বন্যায় স্বাস্থ্যসমস্যা ও করণীয়

ডা: মো: মোয়াজ্জেম হোসেন এফআরসিপি#

বন্যা আমাদের জন্য নতুন কোনো সমস্যা নয়। আমরা ভাটি অঞ্চলের মানুষ। এখানকার জনবসতিদের কাছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলতে মূলত বন্যাই সমধিক পরিচিত। বন্যার ধরনের ওপর নির্ভর করে স্বাস্থ্যসমস্যাও নানা রকম হয়ে থাকে। তবে বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে যা সব ধরনের বন্যার ক্ষেত্রেই দেখা দিয়ে থাকে। যেমন-
১. পেটের পীড়া : নানা রকম পেটের পীড়া হয়ে থাকে-
ক) ডায়রিয়া, কলেরা।
খ) ডিসেন্ট্রি : আমাশয় ও রক্ত আমাশয়।
গ) টাইফয়েড : টাইফয়েডও এক ধরনের পেটের পীড়ার মাধ্যমে সৃষ্টি হয়।
ঘ) ভাইরাল হেপাটাইটিস, হেপ : ই, এ।
২. বুকের প্রদাহ : কফ, কাশি, শ্বাসকষ্ট নিয়ে নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কাইটিস প্রভৃতি হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে শিশুরাই বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকে।
৩. জ্বর বা তাপ : নানা রকম ভাইরাল ও ব্যাকটেরিয়াল জ্বর বা তাপ হয়ে থাকে।
৪. চর্মরোগ : নানা রকম চর্মরোগ, যেমন- খুস-পাঁচরা, ফাংগাল ইনফেকশন, একজিমা প্রভৃতি চর্মরোগ হয়ে থাকে।
৫. চোখের প্রদাহ : বন্যায় নানারকম চোখের প্রদাহ হয়ে থাকে। যেমন কনজানটিভাইটিস, আইরাইটিস প্রভৃতি।
৬. সর্প দংশন : নানা রকম সর্পদংশনের ঘটনাও ঘটে থাকে।
বন্যায় এ সকল রোগের কারণসমুহ
১. খাদ্য ও পানি : খাদ্য ও পানিবাহিত রোগই অধিক মারাত্মক। ডাইরিয়াল রোগসমূহ, কিছু কিছু জ্বর-তাপও হেপাটাইটিস খাদ্য ও পানি দ্বারা ছড়িয়ে থাকে।
২. বৃষ্টি বাদল ও অধিকমাত্রায় পানিতে ভেজা : বৃষ্টি বাদল ও অধিক মাত্রায় পানি ঘাঁটাঘাঁটি করার করণে হাঁচি-কাশি, কফ, জ্বর তাপ দেখা দেয়। এ জ্বর তাপই এক সময় ব্রঙ্কাইটিস, নিউমোনিয়া প্রভৃতি হতে পারে।
৩. সৃষ্ট বন্যার পানি : এই পানির মাধ্যমে নানারকমের চোখের রোগ, চর্মরোগ হয়ে থাকে।
বন্যায় স্বাস্থ্য সুরক্ষার উপায় : বন্যায় স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য কিছু সচেতনতা আবশ্যক। যেমন-
১. বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্য ব্যবহার করা। প্রায় অধিকাংশ রোগই পানি ও খাদ্যবাহিত। তাই বিশুদ্ধ পানি ও টাটকা খাবারই এ সব রোগ থেকে রক্ষা করতে পারে। পানিকে সেকে কমপক্ষে আধাঘণ্টা ফোটাতে হবে। তা ছাড়া ফিটকিরি, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট দিয়েও পানি বিশুদ্ধ করা যায়। প্লেট, গ্লাস, হাত ভালো করে বিশুদ্ধ পানি দিয়ে পরিষ্কার করে নিতে হবে। খাবারটা টাটকা খাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। বাসি, নষ্ট খাবার পরিহার করতে হবে।
২. বন্যার পানিতে বেশি হাঁটা, চলচলা, গোসল করা পরিহার করতে হবে। এতে করে জ্বর- তাপ বুকের প্রদাহ, চর্মরোগ, থেকে রক্ষা পাবে।
৩. বন্যায় সর্পদংশেনের মাত্রা বেড়ে যায়। পানির কারণে নানা ধরনের সাপ গর্ত ছেড়ে আশ্রয়ের খোঁজে ডাঙায় ওঠে।
আক্রান্ত হলে করণীয় : ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হলে খাবার স্যালাইন খেতে হবে। বমি বেশি হলে শিরায় স্যালাইন দিতে হবে। অতিমাত্রায় পাতলা পায়খানা, বমি হলে, রক্ত গেলে, জ্বর থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
বুকে প্রদাহ হলে : বৃষ্টি, ঝড়, বন্যার কারণে কফ-কাশি, শ্বাসকষ্ট, জ্বর প্রভৃতি হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে কিছু উপসর্গ নিরাময়ের ওষুধ সেবনের পরও কোন উপকার না পেলে ডাক্তারে শরণাপন্ন হতে হবে।
চর্মরোগ হলে : নানারকম চর্মরোগ দেখা দিয়ে থাকে। এই ক্ষেত্রে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চিকিৎসকের সহযোগতিা নিতে হবে।
চোখের প্রদাহ হলে : সাধারণ ভাইরাল কনজাইটিভাইটিস হলে ক্লোম ফেনিক্যাল চোখের ড্রপ দৈনিক ৩-৪ বার করে ব্যবহার করতে হবে। জটিলতা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
সর্প দংশনের ক্ষেত্রে : আক্রান্ত স্থানের ওপর মোটা কাপড় জাতীয় জিনিস দিয়ে বেঁধে ক্ষতস্থান ভালো করে পরিষ্কার করে নিতে হবে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।
লেখক : প্রাক্তন সহযোগী অধ্যাপক (মেডিসিন), নর্দার্ন মেডিক্যাল কলেজ

SHARE

Leave a Reply