ফারাক্কা ও তিস্তা বাঁধ ভারত-বাংলাদেশ কারো জন্যই লাভজনক নয় -জালাল উদ্দিন ওমর

খোদ ভারতেই এবার ফারাক্কা বাঁধের বিরুদ্ধে কথা উঠেছে। ব্যাপারটা অবাক করার মতো হলেও শতভাগ সত্যি। বিহারের তিন তিনবারের নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী জনাব নীতিশ কুমার গত ২৩ আগস্ট ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে সাক্ষাৎ করে ফারাক্কা বাঁধ স্থায়ীভাবে ভেঙে দেয়ার দাবি জানিয়েছেন এবং তৎক্ষণাৎ ফারাক্কা বাঁধের সব গেট খুলে দেয়ার দাবি জানান। তিনি বিহারের বন্যা পরিস্থিতির জন্য সরাসরি ফারাক্কা বাঁধকে দায়ী করেন। বিহারের মুখ্যমন্ত্রীর দাবির প্রেক্ষিতে ভারত সরকার ইতোমধ্যেই ফারাক্কা বাঁধের অধিকাংশ গেট খুলে দিয়েছে। মোট ১০৪টি গেটের মধ্যে ৯৫টি গেটই খুলে দিয়েছে বলে খবরে প্রকাশ। নরেন্দ্র মোদির সাথে সাক্ষাৎ করে নীতিশ কুমারের ফারাক্কা বাঁধ স্থায়ীভাবে ভেঙে দেয়া এবং তৎক্ষণাৎ ফারাক্কা বাঁধের সব গেট খুলে দেয়ার দাবি মুহূর্তেই মিডিয়া জগতে ছড়িয়ে পড়ে। এ খবরটি বাংলাদেশের জনগণের মুখে মুখে আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়। কারণ বাংলাদেশের জনগণের বিরাট একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে ভারত কর্তৃক গঙ্গা নদীর ওপর ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণকে বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর বললেও, অপর অংশ এই অভিযোগকে কখনই গুরুত্ব দেয়নি। বরং ফারাক্কা বাঁধের বিরোধিতাকে ভারতবিরোধিতা হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। কিন্তু ফারাক্কা বাঁধ চালুর ৪২ বছর পর আজ স্বয়ং ভারতের রাজনীতিবিদরা যখন ফারাক্কা বাঁধ ভেঙে দেয়া এবং এর গেটগুলো স্থায়ীভাবে খুলে দেয়ার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে দাবি জানায় এবং সেই দাবি অনুযায়ী সাথে সাথে ভারত সরকার যখন ফারাক্কা বাঁধের গেটগুলো খুলে দেয়, তখন ফারাক্কা বাঁধ যে একটি ক্ষতিকর প্রকল্প তা বুঝতে আর কারো বাকি থাকার কথা নয়। মূলতপক্ষে এই ফারাক্কা বাঁধ ভারত এবং বাংলাদেশ কারো জন্যই কোনো লাভজনক প্রজেক্ট নয়। ফারাক্কা বাঁধের কারণে এতদঞ্চল এতদিন কেবল ক্ষতিগ্রস্তই হয়েছে। এই বাঁধের কারণে বাংলাদেশ যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ঠিক তেমনি ভারতও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর দীর্ঘদিন যাবৎ যারা ফারাক্কা বাঁধের বিরোধিতা করেছিল আজ তাদের দাবির সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে। একইভাবে ফারাক্কা বাঁধের বিরোধিতাকে যারা ভারত বিরোধিতা বলে অভিহিত করেছিল, তাদের সেই অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। আজ ফারাক্কা বাঁধের বিরোধিতা করার জন্য আর বাংলাদেশের জনগণের প্রয়োজন নেই। আর ফারাক্কা বাঁধের পক্ষে কথা বলার মতো কোনো যুক্তিও এর স্বপক্ষের লোকদের নেই। সুতরাং এখন উচিত ভারত-বাংলাদেশের যৌথ কল্যাণের স্বার্থে ফারাক্কা বাঁধকে স্থায়ীভাবে ভেঙে ফেলা। এটাই বাস্তবতা এবং এতেই উভয় দেশের কল্যাণ নিহিত রয়েছে।
কলকাতা বন্দর ছিল ব্রিটিশ ভারতের সবচেয়ে বড় বন্দর। হুগলি নদী থেকে বয়ে আসা বিপুল পরিমাণ পলি বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে ব্যাহত করে। নাব্যতা বজায় রাখতে গঙ্গা নদীতে ব্যারাজ নির্মাণ করে বিকল্প খাল দিয়ে গঙ্গার পানিকে হুগলি নদীতে প্রবাহিত করা শুরু হয়। গঙ্গা নদীর ওপর নির্মিত এই বাঁধই ফারাক্কা বাঁধ নামে পরিচিত। ভারত সরকার ১৯৫১ সালে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করে। ১৯৬১ সালে ফারাক্কা বাঁধের নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং ১৯৭৪ সালে এসে এর নির্মাণকাজ শেষ হয়। ১৯৭৪ সালে ভারত পরীক্ষামূলকভাবে ফারাক্কা বাঁধ চালু করে। ফারাক্কা বাঁধের কারণে তখন থেকেই গঙ্গার স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রিত হয়ে যায়। ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর থেকেই এই বাঁধের উজান এবং ভাটিতে অবস্থিত অঞ্চলে পরিবেশগত বিপর্যয় শুরু হয়। এই বাঁধের উজানে বিস্তীর্ণ এলাকায় পলি জমার কারণে প্রতি বছর বন্যা হয় আর ভাটির অঞ্চলে পানির অভাবে খরা হয়। পশ্চিমবঙ্গের মালদহ এবং মুর্শিদাবাদ জেলায় ব্যাপক নদীভাঙন হয় এবং বিশাল জনগোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিহার প্রদেশে প্রতি বছরই ব্যাপক বন্যা হয়। বছরের পর বছর ধরেই এ অবস্থা চলে আসছে। সময়ের সাথে সাথে বিহারের বন্যা বৃদ্ধি পায়। আর ভাটিতে অবস্থিত বাংলাদেশের রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্র্ণ এলাকাজুড়ে পানির অভাবে পরিবেশগত বিপর্যয় সৃষ্টি হয়। শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে ভারত পানি নিয়ন্ত্রণ করার কারণে পদ্মা নদীর বুকে চর আর চর জেগে ওঠে। অপর দিকে বর্ষা মৌসুমে পানি ছেড়ে দেয়ার কারণে সেই পানিতে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বন্যা হয়। ১৯৯৬ সালে গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী দেবগৌড়ার সাথে বাংলাদেশের তৎকালীন ও আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও ভারত কখনোই চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশকে পানি দেয়নি। ফলে ফারাক্কা বাঁধ বাংলাদেশের জন্য আজ মহা এক অভিশাপ হয়ে দেখা দিয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে (বাংলাদেশ) পর্যাপ্ত পানি না পাওয়ার কারণে বাংলাদেশের ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রকৃতি, পরিবেশ, নদীপ্রবাহ, নৌ-যোগাযোগ, কৃষি, মৎস্য, অর্থনীতি এবং মানববসতি। হাজার হাজার হেক্টর জমিতে ফসল হয় না। ফলে কৃষকেরা সর্বস্বান্ত হন। বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলজুড়ে মরুপ্রক্রিয়া চলছে। এদিকে নদীতে পানি শুকিয়ে যাবার ফলে নদী তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমেই নিচে নেমে যাচ্ছে। ফলে নলকূপে পানি ওঠে না। পানির অভাবে রাজশাহীর বরেন্দ্র সেচ প্রকল্প আজ ধ্বংসের মুখোমুখি। এ পর্যন্ত শুধুমাত্র ফসল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ফলে অর্থনীতিতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা।
এ দিকে ফারাক্কা বাঁধের মতো তিস্তার ভারতীয় অংশে ভারত কর্তৃক বাঁধ দেয়ার কারণে বাংলাদেশ শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা নদীতেও প্রয়োজনীয় পানি পায় না। ফলে গ্রীষ্মে তিস্তার বুকে ধূধূ বালুচর জেগে ওঠে। তিস্তায় প্রয়োজনীয় পানি না থাকায় কৃষকেরা কৃষিকাজ করতে পারেন না। এতে তিস্তা পাড়ের মানুষের জীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে এবং আর্থসামাজিকভাবে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। হাজার হাজার কৃষক এবং জেলে বেকার হয়ে পড়েন। বছরের পর বছর ধরে তিস্তার এই জীবনচিত্র চলে আসছে। তিস্তা হচ্ছে ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়া অভিন্ন ৫৪টি নদীর একটি।
৩৬৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে এ নদীর ২৪৯ কিলোমিটার পড়েছে ভারতে আর ১১৭ কিলোমিটার বাংলাদেশে। তিস্তা নদীর পানি অবলম্বনে ভারত এবং বাংলাদেশে বিরাট বিরাট সেচ প্রকল্প গড়ে উঠেছে বিভিন্ন সময়ে। তিস্তার পানি দিয়ে উভয় দেশে ১৯ লাখ ৬৩ হাজার হেক্টর জমিকে কৃষি প্রকল্পে আনা হয়। তন্মধ্যে ভারতে কৃষি প্রকল্পের পরিমাণ ১২ লাখ ১৪ হাজার হেক্টর জমি আর বাংলাদেশে ৭ লাখ ৪৯ হাজার হেক্টর। তিস্তার পানি দিয়ে ভারতের কৃষি প্রকল্পে ঠিকমত ফসল উৎপাদন হলেও, তিস্তার পানির অভাবে বাংলাদেশের কৃষি প্রকল্পে ঠিকমত ফসল উৎপাদন করা যায় না। ভারত কর্তৃক পশ্চিমবঙ্গের গজলডোবায় তিস্তা নদীতে ব্যারাজ নির্মাণ করার পর থেকে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তায় পানি কমে যায়। ২০১৬ সালের জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারি মাসে তিস্তার ডালিয়া পয়েন্টে প্রাপ্ত পানির পরিমাণ গজলডোবা ব্যারাজ নির্মাণের আগে ১৯৭৩-১৯৮৫ সময়কালের প্রাপ্ত পানির এক- তৃতীয়াংশ মাত্র। ডালিয়া পয়েন্টে ১৯৭৩-১৯৮৫ সময়কালে গড়ে জানুয়ারির প্রথম ১০ দিন, দ্বিতীয় ১০ দিন এবং তৃতীয় ১০ দিনে পানির প্রবাহ ছিল যথাক্রমে ৭০১০, ৬০১০ এবং ৫৬৬৮ কিউসেক। আর ২০১৬ সালের জানুয়ারির প্রথম ১০ দিন, দ্বিতীয় ১০ দিন এবং তৃতীয় ১০ দিনে ডালিয়া পয়েন্টে গড় পানিপ্রবাহ যথাক্রমে ২৩৮৪, ১৭৬০ এবং ১১৯০ কিউসেক মাত্র। সুতরাং ব্যবধানটা সহজেই অনুমেয়। ভারত কর্তৃক পানি প্রত্যাহার করায় নভেম্বরের শুরু থেকেই তিস্তায় পানি কমতে থাকে। আর এটা এপ্রিল পর্যন্ত চলে। অর্থাৎ আবার বর্ষা শুরুর আগ পর্যন্ত পুরো শুষ্ক মৌসুমেই তিস্তায় পানি থাকে না। এ কারণে বাংলাদেশ কখনই তার সেচ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারেনি এবং প্রত্যাশিত ফসল উৎপাদন করতে পারেনি। ২০১৩ সাল পর্যন্ত মাত্র ৬৫ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেয়া সম্ভব হয়েছে। ২০১৪ সালেও ৬৫ হাজার হেক্টর জমিতে কৃষিকাজ করা হয়েছিল। কিন্তু তিস্তায় পানি না থাকায় সেই ৬৫ হাজার হেক্টর জমিতে ফসল উৎপাদন করা যায়নি এবং কৃষকেরা ফসল ঘরে তুলতে পারেননি। ২০১৫ সালে লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ২০ হাজার হেক্টর জমিকে সেচ প্রকল্পের আওতায় আনা হলেও মাত্র ৮ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেয়া সম্ভব হয়েছে। এই অবস্থার কারণে ২০১৬ সালে মাত্র ৮ হাজার হেক্টর জমিকে সেচ প্রকল্পের আওতায় আনতে হয়েছে। এভাবে পানি না থাকায় শুধু কৃষকেরা প্রতি বছর একরপ্রতি লোকসান দিচ্ছেন আট হাজার টাকা। আর সেচ প্রকল্পের আওতায় আনা সাড়ে ৭ লাখ হেক্টর জমিতে কৃষিকাজ করতে না পারার কারণে প্রকল্পে মোট লোকসান হচ্ছে ১৪৮২ কোটি টাকা। বাংলাদেশ প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার মৎস্য সম্পদ হারাচ্ছে। হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত তিস্তা ব্যারাজ কোনো কাজে আসছে না। সেচ প্রকল্পের জন্য হাজার হাজার একর কৃষিজমিতে যে ক্যানেল করা হয়েছে তা পরিত্যক্ত হয়েছে। তিস্তায় পানি না থাকায় এ সংলগ্ন বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে পানির স্তর নিচে নেমে যায়। জীববৈচিত্র্য নষ্ট হয়ে যায়। এভাবে ভারত কর্তৃক তিস্তার পানি প্রত্যাহারের কারণে বাংলাদেশের মোট প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ কত তা হিসাবের বাইরে। এখন আবার ভারত সরকার বরাক নদীর টিপাইমুখে বাঁধ নির্মাণের জন্য উদ্যোগ নিয়েছে। এই বাঁধ নির্মিত হলে রাজশাহী এবং রংপুর অঞ্চলের মতো সিলেট অঞ্চলেও মরুপ্রক্রিয়া শুরু হবে এবং এই অঞ্চলের কৃষি, মৎস্য, অর্থনীতি এবং পরিবেশ সবই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বাংলাদেশ ভারতের মাঝে ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে। যেগুলোর উৎপত্তি ভারতে এবং ভারত হয়ে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়েছে। এই নদীসমূহের পানির ওপর ভারতের মতো বাংলাদেশেরও আইনসঙ্গত এবং ন্যায্য অধিকার রয়েছে। তাই ভারতের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে বলেই ভারত কিন্তু তার প্রয়োজন অনুসারে এবং ইচ্ছামত নদীর পানিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। এটা অভিন্ন নদীর পানিপ্রবাহ বণ্টনের জন্য আন্তর্জাতিক যে আইন কানুন এবং নিয়মনীতি রয়েছে তার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। অভিন্ন নদীর পানি ব্যবহারের জন্য আন্তর্জাতিক অনেক নীতিমালা রয়েছে। তার দু’টি এখানে উল্লেখ করছি। হেলসিংকি রুল ১৯৬৬ এ বলা হয়েছে- “অভিন্ন নদী বয়ে চলা প্রতিটি দেশকে নদীর পানি এমনভাবে ব্যবহার করতে হবে, যাতে তা অন্য কোন দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশকে বিঘিœত না করে। এবং তা ক্ষতিগ্রস্ত দেশে কি ক্ষতি বয়ে আনবে তা বিবেচনায় আনতে হবে।” ১৯৯৭ সালের ২১ মে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে গৃহীত ইউএন কনভেনশনের ৫ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছেÑ সর্বোচ্চ টেকসই ব্যবহার ও উপকারের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে পানিপ্রবাহ পর্যাপ্ত সংরক্ষণ নিশ্চিত করে অভিন্ন নদীপ্রবাহের দেশগুলো ন্যায্য ও যৌক্তিক উপায়ে পানি ব্যবহার করবে। এতে আরো বলা হয়েছে, পানিপ্রবাহের দেশগুলো আন্তর্জাতিক পানিপ্রবাহ ব্যবহার, উন্নয়ন ও সংরক্ষণের কাজে ন্যায্য ও যৌক্তিকতার ভিত্তিতে অংশ নেবে।” অথচ ভারত সরকার ইচ্ছামতো অভিন্ন নদীর পানিকে ব্যবহার করছে। ভারত সরকার কর্র্তৃক ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ এবং এই বাঁধের মাধ্যমে অভিন্ন নদীর পানি নিয়ন্ত্রণ আন্তর্জাতিক এসব নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। অভিন্ন নদীসমূহের পানি বণ্টনের জন্য ভারত-বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশন থাকলেও, ভারতের অনিচ্ছার কারণে দীর্ঘদিন যাবৎ (২০১০ সালের পর থেকে) এই নদী কমিশনের বৈঠক হয় না। কিন্তু এতে তো ভারতের কোনো ক্ষতি নেই। ক্ষতি যত সব বাংলাদেশেরই হচ্ছে। ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের পর থেকেই আজ অবধি বাংলাদেশের জনগণের বিরাট একটি অংশ এই ফারাক্কা বাঁধের বিরুদ্ধে কথা বলেছে এবং আন্দোলন করেছে। তারা ফারাক্কা বাঁধ বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর অভিহিত করে এই বাঁধকে চিরতরে ভেঙে দেয়ার দাবি জানিয়েছে।
মরহুম জননেতা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এই ফারাক্কা বাঁধের বিরুদ্ধে লংমার্চ করেছিলেন ১৯৭৬ সালের ১৬ মে। মওলানা ভাসানী এই ফারাক্কা লংমার্চ করেছিলেন। আজ সেই লংমার্চের চল্লিশ বছর পর এসে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী জনাব নীতিশ কুমার যখন ভারতের কেন্দ্রীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব নরেন্দ্র মোদির সাথে সাক্ষাৎ করে বিহারের বন্যার জন্য ফারাক্কা বাঁধকে দায়ী করে ফারাক্কা বাঁধের গেটগুলো খুলে দেয়ার দাবি তোলেন তখন নীতিশ কুমারের বক্তব্যের সাথে কোনো ধরনের দ্বিমত পোষণ না করে ভারত সরকার ফারাক্কা বাঁধের গেটগুলো খুলে দেয়।
এই মহাবিশ্বের কোনো কিছুই মানুষের হাতে সৃষ্ট নয়। সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র, আকাশ বাতাস, অক্সিজেন, আলো, পানি ভূখণ্ডে বসবাসরত হাজারো প্রাণী, আকাশে উড়ে বেড়ানো হাজারো পাখি, পানিতে বসবাসরত হাজারো মাছ, ভূখণ্ডের মাটি ভেদ করে আকাশের দিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা হাজারো গাছ পালা, পৃথিবীতে বিদ্যমান হাজারো পাহাড়-পর্বত, নদ-নদী এবং সাগর-মহাসাগর সকল কিছুই মহান আল্লাহর সৃষ্টি এবং মানুষের কল্যাণের জন্যই তিনি এসব সৃষ্টি করেছেন। তাই এ ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে (নদ- নদীর স্বাভাবিক গতিকে) প্রবহমান রাখা এবং জনমানুষের কল্যাণের বিষয়টা বিশেষ বিবেচনায় আনতে হবে। শুধু একটি দেশের সাময়িক স্বার্থের কথা ভাবলে চলবে না। এ ব্যাপারে ভারত সরকারের যথেষ্ট আন্তরিকতার অভাব। বার বার বাংলাদেশের সাথে ভারত যে চুক্তি করেছে সে ব্যাপারে কখনো কথা রাখেনি। বরং নিজেদের স্বার্থের বিষয়টিকে সবসময় গুরুত্ব দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ফারাক্কার বাঁধ স্থায়ীভাবে উন্মুক্ত করার জন্য জোরেশোরে কথা এসেছে। এ নিয়ে বাংলাদেশের জনগণ বহুবার আন্দোলন করেছে। এখন ভারতের মন্ত্রী এবং জনগণের পক্ষ থেকেও এই বাঁধটি ভেঙে ফেলার দাবি তুলেছে। আশা করি ভারত সরকার ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে এগিয়ে যাবে। শুধু ভারতের স্বার্থ নয়; বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থের দিকেও লক্ষ্য রাখবেন। সত্যিকারের বন্ধুত্বের পরিচয় দেবেন।
লেখক : প্রকৌশলী

SHARE