বইপড়া -মশিউর রহমান

নেপোলিয়ন বলেছিলেন অন্তত ষাট হাজার বই সঙ্গে না থাকলে একটা জীবন চলে না। এই কথাটি নেপোলিয়ন বলেছিলেন প্রায় দুইশত বছর আগে। ষাট হাজার বই এক জায়গায় থাকার অর্থ নিশ্চিত একটি বড় ধরনের সংগ্রহ। একটু চিন্তা করুন তো, আজকের দিনে ৬০ হাজার বইয়ের সংগ্রহ কত জনের আছে? ৬০ হাজার কেন ৬০টা বইই হয়তো অল্প কিছু মানুষের কাছে পাওয়া দুষ্কর।
সারা বিশ্বের মুসলমানরা আজ সব থেকে বেশি নির্যাতিত-নিপীড়িত। পশ্চিমা সা¤্রাজ্যবাদের বেড়াজালে আটকে পড়েছে প্রতিটা মুসলিম দেশ। ইসলামের স্বর্ণযুগে মুসলমানরা জ্ঞানে-গুণে যে সমৃদ্ধি অর্জন করেছিল, তার গুণে সারা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাতিতে পরিণত হয়েছিল। বর্তমানে মুসলমান জাতির এই অধঃপতনের জন্য প্রধান কয়েকটি কারণের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ কারণ হলো জ্ঞানচর্চা কম হওয়া এবং বইবিমুখতা। ভোগবিলাসিতায় মত্ত মুসলমান জাতির অধিকাংশই আজ বইপড়া, জ্ঞানচর্চা থেকে বিমুখ। যার পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করেছে পশ্চিমা সা¤্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী।
মহান আল্লাহ তায়ালা বলেছেন “বল, যারা জানে আর যারা জানে না তারা কি এক?”
মহান আল্লাহ তায়ালা এই কথার দ্বারা জ্ঞানী এবং মূর্খতার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করে দিয়েছেন। অর্থাৎ জ্ঞানীরাই জগতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করবে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর সর্বপ্রথম যে কথাটি নাযিল হয়েছিল সেটা হলো ‘ইকরা’ অর্থ পড়ো। এটার দ্বারা স্পষ্ট প্রমাণ হয় ইসলামের মধ্যে জ্ঞান অর্জন করা কতটা তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়। এ প্রথম কথা ‘ইকরা’ এর বাস্তবায়ন করে সারা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাতিতে পরিণত হয়েছিল মুসলমানরা। মুসলমানদের আবাসভূমিগুলো জ্ঞানচর্চার একটা শ্রেষ্ঠ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।
অষ্টম থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দী মাঝে প্রায় পাঁচশত বছর বাগদাদ ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে সমৃদ্ধ নগরী। সমৃদ্ধ নগরী হবার অন্যতম কারণ হলো জ্ঞান-গরিমায়, শিক্ষা-দীক্ষায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দিক দিয়ে, বই সংগ্রহের দিক দিয়ে বাগদাদের সমকক্ষ আর কোন নগরী ছিল না তখন। সেখানে ছিল সমৃদ্ধ বইয়ের সংগ্রহশালা দারুল হিকমাহ। দারুল হিকমাহতে ছিল বিগত ৫০০ বছরের মানব ইতিহাসের অর্জিত প্রায় সকল জ্ঞান। হাজার হাজার অনুবাদ বই এখানে সংগ্রহে ছিল। ভারতবর্ষ, পার্শিয়ান থেকে শুরু করে পশ্চিমা গ্রিক সভ্যতার বহু বই আরবিতে অনুবাদ করা হতো এখানে। সূত্র মতে প্রায় ১০ লক্ষ বই সংগৃহীত ছিল এখানে। হালাকু খান আক্রমণ করে প্রায় সব বই দজলা নদীতে ফেলে দিয়েছিল। খানের হাত থেকে বেঁচে যাওয়া অনেক ব্যক্তির ভাষ্যমতে দজলা নদীতে এত বই ফেলা হয়েছিল যে নদীর পানি বইয়ের কালির কারণে কালো হয়ে গিয়েছিল।
৯৭৫ সালে প্রতিষ্ঠিত কায়রোর ফাতিমিয়া লাইব্রেরি তৎকালীন সময়ে সবচেয়ে বড় লাইব্রেরি হিসেবে পরিচিত ছিল। প্রায় চল্লিশটি কক্ষে জ্ঞানের নানাবিধ শাখার বই এখানে বর্তমান ছিল। অনেকের মতে এখানে প্রায় ২০ লক্ষ বই ছিল। এখানে শুধু প্রাচীনকালের জ্ঞানের বই ছিল প্রায় ১৮ হাজার! স্পেনের কর্ডোভায় মুসলমানরা গড়ে তুলেছিল এক বিশাল সমৃদ্ধ লাইব্রেরি। খলিফা দ্বিতীয় হাকাম এই লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেন ৯৬১ সালে। এখানে প্রায় ৪ লক্ষ বইয়ের সংগ্রহ ছিল।
এছাড়াও গ্রানাডার আলহামরা প্রাসাদে বইয়ের বিশাল সংগ্রহ গড়ে তুলে ছিল মুসলমানরা। আলহামরা প্রাসাদ ও অন্যান্য জায়গা হতে প্রায় দশ লক্ষ বই আগুনে পুড়িয়ে ফেলেছিল ডিমনেস। দশম শতাব্দীতে হিসেব করে দেখা যায় কেবল কর্ডোভায় ৭০টি বইয়ের সমৃদ্ধ সংগ্রহশালা ছিল। স্পেনের এই সমৃদ্ধ লাইব্রেরিগুলোতে এবং এই শিক্ষা কেন্দ্রগুলোতে ইউরোপের বহু ছাত্র এসে লেখাপড়া করত। কালক্রমে মুসলমানদের এসব বিখ্যাত সংগ্রহশালা ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। আর তার সাথে সাথে তাদের গৌরব পৃথিবীর বুকে মলিন হয়ে গিয়েছে। সেই সমৃদ্ধ জ্ঞানচর্চা আর মুসলিম দেশগুলোতে দেখা মেলে না। এই সুযোগে পশ্চিমারা জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি লাভ করে প্রায় সকল মুসলমান দেশ গুলোকে তাদের উপনিবেশে পরিণত করেছে। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রভাব বিস্তার করে আছে মুসলিম দেশগুলোতে। তাদের সফলতার অন্যতম এবং প্রধান কারণ হলো জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে এগিয়ে যাওয়া। জ্ঞান-বিজ্ঞানে পশ্চিমারা এখন বিশ্বসেরা।
এখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় লাইব্রেরি আমেরিকাতে আমেরিকান লাইব্রেরি অব কংগ্রেস। যেখানে প্রায় সাড়ে তিন কোটি বই সংগ্রহ রয়েছে। দ্বিতীয় বৃহত্তম লাইব্রেরি চীনে, তৃতীয় বৃহত্তম লাইব্রেরি রয়েছে কানাডায়। যেখানে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বইয়ের সংগ্রহ ছিল মুসলিম দেশগুলোতে, সেখানে বর্তমানে টপ ১০টি লাইব্রেরির মধ্যে একটিরও মুসলিম দেশের নাম নেই। ওহঃবৎহধঃরড়হধষ চঁনষরংযবৎং অংংড়পরধঃরড়হ (ওচঅ) এর রিপোর্ট অনুযায়ী বছরে বই প্রকাশের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি বই ছাপা হয় চীনে এবং আমেরিকাতে। ২০১৫ সালের এক বছরে সবচেয়ে বেশি ২৮ শতাংশ বই ছাপা হয়েছে চীনে। যেটা সংখ্যায় ৪ লক্ষ ৭০ হাজার। যেখানে আমেরিকার ছেপেছে ২০% অর্থাৎ প্রায় ৩ লক্ষ ৩৯ হাজার বই।
টপ ২৫টা দেশের মধ্যে মুসলমানদের দেশ মাত্র একটি। সৌদি আরব। তারা ছেপেছে মাত্র ২২ হাজার ৯৯০টি বই। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট বলে দেয় বইপড়া, জ্ঞানচর্চার দিক দিয়ে মুসলমানেরা আজ কতটা পিছিয়ে। অথচ এই জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে ইসলাম সবচেয়ে বেশি গুরুত্বারোপ করেছে। শুধু এই জ্ঞানের কারণে ফেরেশতারা হযরত আদমকে (আ) সিজদা করেছিলেন। মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন “আমি শিক্ষক রূপে প্রেরিত হয়েছি”….. হযরত আবু দারদা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে রাস্তায় গমন করে, আল্লাহ তাকে জান্নাতের পথে পরিচালিত করেন। জ্ঞান অন্বেষণকারীর সন্তুষ্টির জন্য ফেরেশতারা তাদের ডানা বিছিয়ে দেন। আর জ্ঞানীর জন্য আসমান জমিনের সমস্ত সৃষ্টি দোয়া করে এমনকি সমুদ্রের মাছও। (তিরমিজি ২৫০৬)
মুসলমানদের গৌরবময় ইতিহাসে দেখতে পাওয়া যায় জগদ্বিখ্যাত জ্ঞানসাধকদের। যাদের অবদান বর্তমান পৃথিবীর জ্ঞানসাধনায় এবং বিজ্ঞানচর্চায় অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করছে। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ইবনে সিনা চিকিৎসাবিজ্ঞানের জনক, আল খাওয়ারিজমী বীজগণিতের জনক, মুয়াজ আল জাইয়্যানি বিখ্যাত গণিতবিদ, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির আবিষ্কারক ইবনে আল হাইসাম, বিখ্যাত পদার্থবিদ আল-বিরুনী, বিখ্যাত রসায়নবিদ ইবনে ইসহাক আলী কিন্দি, জীববিজ্ঞানে আন নাফিস, সামাজিক বিজ্ঞানে ইবনে খালদুনসহ আরও অনেকে। পৃথিবীর ইতিহাসে জ্ঞানের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে মুসলমানদের অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। তাদের জ্ঞান অর্জনের এত তীব্র নেশা ছিল যে তারা বহু দূর-দূরান্ত সফর করতেন শুধুমাত্র একটি জ্ঞান সংগ্রহ করার জন্য। তাদের মেধাশক্তি ছিল অত্যন্ত তীক্ষè।
ইমাম বুখারী প্রায় তিন লক্ষ হাদিস মুখস্থ করেছিলেন। কঠোর জ্ঞানসাধনার মাধ্যমে উপহার দিয়ে গেছেন হাদিসের সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ সহীহ আল বোখারি। ইবনে তাবাররি (রহ) ছিলেন প্রখ্যাত মুহাদ্দিস। বহু গ্রন্থ তিনি রচনা করেছেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হল কিভাবে তিনি এত বৃহৎ সংগ্রহ রচনা করলেন! তিনি উত্তরে বললেন দীর্ঘ ৩০ বছর চাটাইয়ের উপর কাটিয়েছি। দিন রাত একাকার করে চাটাইয়ের উপর বসে শুধু লিখতাম আর লিখতাম। সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (রহ) একটা বই পছন্দ হলে তার পিতার নিকট টাকা না থাকায় তিনি নিতে পারলেন না। তখন তিনি কান্না শুরু করে দিলেন। কান্না দেখে তার পিতা বইটি নেয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন।
এভাবে ইতিহাসে মুসলমানরা জ্ঞানচর্চায় নিজেদের আত্মনিয়োগ করে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাতিতে পরিণত হয়েছিল। সে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে আবারো জ্ঞানচর্চার সোনালি অতীত ফিরিয়ে আনতে হবে। প্রতিটি ঘরে ঘরে গড়ে তুলতে হবে সমৃদ্ধ লাইব্রেরি। মুসলমানরা জ্ঞানচর্চার দিক দিয়ে হবে সবচেয়ে অগ্রগণ্য। মুসলমানরা জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে আবারও পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাতিতে পরিণত হবে ইনশাআল্লাহ।
লেখক : শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

SHARE

Leave a Reply