সর্বশেষঃ
post

বঙ্কিমচন্দ্রের ‘স্বপ্ন

সরদার আবদুর রহমান

১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২

‘গদ্যসম্রাট’ হিসেবে বাংলা সাহিত্যে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (জুন ১৮৩৮-এপ্রিল ১৮৯৪) নাম সমুজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। সাহিত্য-সমালোচকগণ এ নিয়ে বহুবিধ প্রবন্ধ-নিবন্ধ রচনা করেছেন। এই রচনাসম্ভারের প্রধান দুটি দিক আলোচনায় স্থান পেয়েছে। এর একটি হলো, তাঁর রচনাশৈলী বা কৃৎকৌশলের দিক এবং অপরটি হলো, চিন্তাধারা বা চেতনাগত দিক।

তিনি যে একজন শক্তিশালী লেখক ছিলেন তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। বিশেষত গদ্য তথা উপন্যাস রচনায় তাঁর স্ব-কালে তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তবে এসব রচনার উল্লেখযোগ্য একটি দিক হলো, বঙ্কিমের একজন ‘স্বপ্নচারী’ মানুষের পরিচয় প্রকটিত হয়ে ওঠা। সরাসরি বললে এই দাঁড়ায় যে, তিনি একটি ‘স্বপ্ন-রাজ্য’ গড়ে তোলার প্রতি নিবিষ্ট হন। এই প্রবন্ধে সেই স্বপ্ন-রাজ্য প্রতিষ্ঠার আকুলতা প্রকাশের দিকটি আলোচনার প্রয়াস থাকবে।

সংক্ষিপ্ত পরিচয় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৩৮ খ্রিস্টাব্দের ২৭ জুন পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার কাঁঠালপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা যাদবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রথম দিকে ছিলেন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকারের একজন কর্মকর্তা, পরে হুগলির ডেপুটি কালেক্টর হন। ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ব্যাচের যে দু’জন ছাত্র বিএ পাস করেন, বঙ্কিমচন্দ্র ছিলেন তাঁদের একজন। তিনি তাঁর পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে নিম্ন নির্বাহী চাকরিতে (সাব-অর্ডিনেট এক্সিকিউটিভ সার্ভিস) যোগ দেন এবং পরে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর পদে উন্নীত হন। ঔপনিবেশিক সরকারের কর্মকর্তা হিসেবে বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে পালন করেন। তাঁর কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ কর্তৃপক্ষ তাঁকে ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দে ‘রায়বাহাদুর’ এবং ১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দে Companion of the Most Eminent Order of the Indian Empire (CMEOIE) উপাধি প্রদান করে। বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর পেশাগত জীবনে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, তা তাঁর চিন্তা ও কর্মে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে ইতিহাসে তিনি সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে নন, বরং একজন লেখক ও হিন্দু পুনরুত্থানবাদী চিন্তাবিদ হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হন।

গবেষক সিরাজুল ইসলাম তাঁর পরিচয় এভাবে উল্লেখ করেন: চব্বিশ পরগনা জেলার বারুইপুরে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট থাকা অবস্থায় বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর প্রথম দুটি বিখ্যাত উপন্যাস দুর্গেশনন্দিনী (১৮৬৫) ও কপালকুণ্ডলা (১৮৬৬) রচনা করেন। উপন্যাস দুটি দ্রুত প্রচার লাভ করে। পরবর্তীতে ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে তাঁর অন্যান্য গদ্য রচনাসহ মোট চৌদ্দটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়। ১৮৮০ থেকে বঙ্কিমমনীষা রাজনীতি ও ধর্মের দিকে অগ্রসর হয়। কারণ সেসময় তিনি একজন পুনরুত্থানবাদী সংস্কারক হওয়ার চেষ্টা করেন। আনন্দমঠ (১৮৮২) সম্ভবত বঙ্কিমচন্দ্রের শেষ স্মরণীয় সাহিত্যকীর্তি। পরবর্তীকালে তাঁর সব চিন্তা ধর্মীয় পুনরুত্থান ও জাতীয় নবজাগরণের কর্মকাণ্ডে আবর্তিত হয়। এ সময় থেকে বঙ্কিমচন্দ্রকে সৃষ্টিশীল চিন্তাবিদ ও লেখকের চেয়ে একজন দেশপ্রেমিক ও গর্বিত হিন্দু বলেই বেশি মনে হতো। তাঁর জীবন তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত হলেও তাঁর সৃষ্টিশীলতা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে বিস্ময়কর প্রভাব ফেলেছে।

সিরাজুল ইসলামের মতে, সাহিত্যজীবনের শেষ দিকে বঙ্কিমচন্দ্রকে সৃজনশীল সাহিত্যচর্চার চেয়ে হিন্দুধর্মের প্রকৃত স্বরূপ উদ্ঘাটনের প্রতিই বেশি মনোযোগী মনে হয়েছে। ১৮৮০-এর দিকে স্পষ্টতই তিনি সাহিত্যচর্চার চেয়ে ধর্মচর্চার প্রতি বেশি ঝুঁকে পড়েন। তিনি প্রাচীন ভারতের নৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠা চেয়েছিলেন। তাঁর এ ধারণা আনন্দমঠ (১৮৮২) ও দেবী চৌধুরাণী (১৮৮২) গ্রন্থে এবং ধর্মশাস্ত্র ও গীতার ভাষ্যে পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছে। তিনি নব্য হিন্দুবাদের একজন সংস্কারক এবং একটি হিন্দুজাতি গঠনের চেষ্টা করেছিলেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি আশ্চর্যজনকভাবে ইতিহাসের ধারাকে উপেক্ষা করেছেন। বিগত কয়েক শতকে বাংলার সমাজ ও হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কে যে পরিবর্তন ও পুনর্গঠন হয়েছে তা তাঁর মানসপটে ধরা পড়েনি। বাংলা যে ইতোমধ্যে একটি মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে পরিণত হয়েছে এবং এখানকার হিন্দু-মুসলমানরা যে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পারস্পরিক সহমর্মিতা ও সহযোগিতামূলক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে বসবাস করেছে, এ কথা মেনে নেওয়ার মতো মানসিকতা তাঁর ছিল না। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে সুসম্পর্ক হওয়া অসম্ভব। এ জন্যই তিনি হিন্দুধর্মের পুনরুত্থান এবং একটি একক হিন্দুজাতি গঠনের চিন্তা করেছিলেন। তাঁর ঐতিহাসিক উপন্যাসসমূহে- যেগুলির সঙ্গে প্রকৃত ইতিহাসের সম্পর্ক খুবই কম- হিন্দু দেশপ্রেম এবং হিন্দু জাতীয়তাবাদ প্রচারের প্রবণতাই লক্ষ করা যায়। তাঁর বিভিন্ন উপন্যাসে মুসলমানের বিরুদ্ধে হিন্দুর বিজয় দেখানো হয়েছে, যেমন: রাজসিংহ (১৮৮২) এবং সীতারাম (১৮৮৮)। কোন কোনটিতে আবার ব্রিটিশশক্তির বিরুদ্ধেও হিন্দুজাতির বিজয় দেখানো হয়েছে, যেমন: দেবী চৌধুরাণী এবং আনন্দমঠ।

সিরাজুল ইসলাম উল্লেখ করেন, বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর হিন্দুজাতির পুনরুত্থান বিষয়ক প্রবন্ধ ও গ্রন্থে ‘বন্দে মাতরম্’, ‘মাতৃভূমি’, ‘জন্মভূমি’, ‘স্বরাজ’, ‘মন্ত্র’ প্রভৃতি নতুন স্লোগান তৈরি করেন। পরবর্তীতে এগুলি হিন্দু জাতীয়তাবাদী, বিশেষ করে হিন্দু জঙ্গিরা ব্যবহার করেন। ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের মধ্যপন্থী রাজনৈতিক নেতারা প্রথম দিকে বঙ্কিমচন্দ্রের এই হিন্দু জাতীয়তাবাদী স্লোগানে খুব বেশি আগ্রহী ছিলেন না। কিন্তু স্বদেশী যুগের যুবসমাজের কাছে বঙ্কিমচন্দ্রের প্রচণ্ড জনপ্রিয়তা এবং তাঁর মতাদর্শে যুবসমাজের মধ্যে যে উদ্যম সৃষ্টি হয়েছিল, তা কংগ্রেসকে নতুনভাবে উজ্জীবিত করে এবং একটি জাতীয়তাবাদী দলে পরিণত হতে প্রভাবিত করে। এরপর কংগ্রেস তার জাতীয় রাজনীতির স্লোগান হিসেবে ‘বন্দে মাতরম্’কে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করে এবং সমগ্র ভারতবর্ষে তা ব্যবহৃত হতে থাকে। অতীতে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আদর্শ প্রচার এবং পরবর্তী জীবনে সাহিত্যব্যক্তিত্ব হিসেবে নিষ্ক্রিয়তা সত্ত্বেও বঙ্কিমচন্দ্র রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের আবির্ভাব পর্যন্ত সকলের কাছে, এমনকি শিক্ষিত মুসলিম সমাজের কাছেও সে সময়ের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক হিসেবে পরিগণিত হতেন।১ দেখা যাচ্ছে, ব্যক্তি বঙ্কিমের একটি বিশেষ চেতনাগত দিক সাহিত্যিক বঙ্কিমের কর্মধারায় পর্যবসিত হয়েছে। তা হতে পারে। কিন্তু ইতিহাসের উপাদান ব্যবহার করে সেগুলি তার উদ্দেশ্য সাধনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে গিয়ে উপাদানগুলির বিকৃতি ঘটিয়ে তাঁর কল্পিত ‘স্বপ্ন-রাজ্য’ গঠন করতে প্রয়াসী হয়েছেন বলে সমালোচকরা মনে করেন। আর এতেই তাঁর ‘স্বপ্ন-রাজ্যে’র মনোভূমির চিত্র ফুটে উঠেছে।

বঙ্কিমের চেতনার স্ফুরণ বঙ্কিমের বিভিন্ন রচনায় যে দৃষ্টিভঙ্গিগত দিক রয়েছে এবং সেটি স্ফুরিত হয়ে এক পর্যায়ে তা আদর্শগত রূপ লাভ করেছে। সেই বিষয়টি তুলে ধরতে তাঁর কয়েকটি উপন্যাস ও প্রবন্ধ আলোচিত হবে। বঙ্কিমের যে কয়টি ‘ঐতিহাসিক’ উপন্যাস রয়েছে তার মধ্যে ‘মৃণালিনী’ অন্যতম। ১৮৬৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয় ‘মৃণালিনী’ উপন্যাস। বঙ্গবিজয়ী বীর বখতিয়ার খলজির নওদীহ বা নবদ্বীপ এবং গৌড় বা লাখনৌতি অভিযানের পটভূমি নিয়ে এই উপন্যাস রচিত হয়। বখতিয়ার খলজি ১৭ জন সহচর নিয়ে গৌড়েশ^রের রাজপুরী অধিকার করেন- ইতিহাসবেত্তা মিনহাজ-ই-সিরাজের ‘তবকাত-ই-নাসিরীতে উল্লিখিত এই উক্তি সম্পর্কে এই উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র প্রশ্ন তোলেন ও বিদ্রƒপাত্মক ভাষায় এর সমালোচনা করেন। তিনি এই কাহিনী চিত্রিত করেন ‘মৃণালিনী’র ৪র্থ খণ্ডে। এর ৭ম পরিচ্ছেদের নামকরণ করা হয়েছে ‘যবন বিপ্লব’। বঙ্কিমচন্দ্র মুসলমানদের এখানে ‘যবন’ বলে অভিহিত করেছেন বারবার। তুর্কিদের ‘বঙ্গবিজয়’ বর্ণনা করতে গিয়ে তাঁর কল্পনার ভাষায় অত্যাচারের নারকীয় চিত্র তিনি দিয়েছেন এভাবে- “সেই নিশীথে নবদ্বীপ নগর বিজয়োন্মত্ত যবন সেনার নিúীড়নে বাত্যাসন্তাড়িত তরঙ্গেৎক্ষেপী সাগর সদৃশ চঞ্চল হইয়া উঠিল। রাজপথ ভূরি ভূরি অশ্বারোহীগণে, ভূরি ভূরি পদাতিকদলে, ভূরি ভূরি খড়গী, ধানুকী, শূলিসমূহ সমারোহে আচ্ছন্ন হইয়া গেল। সেনাবলহীন রাজধানীর নাগরিকেরা ভীত হইয়া গৃহমধ্যে প্রবেশ করিল; দ্বার রুদ্ধ করিয়া সভয়ে ইষ্টনাম জপ করিতে লাগিল। যবনেরা রাজপথে যে দুই একজন হতভাগ্য আশ্রয়হীন ব্যক্তিকে প্রাপ্ত হইল, তাহাদিগকে শূলবিদ্ধ করিয়া, কোথায়ও বা প্রাচীর উল্লঙ্ঘন করিয়া, কোথাও বা শঠতাপূর্বক ভীত গৃহস্থকে জীবনাশা দিয়া গৃহপ্রবেশ করিতে লাগিল। গৃহপ্রবেশ করিয়া গৃহস্থের সর্বস্বাপহরণ, পশ্চাৎ স্ত্রী-পুরুষ, বৃদ্ধ-বনিতা, বালক সকলেরই শিরñেদ, ইহাই নিয়মপূর্বক করিতে লাগিল। কেবল যুবতীর পক্ষে দ্বিতীয় নিয়ম। শোণিতে গৃহস্থের গৃহ সকল প্লাবিত হইতে লাগিল। শোণিতে রাজপথ পঙ্কিল হইল। শোণিতে যবনসেনা রক্তচিত্রময় হইল। অপহৃত দ্রব্যজাতের ভারে অশে^র পৃষ্ঠ এবং মনুষ্যের স্কন্ধ পীড়িত হইতে লাগিল। শূলাগ্রে বিদ্ধ হইয়া ব্রাহ্মণের মুণ্ডসকল ভীষণভাব ব্যক্ত করিতে লাগিল। ব্রাহ্মণের যজ্ঞোপবীত অশে^র গলদেশে দুলিতে লাগিল। সিংহাসনস্থ শালগ্রামশিলাসকল যবন-পদাঘাতে গড়াইতে লাগিল। ভয়ানক শব্দে নৈশাকাশ পরিপূর্ণ হইতে লাগিল। অশে^র পদধ্বনি, সৈনিকের কোলাহল, হস্তীর বৃংহতি, যবনের জয়শব্দ, তদুপরি পীড়িতের আর্তনাদ। মাতার রোদন, শিশুর রোদন; বৃদ্ধের করুণাকাক্সক্ষা, যুবতীর কণ্ঠবিদার।”২ উপন্যাসের সমালোচকগণ বলছেন, বঙ্কিম নানাভাবে ঐতিহাসিক মিনহাজ-ই-সিরাজের প্রদত্ত বিবরণকে অস্বীকার করার প্রবণতা দেখালেও উপরোক্ত লোমহর্ষক বর্ণনা তিনি কোথা থেকে সংগ্রহ করলেন তার কোনো সুলুক-সন্ধান পাওয়া যায়নি। তবে তিনি যে আপনার মতো করে একটি ‘স্বপ্ন-রাজ্য’ প্রতিষ্ঠার চেতনা লালন করছিলেন তাই নানাভাবে প্রকাশিত হতে দেখা যায়। ‘বঙ্কিমচন্দ্রজীবনী’ গ্রন্থ রচয়িতা অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য উল্লেখ করেন, “১৮৬৭ এপ্রিলে হিন্দুমেলার প্রবর্তন হয়। বঙ্কিমচন্দ্রের মনও ক্রমেই স্বদেশ-উন্মুখ হয়ে পড়ে। মৃণালিনীতে বঙ্কিমচন্দ্রের স্বাদেশিকতা সর্বপ্রথম সূচিত হয়। সপ্তদশ মুসলমান অশ্বারোহী কর্তৃক বঙ্গদেশ জয়ের প্রচলিত কাহিনী বঙ্কিমচন্দ্র আদৌ বিশ্বাস করতে পারেননি। তিনি বাঙালি জাতির শৌর্যবীর্যের প্রতি আস্থাশীল ছিলেন। বঙ্গের কলঙ্ক বঙ্কিমচন্দ্র বিশ্বাস করতে না পেরে মৃণালিনী উপন্যাস রচনায় প্রবৃত্ত হয়েছিলেন।”৩ বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয়ের ঘটনা কোনোভাবেই হজম করতে পারেননি বঙ্কিমচন্দ্র। তাই তিনি মৃণালিনীর চতুর্থ খণ্ড চতুর্থ পরিচ্ছেদে লিখেন, “ষোড়শ সহচর লইয়া মর্কটাকার বখতিয়ার খিলিজি গৌড়েশ্বরের রাজপুরী অধিকার করিল। ষষ্টি বৎসর পরে যবন-ইতিহাসবেত্তা মিনহাজউদ্দীন এইরূপ লিখিয়াছিলেন। ইহার কতদূর সত্য, কতদূর মিথ্যা, তাহা কে জানে? যখন মনুষ্যের লিখিত চিত্রে সিংহ পরাজিত, মনুষ্য সিংহের অপমানকতা স্বরূপ চিত্রিত হইয়াছিল, তখন সিংহের হস্তে চিত্রফলক দিলে কিরূপ চিত্র লিখিত হইত?”৪ সপ্তদশ অশ্বারোহীতে বাঙলা বিজয় প্রসঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্রের পর্যবেক্ষণ বিষয়ে অমিত্রসূদন আরো উল্লেখ করেন, “সপ্তদশ অশ্বারোহী দূরে থাকুক, বখতিয়ার খিলিজি বহুতর সৈন্য লইয়া বাঙ্গালা সম্পূর্ণরূপে জয় করিতে পারে নাই। বখতিয়ার খিলিজির পর সেনবংশীয় রাজাগণ পূর্ববাঙ্গালায় বিরাজ করিয়া অর্ধেক বাঙ্গালা শাসন করিয়া আসিলেন। তাহার ঐতিহাসিক প্রমাণ আছে। উত্তর বাঙ্গালা, দক্ষিণ বাঙ্গালা, কোনো অংশই বখতিয়ার খিলিজি জয় করিতে পারে নাই। লক্ষ্মণাবতীনগরী এবং তাহার পরিপার্শ্বস্থ প্রদেশ ভিন্ন বখতিয়ার খিলিজি সমস্ত সৈন্য লইয়াও কিছু জয় করিতে পারে নাই। সপ্তদশ অশ্বারোহী লইয়া বখতিয়ার খিলিজি বাঙ্গালা জয় করিয়াছিল- এ কথা যে বাঙ্গালিতে বিশ্বাস করে, সে কুলাঙ্গার।”৫ অন্যদিকে গবেষক অপর্ণাপ্রসাদ সেনগুপ্ত বঙ্কিমচন্দ্রের পক্ষে কৈফিয়ত হাজির করে বলেন, “ইংরাজ শাসনের ফলে বাঙালির হাতে তখন রাজশক্তি ব্যতীত অপর সকল প্রকার ক্ষমতা আসিয়াছে। এই সময় তাহাদের মনে স্বাজাত্যবোধ সৃষ্টি করিলে পরিণামে তাহাদের উপকার হইবে। এই স্বাজাত্যবোধ্য এবং শ্রেষ্ঠত্ববোধের সহায়করূপে উপন্যাসের জন্য তিনি মুসলমান আমলের হিন্দু-মুসলমানের প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্রগুলো বাছিয়া লইলেন। বঙ্কিমের এই স্বাজাত্যবোধ দুর্গেশনন্দিনী অথবা কপালকুণ্ডলার সময় তেমন প্রখর হইয়া আত্মপ্রকাশ করে নাই। উহা তখন অবচেতন অবস্থায় ছিল। ‘মৃণালিনী’ উপন্যাস তাঁহার স্বাজাত্যবোধের প্রথম ফল। উহার প্রেরণায় তিনি সপ্তদশ তুর্কী অশ্বারোহী কর্তৃক বঙ্গদেশ বিজিত হওয়ার কাহিনী অলীক বলিয়া বর্ণনা করিলেন।”৬

স্বপ্নরাজ্যের সীমানায় বঙ্কিমচন্দ্রের ‘স্বপ্ন-রাজ্য’ গড়ে উঠেছিল ‘কামরূপ’কে কেন্দ্র করে- তা তার চরিত্রদের কথোপকথনে পরিষ্কার হয়। ‘মৃণালিনী’ উপন্যাসের মাধবাচার্যকে দিয়ে হেমচন্দ্রকে আশ্বাস দিয়েছেন এইভাবে- মাধব: তুমি দিল্লি গিয়া যবনের মন্ত্রণা কি জানিয়া আসিয়াছ? হেমচন্দ্র: যবনেরা বঙ্গবিজয়ের উদ্যোগ করিতেছে। অতি ত্বরায় বখতিয়ার খিলজি সেনা লইয়া, গৌড়ে যাত্রা করিবে। মাধবাচার্যের মুখ হর্ষপ্রফুল্ল হইল। তিনি কহিলেন, ‘এত দিনে বিধাতা বুঝি এ দেশের প্রতি সদয় হইলেন।’ হেমচন্দ্র একতানমনে মাধবাচার্যের প্রতি চাহিয়া তাহার কথার প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন। মাধবাচার্য বলিতে লাগিলেন, “কয় মাস পর্যন্ত আমি কেবল গণনায় নিযুক্ত আছি, গণনায় যাহা ভবিষ্যৎ বলিয়া প্রতিপন্ন হইয়াছে, তাহা ফলিবার উপক্রম হইয়াছে।” হেমচন্দ্র: কি প্রকার? মাধব: গণিয়া দেখিলাম যে, যবনসাম্রাজ্য-ধ্বংস বঙ্গরাজ্য হইতে আরম্ভ হইবে। হেমচন্দ্র: তাহা হইতে পারে। কিন্তু কতকালেই বা তাহা হইবে? আর কাহা কর্তৃক? মাধব: তাহাও গণিয়া স্থির করিয়াছি। যখন পশ্চিমদেশীয় বণিক বঙ্গরাজ্যে অস্ত্রধারণ করিবে, তখন যবনরাজ্য উৎসন্ন হইবেক। মাধবাচার্য কহিলেন, “বৎস! দুঃখিত হইও না। দৈবনির্দেশ কখনও বিফল হইবার নহে। আমি যখন গণনা করিয়াছি যে, যবন পরাভূত হইবে, তখন নিশ্চয়ই জানিও, তাহারা পরাভূত হইবে। যবনেরা নবদ্বীপ অধিকার করিয়াছে বটে, কিন্তু নবদ্বীপ ত গৌড় নহে। প্রধান রাজা সিংহাসন ত্যাগ করিয়া পলায়ন করিয়াছেন। কিন্তু এই গৌড় রাজ্যে অনেক করপ্রদ রাজা আছেন; তাঁহারা ত এখনও বিজিত হয়েন নাই। কে জানে যে, সকল রাজা একত্র হইয়া প্রাণপণ করিলে, যবন বিজিত না হইবে?” হেমচন্দ্র কহিলেন, “তাহার অল্পই সম্ভাবনা।” মাধবাচার্য কহিলেন, “জ্যোতিষীর গণনা মিথ্যা হইবার নহে, অবশ্য সফল হইবে। তবে আমার এক ভ্রম হইয়া থাকিবে। পূর্ব্বদেশে যবন পরাভূত হইবে- ইহাতে আমরা নবদ্বীপেই যবন জয় করিবার প্রত্যাশা করিয়াছিলাম। কিন্তু গৌড়রাজ্য ত প্রকৃত পূর্ব্ব নহে- কামরূপই পূর্ব্ব। বোধ হয়, তথায়ই আমাদিগের আশা ফলবতী হইবে।” হেমচন্দ্র: কিন্তু এক্ষণে ত যবনের কামরূপ যাওয়ার কোন সম্ভাবনা দেখি না। মাধব: এই যবনেরা এ পর্যন্ত পুনঃপুন জয়লাভ করিয়া অজেয় বলিয়া রাজগণমধ্যে প্রতিপন্ন হইয়াছে। ভয়ে কেহ তাহাদের বিরোধী হইতে চাহে না। তাহারা একবার মাত্র পরাজিত হইলে, তাহাদিগের সে মহিমা আর থাকিবে না। তখন ভারতবর্ষীয় তাবৎ আর্যবংশীয় রাজারা ধৃতাস্ত্র হইয়া উঠিবেন। সকলে এক হইয়া অস্ত্রধারণ করিলে যবনেরা কত দিন তিষ্ঠিবে? হেমচন্দ্র: গুরুদেব! আপনি আশামাত্রেই আশ্রয় লইতেছেন; আমিও তাহাই করিলাম। এক্ষণে আমি কি করিব- আজ্ঞা করুন। মাধব: আমিও তাহাই চিন্তা করিতেছিলাম। এ নগরমধ্যে তোমার আর অবস্থিতি করা অকর্ত্তব্য; কেন না, যবনেরা তোমার মৃত্যুসাধন সঙ্কল্প করিয়াছে। আমার আজ্ঞা- তুমি অদ্যই এ নগর ত্যাগ করিবে। হেমচন্দ্র: কোথায় যাইব? মাধব: আমার সঙ্গে কামরূপ চল।৭ উপন্যাসে যবন নিপাত বা যবনকে তাড়ানো ‘দেবকার্য’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মাধবাচার্য হেমচন্দ্রকে তীব্র ভর্ৎসনা করে বলছেন যে, “তুমি দেবকার্য না সাধিলে কে সাধিবে? তুমি যবনকে না তাড়াইলে কে তাড়াইবে? যবন-নিপাত তোমার একমাত্র ধ্যানস্বরূপ হওয়া উচিত। এখন মৃণালিনী তোমার মন অধিকার করিয়া থাকে কেন? একবার তুমি মৃণালিনীর আশায় মথুরায় না থাকিয়া মগধে থাকিতে, তবে মগধ জয় কেন হইবে।”৮ বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর স্বপ্ন-রাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য ইংরেজকেও বাহন হিসেবে মেনে নিতে কুণ্ঠিত নন। আনন্দমঠের অষ্টম পরিচ্ছেদে তার প্রকাশ দেখুন: “সত্যানন্দ ঠাকুর রণক্ষেত্র হইতে কাহাকে কিছু না বলিয়া আনন্দমঠে চলিয়া আসিলেন। সেখানে গভীর রাত্রে, বিষ্ণুমণ্ডপে বসিয়া ধ্যানে প্রবৃত্ত। এমত সময়ে সেই চিকিৎসক সেখানে আসিয়া দেখা দিলেন। দেখিয়া, সত্যানন্দ উঠিয়া প্রণাম করিলেন। চিকিৎসক বলিলেন, ‘সত্যানন্দ, আজ মাঘী পূর্ণিমা।’ সত্যানন্দ: চলুন- আমি প্রস্তুত। কিন্তু হে মহাত্মন্! আমার এক সন্দেহ ভঞ্জন করুন। আমি যে মুহূর্তে যুদ্ধজয় করিয়া সনাতনধর্ম্ম নিষ্কণ্টক করিলাম- সেই সময়েই আমার প্রতি এ প্রত্যাখ্যানের আদেশ কেন হইল? যিনি আসিয়াছিলেন, তিনি বলিলেন, “তোমার কার্য সিদ্ধ হইয়াছে, মুসলমানরাজ্য ধ্বংস হইয়াছে। আর তোমার এখন কোন কার্য নাই। অনর্থক প্রাণিহত্যার প্রয়োজন নাই।” সত্যনান্দ: মুসলমানরাজ্য ধ্বংস হইয়াছে, কিন্তু হিন্দুরাজ্য স্থাপিত হয় নাই- এখনও কলিকাতায় ইংরেজ প্রবল। তিনি: হিন্দুরাজ্য এখন স্থাপিত হইবে না- তুমি থাকিলে এখন অনর্থক নরহত্যা হইবে। অতএব চল। শুনিয়া সত্যানন্দ তীব্র মর্মপীড়ায় কাতর হইলেন। বলিলেন, “হে প্রভু! যদি হিন্দুরাজ্য স্থাপিত হইবে না, তবে কে রাজা হইবে? আবার কি মুসলমান রাজা হইবে?” তিনি বলিলেন, “না, এখন ইংরেজ রাজা হইবে।”

সত্যানন্দের দুই চক্ষে জলধারা বহিতে লাগিল। তিনি উপরিস্থিতা, মাতৃরূপা, জন্মভূমি প্রতিমার দিকে ফিরিয়া জোড়হাতে বাম্পনিরুদ্ধস্বরে বলিতে লাগিলেন, “হায় মা! তোমার উদ্ধার করিতে পারিলাম না- আবার তুমি ম্লেচ্ছের হাতে পড়িবে। সন্তানের অপরাধ লইও না। হায় মা! কেন আজ রণক্ষেত্রে আমার মৃত্যু হইল না!” চিকিৎসক বলিলেন, “সত্যানন্দ কাতর হইও না। তুমি বুদ্ধির ভ্রমক্রমে দস্যুবৃত্তির দ্বারা ধন সংগ্রহ করিয়া রণজয় করিয়াছ। পাপের কখন পবিত্র ফল হয় না। অতএব তোমরা দেশের উদ্ধার করিতে পারিবে না। আর যাহা হইবে, তাহা ভালোই হইবে। ইংরেজ রাজা না হইলে সনাতনধর্ম্মের পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা নাই।”৯ আপন স্বপ্ন-রাজ্য প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে বঙ্কিমচন্দ্র এতোটাই ‘যবনবিদ্বেষী’ হয়ে ওঠেন যে, তিনি যবননিপাতে তাঁর চরিত্রগুলিকে লেলিয়ে দেন। যেমন: সত্যানন্দ ও মহেন্দ্র নগরের কারাগারে বন্দী হলে, সমবেত সন্তানদের উদ্দেশ্যে মঠের দ্বারে দাঁড়াইয়া তরবারি হস্তে জ্ঞানানন্দ উচ্চৈঃস্বরে বলিতে লাগিলেন, “আমরা অনেকদিন হইতে মনে করিয়াছি যে, এই বাবুইয়ের বাসা ভাঙ্গিয়া এই যবনপুরী ছারখার করিয়া নদীর জলে ফেলিয়া দিব। এই শুয়ারের খোঁয়াড় আগুনে পোড়াইয়া মাতা বসুমতীকে আবার পবিত্র করিব। ভাই আজ সেই দিন আসিয়াছে। আমাদের গুরুর গুরু যিনি অনন্ত জ্ঞানময়,...যিনি দেশ হিতৈষী...যিনি আমাদের শক্তির উপায়, তিনি আজ মুসলমানদের কারাগারে বন্দী। আমাদের তরবারে কি ধার নাই?... চল আমরা যবনপুরী ভাঙ্গিয়া ধূলি গুঁড়ি দিই। সেই বাবুইয়ের বাসা ভাঙ্গিয়া খড় কুটা বাতাসে উড়াইয়া দিই।” সন্তান সেনারা কারাগার ভেঙে মহেন্দ্র ও সত্যানন্দকে মুক্ত করে যেখানে মুসলমানের গৃহ দেখিল আগুন ধরাইয়া দিলো। কিন্তু তারা কামান ও বন্দুকের কাছে পরাজিত হয়ে পলায়ন করলো। মহেন্দ্র সন্তানদের মন্ত্রে দীক্ষিত হলো। মহেন্দ্রকে সত্যানন্দ তাদের ব্রতের উদ্দেশ্য জানালেন, “আমরা রাজ্য চাহি না- কেবল মুসলমানেরা ভগবানের বিদ্বেষী বলিয়া তাহাদের বংশ নিপাত করিতে চাই।”১০ ‘মৃণালিনী’ উপন্যাস প্রসঙ্গে সুপ্রিয়া সেনের অভিমত, ‘হিন্দুর স্বদেশপ্রীতি জাগ্রত করার জন্য বখতিয়ারকে মিথ্যাবাদী, কুচক্রী ও ভণ্ড করে এঁকেছেন এবং অন্তিম আশার সঞ্চার করেছেন- পশ্চিম দেশীয় বণিক কর্তৃক ‘যবন’ রাজত্বের অবসানের সম্ভাবনার কথা বলে। এর সঙ্গে মুসলমান বিরোধী বীরত্বের এক হাস্যকর রূপায়ণ আছে যখন হেমচন্দ্র নগরমধ্যে একা প্রচুর মুসলমান সৈন্যের সঙ্গে যুদ্ধ করে অবিজিত থাকেন’।১১ সুপ্রিয়া সেনের সঙ্গে একমত হয়ে বলতে হয়- হিন্দুরাজ্য তথা কাক্সিক্ষত ‘স্বপ্নরাজ্য’ পুনরুদ্ধার করতে গিয়ে বঙ্কিম হিন্দু মুসলমানদের সম্পর্ককে তিক্ত করার চেষ্টা করেছেন। আর ‘মৃণালিনী’ উপন্যাস তারই সূচনা।

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ ও বিশ্লেষণ বঙ্কিমচন্দ্রের ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ ও বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি একদিকে মুসলমানদের (তাঁর ভাষায় যবন) ধ্বংস করতে চান এবং বিপরীতে তাঁর জাতিকে তথা হিন্দুদেরকে সেই ধ্বংসস্তূপে সমাসীন করতে চান। আনন্দমঠ উপন্যাসের ছোট্ট একটি উদ্ধৃতি দেওয়া যেতে পারে। “সেই এক রাত্রের মধ্যে গ্রামে গ্রামে নগরে নগরে মহাকোলাহল পড়িয়া গেল। সকলে বলিল, “মুসলমান পরাভূত হইয়াছে, দেশ আবার হিন্দুর হইয়াছে। সকলে একবার মুক্তকণ্ঠে হরি হরি বল।” গ্রাম্য লোকেরা মুসলমান দেখিলেই তাড়াইয়া মারিতে যায়। কেহ কেহ সেই রাত্রে দলবদ্ধ হইয়া মুসলমানদিগের পাড়ায় গিয়া তাহাদের ঘরে আগুন দিয়া সর্বস্ব লুঠিয়া লইতে লাগিল। অনেক যবন নিহত হইল, অনেক মুসলমান দাড়ি ফেলিয়া গায়ে মৃত্তিকা মাখিয়া হরিনাম করিতে আরম্ভ করিল, জিজ্ঞাসা করিলে বলিতে লাগিল, ‘মুই হেঁদু’।” “হিন্দুরা বলিতে লাগিল, আসুক, সন্ন্যাসীরা আসুক, মা দুর্গা করুন, হিন্দুর অদৃষ্টে সেই দিন হউক।” মুসলমানেরা বলিতে লাগিল, “আল্লাহু আকবর! এতনা রোজের পর কোরান শরিফ বেবাক কি ঝুটো হলো; মোরা যে পাঁচ ওয়াক্ত নমাজ করি, তা এই তৈলককাটা হেঁদুর দল ফতে করতে নারলাম। দুনিয়া সব ফাঁকি।”... ইত্যাদি।১২ বঙ্কিমের এই চিন্তাধারার বিষয়টি পণ্ডিতগণ আমলে নিয়ে তাঁদের আলোচনায় উপস্থাপন করেছেন। ড. আহমদ শরীফ লিখেছেন, “সাহিত্যক্ষেত্রে বঙ্কিমের আবির্ভাব ঘটে সংস্কারমুক্ত জিজ্ঞাসু মানুষ হিসাবে এবং তাঁর তিরোভাব ঘটে একজন খাঁটি হিন্দু হিসেবে। অতএব বঙ্কিম-সাহিত্য হচ্ছে মানুষ বঙ্কিমের হিন্দু বঙ্কিম ক্রম-পরিণতির ইতিকথা ও আলেখ্য।”১৩ আনন্দমঠের বিশ্লেষণ করতে গিয়ে মোহাম্মদ সাদউদ্দিন বলেন, “...বন্দেমাতরম আধুনিক কালের ঋকমন্ত্রের পরিবর্তে উগ্র হিন্দুত্ববাদকে সবচেয়ে প্রকটিত করেছে। বাঙালির নবযুগ চেতনা বা রেনেসাঁসের পরিবর্তে হিন্দু জাতীয়তাবাদকে উজ্জীবিত করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে সুনীলকুমার বসু তাঁর ‘বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়’ গ্রন্থে বলেন, ১৮৮২-তে কলকাতায় বঙ্কিম প্রায়ই হিন্দুধর্ম বিষয়ে বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করতেন। কোনো নির্দেশে হঠাৎ তিনি ‘রাজসিংহ’ ও ‘আনন্দমঠ’ প্রকাশ করেন- এই বই দুটির কারণে অবিভক্ত বঙ্গের মুসলমান তাঁর কলমের আঘাতে আহত হন।”১৪

ধর্মীয় উজ্জীবন বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর স্বপ্ন-রাজ্যের আদর্শ হিসেবে হিন্দুধর্মকেই বেছে নিয়েছিলেন- এটি কোনো গোপন বিষয় ছিল না। তিনি তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য তার ধর্মের উজ্জীবন ঘটাতে প্রয়াসী হন। এ জন্য তিনি কিছু প্রবন্ধও রচনা করেন। এ বিষয়ে অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য আলোচনা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ‘হিন্দু ধর্ম’ প্রবন্ধে বঙ্কিমচন্দ্র বলেছেন- “সম্প্রতি সুশিক্ষিত বাঙ্গালিদিগের মধ্যে হিন্দুধর্মের আলোচনা দেখা যাইতেছে। অনেকেই মনে করেন যে, আমরা হিন্দুধর্মের প্রতি ভক্তিমান্ হইতেছি। যদি এ কথা সত্য হয়, তবে আহ্লাদের বিষয় বটে। জাতীয় ধর্মের পুনর্জীবন ব্যতীত ভারতবর্ষের মঙ্গল নাই, ইহা আমাদিগের দৃঢ় বিশ্বাস।”১৫ ‘হিন্দু’র অধঃপতন নিয়েও তিনি ভাবিত ছিলেন। প্রবন্ধে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন, “আর একটি হিন্দুর কথা বলি। তাঁহার অভক্ষ্য প্রায় কিছুই নাই। যে-কোন জাতির অন্ন গ্রহণ করেন। যবন ও ম্লেচ্ছের সঙ্গে একত্র ভোজনে কোন আপত্তি করেন না। সন্ধ্যা আহ্নিক ক্রিয়া কর্ম কিছুই করেন না।” প্রবন্ধের শেষে বঙ্কিমচন্দ্রের বক্তব্য: “আমরা বলিতেছিলাম যে, যেটুকু হিন্দুধর্মের প্রকৃত মর্ম, যেটুকু সারভাগ, যেটুকু প্রকৃত ধর্ম, সেইটুকু অনুসন্ধান করিয়া আমাদের স্থির করা উচিত। তাহাই জাতীয় ধর্ম বলিয়া অবলম্বন করা উচিত। যাহা প্রকৃত হিন্দুধর্ম নহে, যাহা কেবল অপবিত্র কলুষিত দেশাচার বা লোকাচার, ছদ্মবেশে ধর্ম বলিয়া হিন্দুধর্মের ভিতর প্রবেশ করিয়াছে, যাহা কেবল অলীক উপন্যাস, যাহা কেবল কাব্য, অথবা প্রত্নতত্ত্ব, যাহা কেবল ভণ্ড এবং স্বার্থপরদিগের স্বার্থসাধনার্থ সৃষ্ট হইয়াছে, এবং অজ্ঞ ও নির্বোধগণ কর্তৃক হিন্দুধর্ম বলিয়া গৃহীত হইয়াছে, যাহা কেবল বিজ্ঞান, অথবা ভ্রান্ত এবং মিথ্যা বিজ্ঞান, যাহা কেবল ইতিহাস, অথবা কেবল কল্পিত ইতিহাস, কেবল ধর্মগ্রন্থমধ্যে বিন্যস্ত বা প্রক্ষিপ্ত হওয়া ধর্ম বলিয়া গণিত হইয়াছে, সে সকল এখন পরিত্যাগ করিতে হইবে। যাহাতে মনুষ্যের যথার্থ উন্নতি, শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিক সর্ববিধ উন্নতি হয়, তাহাই ধর্ম। এইরূপ উন্নতিকর তত্ত্ব লইয়া সকল ধর্মেরই সারভাগ গঠিত, এইরূপ উন্নতিকর তত্ত্বসকল, সকল ধর্মাপেক্ষা হিন্দুধর্মেই প্রবল। হিন্দুধর্মেই তাহার প্রকৃত সম্পূর্ণতা আছে। হিন্দুধর্মে যেরূপ আছে, এরূপ আর কোন ধর্মেই নাই। সেইটুকু সারভাগ। সেইটুকুই হিন্দুধর্ম। সেটুকু ছাড়া আর যাহা থাকে- শাস্ত্রে থাকুক, অশাস্ত্রে থাকুক বা লোকাচারে থাকুক- তাহা অধর্ম। যাহা ধর্ম, তাহা সত্য, যাহা অসত্য, তাহা অধর্ম। যদি অসত্য মনুতে থাকে, মহাভারতে থাকে বা বেদে থাকে, তবু অসত্য, অধর্ম বলিয়া পরিহার্য।”১৬ বঙ্কিমচন্দ্রের ধর্মভাব প্রসঙ্গে রশিদ আল ফারুকী উল্লেখ করেন, বিভ্রান্তির আবরণ সরালে দেখা যাবে, শেষ বয়সের বঙ্কিমচন্দ্রের মধ্যে আসলে একজন নৈয়ায়িক কুলীন ব্রাহ্মণের অধিষ্ঠান হয়েছে যাঁর দেশ নৈহাটীর সন্নিকটস্থ কাঁঠালপাড়ার, সুতরাং যিনি গোত্র-সম্বন্ধে প্রতিম ক্রিয়ার অচল দুর্গ বলে কথিত ভট্টপল্লীর আত্মীয়। .... বঙ্কিমচন্দ্রের বেলায় ঘটেছিল সম্পূর্ণ বিপরীত ব্যাপার। তাঁর নব্যন্যায়ীরুলভ কুশাগ্র বুদ্ধি আর ক্ষুরধার মনীষা কোন কাজে-ই লাগলো না, শেষ পর্যন্ত তাকে হিন্দু মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের শ্রেণীস্বার্থের একজন উৎসাহী প্রবক্তা, হিন্দুসমাজের এক রক্ষণশীল সমাজপিতা এবং নয়াহিন্দুয়ানীর এক প্রচণ্ডবিক্রমী উকিলে রূপান্তরিত করে ছাড়ল।১৭

উপসংহার বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রচনাসমূহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি সেগুলোকে তাঁর ‘জাতিসত্তা’র পুনর্জাগরণ, গঠন ও বিকাশের কাজে ব্যবহার করেছেন। এতে হয়তো তেমন দোষের কিছু নেই। কেননা, লেখক তার জাতির জন্য মেধা, প্রতিভা ও লেখক-দক্ষতা ব্যবহার করতেই পারেন। কিন্তু অন্য জাতি বা সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষের হলাহল ঢেলে দেওয়ার মাধ্যমে নিজ জাতির গৌরব প্রকাশের চেষ্টায় কোনো গৌরব নেই। বঙ্কিম যেমন একজন দক্ষ কথাশিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হয়েছেন তেমনই সেই শিল্পের নেতিবাচক ব্যবহার করে নিজের স্বপ্ন-রাজ্য সম্পর্কে একটি রূপরেখাও প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। ফলে একটি শিল্প নিছক শিল্প হয়ে থাকেনি- জাতিগত বা সম্প্রদায়গত লক্ষ্য অর্জনের হাতিয়ারেও পরিণত হতে পেরেছে। এটি দোষের কিনা তা শিল্প-সাহিত্যের বিশ্লেষক-সমালোচকগণ নির্ধারণ করতে পারেন। হ

তথ্যনির্দেশ

১. সিরাজুল ইসলাম: বাংলাপিডিয়া, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ, ঢাকা। ২. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টপাধ্যায়: মৃণালিনী, উপন্যাস সমগ্র, খান ব্রাদার্স এন্ড কো: ঢাকা, ফেব্রুয়ারি, ২০১৩। ৩. অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য: বঙ্কিমচন্দ্রজীবনী, আনন্দ পাবলিশার্স, কোলকাতা, ষষ্ঠ মুদ্রণ জুলাই ২০১৭, পৃ. ১০০। ৪. প্রাগুক্ত। ৫. প্রাগুক্ত। ৬. অপর্ণাপ্রসাদ সেনগুপ্ত: বাঙ্গালা ঐতিহাসিক উপন্যাস, ক্যালকাটা বুক হাউজ, কোলকাতা, ভাদ্র, ১৩৬৭ বঙ্গাব্দ, পৃ. ৩১। ৭. বঙ্কিম উপন্যাস সমগ্র, রিফ্লেক্ট পাবলিকেশন, কলকাতা। ৮. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টপাধ্যায়: মৃণালিনী, উপন্যাস সমগ্র, খান ব্রাদার্স এন্ড কো: ঢাকা, ফেব্রুয়ারি, ২০১৩। ৯. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টপাধ্যায়: আনন্দমঠ, প্রাগুক্ত। ১০. প্রাগুক্ত। ১১. সুপ্রিয়া সেন: ঊনবিংশ শতাব্দীর স্বদেশ চিন্তা ও বঙ্কিম, কোলকাতা, ১৯৯৬, পৃ. ১৩। ১২. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টপাধ্যায়: আনন্দমঠ, উপন্যাস সমগ্র, খান ব্রাদার্স এন্ড কো: ঢাকা, ফেব্রুয়ারি, ২০১৩, পৃ. ৭৮০। ১৩. ড. আহমদ শরীফ: বঙ্কিম সমীক্ষা: অন্য নিরিখে, ভাষা ও সাহিত্যপত্র, ঢাকা ৩য় বর্ষ, ১৩৮২ বঙ্গাব্দ। ১৪. মোহাম্মদ সাদউদ্দিন: ইতিহাস ও সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতা, শোভা প্রকাশ, ঢাকা, ২০১৭, পৃ. ২২। ১৫. অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য: বঙ্কিমচন্দ্রজীবনী, আনন্দ পাবলিশার্স, কোলকাতা, ষষ্ঠ মুদ্রণ জুলাই ২০১৭, পৃ. ৫৩৭। ১৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ৬৬২। ১৭. রশিদ আল ফারুকী: বঙ্কিমসাহিত্য পরিক্রমা, ভূমিকা, প্রথম সংস্করণ, নভেম্বর, ১৯৮৭, মুক্তধারা, ঢাকা। লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও গ্রন্থকার

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির