প্রেম ও শাসন – আবুল খায়ের নাঈমুদ্দীন

প্রেম আল্লাহর এক ঐশ্বরিক দান। স্বর্গীয় সৌন্দর্যের নমুনা। এই প্রেমই জগৎকে সুশোভিত শোভামণ্ডিত ও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। বলা চলে প্রেমের কারণেই জগৎ টিকে আছে। না হয় প্রেমহীন এ জগৎ হতো কলুষিত, নর্দমাময় বিষাক্ত এক ঘৃণিত জগৎ। জগতে মহান সৃষ্টিকর্তার প্রেম যেমন সৃষ্টির প্রতি আবশ্যক, তেমনি সৃষ্টির পরস্পরের প্রতি পরস্পরের প্রেমও আবশ্যক। সমাজ বিনির্মাণে প্রেমের বিকল্প নেই। পক্ষান্তরে শাসন এক ধরনের অধিকার বিস্তার, শাসনে প্রেমের সীমারেখা নির্ধারণ করে এবং আবদ্ধ রাখে। শাসন এক ধরনের শেকল যে প্রাণে প্রেম আছে তাকে শেকল দিয়ে আটক রাখার চেষ্টা। সেটি জোর করে ব্যক্তির ইচ্ছার বিরুদ্ধে হোক আর ইচ্ছার পক্ষে হোক, শাসনে শোভামণ্ডিত করে। শাসন মানে বাঁধ। ঘরের দেয়ালটাও একটা শাসন, এইটুকু নির্দিষ্ট স্থানে নিজের মতো করে থাকার সুযোগ, ঘরের মতো খোলামেলাভাবে একজন মানুষ কখনো বাইরে চলাফেরা করবে না এটাই শাসন। শাসন যখন কারো ইচ্ছা বা আগ্রহের বিরুদ্ধে যায় তখন তা কারো কারো জন্য হয়ে ওঠে অসহনীয় ও বিপজ্জনক। ফলে সংঘাত সৃষ্টি হয় এবং কখনো কখনো দুর্ঘটনাও ঘটে। আবার কখনো শাসনের ফলে প্রেম অপরূপ সৌন্দর্যের সাজেও সেজে ওঠে। প্রবাদে আছে ‘মুখে খাওয়া দিয়ে পিঠে কিল দিলেও খুশি।’
হযরত আদম (আ)কে আল্লাহ বেহেস্তে রেখেছেন আর সেখানেও শক্ত সীমারেখা টেনে দিয়ে বলেছেন, ‘লা তাকরাবা হাযিহিশ শাজারা’ এই গাছের কাছেও যাবে না। এখানে প্রেমের মর্যাদা রক্ষার্থে এই শাসন। হযরত হাযেরা (রা) যদি হযরত ইসমাইলের পায়ের আঘাতে সৃষ্টি হওয়া জমজমের সীমারেখার বাঁধ না দিতেন তাহলে সারা পৃথিবী সে দিনই প্লাবিত হয়ে যেতো। হযরত ইউসূফ (আ)কে শ্রেষ্ঠ সৌন্দর্য দিয়ে সৃষ্টি করে তাঁর প্রতি জোলেখার হৃদয়ে প্রেমের আগুন জ্বালিয়ে দিলেন কিন্তু ইউসুফ সীমারেখার শাসনের ফলেই সীমা লঙ্ঘন করেননি। ফলে সেই প্রেম আর শাসনের কাহিনী জগতে বিখ্যাত ও সর্বোচ্চ মর্যাদায় আলোচিত।
দুনিয়ায় সকলের হৃদয়েও প্রেম আছে। কারো মনে কম আর কারো মনে বেশি। কারো প্রেম মানুষের প্রতি, কারো প্রেম জগতের প্রতি, কারো প্রেম জগতের সৃষ্টির প্রতি, কারো প্রেম ঈশ্বর, ভগবান, বা আল্লাহর প্রতি। সবাই প্রেম পেতে আগ্রহী তাই যে যার মতো করে সাধনাও করে। যাদের মনে প্রেম আছে তাদের মনে কখনো লোভ, হিংসা, অন্যায়, প্রতারণা, হঠকারিতা, প্রতিশোধ বাসা বাঁধেনি। যাদের মনে প্রেমের ফুল ফোটেনি তাদের হৃদয় জড় অপদার্থের মতো স্থির। তাদের হৃদয় নদীর মতো চলমান নয়, নদীর স্রোতের মতো খলখলিয়ে স্রোত বহে না।
নদীর ধর্ম বাধা বিপত্তি ডিঙ্গিয়ে নদী সাগরের পানে ছুটবে। মানুষের মনও এমনই কখনো নদীর মতো চলছে আবার কখনো সাগরের মতো ঢেউয়ের পর ঢেউ জাগছে। মনের ঢেউ উথাল পাতাল করলে মানুষও শাসনের কথা ভুলে যায় এবং সীমালঙ্ঘন করে।
প্রেম মানুষের মনে ফুলের মতো ফোটে। ফুলের মতো কলি হয়, প্রষ্ফুটিত হয়, আবার ঝরে পড়ে। মানুষের জীবনও এমন ফুলের মতোই কিন্তু শাসন তার উল্টো। শুরু হয় সোনালি ভোরের মতো, তারপর সূর্যের মতো তেজ ছড়িয়ে আলোকিত করে ফুল ফসল ফলায়, জগতের সকলের উপকার করে আবার বিকেলে ধীরে ধীরে নুয়ে পড়ে। হযরত ইব্রাহীম (আ) একবার সূর্যকে খোদা মনে করেছিলেন ঠিক এভাবে জগতে কোন মানুষ যদি তার মেধা প্রতিভা ও সৌন্দর্য দিয়ে কিছু আবিষ্কার করে তেজ ছড়িয়ে দেয় বা শান্তির পথ দেখায় তখন মানুষের প্রেমেও মানুষ বিমোহিত হয় সেখানে শাসনের কথা মনে থাকে না।
প্রবাদ বাক্যে আছে ‘সোহাগ করে যে শাসন করে সে’ তার মানে সোহাগ আর প্রেমের সম্পর্ক আছেই। সোহাগ করে মন জয় করতে পারলেই শাসনে ফল হয়, শাসনে মানায়। আমাদের সমাজে শুধু শাসনের রূপ স্পষ্ট দেখা যায় সোহাগের রূপ ম্রিয়মাণ। এ জন্যই জাতি আজও অবহেলিত ও উন্নয়ন বঞ্চিত। সোহাগের অভাবে মনুষ্যজাতি আজ পশু জাতিতে রূপান্তরিত হতে চলেছে। মানুষগুলো শাসনে শাসনে বিরক্ত। আরে একটি শিশুকেও একটি চকোলেট হাতে দিয়ে কোনো পড়ার কথা বললে সে যত দ্রুত পড়াটা শিখে দেবে তা হয়তো শুধু কড়া শাসনে বললে কখনো হবে না।
আমাদের সমাজে এক শ্রেণীর লোক আছেন যারা তাদের অর্থ, ক্ষমতা ও বংশ গৌরবের পরিচয় দিয়ে সব কিছু নিজের মতো করে পেতে চান। এদেরকে মোতাহের হোসেন চৌধুরী অহঙ্কারী বলেছেন, তিনি ঠিকই বলেছেন। অহঙ্কারীরা দম্ভে বাঁচে না, কারো মন রক্ষার দিকে তাকায় না, সব কিছুকে নিজের মনে করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, মানুষ যে একজন আরেক জনের মন পায় না তাও জানে না। একজন মানুষ এক সাথে থাকে, খায়, শোয় ঠিকই তার মন অন্যখানে কোথাও ঝুলে আছে। সে বারান্দায় গিয়ে ফুলের বাগানে তাকিয়ে ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে পছন্দ করে কিন্তু পাশের নির্জীব প্রেমহীন ক্ষমতাবান শাসকের সাথে বাক্যালাপ করতেও একমত না।
আমাদের সমাজের যুবকেরা সেরা সুন্দরী মেধাবীকে জোর করে তুলে নিয়ে বা মেয়ের মা বাবাকে জিম্মি ঘরে তুলে আর মনে করে পেয়ে গেছে। কিন্তু সেই মেয়েটি হয়তো মহল্লার গরিব কালো, মেধাবী শ্রমিকটাকেই মন দিয়ে পছন্দ করে রেখেছে বহু আগে। তা কি পরিবার, স্বামী, বিচারক বা শাসকের কেউ কখনো মনের চোখ দিয়ে দেখেছে? না জানতে চেয়েছে?
আমি কখনো কারো সাথে একটু মিশলে তাদের মনের অবস্থা জানতে চেষ্টা করি। একবার এক প্রবাসীর স্ত্রীকে হাসি খুশি অবস্থায় দেখে খোলা মনে জিজ্ঞাসা করলাম আপনার সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি কে? তিনি বললেন- মা। হেসে ওঠে বললাম তারপর? বললো শাশুড়ি, বললাম সন্তান? খুব হকচকিত হয়ে উত্তর করলো তারতো কোনো নাম্বার নেই, সেতো সবার ঊর্ধ্বে। তারপর আরেকবার হেসে জিজ্ঞাসা করলাম স্বামী? এবার একটু গম্ভীর হয়ে বললো সে আরো পরে। তাহলে কী বুঝা গেল? মনের ভেতর বাস করে একজন আর শাসন করে আরেকজন। বর্তমান সমাজে মনের মানুষের সাথে নব্বই ভাগ মানুষের শাসনের মিল নেই। সবাই হত দরিদ্রের মতো বোকা সেজে জো হুকুম জাঁহাপনা হিসেবে বাধ্য হয়ে শাসন মেনে চলেছে। তাই সকলের উচিত যাকে ভালোবাসে তার পরিচর্যা করে নিজের করে নেয়া। তাহলে দেখা যাবে প্রেম শাসন দুটোই সমান গতিতে চলছে। আমি দেখেছি বড় সন্তান মাকে ভালোবাসে বলে বাজার থেকে বেদানা এনে লুকিয়ে মাকে দিলেন আর মা ছেলের সামনে একটু খেয়ে বাকি একটু ছোট মেয়ের জন্য রেখে দিলেন। এখানে প্রেমের রকম এমন হয়েছে যে, যে নিয়ে এসেছে তাকে না খাইয়ে নিজের সামান্যটুকু থেকে আরো সামান্য অংশ প্রিয়জনের জন্য লুকিয়ে রাখা। বাধা বিচার এখানে তুচ্ছ। আরেকটি ঘটনা এমন ছিলো, এক ছেলে এক মেয়েকে পারিবারিকভাবে কাছে পাওয়ার জন্য তার মা-বাবাসহ সবার জন্য বহু টাকার কেনাকাটা করে দিয়েছে। আর অপেক্ষা করছে তাকে মেয়ের মা বা বাবা ইনভাইট করবে, পরে জানা গেলো- মেয়েটি বাসায় গিয়ে এর নাম না বলে অন্য প্রিয় ছেলেটির নাম বলে ওকে মা-বাবার সাথে মিট করে তার প্রেমকে সফল করার আরেক ধাপ এগিয়ে নিলো। এখানে মনের আগ্রহের জোয়ারে শাসন নিখোঁজ। যেখানে প্রেম আছে সেখানে শাসন সুন্দরভাবে প্রস্ফুটিত হয়। এ ক্ষেত্রে সংসার ছেড়ে পছন্দের লোকের সাথে যেতে দেখা গেছে আঠারো শতকের সেই আলোচিত ‘গৃহদাহ’ গ্রন্থেও।
প্রেমে মানুষ অন্ধ হয়ে যায়। সেই সুবাদে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষরাও নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন হাজারো সমালোচনার মুখেও। অস্ট্রেলিয়ান বিলিয়নিয়ার রিচার্ড লাগনার প্রতি সন্ধ্যায় একজন সেলিব্রেটির সঙ্গে একটু নাস্তা আর নাচ দেখার জন্য আয়োজন করেন। হলিউডের তুমুল জনপ্রিয় সুন্দরী মডেল ও অভিনেত্রী কিম কার্দেশিয়ানের সঙ্গে এক সন্ধ্যা কাটাতে কার্দেশিয়ানের শর্তানুসারে ৪০ কোটি টাকায় শুধু সম্মত হননি, ঢেলে দিতেও কার্পণ্য করেননি। ভারতের ধনকুবের লক্ষ্মী মিত্তাল তার মেয়ের বিয়েতে ৫০০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় করেছেন। আর আমাদের দেশেও ঘুরতে গিয়ে প্রেমিকাকে মুক্তার মালা, হীরার আংটি দেয়ার কাহিনীও কম নয়।
ভালোবাসার কাছে পরাস্ত হয়ে ইংল্যান্ডের রাজা অষ্টম এডওয়ার্ড মাত্র ৩২৫ দিন রাজত্ব করার পর ১৯৩৬ সালে এক মার্কিন নারী সিম্পসনকে ভালোবেসে বিয়ে করতে সিংহাসন ত্যাগ করেন। শাসন দমাতে পারেনি প্রেমের আগ্রহ। প্রেমের টানে সিংহাসন ছেড়েছিলেন রাজা অষ্টম এডওয়ার্ড সেলিম- আনারকলি: রাজপুত্রের প্রেমগাথা জনমানুষের মনে দাগ কেটে গেছে। তেমনই এক প্রেমিক মুঘল সম্রাট আকবরের ছেলে শাহজাদা সেলিম। সে প্রেমে পড়ল এক নর্তকীর। সুন্দরী আনারকলির এই প্রেম মেনে নিতে পারেননি সম্রাট আকবর। শাহজাদা সেলিমও আনারকলিকে পেতে বাবার বিরুদ্ধেই যুদ্ধ ঘোষণা করে বসেন। কিন্তু সেলিম খুব সহজেই পরাজিত হয়। নিজের ছেলেকে বন্দী করেই ক্ষান্ত হননি তিনি, নিজ সন্তানের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেন আকবর। এখানেও প্রেমের কাছে নিষ্ঠুর শাসন পরাজিত।
যার মনে প্রেম আছে সে যা অর্জন করে তা ব্যয়ও করে। সে বৃক্ষের মতো ছায়া দেয় মায়া দেয়। নিষ্ঠুর মানুষগুলো সেই বৃক্ষের ডাল পালা কেটে নেয়, বৃক্ষ নীরবে কান্না করে তবু সে শান্তির জন্য স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। কঠোর শাসকের মতো নিষ্ঠুর হয় না। তাই যুগ যুগ ধরে মানুষ প্রেমময় মানুষকে আর প্রেমময় বৃক্ষকে নিজের কথা শোনায়। কারণ প্রেমের প্রথম লক্ষণ শ্রেষ্ঠ শ্রোতা হওয়া। প্রেমময় মানুষ হাজারো কষ্টের পরও অন্যের কষ্টের কথা শোনে ও ছায়া বিতরণ করে। প্রকৃত শান্তি বিতরণের জন্যই তারা শাসন করে। তাই শুধু শাসন নয় প্রেমই জগতের মহা মূল্যবান সম্পদ। যে মনে উভয়টার সমান অবস্থান সে মনই জগতের জন্য প্রয়োজনীয়।
লেখক : সাবেক অধ্যাপক, গ্রন্থকার ও কলাম লেখক

SHARE

Leave a Reply