বকশিশ প্রথা । আব্দুল আলীম

বকশিশ প্রথা । আব্দুল আলীম‘বকশিশ’ শব্দটি সবার কাছে সমানভাবে পরিচিত। বহু শতাব্দী আগে এর প্রচলন হলেও এখন পৃথিবীর সব জায়গায় বেশ পরিচিত। তবে বিভিন্ন জায়গায় এটা বিভিন্নভাবে পরিচিত। বকশিশ বলতে আসলে কী বুঝায় এ সম্পর্কে জানতে আমরা কয়েকটি অভিধান ঘেঁটে আসতে পারি। বাংলা একাডেমি অভিধানের অর্থ- পারিতোষিক, পুরস্কার, উপহার, পাওনার ওপর দেয়া, অতিরিক্ত দেয়া।

Oxford Dictionary-তে বলা আছে- A thing given willingly to someone without payment or something given freely.
Cambridge Dictionary
-তে বলা আছে- A present or something that is given.
উপরোক্ত কথাগুলো দিয়ে বোঝা যায়, কোন ব্যক্তিকে তার মূল্যের বা পরিশ্রমের বা পাওনার অধিক যা দেয়া হয় তাই হলো বকশিশ। তবে শর্ত হচ্ছে যিনি দিবেন তিনি স্বেচ্ছায় দিবেন, চাওয়া বা চাপ দিয়ে নেয়া যাবে না।

উৎপত্তি
বকশিশপ্রথা এখন এত বেশি প্রচলিত হলেও এর উৎপত্তি কখন তা সঠিকভাবে জানা যায় না। তবে কেউ কেউ বলেছেন, ষোড়শ শতাব্দীতে এটা ইংল্যান্ডে প্রথম চালু হয়। ছাত্রছাত্রী, ব্যবসায়ী ও পর্যটকরা এসে এই এলাকায় নিজেকে খাপ খাওয়ানোর জন্য এখানকার বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীকে উপঢৌকন দিতেন।

প্রকৃতি
বকশিশ হলো স্বেচ্ছায় কোন কিছু কোন কর্মকর্তা, কর্মচারী বা কোন ব্যক্তিকে দেয়া। কোন সময় খুশি হয়ে দিতে পারে আবার কোন সময় খুশি রাখার জন্য অগ্রিম দিতে পারে। কোন সময় নিজে খুশি হয় আবার কোন সময় অপরকে খুশি করতে চায়। তবে বর্তমান সময়ে কিছু বকশিশ দিতে হয় একেবারে বিরক্ত হয়ে। এখানে খুশি হওয়ার বা খুশি করার কোনো উদ্দেশ্য লেশমাত্র থাকে না।

বিস্তৃতি
ষোড়শ শতাব্দীতে বকশিশপ্রথা চালু হলেও এখন এর বিস্তৃতি অনেক দিকে, অনেক গভীরে। আমাদের জীবনের প্রাত্যহিক সকল দিকেই প্রায় এর বিস্তৃতি আছে। আমরা যদি দেখি কোন কোন জায়গায় এটা ছড়িয়ে পড়ছে? তাহলে সহজেই বোঝা যায় এর প্রভাব ক্রমবর্ধমান।

অফিস
বিভিন্ন অফিসে বকশিশ দেয়া ছাড়া কাজ উঠিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব। এটা প্রকাশ্যে ঘুষ হলেও ভদ্রভাষায় বকশিশ বলা হয়। এইতো সেদিন গেলাম শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবালয়ে কিছু কাগজ সত্যায়ন করতে। তারা গেটেই ধরে বসল। প্রশ্ন করল- আজকে লাগবে নাকি ৭ দিন পর? আজকে হলে ৫ হাজার ৭ দিন পরে হলে ১ হাজার … বাস্তব অবস্থা এমন যে, ওদেরকে এই কাজ না দিলে আপনাকে ভেতরে প্রবেশ করতে দিবে না। নিরুপায় হয়ে বকশিশের নামে ঘুষ দিতে বাধ্য থাকা … আমাদের দেশের প্রত্যেকটি অফিসে এইরকম বকশিশের প্রচলন হয়ে গেছে।

আদালত
বিচারব্যবস্থার এই সেক্টরটি পুরোটাই বকশিশ দিয়ে ঘেরা। মামলার জামিনে তো অবশ্যই, এর বাইরে উকিল-মুক্তার, পেশকার আরও কত কী? সাধারণভাবে হাইকোর্টে জামিন হলে জামিননামা বের হতে ১ সপ্তাহ লাগে। বেঞ্চ অফিসারকে বললাম- দ্রুত বের করার সুযোগ আছে কিনা? তিনি বললেন- ২ হাজার টাকা দেন, দেখি কী করা যায়? ২ ঘণ্টা পরেই ঝরমহ হলো, কাজ শেষ … এমনকি নিম্ন আদালতসহ সকল আদালতে বিচারক জামিন দিলেই দায়িত্বে থাকা পুলিশ, গার্ডসহ সবাই বকশিশ নিতে ছুটে আসে। মনে হয় জামিন তারাই দিলো অথবা আমার বিশ্ব জয় হয়েছে।

হোটেল রেস্তোরাঁ
হোটেল রেস্তোরাঁয় মানুষ নিয়মিত যাওয়া-আসা করে আড্ডা দেয়া এবং মুখরোচক খাবারের জন্য। খাবার শেষে বেরিয়ে আসার সময় বিল দেয়ার পরে বয় যারা তাদের হাতেই একটা কমিশন ধরিয়ে দেয়া লাগে। এটা আবার হতে হবে সম্মানজনক, নাহলে তারা মাইন্ড করবে। ১০০ টাকায় ১০, ১০০০ টাকায় ১০০ এমন আর কি… আবার বাইরে যেখানে গাড়ি রাখছেন সেখানে আর একজন। গাড়ি স্টার্ট দেয়ার আগে আপনাকে একটা সালাম দিবে, তাহলেই বুঝে নিতে হবে তার কিছু চায়। এই ২ শ্রেণীকেই আপনি যদি কিছু না দেন তাহলে তারা আপনাকে অভদ্র মনে করবে। কি বিব্রতকর পরিস্থিতি! তাদের ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে, এটা তাদের অধিকার।

শপিংমল
আপনি কোন শপিংমলে যাবেন সেখানে গেটে দাঁড়িয়ে থাকা যে দারোয়ান তারাও আপনাকে সালাম দিবে। মল থেকে বেরিয়ে হোন্ডা বা প্রাইভেট কার নিতে যাবেন সেখানেও সালাম। মানে হলো- আপনি মানিব্যাগে হাত দিয়ে দয়া করে আমাদের জন্য কিছু করুন।

গাড়ি ভাড়া
যে কোনো জায়গায় যেতে যদি গাড়ি রিজার্ভ করেন তাহলে তার নির্দিষ্ট ভাড়া আছে। বিয়ে বাড়িতে, পিকনিকে যাওয়ার সময় গাড়ি ভাড়া করলেন। ভাড়া যদি ৫০০০ টাকা হয়, তাহলে নির্দিষ্ট ভাড়া দেয়ার পর ড্রাইভার হেলপার তাদের বকশিশ চাইবে। অথচ তারা কিন্তু এই ভাড়ার মধ্যে বেতন পাবে। তারা বলে, বকশিশ খুশি হয়ে দেবেন। কিন্তু আপনি না দিলে রাগ করবে আবার কম দিলে নিতে চাইবে না। তাহলে এটা কেমন বকশিশ? এটা তো রীতিমতো বিড়ম্বনা। অন্যদিকে আপনি যা খাবেন, ড্রাইভার হেলপার তাদের ইচ্ছামত খেয়ে আপনাকে বিল দিতে বলবে।

বাবুর্চি
রান্না করার জন্য যে বাবুর্চি ভাড়া করেন তারাও বকশিশ চায়। তাদের নির্দিষ্ট বেতন আছে, এটা দেয়ার পরে তারা আবার সুন্দর করে বকশিশ চায়। এটা না দিলে আপনি অভদ্র, অসামাজিক।

রিসোর্ট বা স্পট
কোন রিসোর্ট বা পিকনিক স্পটে কোন অনুষ্ঠান যদি করা হয় তাহলে সেখানে যত প্রকার দারোয়ান ও নিরাপত্তাকর্মী আছে সবাই বকশিশ দাবি করে। সামাজিকতা রক্ষার জন্য হয়তো আপনি দিতে বাধ্য থাকবেন।

প্রশাসন
প্রশাসনের কোনো অংশে বা সেক্টরে বকশিশ ছাড়া কাজ হয় বলে আমার জানা নেই। ট্রাফিক পুলিশকে ৫ টাকা দিলে সিগন্যাল ছেড়ে দেয়। আবার কিছু আদায় করার জন্য ইচ্ছাকৃত জ্যাম লাগায়। এ যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। কোন আসামি গ্রেফতার হয়ে থানায় থাকলে তাকে খাবার দিতেও টাকা লাগে। এক আসামির স্বজন থানায় খাবার দিতে গিয়ে দেখল সকালের খাবার দাম ১৮০ টাকা, পুলিশকে দিতে হয় ৫০০ টাকা, এক আজব দেশ আমাদের।

দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগী
ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বা ক্রয় বিক্রয়ের সময় কিছু দালাল কাজ করেন। কিছু অফিসে এমনকি হাসপাতালেও এরা এখন বিদ্যমান। যেকোন কাজ করতে হলে তাদেরকে খুশি করে সামনে এগোতে হবে নচেৎ আপনি হোঁচট খাবেন। হাসপাতালের একটা স্ট্রেচার নিতে হলেও তাদের বকশিশ দেয়া লাগবে। গরু-ছাগলের হাটেও এই সমস্ত লোকদের বকশিশ দেয়া লাগে।

উচ্চপর্যায়ের বকশিশ
এটা একটু ভদ্রভাষায় বলা যায়। আপনি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন, অফিস থেকে পেনশন উঠাবেন। এটা উঠাতে হয়তো আপনার ২ জোড়া জুতা ক্ষয় হবে। পেনশন যদি ৭ লাখ টাকা পান তাহলে বকশিশ হয়তো ১ লাখ দেয়া লাগবে। এভাবেই আপনাকে বকশিশ নামক ভদ্রতা সব সেক্টরে দেখাতে হবে…।

উপরোক্ত আলোচনা থেকে বুঝাতে চেয়েছি যে, বকশিশ নামক সংস্কৃতিটা এখন শুধু প্রথাই নয়, এটি একটি ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। এটার সাথে এখন ভদ্রতা-অভদ্রতা, সামাজিকতা-অসামাজিকতা জড়িত। কিন্তু যে যাই বলুক, এটা রীতিমতো একটি বিরক্তিকর এবং বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করে। এখান থেকে মুক্ত হতে হলে প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন, প্রয়োজন সমাজ সংস্কারের আরও বেশি প্রয়োজন নতুনভাবে রাষ্ট্র নির্মাণের।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply