প্রেরণার মিনারে শহীদি মিছিল -ড. অ্যাডভোকেট মো: হেলাল উদ্দিন

শহীদ শব্দের একটি অর্থ “সত্যের সাক্ষ্য দান করা”, কোরআনের ভাষায়- “অকাজালিকা জায়ালনাকুম উম্মাতান ওসাতান লিতাকুনু সুহাদায়া আলান্নাস ওয়া ইয়া কুনুর রাসূলু আলাইকুম শাহিদা।” (সূরা বাকারা-১৪৩) অর্থ- তোমাদেরকে মধ্যমপন্থী জাতি হিসেবে সৃষ্টি করা হয়েছে যাতে করে তোমরা সমগ্র মানবজাতির জন্য সাক্ষী হতে পার এবং রাসূল হতে পারে তোমাদের জন্য সাক্ষী। আল্লাহর পথে যারা শহীদ হয়ে গেলেন, তারা তো জীবনের সর্বোচ্চ সাফল্য অর্জন করার সৌভাগ্য লাভ করলেন। বিচারের নামে তাঁদের প্রতি সুবিচার করতে যারা ব্যর্থ হলো তাদের বিচার আল্লাহর হাতে, যিনি কখনো ব্যর্থ হন না। আখিরাতে তো তিনি বিচার করবেনই, দুনিয়াতেও আংশিক বিচার করতে পারেন।
ইসলামী আন্দোলনের সাথে আমরা যারা জড়িত তাদের নিকট এ শহীদগণ প্রেরণার উৎস। আমরাও আন্তরিকভাবে শাহাদাতের মর্যাদা কামনা করি। কিন্তু দুশমনের হাতে নিহত হয়ে শহীদ হওয়ার এখতিয়ার কারো হাতে নেই। একমাত্র আল্লাহ তায়ালাই এ বিষয়ে ফয়সালার মালিক। বর্তমান স্বৈরাচারী সরকার বিদেশী শক্তির মদদে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী (রহ), সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ (রহ), সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলদ্বয় মুহাম্মদ কামারুজ্জামান (রহ) ও আব্দুল কাদের মোল্লা (রহ) এবং কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের অন্যতম সদস্য মীর কাসেম আলী ভাইয়ের বিচারের নামে জুডিশিয়াল কিলিংয়ের আশ্রয় নিয়েছে। স্বচ্ছ সাক্ষ্যপ্রমাণের মাধ্যমে বিচার করলে জামায়াত নেতৃবৃন্দের মৃত্যুদন্ডতো দূরের কথা একদিনের সাজাও হতো না। কেন সরকার এই নির্মমতার আশ্রয় নিলো? বিবেকের-দরজা পূর্ণ উন্মুক্ত করে ন্যায়-নীতির পবিত্র মাপকাঠিতে যদি মূল্যায়ন করা হয় তাহলে এটা পরিষ্কার যে, জামায়াত নেতৃবৃন্দ স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় অর্থাৎ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় কি অপরাধ করেছেন? আর সে কারণে বর্তমান সরকার এই পৈশাচিক ঘটনা ঘটিয়েছে তা নয় বরং তারা নি¤েœাক্ত কারণে ভেবে-চিন্তে এই পৈশাচিক জুডিশিয়াল কিলিংয়ের জন্ম দিয়েছে।
১. ১৯৯৬ সালে আওয়ামী মহল ক্ষমতায় গিয়েছিলো, জামায়াত এককভাবে নির্বাচন করার কারণে। ২০০১ সালে তাদের ভরাডুবি হয়েছে বিএনপি-জামায়াত জোটের কারণে। এখানেই তাদের আপত্তি বা বিদ্বেষ। জামায়াত কেন বিএনপির সাথে জোট বাঁধল!
২. জোটে থাকা অবস্থায় জামায়াত ৩টি মন্ত্রণালয় (২ জনে) অত্যন্ত সফলতা ও সঠিকভাবে পরিচালনা করেছে। জামায়াত নেতৃত্ব অর্থাৎ তাদের ভাষায় মোল্লা-মৌলভীরা একটি আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনায় সফলতা দেখাবে কেন? এখানে তাদের মধ্যে হিংসার আগুন জ্বলে উঠেছে।
৩. জামায়াতের ২ জন মন্ত্রী শুধু মন্ত্রণালয় পরিচালনায় সফলতা অর্জন করেছে তা-ই নয়, সততার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, যা জনগণের মধ্যে ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করেছে। জনমতের এ ভাবমর্যাদা বৃদ্ধি ওদের সহ্য হয়নি।
৪. তারা ভালো করেই বুঝতে পেরেছে, জামায়াতের এ ভাবমর্যাদা বৃদ্ধি মানে ইসলামের ভাবমর্যাদা বৃদ্ধি। জনগণের কাছে তা দ্রুত গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে। অন্য দিকে তাদের গালভরা বুলি যে অন্তঃসারশূন্য, তাদের অতীত থেকে জনগণ তা উপলব্ধি করতে পেরেছে। একদিকে জামায়াতের ইমেজ বৃদ্ধি, অন্য দিকে তাদের অন্তঃসারশূন্যতা তাদের জন্য অসহনীয় হয়ে উঠেছিল।
৫. জোট আমলের ৫ বছর তারা বহু কলাকৌশল করে অর্থসম্পদ ব্যয় করে দুর্বল দুর্বল জায়গায় আঘাত করেও জোট ভাঙতে পারেনি। অবৈধভাবে ক্ষমতায় এসে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার করে, সারাদেশে চিরুনি অভিযান চালিয়ে নেতাকর্মীদের গ্রেফতার এবং নির্যাতনের মাধ্যমেও যখন বিএনপি-জামায়াতের জোট ভাঙতে বিফল হয় এবং আগামীতে ক্ষমতায় আসার পথ কণ্টকাকীর্ণ মনে করে তখনই তারা জামায়াত নেতৃবৃন্দকে নির্মমভাবে হত্যার ষড়যন্ত্র করে।

শহীদ মীর কাসেম আলী মিন্টু (রহ)-কে যেমন দেখেছি
শহীদ মীর কাসেম আলী মিন্টু ভাই একজন সাইয়্যেদা সুহাদা, তার সুন্দর আমলের জিন্দেগি তার ছাত্রজীবন থেকেই শুরু। আমাদের একজন ভাই মরহুম আমিনুল ইসলাম (কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য) বলেছেন, মিন্টুভাই যখন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন, তখন তার মেসে আমি একরাত ছিলাম, রাতের বেশির ভাগ সময় তিনি দাঁড়িয়ে সালাতের মাধ্যমে কাটিয়েছেন। এই অভ্যাসটা ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে কর্মব্যস্ত জীবনেও বজায় রেখেছিলেন। তাঁর নূরানী চেহারায় সাহাবিদের জীবনের ছাপ পাওয়া যায়। তিনি কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলতেন। আমি যতদিন তাঁর কথা শুনেছি, তিনি আল্লাহর ভয়ে অশ্রু বিসর্জন দিতেন তা দেখেছি, এটা একটা সাহাবিদের জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সেই মীর কাসেম আলী ভাইয়ের সাথে আমার ছাত্রজীবন থেকেই পরিচয়। শিবিরের প্রথম কেন্দ্রীয় সভাপতি, সেই হিসেবে তিনি আমার প্রেরণার উৎস ছিলেন। বিশেষ করে আমি তাঁকে আরো কাছে পাই, যখন আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি ছিলাম। শিবিরের কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদের অধিবেশনে এসে আমি দাওয়াত দিলাম যে, শহীদি ময়দানে আপনাকে দাওয়াত, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথী ভাইদেরকে নিয়ে একবেলা খাবার খাবেন। তিনি বললেন ‘ঠিক আছে, আমি রাজশাহী সফরে এলে তুমি আমাকে এই কথাটি মনে করিয়ে দিবা।’ তো যাই হোক তিনি রাজশাহীতে সফরে এলেন, আমি মিন্টুভাইকে মেসেজ করলাম, তিনি এলেন বিনোদপুরে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী আমাদের অফিসের পাশে ইসলামিয়া ডিগ্রি কলেজে সাথী সমাবেশ হলো। সাথী সমাবেশ শেষে সবাইকে নিয়ে তিনি ভুনাখিচুরি খেলেন। যাওয়ার সময় সমস্ত বিল পরিশোধ করে ছিলেন। এভাবে তার সাথে গভীরভাবে মেশার সুযোগ হয়, বিশেষ করে যখন আমার ছাত্রজীবন শেষ হলো, ২০০৪ এর জানুয়ারির ৮ অথবা ৯ তারিখ তিনি সিরাজগঞ্জ সফরে যাবেন, খাজা ইউনুস আলী মেডিক্যাল কলেজ ভিজিট করতে। আমি জানার পরে ভাইয়ের সাথে বিকেলে দেখা করলাম যে, ভাই আপনি আমার সিরাজগঞ্জে যাবেন অথচ আমি জানি না? আমি বললাম, আমি আপনার সাথে সফরে যাবো, তিনি বললেন, যদি জায়গা হয় তাহলে তোমাকে নেবো, না হলে তোমাকে নেবো না। আমি বললাম ভাই জায়গা হোক আর না হোক আমি ছাদে উঠে যাবো। আপনার চৎধফড় গাড়ির ছাদে। তিনি বললেন, ঙশ হড় ঢ়ৎড়নষবস, ঠিক আছে। সফরে সারাদিন কর্মক্লান্ত, সকাল সাড়ে ৬টা থেকে শুরু করে রাত ১০টা পর্যন্ত সফর করার পরে আমি বললাম, আপনার সাথে একান্ত কথা আছে, তিনি বললেন ঠিক আছে তুমি আমার পাশে বস। সেই বেলকুচি থেকে শুরু করে যমুনা সেতু পর্যন্ত প্রায় ৩ ঘণ্টা তার পাশে বসা, তিনি বললেন “বল তুমি তোমার ছাত্রজীবনের ইসলামী ছাত্রশিবিরের স্মরণীয় ঘটনা।’ তাকে আগে বড় মাপের মানুষ জানতাম, কিন্তু এতো শিশুর মত নরম মানুষ আগে জানতাম না। ঐ দিন তিনি আমার কাছ থেকে শুনলেন, শুনার পর আদর করলেন, পিঠে হাত রাখলেন, মাথায় হাত রাখলেন। আমি বললাম, ভাই আমার তো ছাত্রজীবন শেষ হয়েছে, এখন আমি কী করতে পারি, তিনি বললেন, ‘তুমি একটা সিভি নিয়ে এসে সাইফুল আলম খান মিলনের কাছে দিয়ে বলবা আমার কথা।’ তো যাই হোক সর্বশেষ আমি তার প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত ছিলাম এবং উনি আমাকে লিগ্যাল অ্যাডভাইজার হিসাবে ইবনে সিনা ট্রাস্টে নিয়োগ দিয়ে ছিলেন। আমি সর্বশেষ পর্যন্ত তার সাথে লিগ্যালি কাজ করার চেষ্টা করেছি, তার সাথে দেখা করেছি, তার নির্দেশ পালন করার চেষ্টা করেছি এবং তিনি প্রেরণা দিয়ে গেছেন যে শহীদেরা মরে না, শহীদেরা জীবিত এবং এই জমিনে শহীদের বিজয় হবে ইনশাআল্লাহ। মীর কাসেম আলী ভাইয়ের শাহাদাতের পর তাঁর দাফন অনুষ্ঠান হয় নিজ গ্রামে। ঢাকা মহানগরীর জামায়াতে পক্ষ থেকে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রতিবন্ধকতা থাকার পরও হাজার হাজার মানুষ গায়েবানা জানাজায় অংশগ্রহণ করে সেই গায়েবানা জানাজায় আমার অংশগ্রহণের সৌভাগ্য হয়েছিলো। ফেরার পথে ১০-১২ জন ভাই গ্রেফতারও হয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যেন শহীদ মীর কাসেম আলী ভাইকে সাইয়্যেদা সুহাদা হিসেবে কবুল করেন, আমিন।

শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লা (রহ)
শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লা, আমার একজন শিক্ষক ছিলেন। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ১০ দিনব্যাপী শিক্ষা শিবিরের একজন ডেলিগেট হিসেবে ১৯৯৭ সালে অংশগ্রহণ করি। সেখানে ২ ঘণ্টার ক্লাস নেন শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লা, শহীদ কামারুজ্জামান, শহীদ আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, শহীদ মীর কাসেম আলী মিন্টু ভাই। পাঁচজনই আমার শিক্ষক, একাধিক সেশনে ওনারা আমার ক্লাস নিয়েছেন। সেই হিসেবে ব্যক্তিগতভাবে ওনাদের সাথে মেশার সুযোগ হয়েছে, ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে জানারও সুযোগ হয়েছে এবং বিশেষ করে শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লা ভাইয়ের সাথে আমার অনেক স্মৃতি জড়িত। আমি যখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সদস্য, একবার তিনি রাজশাহীতে সফরে গেলেন, সেখানে তার কাছে অনেক প্রশ্ন করেছি এবং জানার চেষ্টা করেছি, আগে থেকেই জানতাম যে আব্দুল কাদের মোল্লা ভাই বাংলাদেশের একজন বুদ্ধিজীবী, বিশেষ করে শিক্ষা বিষয়ে তিনি অনেক জ্ঞান রাখেন এবং সরকারকে অনেক পরামর্শ দিয়েছেন, বিভিন্ন সেমিনার, সিম্পোজিয়ামের মাধ্যমে, লেখালেখির মাধ্যমে। সেটা আমার জীবনে আরও বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। আমি যখন ২০০২ সালে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় দাওয়াতি কার্যক্রম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বে ছিলাম, তখন আমার ওপর দায়িত্ব এলো শিবিরের ২৫ বছরের পূর্তি উপলক্ষে একটি স্মারক বের করতে হবে, সেই স্মারকে শিক্ষাবিষয়ক একটি লেখা থাকবে। লেখাটি হবে শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লা ভাইয়ের। এর পরেই আমি তাঁর সাথে যোগাযোগ করলাম, যে ভাই বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে ‘প্রেরণার মিছিল’ নামে একটি স্মারক বের হতে যাচ্ছে সেই স্মারকে আপনার একটি লেখা দিতে হবে। তিনি সাদরে গ্রহণ করলেন, কিন্তু এতই ব্যস্ত মানুষ, নানা কাজে ব্যস্ত থাকেন, মূল সংগঠনের দায়িত্ব পালন করেন এর পরে বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তিনি এতই ব্যস্ত থাকেন যে তার পক্ষে যথাসময়ে লেখা দেয়া দুষ্কর হয়ে পড়ল। আমি এ লেখার জন্য বলা যায় যে কয়েক শ’ বার যোগাযোগ করেছি। আমি অস্থির হয়ে গেলাম, আমার সময় চলে যাচ্ছে অথচ লেখা পাচ্ছি না। তার সাথে যখন কথা বলি, তিনি বিনয়ের সাথে বলেন যে, ‘হেলাল আমি লেখা শেষ করতে পারছি না, এই দিয়ে দেবো।’ একপর্যায়ে আমাদের স্মারক বের করার সময়সীমা শেষ হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু মোল্লা ভাইয়ের লেখা পাচ্ছি না, কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইলাম বুলবুল ভাই এবং সেক্রেটারি জেনারেল মজিবুর রহমান মঞ্জু ভাই বারবার তাগাদা দিচ্ছেন কিন্তু আমি লেখা উদ্ধার করতে পারছি না এই যন্ত্রণায় আমি কোন স্বস্তি পাচ্ছিলাম না। একটা পর্যায়ে আমি মহানগরী পূর্বের সভাপতির কাছে লেখাটি উদ্ধারের জন্য সহযোগিতা চাইলাম। তখন তিনি বললেন যে, মোল্লা ভাইয়ের ছেলে জামিল শিবিরের মহানগরী পূর্বের সাথী। আমি তাকে তখন বললাম ‘জামিল এটা তোমার সাংগঠনিক দায়িত্ব যে তোমার আব্বুকে সকাল বিকেল স্মরণ করিয়ে দেয়ার মাধ্যমে আমার লেখাটা উদ্ধার করিয়ে দেয়া।’ এ কথা বলার পর সে বললো যে ভাইয়া আমি আব্বুকে তাগাদা দেবো এবং লেখা উদ্ধারের চেষ্টা করবো। একপর্যায়ে মোল্লা ভাই রসিকতা করে বললেন, ‘যে হেলাল তুমি আমার বাসার ভেতরে একটা গন্ডগোল সৃষ্টি করে দিলে, আমার ছেলে সকালে-বিকেলে, আমার নাশতা খাওয়াসহ যেখানেই দেখা হয় তখনি বলে যে তুমি লেখা না দিলে হবে না।” শেষ পর্যন্ত আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহর শুকরিয়া এ লেখাটা দিতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং আমাদের স্মারকটা ধন্য হয়েছিল আব্দুল কাদের মোল্লা ভাইয়ের লেখনীর মাধ্যমে। মোল্লা ভাইয়ের সাথে আরও অনেক স্মৃতি জড়িত আছে, দশ দিনের টিসিতে তিনি একদিন বলছিলেন যে একটা মজার ব্যাপার, একটা ডিনারে সাবেক প্রেসিডেন্ট এরশাদ সাহেবের সাথে আমি পাশাপাশি খাদ্য গ্রহণের জন্য আসন গ্রহণ করেছি, এই টাইমে আমার ডায়াবেটিসের ইনসুলিন নেয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়। আমি তখন আমার ব্যাগ থেকে ইনসুলিনের বাক্স বের করছি এবং নিজে যখন পুশ করব, প্রেসিডেন্ট এরশাদ সাহেব একজন আর্মি পারসন, দেশের সেনাবাহীনীর প্রধান, তার ভেতরে যে সাহস থাকা দরকার, দেখলাম যে তার সাহসের বালাই নেই। আমার এ যন্ত্রপাতি দেখার পর তিনি লাফ দিয়ে আমার কাছ থেকে চলে গেলেন ভয়ে, যে সর্বনাশ মোল্লা সাহেব আবার কী বের করছে। মোল্লা ভাইয়ের সাথে আমার একটা মিল আছে যে, তিনিও ছাত্রজীবনে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হন, আমি বললাম যে ভাই আমিও ঠিক আপনার মতো এ একই বয়সে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, আমি খুবই দুশ্চিন্তায় আছি। তিনি আমাকে সাহস দিয়ে বললেন যে চিন্তা করো না এটা কোন ব্যাপার না, আমি আল্লাহর মেহেরবানিতে এত দিন প্রর্যন্ত আছি এ ডায়াবেটিস ম্যানটেইন করে, আমার দুইবার বাইপাস সার্জারি হয়েছে, আল্লাহ আমাকে এখনও সুস্থ রেখেছেন। সর্বশেষ তিনি শাহাদাতের অমিয় পেয়ালা পান করেছেন এবং আমাদের জন্য স্মৃতি রেখে গেছেন, অনেক প্রেরণা দিয়েছেন এবং তিনি আমাদেরকে জানিয়ে গেছেন, যে জালিমের কাছে মাথা নত নয় কালিমার পতাকা উড্ডীন করতে হলে প্রয়োজনে শাহাদাতের নজরানা পেশ করতে হবে। এই জন্য সর্বশেষ তিনি কালেমার পতাকার বিজয়ের জন্য চেষ্টা করে গিয়েছেন এবং শাহাদাতের অমিয় পেয়ালা পান করে অমর হয়ে রয়েছেন। মোল্লা ভাইয়ের শাহাদাতের পূর্ব মুহূর্তে রাত সাড়ে ৯টায় ঢাকার ফকিরাপুল মোড়ে ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ ভাইয়ের নেতৃত্বে একটি বিক্ষোভ মিছিল করা হয়। সেখানে পুলিশ মিছিলকে ছত্রভঙ্গ করার জন্য লাঠিচার্জ এবং গুলিবর্ষণ করে। পরদিন অর্থাৎ ১৩ ডিসেম্বর ২০১২ সাল শুক্রবার জুমার নামাজের পর মতিঝিলে হাজার হাজার ছাত্র-জনতার নেতৃত্বে বাঁধভাঙা প্রতিবাদ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত মিছিল দেখে ভীত বিহ্বল সরকার ছাত্র-জনতাকে রোখার জন্য পুলিশ লেলিয়ে দেয়। পুলিশ জনতাকে ছত্র ভঙ্গ করার জন্য লাঠিচার্জ, টিয়ার শেল ও গুলিবর্ষণের মাধ্যমে একটি ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করে। গুলিতে আহত হয়ে জনতা রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে। শত শত মানুষকে রাজপথ থেকে গ্রেফতার করা হয়। উক্ত মিছিলেও নেতৃত্ব দেন ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এবং আমারও তার সাথে থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল।

শহীদ মুহাম্মদ কামারুজ্জামান (রহ)
শহীদ মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ভাইকেও আমি দশ দিনের টিসিতে পেয়েছি। শিক্ষক হিসেবে তিনি আমাকে খুবই আদর করতেন এবং বলতেন বিশ্বব্যাপী ইসলামের বিজয় অর্জনের জন্য ওহঃবষবপঃঁধষ এর কোন বিকল্প নেই, এই জন্য তিনি সবসময় আমাদেরকে লেখাপড়ার প্রতি উৎসাহ-উদ্দীপনা জোগাতেন। ছাত্রসমাজের নেতৃত্ব দিতে হলে, যুবসমাজের নেতৃত্ব দিতে হলে অবশ্যই মনোযোগ সহকারে লেখাপড়া করতে হবে এবং গভীর জ্ঞান অর্জনের প্রয়োজন রয়েছে। একদিন আমি তার সোনার বাংলা অফিসে গিয়েছিলাম, সেখানে তিনি আমাকে বলেছেন যে সবসময় সাদা শার্ট এবং কালো প্যান্ট পরিধান করবা। এগুলো খুব রুচিশীল পোশাক, এই পোশাক পরলে খুব সুন্দর লাগে, সবসময় রুচিশীল পোশাক পরিধান করবা। আল্লাহর মেহেরবানি যে আমাকে সেই পেশাই নিতে হলো যে পেশায় বাধ্যতামূলক সাদা শার্ট-কালো প্যান্ট পরিধান করতে হয়, আইনজীবী হিসেবে এটা বাধ্যতামূলক। আমার শহীদ মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ভাইয়ের কথা বারবার মনে পড়ে যে, উনি আমাকে আইনজীবী হওয়ার আগেই বলেছিলেন যে, তোমাকে সাদা শার্ট কালো প্যান্ট পরিধান করলে খুব সুন্দর লাগবে, তুমি এটা ঢ়ৎধপঃরপব করবা। আমি তার কাছে বিভিন্ন সময়ে গিয়েছি, যখন ভালো লাগতো আমি ছুটে গিয়েছি কামারুজ্জামান ভাইয়ের কাছে। তিনি সব সময় উৎসাহ-উদ্দীপনা জোগাতেন এবং পড়ালেখার প্রতি বেশি উৎসাহ দিতেন খুব বেশি। বিভিন্ন ব্যস্ততার, কারণে পরবর্তীতে তার কাছে আমার যাওয়ার সুযোগ হয়নি। এরপর-তো প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হয়ে গেল। তিনি যখন সর্বশেষ পর্যায়ে এসে গেছেন অর্থাৎ ফাঁসির সেলে অবস্থান করতেন, তার পাশে থাকতেন ব্রিগে. জেনা. আ: রহিম এবং ব্রিগে. জেনা. রেজ্জাকুল হায়দার। তাদের একটা মামলা ছিল ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা। সেই মামলায় ষড়যন্ত্রমূলকভাবে আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ভাইকেও আসামি করা হয়েছিল। আমি তার আইনজীবী হিসেবে ঐ মামলায় যেতাম এবং সেখানে রেজ্জাকুল হায়দার ও আব্দুর রহিম সাহেবও একই মামলার আসামি থাকার কারণে তারাও কোর্টে আসতেন। তাদের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময় হতো, শহীদ মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ভাই সম্পর্কে খোঁজখবর নিতাম। কামারুজ্জামান ভাই যখন জানতে পারলেন যে, হেলাল কোর্টে আসে, একদিন তিনি আমাকে একটা চিঠি দিলেন। চিঠিতে ছেলেদের কাছে শেষ উপদেশ হিসেবে কতগুলো বিষয় ঢ়ড়রহঃ-ড়ঁঃ করেছেন এবং চিঠিটা তার বাসায় পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করি। আমি খুবই আগ্রহের সাথে চিঠিটা নিয়ে তাঁর ছেলেদের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেছি। এর আগে একটা কুরআন শরিফ পাঠিয়েছিলেন, কুরআন শরিফের মধ্যে কী ছিল সেটা আমি জানতাম না। জামায়াতের কেন্দ্রীয় অফিসের একজন পিয়নকে ওই কুরআন শরিফ উনার বাসায় পৌঁছে দিতে বলি। কিন্তু বাসায় পৌঁছাতে অনেক দেরি করেছে। পরের সপ্তাহে আবার খবর নিয়েছেন যে, কুরআন বাসায় পৌঁছেছে কি না। আমি তো লজ্জা পেয়ে গেলাম, আসলে কুরআন শরীফের মধ্যে কি ছিল সেটা পরে জানতে পারলাম। কুরআন শরীফের ফাঁকে ফাঁকে যে জায়গা ছিল সেখানে তিনি, তার পরিবারের জন্য অনেক উপদেশবাণী লিখে পাঠিয়েছেন। অমূল্য সম্পদ হিসেবে আমি সেটা পৌঁছাতে বিলম্ব করায়, অনেক লজ্জা পেলাম। যাই হোক, এতো কষ্টের মধ্যে আমাদের ভাইয়েরা যে এত উৎফুল্ল ছিলেন, আনন্দের মধ্যে ছিলেন, সেইটা আমরা দেখে অবাক হয়ে যাই যে, ফাঁসির সেলে বসেও আমাদের আন্দোলন সম্পর্কে পরিবার সম্পর্কে তিনি খোঁজখবর নিতেন, দিকনির্দেশনা দিতেন। কামারুজ্জান ভাইয়ের একটা অভ্যাস ছিল, তিনি পান খাইতেন না, কিন্তু খাবার পর একটু সুপারি চিবাইতেন। আমার কাছে যখন খবর এলো, আমি দৌড়ে গিয়ে চকবাজার থেকে কাঁচা সুপারি টুকরো করে রেজ্জাকুল হায়দার সাহেবের মাধ্যমে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছি। দুই দিন আমি এমন করে সুপারি পাঠিয়েছি। এইভাবে সর্বশেষ স্মৃতি হিসেবে তার সাথে লেগে থাকার চেষ্টা করেছি। কিন্তু খুব বেশি কিছু করতে পারি নাই। ট্রাইব্যুনালে প্রথম দিকে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে, পরে বিভিন্ন ব্যস্ততার কারণে আর যেতে পারি নাই। শহীদ কামারুজ্জামান ভাইয়ের শাহাদাতের পরে দাফন অনুষ্ঠান হয় তাঁর গ্রামের বাড়ি শেরপুরে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে গভীর রাতে হাজার হাজার জনতা উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও পারিবারিক লোকজন ছাড়া বাইরের কাউকে জানাজায় শরিক হতে দেয়নি। সকাল হতেই জনতার বাঁধভাঙা জোয়ার আসতে থাকে এবং গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হতে থাকে। তারই ধারবাহিকতায় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে ঢাকা মহানগরীর জামায়াতের পক্ষ থেকে প্রশাসনিক নজরদারির মধ্যেও একটি বিশাল গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

শহীদ আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ (রহ)
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল শহীদ আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ভাইয়ের সাথে আমার অনেক স্মৃতি। ছাত্রজীবনে যখন আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি, সেই সময়ে আমি শহীদ আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ভাইয়ের কাছে প্রথম এসেছিলাম। যখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সাথে পার্শ¦বর্তী মেহেরচন্ডী এলাকার যুবলীগ সন্ত্রাসীদের ভয়াবহ সংঘর্ষের কারণে একটা বিভীষিকাময় পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল, সেই সঙ্কট মোকাবেলা করার জন্য আমি শহীদ আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ভাইয়ের কাছে এসেছিলাম। তিনি সুন্দরভাবে আমার কথা শুনেছেন। আমি আগে শুনেছি যে, মুজাহিদ ভাই খুবই রাগী মানুষ। সবাই তাকে দেখে ভয় পেত। আমিও ভয়ে ভয়ে তার কাছে এলাম, কিন্তু যে আশা নিয়ে এসেছিলাম তার চাইতে অনেক বেশি পাওনা নিয়ে আমি ফেরত যাই। অর্থাৎ ভাই ছিলেন হজরত ওমর (রা.)-এর ন্যায় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। অন্যায়ের বিরুদ্ধে বজ্রকঠিন, ন্যায়নীতির সময় শিশুর মত বিগলিত। তাকে যখন বললাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শহীদের স্মৃতিবিজড়িত ক্যাম্পাস, সেই ক্যাম্পাস আজ নানাবিধ ষড়যন্ত্রের শিকার। আওয়ামী লীগ তখন ক্ষমতায় (১৯৯৬)। তারা সরকারের কোষাগার থেকে টাকা দিচ্ছে, পাশাপাশি সন্ত্রাসীদের সহযোগিতা করছে। তিনি এ-কথা শুনার পর মুক্ত হস্তে সেদিন টাকা দিয়েছিলেন এবং আমি সে টাকা নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার দরিদ্র ও ক্ষতিগ্রস্তদের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করেছি। তখন থেকেই তার সাথে আমার আলাদা একটা সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। কেন্দ্রের দশ দিনের শিক্ষা শিবিরে তার কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছি এবং ছাত্রজীবন শেষ করার পরে আমি তার সাথে বিভিন্ন সফরে গিয়েছি, যাওয়ার পরে তাকে আরো বেশি কাছ থেকে দেখেছি, চিনেছি এবং তিনিও আমাকে খুব আদর করতেন। আদর করার কারণে তার কাছে আমি অনেক দাবি নিয়ে কথা বলেছি এবং তিনিও আমাকে শাসন করেছেন। বিশেষ করে তিনি যখন শাহাদাতের কাছাকাছি সময়ে চলে এসেছেন, যেকোনো মুহূর্তে তার দন্ড কার্যকর হয়ে যাবে, এর পরও তার ভেতর দৃঢ়তা লক্ষ করেছি। তিনি বলেছেন ‘কোন দিন এই মাথা মানুষের কাছে নত হয়নি এবং নত হবেও না এক আল্লাহ্ ছাড়া। শহীদ হয়ে যাবে তোমার ভাই কিন্তু এই মাথা নিচু হবে না।” ২১ আগস্টের মামলায় প্রতি সপ্তাহে তিন দিন হাজিরা থাকতো। সে সময় তিনি স্বাভাবিক থাকতেন। আমি তিন দিনেই সকাল দশটা থেকে বেলা ২টা-৩টা পর্যন্ত তার সাথে অবস্থান করতাম, পাশাপাশি চেয়ারে বসতাম। এটা আমার জীবনের সবচাইতে বড় পাওয়া যে সাইয়্যেদুশ সুহাদা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ভাইয়ের সাথে আমি তিনটি বছর প্রতি সপ্তাহে তিন দিন করে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত তার পাশে থেকেছি। এই ধরনের ফাঁসির রায় তার মাথার ওপর ঝুলছে তারপরেও তার কোনো অনুভূতি নেই। আমি দুপুরে বিরতির সময় খোলামেলা জিজ্ঞাসা করতাম যে ভাই কি খাবেন, ‘তিনি বলতেন তুমি যা খাও হালাল হলে আমি সব খেতে পারি।’ আমি জানতাম যে তিনি সাধারণত হালকা কিছু খান। আগে যারা দায়িত্ব পালন করেছে তারা বলেছে শিঙ্গাড়া, কলা অথবা স্যান্ডউইচ এই ধরনের সাধারণ নাশতা করতেন। একদিন আমি দুষ্টুমি করে বললাম আপনি কি কাচ্চি বিরিয়ানি খাবেন? ভাই বললেন সাইনবোর্ডে শুধুই তো দেখেই গেলাম ইরানি বিরিয়ানি, এই বিরিয়ানি সেই বিরিয়ানি তো তুমি কোনদিন আমাকে খাওয়াইলা না, আমি বললাম আমি তো সাহস পাইনি, যে আপনাকে এই কথা কিভাবে বলি। যাই হোক আমি ভাইকে দুই-তিন দিন বিরিয়ানি খাওয়াইলাম, তিনি বললেন দেখ আমি একজন সাবেক মন্ত্রী আমি একা খাইতে পারি না, এমনও আমার বিলাসিতা নাই যে আমি সবাইকে বিরিয়ানি খাওয়াতে পারব। যাই হোক তিনি দুই একদিন খাওয়ার পর বললেন, না এটা দামি জিনিস সবাইকে নিয়ে খাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না, তুমি হালকা কিছু নিয়ে এসো। বিশেষ করে তার সাথে সমসাময়িক বিষয় নিয়ে আলোচনা হতো। তিনি আমাকে প্রত্যেক দিন সংগঠন সম্পর্কে পরামর্শ দিতেন, তুমি লিখে নাও, এটা গিয়ে জানাবে মহানগরী আমির/ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল, সবার জন্য আলাদা আলাদা পরামর্শ দিতেন। এমনকি যখন ইসরাইল ফিলিস্তিনের ওপর হামলা করল, বিশেষ করে তাদের বর্বরোচিত হামলায় অনেক শিশু নিহত হয়, তাৎক্ষণিকভাবে ভাই বললেন, ‘সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে আমি মনে করি জামায়াতের একটা কর্মসূচি দেয়া উচিত।’ সংগঠন এটা শুনার সাথে সাথে পরের দিনই কর্মসূচি ঘোষণা করেছে, ঢাকা শহরে বড় বড় কয়েকটা মিছিল হয়েছে এবং অনেক উপস্থিতি ছিল শুনে তিনি খুব খুশি হয়েছেন। এইভাবে ভাই যতদিন কোর্টে আসতেন, ততদিন আমাকে সংগঠন সম্পর্কে পরামর্শ দিতেন। নিজের সম্পর্কে কোন ধরনের ব্যস্ততা ছিল না। তিনি কারাগারে অন্যান্য নেতাদের প্রতিও খেয়াল রাখতেন, তাদের পিসিতে টাকা দেয়া চিকিৎসার খবর রাখার জন্য আমাকে বলতেন। কারাগারে তার সেবকদের পোশাক-পরিচ্ছদ দিতেন, মামলার খোঁজ নিতেন এবং টাকা দিয়ে অ্যাডভোকেট দিয়ে সহযোগিতা করতেন। আমি যখন তার নিজ সম্পর্কে কিছু জানতে চাইতাম, বিশেষ করে, তাঁর মৃত্যুদন্ডের রায় কার্যকরের ব্যাপারে। তিনি আমাকে বুঝতে দিতেন না। তিনি বলতেন, ‘তুমি কি মনে কর সরকার আমাকে ফাঁসি দিতে পারবে?’ আমাকে সাহস দিতেন, অন্য দিকে তিনি নিজে নিজে ভেতরে ভেতরে অত্যন্ত সজাগ থাকতেন, যেকোনো সময় তিনি শহীদ হয়ে যাবেন সেই জন্য প্রস্তুত থাকতেন। তার একটা প্রমাণ হলো ভাইকে জানানো হয়নি যে উক্ত রাত্রে তাকে ফাঁসি দেয়া হবে। সর্বশেষ যখন পরিবারের সাক্ষাৎ হয় রাত ১০টার পর, তখন ভাই বুঝতে পারলেন যে উক্ত রাতে হয়তো দন্ড কার্যকর করা হবে। কিন্তু তার অনেক আগ থেকেই তিনি প্রস্তুত ছিলেন। তার ব্যবহৃত জিনিসপত্র কে কোনটা পাবে আগ থেকেই তিনি লিখে দিয়ে গেছেন। যেমন আমার নামে একটা পাঞ্জাবি বরাদ্দ করছিলেন, সেখানে অ্যাডভোকেট হেলাল নিজ হাতে লিখে রেখে দিয়েছিলেন, এইভাবে নূরুল ইসলাম বুলবুল ভাই, মাওলানা আব্দুল হালিমসহ অনেকের নাম লিখে রেখেছিলেন তার ব্যবহৃত জিনিসপত্র কে কোনটা পাবে। যেকোন সময় যেন তিনি আল্লাহর দরবাবে হাজির হয়ে যেতে পারেন, সে জন্য সবসময় প্রস্তুতি নিয়ে থাকতেন। আর অপর দিকে আমাদেরকে বুঝতে দিতেন না। বলতেন কিছুই হবে না, তোমরা কোন ভয় পেয়ো না, চিন্তিতও হবে না, তোমরা সবসময় শক্ত থাকবে, ভয়ের কোন কারণ নাই, বিজয় অবশ্যই তোমাদের হবে ইনশাআল্লাহ। যদি তোমরা ময়দানে ধৈর্য ধরে থাকতে পার। এইভাবে তিনি আমাদেরকে সাহস দিয়েছেন, কিন্তু তিনি শহীদ হওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকতেন। একদিন মুজাহিদ ভাই আমাকে বললেন ‘দেখ হেলাল আমি এই কারাগারে এসে তিনবার তাফহিমুল কুরআন সম্পূর্ণ অধ্যয়ন করেছি। প্রতি সপ্তাহে সোমবার বৃহস্পতিবার উনি রোজা রাখতেন। কনডেম সেলের এত কষ্টের মধ্যেও তিনি রোজা রাখতেন, তাহাজ্জুদ পড়তেন। আশপাশে যারা থাকতো সেসব কনডেম সেলের লোকজন বলতো স্যার তো সবসময় শুধু ইবাদত বন্দেগির মধ্যে দিন কাটিয়ে দেন। এইভাবে তিনি সদাসর্বদা আল্লাহর সাথে গভীর সম্পর্ক রেখেই চলেছেন।
মহান আল্লাহ সূরা ফজরের ২৭ থেকে ৩০ নম্বর আয়াতে যাদের উদ্দেশে বলেছেন, “হে প্রশান্ত আত্মা! চলো তোমার রবের দিকে, এমনতাবস্থায় যে তুমি (নিজের শুভ পরিণতিতে) সন্তুষ্ট এবং (তোমরা রবের প্রিয়পাত্র।) শামিল হয়ে যাও আমার (নেক) বান্দাদের মধ্যে এবং প্রবেশ করো আমার জান্নাতে।” শহীদ আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ভাই সেই প্রশান্ত আত্মাদেরই একজন। কারণ পরিবারের সর্বশেষ সাক্ষাতের কিছু সময় পর আনুমানিক ৩০ মিনিট পরই দন্ড কার্যকর হওয়ার কথা। তিনি সাক্ষাৎ-পরবর্তী সময়ের মধ্যে জায়নামাজে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ সালাত আদায় করেছেন এবং দোয়া-দরুদ পড়া অবস্থায় জায়নামাজেই প্রশান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। জেল কর্তৃপক্ষ দন্ড কার্যকর করার জন্য ডাকতে এসে হতবাক হয়ে যায়- কিভাবে ফাঁসির আসামি দণ্ড কার্যকরের পূর্বে এভাবে ঘুমাতে পারে? কুরআনের উপরিউক্ত আয়াত আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, প্রশান্ত আত্মা কোন প্রকার সন্দেহ সংশয় ছাড়াই পূর্ণ নিশ্চিন্ততা সহকারে ঠান্ডা মাথায় এক ও লাশরিক আল্লাহকে নিজের রব এবং নবীগণ যে সত্য দীন এনেছিলেন তাকে নিজের দীন ও জীবনবিধান হিসেবে গণ্য করেছে। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কাছ থেকে যে বিশ্বাস ও বিধানই পাওয়া গেছে তাকে সে পুরোপুরি সত্য বলে মেনে নিয়েছে। আল্লাহর দীন যে জিনিসটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে তাকে সে অনিচ্ছা সত্ত্বেও নয় বরং এই বিশ্বাস সহকারে বর্জন করেছে যে, সত্যিই তা খারাপ। সত্য প্রীতির পথে যে কোন ত্যাগ স্বীকারের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে সে নির্দ্বিধায় তা করেছে। তাঁদের কাছেই ঘোষিত ফাঁসির পূর্ব মুহূর্তেও চিন্তামুক্ত থেকে ঘুমিয়ে থাকা আসলেই সহজ।
সর্বশেষ তিনি একদিন বললেন, তোমাদেরকে আমি উপদেশ দিচ্ছি, “বর্তমান সময়ে তোমাদের রাসূল (সা) সিরাতকে বেশি করে অধ্যয়ন করা উচিত, সিরাতে ইবনে হিসাম, মানবতার বন্ধু হজরত মুহাম্মদ (সা), পয়গামে মোহাম্মদী (সা) এবং আর রাহিকুল মাখতুম এই বইগুলো বেশি বেশি অধ্যয়ন করবে।” বেশ কিছু দোয়া তিনি আমাদেরকে আমল করার জন্য বলছেন, “আল্লাহ হুম্মাহ ইন্না নাজ আলুকা ফি নূহুরিহিম অনাউযুবিকা মিন শুরুরিহিম” আরো অনেক দোয়া আমাদেরকে আমল করতে বলেছেন, এগুলো আল্লাহর সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধির উপায়। এইভাবে তিনি আমাকে প্রেরণা দিয়েছেন এবং বলেছেন অবশ্যই এই জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠিত হবে ইনশাআল্লাহ। তাঁর শাহাদাতের পরে নিজ এলাকায় প্রশাসনের ব্যাপক বাধাবিপত্তি ও নির্যাতনের মধ্যেও হাজার হাজার লোক সারা রাত্রি দাঁড়িয়ে থেকে বাদ ফজর জানাজায় অংশগ্রহণ করে। ঢাকায় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে ঢাকা মহানগরী জামায়াতের উদ্যোগে গায়েবানা জানাজায় হাজার হাজার মুসল্লি উপস্থিত হয়। জানাজার পূর্বে আমি সংক্ষিপ্ত আলোচনা রাখি। এক পর্যায়ে পুলিশ জানাজার ইমাম সাহেবসহ ১০-১২ জনকে গ্রেফতার করে এবং বাকিদেরকে লাঠি চার্জ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। পরদিন দেশব্যাপী হরতালের সমর্থনে পল্টনে মিছিল করতে গিয়ে আমি, ফারুক হোসেন দুই সহোদর নূর মোহাম্মদ মন্ডল (শিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় অফিস সম্পাদক) ও নাজমুল হকসহ চারজন গ্রেফতার হয়ে পাঁচ মাস কারাগারে আটক থাকি।

সাইয়্যেদুশ সুহাদা মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী (রহ)
আমীরে জামায়াত মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী (রহ) ভাইয়ের সাথে ব্যক্তিগতভাবে মেশার সুযোগ পেয়েছি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সভাপতি থাকার সময়ে। বিশেষ করে ২০০০ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন সন্ত্রাসী হামলা হয়েছিল তখন আমীরে জামায়াতের নিকট গিয়েছিলাম। আমীরে জামায়াত গভীর মনোযোগসহকারে আমার কথা শুনছিলেন, শুনার পরে বললেন ঠিক আছে তুমি সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ভাইয়ের সাথে দেখা কর, আমি তাকে বলে দেবো, পরবর্তীতে সেক্রেটারি জেনারেল আন্তরিকভাবে আমাকে গ্রহণ করেছেন এবং আমাকে সহযোগিতা করেছিলেন। এরপর বিভিন্ন সময়ে তার বাসায় গিয়েছি, তার সাথে দেখা করেছি, কিন্তু তিনি বেশি কথা বলতেন না, খুব কম কথার মানুষ, হাসি দিয়ে একটা কথা বলেই শেষ করতেন। বিশেষ করে একটা ঘটনা বারবার মনে হয় সেটা হলো, নূরুল ইসলাম বুলবুল ভাইয়ের বিয়ের পরে মীর কাসেম আলী মিন্টু ভাই বলছিলেন যে, বুলবুল আমি তোমার বাড়িতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ যাইতে পারছি না, তবে তুমি ঘুরে আস তোমাকে নিয়ে আমরা একটা অনুষ্ঠান করব। দেখা গেল বুলবুল ভাইয়ের বিয়ের এক বছর পার হয়ে যাওয়ার পরেও শহীদ মীর কাসেম আলী মিন্টু ভাই কথাটা ভুলে গেছেন। পরে যখন আমরা কথাটা স্মরণ করিয়ে দেই দুই বছর পরে, তিনি সেই অনুষ্ঠান করলেন আমীরে জামায়াতের বাসায় প্যান্ডেল করে, সার্বিক ব্যবস্থাপনা ছাত্রশিবিরের ওপর থাকে, আর্থিক সহযোগিতা মীর কাসেম আলী ভাই বহন করেন। আমীরে জামায়াতের বাসায় সাবেক সকল কেন্দ্রীয় সভাপতি, পরিবারবর্গ এবং শিবিরের তৎকালীন পরিষদ আমরা সেখানে যাই। একটা ঐতিহাসিক পরিবেশ সৃষ্টি হয় এবং সেখানে সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ভাইয়েরা বক্তব্য রাখেন, তাদের স্ত্রী, ছেলেমেয়েরাও এসেছিলেন, অনেক আনন্দঘন একটা পরিবেশ হয়। সেখানে আমাদের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ভাইদের মধ্যে এ. কে. এম নাজির আহমদ (রহ) ভাই অত্যন্ত প্রেরণাদায়ক এবং হাস্যরসমূলক কথা বললেন যে, আমীরে জামায়াত শেষ বয়সে এসে আমাকে নায়েবে আমীর বানিয়ে ইতিহাস করলেন, তিনি টেস্ট করলেন ফিউজ বাল্ব জ্বলে কি না? আমিতো বুড়া হয়ে গেছি। আমরা বললাম, আমীরে জামায়াত-তো সফল হয়েছেন যে, ফিউজ বাল্বতো জ্বলেই উঠল। বাল্ব ফিউজ হলে তো জ্বলতো না, তার মানে আপনি ফিউজ না, আপনি সফল নায়েবে আমীর হিসেবে ভূমিকা রাখছেন। এরপরে আমি ২০০৪ সালে যখন ছাত্রজীবন শেষ করি, আমাদের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মজিবুর রহমান মঞ্জু ভাই, আমিনুল ইসলাম, হাফেজ আব্দুল্লাহ আল আরিফ ভাইসহ, আমরা ৬ জন আমীরে জামায়াতের বাসায় যাই, তিনি আমাদেরকে সকালের নাশতা করান পরটা এবং গোশত দিয়ে। নাশতা করানোর পর তিনি আমাদের জামায়াতে যোগদান করার জন্য স্বাগত জানালেন, উৎসাহ-উদ্দীপনা জোগালেন এবং বললেন, ‘দেখ আমার কিন্তু রুকন হতে ৮ বছর সময় লেগেছে কিন্তু আমি নিজেকে রুকন হিসেবে মনে করতাম এবং আমি কাজ করেছি, কখনও পিছিয়ে থাকিনি। তোমাদেরকেও একইভাবে কাজ করতে হবে। আমি মহানগরী সংগঠনকে বলে দিব যেন দ্রুত তোমাদেরকে রুকন শপথ দেয়ার ব্যবস্থা করে, তবে যেদিনেই শপথ হোক না কেন, তোমরা কিন্তু রুকন হিসেবে নিজেদেরকে মনে করবে।’ আমীরে জামায়াতের উপদেশকে প্রেরণা হিসেবে নিয়েই আমরা কাজ শুরু করি, আমি জানুয়ারির ২ তারিখে জামায়াতের সহযোগী সদস্য হই এবং ২ তারিখ থেকেই কর্মী হিসেবে আমি রিপোর্ট রাখা শুরু করি এবং তিন-চার মাসের ব্যবধানে আমি রুকন প্রার্থী হয়ে যাই, জুন অথবা জুলাই মাসে আমার শপথ হয়ে যায়। আমীরে জামায়াতের সেই কথার কারণে আমি এক দিনের জন্যও নিষ্ক্রিয় হইনি। এরপরে আমীরে জামায়াতের ট্রাইব্যুনালে আমি প্রথম দিকে আসতাম, উনার সাথে কথা বলতাম, দোয়া নিতাম। তো শেষের দিকে আর বিভিন্ন ব্যস্ততার কারণে ট্রাইব্যুনালে যাওয়া হয়নি। একদিন আমি কাশিমপুর কারাগারে গেলাম, আমাদের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল ডা: শফিকুর রহমান ভাইকে দেখার জন্য তিনি আমাকে ভেতর থেকে খবর পাঠালেন, দেখা করার জন্য। আমি ভেতরে প্রবেশ করি, সৌভাগ্যক্রমে আমীরে জামায়াত উক্ত সময় পরিবারের সাথে সাক্ষাতের জন্য আসছেন, আমি আমীরে জামায়াতকে দেখে সাথে সাথে ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরি। তিনি আমাকে বললেন, “হেলাল তুমি কী জন্য এসেছ? তোমার কি জামিন হলো? না নতুন করে জেলে ঢুকলা আজকে।’ আমি বললাম আপনার সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য এসেছি। আমীরে জামায়াত আমার জন্য দোয়া করলেন। এটাই সর্বশেষ তার সাথে সরাসরি আমার কোন সাক্ষাৎ। আমি ডা: শফিকুর রহমান ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করার পর জানতে পারলাম, সাঈদী সাহেব গেটে আসবেন, আমি আবার সাঈদী সাহেবের সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলাম। ঐদিন খুবই স্মরণীয় ঘটনা যে, একদিনে ৩ জন দায়িত্বশীলের সাথে দেখা হলো। কাশিমপুর কারাগারে সাঈদী সাহেব আমার জন্য দোয়া করলেন এবং আন্দোলনে মজবুতভাবে ভূমিকা রাখার জন্য বললেন এবং সবাইকে সালাম পৌঁছে দেয়ার জন্য বললেন। এরপর আমি ২২ মে ১৪ইং তারিখে গ্রেফতার হয়ে কেন্দ্রীয় কারাগারে। ইতোমধ্যে আমি তিনবার রিঅ্যারেস্ট হয়ে একটু মনমরা অবস্থায় আছি। এমন সময় আমীরে জামায়াতকে কাশিমপুর কারাগার থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে আসা হয়, ট্রাইব্যুনালের রায় ঘোষণার জন্য। যদিও কয়েকদিন রেখে শারীরিক অসুস্থতার কারণে আবার কাশিমপুর কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।
আমীরে জামায়াতের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করতে পারবো, এরকম একটা প্রেরণা নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম, তবে সাক্ষাতের সুযোগ পেলাম না কিন্তু তখন রমজান মাস চলছিল, প্রথম রমজানে আমরা আমাদের যা অ্যারেজমেন্ট ছিল, কিছু ফলমূল, আপেল, পেয়ারা, আম সেবকের মাধ্যমে আমীরে জামায়াতের নিকট পাঠালাম। তিনি এগুলো দিয়ে ইফতার করেছেন। এর পর রমজানের দ্বিতীয় দিন শেষে ইফতারের পূর্ব মুহূর্তে প্রথমে ওজু করে এসে আমীরে জামায়াতের ইফতারি দেয়ার পর খবর পেলাম, আমার জামিন হয়েছে। তিন-বার রি-অ্যারেস্ট হওয়ার পর জামিনের খবর পেয়ে আমি হাত পায়ের শক্তি হারিয়ে ফেলি, এই রমজান মাসে যদি আমাকে আবার রি-অ্যারেস্ট করে, চিন্তা আর একটা অজানা হতাশার মধ্যে, কিন্তু আল্লাহর মেহেরবানিতে এবং আমীরে জামায়াতের দোয়ার কারণে যখন কারা ফটকে গেলাম, তখন ইফতারের আজান হচ্ছে ঠিক সেই মূহূর্তে কারা ফটক খুলে দিয়ে আমাকে বললেন আপনি চলে যান। তখন মনে হলো জীবন্ত শহীদ আমীরে জামায়াতের দোয়াতেই আল্লাহ আমাকে মুক্ত করে দিলেন। যাই হোক শেষ পর্যায়ে আমীরে জামায়াত আইনজীবীদের সাক্ষাৎকারের সময় বলেছিলেন যে “আমি একটা স্বপ্ন দেখেছি, সেই স্বপ্নটা হলো যে আমাকে ঢাকা থেকে পাবনা নিয়ে যাওয়া হলো, আমি আমার নিজ উপজেলা সাঁথিয়াতে গেলাম, সেখানে আমার বাড়িতে গিয়ে পোশাক পরিবর্তন করে আমি নদীর ধারে বেড়াতে যাই। যখন আমি পায়চারি করছি ঠিক ঐ মূহূর্তে নদীর পানি উতলে উঠল, উতলে উঠে আমার পা বরাবর এসে আবার চলে গেল।” তখন আইনজীবীরা জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি এর মাধ্যমে কি বুঝাচ্ছেন? তিনি তখন বললেন, ‘খুব সহসায় আমার দন্ড কার্যকর হবে এবং সাঁথিয়াতে আমাকে দাফন করবে এবং আমার জানাজার নামাজে অনেক লোকের সমাগম হবে এবং আমার শাহাদাতের পরে এই জমিনে একটা পরিবর্তনের সূচনা হবে ইনশাআল্লাহ্।’ ইতোমধ্যে উনার দাফন অনুষ্ঠানে হাজার হাজার লোকের সমাগমের মাধ্যমে উনার একটা কথা বাস্তবায়ন হয়ে গিয়েছে। জানাজায় প্রথম জামায়াতে প্রায় দশ হাজারের ওপরে লোক ছিল, এর পর সারা দিন পঞ্চাশ ষাট হাজারের উপরে লোক হবে যারা প্রায় চল্লিশটা গায়েবানা জানাজায় অংশগ্রহণ করেছে। তাহলে উনি বললেন হাজার হাজার লোকের সমাগম হবে, র‌্যাব, বিজিবি, পুলিশ তিনদিন যাবৎ ঘিরে রাখার পরও জানাজায় অংশগ্রহণ করা লোকের বাঁধভাঙা জোয়ার থামাতে পারেনি। সর্বশেষ বলেছিলেন, তাঁর শাহাদাতের পরে পরিবর্তনের সূচনা হবে, আমরা আশাবাদী তিনি যে প্রেরণা দিয়ে গেছেন, সে পরিবর্তনের সূচনা হবে, ইনশাআল্লাহ আমরা তা দেখতে পাবো। আমীরে জামায়াতকে উনার ছেলে বলেছিল যে ‘আব্বু আমাদের উপদেশ দেন’। উনি বললেন, ‘উপদেশ আমিতো লিখে গিয়েছি। তিনি রাসূল (সা) উপরে একটা বই লিখে গেছেন যে কুরআন হাদিসের আলোকে রাসূলূল্লাহ (সা) এবং আদাবে জিন্দেগি। এই বই দুইটা তিনি পড়তে বলেছেন। শহীদ আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ভাইও একদিন, সিরাত পড়ার কথা বললেন। দুইজন দুই জায়গায় থাকার পরও উপদেশ একদম মিলে যায়। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর যে ঘটনা সেই ঘটনার দিনেও এই পাঁচজন শহীদ ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছিলেন জীবনবাজি রেখে, যখন দেখছেন যে চারদিক থেকে বৃষ্টির মত গুলিবর্ষণ হচ্ছে, অবিস্মরণীয় একটা ইতিহাসÑ এত গুলিবর্ষণ হওয়ার পরও তারা স্টেজে ছিলেন, এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে মর্দে-মুজাহিদরা কোন দিন মরে না, তারা শহীদ হতে পারেন কিন্তু পিছপা হতে পারেন না। সকাল দশটা থেকে যে মারামারি শুরু হয়েছে, তার পরেও এই সিপাহসালাররা স্টেজে উঠে বক্তব্য দিয়েছেন, বক্তব্য শেষ করেই তারা নেমেছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইচ্ছা করলে তাদেরকে ২৮ অক্টোবর ২০০৬ শহীদ হিসেবে কবুল করতে পারতেন। কয়েকজন ভাইকে শহীদ হিসেবে কবুল করেছেন আর এই সকল ভাইদের গাজী হিসেবে কবুল করেছেন, কিন্তু পরবর্তীতে আল্লাহ তাদের শাহাদাতের মর্যাদা দিয়েছেন।

কবি আল মাহমুদের ভাষায়-
আমাদের এ মিছিল নিকট অতীত থেকে অনন্তকালের দিকে,
আমরা বদর থেকে ওহুদ হয়ে এখানে শত সংঘাতের মধ্যে এ কাফেলায় এসে দাঁড়িয়েছি।
কে প্রশ্ন করে আমরা কোথায় যাব? আমরা তো বলেছি আমাদের যাত্রা অনন্তকালের।
উদয় অস্তের ক্লান্তি আমাদের কোন দিনই বিহবল করতে পারেনি।
আমাদের দেহ ক্ষত-বিক্ষত, আমাদের রক্তে সবুজ হয়ে উঠেছিল মুতার প্রান্তর।
পৃথিবীতে যত গোলাপ ফুল ফোটে তার লাল বর্ণ আমাদের রক্ত,
তার সুগন্ধ আমদের নিঃশ্বাস বায়ু।
আমাদের হাতে একটি মাত্র গ্রন্থ আল কুরআন, এই পবিত্র গ্রন্থ কোন দিন,
কোন অবস্থায় কোন তৌহিদবাদীকে থামতে দেয়নি।
আমরা কি করে থামি? আমাদের গন্তব্য তো এক সোনার তোরণের দিকে যা এই ভূপৃষ্ঠে নেই। আমরা আমাদের সঙ্গীদের ভিন্নতাকে গ্রাহ্যের মধ্যে আনি না,
কারণ আমাদের আত্মার গুঞ্জন হু হু করে বলে, আমরা এক আত্মা এক প্রাণ।
শহীদদের চেহারার কোন ভিন্নতা নেই।
আমরা তো শাহাদাতের জন্যই মায়ের উদর থেকে পৃথিবীতে পা রেখেছি।

যারা আওয়ামী বাকশালী সরকারের হাতে নিজেদের জীবন দিয়েছেন তারা নিঃসন্দেহে সাচ্চা শহীদ, তারা ভাগ্যবান। যারা শহীদ হয়েছেন তাদের অনেক স্বপ্ন ছিল, অনেক আশা ছিল। বিশেষ করে শহীদ আমীরে জামায়াত এবং শহীদ সেক্রেটারি জেনারেল পাঁচ বছর সরকার পরিচালনায় অংশগ্রহণ করে অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন, যেগুলো বাংলাদেশে ইসলামী আন্দোলনকে বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যেতে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারতেন। কিন্তু তারা সব কিছু ছেড়ে আল্লাহর কাছে চলে গিয়েছেন। আজকে তারা আমাদের কাছ থেকে অনেক অনেক দূরে অবস্থান করছেন। তাদের রক্তের বদলেই হয়ত আগামী দিনে এদেশে ইসলামী আন্দোলন আরো শক্তিশালী হবে এবং আল্লাহর এ জমিনে আল্লাহর দ্বীন কায়েম হবে ইনশাআল্লাহ।
শহীদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার দায়িত্ব আমরা যারা বেঁচে আছি তাদের সকলের। তারা যে ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েমের স্বপ্ন দেখতেন সে স্বপ্ন যদি আমরা বাস্তবায়ন করতে পারি তাহলেই তাদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হবে এবং তাদের আত্মা শান্তি পাবে। তাই সকল ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে এদেশে একটি ইসলামী সমাজ কায়েমের আন্দোলনকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদের সংগ্রাম করতে হবে। দেশে একটি শোষণহীন, জুলুমমুক্ত, ইনসাফপূর্ণ ইসলামী সমাজব্যবস্থা কায়েমের সঙ্কল্প গ্রহণের মাধ্যমে শহীদদের স্মরণ করার জন্য আমি সবার প্রতি আহবান জানাচ্ছি এবং আমাদের শহীদ ভাইদের সাইয়্যেদা সুহাদা হিসেবে কবুল করার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করছি এবং তাদের পরিবার পরিজনদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি ও দোয়া করছি। আল্লাহ যেন তাদের দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ দান করেন। আমিন।

SHARE

Leave a Reply