প্রসঙ্গ এমসি কলেজ ছাত্রলীগের ছাত্রাবাস জ্বালাও-পোড়াও রাজনীতি

মুহাম্মদ আবদুল জব্বার


ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস কারো অজানা নয়। তাদের অবদানও স্বীকৃত। কিন্তু স্বাধীনতা-পরবর্তী তাদের সন্ত্রাস,  টেন্ডার, ভর্তিবাণিজ্য ও অনৈতিক কাজে সরব অংশগ্রহণ জাতিকে আশাহত করেছে। এর প্রভাব অন্যান্য লেজুড়বৃত্তিক, ব্যক্তিতান্ত্রিক ছাত্র সংগঠনগুলোকেও সাংঘাতিকভাবে প্রভাবিত করেছে। যেখানে শিক্ষাঙ্গনগুলোতে নিরাপদ আর শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ থাকার কথা, সেখানে প্রতিপক্ষ অথবা আন্তঃকোন্দলে ছাত্রহত্যা মিডিয়ায় নিত্যনৈমিত্তিক খবরের অংশ হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। এ সরকারের শুরু থেকে ছাত্রলীগের লাগামহীন কর্মকাণ্ডে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ছাত্রলীগের দায়িত্বভার থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীকে বুদ্ধিজীবীরা বারবার পরামর্শ দিয়েও ছাত্রলীগের সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি বন্ধে কোনো সুরাহা করতে পারেননি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এর পরও ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠা বার্র্ষিকীসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সরব অংশগ্রহণ করতে দেখা গেছে। এখন তাই বাংলাদেশের মানুষের কাছে ছাত্ররাজনীতি মানে আতঙ্ক আর আশঙ্কার নাম। ছাত্ররাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত অধিকাংশের ছাত্রত্ব নেই। বিবাহিত, সন্তানের জনক, ব্যবসায়-বাণিজ্য, মাদকাসক্ততা ইত্যাদি অভিযোগ তাদেরকে ঘিরে রেখেছে। বাস্তব অবস্থাও তাই। ২০১১ সালে ছাত্রলীগের পাবনা জেলা কমিটি গঠনের আগে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু ছাত্রলীগের রক্ত পরীক্ষা করে তাদের সুস্থতা নিশ্চিত করে জেলা কমিটিতে মনোনয়ন দেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের অপরাধ প্রবণতা দেখে কেউ কেউ ডাকাতের গ্রাম বলে সম্বোধন করতে কুণ্ঠাবোধ করেননি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ নেতা মানিকের ধর্ষণের সেঞ্চুরি কারো অজানা নয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের জন্য আগে থেকে সন্ধ্যা আইনের প্রচলন ছিল। সরকার ছাত্রশিবিরকে দমন-পীড়নের মাধ্যমে ক্যাম্পাস ছাড়তে বাধ্য করার পর এখন দিন দুপুরেও ছাত্রীরা ক্যাম্পাসে ইভটিজিংসহ নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হওয়ার কারণে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দুপুর আইন পাস করতে বাধ্য হয়েছে।
২০০৯ সালে সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে সারা দেশে সরকারের মদদপুষ্ট প্রশাসন ও ছাত্রলীগ-বিরোধী মতের অনুসারী ছাত্রদের ওপর জেল-জুলুম, হত্যা, গুম ও নির্যাতন প্রকট আকার ধারণ করেছে। ২০১০ সালের ৮ ফেব্র“য়ারি রাবি ছাত্র ফারুক হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে প্রশাসন সারা দেশে একযোগে শিবিরের বিরুদ্ধে চিরুনি অভিযান চালিয়েছিল। হাজার হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আর স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সফর করার মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মাথায় পদ্মা সেতুর জন্য কথিত তহবিল সংগ্রহের ভাগবাটোয়ারা নিয়ে গত ১৫ জুলাই একই ক্যাম্পাসের ছাত্র ছাত্রলীগের সভাপতি-সেক্রেটারি গ্র“পের গোলাগুলিতে আব্দুল্লাহিল সোহেল গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হলেন। প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এর জন্য কী পদক্ষেপ নেবেন? বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনগুলো আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতির কথায় সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইলে ‘যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের’ বিচারকার্য বাধাগ্রস্ত করার জন্য বিরোধী দলগুলোর ষড়যন্ত্র বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা অব্যাহত রাখেন।

শিক্ষামন্ত্রী কাঁদলেন, নিলেন না কোনো ব্যবস্থা

উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সন্তানদের পাঠিয়ে অভিভাবকরা অনিশ্চয়তার প্রহর গুনছেন। ঠুনকো অভিযোগে সারা দেশের ক্যাম্পাসগুলো মাসের পর মাস বন্ধ রেখেছে এই ছাত্রলীগ। তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করার কি কেউ নেই? এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, যখনই ছাত্রলীগের সাথে ছাত্রশিবির অথবা অন্য যে কোনো ছাত্র সংগঠনের সংঘর্ষ বাধে তখনই তারা হল-ছাত্রাবাসগুলোতে আগুন লাগিয়ে দেয়। এখন প্রশ্ন জাগে এটা কোন ধরনের রাজনীতি? এতে ছাত্রদের প্রয়োজনীয় বইপত্রসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এতে প্রফিট কার? যদি ছাত্রলীগ ছাত্রাবাসগুলো দখল করা অথবা নিয়ন্ত্রণ করার খায়েস থাকতো তাহলে তারা কখনও হল-ছাত্রাবাসে জ্বালাও পোড়াও করতো না। জ্বালাও পোড়াও রাজনীতির পেছনে মূল কারণ হচ্ছে এসকল ছাত্রাবাসে মেধাবী ছাত্ররা থাকে আর ছাত্রশিবির সেখানে মেধাবীদের প্রতিনিধিত্ব করে। তাই নিজেরা যেহেতু মেধাবী ছাত্রদের নেতৃত্ব দিতে পারে না সেহেতু অন্যরা নেতৃত্বে থাকুক অথবা তাদের নেৃতত্বে হল-ছাত্রাবাস পরিচালিত হোক এটা তারা কোনোভাবে সহ্য করতে পারে না। এছাড়াও ছাত্রলীগের অধিকাংশ নেতার ছাত্রত্ব শেষ হয়েছে অথবা বারবার ফেইলের রেকর্ড করেছে। তাই হল-ছাত্রাবাসে আগুন, ভাঙচুর, ক্ষতিসাধন ও আতঙ্ক ছড়িয়ে দিতে পারলেই তাদের লাভ। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগ আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে। কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছে। কতদিন তারা হল দখল করে রাখবে? কারণ ছাত্রলীগের বিভিন্ন গ্র“প-উপগ্র“প থাকার কারণে প্রতিনিয়ত আন্তঃকোন্দল লেগেই থাকে। সারা দেশের দলীয় আন্তঃকোন্দলে অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে, নিহত হয়েছে দলীয় নেতাকর্মী। এ থেকে বুঝতে বাকি থাকে না, হল জ্বালাও পোড়াও রাজনীতির মূলে তারা ছাত্রদের নেতৃত্ব দেয়ার উপযুক্ততা হারিয়েছে ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
বর্তমানে ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডের কারণে স্বয়ং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও চরম শঙ্কায় আছেন। আগামী জাতীয় নির্বাচনে মহাজোট সরকারের নানামুখী ব্যর্থতাসহ ছাত্রলীগের অপকর্মগুলো দলের ভরাডুবির ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখবে বলে তারা মনে করেন। এরপরও কি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব অপকর্মের মূল হোতা ছাত্রনামের কলঙ্ক, অপরাধী অছাত্রদেরকে সোনার ছেলে বলবেন? শেখ হাসিনা বিভিন্ন সভা-সমিতিতে আওয়ামী লীগের এবং নিজের সুকীর্তির বয়ান করেন। এ সকল কু-কীর্তির হোতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বেহাল অবস্থার উত্তরণ না করলে আগামীতে জাতির সামনে কিছু বলার অবস্থা কি শেখ হাসিনার থাকবে? দল বাঁচাতে হলে এসব অপকর্মের বিরুদ্ধে তাদেরকে পদক্ষেপ নিতেই হবে।
ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীদের হাতে ৯১ বছরের ঐতিহ্য ছারখার। ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সিলেট এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে আগুন দিয়ে শুধু সিলেটবাসীর নয় দেশপ্রেমিক সকল মানুষের বিবেককে আহত করেছে, যেটা ছিল মেধা মননের পাঠশালা। এই প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করে ছাত্রাবাসে দিনাতিপাত করেছেন বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদের মতো অনেকেই। যাদের যশ-খ্যাতি দেশ-বিদেশে। মিডিয়া সূত্রে জানা যায়, শিক্ষানুরাগী রাজা গিরিশচন্দ্র রায়ের পিতামহ মুরুরী চাঁদের নামে ১৮৯২ সালে প্রতিষ্ঠা লাভ করে সিলেট এমসি কলেজ। ১৯২১ সালে কলেজের পাশে বড় একটি অংশ জুড়ে নির্মিত হয় ছাত্রাবাস। প্রাচীনতম স্থাপত্যশৈলী ‘সেমি পাকা আসাম টাইপ’ ছাত্রাবাসগুলো ছিল দর্শনীয়। সম্ভবত এ কারণেই বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী বলেছিলেন কিছুদিন আগেও ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ স্থাপনা হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য তিনি কর্তৃপক্ষের সাথে আলাপ করেছেন। ১৯৩৬ বাংলা বর্ষে ২১ কার্তিক বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই ছাত্রাবাসে দীর্ঘক্ষণ সময় কাটিয়েছিলেন। এই ছাত্রাবাসটি এদেশের সকল মানুষের মণিকোঠায় স্থান করে নিয়েছে। এহেন ধ্বংসাত্মক কাজের সাথে ছাত্র বা ব্যক্তিদেরকে চিহ্নিত করার জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী নিজেই এমসি কলেজ ছাত্রাবাসের ধ্বংসাবশেষ পরিদর্শন করতে এসে স্মৃতিবিজড়িত কক্ষকে ভস্মীভূত দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন। নিশ্চয়ই ৪২টি কক্ষে যারা থাকতো তারা অজোপাড়া গ্রাম থেকে এসে মেধার ভিত্তিতে আসন নিশ্চিত করে সুন্দর আগামী গড়ার প্রত্যয়ে বিভোর ছিল। তাদের সর্বশেষ সম্বলটুকু নিঃশেষ হয়েছে জ্বলে পুড়ে। তিনি কি সেই মেধাবী ছাত্রবন্ধুদের কান্না দেখেছেন? সকল মিডিয়াতে এসেছে এ আগুন প্রকাশ্যে কারা জ্বালালো? সকল ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারী এক বাক্যে বলেছেন, আমরা ছত্রলীগকে আগুন জ্বালাতে দেখেছি। প্রশাসনের তদন্ত কমিটির কাছে সাক্ষ্য দানকারী সূত্র ও পত্রিকার মারফত জানা গেছে, ঘটনার সাথে জড়িতরা সবাই ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সর্বমহলে তোলপাড় সৃষ্টি হলেও প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করতে প্রশাসনকে শিবির নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার করতে দেখা গেছে। এ পর্যন্ত শিবিরের ২১ জন নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অথচ এই ঘটনার সাথে যারা জড়িত তারা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সিলেটের সর্বসাধারণের মনে যে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে তার প্রমাণ প্রতিদিন সিলেটসহ সারা দেশে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ, মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে তাণ্ডবকারীদের গ্রেফতার ও উপযুক্ত শাস্তি দাবি করেছেন সচেতন দেশবাসী। তবে শিক্ষামন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী দোষীদের গ্রেফতারের নির্দেশ দিলেও কার্যকরী ভূমিকা প্রশাসন নিচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। সাধারণ সকল বিবেকবান মানুষের আশঙ্কা এ তদন্ত কমিটির তদন্ত কাজ দলীয় প্রভাবে নিঃশেষ হয়ে যাবে নাতো? সত্যিকার দোষীদের বিচার হবে তো? ছবি, ভিডিও ফুটেজের মাধ্যমে সারা দেশ দেখেছে ছাত্রলীগের জেলা সভাপতি ও কলেজ সভাপতির নেতৃত্বে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত অবস্থায় তাণ্ডবলীলাতে অংশগ্রহণ করে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি বিভিন্ন পত্রিকার সাথে কথা বলতে গিয়ে বলেন, ছাত্রশিবির অনেকদিন ধরে ছাত্রাবাস দখল করে আছে। তাই তাদের বিতাড়িত করার জন্য আমরা এই প্রতিরোধ গড়ে তুলি।
আওয়ামী সরকার গায়ের জোরে সাধু সাজার চেষ্টা করছে। অথচ সারা দেশে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের বিভিন্নমুখী অপকর্মের তাণ্ডবলীলায় দেশের মানুষ অতিষ্ঠ। মানুষের বাকস্বাধীনতা কেড়ে নেয়া হয়েছে। মানুষ প্রতিবাদ জানাতে পারছে না। অঘোষিতভাবে চলছে বাকশাল। সরকার তার অপকর্মের খতিয়ান দেখে নিজেদের অবস্থান পর্যালোচনা করুক। জনগণের সাথে কৃত প্রতিশ্র“তি পূরণ করুক। এ পথে ফিরে আসতে না পারলে সময়ের ব্যবধানে আওয়ামী লীগের ধ্বংস অনিবার্য।
লেখক : সেক্রেটারি জেনারেল
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

 

SHARE

Leave a Reply