ফ্লাশ ব্যাক : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১১

 মু. সাজ্জাদ হোসাইন

Masud-vaiবাংলাদেশ মুসলিম বিশ্বের এক অপার সম্ভাবনাময় দেশ। সবুজ শ্যামল ভূখণ্ডটির বুক চিরে বয়ে চলা শত শত নদী আর কাকস্বচ্ছ কালো জলের হাজারো খাল-বিল যেন রক্ত জালিকার ন্যায়। এই বয়ে চলা নদীর পাশে গড়ে ওঠা কৃষিনির্ভর হাজারো জনপদ। এ দেশের মাটি ও মানুষের সাথে ইসলামের নিবিড় সম্পর্ক অতি প্রাচীনকাল থেকে। ঈমান যেন লুকিয়ে রয়েছে এদেশের প্রতিটি ধূলিকণায়, ঘাসের ডগায়, সবুজ কচি লাউয়ের পাতায়। ১৮৩১ সালে বালাকোটে মুসলমানদের পতনের পর ইসলামী আন্দোলনকে একটা সংগঠিত রূপ নিতে সময় লাগে অনেক দিন।
বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মুজাদ্দিদ আল্লামা মওদূদীর জন্মগ্রহণ যেন আঁধার ফুঁড়ে সূর্য উদয়ের মতো। তার গড়া জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠিত পথ দেখায় মজলুম মানুষকে এক সোনালি দিগন্তের। নদ-নদী আর খাল, বিল, হাওরপাড়ের বাংলাদেশী মুসলমানরা খোঁজে পায় এক নতুন দিশা। জেগে উঠতে থাকে জনপদের পর জনপদ। বিস্তীর্ণ সবুজের মাঝে ক্যাম্পাসগুলো পরিণত হয় দ্বীনি পাঠশালায়। মালেক, সাব্বির, হামিদ, আইয়ুব, আবুল কাশেম পাঠানদের মতো চরিত্রবান ছাত্র নেতৃবৃন্দের জন্ম হতে থাকে হাজারে হাজারে। বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলন হতে থাকে শক্তিধর থেকে প্রবল শক্তিধরে। চেতনায় আঘাত লাগে আল্লাহদ্রোহী শক্তিগুলোর। তাদের সামনে দিয়ে যখন মালেকের উত্তরসূরিরা জাতীয় পতাকাবাহী গাড়ি নিয়ে চলে যায় তখন তাদের গা জ্বালা করে। তখন ফন্দি আঁটে আঁধারের কীটেরা। ২০১০ সালের ১৯ শে জুন। ইতিহাসের একটি কালো দিন এটি। দিন হলেও এটি রাতের চেয়ে বেশি অন্ধকার। এ দিন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের অন্যতম নেতা সাবেক মন্ত্রী মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে জামায়াতের মগবাজারস্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে গ্রেফতার করা হয়। নায়েবে আমীর বিশ্ববিখ্যাত মুফাসসিরে কুরআন সাবেক এমপি আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে এবং সেক্রেটারি জেনারেল একসময়ের ছাত্ররাজনীতির তুখোড় নেতা সাবেক মন্ত্রী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ভাইকেও অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করা হয় একই দিনে। তাদেরকে যে দিন গ্রেফতার করা হয় সেদিন তুমুল বৃষ্টি হচ্ছিল। তার পরও বৃষ্টি উপেক্ষা করে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় মানবপ্রাচীর তৈরি করেছিল শান্তিপূর্ণভাবে।
তারপর থেকে তাদের গ্রেফতারের প্রতিবাদে জনগণ শান্তিপূর্ণভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করতে থাকে। নেতৃবৃন্দকে নিয়ে ধীরে ধীরে ঘৃণ্য এবং ভয়ঙ্কর খেলায় মেতে ওঠে সরকার। চলতে থাকে একের পর এক ষড়যন্ত্র। ধর্মীয় অনুভূতি থেকে মামলা গড়ায় যুদ্ধাপরাধ, সেখান থেকে মানবতাবিরোধী অপরাধে। রাষ্ট্র পরিচালনায় সরকারের সীমাহীন ব্যর্থতা, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট, হত্যা,খুন-গুম, ধর্ষণ, জনজীবনের নিরাপত্তাহীনতা, ছাত্রলীগের ক্যাম্পাসগুলোতে অবিরাম সন্ত্রাস অপর দিকে নিরপরাধ নিষ্কলুষ জাতীয় নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার এবং নির্যাতন। ফলে ফুঁসে ওঠে জনগণ। দিনটি ২০১১ সালের ১৯ জুন। সারা দেশের মতো ঢাকার রাজপথেও নেমে আসে দেশপ্রেমিক তৌহিদ প্রিয় জনগণ।
বিকেল তখন ৪টা বাজতে কয়েক মিনিট বাকি। ঢাকার রাজপথ বিশেষ করে কাকরাইল মোড় থেকে ফকিরাপুল হয়ে নটর ডেম কলেজ। পল্টন মোড় থেকে নাইটিঙ্গেল মোড়। দৈনিক বাংলা থেকে বায়তুল মোকাররম হয়ে পল্টন মোড়। কালভার্ট রোড লোকে লোকারণ্য। হাজার হাজার মানুষ নেমে এসেছে রাস্তায়। তাদের প্রিয় নেতৃবৃন্দের মুক্তির দাবিতে। কর্মসূচি পালনের আগেই বিনা উসকানিতে পুলিশ হামলা করে বহু নিরীহ নিরস্ত্র প্রতিবাদী জনতার ওপরে। শুরু হয়ে যায় প্রচণ্ড সংঘর্ষ। প্রতিবাদী জনতার যে অংশটি নাইটিঙ্গেল মোড়ে ছিল তারা শত শত পুলিশকে তাদের রায়টকারসহ ধাওয়া দিয়ে নিয়ে যায় কাকরাইল মসজিদ এবং রমনা পার্ক পর্যন্ত। এদিকে রাজমনী হলের সামনে থাকা জনতা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসী বাহিনীর শত শত সন্ত্রাসীকে ধাওয়া দিয়ে নিয়ে যায় একদম শান্তিনগর পার করে মালিবাগ মোড় পর্যন্ত। এদিকে স্কাউট ভবনের পূর্ব পাশের গলি দিয়ে ৫০-৬০ জনের পুলিশের একটি গ্র“প মুহুর্মুহু গুলি করতে থাকে। এবং তারা  ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করতে থাকে। তাদের করা গুলিতে আমাদের কয়েকজন ভাই আহত হয়। অপর দিকে পুরানা পল্টন কালভার্ট রোড এবং রাজস্ব ভবনের সামনের রাস্তায় তুমুল সংঘর্ষ চলতে থাকে। ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া এবং সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে কয়েক কিলোমিটার জুড়ে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর Chain of command এবং Control ছিন্ন ভিন্ন হয়ে পড়ে। গোটা এলাকাজুড়ে প্রায় ঘণ্টা দেড়েক ধরে চলে সংঘর্ষ। রাজপথ স্থবির হয়ে পড়ে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ছোড়া টিয়ার শেলে অন্ধকার হয়ে পড়ে চারিদিক।
কিছু সময় পর পুলিশ এবং র‌্যাব তাদের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি করে সব মিলিয়ে তাদের সংখ্যা ৫০০০ এর কম হবে না। ঢাকা শহরের গুরুত্বপূর্ণ একটি বড় অংশ সেদিন অচল হয়ে পড়ে। প্রতিবাদী জনগণ আইনশৃংখলা বাহিনীর কয়েকটি গাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসীরা তখন গাড়ি ফেলে পালাতে থাকে। মাগরিবের কিছু আগে প্রতিবাদী জনগণ রাস্তা ছেড়ে দিতে থাকে। তারও অনেক পড়ে ভীতসন্ত্রস্ত সরকারি সন্ত্রাসীরা নিরীহ পথচারীদের Arrest করতে থাকে। চালাতে থাকে নির্মম নির্যাতন। প্রায় দুই শতাধিক লোককে Arrest করা হয়। ঢাকা শহর অচল হয়ে থাকে একটা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত। সন্ধ্যার পর পুলিশ এবং র‌্যাবের Protection নিয়ে ছাত্রলীগ এবং যুবলীগের কতিপয় লোক মিছিল করে। ততক্ষণে জনগণ চলে গিয়েছে নয়ত তারা আসার মতো দুঃসাহস করতো না।
এবার চলে পুলিশি তাণ্ডব। রাতের আঁধারে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইসলামী দলের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম আজহারুল ইসলামকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি তার মগবাজারস্থ বাসায়ই তখন অবস্থান করছিলেন। এবং সংবাদ সম্মেলন শেষে বাসায় ফেরার পর তাকে Arrest করা হয়।
Arrest এর ব্যাপারে সামান্যতম ভয়ও তার ভেতরে কাজ করেনি। ইসলামের এ বীর সেনানী জানতেন তিনি কোনো অপরাধ করেননি। তাহলে কেন তিনি পালাবেন? একই রাতে গ্রেফতার করা হয় বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি, জামায়াতের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচিত সিনেট সদস্য অধ্যাপক তাসনীম আলমকে এবং জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা ইজ্জতউল্লাহ সাহেবকে।
স্যাটেলাইট মিডিয়ার কল্যাণে পৃথিবীবাসী প্রত্যক্ষ করল রাতের বেলায় যারা সুস্থ সবল ছিলেন পুলিশি নির্যাতনে সকালবেলা তারা আর হাঁটতে পারছেন না। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনে তাদের কোনো ইন্ধন ছিল না অথচ তাদের মত জাতীয় নেতৃবৃন্দকে নির্যাতন করে পঙ্গু করে দিল রাষ্টীয় সন্ত্রাসী বাহিনী।
আজকে ২০১৩ এবং ১৪ সালে আমরা কী দেখছি। আমাদের নিরীহ-নিরস্ত্র মেধাবী ভাইদেরকে পুলিশ ঠাণ্ডা মাথায় গুলি করে শহীদ করে দিচ্ছে। র‌্যাব ধরে নিয়ে গুম করে ফেলছে। আওয়ামী লীগের জন্ম দেয়া ছাত্রলীগ ক্যাম্পাসগুলোতে গবফরধ এর সামনে অস্ত্র হাতে গুলি করছে। আমাদের ভাইদের হাত-পা কেটে নিচ্ছে। ১৯ সেপ্টেম্বর আসলে আমাদের এ কথাই মনে করিয়ে দেয়Ñ অস্ত্র রেখে এসো, জনগণ দেখিয়ে দেবে আন্দোলন কাকে বলে আর ধাওয়া কাকে বলে?
লেখক : কেন্দ্রীয় প্রকাশনা সম্পাদক
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

SHARE

Leave a Reply