ফারছী-বাঙালায় লেখা পুথি সাহিত্যের অকথিত ইতিহাস [পুথি সাহিত্যই বাঙালির জাতীয় সাহিত্য]

ডক্টর এস এম লুৎফর রহমান#

Pothipathবাঙলাদেশ ও ভারতীয় বাঙালার শিক্ষিত জন-সমাজের অনেকের কাছেই ‘পুথি’ শব্দটি পরিচিত। তবে পুথি-শব্দে যে বিশাল সাহিত্য-সম্ভারের কথা বলা হয়Ñ সে সব সাহিত্যের সাথে এ কালে কতজন শিক্ষিত মানুষের প্রকৃত পরিচয় আছে, তা বলা কঠিন। কারণ একসময় ‘ভারতীয় বাঙালা’য় ও ‘বাঙলাদেশে’ পুথি কেতাবের যে বিশাল চাহিদা ও ব্যাপক পাঠক ছিল, এখন আর তা নেই। কেন নেই, তা জানতে হলে, একথা জানা দরকার যে, বাঙালা ভাষা ও বাঙালা সাহিত্য গত দু’শ বছর হ’ল দুটি প্রধান ধারায় বিভক্ত হয়ে গেছে। তার একটি হল ‘ফারছী-বাঙালা’, আর অন্যটি হল ‘সংস্কৃত-বাঙালা’। পুথি সাহিত্য পয়দা হয় ফারছী-বাঙালায় মুছলিম কলমে। মুছলমানি আখলাকে। আর সংস্কৃত-বাঙালায় পয়দা হয়- গ্রন্থ-পুস্তক ইত্যাদি।
১৯৮১ সাল থেকে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পন্ডিতদের কলমে এই দুই ধারায় বাঙালা ভাষা ও সাহিত্য-ভাগের সূচনা। কাজেই বাঙালা ভাষা ও বাঙালা সাহিত্যের এই দুই ধারায় বিভক্তি খুব বেশী দিনের না হলেও আধুনিক শিক্ষা এই বিভক্তিকে এত বাড়িয়ে দিয়েছে যে, পুথির ভাষার সাথে আমাদের পরিচয় একেবারে ঘুচে গেছে। আমরা এই ভাষাকে এখন আর দেখেও চিনতে পারিনে। অথচ এক সময়Ñ মাত্র ষাট সত্তর বছর আগেওÑ এই ভাষাই ছিল আমাদের ‘দিন রাত্রির ভাষা’, ‘ঘর-গেরস্তালীর ভাষা’, ‘মা-বাবার ভাষা’, ‘গান-গল্পের ভাষা’, ‘বাসর-ঘরের ভাষা’। মুছলিম-অমুছলিম নির্বিশেষে আম-জনতার ভাষা। আর পুথি সাহিত্যই ছিল তখন জনগণের সাহিত্য বা ‘জন-সাহিত্য’।
অনেকেই কবুল ক’রবেন যে, এখনও আমাদের বয়স্ক বাপ-দাদা, নানা-নানী পুথি সাহিত্য সুর ক’রে পড়েন, বোঝেন এবং তার রসপান করে হাসেন-কাঁদেন। কিন্তু আধুনিক শিক্ষা আমাদের এমনি এলেম তালিম দিয়ে ছেড়ে দিয়েছে ও দিচ্ছে যে, তাঁরা ও তাঁদের বাপ-দাদারা অল্প লেখাপড়া জেনে যা প’ড়তে ও বুঝতে পারতেন; আমরা চার পাঁচটা বড় বড় পরীক্ষায় পাস করেও তা প’ড়তে বুঝতে পারিনে। আমাদের বুড়ো দাদা দাদীদেরও বোঝাতে পারিনে। কাজেই তার সঠিক মূল্যায়ন করাও আমাদের পক্ষে সম্ভব হয় না।
বাপ-দাদার এই মানস-সম্পত্তি, তাদের অলি-আওলাদদের কাছে এমন অজানা ও অচেনা, প’র হল কেমন ক’রে? চিরচেনা পুথি একেবারে অচেনা হ’ল কেমন ক’রেÑ এবার সে বিষয়ে আলোকপাত করা হবে।
পুথি পরিচয়
বলা দরকার যে, এদেশে বৌদ্ধ, হিন্দু ও মুছলিম শাসনামলে যত গ্রন্থ-পুস্তক লেখা হয়েছে, তা সব-ই পুথি নামে পরিচিত। ওগুলো কোন কোনটিকে যে গ্রন্থ-পুস্তক, পোথা, কেতাব বলা হয় নি; তাও নয়। তবে মুছলিম কিংবা অমুসলিম লেখকের প্রাক-আধুনিক যুগে লিখিত সব রচনাই পুথি। কয়েকটি নজীর নিচেয় হাজির করা হল যথাÑ
১. লোচন দাসের ‘চৈতন্য মঙ্গল’ -এ বলা হয়েছেÑ
(ক) ‘‘না চাহি সম্পদ বর মঞি অতিপামর
নির্ব্বিঘেœ সম্পূর্ণ হউ পুথি ॥’’

(খ) ‘‘দামোদর পন্ডিত পুছিল সব তারে।
আদ্য অন্ত জত কথা কহিল অন্তরে ॥
শোক বন্ধে হৈল পুথি গৌরাঙ্গ চরিত।
দামোদর সম্বাদ মুরারি মুখোদিত ॥’’

কৃষ্ণদাস কবিরাজ এর সুখ্যাত সুবৃহৎ ‘চৈতন্য চারিতামৃত’ -কেও পুস্তিকায় পুথি ব’লে উল্লেখ করা হয়েছে। এ গ্রন্থের শেষ পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে বৃন্দাবনের মধ্যে এই পুথি লেখা সম্পূর্ণ হল। (-পৃ. ৫৬৯)।
অপরদিকে, মুছলিম লেখক বা কবিগণও যে, তাঁদের ছোট বড় সব রচনাকেই পুথি ব’লতেন, তার নজীর এরকম-
১. চৈতন্য চরিতা মৃতের চেয়ে বিশাল গ্রন্থ ‘আমীর হামজা’। এই বই উরদু থেকে একাধিক কবি অনুবাদ করেছেন। কবিরা সেই বিপুলায়তন গ্রন্থকেও পুথি বলেছেন যথাÑ
ক) ‘‘ঋতু নিধি অব্দ আদি হিজরী রইল ।
আমীর হামজার পুথি সমাপ্ত হৈল।’’ -আবদুন নবী।
খ) ‘‘বার শত এক সাল বাঙ্গালার শেষে।
কিতাব মিলিল বুঝে বহুৎ কোশেশে।
করিনু শায়েবী পুথি আখেরী কেচ্ছার।
লেখা গেল শাহাদাৎ আমীর হামজার। -সৈয়দ হামজা।
২. এক-ই ভাবে মহাকবি আলাওলও তাঁর ‘সয়ফল মূল্ক-বদিউজ্জামাল’ -গ্রন্থকে পুথি ব’লে লিখেছেন Ñ
‘‘সমাপ্ত না হৈতে পুথি তিনি পরলোক।
কতকাল মানতে আছিল মহা শোক॥’’

এরকম আরও নজীর দেয়া যায়। এ সব তথ্য থেকে দেখা যায়Ñ সেকালে মুছলমানÑঅমুছলমান নির্বিশেষে সব কবিই তাঁদের রচনাকে ‘পুথি’ বলে পরিচয় দিতেন।
এছাড়া, হাতে লেখা পুস্তক-পুস্তিকাকেও পুথি বলা হ’ত। কারণ কোলকাতায় ব্রিটিশ আমলে ছাপাখানার প্রতিষ্ঠা না হওয়া তকÑ সকল পুথিই হাতে লেখা হত; নকল করে এক জনের পুথি অন্য জনে নিয়ে যেত। সেকালে পুথি নকলকারীদের ইজ্জৎও ছিল। পুথি নকল, চালু হবার পর, ঐ সব পুথি যখন ছাপা শুরু হলÑ তখন তাঁরা কেবল পান্ডুলিপি বা হাতে লেখা পুস্তক-পুস্তিকাকেই পুথি বলত না; ছাপা বইকেও পুথি বলত। তবে, মুছলিম সমাজে বহুকাল থেকে পুথির বদলে কেতাব বা কিতাব শব্দটি চালু ছিল। আর হিন্দু সমাজে পুথির বদল ঘটেÑ পুস্তক ও গ্রন্থে। ছোট হ’লে পুস্তক-পুস্তিকা, আর বড় হলে গ্রন্থ। অন্যদিকে, মুছলমানদের কেতাব আজও কেতাবই আছে। উচ্চ শিক্ষিত মুছলমানরা ঐ সব কিতাবকে সেই পুরনো পুথি নামেই ডাকেন। কেতাব বা গ্রন্থ নামে নয়।

২. বটতলার পুথি
মুছলিম আমল, ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তানী আমল ও বাঙলাদেশী আমলে দেশীয় ট্র্যাডিশনাল ধারায় শিক্ষিত জনগণ, যাকে ‘কেতাব’ বা ‘শায়েবী কেতাব’ ব’লতেন; তাই ১৯-২০ শতকের নুতন শিক্ষিতরা বটতলার পুথিনামে ডাকতে থাকেন। সে ধারা আজ তক অব্যাহত থাকায় পুথিসাহিত্যের পরিচয় দাঁড়িয়েছেÑ বটতলার সাহিত্য বা বটতলার পুথি। পুথির সাথে পরিচয়হীন আধুনিক পাঠকরা অবশ্য জানে না, কেন একে বটতলার পুথি বলা হয়। একালে বাঙালায় এম, এ, পাস শিক্ষিতরাও যে, বটতলায় পুথি বা শায়েরী কেতাব চেনে না, তা তাঁদের সাথে আলাপ করলে জানা যায়।

বলা দরকার যে, ‘বটতলা’ কোলকাতার একটি জায়গার নাম। আমাদের ঢাকায় যেমন ‘কলাবাগান’, ‘কাঠাল বাগান’, ‘শ্যাওড়াপাড়া’, ‘গাবতলা’ বা ‘গাবতলী’ আছে; তেমনি কোলকাতায়ও আছে ‘বটতলা’, ‘বেলতলা’ ইত্যাদি। সেই ‘বটতলা’ এলাকাটি উত্তর কোলকাতায়। এ জায়গার ভৌগোলিক পরিচয় দিতে গিয়ে বিনয় ঘোষ লিখেছেনÑ ‘‘শোনা যায়, বৌবাজারের এক অশ্বত্থগাছের তলা ছিল চার্নক সাহেব ও অন্যান্য বণিকদের বিশ্রাম নেবার বৈঠকখানা। বাজারের কাছে, শিয়ালদহ বৌবাজারে মোড়ের মাথায় এই অশ্বত্থের ছায়ায় বসে জব-চার্নক কয়েকটি গ্রামকে কলকাতা শহরে পরিণত করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই অশ্বত্থগাছটা আজ নেই কিন্তু বৈঠকখানা নামটা রয়েছে এবং তার সঙ্গে অক্ষুণœ রয়েছে এই অঞ্চলে সেই ঐতিহাসিক বাণিজ্য-ধারা।

বৌবাজারের এই অশ^ত্থগাছের মতন সেকালে কোলকাতায় আর একটি বিখ্যাত বটগাছ ছিল শোভা বাজারে। বাঙলাদেশের অনেক দীর্ঘায়ু বটগাছের মতন, শোভাবাজারে বটগাছেরও একটা বাঁধানো চাতাল ছিল। সেই বাঁধানো বটতলায় কবি-গানের আসর জমত প্রায়ই। নিধু বাবুর টপ্পা সুরে বটতলার পরিপার্শ্ব সরগরম হয়ে উঠত। শুধু তাই নয়, ছাপার অক্ষরে নব যুগের বাঙালীর সাহিত্য সাধনার উদ্বোধনও হয়Ñ এই বটতলার আশপাশের ছাপাখানায়। বিনয় ঘোষ বটতলার পরিচয় দিতে গিয়ে আরও লিখেছেনÑ
‘‘নির্দিষ্ট সীমারেখায় ঘেরা বটতলার কোন মানচিত্র নেই, কোন ইতিহাস বা গেজেটিয়ারও নেই। বাঙালীর সংস্কৃতি জীবনের এক ঐতিহাসিক যুগ-সন্ধিক্ষণের অন্যতম লীলাকেন্দ্র বটতলা; চিরদিনই শিক্ষিতের উপেক্ষিতা। নির্বিচার অবজ্ঞার বাণবিদ্ধ বটতলা, সাহিত্যের আবর্জনা-স্তুপে সমাধিস্থ। কে তাকে খুঁজে বের করবে? চিৎপুরের আশেপাশের অলিতে-গলিতে, আহিরিটোলায়, দর্জিপাড়ায়, জোড়া-সাঁকোয়, গরানহাটায়, জোড়-বাগানে, চোরবাগানে, বড় বাজারে, শোভাবাজারে। শুধু তাই কেন? শিয়ালদহ, মীর্জাপুর, কলুটোলা, কসাইটোলা, বৌবাজার, জানবাজার, ঠিক বটতলার ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে না পড়লেও সাহিত্যিক সীমানার মধ্যে নিশ্চয় পড়ে। মির্জাপুরে ‘সম্বাদ তিমির নাশক প্রেস’ ও মুনশী হেদাতল্লার (হেদায়েৎ উল্লাহÑ বর্তমান লেখক) প্রেস এবং শিয়ালদহের পীতাম্বর সেনের ‘সিদ্ধযন্ত্র’ থেকেই বটতলার যুগের সূচনা হয়নি কী? সুতরাং বটতলা শুধু তার ভৌগোলিক সীমারেখাতেই আবদ্ধ ছিল না, চিৎপুর রোড থেকে সার্কুলার রোড এবং আরও অনেক দূর পর্যন্ত তার বিস্তার ছিল।’’

সাম্প্রতিক কালে, ‘বটতলা’ নামক বইয়ে বটতলার পরিচয় দিতে গিয়ে শ্রীপান্থ লিখেছেনÑ ‘‘বটতলা এখন উত্তর কোলকাতার একটি থানার নাম। আর নির্বাচনী পরবের সময় একটি বিধান সভা-কেন্দ্রের । অথচ নিমতলায় যেমন একটি নিমগাছ ছিল, তেমনই শোভা বাজার চিৎপুর এলাকায় একদিন সত্য সত্যই ছিল এক বিশাল বটগাছ। বটতালার বেসাতি নিয় একালে যাঁরা বিশেষভাবে আগ্রহভরে সন্ধান করেছেন, ভেবেছেন, লিখেছেন, তাদের অগ্রগণ্য সুকুমার সেন।’’
ড. সুকুমার সেন এর রচনা থেকে বটতলার যে সব খুঁটিনাটি উল্লেখ শ্রীপান্থ করেছেনÑ তা থেকে জানা যায়Ñ ‘বটতলা’ শোভাবাজারে। বটগাছটির গোড়া শান বাঁধানো ছিল। সে কথা কবি আজাহার আলীর ‘দেলবর গোলে রওশন’ থেকেও জানা যায়। কবি ঐ কেতাবে লিখেছেনÑ
‘‘মধু রস কথা ভাই জানিবে তাহাতে।
বান্ধা বটতলার তারে দিয়েছি ছাপিতে ॥’’
মুছলিম মুছান্নেফ (লেখক) ও শায়েরদেও (কবি) একাধিক কেতাবে এই বটগাছটির তলা যে, চিৎপুর রোডের পাশে ছিল, তার উল্লেখ পাওয়া যায়।
৩. ভৌগোলিক বটতলা ও সাহিত্যের বটতলা।
এছাড়া, বলা আবশ্যক ভৌগোলিক বটতলা আর সাহিত্যের বটতলার যে বিশেষ পরিচয় বিনয় ঘোষ উল্লেখ করেছেন তাতে তিনি গোটা কোলকাতা শহরকেই সেকালের সাহিত্যিক বটতলার আওতাভুক্ত করেছেন। এ ব্যাপারে আরও বাড়িয়ে শ্রীপান্থ বলেছেনÑ ‘‘বস্তুতঃ শুধু কলকাতা কেন, মনে হয় বটতলা রসে বুঝি সমগ্র বাঙলা মুলুক প্লাবিত। ঢাকা ছাপাখানার মুখ দেখে কলকাতার অনেক পরে, ১৮৬০ সালে। শুধু ঢাকায় নয়, ছাপাখানা ক্রমে ছড়িয়ে পড়ে অন্যত্রও। কলকাতার বাইরে ছাপাখানা বলতে (তখন) বর্ধমান, হুগলি আর হাওড়ার কটি; আর পূর্ব বঙ্গে সবে ধন রংপুরে ‘বার্তাবহ-যন্ত্রণালয়’। বর্ধমানের তিন-তিনটি ছাপাখানায় অবশ্য তখন বটতলার হাওয়া লাগেনি। কিন্তু পরিস্থিতি ক্রমে পাল্টে যায়। (এখান থেকে) একাধিক কাব্য রচিত হয়েছে বিদ্যাসুন্দরের ছায়া অনুসরণে। তাছাড়া ‘হাতেম তাই’, ‘চাহার দরবেশ’ও ছিল। তাছাড়া উনিশ শতকের মাঝামাঝি বটতলার অন্যতম জনপ্রিয় বই ‘যোজন গন্ধার’ লেখক বনয়ারী লাল রায় ছিলেন বর্ধমান রাজ মাহতাব চন্দ বাহাদুরের আশ্রিত। …আবদুস সামাদ যে আখ্যাপত্র উদ্ধার করেছেন তা থেকে বোঝা যায় ‘যোজন গন্ধা’ সর্বার্থে বটতলার-ই বই।’’
বটগাছের উত্তর পাশে ছিলÑ চিৎপুর রোড। নিকটেই ছিলÑ রাজা নবকৃষ্ণের রাজবাড়ী। বটগাছের দক্ষিণের এলাকায় কেবল বই-কিতাব ছাপা হত না; বিকিকিনিও হত। তার মানে, এখানে ছাপাখানা আর বই কেনাবেচার দোকান দুই-ই ছিল।
অতএব, সেকালে চিৎপুর রোডের পাশে দাঁড়ানো শোভাবাজারে এই শান বাঁধা বটগাছের আশেপাশের প্রেসে বড় বড় হরফে ছাপা চিকণ-মোটা নানা কিছিমের বাঙালা বই কেতাবকেই বলা হতÑ পুথি।
মুছলিম পুথি ও হিন্দু পুথি
সে পুথি ছিল দুই রকমের। মুছলিম পুথি ও হিন্দু পুথি। মুছলিম পুথিকে মুছলমানরা বলতেন ‘কিতাব’ বা ‘শায়েরী’ কিতাব। মুছলিম কবিরা ‘পুথি’ নামেও নিজেদের রচনার পরিচয় দিতেন। হিন্দুরাও তাঁদের পুথিকে বলতেনÑ ‘পুথি’, ‘পোথা’ ইত্যাদি। পরে এই ‘পুথি’, বা ‘পোথা’Ñ ‘গ্রন্থ’ ও ‘পুস্তক-পুস্তিকা’ নামে পরিচিত হয়। কিন্তু মুছলিম কিতাব পুথিÑ পুথিই থেকে যায়। তা আগেই বলা হয়েছে।
আধুনিক কালে অনেকে ‘পুথি’ বলতে ছোটখাট কিতাবকেই বুঝে থাকেন। যেমনÑ ‘জৈগুণের পুথি’, ‘সোনাভানের পুথি’, ‘হাসেম কাজীর পুুথি’ ওগয়রহ (ইত্যাদি)। কিন্তু বটতলার মুছলিম লেখকগণ কেবল চটি পুথি কিতাবই লিখতেন না। তাঁরা দেড় দুই হাজার পৃষ্ঠায় গ্রন্থ-কিতাবও লিখেছেন এবং ছেপেছেন। সে সব কিতাবের কোন কোনটা পঞ্চাশ বালাম (খন্ড) এ লেখা এবং ছাপা হয়েছে। এরকম সব কিতাব আধুনিক পরিভাষায় অনায়াসে ‘গ্রš’’ নামে অবিহিত হওয়ার যোগ্য। কিন্তু সেই সমাদর মুছলিম কাব্য মহাকাব্যগুলোকে দেয়া হয়নি। সুকুমার সেন, বিনয় ঘোষ, শ্রীপান্থ Ñবটতলার পুথি-কিতাবের আলোচনা করতে দু’চারখানা মুছলিম পুথির নাম উল্লেখ করেছেন ঠিকই; কিন্তু যে সব বিশাল বিশাল মুছলিম পুথি কিতাবের দেখা আজও পাওয়া যায়, তার কোনটারই নাম পরিচয়ের বিবরণ দেননি। আমাদের দেশের পুথি গবেষকগণও ঐ সব পুথির গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা কিংবা মূল্যায়ন করেননি।

বতটতলা বনাম বেলতলাÑ
চিৎপুর রোড বনাম কলেজ স্ট্রীট
উপরিউক্ত তুলনাটি করেছেন বিনয় ঘোষ। তিনি তাঁর কলকাতা কালচার বইয়ে বটতলার অবদান আর বেলতলার অবদানের মধ্যে তুলনা কালে লিখেছেনÑ ‘‘কলেজ স্ট্রীট ও আজকের বটতলার মধ্যে আসলে ক্রস্-কাজিনের সম্পর্ক থাকলেও তাদের মধ্যে মুখ দেখাদেখি নেই। বিশ্ববিদ্যালয়াশ্রিত কলেজ স্ট্রীট অঞ্চলে কালচার অভিযান আজ সমুদ্যত। তার কাছে বটতলা আজ অবজ্ঞাত। যে কোন কুৎসিত সাহিত্য ও কদর্য ছাপা গ্রন্থকে আজ কলেজ স্ট্রীটের কালচার বাগীশরা ‘বটতলার সাহিত্য’ বলে বিদ্রƒপ করে থাকেন। কিন্তু কলেজ স্কোয়ার অঞ্চলের হরেক রকমের যৌন-সাহিত্য ও পত্রিকাদির দিকে চেয়ে বটতলা শুধু মুচকি হাসে, বোবার মতন চুপ করে থাকে, কোন উত্তর দেয় না। কলেজ স্ট্রীট থেকে বটতলা বেশী দূর নয়, কিন্তু মানসিক দূরত্বটা আজ অনেক বেশী। কলকাতার মধ্যবিত্ত কালচারের স্তরে স্তরে অনেক পলেস্তারা জমেছে, তার-ই তলার স্তরে বটতলা, উপরের স্তরে বর্তমান কলেজ স্ট্রীট। কলেজ স্ট্রীট যে বটতলারই বংশধর। আজও তার প্রমাণ পাওয়া যায়। বটতলা তাই শুধু বিদ্রƒপের পাত্র নয়, তার একটা ইতিহাস আছে এবং একটা বিশেষ কালে সাহিত্যের ইতিহাসে তার একটা ভূমিকাও আছে। বিদ্রƒপ করবার আগে কলেজ স্ট্রীটের ‘কালচার্ড’দের সেটা জানা উচিত নয় কি?’’

তারপর বিনয় ঘোষ লিখেছেন- ‘‘একালের বেলতলা আর সেকালের বটতলার মধ্যে লেখক প্রকাশক সম্পর্ক স্থাপনে পার্থক্য এইখানে যে, বেলতলার প্রকাশকদের কথা লেখকরা নেহাৎ অন্নের দায়ে ভদ্রতার খাতিরে উল্লেখ করেন, কিন্তু বটতলার লেখকরা শুধু সেই কারণে করতেন না। বটতলার লেখক ও প্রকাশকদের বাণিজ্যিক সম্পর্কের মধ্যে একটা মানবিক সম্পর্ক ছিল, আজকের বেলতলার প্রকাশকদের সে কথা মধ্যে মধ্যে মনে করা উচিত।’’
বিনয় ঘোষ আলোচনা করে দেখিয়েছেন যেÑ ‘‘বাংলাদেশের ইতিহাসে বটতলার ছাপাখানা একটা রোমান্টিক অধ্যায় জুড়ে আছে। ঊনবিশং শতাব্দীর গোড়া থেকেই বটতলার (সাহিত্যের) অভিযান শুরু হয়েছে বলা চলে।’’ বিনয় ঘোষ স্থানান্তরে বলেছেন Ñ ‘‘মীর্জাপুরের ‘সম্বাদতিমিরনাশক প্রেস ও মুন্সী হেদাতুল্লাহর (হেদায়েৎ উল্লাহ) প্রেস এবং শিয়ালদহের পীতাম্বর সেনের ‘সিন্ধুযন্ত্র’ থেকেই বটতলার যুগের সূচনা হয়নি কি?’’ তা যে হয়েছে Ñ সে বিষয়ে একমত না হয়ে উপায় নেই। তবে, তা হল মুদ্রন যন্ত্রের যুগের কথা। কলমী যুগের সূচনা তারও অনেক আগে।
বিনয় ঘোষ আরও জানিয়েছেন, ‘‘১৮১৮ থেকে ১৮২০ সালের মধ্যে বটতলায় অন্ততঃ চারটি প্রেস চালু ছিল। সেগুলো হল ‘হিন্দুস্থানী প্রেস’, ‘বাঙ্গালী প্রেস’, ‘সংস্কৃত প্রেস’ ও ‘বিশ্বনাথের প্রেস’। এসব প্রেসে প্রথম পঞ্চাশ বা ষাট বছরে মোট কত কিছিমের কত পুথি ফি-বছর ছাপা হয়েছে, তা আজ আর জানার উপায় নেই।

৫. বটতলার প্রকাশক
তাই সে বিষয়ে কল্পনাজাল না বিছিয়ে বটতলার প্রকাশকদের যে সব অবদানের কথা বিনয় ঘোষ আলোচনা করেছেন তার উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি বটতলার ছাপাখানার কথা বলতে গিয়ে লিখেছেনÑ ‘‘বাঙালীর সংস্কৃতির ইতিহাসে বটতলার প্রকাশকদের একটা অবিস্মরণীয় দান আছে। তা হলÑ ‘‘এই প্রকাশকদের চেষ্টাতেই বাংলা ছাপা বইয়ের দাম ক্রমে আশাতীত পরিমাণে কমে যায়, মাত্র পঁচিশ-তিরিশি বছরের মধ্যে। প্রথমে বই ছাপা অত্যন্ত দুরূহ ব্যাপার ছিল, ছাপাতে খরচ পড়তে যথেষ্ট, এবং দামও ছিল বেশী। পরে বটতলার প্রকাশকদের অক্লান্ত চেষ্টায় বাংলা ছাপা বইয়ের দাম অনেক কমে যায় এবং তা বাংলার ঘরে ঘরে হাজার হাজার বাঙালী পাঠক-পাঠিকার হাতে পৌঁছয়। কয়েকটা তার দৃষ্টান্ত দিচ্ছি। মুকুন্দরামের ‘চন্ডীমঙ্গল কাব্য’ বিশ্বনাথ দেবের প্রেসে যখন ছাপা হয় ১৮২৩ সালে, তখন তার দাম ছিল ছয় টাকা, পরে ১৮৫৬ সালে যখন কমলালয় প্রেসে ছাপা হয় তখন দাম হয় মাত্র এক টাকা। কালিদাস কবিরাজের ‘বেতালপঞ্চবিংশতি’ সমাচার চন্দ্রিকা প্রেসে ছাপা (১৮৩১ সালে), দাম দু’টাকা, পরে সুধাসিন্ধু প্রেসে ছাপা (১৮৫৬ সালে), দাম চার আনা মাত্র। কৃত্তিবাসের ‘আধিপূর্ব’ রামকৃষ্ণ মলিকের প্রেসে ছাপা (১৮৩১ সালে), দাম তিন টাকা, সুধাসিন্ধু প্রেসে ছাপা (১৮৫৬ সালে), দাম মাত্র দুই আনা। পরবতীকালে অন্যান্য গাছতলার অনেক প্রকাশক প্রথমে সুলভে বই ছাপার কৃতিত্ব অর্জন করেছেন, কিন্তু বটতলার প্রকাশকরা সবার আগে সকলের পথপ্রদর্শক। এইদিকে দিয়ে বিচার করলে বটতলার প্রকাশকদের-ই বাংলাদেশের প্রথম গণতান্ত্রিক প্রকাশক বলা চলে। বটতলার দৌলতেই বাংলা সাহিত্য প্রথম বাঙালীর কাছে লোকপ্রিয় হয়ে ওঠে।’’
দাম কমানোর এরকম আরও নজীর দিয়েছেনÑ শ্রীপান্থ।

৬. বটতলার ফেরিওয়ালা
বটতলার প্রকাশকরা ছাপা বইয়ের দাম কমানো ছাড়াও, তাঁরা সারা দেশে বই ছড়িয়ে দেবার কোশেশও ক’রেছিলেন। তাঁরা একাজে বই কেনাবেচার একটা সহজ উপায় বের করেন। তাহলÑ বই কেনাবেচা কেবল দোকান কেন্দ্রিক না করে; তাঁরা বই ফেরিওয়ালাÑ দল তৈরি করেন। এ সব বই ফেরিওয়ালা কেবল শহরেই নয়; গ্রামীণ এলাকায়ও বই কেতাব বহন করে নিয়ে যেত। ফলে, শুধু শহরের লোকে নয়; গ্রামের লোকের কাছেও বটতলার পুথি কেতাব সহজ প্রাপ্য ছিল। তারা মেলায় মেলায় ঘুরেও পুথি বিক্রি করত। এ বিষয়ে বিনয় ঘোষ লিখেছেনÑ ‘‘এছাড়া বটতলার প্রকাশকদের ভ্রাম্যমাণ সেলস্মান বা ক্যানভাসারও ছিল। আধুনিক বিজ্ঞাপনের কায়দা কানুন তাঁরা জানতেন না, সামান্য যে দু’চারখানা পত্রিকা ছিল তার পাঠকসংখ্যাও এত অল্প ছিল যে, তাতে বিজ্ঞাপন দিলে বিশেষ কাজও হত না তাই বটতলার প্রকাশকরা ক্যানভাসারের উপরেই নির্ভর করতেন বেশী। বইয়ের বোঁচকা কাঁধে করে, ক্যানভাসাররা শহরে ও গ্রামে ঘুরে ঘুরে বেড়াতেন। গ্রাম্য মেলাগুলিও তখন আজকের মতন অবনতি হয়নি। বটতলার পুস্তক-ক্যানভাসাররা এই গ্রাম্য মেলায় ঘুরে ঘুরে বই বিক্রি ও প্রচার করতেন। তাঁদের রোজগারও নেহাৎ কম ছিল না। লঙ সাহেব একজন ক্যানভাসারের কথা বলেছেনÑ যাঁর রোজগার ছিল মাসে প্রায় শতাধিক টাকা।’’
এ তরফে বিনয় ঘোষ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কথাটি বলেছেন, তাহ’ল ‘‘আজকের বাসন কোসনের ফেরীওয়ালাদের মত সে কালে পুথি কেতাবের ফেরি ওয়ালারাও গ্রামে গ্রামে বই-কেতাব ফেরি করবার সময় এই ক্যানভাসাররা সস্তা দামে এবং নতুন বইয়ের বিনিময়ে অনেক মুল্যবান পুথি সংগ্রহ করে এনেছেন, যা অনেক অনুসন্ধানী স্কলাররা পরবর্তীকালে করতে পারেন নি। বটতলার প্রকাশকরা না থাকলে তাঁদের ক্যানভাসারদের মাধ্যমে এত বড় মূল্যবান কাজটা হয়ত কোনদিনই করা হত না এবং অনেক পুঁথি চালের বাতায় গোঁজা থেকে নষ্ট হয়ে যেত। বাংলা সাহিত্যের প্রতি বটতলার প্রকাশক ও ক্যানভাসারদের এই যে আন্তরিক দরদ ছিল, কলেজ স্ট্রীটে আজ তা ক’জনের আছে?’’
এছাড়া কবি মুন্সী মোহাম্মদ খাতেরের লেখা থেকে জানা যায়, সেকালে আমাদের এদেশ থেকেও পুথি ব্যবসায়ীরা/ফেরিওয়ালারা কোলকাতায় গিয়ে বটতলা থেকে পুথি কিনে আনতেন। তাঁরা পুথির কবিদের সাথেও যোগাযোগ রাখতেন। অনুরোধ জানাতেন নুতন কেতাব লেখার, নুতন কাহিনী শোনাবার। কবি খাতেরের অতি মশহুর ও বিশাল জনপ্রিয় বই ‘বোন বিবীর জহুরানামা’ এমনি একখানি গণমুখী তাগাছার ফসল। কবি সেকথা জানিয়ে লিখেছেনÑ
‘‘পূর্বদেশ বাদাবন সেথা হৈতে লোকজন
আইসে যারা কেতাব লইতে
হামেসা খায়েস রাখে জেদ করে কহে মোকে
এই পুথি রচনা করিতে
কহে সকলেতে ইহা বোন বিবীর কেচ্ছা যাহা
বিরচিয়া ছাপ যদি ভাই।।
সে হইলে দেশে দেশে পুথি মোরা অনায়াসে
সকলেতে ঘরে বৈসে পাই।
শুনিয়া এ্যাছাই কথা দেলেতে পাইয়া ব্যথা
ভেবে শুনে আখেরে তখন।।
বোন বিবি কেচ্ছা যাহা আওয়াল আখেরে তাহা
একে একে কৈনু বিরচন।’’
এ বয়ান থেকে স্পষ্ট জানা যায়, এসব কেতাব কেননেওয়ালারা (বিক্রেতা) কেবল তেজারতিই (ব্যবসা) করতেন না পুথি সাহিত্যের বিকাশেও মদদ দিতেন। বটতলার শায়েরদের জোগাতেন নানা লোকপ্রিয় কেচ্ছা-কাহিনি, ইতিহাস, জীবনী ওগয়রহ (ইত্যাদি)।
এসব বিষয়েও কলেজ স্ট্রীটের চেয়েও চিৎপুর রোড, তথা বেলতলার চেয়ে বটতলার অবদানই অধিক গুরুত্বপূর্ণ। তা অকপটে বলেছেন বিনয় ঘোষ।

৭. জাতীয় ঐতিহ্য ও বটতলা
এতিহ্যের সাথে যোগাযোগ রক্ষার সেতুবন্ধন হিসেবে বটতলার অবদান সাহিত্যের ইতিহাসে কতখানি, তা বোঝাতে গিয়ে শ্রীপান্থও লিখেছেনÑ ‘‘বটতলার সরস্বতীকে আহ্বান করে একটু বিদ্রুপ করার পর থেকে অনেক সাহিত্য ঘোড়ছওয়ার বটতলার নামে নাক সিঁটকে থাকেন। বলি, ও ঠাকুর! কোথায় থাকত তোমার বাঙ্গালা বিদ্যা, বাঙ্গালা সাহিত্য, ভাষা, বাঙ্গালা গদ্য-পদ্য যদি না চোদ্দ আনায় বিকুত বটতলার বাঙ্গালা মহাভারত, বাঙ্গালা রামায়ণ?’’ Ñপ্রশ্ন তুলেছিলেন অমৃত লাল বসু। প্রশ্নটি অবমত্র। তুচ্ছ করার মত নয়। তার অর্থÑ ওঁদের মতেÑ বটতলার সাহিত্য, আধুনিক বাঙালা বিদ্যা, বাঙালা ভাষা, বাঙালা সাহিত্য ও বাঙ্গালা গদ্য-পদ্যের ভিত্তি রচনা ক’রেছে। সেই ভিত্তির ওপরই দাঁড়িয়ে আছে নুতন রঙে, নতুন রুপে নতুন রসে ‘আধুনিক’ নামধেয় বাঙালা ভাষা ও সাহিত্য।
বলা দরকার, বটতলা থেকে কেবল ঐতিহ্যের অঙ্গীকার রূপে ‘রামায়ণÑ মহাভারত’ই ছাপা হয়নি। তার সাথে ‘তাজকেরাতুল আউলিয়া’, ‘কাছাছোল আম্বিয়া, ‘দাস্তানে আমীর হামজা, ‘সাহা নামা’ ওগয়রহের মত মহা মহা মহাকাব্যগুলোও ছাপা হয়েছে। কিন্তু সে সব বইয়ের উল্লেখ কোন অমুছলিম আলোচক-গবেষক, পুথির আলোচনায় একবারও করেননি। বিনয় ঘোষও নয়। তার মানে, তাঁরা হিন্দুদের তরফ থেকে বটতলার অবদান বিচার করেছেন। মুছলমানদের কথা মনে আনেননি।

৮. পুথি-প্রকাশকদের আপদ-বিপদ
বিনয় বাবু বটতলার লেখক প্রকাশকদের আরও যে দু’একটি অবদানের উল্লেখ করেছেন তা হলÑ ‘‘আমলের কবি লেখকরা প্রকাশকদের আন্তরিক তারিফ করতেন। বটতলার প্রকাশকদের অনেক ঝক্কি-ঝামেলা সহ্য করে বই প্রকাশ করতে হত।’’
এ ঝক্কি ঝামেলার কিছু বিবরণ তখনকার দিনের শ্রেষ্ঠ প্রকাশক কাজী সফিউদ্দীনের রচনা থেকে পাওয়া যায়। তিনি ছিলেন হুগলী জেলার বন্দীপুরের আদিবাসী এবং একজন আয়মাদার। তাঁর পরিচয় দিয়ে কবি আশরাফ উদ্দীন কাছাছোল আম্বিয়ার আখেরী অংশে লিখেছেনÑ
‘‘আর এ কেতাব যিনি করান তৈয়ার।
কাজি সফিউদ্দিন নাম জানিবে তাহার।
তাহাকে করিবে দোত্তা যত মোছলমান।
বন্দিপুর আছে যার কছিমি মকান
হুগলি জেলার তাকে বসতি তাহার
আউওল আসরাফ তিনি ছালে নেককার।
কবেন আয়মাদারি লিখিনু খবর
রাজি যেন রহে আল্লাহ তাহার উপর।’’
এ থেকে জানা যায়, এ পরিবারটি বহিরাগত এবং শরীফ খানদানের । সে জন্যে তাকে আউওল আসরাফ বলা হয়েছে। হয়তো আরবদেশ থেকে আগত ইমাম হাছানের নছর ভুক্ত কাজী সফিউদ্দিনের পূর্বপুরুষ মুছলিম আমলে হুগলীর সরকার নিযুক্ত ছিলেন। সে কারণেই তাঁকে সরকারী কাজী (বিচারক) পদের বেতনের বদলে আয়মাদারি (ভূমিস্বত্ব) দেওয়া হয়। বর্ধমানের কাজী নজরুল ইসলামের খানদানও ছিলেন এ রকম একঘর ‘আয়মাদার’।
ব্রিটিশ আমলে এসব অভিজাত বা বনেদী কাজী পরিবার ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে, তাদের জমি-জমার পরিমাণ খুব কমে যায়। পরিবারগুলো বাধ্য হয়, নানা পেশায় ঝুঁকে পড়তে। হুগলীর এ কাজী পরিবারটিও তাই আয়মাদারির পেশায় আর আসেনি। কুলতেপেরে পুস্তক প্রকাশনায় লেগে যায়। কাজী সফিউদ্দিন নিজেও কবি ছিলেন। তাই অন্য কবিদের দিয়ে আলোচ্য ‘কাছাছোল আম্বিয়া’ রচনা করলেও কয়েকটি বালাম (খন্ড) এর শুরুতে নিজের কথায় কবিতায় জুড়ে দিয়েছেন। তাতে নিজের পরিচয় এভাবে দিয়েছেনÑ
ক. ‘‘আমি কাজি সফিউদ্দি তেছরা জেলেদ যদি
ছাপাতে হইনু তৈয়ার’’
খ. ‘‘হীন সফিউদ্দিন বলে রছুলের পাও তলে॥
আকবতে নবিজি কান্ডার’’
গ. ‘‘আমি হীন সফিউদ্দি খায়েস করিয়া॥
ছাপাইনু এই কেচ্ছা দিনের লাগিয়া।’’
ঘ. ‘‘কাজি সফিউদ্দি বলে কি বলিব আর॥
আঁকবতে জানা যাবে দরবারে আল্লাহর।’’
ঙ. ‘‘হিন সফিউদ্দি বলে মমিনের পাওতলে॥
দোত্তা মুঝে দিবে সবে ভাই’’।
কাজী সাহেব এর কেতাবে নিজের বেশি পরিচয় দেননি। তবে তাঁর বিষয়ে জিয়াদা খবর পাওয়া যায়। আলোচ্য ‘কাছাছোল আম্বিয়া’র অপর কবি মুনসী রেজাউল্লøার বিবরণী থেকে। কাছাছোল আম্বিয়ার পহেল জেলেদের কবি রেজাউল্লাহ, ‘শায়েরের কালাম ও কেতাব তরজমা করার বয়ান’Ñএ কাজী সফিউদ্দিনের পরিচয় দিতে লিখেছেনÑ
‘‘আর এক দোস্তদার বন্দিপুরে ঘর।।
হুগলি জেলার বিচে জান বেরাদর।
কাজি সফিউদ্দি নাম বড়া হোসমন্দ।
কাজি ছেলেরদ্দি তিনি জানহ ফরজন্দ।’’
মরহুম কাজীর পরিচয় দিতে এ কেতাবের অপর কবি মুনসী আমির উদ্দিন লিখেছেনÑ
‘‘কাজি সফিউদ্দিন নামে নেক মুছলমান।
নেহাএত দোস্তদার বড় মেহেরবান।
হুগিল জেলার বিচে বন্দিপুরে ঘর।
বড় হোসমন্দ মর্দ্দ খুব নামুঅর
কাজি ছেলেবদ্দি নামে ওয়ালেদ তাহার।
কাজী আমির উল্লাহর নাম দাদার তাহার।
এ থেকে কবির তিন পুরুষের পরিচয পাওয়া যায়। কাজী সফিউদ্দিনের ওয়ালেদ (পিতা) কাজী দেলেরুদ্দিন এবং তাঁর ওয়ালেদ কাজী আমির উল্লাহ।
এ বিষয়ে খ্যাতিমান ইজ্জৎদার আয়মাদার কাজীজী ‘কাছাছোল আম্বিয়া’র পহেলা জেলেদ ছাপাবার সময় বিপাকে পড়েন। এলাকার একদল বদলোক (হয়তো এগালা/ আত্মীয়) বা শরীকদার তাঁকে বসতবাড়ী থেকে উচ্ছেদের কোশেশ করে। ফলে, মরহুম কাজীজী তাদের রুখতে মামলা মোকদ্দমায় জড়িয়ে পড়েন। এতে এ কেতাব ছাপার কাজ বন্ধ হয়ে যায়। মোকদ্দমা অন্তে কবি আবার কেতাব ছাপার কাজ শুরু করেন।
এ বিষয়ে দোছরা জেলেদ রচনা কালে, ‘সায়েবের নাম ও কেতাব সায়েরি করার বয়ান’-এ কবি আমির উদ্দিন লিখেনÑ
‘‘দুছরা জেলেদ ফের ছাপিবার তরে ॥
শুন ভাই দের হইয়া গেল যে খাতেরে।
কাজির মিরাছ বাড়ি ছিল বন্দিপুরে ॥
কেহ তাহা ফোরেবেতে চাহে লইবারে।
ফেরেবি মামলা পেশ নাহক করিল ॥
তাহার ছববে মর্দ্দ পেরেশান ছিল।
তার বিচে সায়েরের ওফাত হইল ॥
এই দুই ছববেতে দেরি হইয়া গেল।
কেতাব ছাপিতে নাহি গাফেলি তাহার ॥
নাগেহানি হরকতে ছিলেন লাচার।’‘
সিরাছ বাড়ী হল পুরুষানুক্রমেÑ বসবাস করা বাড়ী। কাজী আমির উদ্দিনের কথায় জানা যায়Ñ দুই কারণে (ছববে) দোছরা জেলেদ লেখা ও ছাপা হতে দেরী হয়। তার একটা কারণ মূল কবি মুনসী রেজাউল্লাহর ইনতেকাল। অপরটা বসত বাড়ী নিয়ে মামলা। কাজীজী মামলায় জিতে ফের কেতাব লেখানো ও ছাপানোর কাজে মন দেন।
কিন্তু মামলায় হেরে গিয়ে বাদীর তরফ, আপীল করে। ফলে কাজীজীকে আবার ঝামেলায় পড়তে হয়। কেতাব ছাপানো বন্ধ রাখতে হয়। সেসব কথা, কাজী সফিউদ্দিন আলোচ্য কেতাবের তেছরা জেলেদের শুরুতে নিজেই লিখেছেন বলেছেনÑ
‘‘আমি কাজি সফিউদ্দি তেছরা জেলেদ যদি
ছাপাইতে হইনু তৈয়ার ॥
এয়ছা ওক্ত দাগা দিল ফের তাতে দের হইল
শুন কিছু তাহার বয়ান ॥
দোছরা জেলেদ বিচে যেই জাত লেখা আছে
সেই দাগাবাজ বৈইমান ॥
সাইদান সাজাইয়া দলিলাত বানাইয়া
জালসাজি ফেরেব করিয়া ॥
আমার যে ঘরবাড়ী লইবাররে চাহে কাড়ি
জুয়াচুরি দাগায় ডালিয়া
আল্লাহর মেহের ছিল অধিনের ফতে হইল
বেইমান পড়ে ফাফরেতে ॥
আপিলে করিয়া তার দাগা দিলে দাগাদার
ফেরদ্দের হইল তাহাতে ॥’’
এখনেই শেষ নয়। কাজী সফিউদ্দিন যখন বাধার পর বাধা ডিঙিয়ে কেতাবখানি জেলেদ-ব-জেলেদ ছেপে চলেছেন; তখন আর একজন এ কেতাবের মালিকানা দাবী করেন। তিনি কাজীজীকে আলোচ্য কেতাব ছাপার কাজেও বাধা দেন। কেতাবের মালিকানা ছিনিয়ে নেবারও কোশেশ করেন। সে বিষয়ে কাজী সফিউদ্দিন ‘মাসম কালাম’- এর দিবাচায় লিখেছেনÑ
‘‘আমি কজি সফিউদ্দি নেকির খাতিরে যদি
ছাপাইতে হইনু তৈয়ার।
ইবলিছের দাঙ্গা হইতে নাম সেরা ছেনাইতে
একজন কোমর বান্দিল।
দাগাবাজের দাগা হইতে একবারে ছাপাইতে
লাচরিতে পারা নাহি গেল।
আমি হিন গোনাগারে আল্লার মেহের পরে।
বদকার হইয়া গেল জের ॥
দুস্মন হইয়াছে জের ছাপা শুরু হইল ফের
এ কারণে হইল যে দের ॥
আল্লাহর মেহের হইতে এইবার ছাপাইতে
ছারাবাত হইল তামাম ॥
অধিনের দিবে দোত্তা আল্লাতালাত করে রওা
হয় দিনদুনিয়র কাম ॥’’
হয়তো এরপরÑ কাজীজীকে বই ছাপতে আর কোন ঝামেলা পোহাতে হয়নি।

৯. পুথির মাগন ঠাকুরদের পরিচয় ও কবিদের মদদগারির রূপ
পহেলা, উপরে কথিত ‘কাছাছোল আম্বিয়া’র কথাই ধরা যাক। এ কেতাবের মুল কবি মুনসী রেজাউল্লা, তাঁর ‘সায়রের কালামা’ এ লিখেছেনÑ
‘‘হাসেসা আমার ছেলে করে এ পয়গাম।
করহ সায়ের কিছু কেতাব কালাম ॥
মোদাম দুনিয়ার কামে মসগুল হইয়া।
নাহক সামায় সব দেও গোঙাইয়া ॥
কত কিছু কেচ্ছা আর কালাম এয় ছাই।
শুনিতে সওক করে সওকিন সবাই ॥
যাহাতে ফায়দা হয় লোকের খাতের।
কিসেতে হইবে ভাল আউয়ল আখের ॥
মনের খাহেস তার আছিনু তাল্লাসে।
করি কোন কেচ্ছা আমি বাঙালার ভাসে ॥
কহিলেন পরে মুকে বহুত লোকেতে।
কাছাছেল আম্বিয়া কর রচনা বাঙালাতে ॥
লোকেতে খাহেস বড় করেন তাহার।
হইবে ফায়েদা এতে মুমিন সবার ॥
আর এক দোস্ত মেরা বন্দ্পিুরে ঘর।
হুগলি জেলার বিচে জান বেরাদর ॥
কাজি সফিউদ্দিন নাম বড় হোসমন্দ।
কাজি দেলেরদ্দিন তিনি জানহ ফরজন্দ ॥
জরুরি করিয়া তিনি কহিল আমায়।
আম্বিয়া লোকের কেচ্ছা কর বাঙালায় ॥
শুনিয়া তাদের কথা হইলো মুঝে ভারি।
আমি অতি মুর্খ করি কিরূপে সায়েরি ॥
ভাবি মনে আল্লাহ বিনে নাই মদদগার ।
যেবা যাহা ঢোড়ে তারে দেয় পরত্তার ॥
সেই ভরসাতে আমিও ক্ষেত্র রাখিয়া।
সমুদ্দুরে দিনু ঝাপ কমর বান্দিয়া ॥
মতি হাথড়িয়া হার গাথিতে লাগিনু।
কাছাছোল আম্বিয়া নাম হাবের রাখিনু ॥’’
এ থকে জানা যায়, কবির আপন ইচ্ছাকে বাস্তবে রূপ দেয়া সম্ভব হয়Ñ জনগণের অনুরোধ ও দোস্ত পর কেতাব প্রকাশক কাজী সফিউদ্দিনের জরুরী তাকিদে। তারপর এ কেতাবের পরবর্তী কবি মুনসী আমির উদ্দীন ও তাঁর কেতাব ‘সায়েরি করার বয়ান এ লিখেছেÑ
‘‘আখেরে হইল এই এরাদা আমার ॥
দিনের কালাম কিছু লিখিবার তরে।
ফায়েদা যাহাতে খেলে যত দিনদারে ॥
ছেলেতে খেয়াল এয়ছা করি যে বসিয়া।
বলিলেন একদিন আমাকে আসিয়া ॥
কাজি সফিউদ্দিন নামে নেক মুছলমান।
নেহাএত দোস্তদার বড় মেহেরবান ॥’’
‘‘কাজি সফিউদ্দিন এই শহর বিচেতে ॥
অনেক কেতাব ছাপাইলেন ভ্রাতে।
পরে আর এই কেচ্ছা কাছাছোল আম্বিয়ার॥
ছাপাইতে কোমর বান্ধিল নেককার ।
মুনসী রেজাউল্লাহ নামে বড় কবিকার ॥
পহেলা জেলেদ কেচ্ছা সায়েরি তাহার ।
আউয়াল জেলেদ তিনি সায়েরি করিয়া ॥
জান্নাত নছিব হৈলে ওফাত পাইয়া।
বাকি যাহা ছিলো তাহা সাইরি করিতে ॥
বলিলেন কাজীজী আমার খাতিরেতে।
তাহার কথায় হইল খাহেস আমায় ॥
লিখিতে করিনু শুরু এইত কেচ্ছায়।’’
কবির এ বিবরণ থেকে বোঝা যায় কাজীজী অতিশয় মান্যমান লোক হয়েও তিনি কবির বাড়ীতে গিয়ে এ-কেতাব পুরোপুরি লেখাবার জন্যে তাকে অনুরোধ করেন। আর সে অনুরোধের ফলে-ই কবি আমিরুদ্দীন ‘কাছাছোল আম্বিয়া’র বাকি অংশ রচনায় হাত দেন। এ যেন দৌলত কাজীরÑ ‘সতীময়না’র পরেকার কবি, মহাকবি আলাওলকে খুঁজে পায়া। আলোচ্য কাব্য অবশ্য কবি আমির উদ্দীনও শেষ করতে পারেন নি। তাই কাজীকে (মরহুম) ‘কাছাছোল আম্বিয়া’র বাকি অংশ লিখতে পারে এমন আরও একজন মহকবিকে খুঁজে বেড়াতে হয়। তা তিনি পেয়েও যান।
তাঁর নাম মুনসী আসরফ উদ্দীন। তাঁর সায়েরী হপ্তম (সপ্তম) কালাম থেকে শুরু । তিনি কিভাবে এ কেতাব রচনায় হাত দেনÑ সে বিষয়ে খুব অল্প কথাই লিখেছেন। বলেছনÑ
‘‘আর একেতাব যিনি করান তৈয়ার
কাজি সফিউদ্দিন নাম জানিবে তাহার ॥
…………………………………..
বহুতি মেহনতি এই কেতাবে করিল।
করিয়া বহুল খরচা ছাপাইয়া দিল ॥
…………………………………..
লিখিব কতেক আমি তারিফ তাহার।
সায়েরি করিনু আমি খাতেরে যাহার ॥’’

যাহোক, এভাবে নানা প্রতিকূল খেলায়, লড়াই করে কাজী সফিউদ্দীন ৫৬৮ পৃষ্ঠায় সমাপ্ত ‘কাছাছোল আম্বিয়া’ প্রকাশ করেন। আর তিন জন কবি তার অনুরোধে একাজের আনজাম দিতে এগিয়ে আসেন। এদের মধ্যে মুনসী রেজাউল্লাহ ছিলেন হুগলী জেলার চৌমাহা পরগনার মিঞাবেড় গ্রামের অধিবাসী। আর মুনসী আমির উদ্দীন ও আসরাফ উদ্দীনের বসবাস ছিল কোলকাতার কড়েয়ায়।
কাজী সফিউদ্দীন ছড়া সেকালে কোলকাতার চিৎপুরে আর একজন কেতাব প্রকাশক ছিলেন। ঢাকা জেলার ষোলই গড়পাড়ার অধিবাসী মুনসী তাজদ্দিন। তিনিও নিজে কবি ছিলেন। তাজদ্দিনও ৫০ বালামে সব থেকে বড় একখানি ‘কাছাছোল আম্বিয়’া প্রকাশ করেন। এর পহেলা বালাম তিনি নিজেই লেখেন। লেখার কারণ জানতে তাজউদ্দিন মরহুম তার ‘সায়েরের আরজ’এ বলেছনÑ
‘‘কহে হীন কবিকার জনাবে সবার ॥
কেচ্ছা লিখিবার ইচ্ছা না ছিল আমার।
কিন্তু এই জামানার দেখিতেছিÑরিত ॥
কেচ্ছা কাহিনীতে লোক সদা আনন্দিত।
কেননা আমার দোস্তদার যতজন ॥
হাসেসা করেন জেদ কেচ্ছার কারণ ।
কি করি বেহুদা কেচ্ছা লিখিতে বারণ ॥
না লিখিলে দোস্তাদের রুষ্ট হয় মন ।
বিধি মতে তাহাদের মন রাখা চাই ॥
কি কেচ্ছা লিখিব সদা মনে ভাবি তাই।
আখেরে দেলেতে আমি ভাবিয়া বিস্তর ॥
কেতাব পাইনু এক বড়া মাতব্বর।
কাছাছোল আম্বিয়া যে কেতাবের নাম ॥
নবি সকলের কথা যাহাতে তামাম।
সেই কেতাবের আমি করিতে সাইর ॥
কলম ধরিনু যে নামেতে এলাহির ।’’

এ বয়ান থেকে জানা যায় কবি মুনসী তাজদ্দিন, তাঁর দোস্তাদের অনুরোধে অনুপ্রাণিত হয়েই এ বিশাল মহাকাব্য রচনায় হাত দেন। কিন্তু তিনি একাব্যের পঞ্চম বালাম শেষ করার পর বাকি অংশ রচনার ভার দেন কবি মোহাম্মদ খাতেরকে। এ বিষয়ে সসম (৬ষ্ঠ) বালামের ভূমিকার এক জায়গায় কবি খাতের (মরহুম) লিখেছেনÑ
‘গুণ ফের সকলেতে জাহার খাহেস হৈতে
এই কেচ্ছা করি জে রচন ॥
পড়িয়া সুনিয়া সবে সদা তারে দোত্তা দিবে
আল্লাহ জাতে রাখে খুসি মন ॥
নেক বক্ত নেক কার ছাখাওতি দেল তার
মুহাম্মদ তাজদ্দিন নাম ॥
ঢাকা জেলার বিচে তাহার বসতী আছে
গড়পাড়া নামে জে মকাম ॥
লোকের ফায়দার তরে বহুত মেহনত করে
ছাপালেন হরেক কেতাব ॥
এবাসনা তার মনে জাতে সব লোক জনে
নেক রাহা পাছালে সেতাব ॥
তাহার মা বাপ আর জত কেহু হকদার
ভাই বন্দু এগানা বেগানা ॥
দোত্তা দিও জনে জনে হেথা সেথা দোজাহানে
ভাল করে এলাহি রব্বানা ॥
এভাবে প্রকাশক মুনসী তাজদ্দিনের অনুরোধে কবি মোহাম্মদ খাতের আলোচ্য মহাকাব্যের ৪৬ বালামের কিছু অংশ অবধি রচনা করেন। বাকি অংশ লেখেন অপর কবি মুনসী আবদুল ওহাব। তিনি কিভাবে, কেন এ কাজে হাত দেন, তা অবশ্য লেখেননি।
প্রকাশক মুনসী তাজদ্দিন ‘ফুতুহশ্বাষ ও মেছের’ নামে একখানি ইতিহাসও তরজমা করিয়ে প্রকাশ করার কোশেশ করেন। একাজে তিনি মুনসী আজিমদ্দিন মরহুমকে অনুপ্রেরণা দেন। কবি আজিমুদ্দিনের ‘সায়েরের কালাম’ পাওয়া যায়নি। কারণ প্রাপ্ত কেতাব খানি আদি-অন্তে খন্ডিত। মোট চার খন্ডে (জেলেদ) সমাপ্ত একেতাবের ৩৪৮ পৃষ্ঠায় ছাপা বিজ্ঞাপন থেকে জানা যায়Ñ
মুনসী তাজদ্দিন মুহাম্মাদ ছাহেব মুনসী আজিমদ্দিন ছাহেবকে দিয়ে ‘ফুতুহশ্বাস’ কেতাবের পহেলা উরদু থেকে বাঙালায় তরজামা করে ছাপান। কিন্তু সে কেতাব (পুরোটা রচনার আগেই কবির ওফাত হবার ফলে) আসমাপ্ত থাকায় (তাজউদ্দিন এর জামাতা মুনসী) মফিউদ্দিন আহমদ, মুনসী জোনাব আলী মরহুমকে দিয়ে দোছরা  জেলেদ তরজমা করিয়ে অনেক মেহনতে কেতাবখানা ছাপেন। এরপর, মরহুম আফাজউদ্দিন তার মন্তব্যে লিখেছেন- ‘‘এই ‘ফুতুহশ্বাস’ এর দোছরা জেলেদ মুনসী জোনাব আলী ছাহেবকে দিয়ে মুনসী মফিউদ্দিন আহমদ ছাহেব তরজমা করিয়ে দুবার ছাপিয়ে ইন্তেকাল করেন। এখন আমি এ কেতাবের তেছরা জেলেদ মুনসী মুহাম্মদ মুছা ছাহেবকে দিয়ে রচনা (তরজমা) করিয়ে বহু অর্থ ব্যয়ে ছাপালাম।’’ এ বিষয়ে কাব জোনাব আলী লিখেছেনÑ
‘‘তার পরে শুন ভাই খতেক এছলাম ॥
ফুতুহÑশ্বাসেতে আছে যেচাই কালাম।
নবির ওফাত বাদে ছিদ্দিক আকবর ॥
রুম আর শ্বাসে দিল ভেজিয়ে লস্কর ।
ওয়াকাদি রহমতুল্লাহ আরব্বি ভাষাতে ॥
লিখিয়াছিলেন খুব তহকিকের সাথে।
তাহা বাদে হিন্দুস্তানে হিন্দুতে হইল ॥
মুনসী আজিমুদ্দি তাহা বাঙ্গালা করিল ।
মুনসী তাজদ্দিন মহাম্মদ নেক নাম ॥
ছাপায়া দিয়ছিল পহেলা বালাম ।
ওফাত পাইল তিনি হুকুমে খোদার ॥
মুনসী মফিজদ্দি নামে দামাদ তেনার ।
বার বার জেদ করে তরজমা করিতে ॥
রচনা করিয়া দেহ ছলিছের সাথে।
কি করি তাহার কথা এড়াতে না পারি ॥
দোছরা জেলেদ একে করি যে সায়েরী ।’’

একেতাবের তেছরা জেলেদ (বালমা) খতম হবার পর ছাপা পহেলা বিজ্ঞাপন এ হাজী আফাজদ্দিন আহমদ লিখেছেনÑ ‘‘এই ফতুহ শ্বাসের দোছরা ও তেছরা জেলেদ মুনসী জোনাবালি (মরহুম) ছাহেবকে দিয়ে তরজমা করিয়ে আমার ভাই মুনসী মফিজদ্দিন আহমদ (মরহুম) দুবার ছেপে ইন্তেকাল করেন। তারপর, এ কেতাব আর ছাপা হয়নি। (চলবে)

লেখক : সাবেক চেয়ারম্যান,
বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়

SHARE

Leave a Reply