ফিরে দেখা ২৮ অক্টোবর আর কত সন্ত্রাস করলে আওয়ামী লীগকে জঙ্গি বলা যাবে? -ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম

Britannica READY REFERENCE ENCYCLOPEDIA-তে বলা হয়েছে-Terrorism Systematic use of violence to create a general climate of fear in a population and thereby to bring about a particular political objective. It has been used throughout history by political organizations of both the left and the right, by nationalist and ethnic groups, and by revolutionaries. Although usually thought of as a means of destabilizing or overthrowing existing political institutions, terror also has been employed by governments against their own people to suppress dissent; examples include the reigns of certain Roman emperors, the French Revolution (see REIGN OF TERROR), Nazi Germany, the Soviet Union under Stalin, and Argentina during the Òdirty war” of the 1970s.

আজ থেকে প্রায় ৯ বছর আগের কথা। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র পল্টন ময়দানে আওয়ামী-বামরা প্রকাশ্য দিবালোকে লগি-বৈঠা দিয়ে যে পৈশাচিক কায়দায় জীবন্ত মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করার পর লাশের ওপর নৃত্য করেছে তা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল! তাই ২৮ অক্টোবর অন্য দিনের মতো একটি দিন, একটি মাস, একটি বছর নয়। এটি একটি ঐতিহাসিক কালো অধ্যায়ের দিন। জাতীয় জীবনে একটি কলঙ্ক সংযোজনের দিন। এ দিন পল্টন হত্যা দিবস, মানবাধিকার ভূলুণ্ঠিত দিবস, লগি-বৈঠার তান্ডব দিবস, আওয়ামী বর্বরতার দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। নারী-শিশু নির্যাতনসহ এই রকম অনেক জঘন্য ঘটনার মাধ্যমে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের দরবারে একটি অসভ্য-বর্বর জাতি হিসেবে চিত্রিত করেছে।
যুগে যুগে ক্ষমতার লিপ্সা, ভূমি দখল, সম্পদ আহরণ, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ওপর আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে পূর্বেও হাজার হাজার মানুষ, নারী-শিশুকে হত্যা করে সভ্যতা ধ্বংস করেছে মানুষরূপী নরপশুরা। যেমন হিটলার, মুসোলিনি, চেঙ্গিস খান, হালাকু খান, তৈমুর লং, কুবলাই খান এরকম অনেক রক্তপিপাসু খুনির নামের সাথে শেখ হাসিনার নামটিও আজ স্থান করে নিয়েছে।
ইতিহাসের কালো অধ্যায় জুড়ে যেমনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ক্রসেড (ত্রিপলি), ভারত-পাকিস্তান দাঙ্গা, মধ্য আফ্রিকায় (মুসলিম গণহত্যা), আফ্রিকায় উপজাতি দাঙ্গা, ইন্দোনেশিয়া গণহত্যা, সোমালিয়ায় গণহত্যা, চায়না কমিউনিস্ট বিপ্লব, সিরিয়া গণহত্যা, কম্বোডিয়া (খেসারু হত্যা), বসনিয়া-চেচনিয়া মুসলিম হত্যা, মিয়ানমার মুসলিম গণহত্যা, ইরাক, আফগান হত্যা, লেনিন (কমিউনিস্ট বিপ্লব), স্ট্যালিন (কমিউনিস্ট বিপ্লব) হিরোশিমা নাগাসাকি, ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি ’০৯ বিডিআর হত্যাযজ্ঞ, ২৫ মার্চের কালো রাত্রি, এপ্রিল ফুল দিবসের ঘটনাসমূহ আমাদের স্মৃতিতে এক বীভৎস চিত্র হয়ে ভেসে ওঠে, ঠিক তেমনি শত বছর পরও ২৮ অক্টোবরকে স্মরণ করলে শিউরে উঠবে মানুষের শরীর, বাকরুদ্ধ হবে তার বিবেক, অমানবিকতার কথা মনে করে কেঁদে উঠবে মানুষের হৃদয়। অভিশপ্তদের ঘৃণা করবে বিশ্বমানবতা শতাব্দীর পর শতাব্দী।
পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর। ২৮ অক্টোবর মানবতার বিরুদ্ধে যে জঘন্য ইতিহাস দিয়ে আওয়ামী লীগ-বামরা যাত্রা শুরু করেছে, এখনো প্রতিদিন নতুন নতুন অপরাধ করছে তারা। অপরাধের মাত্রা দিন দিন ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করছে। টাঈাইলে ছেলের সামনে মাকে বিবস্ত্র করে নির্যাতন! প্রতিদিন নারী-শিশু নির্যাতন! জাতিকে ভাবিয়ে তুলছে। ভয়াবহ নির্যাতন থেকে বাদ যায়নি ছাত্রী-শিক্ষিকা, অন্তঃসত্ত্বা নারী, গৃহবধূ, মানবাধিকার নেত্রী, গার্মেন্টশ্রমিক, বিদেশী পর্যটক, আইনজীবী, সাংবাধিক, আদিবাসী এবং নারী-পুলিশ। সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার পর্দানশিন নারীরা। রেহাই পাননি অন্তঃসত্ত্বা নারী, দুগ্ধপান করা শিশু, পরীক্ষার্থী কেউই। এই সরকার নিজ দলের ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্তদের খালাস দেয়, আর আটকিয়ে রাখে এই সব পর্দানশিন দ্বীনদার নারীদের। হায়রে! আইনের শাসন। হায়রে! বিচারের নামে প্রহসন!। কত অমানবিক! কত জঘন্য আর কত ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে এ সরকার!! আওয়ামী লীগের শাসন আজ আইয়্যামে জাহিলিয়াতকেও হার মানাতে বসছে। ৯০% মুসলমানের দেশেও আজ কুরআন শরিফ পড়া, ইসলামিক বই রাখা, নামাজ পড়া, ইসলামী অনুশাসন মেনে চলা আর বোরকা পরা-ই কি একমাত্র অপরাধ? আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ আজ যেন নিজেরাই অপরাধ, জঘন্য, হিংস্র, পৈশাচিক, মানবতাবিরোধী অপকর্মের আবিষ্কারক!
মূলত রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি যখন দুর্বল হয়ে পড়ে তখন শাসন করার সৎ সাহসটুকুও শাসকদের আর থাকে না। ফলে সমাজের সর্বত্র অরাজকতা, অমানবিকতা, হিং¯্রতা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। রাষ্ট্র ধীরে ধীরে অপরাধ রোধ করার শক্তি হারিয়ে ফেলে। বাংলাদেশ এখন সেই ভয়ঙ্কর সময়টি অতিক্রম করছে। মূলত বিগত ৫ জানুয়ারির অনির্বাচিত সরকারের মানুষকে শাসন করার নৈতিক ভিত্তি এখন আর অবশিষ্ট নেই। সকল ক্ষেত্রেই ‘অ’ অক্ষর যোগ করলেই যেন শাসকগোষ্ঠীর আসল পরিচয় মেলে। এই সরকার অগণতান্ত্রিক, অনির্বাচিত, অনৈতিক ও অবৈধ। তাই তাদের কর্মকান্ডের মাঝেও যেন অপদার্থের নিশানাই বেশি!
আজ মনে হ্েচ্ছ আমরা স্বাধীন একটি ভূখন্ড পেয়েছি বটে। কিন্তু পাইনি স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের গ্যারান্টি। নাগরিক পাচ্ছে না স্বাধীনভাবে কথা বলার অধিকার। জান-মাল, ইজ্জত, আবরুর নিরাপত্তা এখানে ভূলুণ্ঠিত! আমরা পাইনি প্রকৃত গণতন্ত্র। আমরা এখন যেন নিজ দেশেই বন্দী। দুর্নীতি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, হত্যা লুটপাট আর বিরোধী দল দমনে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে দমন-নিপীড়ন, গুম, খুন, গণহত্যা আর মানবাধিকার লঙ্ঘনে সরকার দেশে-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনার মুখোমুখি। কাঁটাতারের বেড়ায় ফেলানীদের লাশের করুণ চাহনি আমাদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে, আমরা কি আসলে স্বাধীন? প্রতিবেশী রাষ্ট্র হাঙ্গরের মতো এদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতির ওপর আধিপত্য বিস্তার করার মাধ্যমে হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব।
ছাত্রলীগের নখরে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ছাত্রসমাজ ও আমাদের প্রিয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ছাত্রলীগের হিংস্রতা, জঘন্যতা, পৈশাচিক, ভয়ঙ্কর দানবীয়, লুটপাট, জ্বালাও-পোড়াও, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ছিনতাই, সিট দখল, হল দখল ও নারীনির্যাতন, শিক্ষক লাঞ্ছনা, অস্ত্রবাজির আরেক নাম ছাত্রলীগের রাজনীতি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও সন্ত্রাসের রাজত্ব আর শিক্ষাব্যবস্থার হ-য-ব-র-ল অবস্থা লাখ লাখ মেধাবী ছাত্রের শিক্ষাজীবন হুমকির মুখে। আওয়ামী শাসনামলে সকল পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস! আর বিরোধীদের ফাঁসির মহোৎসব চলছে!!
আকাশে বাতাসে লাশ আর বারুদের গন্ধ! হাসপাতালের বেডে আহতের আর্তচিৎকার, গুম, খুন, গণহত্যা এখন শেখ হাসিনার রক্তপিপাসু হায়েনাদের কাছে অতি সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। রিমান্ডে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করে চিরদিনের জন্য পঙ্গু করে দেয়া হচ্ছে অনেককে। হাত, পা, চোখ হারাদের সংখ্যা এখন শত সজশ্য
কিন্তু এখন বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থা হিটলার ও মুসোলিনির অক্ষশক্তির নৃশংসতা ও বর্বর কর্মকান্ডকেও যেন হার মানাতে বসেছে। জুলুম-নির্যাতন, লুণ্ঠন, রাহাজানি অক্টোপাসের মতো গোটা জাতিকে ঘিরে ফেলেছে। প্রতিদিন কত মানুষ জীবন দিচ্ছে তার কোনো হিসাব এখন কেউই যেন রাখতে পারছে না। সর্বত্র আহাজারি আর কান্নার আওয়াজ বাংলার আকাশ-বাতাসকে ভারী করে তুলছে।
পৃথিবীর বিভিন্ন পার্লামেন্টে এখন বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপর ডিবেট হচ্ছে। বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি এখন টক অব দ্য ওয়ার্ল্ড। ২৮ অক্টোবরের লগি-বৈঠাধারীদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট মামলা থাকলেও তা রাজনৈতিক বিবেচনায় বাদ দেয়ার উদ্যোগ সরকারের নব্য বাকশালী চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ। ২৮ অক্টোবর সংঘটিত এই নৃশংস ঘটনা নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে অনেক বক্তৃতা বিবৃতি, বুকলেট, প্রতিবাদ, সিডি, ভিসিডি ও ওয়েবসাইট খোলাসহ নানা ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। আজকের লেখাটি তারই এই ক্ষুদ্র প্রয়াস। সেদিন ঘটনার শুরু যেভাবে-
আজ থেকে প্রায় ৯ বছর আগের কথা। অথচ মনে হচ্ছে এইতো সেদিনের কথা। ২৮ অক্টোরর চারদলীয় জোট সরকারের ক্ষমতার পাঁচ বছর বর্ষপূর্তির দিন। ক্ষমতা হস্তান্তরের এ দিনে বায়তুল মোকাররম উত্তর গেটে আয়োজন করা হয়েছে জনসভার। উল্লেখ্য, ২৭ অক্টোরর থেকেই সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে বেশ কয়েকজনকে হত্যা করে। ২৮ অক্টোবর সকাল ১০টা। ইসলামী ছাত্রশিবিরের পল্টনস্থ কেন্দ্র্রীয় কার্যালয়ে কেন্দ্রীয় সভাপতিসহ আমরা কয়েকজন উপস্থিত। হঠাৎ গেটের সামনে চিৎকার শোনা গেল। বেরিয়ে দেখি একজন ভাইকে রিকশায় করে রক্তাক্ত অবস্থায় নিয়ে আসা হচ্ছে, তার মাথায় এমনভাবে আঘাত করা হয়েছে, মাথার এক পাশ ঝুলছে! দেখে শরীর শিউরে উঠেছে!। কেন্দ্রীয় সভাপতিসহ আমরা কয়েকজন সামনের দিকে এগিয়ে গেলাম। দেখছি অনবরত আহত ও রক্তাক্ত ভাইয়েরা আসছেন। গ্র্যান্ড আজাদ হোটেলের সামনে কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে করণীয় ঠিক করা হলো। আহত ভাইদের সারি আস্তে আস্তে দীর্ঘ হচ্ছে। আর সহ্য করা যায় না। আমরা কয়েকজন পল্টন মসজিদের গলির দিকে এগিয়ে গেলাম। এগিয়ে দেখি সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মজিবুর রহমান মন্জু ভাইকে আহত অবস্থায় নিয়ে আসছে। আওয়ামী সন্ত্রাসীরা তার ওপর লগি-বৈঠার আক্রমণ চালিয়ে জর্জরিত করেছে সারাটি দেহ।
এ দৃশ্য দেখতে না দেখতে জড়িয়ে পড়লাম পরিস্থিতি মোকাবেলায়। পল্টন মসজিদের গলিতে একদিকে আমরা ৪০-৫০ জন ভাই, অপর দিকে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত চার থেকে পাঁচ হাজার সন্ত্রাসী হামলা চালাচ্ছে অস্ত্র, লাঠি, বোতল, বোমা ইত্যাদি নিয়ে। এমন কোনো অস্ত্র নেই যা তারা ব্যবহার করেনি। যে ইটগুলো তারা আমাদের দিকে মারছিল সেইগুলো তুলে আমরা আবার তাদের দিকে ছুড়ে মারছি। এভাবে একদিকে সন্ত্রাসীদের মারণাস্ত্রের হামলা, অন্য দিকে আমরা নিরস্ত্র। এভাবে ৭ ঘণ্টা মোকাবেলা করেছি আমরা। ওরা এক ইঞ্চি জায়গা থেকেও সরাতে পারেনি আল্লাহর দ্বীনের গোলামদের। এ তো আল্লাহর দ্বীনের পথে এগিয়ে যাওয়ার ঐতিহাসিক দিকনির্দেশনা। বাতিলের বিরুদ্ধে এক চরমপত্র। ১৪ দলের গালে একটি চপেটাঘাত। এ যেন শাহাদাতের প্রতিযোগিতা। ঈমানদারের জন্য এগিয়ে যাবার বিরাট সুযোগ। আগামীর পথে এক দুরন্ত সাহস। এক সময় আমি নিজেও মনে করতাম অস্ত্রের মোকাবেলায় টিকে থাকা যায় না। কিন্তু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক ঘটনায় আল্লাহর প্রত্যক্ষ মদদ দেখে সে ভুল ধারণা শুধরে নিয়েছি। বাকিটুকুর পরিশুদ্ধতা লাভ করেছি ২৮ অক্টোবরের ঘটনায় আল্লাহর প্রত্যক্ষ মদদের বাস্তব সাক্ষী হয়ে। ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া চলছে। কেউ কেউ আহত হয়ে বিদায় নিচ্ছে আমাদের কাতার থেকে। নতুন করে, দু-একজন করে আমাদের সাথে যোগ দিচ্ছে। কিন্তু আমাদের সংখ্যা এর থেকে বাড়ছে না। কারণ বিজয় তো সংখ্যার ওপর নির্ভরশীল নয়।
হঠাৎ সামনের দিক থেকে চিৎকার শুনলাম। তখন উপস্থিত ভাইদের উদ্দেশে বললাম, আপনাদের মধ্যে যারা জীবন থাকা পর্যন্ত পিছিয়ে আসবেন না তারা হাত তুলুন এবং সামনে আসুন। ১৫-২০ জন ভাই এগিয়ে এলেন। আমরা নারায়ে তাকবির ধ্বনি দিয়ে সামনের দিকে এগোতে লাগলাম তখন দেখি আওয়ামী লীগের ৪-৫ হাজার অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত বাহিনী পেছনের দিকে পালাতে লাগল। আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করলে তাঁর সাহায্য অনিবার্য। এটাই তার প্রমাণ। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “কোনো মু’মিন মুজাহিদ জিহাদের ময়দানে নারায়ে তাকবির উচ্চারণ করলে বাতিলের মনে চার হাজার লোক তাকবির উচ্চারণ করলে যে আওয়াজ হয় তার সমপরিমাণ ভীতি সৃষ্টি হয়।” ২৮ অক্টোবর হাতেনাতে তার প্রমাণ পেয়েছি।
যাক, সামনে এগিয়ে গিয়ে দেখি গলির একটু ভেতরে পড়ে আছে আমাদের প্রিয় ভাই শহীদ মুজাহিদের লাশ। তার দেহ এখন নিথর নিস্তব্ধ। তিনি শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করে পাড়ি জমিয়েছেন তার কাক্সিক্ষত মঞ্জিলে। শাহাদাতের যে মৃত্যুর জন্য তিনি প্রায়ই তার মায়ের কাছে দোয়া চাইতেন। মাবুদ আজ তার আকাক্সক্ষা পূর্ণ করেছেন আলহামদুলিল্লাহ। এর থেকে সৌভাগ্যবান আর কী হতে পারে? শহীদরা পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েও তারা যেন অমর!। আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে নিজের মেহমান হিসেবে জান্নাতে থাকতে দেন। আল্লাহ বলেন, “আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদের মৃত মনে করো না, প্রকৃত পক্ষে তারা জীবন্ত, কিন্তু তাদের জীবন সম্পর্কে তোমরা অনুভব করতে পারো না।” (সূরা আল বাকারা : ১৫৪) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) বলেন, ‘তাদের প্রাণ সবুজ পাখির মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। আল্লাহর আরশের সাথে ঝুলন্ত রয়েছে তাদের আবাস, ভ্রমণ করে বেড়ায় তারা গোটা জান্নাত, অতঃপর ফিরে আসে আবার নিজ নিজ আবাসে।” (মুসলিম, তিরমিজি, ইবনে মাজাহ) প্রিয় রাসূল (সা) বলেছেন : “শাহাদাত লাভকারী ব্যক্তি নিহত হওয়ার কষ্ট অনুভব করে না। তবে তোমাদের কেউ পিঁপড়ার কামড়ে যতটুকু কষ্ট অনুভব করে, কেবল ততটুকুই অনুভব করে মাত্র।” (তিরমিজি)
হায়েনারা আমাদের প্রিয়ভাই শহীদ মুজাহিদকে হত্যার পর ফেলে রেখেছে গলির মধ্যে। কয়েকজন মিলে যখন কাঁধে করে নিয়ে যাচ্ছে তার মৃতদেহ। কিন্তু রক্তপিপাসু আওয়ামী সন্ত্রাসীদের রক্তের পিপাসা তখনও থামেনি। লাশের ওপর তারা ছুড়ে মারছে ইট, পাথর, বোতল ও লাঠি। আল্লাহর প্রিয় বান্দা মুজাহিদ আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়েছেন। আল্লাহর জান্নাতের মেহমান হিসেবে তাকে কবুল করেছেন। পরে হাসপাতালে অপারেশন থিয়েটারে গিয়ে শুনলাম প্রিয় ভাই মুজাহিদ আর নেই। তখন স্মৃতিতে ভেসে উঠলো সব ঘটনা।
এ পর্যায়ে দীর্ঘ ৫-৬ ঘণ্টা পর আওয়ামী সন্ত্রাসীদের গুলি আমার বাম পায়ে আঘাত হানল। আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। গাড়ির চাকা পাংচার হওয়ার মতো লুটিয়ে পড়লাম হাঁটুর ওপর ভর করে। জাহেদ হোসেন ভূঁঞা ভাই ও আব্দুল মান্নান ভাইসহ কয়েকজন কাঁধে করে নিয়ে যাচ্ছেন আমাকে। পায়ের যন্ত্রণায় যতটুকু কাতর তার থেকে বেশি কষ্ট লাগছে এই ধন্য মানুষগুলোর কাতার থেকে এই অধমের বিদায় নিতে হচ্ছে বলে। তখন নিজেকে খুব স্বার্থপরই মনে হচ্ছিল। সবাই যখন জীবনবাজি রেখে ভূমিকা রাখছে তখন আমি চলে যাচ্ছি অন্যের কাঁধে ভর করে। গুলিবিদ্ধ পা-টি ঝুলছে আর সেই সাথে রক্ত ঝরছে। কষ্টের মধ্যে নিজেকে একটু গুছিয়ে নিলাম। অনেক ভাই পেরেশান হয়ে গেল এবং দলবেঁধে আমার সাথে আসতে লাগল। ভাইদের বললাম, আপনারা কোথায় যাচ্ছেন? পরিস্থিতি মোকাবেলা করুন।
আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো হাসপাতালে। এ যেন আরেক কারবালা। কিন্তু কঠিন পরিস্থিতিতে দারুণ শৃঙ্খলা শহীদি কাফেলার ভাইদের মাঝে। এখানেও ইয়ামামার যুদ্ধের সেই সাহাবীদের মত অপর ভাইকে অগ্রাধিকারের দৃষ্টান্ত। নিজেদের শরীর থেকে রক্ত ঝরছে তবুও ডাক্তারকে বলছেন, ঐ ভাইকে আগে চিকিৎসা করুন। এ যেন ‘বুন ইয়ানুম মারসুস’-এর উত্তম দৃষ্টান্ত। এ যেন আনসার মুহাজিরদের ভ্রাতৃত্বের জীবন্ত দলিল। জোহরের নামাজ আদায় করলাম অপারেশন থিয়েটারে গুলিবিদ্ধ পা প্লাস্টার করা অবস্থায়। নিজের অজান্তেই ভাইদের জন্য দোয়া করতে লাগলাম। প্লাস্টার করছেন ডাক্তার। এক্সরে রিপোর্ট ঝুলানো দেখা যাচ্ছে পায়ের হাড় দ্বিখন্ডিত হয়ে গেছে। আমি ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করলাম, এই এক্সরেটি আমার? কেউ যেন বলতে চেয়েও আমি ভয় পাবো সে জন্য আর কিছু বলতে চায়নি। আমি বললাম, এই গুলিটি আমার জন্য আল্লাহ কবুল করেছিলেন। শুধু তাই নয়, গুলিটি আমার পায়ের নামেই লেখা ছিল। এ বিশ্বাস থাকতে হবে প্রতিটি আল্লাহর দ্বীনের সৈনিকের। এই বিশ্বাসের ইমারতের ওপর যে আন্দোলন গড়ে ওঠে তার ওপর আঘাতের পর আঘাত এলেও তাকে কখনো স্তব্ধ করা যাবে না ইনশাআল্লাহ।
আজ হয়তো কেউ কেউ বলেন, ২৮ অক্টোবরে আমাদের প্রস্তুতির কথা। কিন্তু যদি আমাদের প্রস্তুতি আরো ভালো থাকতো! তাহলে কী হতো? কারণ দীর্ঘ ৭ ঘণ্টা যাদের সাথে আমরা মোকাবেলা করেছি, কী তাদের পরিচয়? দলে তারা আওয়ামী লীগ কিন্তু ভাড়াটে সন্ত্রাসী, টোকাই, গার্মেন্টকর্মী ও পতিতালয়ের হিন্দা। মুখে রুমাল, কোমরে মাফলার, খালি গায়ে মারামারিতে অংশ নিয়েছে ওরা। আমাদের প্রস্তুতি আরো ভালো হলে সেদিন লাশের সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পেত আর এ ধরনের সন্ত্রাসী একজন টোকাই এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া, নামাজি, আল্লাহর দ্বীনের সৈনিকদের লাশ সবাই একই হিসেবে মূল্যায়ন করতো। হিসাব হতো কাদের লাশ কয়টি। দেশীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে দেখা হতো সেভাবে। অন্তত আল্লাহতায়ালা সে কলঙ্কের হাত থেকে এ আন্দোলনকে রক্ষা করেছেন। বিশ্বের মানুষ চিনতে সক্ষম হয়েছে উগ্র ও জঙ্গি কারা। আল্লাহ যা করেন তার মধ্যে এই আন্দোলনের কল্যাণ নিহিত। কিন্তু আজও ভাবি আওয়ামী লীগ আর কত সন্ত্রাস, খুন, গুম করলে তাদের জঙ্গি বলা হবে? আর কত রক্তের হোলি খেললে তাদের নিষিদ্ধের আওয়াজ উঠবে?
আল্লাহ বলেন, “আর বিপদ কখনো আমার অনুমতি ব্যতিরেকে আসে না।” এটিই চিরন্তন সত্য। আমাদের কারো হিসাবে যেটি বিপদ, কেউ নিচ্ছেন আবার পরীক্ষা হিসেবে। কেউ নিচ্ছেন পরিশুদ্ধতা হিসেবে। আবার কেউ মনে করেন এটিই আমাদের পাওয়া। এটিই ইসলামী আন্দোলন।
কিন্তু আমি জানি না ২৮ অক্টোবরের ঘটনা পর্যালোচনা ১৪ দল কিভাবে করছে। আজ যদি বলা হয়, এই দুনিয়ার বিবেচনায় ২৮ অক্টোবরে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কে? কেউ বলবে, শহীদ, মাসুম, শিপন, মুজাহিদ, রফিক, ফয়সলের পরিবার। কিন্তু না। এটি আপনার হিসাব হতে পারে তবে শহীদ পরিবারের অনুভূতি ভিন্ন। কিন্তু তা অবিশ্বাস্য। শহীদ গোলাম কিবরিয়া শিপনের মায়ের ফরিয়াদ : আল্লাহর দরবারে আমার স্বপ্ন ছিল আমি শহীদের মা হবো, আল্লাহ যেন আমাকে একজন শহীদের মা হিসেবে কবুল করেন। শিপন সবসময় সত্যকে সত্য জানতো, মিথ্যাকে মিথ্যা জানতো।
শহীদ সাইফুল্লাহ মোহাম্মদ মাসুমের গর্বিত মায়ের আহ্বান : আমার জীবনের আশা ছিল আমার ছেলে খালেদ বিন ওয়ালিদ হবে, নিষ্পাপ হবে। আমার ছেলে হাসান-হুসাইনের মতো হবে। আমি আমার সাইফুল্লাহর রক্তের বিনিময়ে এ দেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হোক এই প্রার্থনা সবসময় করি। শহীদ ফয়সলের গর্বিত মা অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন ঠিক এভাবে : তাদের কথা শুনেই মনে হয় তারা সত্যিই হজরত ইবরাহিম (আ)-এর উত্তরসূরি। হজরত ইসমাইল (আ)কে আল্লাহর পথে কুরবান করে হজরত ইবরাহিম (আ) যেভাবে সন্তুষ্ট হয়েছিলেন ঠিক তেমনি তিনি বলেন, আলহামদুলিল্লাহ। আমি আশা করি ইনশাআল্লাহ আমার এই সুশিক্ষিত বিনয়ী, ভদ্র, শান্ত, অমায়িক ও সুন্দর আচরণবিশিষ্ট সন্তানকে আল্লাহ শাহাদাতের মর্যাদা দান করবেন। আমার সন্তানদের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় সন্তানকে আল্লাহ কবুল করে নিয়েছেন সে জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি। শহীদ রফিকুল ইসলামের পিতার চাওয়া : আমার ছেলে আল্লাহর দরবারে শহীদ হিসেবে কবুল হয়েছে বলে আমি মনে করি। কুড়িগ্রামবাসী সবাই তার জন্য কেঁদেছেন। জীবনে সে কারো সাথে ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত হয়নি। সে সবসময় সৎ সঙ্গে মিশত এবং দ্বীনের পথে মানুষকে ডাকত।
আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা যাদের পিটিয়ে হত্যা করেছে, লাশের ওপর নৃত্য-উল্লাস করেছে, ভেঙে দিয়েছে দাঁত, উপড়ে ফেলেছে চোখ; তারা কি আজ উত্তর দিতে পারবে হাফেজ গোলাম কিবরিয়া শিপনের মায়ের জিজ্ঞাসা- ‘কী অপরাধ আমার সন্তানের? কেন খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আমার সন্তানের দাঁতগুলো ভেঙে ফেলা হয়েছে? এই মুখ দিয়ে তো সে মহাগ্রন্থ আল কুরআন মুখস্থ করেছে। ঐ অসভ্য নরপশুরা কি জানে? যে কপালে লাথি মারা হয়েছে সে কপাল দিনে পাঁচবার করে আল্লাহকে সেজদা করতো! পড়তো তাহাজ্জুদ নামাজ। যে হাত ভেঙে দেয়া হয়েছে সে হাত দিয়ে আল্লাহর দরবারে মুনাজাত করতো, যে পা গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে সে পায়ে  হেঁটে আল্লাহর পথে মানুষকে আহ্বান করতো। এ রকম হাজারো জিজ্ঞাসার জবাব আজ তাদের কাছে আছে কি?
পল্টনে এ জাতি আরেকবার দেখে নিয়েছে আমাদের পরীক্ষিত নেতৃত্ব। যাদের সাহস আমাদের এগিয়ে দেয়। যাদের আল্লাহর নির্ভরতা এ কাফেলার কর্মীদের আশান্বিত করে। যাদের ত্যাগ আমাদের অনুপ্রাণিত করে। আমরা দেখেছি তাদেরকে। আমরা দেখেছি শ্রদ্ধেয় আমীরে জামায়াত মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী সাহেবকে। মুহুর্মুহু গুলি আর বোমা স্তব্ধ করতে পারেনি তার বলিষ্ঠ কণ্ঠকে, যা ছিল তেজোদীপ্ত, নিশ্চল, অবিরত আর অবিচল। তিনি যেন মাওলানা মওদূদীর অবিকল প্রতিচ্ছবি। এমনি এক জনসভায় অবিরাম গুলিবর্ষণ চলাকালে মাওলানা মওদূদীকে বসে পড়ার জন্য অন্যরা অনুরোধ করলে দৃঢ়তার সাথে তিনি বলেছিলেন, আমিই যদি বসে পড়ি তাহলে দাঁড়িয়ে থাকবে কে? তাই বিশ্বাস শহীদের রক্ত বৃথা যাবে না, একদিন কথা বলবেই।
শহীদ কামারুজ্জমান ভাইয়ের ঐ স্মৃতি আজ আমাকে খুবই নাড়া দেয়। ২০০৯ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সেক্রেটারি শহীদ শরীফুজ্জামান নোমানী ভাইয়ের কফিন নিয়ে তাঁর গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহ আমাদের প্রিয় নেতা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি শহীদ কামারুজ্জামান ভাই একসাথে গিয়েছি। কিন্তু কে জানে তিনি নিজেই একদিন শহীদ হয়ে এই মাটিতে আসবেন!
কামারুজ্জামান ভাই আমাকে অনেকবার জড়িয়ে ধরে সাহস জুগিয়েছেন। নোমানী ভাইয়ের আব্বা-আম্মা, আত্মীয়-স্বজনকে বোঝাতে আমাদের বারবার হিমশিম খেতে হয়েছে। শহীদ নোমানী ভাইয়ের মা বাকরুদ্ধকণ্ঠে বারবার বলছিলেন, ‘আহ্! আমার এতো আদরের বাবাকে তারা কিভাবে কুপিয়ে হত্যা করলো? আমি যদি সেখানে থাকতাম, তাহলে বলতাম, তোমরা আমাকে কোপ দাও কিন্তু আমার কলিজার টুকরো নোমানীকে আঘাত করো না।’ শহীদের বাবা জনাব হাবিবুল্লাহ নিজেই সন্তানের জানাজা পড়ান। তিনি জানাজার পূর্বে বলেন, ‘হে আল্লাহ, আমি তো তোমার কাছে চেয়েছিলাম আমার ছেলে আমার জানাজা পড়াবে, কিন্তু আমি আজ ছেলের জানাজা পড়াচ্ছি। আর পিঠে বহন করছি তার কফিন। মাবুদ গো, তুমি শুধু আমার ছেলেকে শহীদ হিসেবে কবুল করো। কি অপরাধ ছিল আমার সন্তানের? আমি তোমার কাছেই এই হত্যার বিচার চাই।’ ছোট ভাতিজা-ভাতিজী কিছুই বুঝে না, তারা বাকরুদ্ধ। ছোট দুই শিশুকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনার ভাষা আর খুঁজে পেলাম না। তাদেরকে আদর করার প্রিয় চাচ্চু আর নেই। ‘কেন মারা হলো তাদের প্রিয় চাচ্চুকে?’ এই হলো তাদের জিজ্ঞাসা।” শহীদের মর্যাদার কথা যিনি বারবার সেদিন বলছিলেন তিনি হলেন শহীদ মুহাম্মদ কামারুজ্জামান। আজ নিজেই সেই কাতারে অন্তর্ভুক্ত।
শাহাদতের জন্য শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লা ভাইয়ের মন কেমন পাগলপারা ছিল এই ঘটনা থেকে তা উপলব্ধি করা যায়। খুব সম্ভব ২০০৯ সালের ২৮ অক্টোবর ইঞ্জিনিয়ার ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে ইসলামী ছাত্রশিবির আয়োজন করে আলোচনা সভার। সকল অতিথি উপস্থিত, আলোচনা সভা শুরু হয়ে গেছে। ঠিক মাঝখানে আমাদের প্রিয় মোল্লা ভাই প্রোগ্রামে এসে হাজির। আমি দাঁড়িয়ে রিসিভ করে বললাম, স্যরি মোল্লা ভাই, আপনি আসছেন এ জন্য মোবারকবাদ। কারণ মোল্লা ভাই আমাদের দাওয়াতি মেহমানের মধ্যে ছিলেন না। তবু তিনি নিজ উদ্যোগে আলোচনা সভায় হাজির হয়েছেন। তিনি বললেন, শুন ২৮ অক্টোবর ২০০৬ আমি ঐ প্রোগ্রামে অনুপস্থিতির বেদনা আমাকে সব সময় তাড়িয়ে বেড়ায় এ কথা বলে আবেগাপ্লুত হয়ে গেলেন। পল্টনে আমি উপস্থিত থাকতে পারিনি। যেখানে আমাদের ভাইয়েরা শহীদ আর গাজী হয়েছেন। ঐ দিন আমি ঢাকায় ছিলাম কিন্তু আমীরে জামায়াত আমাকে কেন্দ্রীয় অফিস থেকে সব খোঁজখবর রাখতে বললেন। সেদিনের এই অনুপস্থিতির বেদনা থেকে তোমাদের দাওয়াত না পেয়েও বে-দাওয়াতে এখানে উপস্থিত হয়ে গেলাম। এই কথাগুলো মোল্লা ভাই স্টেজে বসে বসে বললেন। তখন বুঝতে পারিনি, কিন্তু আজ তাঁর শাহাদাতের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে তিনি কত গভীরভাবে শাহাদাতের চেতনাকে লালন করতেন।
বাংলার জমিনে প্রতিটি মুহূর্তে আজ শাহাদাতের মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। সন্তানহারা পিতা-মাতার আহাজারি, ভাইহারা বোনের আর্তনাদ, পিতাহারা সন্তানের করুণ চাহনি, মা-হারা সন্তানের অব্যক্ত বেদনা বাংলার আকাশ বাতাসকে প্রকম্পিত করছে। এবার শহীদের তালিকায় যোগ হচ্ছে সমাজের শ্রেণী-পেশার মানুষ। বৃদ্ধ-বনিতা এমনকি অনেক নিষ্পাপ শিশুও রেহাই পায়নি জালেমের বুলেটের আঘাত থেকে। আর এর মধ্য দিয়ে ইসলামী আন্দোলন অনেক বেশি জনপ্রিয় ও জনমানুষের আন্দোলনে পরিণত হচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর এই প্রথম জামায়াত স্থানীয় নির্বাচনে এত আশানুরূপ ফলাফল লাভ করেছে, আলহামদুলিল্লাহ। ইসলামী আন্দোলনের ওপর হাজারো জুলুম নির্যাতনের মাঝে এই কাফেলা কর্মীদের ত্যাগ, কোরবানি, ভ্রাতৃত্ব, পরকালভীতি এবং নিজেদের পরিশুদ্ধ করার অনেক উপাদানের সন্ধান পেয়েছে এই সময়। যারা আমাদের পিছিয়ে দিতে চায় তাদের অনেক কর্মকান্ডের মধ্যেই আল্লাহ তাআলা ইসলামী আন্দোলনের জন্য কল্যাণ রেখেছেন। আমাদের প্রতিপক্ষের অপপ্রচার অপবাদ হিংসা উসকানির কারণে মানুষের মনে আন্দোলনকে জানার এক প্রচন্ড আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যেই হাজার হাজার মানুষ এ আন্দোলনে শরিক হচ্ছে। অনিবার্য হয়ে উঠছে তার বিজয়।
আজ মহান রবের দরবারে সন্তানহারা মায়ের আহাজারি আর প্রতিরাতে তাহাজ্জুদের নামাজ শেষে চোখের পানি কি কোনোই কাজে আসবে না? একদিন তারা আল্লাহর সম্মানিত অতিথি হবেন শহীদের পিতা-মাতা হিসেবে। সেদিন জান্নাতের সবুজ পাখি হয়ে উড়তে থাকবেন শহীদেরা। এটাই তো শহীদের চূড়ান্ত সফলতা! ন্যায় ও বাতিলের এই দ্বন্দ্ব কোনো সাময়িক বিষয় নয়, এটি চিরস্থায়ী আদর্শিক দ্বন্দ্বেরই ধারাবাহিকতা মাত্র। শাহাদাত ইসলামী আন্দোলনের বিপ্লবের সিঁড়ি, কর্মীদের প্রেরণার বাতিঘর, উজ্জীবনী শক্তি, নতুন করে পথচলার সাহস। তবে আমাদের বিশ্বাস- এই দুনিয়ার আদালতে এই সকল হত্যার ন্যায্য বিচার না হলেও আল্লাহর আদালত থেকে খুনিরা রেহাই পাবে না।
শহীদেরা তাদের মাবুদের সাথে তামাম জিনিসের বিনিময় করে শুধু একটি বাক্যের ভিত্তিতে ‘‘রাদিয়া আল্লাহু আনহুম অরাদু আন্হ”। আজ জীবিত কামারুজ্জামান আর আব্দুল কাদের মোল্লার চাইতে শহীদ কামারুজ্জামান আর আব্দুল কাদের মোল্লা, শহীদ মুজাহিদ, শহীদ মাসুম, শহীদ শিপন এবং শহীদ ফয়সাল অনেক বেশি শক্তিশালী। আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট জেল-জুলুম-নির্যাতন, হত্যা, গুম, খুন চালিয়ে ইসলামী আন্দোলনকে স্তব্ধ করা যায় না, বরং দ্বীনের বিজয় অনিবার্য হয়ে ওঠে। যারা ইসলামী আন্দোলনের নেতৃবৃন্দকে হত্যা করে এ দেশকে কলোনিভুক্ত করার স্বপ্ন দেখছে, শহীদদের রক্তের শপথ নিয়ে বাংলার তৌহিদি জনতা তা রুখে দাঁড়াবে ইনশাআল্লাহ। সে শ্লোগান বুকে ধারণ করে আজ বাংলার ৫৬ হাজার বর্গমাইলে একটি অপ্রতিরোধ্য নাম বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। ২৮ অক্টোবর পল্টনে শাহাদাতের নজরানার মধ্য দিয়ে রাজপথে যে যাত্রা শুরু হয়েছে তা এ জমিনে বিজয়ের সূচনা করবে ইনশাআল্লাহ। হে বিস্তীর্ণ আকাশ ও জমিনের মালিক! তুমি আমাদের ফরিয়াদকে কবুল কর। হে আল্লাহ! তুমি আমাদেরকে সকল ত্যাগের বিনিময়ে বাংলার জমিনে দ্বীন কায়েমের তাওফিক দাও। আমিন।
লেখক : সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

সহকারী সম্পাদক, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা

SHARE

Leave a Reply