পদটি একটি প্রতিষ্ঠান। সেই পদের ও বিচার বিভাগের মর্যাদা সুমন্নত রাখার স্বার্থে ইতঃপূর্বে সুপ্রিম কোর্টের তরফ থেকে কোনো প্রকার বিবৃতি বা বক্তব্য প্রদান করা হয়নি। কিন্তু উদ্ভূত পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে নির্দেশক্রমে উক্ত বিবৃতি প্রদান করা হলো।’
প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার লিখিত বিবৃতির জবাবে সুপ্রিম কোর্টের দেয়া বিবৃতিতে বলা হয়, এস কে সিনহার বিবৃতি বিভ্রান্তমূলক। এতে বলা হয়, ‘গত ৩০ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা ব্যতীত আপিল বিভাগের ৫ জন বিচারপতিকে বঙ্গভবনে আমন্ত্রণ জানান। বিচারপতি মো: ইমান আলী দেশের বাইরে থাকায় তিনি সেখানে উপস্থিত হতে পারেননি। অপর চারজন বিচারপতি মো: আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী এবং বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। দীর্ঘ আলোচনার একপর্যায়ে রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার বিরুদ্ধে ১১টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ সংবলিত দালিলিক তথ্যাদি হস্তান্তর করেন। এর মধ্যে বিদেশে অর্থ পাচার, আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি, নৈতিক স্খলনসহ আরও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।’
সুপ্রিম কোর্টের ওই বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘বিচারপতি ইমান আলী ঢাকায় আসার পর ১ অক্টোবর আপিল বিভাগের ৫ বিচারপতি বৈঠকে মিলিত হয়ে উক্ত ১১টি অভিযোগ বিশদভাবে পর্যালোচনার পর এ সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, ওইসব গুরুতর অভিযোগগুলো প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাকে অবহিত করা হবে। তিনি যদি ওইসব অভিযোগের ব্যাপারে কোনো সন্তোষজনক জবাব বা সদুত্তর দিতে ব্যর্থ হন তাহলে তার সঙ্গে বিচারালয়ে বসে বিচারকার্য পরিচালনা করা সম্ভব হবে না। এ সিদ্ধান্তের পর ওই দিন বেলা সাড়ে ১১টায় মাননীয় প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার অনুমতি নিয়ে উল্লিখিত পাঁচ বিচারপতি মাননীয় প্রধান বিচারপতির ১৯ হেয়ার রোড, রমনা, ঢাকার বাসভবনে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে অভিযোগগুলোর বিষয়ে বিশদ আলোচনা করেন। কিন্তু দীর্ঘ আলোচনার পরও তার কাছ থেকে কোনো ধরনের গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা বা সদুত্তর না পেয়ে আপিল বিভাগের উলিখিত ৫ বিচারপতি তাকে সুস্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, এ অবস্থায় উক্ত অভিযোগের সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত তার সঙ্গে একই বেঞ্চে বসে তাদের পক্ষে বিচারকার্য পরিচালনা করা সম্ভব হবে না। একপর্যায়ে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা সুস্পষ্টভাবে বলেন, সে ক্ষেত্রে তিনি পদত্যাগ করবেন। তবে ২ অক্টোবর তিনি উল্লিখিত বিচারপতিদের কোনো কিছু অবহিত না করেই মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে এক মাসের ছুটির আবেদন করেন এবং রাষ্ট্রপতি তা অনুমোদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধান বিচারপতির আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতি মো: আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞাকে প্রধান বিচারপতির অনুপস্থিতিতে প্রধান বিচারপতির অনুরূপ কার্যভার পালনের দায়িত্ব প্রদান করেন। সুপ্রিম কোর্টের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, ‘ছুটি ভোগরত প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা ১৩ অক্টোবর বিদেশ গমনের প্রাক্কালে একটি লিখিত বিবৃতি গণমাধ্যম কর্মীদের হস্তান্তর করেন। উক্ত বিবৃতি সুপ্রিম কোর্টের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। উক্ত লিখিত বিবৃতি বিভ্রান্তিমূলক।’ গত ১৬ অক্টোবর সোমবার বিকেলে সুপ্রিম কোর্টের জাজেস লাউঞ্জে অনুষ্ঠিত ফুল কোর্ট সভায় হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের বিচারপতিদের নিয়ে বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা সভাপতির বক্তব্যে সভার শুরুতে গত ১৪ অক্টোবর শনিবার দেয়া বিবৃতির প্রেক্ষাপট অবহিত করেন। এ সময় তিনি বলেন, প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার বিবৃতির কারণেই সুপ্রিম কোর্টকে বিবৃতি দিতে হয়েছে।
আইনমন্ত্রী ও অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্য
প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বিদেশ যাওয়ার প্রাক্কালে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির এখতিয়ার নিয়ে যে বক্তব্য দিয়ে গেছেন তা আইনসঙ্গত নয় বলে মন্তব্য করেছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক। গত ১৪ অক্টোবর আইন মন্ত্রণালয়ে তার কার্যালয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ কথা বলেন তিনি। আনিসুল হক বলেন, সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধান বিচারপতির এখতিয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির এখতিয়ার একই। এ বিষয়ে প্রধান বিচারপতি বিদেশ যাওয়ার প্রাক্কালে এক চিঠিতে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা আইনসঙ্গত নয়। এ বক্তব্যের জন্য আমি মনে করি, প্রধান বিচারপতি যা বলেছেন তাতে উনিই বিব্রত। আইনমন্ত্রী বলেন, যখন প্রধান বিচারপতি তার বাসস্থান ত্যাগ করেন, তখন কাউকে অ্যাড্রেস না করে একটি চিঠি বা লিখিত জিনিস দিয়েছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ। আমি তার এ বক্তব্যে হতভম্ব। তার কারণ হচ্ছে, দেশের প্রধান বিচারপতি রাষ্ট্রপতির কাছে নিজ হাতে চিঠি লিখেছেন, সেখানে কী লিখেছেন, তা আপনাদের আমি পড়ে শুনিয়েছি। তিনি যে অসুস্থ সে কথা তিনি চিঠিতে বলেছেন। প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ ও তার বিদেশ সফর নিয়ে সাংবাদিকদের করা প্রশ্নের উত্তরে আইনমন্ত্রী বলেন, আইনের বলে যদি কারো বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ হয়, তখন একটি প্রক্রিয়া আছে, যেটি সম্পন্ন করে মামলা-মোকদ্দমায় যেতে হয়। অভিযোগ যেহেতু উঠেছে, প্রথমে অনুসন্ধান করা হবে। এর সত্যতা পাওয়া গেলে পরবর্তী যে ব্যবস্থা গ্রহণ করার সেটি করা হবে। পরিষ্কারভাবে আমি বলতে চাই, কেউ কিন্তু আইনের ঊর্ধ্বে নয়। আইনে যা বলা আছে, সবার ব্যাপারে সেটা পালন করা হবে। তবে সুপ্রিম কোর্ট যে বিবৃতি দিয়েছেন, সে বিষয়ে আমি বিশেষ কিছু বলতে চাই না। অভিযুক্ত থাকার প্রেক্ষাপটে বিদেশ থেকে ফিরে প্রধান বিচারপতি দায়িত্বভার গ্রহণ করতে পারবেন কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্য অনুযায়ী, যতক্ষণ পর্যন্ত ১১টি অভিযোগের বিষয়ে সুরাহা না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত হয়তো অন্য বিচারপতিরা ওনার সঙ্গে বসবেন না। তাহলে কী করে তিনি এখানে এসে বসবেন। কারণ সুপ্রিম কোর্টে আপিল বিভাগে একক বেঞ্চের কোনো নিয়ম আছে বলে আমার জানা নেই। প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের তদন্ত প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, তার বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগই দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আওতায় পড়ে। দুদক একটি স্বাধীন কমিশন। এসব অভিযোগের তদন্ত দুদকই করবে।
সরকার মনে করে, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল কার্যকর নয়। আর সংসদের হাতেও বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা যায়নি। এ অবস্থায় প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অনুসন্ধানে প্রমাণ হলে তার বিচারের প্রক্রিয়া কী হবে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী বলেন, এ ক্ষেত্রে একটা শূন্যতা আছে, তবে রাষ্ট্রপতির কিছু নিজস্ব ক্ষমতা আছে। অভিযোগ সম্পর্কে অনুসন্ধান হবে, তারপর আইন অনুযায়ী কার্যক্রম চলবে।
অ্যাটার্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, “প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার ফিরে এসে দায়িত্ব গ্রহণ সুদূর পরাহত। কারণ, আপিল বিভাগের বিচারপতিরা তার সঙ্গে এক বেঞ্চে বসতে চান না। অন্য বিচারপতিরা না বসলে এস কে সিনহা একা বিচারকাজ করতে পারবেন না।” অন্যদিকে দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী বলেছেন, “আমি নিশ্চিত-তিনি যদি চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে কাল সকালে আবার দায়িত্ব নিতে চান তাতেও কোনো সমস্যা হবে না।”

আইনজীবী সমিতির পাল্টাপাল্টি সম্মেলন
ছুটি নিয়ে বিদেশ গমনের যাত্রাকালে গত ১৩ অক্টোবর গণমাধ্যমের কাছে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার দেয়া বক্তব্য নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন করেছেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির বিএনপি ও আওয়ামীপন্থী আইনজীবীরা। গত শনিবার ১৪ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির মিলনায়তনে পূর্বঘোষিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন। এর পরপরই সংবাদ সম্মেলনে করেন আওয়ামীপন্থী আইনজীবী সমিতির সদস্যরা।
বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের সম্মেলন সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন লিখিত বক্তব্যে বলেন, ‘প্রধান বিচারপতির বক্তব্যে পরিষ্কার হয়েছে যে, ষোড়শ সংশোধনীর পরই বিচার বিভাগ তথা প্রধান বিচারপতির ওপর এই হামলা। প্রধান বিচারপতি অসুস্থ নন, তার বক্তব্যেই এটা প্রমাণ হয়েছে, যা সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি এত দিন বলে আসছিল।’ প্রধান বিচারপতিকে জোর করে ছুটিতে পাঠানো হয়েছে দাবি করে জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘সমগ্র বিচার বিভাগ এবং বিচারকদের ওপর হুমকির সৃষ্টি হয়েছে।’ এ অবস্থায় বিচার বিভাগকে বাঁচাতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। প্রধান বিচারপতির দেয়া বক্তব্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আইনজীবী সমিতি যা এতদিন দৃঢ়তার সঙ্গে বলে আসছে তাই সত্য হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। আমরা আজ সারা দেশের আপামর জনগণ এবং আইনজীবীদের সর্বত্র সহযোগিতা কামনা করছি, বিচার বিভাগ রক্ষার আন্দোলনে শরিক হওয়ার জন্য।’ তিনি রাষ্ট্রপতির উদ্দেশে বলেন, ‘রাষ্ট্রের প্রধান হচ্ছেন রাষ্ট্রপতি। কাজেই রাষ্ট্রপতির প্রতি আমাদের আহ্বান, আপনি বিচার বিভাগকে বাঁচাতে এগিয়ে আসুন। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করুন।’ তিনি বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক মহল, আইনজীবী ও সরকারের মন্ত্রীরা ব্যক্তিগতভাবে প্রধান বিচারপতির সমালোচনা করেছেন, যা বিব্রতকর বলে প্রধান বিচারপতি তার বক্তব্যে তুলে ধরেছেন। প্রধান বিচারপতিকে হয়তো তার সব বক্তব্য প্রকাশ করতে দেয়া হয়নি। হয়তো আরও কিছু বলতে চেয়েছিলেন তিনি।’
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপনের আগে বক্তব্য দেন আইনজীবী সমিতির সম্পাদক মাহবুব উদ্দিন খোকন। তিনি বলেন, ‘আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম তারা সাংবিধানিক পদে থেকে সংবিধান লংঘন করেছেন। তাদের সাংবিধানিক পদে থাকার কোনও অধিকার নেই।’ এ সময় তিনি সাবেক তিনজন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠন করে বিষয়টি (প্রধান বিচারপতির ছুটি ও অসুস্থতা) সুষ্ঠু তদন্তের আহ্বান জানান। সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের রদবদল প্রসঙ্গে সমিতির সম্পাদক খোকন বলেন, ‘প্রধান বিচারপতি বলে গিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টে সরকার হস্তক্ষেপ করছে। আইনমন্ত্রী বলেছেন, প্রশাসনের রদবদল করছে। এতে প্রধান বিচারপতির বক্তব্য প্রমাণিত হয়েছে, এতে মন্ত্রীরা জড়িত। আরও অনেকেই জড়িত।’ বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়ে খোকন বলেন, ‘এসব অভিযোগ আবেদন আকারে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির নিকট দাখিল করা হোক। কারণ দেশের প্রধান বিচারপতি যদি অভিযোগ করে সেই অভিযোগ যদি সুরাহা না হয়, তদন্ত না হয় এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না হয় তাহলে দেশে সংবিধান থাকবে না। সংবিধানের ওপর আস্থা থাকবে না।’
সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামীপন্থী আইনজীবীরা উপস্থিত হলে হট্টগোলের সৃষ্টি হয়। এদিকে আইনজীবী সমিতির বিএনপিপন্থীদের সংবাদ সম্মেলন শেষ হতে না হতেই সমিতির সহ-সভাপতি অজিউল্লাহর নেতৃত্বে একই স্থানে পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করতে যায় আওয়ামীপন্থীরা। এ সময় মিলনায়তনে হট্টগোল শুরু হয়। পাল্টাপাল্টি স্লোগান আর বাগি¦তণ্ডার মধ্যে আওয়ামীপন্থীরা মিলনায়তন থেকে বের হয়ে আসে।
পরে সমিতি ভবনের প্রবেশমুখে সাংবাদিকদের ডেকে নিয়ে কথা বলেন আইনজীবী সমিতির সহ-সভাপতি মো: অজিউল্লাহ। তিনি বলেন, ‘কিছুক্ষণ আগে আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সম্পাদক যে সংবাদ সম্মেলন করেছেন তা ছিল তাদের ব্যক্তিগত। এটা ছিল তাদের দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন। আমরা সম্পূর্ণভাবে তাদের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট বারের আমরা ছয়জন নির্বাচিত কর্মকর্তা আছি। আমাদের পরিষ্কার বক্তব্য হলো- প্রধান বিচারপতি নিজে ছুটি নিয়ে স্বেচ্ছায় বিদেশ গিয়েছেন। তার ছুটি নিয়ে কোনও বিতর্ক নেই। তিনি নিজেই বলেছেন, ছুটি শেষে তিনি আবার ফিরে আসবেন।’ যাওয়ার আগে সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনে রদবদল নিয়ে প্রধান বিচারপতি যে বক্তব্য দিয়েছেন তা সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদকে লঙ্ঘন করেছে দাবি করে অজিউল্লাহ বলেন, ‘৯৭ অনুচ্ছেদে বলা আছে- প্রধান বিচারপতি যদি রাষ্ট্রপতির নিকট ছুটি নেন তাহলে প্রধান বিচারপতির অনুপস্থিতিতে যাকে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব দেয়া হবে তিনি বিচারিক ও প্রশাসনিক সকল কার্য পরিচালনা করবেন। এতে সাংবিধানিক কোনও বাধা নেই।’ কিন্তু বিষয়কে এত সহজ সরলভাবে দেখছেন না দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ ও দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতারা।
বিএনপি ও জামায়াতের প্রতিক্রিয়া
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বিবৃতিতেই প্রমাণিত হয়েছে সরকার বিচার বিভাগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।
প্রধান বিচারপতি বিদেশে যাওয়ার পরদিন গত ১৪ অক্টোবর শনিবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “প্রধান বিচারপতি ইতোমধ্যেই বলে দিয়েছেন, সরকার এখন সর্বোচ্চ আদালতের ওপরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। এখানে আমাদের নতুন করে কিচ্ছুই বলার নেই।” শারীরিক অবস্থা নিয়ে বিচারপতি সিনহার বক্তব্য বিএনপির কথাকেই সত্য প্রমাণিত করেছে মন্তব্য করে ফখরুল বলেন, “তাকে যখন ছুটি চাওয়ানো হয় তখন বলা হয়েছিল, অসুস্থ আছে। তিনি বলেছেন, তিনি সুস্থ আছেন। অথচ সরকার সব সময় বলেছে, তিনি অসুস্থ, চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাবেন।” ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে ক্ষমতাসীনদের তোপের মুখে থাকা বিচারপতি সিনহা গত ১৩ অক্টোবর শুক্রবার রাতে বিদেশে যাওয়ার আগে সাংবাদিকদের দেয়া এক লিখিত বিবৃতিতে বলেন, তিনি অসুস্থ নন, বিচার বিভাগ যাতে কলুষিত না হয় সেজন্য ‘সাময়িকভাবে’ বিদেশে যাচ্ছেন। ওই রায়ের সমালোচনা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “ইদানীং একটা রায় নিয়ে রাজনৈতিক মহল, আইনজীবী ও বিশেষভাবে সরকারের মাননীয় কয়েকজন মন্ত্রী ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে ব্যক্তিগতভাবে যেভাবে সমালোচনা করেছেন, এতে আমি সত্যিই বিব্রত।” প্রধান বিচারপতি উচ্চ আদালতে সরকারের হস্তক্ষেপের আশঙ্কার কথাও বলেছেন। রাষ্ট্রের জন্য তা ‘কল্যাণ বয়ে আনবে না’ বলে সতর্ক করেছেন তিনি। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “দিজ স্টেটমেন্ট হ্যাজ স্টেটস দ্য ফ্যাক্টস। সত্য কথাগুলো বলে দিয়েছেন। সত্য কথাগুলো বলার পরে প্রমাণিত হয়ে গেছে যে, এই গভর্নমেন্টের ইনটেনশনটা কী, গভর্নমেন্ট কী করতে চাচ্ছে?” “যে কোনো বুদ্ধিমান লোক যারা এটা (প্রধান বিচারপতির বিবৃতি) পড়বেন তারা বুঝে যাবেন, কোন পরিস্থিতিতে প্রধান বিচারপতিকে চলে যেতে হয়েছে এবং কী ঘটতে চলেছে।” তার রায় নিয়ে সরকারকে ভুল বোঝানো হয়েছে বলে প্রধান বিচারপতি যে বক্তব্য দিয়েছেন, তাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন মির্জা ফখরুল।
তিনি বলেন, “তিনি বলেছেন, ‘সরকারকে ভুল বুঝানো হচ্ছে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অভিমান করেছেন’। আমি এই জিনিসটাকে সিরিয়াসলি দেখেছি। সরকারকে ভুল বোঝানো হচ্ছে, কে করছে? কারা করছে? কারা সেদিন তাকে (প্রধান বিচারপতি) বাধ্য করল অফিস ছেড়ে চলে যেতে, যেখানে তার জয়েন করার কথা। কারা বাধ্য করল, কারা ফলস একটা ডকুমেন্ট তৈরি করল?” প্রধান বিচারপতি ছুটিতে যাওয়ার পর ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি ওয়াহহাব মিঞার সঙ্গে বৈঠকের পর আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বক্তব্যকে বিচার বিভাগের ওপর সরকারের হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত দেয় বলে মনে করেন ফখরুল।
বিচার বিভাগের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এ টি এম মাসুম গত ১৬ অক্টোবর প্রদত্ত এক বিবৃতিতে বলেন, “সরকার বিচার বিভাগের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার যে হীন প্রচেষ্টা চালাচ্ছে তা দেশ এবং জাতিকে এক গভীর সঙ্কটের দিকে ঠেলে দিবে। সরকার অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে প্রধান বিচারপতিকে কেন্দ্র করে যেসব নাটকের আয়োজন করেছে তা বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে নজিরবিহীন। সরকারের পক্ষ থেকে প্রথমে বলা হলো প্রধান বিচারপতি অসুস্থ। এ জন্য তিনি ছুটি চেয়েছেন। প্রধান বিচারপতি অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার পূর্বে যে লিখিত বক্তব্য দিয়েছেন তাতে তিনি বলেছেন, ‘আমি অসুস্থ নই, আমি সম্পূর্ণ সুস্থ আছি, ‘আমি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে একটু শঙ্কিতও বটে এবং প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের আমার ব্যক্তিগত সমালোচনায় আমি সত্যিই বিব্রত।’
প্রধান বিচারপতি দেশ ত্যাগ করার পর সরকারের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত ১১টি অভিযোগের ঘটনা গণমাধ্যমে প্রচার করা হয়। সঙ্গত কারণেই জনগণের মনে প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে যে, অর্থ আত্মসাৎ, বিদেশে অর্থ পাচারসহ নানা অপরাধ, দুর্নীতি ও অনৈতিক কর্মকান্ডের সাথে জড়িত ব্যক্তিকে কেন বিদেশ যেতে দেয়া হলো?
প্রধান বিচারপতির দেশ ত্যাগের পর আইনমন্ত্রী ও অ্যাটর্নি জেনারেল যেসব বক্তব্য দিয়েছেন তাতে সরকারের পক্ষ থেকে এ কথারই ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে যে, তারা প্রধান বিচারপতিকে আর দায়িত্ব পালন করতে দিতে ইচ্ছুক নন। ষোড়শ সংশোধনীর রায়কে কেন্দ্র করে সরকার সর্বোচ্চ আদালতের বিরুদ্ধে যে প্রকাশ্য বক্তব্য রেখেছে তাতে প্রতীয়মান হয়, নিজেদের পছন্দ মতো রায় না দিলে প্রধান বিচারপতির মত গুরুত্বপূর্ণ আসনে কিছুতেই অধিষ্ঠিত থাকা সম্ভব নয়। সর্বোচ্চ আদালত তথা বিচার বিভাগ নিয়ে সরকার যে ষড়যন্ত্র করছে তা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। সরকারের এ ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে দলমত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধভাবে সোচ্চার হওয়ার জন্য আমি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।”

দ্বন্দ্বের শুরু যে কারণে
প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা তার এক রায়ে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অসদাচরণ তদন্ত ও অপসারণের সুপারিশ করার ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতেই ফিরিয়ে দেন। বর্তমান সরকারের সময়ে এই ক্ষমতা জাতীয় সংসদের কাছে দিতে সংবিধানে ষোড়শ সংশোধনী আনা হয়েছিল। বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের হাতে দিতে আনা সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণার রায় বহাল রেখে আপিল বিভাগের দেয়া পূর্ণাঙ্গ রায় গত ১ আগস্ট মঙ্গলবার প্রকাশিত হয়। উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে নেয়া সংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় দেয়ার পর থেকে বিচার বিভাগের সঙ্গে সরকারের এক ধরনের টানাপড়েন শুরু হয়। উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে নিতে ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রস্তাব সংসদে পাস হয়, যা ষোড়শ সংশোধনী হিসেবে পরিচিত। নয়জন আইনজীবীর রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ২০১৬ সালের ৫ মে সংবিধানের ওই সংশোধনী ‘অবৈধ’ ঘোষণা করে রায় দেন। গত ৩ জুলাই আপিল বিভাগও ওই রায় বহাল রাখেন। যার পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ পায় ১ আগস্ট। রায়ের পর্যবেক্ষণের এক স্থানে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘মানবাধিকার ঝুঁকিতে, দুর্নীতি অনিয়ন্ত্রিত, সংসদ অকার্যকর, কোটি মানুষ স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত।’ ৭৯৯ পৃষ্ঠার রায়ে সরকার, সংসদ, রাজনীতি, নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, সামরিক শাসন এবং রাষ্ট্র ও সমাজের বিভিন্ন বিষয়ে এমন অনেক পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে। এরপরই প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার দেয়া রায় ও পর্যবেক্ষণের তীব্র সমালোচনা করেন সরকারের মন্ত্রী-এমপি ও নেতারা। এমনকি কোনো কোনো মন্ত্রী এবং বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের নেতারা প্রধান বিচারপতির পদত্যাগের দাবিতে সরব হন। পাশাপাশি রায়ে প্রধান বিচারপতির দেয়া পর্যবেক্ষণও স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে প্রত্যাহারের দাবি জানান। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বিচারপতি সিনহার ভাইয়ের নামে রাজউকের প্লট নেয়ায় অনিয়মের কথা সংসদে বলেছিলেন। মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করার কথাও বলেছিলেন তিনি। সংসদ সদস্য মহীউদ্দীন খান আলমগীরের মালিকানাধীন ব্যাংকে বেনামে বিচারপতি সিনহার অর্থ জমা রাখার কথা বলেছিলেন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী। বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের ‘দুর্নীতির’ তদন্ত আটকাতে প্রধান বিচারপতি সিনহার পদক্ষেপের সমালোচনা করেন। গত ১৪ অক্টোবর শনিবার সাবেক আইনমন্ত্রী ও আইন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি আবদুল মতিন খসরু কুমিল্লায় তার নির্বাচনী এলাকায় সাংবাদিকদের বলেছেন, প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার বিরুদ্ধে দালিলিক প্রমাণসহ কিছু অভিযোগ পাওয়া গেছে। তদন্তে তা প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি বলেন, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে।
রাজননৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন, এমন আলোচনা সমালোচনার মুখে প্রধান বিচারপতি বিব্রত হয়েই দেশত্যাগ করেছেন। বিচার বিভাগের মতো রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গকে বিতর্কিত করা কারো জন্যই মঙ্গলজনক নয়। উল্লিখিত বিষয়টিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক ও সমসাময়িক ঐতিহাসিক ইস্যু থেকে বিচার বিভাগকে নিরাপদ দূরত্বে রাখার দায়িত্ব যখন যারা ক্ষমতায় থাকেন তাদের, তাই সব রাজনৈতিক দলের নেতাদের উচিত রাষ্ট্র ক্ষমতায় গিয়ে এমন কোনো রাজনৈতিক ও বিতর্কিত সমসাময়িক ঐতিহাসিক ইস্যু আদালতের বারান্দায় না নেয়া। আর এর জন্য প্রয়োজন গণতান্ত্রিক রাজনীতি চর্চার মুক্ত পরিবেশ। তা না হলে এই সঙ্কট কমবে না, বরং দিন দিন বাড়তেই থাকবে। হ
লেখক : কথাসাহিত্যিক, সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply