প্রয়োজনে স্বাধীনতা রক্ষায় যুবসমাজকে আরো একটি মুক্তিযুদ্ধ করতে হবে

যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ আবু হানিফ

ছাত্র সংবাদ : একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ১৯৭১ সালের মুক্তিযদ্ধ নিয়ে কিছু বলুন।
আবু হানিফ : ১৯৭১ সালে আমি সাতক্ষীরার সদর থানার ২ নং গেরিলা  কমান্ডার ছিলাম। ’৭১ সালে বিভিন্ন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি, তার মধ্যে অক্টোবরে সাতক্ষীরার বালিয়াডাঙ্গা নামক স্থানে পাক বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধ হয়। ঐ যুদ্ধে আমার পার্টির ২৬ জন মারা যায়। দুলাল চন্দ্র ও আমি গুলিবিদ্ধ হই। আমি পাকবাহিনীর হাতে সশস্ত্র ধরা পড়ি এবং তারা প্রচণ্ড মারধর করায় আমার মেরুদণ্ডের তিনটি হাড় সরে যায়। এমতাবস্থায়  পেছন দিক থেকে গেরিলাদের পুনঃআক্রমণে পাক বাহিনীর ৭-৮ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। আমি তখন মাটিতে পড়ে যাই এবং সুযোগ  বুঝে ক্রলিং করে পালিয়ে বেঁচে যাই। বালিয়াডাঙ্গা যুদ্ধের পর ৮ নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার মেজর মনজুরুল ৯ নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিল ও কর্নেল শফিউল্লাহসহ সবাই পরামর্শ করে আমার যুদ্ধের অবদানের দিকে লক্ষ্যে করে আমাকে সাব-সেক্টর কমান্ডার ঘোষণা করেন। ভারত ও বাংলাদেশে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েও আজ পর্যন্ত আমি সুস্থ হতে পারিনি। আমার চিকিৎসায়  সর্বস্বান্ত হয়েছি। এখনো প্রায় রাতে যন্ত্রণায় ছটফট করে অজ্ঞান হয়ে পড়ি। আমি যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বা সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সরকারি কোনো আর্থিক সাহায্য সহযোগিতা পাইনি। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনাসহ সংসার পরিচালনা ও আমার চিকিৎসা খরচ করা আমার পক্ষে সম্পূর্ণ অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বর্তমানে আমি একজন প্রকৃত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা হয়েও মানবেতর জীবনযাপন করছি। অ-মুক্তিযোদ্ধাদের প্রভাব বেশি। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের মূল্যায়ন খুবই কম। যে ক’দিন বেঁচে থাকবো দেশের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।
ছাত্র সংবাদ : বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের ৪০তম বর্ষপূর্তিতে এসে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আপনার অনুভূতি ব্যক্ত করুন?
আবু হানিফ : আজ ৪১তম বিজয় দিবস উদযাপিত হতে যাচ্ছে। একজন যুদ্ধাহত প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমার বক্তব্য লক্ষ লক্ষ মানুষের রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি। দুঃখের বিষয়  এদেশের মানুষের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয়নি। আমরা যুদ্ধ করেছিলাম দেশ স্বাধীন হলে বেকার সমস্যা দূর হবে, মানুষের জানমালের নিরাপত্তার বিধান হবে, সুচিকিৎসার ব্যবস্থা হবে, দ্রব্যমূল্য মানুষের ক্রয়ক্ষমতা মধ্যে থাকবে, বাঙালি জাতি হিসেবে স্বাধীনভাবে গণতান্ত্রিক অধিকার ভোগ করবে। যুগ যুগ ধরে এদেশের  সকল মানুষ  আশা থেকে নিরাশ হচ্ছে। তাই সৃষ্টিকর্তার কাছে সাহায্য চেয়ে নিজেদের সর্বশক্তি দিয়ে স্বাধীনতা-সাবভৌমত্ব রক্ষা করার চেষ্টা করতে হবে। প্রতি বছর বিজয় দিবস এলে আমরা মুক্তিযোদ্ধারা লজ্জায় মাথা নত করি। মুক্তিযোদ্ধাদের চেয়ে ভারতীয় মিত্র বাহিনীর সম্মান দেখানো হয় বেশি, এটা আমার জন্য লজ্জাকর বিষয়।
ছাত্র সংবাদ : স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য কী কী অর্জন হয়েছে বলে আপনি মনে করেন?
আবু হানিফ : স্বাধীনতা যুদ্ধের পর উল্লেখযোগ্য কিছু অর্জন হয়েছে বলে আমার মনে হয় না। মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করেছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানের গোলামি হতে মুক্ত হয়ে ভারতের গোলামির জিঞ্জিরে আবাদ্ধ হওয়ার জন্য নয়। দলাদলি, হানাহানি দেশে লেগে আছে। একশ্রেণীর স্বার্থান্বেষী দেশের মানুষের সুখ-শান্তির দিকে লক্ষ্য না রেখে ভারতেকে সন্তষ্ট করার জন্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আছে। আজ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির চাপে নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষেরা মানবেতর জীবন যাপন করছে। মুক্তিযোদ্ধারা বৃদ্ধ বয়সে অনেকে রিকশা ও ভ্যান চালাচ্ছেন। যাদের শক্তি নেই তারা অনেকে ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবন যাপন করছেন। অনেকের স্ত্রী-কন্যা অভাবের তাড়নায় পরের বাড়ি ঝি, চাকরানীর কাজ করে সংসার নির্বাহ করছেন। অনেক মুক্তিযোদ্ধা অসুস্থ হয়ে অর্থাভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরছেন। গণতান্ত্রিক দেশে গণতান্ত্রিক অধিকার বলতে কিছু নেই।
ছাত্র সংবাদ :. স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে আমাদের মৌলিক অধিকারসহ আমরা স্বাধীনতার সুফল কতটুকু পাচ্ছি ?
আবু হানিফ : স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে ব্যক্তির মৌলিক অধিকার ভোগ করার সুযোগ নেই। স্বাধীনতার সুফল, কুফলে পরিণত হয়েছে। জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার ভোগ করার সুযোগ  নেই। স্বাধীনতা বলে দেশে কিছু আছে বলে আমার মনে হয় না। ভারত দেশ চালাচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধাদের জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বলে, কিন্তু কিছুসংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা রাষ্ট্রীয় সম্মানী, ভাতা মাসিক দুই হাজার টাকা করে পাচ্ছেন। এটা একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অতি নগণ্য। মুক্তিযোদ্ধাদের বয়স প্রায় শেষ, আজ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তৈরি হয়নি, এমনকি সাময়িক সনদপত্র দিয়ে চলছে।
ছাত্র সংবাদ : স্বাধীনতার চেতনা ঐক্যের, বিভক্তির নয়- এ সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?
আবু হানিফ : স্বাধীনতার চেতনা বলে আমি একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বলতে চাই ধর্মনিরপেক্ষতা মুক্তিযোদ্ধার চেতনা নয়। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা কল্পনা করা যায় না। মুক্তিযোদ্ধার চেতনা কুরআন হাদিসের বিরুদ্ধে নয়, ইসলামের বিরুদ্ধে নয়, আলেম-ওলামাদের বিরুদ্ধে নয়। স্বাধীনতার চেতনা দেশের উন্নতি সাধন করা, জাতি ধর্ম নির্বিশেষে স্বাধীন দেশের উন্নতির জন্য জাতিকে দ্বিধাবিভক্ত না করে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশের কল্যাণে, জাতির কল্যাণে, স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য একযোগে কাজ করা। সুনাগরিকের দায়িত্ব বলে আমি মনে করি। হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলিম সকলে মিলে দেশ স্বাধীন করেছি। রক্ষা করার দায়িত্ব সকলের।
ছাত্র সংবাদ : দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কোন বিষয়গুলোকে আপনি প্রতিবন্ধক মনে করছেন?
আবু হানিফ : স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রতিবন্ধকতা অনেক আছে, তার মধ্যে আমার মতে প্রধান প্রতিবন্ধকতা ভারত। স্বাধীনতাযুদ্ধে ভারত আমাদের অস্ত্র  ও প্রশিক্ষণ দিয়ে, খাদ্য দিয়ে, সৈন্য দিয়ে সহযোগিতা করেছিল। আর আজ ভারতই প্রধান প্রতিবন্ধক। দেশ স্বাধীন হলে ৮ নং সেক্টরের অন্যতম কমান্ডার কর্নেল শফিউল্লাহ স্যারের কাছে প্রশ্ন করেছিলাম অনেক যুগ অতিবাহিত হলো- মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তৈরি হলো না কেন? স্যার বলতেন, মুক্তিযোদ্ধাদের দ্বারা দেশ স্বাধীন হয়েছে এটা ভারত মেনে নিতে পারে না। তাই ভারত বলছে আমরা যুদ্ধ করে পাকিস্তানিদের হটিয়ে পূর্বপাকিস্তান দখল করেছি এবং বাংলাদেশ নাম দিয়ে বাংলাদেশের জনগণকে উপহার দিয়েছি। তাছাড়া মুক্তবাজার, ট্রানজিট, চিটাগাং বন্দর প্রভৃতি ভারত ব্যবহার করবে তাহলে আমাদের স্বাধীনতা থাকলো কোথায়? আমরা ভারতের অঙ্গরাজ্য নই, আমরা স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। আমরা কারো গোলামি করতে রাজি নই।
ছাত্র সংবাদ : স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দেশের রাজনীতিবিদদের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী?
আবু হানিফ : স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দেশের সকল রাজনীতিবিদদের কাছে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রত্যাশা দলাদলি, হানাহানি বাদ দিয়ে স্বাধীনতার পক্ষে বিপক্ষের কথা তুলে জাতিকে দ্বিধা-বিভক্ত না করে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে স্বাধীনতা রক্ষার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশের উন্নতি সাধনের চেষ্টা করা। আমরা মুক্তিযোদ্ধারা রাজনীতিবিদদের কাছে এটাই কামনা করি।
ছাত্র সংবাদ : বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ রাখা ও দেশকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে তরুণ ছাত্র ও যুবসমাজের কাছ থেকে আপনি কেমন ভূমিকা প্রত্যাশা করেন?
আবু হানিফ : আমরা যখন মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম তখন বেশির ভাগ মুক্তিযোদ্ধা তরুণ, ছাত্র-যুবক ছিলেন। স্বাধীনতার ডাকে শ্রমিক তার হাতের কাস্তে, কোদাল, কুড়াল এবং ছাত্ররা বই, খাতা, কলম ফেলে তরুণ তাজা হাতে তুলে নিয়েছিল এলএমজি, এসএলআর, রাইফেল,  বেয়োনেট, বুলেট। বুকের তাজা রক্ত দিয়ে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ পদাতিক বাহিনী পাকসেনাদের যুদ্ধে পরাজিত করে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিলেন। আজ বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা বয়সে বৃদ্ধ হতে চলেছেন তাই দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার দায়িত্ব তরুণ ছাত্র-যুবকদের। প্রয়োজনে স্বাধীনতা রক্ষার জন্য যুবসমাজকে আরো একটি মুক্তিযুদ্ধ করতে হবে। ৯ নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিল সাহেব বলেছিলেন, ‘অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা।’ আর আজ আমরা ভারতের গোলামিতে আবদ্ধ হতে চলেছি। মেজর জলিল বেঁচে থাকলে তিনিও যুদ্ধাপরাধী হতেন। বঙ্গবীর আব্দুল কাদের সিদ্দিকীকে আজ যুদ্ধাপরাধী বলা হচ্ছে। ২ নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে যুদ্ধাপরাধী বলা হয়। তাই রাজনীতিবিদেদের কাছে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমার আকুল আবেদন, জাতির এই শ্রেষ্ঠসন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের এভাবে যাতে হেয়প্রতিপন্ন না করে এ ব্যাপারে  ব্যবস্থা নেয়া অনুরোধ করি।
ছাত্র সংবাদ : একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের সমৃদ্ধি আনয়নে আপনার পরামর্শ কী?
আবু হানিফ : আমি একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলাদেশের একজন নাগরিক, তাই দেশ যাতে বিশ্বের কাছে একটা স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে পরিচিত হয় সে ব্যাপারে বাংলাদেশের সকল জনগণের কাছে আমার অনুরোধ, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধভাবে চেষ্টা করতে হবে। অভ্যন্তরীণ কলহ ও দলাদলি এবং সকল ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে গণতান্ত্রিক পন্থায় জনগণের মৌলিক অধিকার দিয়ে সরকার দেশ পরিচালনা করলে দেশের সমৃদ্ধি ফিরে আসবে এবং বিশ্বের কাছে আমরা একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করবো। স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার ব্যাপারে সব রাজনৈতিক দল একমত পোষণ করলে অবশ্যই দেশের সমৃদ্ধি অর্জিত হবে।

SHARE

Leave a Reply