প্রাণের মালেক, গানের মল্লিক চলে গেছে ওপারে, সুন্দর জীবনে -আহসান হাবিব ইমরোজ

“উহ, কী ভীষণ যুদ্ধ? তারায় তারায় যুদ্ধ। আকাশের বুক কেঁপে উঠছে। …হঠাৎ আকাশ থেকে একটা তারা খসে পড়লো, তার কোলে। চমকে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল শহীদ আবদুল মালেকের আম্মার।”
শহীদ আবদুল মালেক গর্ভে থাকা অবস্থায় দেখা অদ্ভুত এ স্বপ্নের তাৎপর্য তখন বুঝতে পারেননি তাঁর মহীয়সী মা। তবে এটিই ছিল সমাগত সন্তানের ব্যাপারে মায়ের মনে প্রথম ব্যাপকতর উপলব্ধি।
মাত্র ২২ বৎসরের সংক্ষিপ্ত জীবনে প্রোজ্জ্বল তারকার মতোই অকালে খসে পড়েছিলেন শহীদ আবদুল মালেক।

কে এই আবদুল মালেক?
ব্রিটিশ বেনিয়াদের গোলামির জিঞ্জির মুক্ত হওয়ার উষালগ্নে ১৯৪৭ সালের মে মাসে তার জন্ম। বগুড়া জেলার ধুনট থানার খোকসাবাড়ী নামক সবুজ-শ্যামল এক গ্রামে।
পাঁচ ভাই ও ছোট এক বোন নিয়ে ছিলো তাদের পরিবার। শহীদ আবদুল মালেক ছিলেন ভাইদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ, আর বোনটি সবার ছোট। আব্বা মুন্সী মোহাম্মদ আলীর আর্থিক অবস্থা সচ্ছল ছিলো না। শহীদের আম্মা ছাবিরুননেসা একজন ধর্মপরায়ণ মহিলা ছিলেন।
আবদুল মালেকের জন্মের পূর্বে পরপর দুটি ভাইয়ের মৃত্যু এই পরিবারকে কাঁদিয়ে ছিলো। তাই পরিবারের সকলের কাছে তিনি ছিলেন কলিজার টুকরা, চোখের মণি।

মেধাবী ও সংগ্রামীর সত্তার বিকাশ
শহীদ আবদুল মালেকের গ্রাম থেকে প্রায় চার মাইল দূরে গোসাইবাড়ী হাইস্কুল। রাস্তা ছিল খুবই খারাপ। স্কুলের এই দীর্ঘ পথ তাকে হেঁটে যেতে হতো; এমনকি বর্ষার দিনেও। নিতান্তই শিশু এই ছেলের পক্ষে যা সত্যিই ছিল কষ্টদায়ক। কিন্তু অনেক বড় হওয়ার প্রত্যয় ছিল তাঁর। তাই কোনো কষ্টেই তিনি ক্ষান্ত হননি।
এরপর তাঁর জীবন কাটে জায়গিরে, হোস্টেলে এবং বাড়ির বাইরে বগুড়া, রাজশাহী এবং সবশেষে ঢাকায়।
এ দিকে সব ক্লাসের পরীক্ষায় তিনি প্রথম হতে লাগলেন। তা ছাড়া তাঁর চরিত্রের দৃঢ়তা, সত্যবাদিতা, বিনয় সবকিছু স্কুলের ছাত্র-শিক্ষকদের দৃষ্টি আর্কষণ করলো।
সেই ছেলেবেলা থেকেই তাঁর মাঝে দেখা যায় বইপড়ার প্রবল ঝোঁক। বই পড়তে পড়তে ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়তেন। মা আলতো আদরে সে বইগুলো গুছিয়ে রাখতেন।
বড় ভাইদের বইপত্র, লজিংমাস্টার মহিউদ্দিন সাহেবের কাছ থেকে নেয়া বই, পত্র-পত্রিকা এবং স্কুল লাইব্রেরি থেকে বই পড়ে তিনি তার জ্ঞানের পরিধিকে আস্তে আস্তে সমৃদ্ধ করছিলেন।
শুধু তত্ত্বে বেঁধে রাখা নয় বরং বাস্তবে আধুনিক জাহেলিয়াতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নিজেকে প্রতিনিয়ত তিনি শান দিতেন।
তাঁর শাহাদতের পর প্রতিবেশী এক আবাসিক ছাত্র আকরামকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল শহীদ মালেকের ফজলুল হক হলের ১১২ নং রুমে, তার সংগৃহীত বইয়ের তালিকা করতে।
সেই ছাত্র পরবর্তীতে প্রফেসর ড. মীর আকরামুজ্জামান আমাকে এক আলাপচারিতায় বলেছিলেন, তিনি সে রুমে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার বই ও ম্যাগাজিন পেয়েছিলেন।
ভাবা যায়, জ্ঞানের লড়াইয়ে তিনি কেমন শ্রেষ্ঠ সেনাপতি ছিলেন…?
১৯৬০ সালে তিনি জুনিয়র স্কলারশিপ পান। ১৯৬১ সালে তিনি বগুড়া জেলা স্কুলে নবম শ্রেণীতে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন।
মাত্র ১৪ বছরের এক কিশোর। সবুজ শ্যামল গাঁয়ের মায়া কাটিয়ে, আব্বা-আম্মা, ভাই-বোনদের আদরের মায়াজাল ছিঁড়ে একা শহরের বুকে দিন কাটায়। কী দুরন্ত আশা তার ছোট্ট বুকে। ভাবতেই অবাক লাগে।
বগুড়ায় এসে আব্বার কাছে চিঠি লিখেন-
‘বাড়ির কথা ভাবি না, আমার শুধু এক উদ্দেশ্য, খোদা যেন আমার উদ্দেশ্য সফল করেন। কঠিন প্রতিজ্ঞা নিয়ে এসেছি এবং কঠোর সংগ্রামে অবতীর্ণ, দোয়া করবেন খোদা যেন সহায় হন। আমি ধন-সম্পদ কিছুই চাই না, শুধুমাত্র যেন প্রকৃত মানুষরূপে জগতের বুকে বেঁচে থাকতে পারি।’
২০.১২.৬১ তারিখে ছোট্ট পোস্টকার্ডে লেখা নবম শ্রেণীপড়–য়া এক কিশোরের কয়েকটি মাত্র বাক্য কিন্তু ছত্রে ছত্রে যেন নুরের তাজাল্লি। ঠিক কতটা এর ব্যাপ্তি ও দীপ্তি পরবর্তী জীবনে তিনি নিজ জীবন কুরবান করেই সেই শপথের স্বাক্ষর রাখেন।
আমি আজো হাজারো তরুণ বিপ্লবীর ভিড়ে আর তাদের হৃদয় কন্দরে খুঁজে ফিরি সেই মালেকের শ্লোগান ‘ধন-সম্পদ কিছু চাই না… শুধু প্রকৃত মানুষ হতে চাই’।
বাংলাদেশের ইসলামী শিক্ষা আন্দোলনের পথিকৃৎ শহীদ আবদুল মালেক আশাবাদী এক সৈনিক। প্রায়ই তাঁকে বলতে শোনা যায়- “বিপ্লবের নতুন সূর্য উদিত হবেই, অবশ্যই সেটা হবে।”
আমরা মালেককে সশরীরে দেখিনি, কিন্তু মল্লিকের গানে গানে তাকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করেছি। যেমন তিনি গেয়েছেন, মালেক ভাইয়ের শাহাদাতে রক্তে রাঙা পথে…
শহীদ আবদুল মালেককে নিয়ে কবি মতিউর রহমান মল্লিক আরো লিখেন-
মালেক মালেক শহীদ মালেক
আমাদের সেনাপতি
ঘন দুর্যোগে শত দুর্ভোগে
নির্ভীক এক
চির অবিকল
ভাস্বর সভাপতি।

কে এই মল্লিক?
মালেকের জন্মের তিন থেকে ছয় বছর পরেই ধুনট, বগুরা থেকে প্রায় সোয়া তিনশত কিলোমিটার দূরে বাগেরহাট সদরের ১৬৭টি গ্রামের ভিতর ছোট্ট একটি গ্রাম বারুইপাড়ায় তার জন্ম। পাঁচ ভাইবোনের ভিতর তিনিও সবার ছোট। সবার আদরের ধন।
সুন্দরবনের সীমাহীন সৌন্দর্য, রূপসার কল্লোলিত রূপের ঝঙ্কার আর ষাটগম্বুজের ঐতিহ্য আর ঐশী ভাব সবটাই যেন হামলে পড়েছিল তার মননের পরতে পরতে।
শহীদ মালেক আর শিল্পী মল্লিকের কি কখনও বাস্তবে সাক্ষাৎ হয়েছিল? আমাদের জানা নেই।
তবে মনে হয় তারা হেরার জ্যোতিমাখা দ্বিধাহীন রাজপথ ধরে দৃপ্ত কদমে যেন একসাথে হেঁটেছেন।
বরং বলা যায় প্রাণের মালেক, জ্ঞানের মালেকের রক্তপিচ্ছিল রাজপথ ধরে গানের মশাল নিয়ে সাহসী সিপাহসালারের মতোই রাস্তা দেখিয়েছেন গানের মল্লিক।
তিনি রচনা করেছেন প্রায় ২ হাজার গান। ছড়া, কবিতা, প্রবন্ধ ও উপন্যাস নিয়ে প্রায় ৭টি বই। যেসব নানা ভাষায় অনূদিত।
কিন্তু কান পাতলেই শোনা যায় সেই সব গানের পরতে পরতে মালেকের পদধ্বনি। মালেকের জ্ঞান-সুষমার বর্ণিল বৈভব। তারই চরিত্রের সীমাহীন সৌরভ।
আমাদের গানের মল্লিক এই ধূসর পৃথিবী থেকে ১০ বছর আগেই বিদায় নিয়েছেন।
কিন্তু তাতে কী, এই পৃথিবীতে ১০ হাজার প্রজাতির পাখি আছে যাদের গানে সকাল সাঁঝে আমরা মল্লিককে খুঁজে পাই।
শহীদ মালেক বিদায় নিয়েছেন ৫১ বছর আগে।
কিন্তু আমরা আজো এই পৃথিবী নামক ৫১বর্তী পরিবারে ৪ লক্ষ প্রজাতির ফুলের সুষমা ও সৌরভে মালেকের প্রবল উপস্থিতি লক্ষ করি।
যেন তারা নিকষ কালিমা ভরা আকাশে ধ্রুবজ্যোতি তারা হয়ে জ্বলছে।
আর তাদের মেধা, মনন আর অনুপম চরিত্রের বিপুল চুম্বকীয় শক্তি দিয়ে আমাদের টানছে আর বলছে;
শতাব্দী আজ ডাকছে তোমায় আগামী দিনের হে দীপ্ত সেনা॥
এই মহাজাগতিক দুর্নিবার আকর্ষণে আমরা কি সাড়া না দিয়ে পারি?
হেরার রাজতোরণের পথ থেকে আমরা কি ছিটকে যেতে পারি?
তাদের জ্ঞান আর গানের মোহনীয় আহবান আমরা কি প্রত্যাখ্যান করতে পারি?
লেখক : শিক্ষাবিদ ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply