বন্ধু এবং শত্রু -মুনতাজ আল জাইদি

“দুর্ভাগ্য আমার, আমি যদি অমুককে (নিজের) বন্ধু না বানাতাম! আমার কাছে (দ্বীনের) উপদেশ আসার পর সে তা থেকে আমাকে বিচ্যুত করে দিয়েছিলো; আর শয়তান তো (হামেশাই) মানুষকে (বিপদের সময় একলা) ফেলে কেটে পড়ে।
– সূরা ফুরকান : ২৮-২৯

আয়াত দুটো আমাদের ডায়েরিতে নোট করে রাখার মতো। আমাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলো নষ্ট করে অসৎ বন্ধু। অনেকের দ্বীনি পরিবেশ থেকে বিচ্যুত হওয়ার কারণ তাদের অসৎ চরিত্রের বন্ধুগুলোই। বন্ধুত্বহীন হয়ে তো কেউ চলতে পারে না। কারো কারো ভালো বন্ধু থাকে আবার কারো থাকে খারাপ বন্ধু। বন্ধু মানুষের জীবনকে কঠিনভাবে প্রভাবিত করে। তাই কাউকে অন্তরঙ্গ বন্ধু ভাবার আগে যদি ব্যক্তি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হয় তাহলে সে বন্ধুই তাকে মন্দের দিকে নিয়ে যায়। তাকে দ্বীনি পরিবেশ থেকে দূরে সরিয়ে নেয়। আল্লাহর নাফারমানিতে লিপ্ত হওয়ার পথ সহজ করে দেয়।
রাসূল সা.-এর মাক্কী যুগে উবাই ইবনু খালফ ও উকবা ইবনু আবি মুআইত ছিল একে অপরের অন্তরঙ্গ বন্ধু। একদিন উকবা রাসূল সা.-এর মজলিশে এসে কিছু কথা শুনলো। সেটা জেনে গিয়েছিলে উবাই ইবনু খালাফ।
তখন উবাই উকবার কাছে এসে পৌঁছালো, আর জিজ্ঞেস করলো তুমি নাকি মুহাম্মদের সাথে উঠাবসা শুরু করেছো?
তার কথা শুনছো?
আমি আর তোমার সাথে কথা বলব না। তখন উবাই শপথ করে বললো, তুমি যদি আর মুহাম্মদের কাছে যাও তাহলে তোমার চেহারা আমি দেখব না, আর যদি চাও আমাদের বন্ধুত্ব টিকে থাকুক তাহলে তোমাকে মুহাম্মদের মুখে থুথু মেরে আসতে হবে! (নাউজুবিল্লাহ)
অভিশপ্ত উকবা তখন বন্ধুত্বের সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে দিশেহারা হয়ে আল্লাহর রাসূলের সা.-এর মুখে থুথু নিক্ষেপ করতে বেরিয়ে পড়লো; বন্ধুত্বের সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে আল্লাহর দ্বীন ও রাসূল সা.-এর অবাধ্যতায় লিপ্ত হলো; আর আল্লাহর হিদায়াত থেকে ছিটকে পড়লো। (সিরাত ইবনে হিশাম)
জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো বেশির ভাগ বন্ধুর কাছ থেকে আসে। যদি বন্ধু খোদাদ্রোহী হয় চরিত্রহীন হয় লম্পট হয় তাহলে তার সিদ্ধান্ত কেমন হবে ব্যক্তিই ভালো জানে। কোনো কোনো ব্যক্তি কিয়ামতের দিন আফসোস করে বলবে, অমুককে যদি বন্ধু না বানাতাম তাহলে আমিও আজ মুত্তাকিনদের অন্তর্ভুক্ত হতাম। কিন্তু সেদিন তার আফসোস কোনো কাজে আসবে না। কার সাথে কি কথা বলেছে, কোথায় সময় নষ্ট করেছে, অসৎ বন্ধুর সাথে নীরবে নিভৃতে কোথায় গিয়েছে, পার্কে গিয়ে কার সাথে দেখা করেছে, রাতের অন্ধকারে অসৎ বন্ধুর সাথে কখন কোথায় নেশায় লিপ্ত হয়েছে, কোন গার্লফ্রেন্ডের সাথে কেমন চ্যাটিং করেছে প্রতিটি কাজের হিসাব সেদিন নেয়া হবে। কারো সাথে বিন্দু পরিমাণ বেইনসাফি করা হবে না। কোনো দলীয় আধিপত্য থাকবে না, স্বজনপ্রীতি থাকবে না।
এমন কঠিন পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে আল্লাহ বলেন, (অতঃপর তাদের সামনে) আমলনামা রাখা হবে, (তখন) নাফরমান ব্যক্তিদের তুমি দেখবে, সে আমলনামায় যা কিছু লিপিবদ্ধ আছে তার কারণে তারা (খুবই) আতঙ্কগ্রস্ত থাকবে, তারা বলতে থাকবে, হায় দুর্ভাগ্য আমাদের, এ (আবার) কেমন গ্রন্থ! এ তো (দেখছি আমাদের জীবনের) ছোটো কিংবা বড়ো প্রত্যেক বিষয়েরই হিসাব রেখেছে, তারা যা কিছু করেছে তার প্রতিটি বস্তুই তারা (সে গ্রন্থে) মজুদ দেখবে, তোমার মালিক (সেদিন) কারো ওপর বিন্দুমাত্র জুলুম করবেন না। (সূরা কাহ্ফ : ৪৯)
বিচারদিনে এমন পরিস্থিতি দেখে তখন বান্দা আফসোস করতে থাকবে। আর বলবে যদি আমাদের আবার সুযোগ দেয়া হতো আমরা ভালো হয়ে যেতাম।
সেদিন তাদের অসৎ বন্ধুগুলো কোনো কাজে আসবে না। প্রত্যেকে নিজের কৃতকর্মের জন্য চিন্তিত থাকবে।
নিজের মন্দ কর্মের ফলাফল প্রত্যক্ষ করে বলবে যদি আমাদের আবার সুযোগ দিতো! আমরা ভালো হয়ে যেতে পারতাম। অসৎ বন্ধুদের পরিত্যাগ করে একেবারে দ্বীনের জন্য সময় ব্যয় করতাম!
তাদের এ আফসোসের কথা আল্লাহ কুরআনে উল্লেখ করেছেন, “তুমি যদি (সত্যিই তাদের) দেখতে পেতে যখন এই (হতভাগ্য) ব্যক্তিদের (জ্বলন্ত) আগুনের পাশে এনে দাঁড় করানো হবে, তখন তারা (চিৎকার করে) বলবে, হায়! যদি আমাদের আবার (দুনিয়ায়) ফেরত পাঠানো হতো, তাহলে আমরা (আর কখনো) আমাদের মালিকের আয়াত সমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতাম না এবং আমরা (অবশ্যই) ঈমানদার লোকদের দলে শামিল হয়ে যেতাম।” (সূরা আনআম : ২৭)
যখন যে যার প্রাপ্য বুঝে পাবে তখন মুমিনরা জান্নাতের দিকে অগ্রসর হবে। মুনাফিক ও কাফেরা বলবে আমাদের জন্য একটু অপেক্ষা করো, আমরাও তোমাদের সাথে ছিলাম। তোমার সাথে থাকতাম, বাজারে যেতাম, কলেজে পড়তাম, বিয়েতে যেতাম। আজ তোমার আমাদের রেখে চলে যাচ্ছো? পবিত্র কুরআনের তাদের বক্তব্যটি এভাবে উল্লেখ করেছেন, “সেদিন মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারীরা ঈমানদারদের বলবে, তোমরা আমাদের দিকে একটু তাকাও, যাতে করে আমরা তোমাদের নূর থেকে কিছুটা হলেও আলো গ্রহণ করতে পারি, তাদের বলা হবে, তোমরা (আজ) পেছনে ফিরে যাও এবং (পারলে সেখানে গিয়ে) আলোর সন্ধান করো; অতঃপর এদের (উভয়ের) মাঝখানে একটি প্রাচীর দাঁড় করিয়ে দেয়া হবে, এতে একটি দরজাও থাকবে; যার ভেতরের দিকে থাকবে (আল্লাহর) রহমত, আর তার বাইরের দিকে থাকবে (ভয়াবহ) আজাব। তখন মুনাফিক দল ঈমানদারদের ডেকে বলবে, আমরা কি (দুনিয়ার জীবনে) তোমাদের সাথী ছিলাম না; তারা বলবে, হ্যাঁ (অবশ্যই ছিলে), তবে তোমরা নিজেরাই নিজেদের (গোমরাহির বিপদে) বিপদগ্রস্ত করে দিয়েছিলে, তোমরা (সব সময় সুযোগের) অপেক্ষায় থাকতে, নানা রকমের) সন্দেহ পোষণ করতে (আসলে দুনিয়ার) মোহ তোমাদের সব সময়ই প্রতারিত করে রেখেছিলো, আর এভাবে (একদিন তোমাদের ব্যাপারে) আল্লাহর (পক্ষ থেকে মৃত্যুর) ফায়সালা এসে হাযির হলো এবং সে (প্রতারক শয়তান) তোমাদের আল্লাহ তায়ালা সম্পর্কেও ধোঁকায় ফেলে রেখেছিলো।” (সূরা হাদিদ : ১৩-১৪)
তখন মুনাফিক ও অস্বীকারকারীরা দিশেহারা হয়ে বলবে যদি মাটি হয়ে যেতাম! আল্লাহ তাদের এমন আকুতিটুকুও বাদ রাখেনি তার কালামে সুবহানআল্লাহ! “আমি আসন্ন আজাব সম্পর্কে তোমাদের সতর্ক করে দিলাম, সেদিন মানুষ দেখতে পাবে তার হাত দু’টি এ দিনের জন্য কী কী জিনিস পাঠিয়েছে, (এ দিনকে) অস্বীকারকারী ব্যক্তি তখন বলে উঠবে (ধিক্ এমনি এক জীবনের জন্য), হায়, কতো ভালো হতো যদি মানুষ (না হয়ে) আমি (আজ) মাটি হতাম!” (সূরা নাবা : ৪০)
দুনিয়াতে যেসকল আপন মানুষ, প্রাণের দোস্ত, সঙ্গী যাদের সাথে না মিশলে সময় পার হতো না, যাদের সাথে সময় দিতে গিয়ে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ভুলে গেলেন, যাদের দ্বারা খারাপের দিকে আসক্ত হয়েছেন, যাদের চরিত্রে প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর অবাধ্য হয়েছেন আজ তারা কেউ আপনার ঐ সময়ের আমলের ভাগ নিতে আসবে না। সেদিন প্রত্যেকে তার কর্মফল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাবে আর আল্লাহর নিকট জবাবদিহিতার ভয়ে ভীতিসঞ্চার হবে।
সেদিন শুধুমাত্র তাদের আপনি বন্ধু হিসেবে পাবেন যাকে আল্লাহর জন্য ভালোবেসেছেন। তারাই হবে আপনার জান্নাতের সঙ্গী যদি আপনি সে জান্নাত উপযোগী মানুষ হয়ে আল্লাহর আদালতে আসার সৌভাগ্য অর্জনের জন্য দুনিয়াতে কাজ করেন। সেদিন একমাত্র মুত্তাকিরাই আপনার বন্ধু হবে। দুনিয়াবি সুখ সাফল্য লাভের জন্য যত বন্ধু আপনার ছিলো সবাই আপনার পর হয়ে যাবে। শুধু পর হবে না তারা শত্রুতেও পরিণত হবে।
এখন আমাদের কেমন বন্ধু প্রয়োজন তার একটি ছোট্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন আছে। মানুষ বলে অসৎ বন্ধু থাকলে শত্রু লাগে না। আবার ভালো মানুষের সহবত পেলে কুকুরও ধন্য হয়। তার প্রমাণ আমরা দেখতে পাই আসহাবে কাহাফের ঘটনায়। আমি সূরা কাহাফের আলোচনায় যাব না। চাইলে এ সূরাটি পড়ে নিতে পারেন নিজের জন্য। অত্যাচারী রাজার কাছ থেকে ঈমান বাঁচাতে যে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন তা আল্লাহ সমগ্র উম্মাহর জন্য শিক্ষণীয় হিসেবে কুরআনে রেকর্ড করে দিলেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাথীদের বন্ধু নির্বাচনে বেশ কিছু পদক্ষেপ দেখিয়ে দিয়েছেন হাদীসে। রাসূল সা. বলেছেন, “মানুষ তার বন্ধুর দ্বারা বেশি প্রভাবিত হয়, তাই প্রত্যকের খেয়াল রাখা উচিত সে কার সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করছে।” (তিরমিযি-২৩৭৮)
“তুমি ঈমানদার লোক ব্যতীত অন্য কারও সঙ্গী হয়ো না এবং আল্লাহভীরু মুত্তাকি লোক ছাড়া কেউ যেন তোমার খাদ্য না খায়।” (আবু দাউদ-৪৮৩২)
বন্ধু নির্বাচনে তিনটি গুণকে প্রাধান্য দিতে হবে :
১. খোদাভীরু
২. আমানতদারি
৩. সত্যবাদী
আল্লাহর তায়ালা বলেছেন, “যখন সে দিনটি আসবে তখন মুত্তাকিরা ছাড়া অবশিষ্ট সব বন্ধুই একে অপরের দুশমন হয়ে যাবে।” (সূরা যুখরুফ : ৬৭)
তাই আমাদের বন্ধুত্ব তৈরির ক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখতে হবে তার চরিত্র, কর্ম, আচার ব্যবহার, কথা-বার্তা, চিন্তা-চেতনা, স্বভাব ইত্যাদি। কারণ একজন বন্ধু সহজে যেকোনো দিকে প্রভাবিত করতে পারে।
তাই আল্লাহ আমাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক জীবনে অসৎ খোদাদ্রোহী বন্ধু থেকে হেফাজত করুন। এমন বন্ধু আমাদের দান করুন যাদের নিয়ে জান্নাতেও একসাথে থাকতে পারি। এমন বন্ধু আল্লাহ আমাদের দান করুন যারা আমাদের জান্নাতের পথে আহবান করে।
লেখক : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম কলেজ

SHARE

Leave a Reply